05-10-2026, 01:39 PM
(This post was last modified: 05-10-2026, 01:48 PM by কাদের. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
ঙ
আবিদ প্রথমবার বুশরাকে দেখেছিল লাইব্রেরির তৃতীয় তলায়। সেদিন বিকেলের রোদ জানালা দিয়ে এসে পড়েছিল টেবিলের ওপর। ধুলোর কণাগুলো আলোর মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আবিদ একটা রেফারেন্স বই খুঁজছিল। ব্যবসায় প্রশাসনের একটা কেস স্টাডির জন্য। তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বইয়ের নামগুলো দেখছিল। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে একটা পাতা ওল্টানোর শব্দ শুনতে পেল।
মেয়েটা বসেছিল জানালার পাশে। মাথায় হালকা স্কার্ফ। সাদা রঙের। চুলগুলো স্কার্ফের নিচে ঢাকা, কিন্তু কয়েকটা পাতলা চুল বেরিয়ে এসে গালের ওপর পড়েছিল। মুখখানা ফর্সা। চোখ কালো, বড়। নাক ছোট, সোজা। ঠোঁট পাতলা। কোনো মেকআপ নেই। শুধু একটা হালকা গোলাপি ভাব ঠোঁটে। সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। খাতায় মাঝে মাঝে কিছু লিখছিল। হাতের আঙুলগুলো লম্বা, পরিষ্কার। কলমটা ধরার ভঙ্গিটাও সাজানো। আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন আলোর ভেতর থেকেই তৈরি। কোনো উচ্চস্বরে হাসি নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। শুধু একটা শান্ত উপস্থিতি। যেন পুরো লাইব্রেরির শব্দহীনতা তার চারপাশে জড়ো হয়েছে।
সে দিন আবিদ কিছু বলেনি। শুধু একবার চোখ পড়েছিল। তারপর নিজের কাজ করে চলে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল জেনারেল এডুকেশনের একটা ক্লাসে। বুশরা সামনের সারিতে বসত। আবিদ মাঝখানে। প্রফেসর যখন প্রশ্ন করতেন, বুশরা উত্তর দিত পরিষ্কার গলায়। কোনো দ্বিধা নেই। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকু। আবিদের ভালো লেগেছিল। মেয়েটার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আছে। যে শৃঙ্খলা আবিদ নিজেও পছন্দ করত। একদিন ক্লাসের পর করিডোরে দেখা হয়ে গেল। আবিদ বই নিয়ে যাচ্ছিল। বুশরাও একই দিকে। আবিদ একটু থেমে বলল, “আপনি গতকালের প্রশ্নের উত্তরটা খুব ভালো দিয়েছিলেন।” বুশরা ঘুরে তাকাল। চোখে কোনো অতিরিক্ত কৌতূহল নেই। শুধু একটা শান্ত দৃষ্টি।
“ধন্যবাদ।”
আবিদ একটু দ্বিধা করে বলল,
“আমি আবিদ। বিবিএ।”
বুশরা মাথা নাড়ল।
“বুশরা। ইংলিশ।”
সেই পরিচয়। খুব সাধারণ। কোনো নাটকীয়তা নেই। কিন্তু আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটার নামটাও তার মতোই পরিষ্কার। বুশরা।
তারপর আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল। লাইব্রেরিতে, ক্যাফেটেরিয়ায়, কখনো কখনো ক্যাম্পাসের প্লাজায়। আবিদ কখনোই জোর করে কথা বাড়াত না। শুধু যখন সুযোগ হত, তখন একটা-দুটো কথা বলত। বুশরাও জবাব দিত। সংক্ষেপে। কিন্তু অসভ্য না।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ক্যাম্পাসের ওপেন স্পেস দিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই ভিজে গিয়েছিল। আবিদের কাছে একটা ছাতা ছিল। সে বুশরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নিয়ে নিন। আমার বাসা কাছে।”
বুশরা একটু দ্বিধা করেছিল। তারপর ছাতাটা নিয়েছিল।
“ধন্যবাদ। আমি পরে ফেরত দিয়ে দেব।”
আবিদ হাসল।
“কোনো তাড়া নেই।”
সেই ছাতা ফেরত দিতে গিয়ে তাদের মধ্যে প্রথমবার লম্বা কথা হয়েছিল। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় বসে। আবিদ জিজ্ঞেস করেছিল তার পড়াশোনা নিয়ে। বুশরা বলেছিল ইংরেজি সাহিত্য কেন পছন্দ। আবিদ বলেছিল সে কর্পোরেট জগতে যেতে চায়। স্থির। পরিকল্পনা করে। বুশরা বলেছিল সে সামাজিক কাজে আগ্রহী। Teach for Bangladesh বা এমন কিছু। আবিদ মাথা নেড়েছিল। কোনো বিদ্রূপ নেই। কোনো হালকা মন্তব্য নেই। শুধু শুনেছিল।
বুশরার চোখে আবিদ প্রথম থেকেই আলাদা লেগেছিল। অন্য ছেলেরা কথা বলার সময় চোখ ঘোরায়। হাসে অতিরিক্ত। কখনো কখনো কথায় একটা চাপ থাকে। আবিদের তা নেই। সে কথা বলে কম। কিন্তু যা বলে, তা মাপজোখ করে। মেয়েদের দিকে তাকানোর সময় তার চোখে কোনো অশালীনতা থাকে না। সম্মান থাকে। বুশরা সেটা লক্ষ করেছিল। আবিদ যখন কথা বলত, পুরোপুরি মনোযোগ দিত। ফোন দেখত না। অন্যদিকে তাকাত না। যেন সামনের মানুষটাই সেই মুহূর্তের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আবিদের চেহারা নাটকীয়ভাবে সুন্দর নয়। কিন্তু পরিষ্কার। চোখ শান্ত। কথা বলার ভঙ্গিটা দায়িত্বশীল। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা জীবনকে সিরিয়াসলি নেয়। ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে। পরিবারের কথা বলে সম্মানের সাথে। কোনো অতিরিক্ত আবেগ দেখায় না। কোনো নাটক করে না। একদিন ক্লাসে গ্রুপ প্রেজেন্টেশন ছিল। বুশরা তার অংশটা বলেছিল খুব পরিষ্কারভাবে। কোনো হকচকানি নেই। আবিদ পরে করিডোরে বলেছিল,
“তোমার কথা বলার ধরনটা খুব লজিক্যাল। শুনতে ভালো লাগে। এতটা গুছিয়ে কথা বলতে পারা সহজ নয়।”
বুশরা সেদিন একটু হেসেছিল।
“আপনিও খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন।”
আবিদ বলেছিল,
“মনোযোগ দেওয়া উচিত। কেউ যখন কষ্ট করে কিছু বলে, তখন শোনাটাই সম্মান দেখানো।”
বুশরার মনে সেই কথাটা থেকে গিয়েছিল। সম্মান। আবিদ সেই শব্দটা বুঝত।
তাদের মধ্যে কথা বাড়তে শুরু করল ধীরে ধীরে। সাপ্তাহে দুবার-তিনবার। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যাফেটেরিয়ায়। আবিদ কখনোই প্রথম উদ্যোগ নিত না কোনো অতিরিক্ত কিছুর জন্য। বুশরা যখন কথা বাড়াত, তখন সে সাড়া দিত। বুশরা যখন চুপ থাকত, তখন সেও চুপ থাকত।
একদিন বুশরা অসুস্থ ছিল। ক্লাসে আসেনি। আবিদ খবর পেয়ে সাদিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছিল। সন্ধ্যায় একটা মেসেজ করেছিল।
“শুনলাম অসুস্থ। তাড়াতাড়ি সুস্থ হোন। কোন দরকার লাগলে বলবেন।”
বুশরা উত্তর দিয়েছিল,
“ধন্যবাদ। অসুবিধা নেই।”
কিন্তু সেই মেসেজটা তার ভালো লেগেছিল। কোনো অতিরিক্ত আবেগ নেই। কোনো নাটক নেই। শুধু খোঁজ।
আবিদের চোখে বুশরার প্রতি আবেগ দিনে দিনে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
মেয়েটার হাঁটার ধরনটা শান্ত। কোনো অতিরিক্ত ভাঁজ নেই। স্কার্ফ পরেও তার মুখখানা আলোর মতো ফুটে থাকে। যখন সে পড়াশোনার কথা বলে, চোখে একটা জ্বলজ্বলে ভাব আসে। যখন কেউ নিয়ম ভাঙে, তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে। আবিদের মনে হত, বুশরা যেন নিজের জীবনকে একটা পরিষ্কার কাঠামোর মধ্যে রেখে চলে। সেই কাঠামোটাই তার সৌন্দর্য। শরীরের রেখাগুলো কোমল। কাঁধ ছোট, সরু। হাঁটার সময় স্কার্ফের দুই প্রান্ত হালকা দোলে। গলার রেখাটা পরিষ্কার। আবিদ কখনোই সেই সৌন্দর্যকে নোংরা চোখে দেখেনি। দেখেছে একটা শান্ত ছবির মতো। যেন কেউ খুব যত্ন করে আঁকা একটি প্রতিকৃতি।
বুশরাও আবিদকে দেখতে শুরু করেছিল অন্যভাবে। ছেলেটা দায়িত্বশীল। কথা দিলে রাখে। সময়ের প্রতি খেয়াল রাখে। মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় কোনো হালকা মন্তব্য করে না। ক্যারিয়ার নিয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে। পরিবারের প্রতি সম্মান আছে। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটার সাথে কথা বললে মনটা অস্থির হয় না। বরং শান্ত হয়। যেন কেউ পাশে থেকে বলছে, সবকিছু ঠিকঠাক চলবে।
তাদের মধ্যে প্রথমবার হাত ধরাধরি হয়েছিল অনেক পরে। একদিন ক্যাম্পাসের বাইরে একটা বইমেলায়। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ মানুষজন ধাক্কা দিয়েছিল। আবিদ বুশরার হাতটা ধরে নিয়েছিল। শক্ত করে না। শুধু যাতে সে হারিয়ে না যায়। বুশরা হাত ছাড়ায়নি। আবিদের হাতটা উষ্ণ ছিল। নিরাপদ।
সেই রাতে বুশরা নিজে থেকে মেসেজ করেছিল।
“আজকের জন্য ধন্যবাদ।”
আবিদ উত্তর দিয়েছিল,
“আমি ছিলাম বলেই ধন্যবাদ দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই।”
বুশরা সেই মেসেজটা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখেছিল।
তাদের সম্পর্কটা ঘোষণা করে হয়নি। একদিন আবিদ বলেছিল,
“আমি তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসি। যদি তোমারও তাই লাগে, তাহলে আমরা এটাকে একটা নাম দিতে পারি।”
বুশরা চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল,
“আমারও ভালো লাগে।”
সেই ভালোলাগাটাই তাদের সম্পর্ক। কোনো ঝড়ো রাত নয়। কোনো অশ্রু নয়। শুধু দুজন মানুষের শান্ত সম্মতি। আবিদ বুশরাকে কখনো জোর করেনি। কোনো সীমা অতিক্রম করেনি। চুমু খেয়েছিল অনেক পরে। দুইবার। খুব সংক্ষেপে। কপালে। বুশরা সেই মুহূর্তগুলোতে চোখ বন্ধ করেছিল। ভয় পায়নি। কারণ আবিদের স্পর্শে কোনো লোভ ছিল না। শুধু একটা নরম অনুভূতি। বুশরার চোখে আবিদ হয়ে উঠেছিল সেই মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। যে মেয়েদের সম্মান করতে জানে। যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। যে কথা দিলে রাখে।
আবিদের চোখে বুশরা হয়ে উঠেছিল সেই মেয়ে, যার উপস্থিতি শান্ত। যার চোখে লক্ষ্য আছে। যার সৌন্দর্য চিৎকার করে না, কিন্তু থেকে যায়। স্কার্ফের নিচে লুকানো চুলগুলো, ফর্সা মুখ, শান্ত হাঁটা সবকিছু মিলে একটা পরিচ্ছন্ন ছবি। তারা দুজনই জানত, তাদের সম্পর্কটা দ্রুতগতির নয়। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা। যেন কেউ ইটের পর ইট সাজিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করছে। তাড়াহুড়ো নেই। শুধু নিশ্চিত পদক্ষেপ। আজ যখন আবিদ বুশরার সাথে কথা বলে, তখনও সেই একই শান্তি থাকে। আর বুশরা যখন আবিদের কথা শোনে, তখনও মনে হয়, এই ছেলেটা তাকে সম্মান করে। তাকে বোঝে। তাকে তাড়া করে না। তাদের ভালোবাসাটা এমনই। জোরালো শব্দে না বরং নিঃশব্দে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় নিজেদের ভিতরে।
আবিদ প্রথমবার বুশরাকে দেখেছিল লাইব্রেরির তৃতীয় তলায়। সেদিন বিকেলের রোদ জানালা দিয়ে এসে পড়েছিল টেবিলের ওপর। ধুলোর কণাগুলো আলোর মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আবিদ একটা রেফারেন্স বই খুঁজছিল। ব্যবসায় প্রশাসনের একটা কেস স্টাডির জন্য। তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বইয়ের নামগুলো দেখছিল। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে একটা পাতা ওল্টানোর শব্দ শুনতে পেল।
মেয়েটা বসেছিল জানালার পাশে। মাথায় হালকা স্কার্ফ। সাদা রঙের। চুলগুলো স্কার্ফের নিচে ঢাকা, কিন্তু কয়েকটা পাতলা চুল বেরিয়ে এসে গালের ওপর পড়েছিল। মুখখানা ফর্সা। চোখ কালো, বড়। নাক ছোট, সোজা। ঠোঁট পাতলা। কোনো মেকআপ নেই। শুধু একটা হালকা গোলাপি ভাব ঠোঁটে। সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। খাতায় মাঝে মাঝে কিছু লিখছিল। হাতের আঙুলগুলো লম্বা, পরিষ্কার। কলমটা ধরার ভঙ্গিটাও সাজানো। আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন আলোর ভেতর থেকেই তৈরি। কোনো উচ্চস্বরে হাসি নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। শুধু একটা শান্ত উপস্থিতি। যেন পুরো লাইব্রেরির শব্দহীনতা তার চারপাশে জড়ো হয়েছে।
সে দিন আবিদ কিছু বলেনি। শুধু একবার চোখ পড়েছিল। তারপর নিজের কাজ করে চলে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল জেনারেল এডুকেশনের একটা ক্লাসে। বুশরা সামনের সারিতে বসত। আবিদ মাঝখানে। প্রফেসর যখন প্রশ্ন করতেন, বুশরা উত্তর দিত পরিষ্কার গলায়। কোনো দ্বিধা নেই। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকু। আবিদের ভালো লেগেছিল। মেয়েটার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আছে। যে শৃঙ্খলা আবিদ নিজেও পছন্দ করত। একদিন ক্লাসের পর করিডোরে দেখা হয়ে গেল। আবিদ বই নিয়ে যাচ্ছিল। বুশরাও একই দিকে। আবিদ একটু থেমে বলল, “আপনি গতকালের প্রশ্নের উত্তরটা খুব ভালো দিয়েছিলেন।” বুশরা ঘুরে তাকাল। চোখে কোনো অতিরিক্ত কৌতূহল নেই। শুধু একটা শান্ত দৃষ্টি।
“ধন্যবাদ।”
আবিদ একটু দ্বিধা করে বলল,
“আমি আবিদ। বিবিএ।”
বুশরা মাথা নাড়ল।
“বুশরা। ইংলিশ।”
সেই পরিচয়। খুব সাধারণ। কোনো নাটকীয়তা নেই। কিন্তু আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটার নামটাও তার মতোই পরিষ্কার। বুশরা।
তারপর আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল। লাইব্রেরিতে, ক্যাফেটেরিয়ায়, কখনো কখনো ক্যাম্পাসের প্লাজায়। আবিদ কখনোই জোর করে কথা বাড়াত না। শুধু যখন সুযোগ হত, তখন একটা-দুটো কথা বলত। বুশরাও জবাব দিত। সংক্ষেপে। কিন্তু অসভ্য না।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ক্যাম্পাসের ওপেন স্পেস দিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই ভিজে গিয়েছিল। আবিদের কাছে একটা ছাতা ছিল। সে বুশরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নিয়ে নিন। আমার বাসা কাছে।”
বুশরা একটু দ্বিধা করেছিল। তারপর ছাতাটা নিয়েছিল।
“ধন্যবাদ। আমি পরে ফেরত দিয়ে দেব।”
আবিদ হাসল।
“কোনো তাড়া নেই।”
সেই ছাতা ফেরত দিতে গিয়ে তাদের মধ্যে প্রথমবার লম্বা কথা হয়েছিল। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় বসে। আবিদ জিজ্ঞেস করেছিল তার পড়াশোনা নিয়ে। বুশরা বলেছিল ইংরেজি সাহিত্য কেন পছন্দ। আবিদ বলেছিল সে কর্পোরেট জগতে যেতে চায়। স্থির। পরিকল্পনা করে। বুশরা বলেছিল সে সামাজিক কাজে আগ্রহী। Teach for Bangladesh বা এমন কিছু। আবিদ মাথা নেড়েছিল। কোনো বিদ্রূপ নেই। কোনো হালকা মন্তব্য নেই। শুধু শুনেছিল।
বুশরার চোখে আবিদ প্রথম থেকেই আলাদা লেগেছিল। অন্য ছেলেরা কথা বলার সময় চোখ ঘোরায়। হাসে অতিরিক্ত। কখনো কখনো কথায় একটা চাপ থাকে। আবিদের তা নেই। সে কথা বলে কম। কিন্তু যা বলে, তা মাপজোখ করে। মেয়েদের দিকে তাকানোর সময় তার চোখে কোনো অশালীনতা থাকে না। সম্মান থাকে। বুশরা সেটা লক্ষ করেছিল। আবিদ যখন কথা বলত, পুরোপুরি মনোযোগ দিত। ফোন দেখত না। অন্যদিকে তাকাত না। যেন সামনের মানুষটাই সেই মুহূর্তের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আবিদের চেহারা নাটকীয়ভাবে সুন্দর নয়। কিন্তু পরিষ্কার। চোখ শান্ত। কথা বলার ভঙ্গিটা দায়িত্বশীল। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা জীবনকে সিরিয়াসলি নেয়। ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে। পরিবারের কথা বলে সম্মানের সাথে। কোনো অতিরিক্ত আবেগ দেখায় না। কোনো নাটক করে না। একদিন ক্লাসে গ্রুপ প্রেজেন্টেশন ছিল। বুশরা তার অংশটা বলেছিল খুব পরিষ্কারভাবে। কোনো হকচকানি নেই। আবিদ পরে করিডোরে বলেছিল,
“তোমার কথা বলার ধরনটা খুব লজিক্যাল। শুনতে ভালো লাগে। এতটা গুছিয়ে কথা বলতে পারা সহজ নয়।”
বুশরা সেদিন একটু হেসেছিল।
“আপনিও খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন।”
আবিদ বলেছিল,
“মনোযোগ দেওয়া উচিত। কেউ যখন কষ্ট করে কিছু বলে, তখন শোনাটাই সম্মান দেখানো।”
বুশরার মনে সেই কথাটা থেকে গিয়েছিল। সম্মান। আবিদ সেই শব্দটা বুঝত।
তাদের মধ্যে কথা বাড়তে শুরু করল ধীরে ধীরে। সাপ্তাহে দুবার-তিনবার। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যাফেটেরিয়ায়। আবিদ কখনোই প্রথম উদ্যোগ নিত না কোনো অতিরিক্ত কিছুর জন্য। বুশরা যখন কথা বাড়াত, তখন সে সাড়া দিত। বুশরা যখন চুপ থাকত, তখন সেও চুপ থাকত।
একদিন বুশরা অসুস্থ ছিল। ক্লাসে আসেনি। আবিদ খবর পেয়ে সাদিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছিল। সন্ধ্যায় একটা মেসেজ করেছিল।
“শুনলাম অসুস্থ। তাড়াতাড়ি সুস্থ হোন। কোন দরকার লাগলে বলবেন।”
বুশরা উত্তর দিয়েছিল,
“ধন্যবাদ। অসুবিধা নেই।”
কিন্তু সেই মেসেজটা তার ভালো লেগেছিল। কোনো অতিরিক্ত আবেগ নেই। কোনো নাটক নেই। শুধু খোঁজ।
আবিদের চোখে বুশরার প্রতি আবেগ দিনে দিনে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
মেয়েটার হাঁটার ধরনটা শান্ত। কোনো অতিরিক্ত ভাঁজ নেই। স্কার্ফ পরেও তার মুখখানা আলোর মতো ফুটে থাকে। যখন সে পড়াশোনার কথা বলে, চোখে একটা জ্বলজ্বলে ভাব আসে। যখন কেউ নিয়ম ভাঙে, তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে। আবিদের মনে হত, বুশরা যেন নিজের জীবনকে একটা পরিষ্কার কাঠামোর মধ্যে রেখে চলে। সেই কাঠামোটাই তার সৌন্দর্য। শরীরের রেখাগুলো কোমল। কাঁধ ছোট, সরু। হাঁটার সময় স্কার্ফের দুই প্রান্ত হালকা দোলে। গলার রেখাটা পরিষ্কার। আবিদ কখনোই সেই সৌন্দর্যকে নোংরা চোখে দেখেনি। দেখেছে একটা শান্ত ছবির মতো। যেন কেউ খুব যত্ন করে আঁকা একটি প্রতিকৃতি।
বুশরাও আবিদকে দেখতে শুরু করেছিল অন্যভাবে। ছেলেটা দায়িত্বশীল। কথা দিলে রাখে। সময়ের প্রতি খেয়াল রাখে। মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় কোনো হালকা মন্তব্য করে না। ক্যারিয়ার নিয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে। পরিবারের প্রতি সম্মান আছে। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটার সাথে কথা বললে মনটা অস্থির হয় না। বরং শান্ত হয়। যেন কেউ পাশে থেকে বলছে, সবকিছু ঠিকঠাক চলবে।
তাদের মধ্যে প্রথমবার হাত ধরাধরি হয়েছিল অনেক পরে। একদিন ক্যাম্পাসের বাইরে একটা বইমেলায়। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ মানুষজন ধাক্কা দিয়েছিল। আবিদ বুশরার হাতটা ধরে নিয়েছিল। শক্ত করে না। শুধু যাতে সে হারিয়ে না যায়। বুশরা হাত ছাড়ায়নি। আবিদের হাতটা উষ্ণ ছিল। নিরাপদ।
সেই রাতে বুশরা নিজে থেকে মেসেজ করেছিল।
“আজকের জন্য ধন্যবাদ।”
আবিদ উত্তর দিয়েছিল,
“আমি ছিলাম বলেই ধন্যবাদ দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই।”
বুশরা সেই মেসেজটা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখেছিল।
তাদের সম্পর্কটা ঘোষণা করে হয়নি। একদিন আবিদ বলেছিল,
“আমি তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসি। যদি তোমারও তাই লাগে, তাহলে আমরা এটাকে একটা নাম দিতে পারি।”
বুশরা চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল,
“আমারও ভালো লাগে।”
সেই ভালোলাগাটাই তাদের সম্পর্ক। কোনো ঝড়ো রাত নয়। কোনো অশ্রু নয়। শুধু দুজন মানুষের শান্ত সম্মতি। আবিদ বুশরাকে কখনো জোর করেনি। কোনো সীমা অতিক্রম করেনি। চুমু খেয়েছিল অনেক পরে। দুইবার। খুব সংক্ষেপে। কপালে। বুশরা সেই মুহূর্তগুলোতে চোখ বন্ধ করেছিল। ভয় পায়নি। কারণ আবিদের স্পর্শে কোনো লোভ ছিল না। শুধু একটা নরম অনুভূতি। বুশরার চোখে আবিদ হয়ে উঠেছিল সেই মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। যে মেয়েদের সম্মান করতে জানে। যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। যে কথা দিলে রাখে।
আবিদের চোখে বুশরা হয়ে উঠেছিল সেই মেয়ে, যার উপস্থিতি শান্ত। যার চোখে লক্ষ্য আছে। যার সৌন্দর্য চিৎকার করে না, কিন্তু থেকে যায়। স্কার্ফের নিচে লুকানো চুলগুলো, ফর্সা মুখ, শান্ত হাঁটা সবকিছু মিলে একটা পরিচ্ছন্ন ছবি। তারা দুজনই জানত, তাদের সম্পর্কটা দ্রুতগতির নয়। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা। যেন কেউ ইটের পর ইট সাজিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করছে। তাড়াহুড়ো নেই। শুধু নিশ্চিত পদক্ষেপ। আজ যখন আবিদ বুশরার সাথে কথা বলে, তখনও সেই একই শান্তি থাকে। আর বুশরা যখন আবিদের কথা শোনে, তখনও মনে হয়, এই ছেলেটা তাকে সম্মান করে। তাকে বোঝে। তাকে তাড়া করে না। তাদের ভালোবাসাটা এমনই। জোরালো শব্দে না বরং নিঃশব্দে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় নিজেদের ভিতরে।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)