Thread Rating:
  • 9 Vote(s) - 1.89 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি
#50
«নাবিলা»

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা এখনো সিনথিয়ার কানে বাজছিল।

অর্ণব চলে গেছে। সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ — তবু সিনথিয়া বিছানায় বসে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে জল জমেছিল, গড়িয়ে পড়ছিল না — যেন চোখও বুঝতে পারছিল না কাঁদবে কি হাসবে।

ঘরে এখনো তার গন্ধ — ঘাম আর সাবানের মিশ্রণ। বালিশে তার মাথার ছাপ। সিনথিয়া বালিশটা বুকে চেপে ধরল — গভীর শ্বাস নিল। কয়েক ঘণ্টা আগে এই ঘরে যা হয়েছে — তা শুধু শরীর ছিল না। ছিল প্রতিশ্রুতি — দূরত্বেও ভাঙবে না এমন। আঙুলে এখনো তার আঙুলের ছোঁয়া লেগে আছে যেন।

পেছনে নাবিলার পায়ের শব্দ। দরজা ভেজানো ছিল — নাবিলা ঠেলে ঢুকল, এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, তারপর এসে সিনথিয়ার পাশে বসল। কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে সিনথিয়াকে নিজের কাঁধে টেনে নিল।

আর তখনই বাঁধ ভাঙল। সিনথিয়া নাবিলার কাঁধে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল — নিঃশব্দে না, হেঁচকি তুলে, বাচ্চাদের মতো।

নাবিলা: "কাঁদিস না পাগলি।"

সিনথিয়া: "কাঁদব না? তুই থাকবি, ও থাকবে, আমি চলে যাব — আর আমি কাঁদব না?"

নাবিলা উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিল। সিনথিয়া ঢকঢক করে খেল — গলা ভিজল, কান্না একটু থামল।

নাবিলা: "তোর কী মনে হয় — আমি খুশি? আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটা চলে যাচ্ছে — আর আমি হাততালি দেব?"

সিনথিয়া: "তুই তো ঢাকায় থাকছিস..."

নাবিলা: "আমার তো কী? আমার তো তুই নেই! ক্যান্টিনে দুটো সিঙ্গাড়া অর্ডার করে একটা ফেরত দিতে হবে — কারণ তুই নেই! ছাদে একা চা খেতে হবে!"

সিনথিয়া হেসে ফেলল — চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছিল তবু।

সিনথিয়া: "তুইও তো আগামী বছর..."

নাবিলা: "হ্যাঁ। আমিও মেডিকেলের চেষ্টা করব। হয়তো রংপুরেই! তখন দেখবি — তোর রুমমেট আমি!"

সিনথিয়া: "সত্যি বলছিস?"

নাবিলা: "একশো ভাগ। তুই ছাড়া আমি... আমি চেষ্টা করব। তোর জন্য। তুই পেরেছিস — আমিও পারব।"

নাবিলা সিনথিয়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিল — ধীরে, মায়ের মতো করে।

নাবিলা: "রংপুর কি চাঁদে? বাসে এক রাত। ছুটিতে আসবি, আমি যাব।"

সিনথিয়া: "তুই বলছিস যেন ব্যাপারটা সহজ।"

নাবিলা: "সহজ না। কিন্তু শেষও না।"

সিনথিয়া মুখ তুলল। নাবিলার চোখও ভেজা — সেও কাঁদছিল, লুকোচ্ছিল না।

সিনথিয়া: "মনে আছে? ক্লাস সেভেনে — বৃষ্টিতে ভিজে কলেজ থেকে ফিরছিলাম, তোর জুতো কাদায় আটকে গেল —"

নাবিলা: "আর তুই আমাকে পিঠে করে বাকি রাস্তা নিয়ে গেলি। আমার মা তোকে দেখে বলেছিল — এই মেয়েটা তোর বোনের চেয়েও বেশি।"

দুজনেই হেসে ফেলল — কান্নার মাঝখানে হাসি, অদ্ভুত মিশ্রণ।

সিনথিয়া: "তোর মনে আছে প্রথম যেদিন —"

নাবিলা: "কোন প্রথম?"

সিনথিয়া: "যেদিন তুই আমাকে বললি — তুই আমার রাত।"

নাবিলা থামল। তারপর সিনথিয়ার হাতটা নিজের দুহাতে নিল।

নাবিলা: "তুইও আমার রাত, সিনথিয়া। ও তোর দিন হতে পারে। কিন্তু রাতটা আমার। রাত কখনো দিনের কাছে হার মানে না।"

নাবিলা: "জানিস, আমি ভাবছি — তুই চলে গেলে এই শহরটা কেমন ফাঁকা লাগবে। রিকশায় একা বসতে হবে। ছাদে একা চা খেতে হবে।"

সিনথিয়া: "তুইও তো আসবি। ছুটিতে।"

নাবিলা: "আসব। কিন্তু ততদিন?"

দুজনে চুপ করে রইল। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো আসছিল — নাবিলার মুখে পড়ে। কত বিকেল তারা এভাবে কাটিয়েছে — গুনে শেষ করা যাবে না।

সিনথিয়া: "মনে আছে — ক্লাস নাইনে? তোর জ্বর, পরীক্ষা দিতে পারছিলি না —"

নাবিলা: "চুপ! ওটা কেউ জানে না! তুই আমার হয়ে..."

দুজনে হেসে ফেলল — কান্নার মাঝে।

নাবিলা: "আর সেই বর্ষার দিনটা? ছাদে দুজনে ভিজছিলাম — তোর মা নিচ থেকে চিৎকার করছিল — আমরা কানে আঙুল দিয়ে..."

সিনথিয়া: "তারপর দুজনেরই জ্বর! এক সপ্তাহ কলেজ বন্ধ!"

স্মৃতিরা একে একে আসছিল — কলেজের টিফিন ভাগাভাগি, প্রথম প্রেমের চিঠি পড়ে দুজনে মিলে খিলখিল হাসা, রাত জেগে ফোনে ফিসফিস গল্প, পরীক্ষার আগের রাতে এক বিছানায় শুয়ে ভয় ভাগ করে নেওয়া।

নাবিলা: "তুই জানিস? তুই ছাড়া আমার কোনো 'আমার' মানুষ নেই। তুই আমার সবচেয়ে পুরনো অভ্যাস — ছাড়তে পারব না।"

সিনথিয়া: "ছাড়তে বলেছি?"

নাবিলা ফোন বের করে পুরনো ছবি দেখাতে লাগল — দুজনের কলেজ জীবনের। একটায় দুজনে ঝালমুড়ি খাচ্ছে, মুখে মসলা লেগে। আরেকটায় বৃষ্টিতে ভেজা — চুল এলোমেলো, জামা চুপসে।

নাবিলা: "এই ছবিটা দেখ! তোকে দেখে মনে হচ্ছে ভূত!"

সিনথিয়া: "তুইও কম না! এই চুল দেখ — কাকের বাসা!"

দুজনে হেসে গড়াগড়ি — কান্না ভুলে গেল কিছুক্ষণের জন্য। ছবি দেখতে দেখতে কখন যে নাবিলার মাথা সিনথিয়ার কাঁধে এল — টেরই পেল না দুজনে।

সিনথিয়া: "প্রতিশ্রুতি দে — ভুলে যাবি না।"

নাবিলা: "তোকে ভুলে যাওয়া যায়? তুই আমার শরীরের প্রতিটা জায়গা চিনিস। ভুলতে হলে নিজেকেই ভুলতে হবে।"

কথাটা বলার সময় নাবিলার আঙুল সিনথিয়ার গালে — চোখের জল মুছে দিচ্ছিল। তারপর আঙুল থামল ঠোঁটের কোণে। দুজনের চোখ মিলল।

এই দৃষ্টি তারা চেনে। বহুবার দেখেছে — «নাবিলার ঘর»-এর সেই রাতে, «দ্বিতীয়বার»-এর সেই দুপুরে। কিন্তু আজকের দৃষ্টিতে কিছু আলাদা ছিল — তাড়া নেই, ক্ষুধা নেই — আছে শুধু... বিদায়ের আগে শেষবারের মতো ধরে রাখার ইচ্ছা।

নাবিলা ঝুঁকে সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল। তারপর চোখের পাতায়। তারপর — ঠোঁটে।

ধীরে। খুব ধীরে। যেন সময়কে থামিয়ে রাখতে চাইছে।

সিনথিয়া: "নাবিলা..."

নাবিলা: "চুপ। আজ কোনো কথা না। শুধু... থাক।"

নাবিলা সিনথিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল — নরম করে, যত্নে। তারপর নিজে পাশে শুল। দুজনের মাঝখানে কোনো দেয়াল রইল না — কাপড়ের বাধাও একে একে সরে গেল, তাড়াহুড়ো ছাড়া।

এই শরীর তারা চেনে — প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা সংবেদনশীল জায়গা। নাবিলার হাত সিনথিয়ার পেটে নামল — ধীর বৃত্তে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল।

সিনথিয়া: "আহ..."

নাবিলা: "মনে আছে প্রথমবার? তুই কাঁপছিলি।"

সিনথিয়া: "এখনো কাঁপছি।"

নাবিলা সিনথিয়ার কামিজের বোতাম খুলতে লাগল — একটা একটা করে, তাড়াহুড়ো না করে। প্রতিটা বোতামের সাথে একটা করে চুমু — গলায়, কাঁধে, বুকের উপরে। সিনথিয়াও নাবিলার জামা খুলল — ধীরে, যেন প্রিয় উপহারের মোড়ক খুলছে।

দুটি শরীর — চেনা, তবু আজ নতুন করে দেখা। নাবিলা সিনথিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল — মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে, কোমরে। সিনথিয়া শিউরে উঠল।

নাবিলা: "তোর এই তিলটা... এখানে... আমি চিনি।"

সিনথিয়া: "তুই সব মনে রেখেছিস।"

নাবিলা: "সব। প্রতিটা ইঞ্চি।"

তারা একে অপরের দিকে ফিরল — ঠোঁটে ঠোঁট, বুকের সাথে বুক। হৃৎস্পন্দন মিলে গেল — ধুকধুক, ধুকধুক। নাবিলার হাত সিনথিয়ার কোমরে — সিনথিয়ার হাত নাবিলার পিঠে — চুলে। ধীরে ধীরে দুলতে লাগল — যেন নাচ, যেন ঢেউ।

নাবিলা হাসল — ঠোঁটে ঠোঁট রেখে। তারপর নিচে নামল — গলায়, বুকে। সিনথিয়ার স্তনে মুখ রাখল — চুষল না জোরে, শুধু জিভ বুলিয়ে দিল — আদরে। সিনথিয়ার হাত নাবিলার চুলে — আঁকড়ে ধরল না, শুধু রাখল।

সিনথিয়া: "তুই... তুই আমাকে এভাবে... আমি ভুলব কী করে?"

নাবিলা: "ভুলতে বলেছি? মনে রাখবি। রংপুরের হোস্টেলের রাতে — যখন একা লাগবে — মনে করবি এই হাত।"

নাবিলার আঙুল আরও নিচে নামল। সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ বয়ে গেল — পরিচিত, তবু আজ নতুন। নাবিলা জানে ঠিক কোথায়, কতটা জোরে। আঙুল ঢুকল — ধীরে, গভীরে। সিনথিয়ার পিঠ বেঁকে গেল।

নাবিলা: "শশশ... আমার দিকে তাকা।"

সিনথিয়া চোখ খুলল। নাবিলার চোখে চোখ রেখে — আঙুলের প্রতিটা নড়াচড়া অনুভব করল। এটা শুধু শরীর ছিল না — এটা ছিল বছরগুলোর জমে থাকা সব কথা, যা মুখে বলা যায় না।

তারপর সিনথিয়া উঠল — নাবিলাকে নিচে নিল। এবার তার পালা। সে নাবিলার শরীরে মুখ রাখল — প্রতিটা জায়গায় চুমু, যা সে চেনে। নাবিলার উরুর ভেতরে জিভ — নাবিলার দম আটকে গেল।

নাবিলা: "সিনথিয়া... ওহ..."

সিনথিয়া থামল না। ধীরে, যত্নে — নাবিলার শরীরকে শেষবারের মতো পড়ল, যেন প্রিয় বইয়ের শেষ পাতা — প্রতিটা লাইন মনে রাখতে চায়। জিভের প্রতিটা ছোঁয়ায় নাবিলা কেঁপে উঠছিল। নাবিলার হাত প্রথমে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল — তারপর ছেড়ে দিল — তারপর সিনথিয়ার চুলে — টানল না, শুধু ধরল, যেন ডুবে যাওয়া মানুষ খড়কুটো ধরে।

নাবিলা: "আমি... আমি আসছি... ওহ..."

শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল — তারপর শিথিল। দীর্ঘশ্বাস — গভীর, কাঁপা। নাবিলা চোখ খুলল — চোখে জল, ঠোঁটে হাসি।

নাবিলা: "তুই... তুই আমাকে মেরে ফেলবি।"

সিনথিয়া হেসে নাবিলার পাশে শুল — দুজনে মুখোমুখি। ঘামে ভেজা কপালে কপাল ঠেকাল।

সিনথিয়া থামল না। ধীরে, যত্নে — নাবিলার শরীরকে শেষবারের মতো পড়ল, যেন প্রিয় বইয়ের শেষ পাতা। নাবিলার হাত বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল — তারপর ছেড়ে দিল — শরীর কেঁপে উঠল, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

নাবিলা: "আমি... আমি..."

দুজনে একে অপরের দিকে ফিরল — ঘামে ভেজা, হাঁপাতে হাঁপাতে — আর জড়িয়ে ধরল। কোনো কথা না। শুধু শ্বাসের শব্দ, হৃৎস্পন্দন।

অনেকক্ষণ পর নাবিলা ফিসফিস করল।

নাবিলা: "এটা আমাদের গোপন। চিরকাল।"

সিনথিয়া: "চিরকাল।"

অনেকক্ষণ তারা শুয়ে রইল — জড়াজড়ি করে, কথা না বলে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছিল — সময় ফুরিয়ে আসছিল, দুজনেই জানত। কিন্তু এই মুহূর্তটা কেউ নষ্ট করতে চাইল না।

নাবিলা: "সিনথিয়া?"

সিনথিয়া: "হুম?"

নাবিলা: "রংপুরে গিয়ে... অন্য কেউ... আমার জায়গা নেবে না তো?"

সিনথিয়া উঠে নাবিলার দিকে তাকাল — গম্ভীর।

সিনথিয়া: "শোন। তুই আমার প্রথম। সবকিছুর প্রথম। বন্ধুত্বের, গোপনের, এই শরীরের। প্রথমকে কেউ বদলাতে পারে না। কখনো না।"

নাবিলার চোখে আবার জল। সে সিনথিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

নাবিলা: "যা। এবার যা। নইলে আমি তোকে যেতে দেব না। দরজা বন্ধ করে রাখব।"

দুজনে হেসে উঠল — কাপড় পরল — চুল ঠিক করল। নাবিলা সিনথিয়ার চুলে হাত বুলিয়ে বিনুনি করে দিল — যেন ছোটবেলার মতো।

নাবিলা: "সুন্দর লাগছে। রংপুরের ছেলেরা পাগল হয়ে যাবে।"

সিনথিয়া: "চুপ কর!"

নাবিলা ড্রয়ার থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল — ভেতরে দুটো একরকম ব্রেসলেট, কালো সুতোর, ছোট্ট রুপোর বিডসহ।

নাবিলা: "একটা তোর, একটা আমার। যতদিন পরবি — মনে রাখবি আমাকে।"

সিনথিয়া ব্রেসলেটটা পরল — কব্জিতে। নাবিলা নিজেরটাও পরল। দুজনে কব্জি মিলিয়ে দেখল — একরকম — হাসল।

সিনথিয়া: "খুলব না। শপথ করলাম।"

আরও একবার জড়িয়ে ধরা — দীর্ঘ, শক্ত। তারপর সিনথিয়া ব্যাগ কাঁধে নিল। দরজায় দাঁড়িয়ে নাবিলা হঠাৎ বলল।

নাবিলা: "শোন — রংপুরে গিয়ে যদি কোনো ছেলে তোর দিকে তাকায় —"

সিনথিয়া: "তো?"

নাবিলা: "তো কিছু না। শুধু মনে রাখবি — তোর রাতটা আমার কাছে বন্ধক রইল। ফিরে এসে ছাড়িয়ে নিস।"

সিনথিয়া হেসে নাবিলার গালে চুমু খেল।

সিনথিয়া: "বন্ধক রইল। সুদসহ ফেরত নেব।"

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল যখন সিনথিয়া নাবিলার বাসা থেকে বেরোল।

নাবিলা দরজা পর্যন্ত এল। দুজনে আর কিছু বলল না — বলার কিছু বাকি ছিল না। শুধু দীর্ঘ আলিঙ্গন — তারপর সিনথিয়া রিকশায় উঠল। পেছনে তাকিয়ে দেখল — নাবিলা দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে, চোখে জল, ঠোঁটে হাসি। রিকশা চলতে শুরু করল — গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা। সিনথিয়া বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল — যতক্ষণ নাবিলাকে দেখা যায়। তারপর মোড় ঘুরতেই দৃশ্য হারিয়ে গেল — শুধু রইল কব্জির ব্রেসলেট আর বুকের ভেতর একটা শূন্যতা, যা কান্নার চেয়েও গভীর।

বাসায় ঢুকতেই মায়ের ডাক।

মা: "এই তো এসেছিস! আয়, ব্যাগ গোছানো বাকি। কাল ভোরে বেরোতে হবে না — রাতের বাস তো, তবু সব রেডি রাখি।"

ঘরে সুটকেস খোলা — মা শাড়ি ভাঁজ করছে, সালোয়ার-কামিজ গুছিয়ে রাখছে। সিনথিয়া বসে সাহায্য করতে লাগল। মায়ের হাত কাঁপছিল — সিনথিয়া দেখল, কিছু বলল না।

সিনথিয়া: "মা, তুমি কাঁদছ?"

মা: "কাঁদব কেন? খুশিতে... খুশিতে চোখে জল আসে। আমার মেয়ে ডাক্তার হবে — ভাবতে পারিস?"

বাবা দরজায় এসে দাঁড়ালেন। চুপচাপ মেয়েকে দেখলেন অনেকক্ষণ। তারপর কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেন।

বাবা: "রংপুর... দূর। কিন্তু তুই পারবি। আমি জানি তুই পারবি।"

সিনথিয়া: "বাবা..."

বাবা: "ফোন করবি রোজ। আর — নিজের খেয়াল রাখবি।"

মা আলমারি থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল — খুলে দেখাল — একজোড়া সোনার চুড়ি, পুরনো ডিজাইনের।

মা: "এটা আমার মায়ের। তোর নানির। আজ থেকে তোর।"

সিনথিয়া: "মা, এটা তো অনেক দামি..."

মা: "পর। ডাক্তার মেয়ের হাতে নানির চুড়ি — মানাবে। আর মনে রাখবি — এই চুড়ি পরা হাত দিয়ে মানুষের সেবা করবি।"

সিনথিয়া চুড়ি পরল — ঠান্ডা সোনা কব্জিতে। মায়ের চোখে জল — এবার আর লুকোলেন না।

মা: "হোস্টেলে মেয়েদের সাথে মিলেমিশে থাকবি। বড়দের সম্মান করবি। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করবি — শুকিয়ে গেলে আমি গিয়ে..."

সিনথিয়া: "মা!"

মা হেসে ফেললেন — চোখের জল মুছতে মুছতে। সিনথিয়া মাকে জড়িয়ে ধরল — অনেকক্ষণ। মায়ের গায়ের চেনা গন্ধ — রান্নাঘর, সাবান, মমতা।

এই মানুষটা কম কথা বলে — কিন্তু প্রতিটা শব্দ ওজনে ভারী। সিনথিয়ার গলা ধরে এল। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে।

সিনথিয়া: "তোমাদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।"

বাবা: "যেতে হবে বলেই যাচ্ছিস। এটাই জীবন, মা।"

বাবা পকেট থেকে একটা খাম বের করে সিনথিয়ার হাতে দিলেন — মোটা খাম।

বাবা: "হাতখরচ। বেশি না। কিন্তু লাগলে বলবি — লজ্জা করবি না।"

সিনথিয়া: "বাবা, তোমার তো..."

বাবা: "আমি তোর বাবা। এটা আমার কাজ। মেয়েকে ডাক্তার বানানো — এর চেয়ে বড় কাজ আমার জীবনে নেই।"

সিনথিয়া খামটা বুকে চেপে ধরল। এই মানুষটা কোনোদিন বেশি কথা বলেনি — আজও বলল না। কিন্তু প্রতিটা শব্দ সিনথিয়ার বুকে গেঁথে গেল।

রাতের খাবার — মা স্পেশাল রান্না করেছে। তিনজনে একসাথে খেল — অনেকদিন পর। খাওয়ার ফাঁকে মা বারবার বলছিল — ওষুধের বাক্স, শুকনো খাবার, গরম কাপড় — সব ব্যাগে ঢুকিয়েছে কিনা। সিনথিয়া হাসছিল — চোখ ভিজে আসছিল।

খাওয়ার পর নিজের ঘরে গেল। ঘরটা এখন অর্ধেক খালি — দেয়ালে পোস্টার, তাকে বই — সব গোছানো। টেবিলের ড্রয়ারে একটা পুরনো ছবি — ক্লাস টেনে নাবিলার সাথে তোলা, দুজনে কলেজ ড্রেসে, হাসিমুখে, পেছনে কলেজ গেট। সিনথিয়া ছবিটা হাতে নিল অনেকক্ষণ — তারপর ডায়েরির ভেতর রেখে দিল। এই ছবি যাবে সাথে — রংপুরে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল — ঢাকার রাত, আলো, শব্দ, রিকশার টুংটাং। এই শহর তাকে অনেক কিছু দিয়েছে — অনেক কিছু নিয়েওছে। কাল এই জানালা দিয়ে সে আর তাকাবে না। বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল — আবার ভরা ভরাও।

ফোন বাজল — অর্ণব।

অর্ণব: "প্যাকিং শেষ?"

সিনথিয়া: "প্রায়। তুমি আসছ তো কাউন্টারে?"

অর্ণব: "অবশ্যই। তোকে বাসে তুলে দেব।"

সিনথিয়া: "অর্ণব..."

অর্ণব: "বল।"

সিনথিয়া: "দূরত্ব... আমাদের বদলে দেবে না তো?"

এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর অর্ণবের গলা — দৃঢ়, উষ্ণ।

অর্ণব: "শোন সিনথিয়া। তুই রংপুর যাচ্ছিস ডাক্তার হতে। আমি এখানে থাকছি — তোর জন্য। দূরত্ব শরীরের, মনের না। এটা শেষ না — মনে রাখিস।"

সিনথিয়ার চোখে জল এল — এবার আনন্দের।

সিনথিয়া: "মনে রাখব।"

ফোন রেখে সিনথিয়া আয়নার সামনে দাঁড়াল — নিজেকে দেখল। আঠারো বছরের মেয়ে — চোখে জল, ঠোঁটে হাসি। কব্জিতে নানির চুড়ি — ঠান্ডা, ভারী, পারিবারিক। পাশে নাবিলার দেওয়া কালো সুতোর ব্রেসলেট — গোপনের। দুটো দুই জগতের — দুটোই তার। এই মুখে কত গল্প লুকিয়ে — কেউ জানে না, কেউ জানবে না। শুধু ডায়েরি জানে।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ — শহরের আলো গুনতে গুনতে।

রাত সাড়ে দশটা। বাস কাউন্টারে ভিড়। সিনথিয়া বাবা-মায়ের সাথে পৌঁছাল — সুটকেস, ব্যাগ। আর সেখানে — নাবিলা আর অর্ণব, দুজনেই এসেছে।

বাবা কাউন্টারের পাশের দোকান থেকে পানির বোতল আর পাউরুটি কিনে আনলেন — লম্বা জার্নির জন্য। মা খাবারের ব্যাগটা বারবার গুছিয়ে দেখছিলেন — কিছু বাদ পড়ল কিনা।

মা: "ব্যাগটা কোলের কাছে রাখবি। ঘুম পেলে ব্যাগ জড়িয়ে ঘুমাবি।"

সিনথিয়া: "মা, আমি বাচ্চা না!"

মা: "আমার কাছে তুই সবসময় বাচ্চা।"

নাবিলা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।

নাবিলা: "এই যে! শেষ মুহূর্তে কাঁদাবি না কিন্তু!"

সিনথিয়া: "তুই কাঁদছিস!"

নাবিলা: "আমি কাঁদছি না! চোখে... ধুলো পড়েছে!"

দুজনে হেসে ফেলল — চোখের জল মুছতে মুছতে। কাউন্টারের পাশে চায়ের দোকান থেকে অর্ণব তিন কাপ চা নিয়ে এল।

অর্ণব: "শেষ চা — ঢাকার। রংপুরে গিয়ে মিস করবি।"

সিনথিয়া: "রংপুরেও চা আছে!"

নাবিলা: "কিন্তু এই চায়ের দোকানদার নেই!"

তিনজনে হাসল — চায়ের কাপে চুমুক। নাবিলা ফোন বের করে ছবি তুলল — তিনজনের সেলফি, চায়ের কাপ হাতে, পেছনে কাউন্টারের আলো।

নাবিলা: "এটা ফ্রেম করে রাখব। 'শেষ চা'।"

অর্ণব: "শেষ না। বিরতির চা। ফিরে এলে আবার খাব — এই দোকানেই।"

সিনথিয়া অর্ণবের দিকে তাকাল — সে হাসছে, কিন্তু চোখে চাপা কষ্ট লুকোতে পারছে না। এই ছেলেটা তার জন্য কতটা সহ্য করেছে — না জেনেও, সব জেনেও যেন। সিনথিয়া তার হাতটা চেপে ধরল।

মাইকে ঘোষণা — রংপুরের বাস ছাড়বে দশ মিনিটে। যাত্রীরা লাইন দিতে শুরু করল।

অর্ণব কাছে এল। বাবা-মা একটু সরে দাঁড়ালেন — বুঝতে পেরে। অর্ণব সিনথিয়ার হাত ধরল।

অর্ণব: "পৌঁছে ফোন দিস।"

সিনথিয়া: "দেব।"

অর্ণব পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল — খুলে দেখাল — একটা লকেট, চেইনসহ।

অর্ণব: "এটা পর। যেন... আমি সাথে আছি।"

সিনথিয়া: "তুমি... কবে কিনলে?"

অর্ণব: "আজ দুপুরে। তুই ঘুমাচ্ছিলি তখন।"

সিনথিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল — অর্ণব লকেটটা তার গলায় পরিয়ে দিল। ঠান্ডা ধাতু গলায় — উষ্ণ হাত ঘাড়ে।

সিনথিয়া: "খুলব না। কখনো না।"

তিনজনে — অর্ণব, নাবিলা, সিনথিয়া — একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। গ্রুপ হাগ — কাউন্টারের ভিড়ের মাঝে, কারো পরোয়া না করে।

নাবিলা সিনথিয়ার কানে ফিসফিস করল।

নাবিলা: "লিখবি তো?"

সিনথিয়া: "রোজ। ডায়েরিতে সব লিখব।"

নাবিলা: "আমাদেরটাও?"

সিনথিয়া: "বিশেষ করে আমাদেরটা।"

বাসের হর্ন। যাত্রীদের ডাক। সময় হয়ে গেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট দেখাল সিনথিয়া — হাত কাঁপছিল একটু। বাসে উঠে জানালার পাশের সিট খুঁজে পেল — ব্যাগটা উপরে তুলে রাখল। জানালা দিয়ে নিচে তাকাল — চারটে মুখ — মা, বাবা, নাবিলা, অর্ণব — চার জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে। সে হাত নাড়ল — জোরে, বারবার, যতক্ষণ দেখা যায়।

মা সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল — এবার আর চোখের জল লুকোলেন না। বাবা মাথায় হাত রাখলেন — শেষবারের মতো।

মা: "খেয়াল রাখিস, মা।"

সিনথিয়া: "রাখব। তোমরাও।"

বাবা শেষবারের মতো মাথায় হাত রাখলেন — কিছু বললেন না। বলার দরকার ছিল না — চোখেই সব বলা হয়ে গেছে।

নাবিলা দৌড়ে এসে আবার জড়িয়ে ধরল — এবার আরও শক্ত, যেন ছাড়তে চাইছে না।

নাবিলা: "মনে রাখবি — তুই আমার রাত!"

সিনথিয়া: "আর তুই আমার! চিরকাল!"

অর্ণব কাছে এল — সবার সামনেই সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল — দীর্ঘ, গভীর।

অর্ণব: "যা। ডাক্তার হয়ে ফিরবি। আমি অপেক্ষা করব — যতদিন লাগে।"

সিনথিয়া: "অপেক্ষা কোরো। আমি ফিরব। এটা শেষ না।"

সিনথিয়া বাসে উঠল। জানালার পাশের সিট। বাস ছাড়ল — ধীরে, তারপর গতি বাড়ল। শহরের আলো পেছনে সরে যেতে লাগল — ঝাপসা, স্বপ্নের মতো।

ব্যাগে ফোনটা বাজল — অচেনা নম্বর। সিনথিয়া এক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল — তারপর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। ফোনটা ফিরিয়ে রাখল ব্যাগে। কিছু শেকল এখনো আছে। কিছু গল্প এখনো বাকি। সিজন ২-এর জন্য।

তারপর সে ডায়েরিটা বের করল — সেই পুরনো ডায়েরি, যেখানে সব শুরু হয়েছিল। কলম খুলল। হাত কাঁপছিল একটু। তারপর লিখল —

«আজ আমি ঢাকা ছাড়ছি। রংপুর মেডিকেল — নতুন শহর, নতুন জীবন। পেছনে রেখে যাচ্ছি মা-বাবা, নাবিলা, অর্ণব — আর একটা গোটা জীবন, যা এই ডায়েরির পাতায় পাতায়।

গলায় অর্ণবের লকেট। কব্জিতে নানির চুড়ি। মনে নাবিলার হাতের উষ্ণতা। ব্যাগে বাবার দেওয়া খাম, মায়ের রান্না করা খাবার।

কাঁদছি। হাসছিও। কারণ আমি জানি — এটা শেষ না। শুধু বিরতি। দূরত্ব শরীরের, মনের না। যাদের ভালোবাসি, তারা সাথে আছে — গলায়, কব্জিতে, মনে।

সিজন ১ এখানেই থামল। কিন্তু গল্প থামেনি। রংপুর, আমি আসছি — নতুন পাতা নিয়ে, নতুন গল্প নিয়ে।

— সিনথিয়া»

কলম বন্ধ করল। ডায়েরি বুকে চেপে জানালার বাইরে তাকাল — অন্ধকার রাস্তা, দূরে আলোর ঝিকমিক। গলায় অর্ণবের লকেট। মনে নাবিলার হাতের উষ্ণতা। ব্যাগে মায়ের দেওয়া খাবার, বাবার আশীর্বাদ।

বাস ছুটে চলল রাতের বুক চিরে। জানালায় মুখ রেখে সিনথিয়া দেখল — শহরের আলো একে একে পেছনে সরে যাচ্ছে। একটা করে আলো মিলিয়ে যাওয়া মানে একটা করে স্মৃতি বুকে জমা হওয়া। সে চোখ বন্ধ করল — নাবিলার হাসি, অর্ণবের চুমু, মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, বাবার হাতের ভার — সব একসাথে।

নতুন ভোরের দিকে। নতুন শহর। নতুন গল্প।

(সমাপ্ত)
Like Reply


Messages In This Thread
RE: সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি - by midnightkalamkar - Yesterday, 06:28 PM



Users browsing this thread: 3 Guest(s)