Yesterday, 06:22 PM
«ডেট»
সকালটা শুরু হয়েছিল একটা শব্দে — পরিচিত, প্রায় ভুলে যাওয়া একটা শব্দ।
সিনথিয়ার ফোনের রিংটোন।
তিন মাস। পুরো তিন মাস পর মা আজ সকালে আলমারি খুলে ফোনটা তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আলমারির চাবিটা মায়ের আঁচলে বাঁধা থাকত এই তিন মাস — সিনথিয়া কতবার সেই চাবিটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, গুনতে পারবে না।
মা: "এডমিশন পরীক্ষা শেষ। এখন আর বন্দি না।"
সাথে একটা হালকা হাসি — যেন নিজেও জানেন এই তিন মাস মেয়েটার ওপর কতটা ভারী ছিল।
সিনথিয়া: "সত্যি?"
মা: "সত্যি। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবি। রেজাল্টের আগে ঢিলেমি না।"
সিনথিয়া মাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে, অনেকক্ষণ। মায়ের গায়ে রান্নার গন্ধ, নিরাপত্তার গন্ধ।
মা: "আরে পাগলি! ফোন পেয়ে এত খুশি?"
সিনথিয়া: "খুব খুশি।"
ফোনটা হাতে নিয়ে সিনথিয়া অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে ধুলো জমেছিল — মুছে নিল কামিজের আঁচলে। তারপর পাওয়ার বাটন চাপল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ব্যাটারি শূন্যের কাছাকাছি — তাড়াতাড়ি চার্জে দিল।
চার্জ হতে হতে সে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে রোদ — তিন মাস ধরে যে রোদটা শুধু জানালা দিয়ে দেখেছে, বইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে। আজ সেই রোদে হাঁটবে। বাইরে যাবে। স্বাধীন।
ফোনটা একটু চার্জ হতেই নোটিফিকেশনের বন্যা শুরু হলো।
মিসড কল — তেইশটা। মেসেজ — গুনে শেষ করা যাবে না। তিন মাসের নীরবতা একসাথে চিৎকার করে উঠল।
সে প্রথমে নাবিলাকে ফোন করল। নাবিলা — তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, যার সাথে তিন মাস কোনো কথা হয়নি। বাটন ফোনটা ছিল শুধু আসিফের জন্য — মায়ের ভয়ে আর কাউকে নম্বর দেয়নি।
দুটো রিং-এর পরই ওপাশ থেকে চিৎকার —
নাবিলা: "তুই বেঁচে আছিস?!"
সিনথিয়া হেসে ফেলল — তিন মাস পর প্রথম সত্যিকারের হাসি, পেট থেকে ওঠা।
সিনথিয়া: "বেঁচে আছি। ফোন পেলাম আজ। মা আলমারি খুলে দিল।"
নাবিলা: "তিন মাস! তিন মাস তুই উধাও! আমি তোর বাসার সামনে দিয়ে গেছি কতবার — তোর মা বলে 'পড়ছে, ডিস্টার্ব করিস না'। আমি ভাবলাম তুই মরে গেছিস নাকি! নাকি তোর মা তোকে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে!"
সিনথিয়া: "প্রায় মরেই গেছিলাম। বন্দি জীবন।"
নাবিলা: "আসিফ স্যারের টিউশন কেমন ছিল?"
সিনথিয়া একটু থামল। আসিফ। শুক্রবারগুলো। "শুধু শরীর" — যেটা শুধু শরীর থাকেনি পুরোপুরি, কিন্তু প্রতিশ্রুতিও হয়নি। শেষ টিউশনের পর সে বলেছিল — "পরীক্ষা শেষ। আর দরকার নাই।" — আসিফ শুধু মাথা নেড়েছিল। কোনো নাটক হয়নি। ঠিক যেমন কথা ছিল।
সিনথিয়া: "ভালো ছিল। ফিজিক্স শিখেছি।"
নাবিলা: "শুধু ফিজিক্স?"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
দুজনে হাসল। তারপর নাবিলার গলা নরম হলো —
নাবিলা: "সত্যি বল তো — কেমন ছিলি?"
সিনথিয়া জানালার বাইরে তাকাল। কেমন ছিল? খাঁচায়। কিন্তু খাঁচার ভেতরেও একটা গোপন দরজা ছিল — যেটা দিয়ে মাঝে মাঝে হাওয়া আসত।
সিনথিয়া: "কঠিন ছিল। কিন্তু এখন মুক্ত।"
নাবিলা: "তাহলে আজ কী প্ল্যান?"
সিনথিয়া: "আজ অর্ণবের দিন।"
নাবিলা: "ওহো! ফ্রি বার্ডের প্রথম ডেট! যা, যা — ডিটেইলস পরে চাই। সব।"
সিনথিয়া: "পাগলি। আগে দেখা করি। তিন মাস পর!"
নাবিলা: "যা। আর শোন —"
সিনথিয়া: "বল।"
নাবিলা: "তোকে মিস করেছি। সত্যি।"
সিনথিয়ার গলা একটু ধরে এল।
সিনথিয়া: "আমিও। কাল দেখা করব। প্রমিস।"
ফোন রেখে সিনথিয়া গ্যালারি খুলল। তিন মাসের পুরনো ছবি — নাবিলার সাথে সেলফি, ছাদ পার্টির রাতের ছবি, অর্ণবের জন্মদিনের কেকের ছবি। আর একটা ছবিতে থামল — গত বছর পার্কে তোলা, অর্ণবের পাশে সে, দুজনে হাসছে। সেই হাসিটা আজ আবার ফিরে পেতে চায়।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল শেষ টিউশনের দিনটা। আসিফ সেদিন একটু আগেই এসেছিল। বই খোলেনি। শুধু বলেছিল —
আসিফের গলা তার মনে বাজল — "পরীক্ষা ভালো দিয়েছিস। আর দরকার নাই।"
সে বলেছিল — "আর দরকার নাই।" — আসিফ শুধু মাথা নেড়েছিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু থেমেছিল, তারপর বলেছিল — "ভালো থাকিস।" কোনো নাটক হয়নি। কোনো কান্না না। ঠিক যেমন কথা ছিল — শুধু শরীর, কোনো প্রতিশ্রুতি না।
সিনথিয়া বাটন ফোনটা বের করল — যেটা এখন আর দরকার নাই। সিমটা খুলে ভেঙে ফেলল দুই টুকরো। ফোনটা ড্রয়ারের গভীরে রেখে দিল। একটা অধ্যায় শেষ।
ফোন রেখে সিনথিয়া মেসেজগুলো স্ক্রল করল। অনেক মেসেজ — কিছু পড়ল, কিছু শুধু নাম দেখে রেখে দিল। যেগুলোর উত্তর আজ না, সেগুলো আপাতত থাক। আজকের দিনটা শুধু একজনের।
তারপর স্ক্রিনে অর্ণবের নামটা ভেসে উঠল — আর তার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। যেন সে জানত, যেন সে অপেক্ষায় ছিল।
অর্ণব: "ফ্রি?"
একটা শব্দ। কিন্তু সেই একটা শব্দে তিন মাসের অপেক্ষা, তিন মাসের দূরত্ব, তিন মাসের না-বলা কথা।
সিনথিয়া: "ফ্রি। পুরোপুরি ফ্রি।"
অর্ণব: "তাহলে আজ বিকেলটা আমার। কোনো আপত্তি?"
সিনথিয়া: "কোনো আপত্তি নাই।"
অর্ণব: "চারটায়। পুরনো জায়গায়।"
একটু থামল। তারপর নরম গলায় —
অর্ণব: "মিস করেছি তোকে।"
সিনথিয়া: "আমিও। অনেক।"
ফোন রেখে সিনথিয়া বিছানায় বসে পড়ল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে — যেন প্রথম ডেট। আসলে তো প্রথমই — তিন মাস পর আবার শুরু।
সে আলমারি খুলল। নীল কামিজটা বের করল — অর্ণবের প্রিয়, সে জানে। গত বছর অর্ণব বলেছিল — "নীল তোকে মানায়।" — সেই থেকে এই কামিজটা তার প্রিয়। চুলটা খুলে দিল — তিন মাসে চুলটা লম্বা হয়েছে, কোমর ছুঁইছুঁই। কাজলটা একটু গাঢ় করে দিল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি। কানে ছোট ঝুমকো — অর্ণবের দেওয়া, জন্মদিনে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল — একটু শুকিয়েছে, চোখের নিচে হালকা কালি। তিন মাসের বন্দিত্বের ছাপ এখনো মুখে। কিন্তু চোখে আজ আলো — মুক্তির আলো।
সে আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল মনে মনে — "তুই কে?"
উত্তর এল ভেতর থেকে — "আজ আমি শুধু সিনথিয়া। অর্ণবের সিনথিয়া।"
সে হাসল। আয়নার মেয়েটাও হাসল। তিন মাস পর প্রথমবার — নিজেকে চিনতে পারছে।
দুপুরে মায়ের সাথে ভাত খেল। মা ডাল বেড়ে দিতে দিতে বললেন —
মা: "কোথায় যাচ্ছিস বিকেলে?"
সিনথিয়া: "অর্ণবের সাথে দেখা করতে। রমনা পার্কে।"
মা: "সন্ধ্যার আগে ফিরবি।"
সিনথিয়া: "ফিরব। মা —"
মা: "বল।"
সিনথিয়া: "থ্যাংকস। এই তিন মাস... আমি জানি তুমি আমার ভালোর জন্যই করেছ।"
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
মা: "ভালো করে ঘুরে আয়। অনেক কষ্ট করেছিস।"
বাসা থেকে বেরিয়ে সিনথিয়া রিকশা নিল। রিকশায় উঠে সে বারবার ফোনটা দেখছে — যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এটা সত্যি তার হাতে। রাস্তায় মানুষ, দোকান, ভিড় — তিন মাস পর এই ভিড়টাও সুন্দর লাগছে।
বাতাস তার খোলা চুল উড়িয়ে নিচ্ছে। সে চুল সামলাতে সামলাতে হাসছে — নিজের মনেই। পাশের রিকশায় একটা বাচ্চা তার দিকে তাকিয়ে হাসল। সিনথিয়াও হাসল।
মনে মনে ভাবল — আজকের দিনটা সে অনেকদিন মনে রাখবে। খাঁচা থেকে বেরোনোর প্রথম দিন। আর সেই দিনটা অর্ণবের সাথে — এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
পার্কের গেট দেখা যাচ্ছে। তার বুক ধড়ফড় করছে — যেন প্রথমবার দেখা করতে যাচ্ছে। আসলে তো প্রথমবারই — নতুন করে শুরু।
বিকেল চারটা। রমনা পার্কের পুরনো গেট।
অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল — হালকা নীল শার্ট, চুলটা একটু বড় হয়েছে, হাতে একটা ছোট প্যাকেট। সিনথিয়াকে দেখে তার মুখে যে হাসিটা ফুটল, সেটা দেখে সিনথিয়ার বুকের ভেতর কিছু একটা গলে গেল — বরফ গলার মতো।
তিন মাস। তিন মাসে সে অনেক কিছু করেছে — অনেক হাত, অনেক ঠোঁট, অনেক গোপন রাত। ফাহিমের বাসা, আসিফের শুক্রবার, রনির দোকানের পেছনের ঘর — সব মনে পড়ে গেল একসাথে। কিন্তু এই একটা হাসির সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝল — এই মানুষটা আলাদা। এই মানুষটা তার "স্বাভাবিক" জীবন। তার আসল জীবন।
অর্ণব এগিয়ে এসে তার হাত ধরল। কোনো কথা না বলে। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরল — যেন ছেড়ে দিলে আবার হারিয়ে যাবে। তার হাতটা একটু কাঁপছিল।
অর্ণব: "চল।"
তারা পার্কের ভেতরে ঢুকল। বিকেলের আলো গাছের পাতা ভেদ করে ছায়া ফেলেছে পথে। পাখির ডাক, বাচ্চাদের হাসি, বাদামওয়ালার ডাক — সব মিলে একটা চেনা পৃথিবী। তিন মাস পর এই পৃথিবীতে ফেরা।
হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিল।
অর্ণব: "তোর জন্য।"
সিনথিয়া: "কী এটা?"
অর্ণব: "খুলে দেখ।"
ভেতরে একটা সিলভার ব্রেসলেট — সরু, সাদাসিধে, কিন্তু সুন্দর। ছোট ছোট নকশা কাটা।
সিনথিয়া: "এটা কেন?"
অর্ণব: "এডমিশন পরীক্ষা শেষের উপহার। তুই অনেক খেটেছিস। আমি জানি — তিন মাস তুই কীভাবে কাটিয়েছিস, আমি কল্পনা করতে পারি।"
সিনথিয়া ব্রেসলেটটা হাতে পরল। অর্ণব নিজে পরিয়ে দিল — তার আঙুলগুলো সিনথিয়ার কবজিতে একটু কাঁপছিল। হুকটা লাগাতে গিয়ে দুবার ফসকে গেল।
সিনথিয়া: "সুন্দর।"
অর্ণব: "তোর হাতে সব সুন্দর লাগে।"
সিনথিয়া হাসল — গাল লাল হয়ে গেল। তিন মাসে কত পুরুষ তাকে কত কথা বলেছে — কেউ নোংরা, কেউ বুনো, কেউ পাগল করা। কিন্তু এই একটা সাদাসিধে লাইন — "তোর হাতে সব সুন্দর লাগে" — তার গাল লাল করে দিল, বুক ধড়ফড় করিয়ে দিল। এটাই অর্ণব। এটাই তাদের ভালোবাসা। সাদা, সহজ, সত্যি।
অর্ণব পকেট থেকে ফোন বের করল।
অর্ণব: "একটা ছবি তুলি?"
সিনথিয়া: "তিন মাস পর প্রথম ছবি?"
অর্ণব: "হ্যাঁ। প্রমাণ থাকুক — তুই ফিরেছিস।"
তারা পাশাপাশি দাঁড়াল। অর্ণবের হাত তার কোমরে। সিনথিয়া মাথা হেলিয়ে দিল তার কাঁধে। ক্লিক।
ছবিটা দেখল দুজনে।
সিনথিয়া: "আমি কালো দেখাচ্ছি।"
অর্ণব: "তুই সুন্দর দেখাচ্ছিস। সবসময়ের মতো।"
সিনথিয়া: "আরেকটা তোল। এবার আমি তুলব।"
সে ফোনটা নিয়ে একটু দূরে গেল। অর্ণব পোজ দিল — হাত জোড়া, মাথা নিচু, নাটকীয় ভঙ্গি। সিনথিয়া হাসতে হাসতে ছবি তুলল।
সিনথিয়া: "এটা তোর মাকে পাঠিয়ে দেব — দেখো তোমার ছেলে কত বোকা।"
অর্ণব: "দিস না! মা বিশ্বাস করে ফেলবে!"
দুজনে হাসল — প্রাণখোলা হাসি। পাশ দিয়ে যাওয়া এক বয়স্ক দম্পতি তাদের দিকে তাকিয়ে হাসল। সিনথিয়ার মনে হলো — এই তো জীবন। এই সহজ আনন্দটাই তো সে তিন মাস ধরে মিস করেছে।
তারা হাঁটতে হাঁটতে পার্কের ভেতরের ফুচকার দোকানে গেল। কাঠের বেঞ্চিতে বসল পাশাপাশি।
সিনথিয়া: "ঝাল বেশি দেবেন মামা!"
অর্ণব: "তুই তো ঝাল খেতে পারিস না।"
সিনথিয়া: "পারি! তুই দেখিসনি। তিন মাসে অনেক কিছু বদলেছে।"
অর্ণব তার দিকে তাকাল — একটু গভীরভাবে।
অর্ণব: "তুই বদলেছিস?"
সিনথিয়া: "একটু। তুই?"
অর্ণব: "আমি একই আছি। তোর অপেক্ষায়।"
ফুচকা এল। সিনথিয়া একটা মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল — ঝালে চোখে পানি চলে এল।
অর্ণব: "বলেছিলাম!"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
অর্ণব হেসে তার চোখের পানি মুছে দিল আঙুল দিয়ে — আলতো, যত্নে। তারপর নিজের প্লেট থেকে একটা কম ঝালের ফুচকা তার মুখের সামনে ধরল।
অর্ণব: "এটা খা।"
সিনথিয়া তার হাত থেকে ফুচকাটা খেল। তাদের চোখাচোখি হলো — আর সেই মুহূর্তে পার্কের কোলাহল, ফুচকাওয়ালার ডাক, পাশের বেঞ্চির আড্ডা — সব মিলিয়ে গেল। শুধু দুজন। শুধু এই মুহূর্ত।
খাওয়া শেষে তারা আবার হাঁটল। এবার লেকের দিকে। পথে একটা আইসক্রিমের দোকান দেখে অর্ণব থামল।
অর্ণব: "একটা নিবি?"
সিনথিয়া: "দুটো। একটা তোর, একটা আমার।"
অর্ণব: "আগে তো একটাতেই দুজনে খেতাম।"
সিনথিয়া: "আগে ছোট ছিলাম। এখন বড় হয়েছি।"
অর্ণব: "কত বড়?"
সিনথিয়া: "অনেক বড়।"
দুজনে হাসল। দুটো আইসক্রিম নিয়ে তারা লেকের ধারের ঘাসে বসল। পানিতে হাঁস ভাসছে। দূরে কয়েকটা ছেলে ফুটবল খেলছে।
অর্ণব: "ভার্সিটিতে আমার প্রথম সেমিস্টার শেষ।"
সিনথিয়া: "রেজাল্ট কেমন?"
অর্ণব: "ভালো। তুই থাকলে আরো ভালো হতো। তুই তো আমার লাক।"
সিনথিয়া: "লাক না, আমি তোর টেনশন।"
অর্ণব: "সবচেয়ে সুন্দর টেনশন।"
সিনথিয়া আইসক্রিম চাটতে চাটতে জিজ্ঞেস করল —
সিনথিয়া: "আমি চান্স পাব তো?"
অর্ণব: "পাবি। তুই যেভাবে খেটেছিস — না পাওয়ার কোনো কারণ নাই।"
সিনথিয়া: "যদি না পাই?"
অর্ণব তার হাত ধরল।
অর্ণব: "তাহলে আবার দিবি। আমি আছি। তোর পাশে। সবসময়।"
সিনথিয়ার বুকের ভেতর আবার সেই চিনচিনে ব্যথাটা উঠল। অপরাধবোধ। এই মানুষটা — এত সাদা, এত সত্যি — আর সে? তিন মাসে সে যা করেছে...
ফাহিমের কথা মনে পড়ল — "পরশু" যেটা কখনো আসেনি। সে একটা মেসেজও পাঠাতে পারেনি। ফাহিম হয়তো ভেবেছে সে ভুলে গেছে। হয়তো ভালোই হয়েছে।
আসিফের কথা মনে পড়ল — শেষ শুক্রবার। "আর দরকার নাই" — সে বলেছিল। আসিফ শুধু তাকিয়েছিল — সেই শান্ত, গভীর দৃষ্টিতে। "ভালো থাকিস" — বলেছিল। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো ভাঙনও না। ঠিক যেমন কথা ছিল।
রনি, সজীব, নাবিলা — সবাই। একটা পুরো গোপন জীবন — যেটা অর্ণব জানে না, কোনোদিন জানবে না।
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। না। আজ না। আজ সে শুধু সিনথিয়া — অর্ণবের সিনথিয়া। পরিষ্কার, সাদা, ভালোবাসার। ওই জীবনটা অন্য কারো — "মিম" বা অন্য কেউ। আজকের সিনথিয়া শুধুই অর্ণবের।
সিনথিয়া: "আমিও মিস করেছি। প্রতিদিন।"
এটা মিথ্যে ছিল না। ভিড়ের মধ্যে, বুনো রাতগুলোর মধ্যেও — সে অর্ণবকে মিস করেছে। এই সহজতাটা মিস করেছে। এই নিরাপত্তাটা। এই "স্বাভাবিক" হওয়াটা।
অর্ণব তার কাঁধে হাত রাখল। সিনথিয়া মাথাটা তার কাঁধে হেলিয়ে দিল। এত সহজ। এত স্বাভাবিক। কোনো লুকোচুরি নাই, কোনো ভয় নাই, কোনো তাড়া নাই। শুধু দুজন মানুষ — যারা একে অপরকে ভালোবাসে।
তারা বসে রইল — অনেকক্ষণ। কথা কম, নীরবতা বেশি। কিন্তু সেই নীরবতায় সব কথা ছিল।
একটা হাঁস পানিতে ভেসে এল কাছে। সিনথিয়া আইসক্রিমের শেষ টুকরোটা ছিঁড়ে পানিতে ফেলল। হাঁসটা ঠোকর দিয়ে খেল।
সিনথিয়া: "দেখ, ও খাচ্ছে!"
অর্ণব: "তুই হাঁসকেও খাওয়াস। তোর মনটা এত নরম কেন?"
সিনথিয়া: "নরম না। শুধু... ভালো লাগে।"
অর্ণব: "আচ্ছা, সিরিয়াস কথা। তুই কোন ভার্সিটিতে চান্স চাস?"
সিনথিয়া: "ঢাবি। ইংরেজি। তুই তো জানিস।"
অর্ণব: "জানি। তুই পাবি। আমি বাজি ধরতে পারি।"
সিনথিয়া: "কী বাজি?"
অর্ণব: "তুই চান্স পেলে আমি তোকে কক্সবাজার নিয়ে যাব।"
সিনথিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
সিনথিয়া: "সত্যি?!"
অর্ণব: "সত্যি। সমুদ্র দেখবি আমার সাথে। সূর্যোদয়।"
সিনথিয়া: "আর যদি না পাই?"
অর্ণব: "তাহলেও নিয়ে যাব। শুধু একটু দেরিতে।"
সিনথিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
সিনথিয়া: "তুই এত ভালো কেন?"
অর্ণব: "তোর জন্য।"
আরো কয়েকটা হাঁস এল। তারা বসে বসে দেখল — পানিতে ঢেউ, আকাশে মেঘের ছায়া। সিনথিয়ার মনে হলো সময়টা থেমে গেছে। এই মুহূর্তটা যদি সারাজীবন থাকত।
একসময় সূর্য হেলতে শুরু করল। আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়ল। সিনথিয়া উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়িয়ে দিল।
সিনথিয়া: "চল, ওইদিকে যাই। সূর্য ডোবা দেখব।"
লেকের পশ্চিম পাশে একটা নির্জন কোণা — বড় বড় গাছ, ঘন ছায়া, কেউ আসে না সেদিকে। তারা গিয়ে বসল একটা পাথরের ওপর।
সূর্য ডুবছে — আকাশে কমলা, গোলাপি, বেগুনি রঙের খেলা। পানিতে সূর্যের প্রতিবিম্ব কাঁপছে, ভেঙে ভেঙে। বাতাসে শীতলতা নামছে।
অর্ণব তার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিল। তার আঙুলগুলো সিনথিয়ার আঙুলে জড়াল।
অর্ণব: "তুই জানিস, আমি কখনো কাউকে এভাবে চাইনি।"
সিনথিয়া: "কীভাবে?"
অর্ণব: "এভাবে — শান্তিতে। তোর পাশে বসে থাকলেই মনে হয় সব ঠিক আছে। পৃথিবীতে আর কিছু লাগবে না। কোনো টেনশন নাই, কোনো ভয় নাই। শুধু তুই আর আমি।"
সিনথিয়া তার দিকে তাকাল। অর্ণবের চোখে কোনো কামনা ছিল না — ছিল গভীর, শান্ত ভালোবাসা। এমন ভালোবাসা যেটা চায় না, শুধু দেয়।
সে নিজে এগিয়ে গিয়ে অর্ণবের ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
প্রথমে আলতো — শুধু ছোঁয়া। তারপর গভীর। অর্ণবের হাত তার গালে উঠে এল, আঙুলগুলো তার চুলে ডুবল। চুম্বনটা ধীর, মিষ্টি, সময় নিয়ে — যেন তিন মাসের দূরত্ব একটা একটা করে মুছে দিচ্ছে। যেন প্রতিটা সেকেন্ড বলছে — "আমি এখানে আছি, আমি যাইনি।"
সিনথিয়ার শরীরে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। এটা সেই বুনো আগুন না — যেটা অন্যরা জ্বালাত। এটা অন্য কিছু। নরম, গভীর, হৃদয় থেকে ওঠা। তার চোখে পানি এসে গেল — সে জানে না কেন। হয়তো মুক্তির আনন্দে। হয়তো ভালোবাসার ভারে।
তারা আলাদা হলো। দুজনেরই শ্বাস ভারী। সিনথিয়া অর্ণবের কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখল — চোখ বন্ধ। তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে লাগছে — গরম, মিষ্টি।
কতক্ষণ এভাবে ছিল, কেউ জানে না। সময় থেমে গেছিল। পৃথিবীতে শুধু দুটো হৃদস্পন্দন — এক তালে, এক ছন্দে।
সিনথিয়া ফিসফিস করল —
সিনথিয়া: "এই মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না।"
অর্ণব: "আমিও না।"
অর্ণব তার চোখের পানি দেখে চমকে উঠল।
অর্ণব: "কাঁদছিস কেন?"
সিনথিয়া: "জানি না। ভালো লাগছে। অনেক ভালো লাগছে।"
অর্ণব তাকে বুকে টেনে নিল। শক্ত করে। সিনথিয়া তার বুকে মাথা রেখে শুনল হার্টবিট — ধক ধক, দ্রুত, তার নিজের তালে।
অর্ণব: "তোর ঠোঁট এখনো মিষ্টি।"
সিনথিয়া: "তুই এখনো বোকা।"
অর্ণব: "তোর জন্য বোকাই থাকব। সারাজীবন।"
সিনথিয়া: "সারাজীবন অনেক লম্বা।"
অর্ণব: "তোর সাথে কাটালে ছোট মনে হবে।"
সূর্য ডুবে গেল। পার্কে বাতি জ্বলল — হলুদ আলোর ফোঁটা গাছের ফাঁকে ফাঁকে। তারা উঠতে চাইল না। সিনথিয়া অর্ণবের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। অর্ণব তার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল।
সিনথিয়া: "আজকের দিনটা শেষ না হোক।"
অর্ণব একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল —
অর্ণব: "মেসে চল। রুমমেটরা কেউ নাই। সবাই বাড়ি গেছে ছুটিতে।"
সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। সে জানত এর মানে কী। তিন মাস পর — তাদের প্রথমবার আবার।
সিনথিয়া: "তুই চাস?"
অর্ণব তার চোখের দিকে তাকাল — সরাসরি, সৎ।
অর্ণব: "তোকে চাই। শুধু তোকে। আজ। এখন।"
সিনথিয়া তার হাত ধরল — শক্ত করে।
সিনথিয়া: "চল।"
রিকশায় তারা পাশাপাশি বসল। অর্ণবের হাত তার কোমরে — শক্ত, অধিকার নিয়ে, কিন্তু নরম। সিনথিয়া মাথা হেলিয়ে দিল তার কাঁধে। রাস্তার বাতিগুলো সরে যাচ্ছে জানালা দিয়ে — হলুদ, কমলা, সাদা।
রিকশাওয়ালা প্যাডেল মারছে ছন্দে। বাতাসে রাতের গন্ধ — ভাজাপোড়া, ফুল, ধুলো। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছে — ভয়ে না, উত্তেজনায়। ভালোবাসার উত্তেজনায়।
অর্ণব: "ভয় পাচ্ছিস?"
সিনথিয়া: "একটু।"
অর্ণব: "আমাকে বিশ্বাস করিস?"
সিনথিয়া: "নিজের চেয়ে বেশি।"
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল — রিকশার মধ্যেই। রিকশাওয়ালা সামনে তাকিয়ে হাসল, কিছু বলল না।
সিনথিয়া: "তোর রুমমেটরা সত্যি নাই তো?"
অর্ণব: "সত্যি। সবাই বাড়ি গেছে। পুরো মেস ফাঁকা। শুধু আমরা।"
সিনথিয়া: "তাহলে ঠিক আছে।"
সে অর্ণবের হাতটা নিজের হাতে নিল। তাদের আঙুল জড়াজড়ি হয়ে গেল। রিকশা চলছে — ধীরে, ছন্দে। সিনথিয়ার মনে হলো এই পথটা যদি কখনো শেষ না হতো।
মেসের গেটে রিকশা থামল। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে ঢুকল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে — তিনতলা। করিডোর ফাঁকা, শুধু একটা টিউবলাইট জ্বলছে। অর্ণব দরজা খুলল।
ঘরটা ছোট, কিন্তু গোছানো। একটা বিছানা — চাদরটা পরিষ্কার, মনে হয় আজই বদলেছে। একটা টেবিল — বইয়ের স্তূপ। দেয়ালে কয়েকটা ছবি — বন্ধুদের সাথে, একটা সিনথিয়ার সাথে — পার্কে তোলা, গত বছরের। জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে — তারা ফুটেছে।
অর্ণব দরজা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। তারপর ধীরে ধীরে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে এল।
কোনো তাড়া ছিল না। কোনো বুনো ক্ষুধা ছিল না। শুধু ভালোবাসা — চোখে, হাতে, শ্বাসে।
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল। তারপর চোখের পাতায় — ডান, বাম। তারপর গালে। প্রতিটা চুম্বনে সময় নিল — যেন প্রতিটা ছোঁয়া মনে রাখতে চায়, যেন তিন মাসের প্রতিটা দিনের জন্য একটা করে চুমু।
সিনথিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে এল। তার শরীর শিথিল হয়ে গেল অর্ণবের হাতে। নিরাপদ। সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই হাতে কোনো দাবি নাই — শুধু ভালোবাসা।
অর্ণব তার কামিজের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলল। ধীরে। প্রতিটা বোতামের পর একটা চুমু — গলায়, কাঁধে, বুকের ওপরে। তার ঠোঁট গরম, নরম।
সিনথিয়া: "অর্ণব..."
অর্ণব: "হুম?"
সিনথিয়া: "ভালোবাসি।"
অর্ণব থামল। তার চোখে পানি চিকচিক করছে — বাতির আলোয় ঝিলমিল।
অর্ণব: "আমিও। অনেক। তুই জানিস না কতটা।"
সে সিনথিয়াকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়াল — আলতো, যেন সে কাচের তৈরি। তারপর নিজে পাশে শুল। তাদের শরীর একে অপরের সাথে মিশে গেল — ধীরে, নরমভাবে, কোনো জোর নাই।
এটা ছিল ভালোবাসা। শুধুই ভালোবাসা।
অর্ণব তার শরীরের প্রতিটা অংশে চুমু খেল — শ্রদ্ধার সাথে, ভালোবাসার সাথে। কাঁধে, বুকে, পেটে — প্রতিটা ছোঁয়ায় যত্ন। সিনথিয়া তার চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিল। তার শরীর জেগে উঠল — নরমভাবে, ফুলের পাপড়ি খোলার মতো, একটা একটা করে।
সিনথিয়া অর্ণবের শার্টের বোতাম খুলল — তার হাত কাঁপছিল। অর্ণবের বুক — চেনা, নিরাপদ। সে তার বুকে মাথা রাখল, হার্টবিট শুনল।
তারপর যখন তারা এক হলো, সিনথিয়ার চোখে পানি এসে গেল। অর্ণব সাথে সাথে থামল।
অর্ণব: "ব্যথা পাচ্ছিস?"
সিনথিয়া: "না। এটা... সুখের। অনেকদিন পর... এভাবে..."
অর্ণব তার চোখের পানি মুছে দিল আঙুল দিয়ে। তারপর কপালে চুমু খেল।
অর্ণব: "আমি আছি। ধীরে করব।"
তারপর আবার — ধীরে, গভীরে। তাদের চোখ একে অপরের থেকে সরল না। প্রতিটা নড়াচড়ায় ভালোবাসা। প্রতিটা শ্বাসে বিশ্বাস। প্রতিটা মুহূর্তে — "তুমি আমার, আমি তোমার।"
সিনথিয়া: "আরো কাছে আয়।"
অর্ণব তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তাদের শরীরের মধ্যে কোনো ফাঁক রইল না। হৃদস্পন্দন এক তালে — ধক ধক, ধক ধক।
সিনথিয়ার শরীরে একটা ঢেউ উঠল — নরম, গভীর, পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া। এটা সেই তীব্র, বুনো শিখর না — এটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, ধীরে এসে পুরোটা ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। সে অর্ণবের কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল —
সিনথিয়া: "ভালোবাসি... ভালোবাসি... ভালোবাসি..."
অর্ণব: "আমিও তোকে ভালোবাসি। শুধু তোকেই। আর কাউকে না। কোনোদিন না।"
সেই "আর কাউকে না" শুনে সিনথিয়ার বুকটা আবার চিনচিন করল — কিন্তু সে সেটা ঠেলে দিল দূরে। আজ না। আজ শুধু ভালোবাসা।
তারপর শান্তি। গভীর, নরম শান্তি। তারা একে অপরের বাহুতে শুয়ে রইল — ঘামে ভেজা, শ্বাস ভারী, কিন্তু মুখে হাসি। জানালা দিয়ে তারার আলো এসে পড়েছে বিছানায়।
অর্ণব তার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল — ধীরে, বারবার।
অর্ণব: "তুই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।"
সিনথিয়া: "তুইও। আমার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।"
অর্ণব: "নিরাপদ?"
সিনথিয়া: "তোর বুকে মাথা রাখলে মনে হয় পৃথিবীর কোনো খারাপ কিছু আমাকে ছুঁতে পারবে না।"
অর্ণব তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
অর্ণব: "পারবে না। আমি থাকতে না।"
তারা শুয়ে রইল — জানালা দিয়ে তারার আলো এসে পড়েছে বিছানায়, তাদের গায়ে।
সিনথিয়া: "অর্ণব?"
অর্ণব: "হুম?"
সিনথিয়া: "তুই কখনো ভেবেছিস — পাঁচ বছর পর আমরা কোথায় থাকব?"
অর্ণব একটু ভাবল।
অর্ণব: "আমি পাস করে চাকরি করব। তুই ভার্সিটি শেষ করবি। তারপর..."
সিনথিয়া: "তারপর?"
অর্ণব: "তারপর তোকে বিয়ে করব।"
সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। বিয়ে। এই শব্দটা তার গোপন জীবনে কখনো আসেনি — সেখানে শুধু শরীর ছিল, মুহূর্ত ছিল। কিন্তু এখানে — ভবিষ্যৎ।
সিনথিয়া: "তুই সিরিয়াস?"
অর্ণব: "পুরো সিরিয়াস। তুই ছাড়া আমি কাউকে ভাবতে পারি না।"
সিনথিয়া তার বুকে মুখ গুঁজল। চোখে পানি — আবার।
সিনথিয়া: "আমিও। তোকে ছাড়া আমিও কাউকে ভাবতে পারি না।"
এটা সত্যি ছিল। তার গোপন জীবনের সব পুরুষ — তারা শরীর ছিল, উত্তেজনা ছিল। কিন্তু ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যৎ শুধু একজনের সাথে — অর্ণবের সাথে।
অর্ণব তার মাথায় চুমু খেল।
অর্ণব: "ঘুমিয়ে পড়ছিস?"
সিনথিয়া: "না। শুধু... এই মুহূর্তটা ধরে রাখতে চাই।"
অর্ণব: "ধরে রাখ। আমি আছি।"
তারা শুয়ে রইল — অনেকক্ষণ। কথা কম। অর্ণব তার পিঠে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে। সিনথিয়া তার বুকের লোমে আঙুল ডুবিয়ে খেলছে।
সিনথিয়া: "তোর পরীক্ষা কবে থেকে?"
অর্ণব: "সামনের মাসে। তুই আমার নোটগুলো দেখে দিবি?"
সিনথিয়া: "দেব। তবে ফি লাগবে।"
অর্ণব: "কী ফি?"
সিনথিয়া: "প্রতিদিন একটা করে চুমু।"
অর্ণব: "ডিল।"
সে তার ঠোঁটে চুমু খেল — মিষ্টি, ছোট। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা। সিনথিয়া হাসতে হাসতে তাকে ঠেলে দিল।
সিনথিয়া: "থাম! সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। মা বলেছে সন্ধ্যার আগে ফিরতে।"
অর্ণব: "আরেকটু থাক।"
সিনথিয়া: "না। প্রথম দিনই দেরি করলে মা আর বেরোতে দেবে না।"
তারা উঠল। কাপড় পরল। অর্ণব তার চুল ঠিক করে দিল — আঙুল দিয়ে আঁচড়ে। সিনথিয়া তার শার্টের কলার ঠিক করে দিল।
আয়নায় দুজনকে দেখা গেল — পাশাপাশি। সিনথিয়া মনে মনে ভাবল — এই তো স্বাভাবিক জীবন। এই তো আসল। বাকি সব — স্বপ্নের মতো, অন্ধকারের মতো — সেটা অন্য কারো জীবন।
অর্ণব: "চল, তোকে বাসায় পৌঁছে দিই।"
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব তার হাত ধরল — আঙুলে আঙুল জড়িয়ে। বাতাসে রাতের গন্ধ। দোকানগুলো বন্ধ হচ্ছে একটা একটা করে। রিকশার টুংটাং, দূরে কোথাও গানের সুর — সিনথিয়া সেদিকে কান দিল না।
তারা হাঁটল ধীরে — যেন পথটা শেষ না হয়।
অর্ণব: "আজকের দিনটা মনে থাকবে।"
সিনথিয়া: "আমারও।"
অর্ণব: "তিন মাস পর তোকে এভাবে পেয়ে... মনে হচ্ছে হারানো জিনিস ফিরে পেলাম।"
সিনথিয়া: "আমি হারাইনি। শুধু... দূরে ছিলাম।"
অর্ণব: "আর যাস না দূরে।"
সিনথিয়া: "যাব না।"
বাসার গেটের সামনে তারা দাঁড়াল। গেটের বাতিটা জ্বলছে। ভেতরে মায়ের ঘরে আলো।
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল। তারপর ঠোঁটে — লম্বা, মিষ্টি, বিদায়ের।
অর্ণব: "রেজাল্টের দিন কলেজে যাবি তো?"
সিনথিয়া: "যাব। তুই যাবি?"
অর্ণব: "অবশ্যই। তোর রেজাল্ট আমি নিজে দেখতে চাই। সবার আগে।"
সিনথিয়া হাসল।
সিনথিয়া: "ভালো রেজাল্ট হলে কী দিবি?"
অর্ণব: "যা চাস।"
সিনথিয়া: "মনে রাখিস। কথা দিলি।"
অর্ণব: "দিলাম।"
আরেকটা চুমু — ছোট, মিষ্টি। তারপর সিনথিয়া গেটের ভেতরে ঢুকল। পেছন ফিরে দেখল — অর্ণব এখনো দাঁড়িয়ে, হাত নাড়ছে। বাতির আলোয় তার মুখটা উজ্জ্বল।
সে হাত নাড়ল। তারপর ভেতরে ঢুকে গেল।
গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে সে শুনল অর্ণবের পায়ের শব্দ — ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল — এখনো গরম, এখনো তার ছোঁয়া লেগে আছে।
উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতে উঠতে সে ভাবল — আজকের দিনে কোনো মিথ্যে ছিল না। কোনো ছদ্মবেশ না। শুধু সিনথিয়া আর অর্ণব। যেমনটা হওয়ার কথা ছিল সবসময়।
মা ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন।
মা: "কেমন কাটল?"
সিনথিয়া: "ভালো। খুব ভালো।"
মা: "মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যা, হাতমুখ ধুয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি।"
খেতে বসে মা ডালের বাটি এগিয়ে দিলেন।
মা: "অর্ণব কেমন আছে?"
সিনথিয়া: "ভালো। তোমাকে সালাম দিয়েছে।"
মা: "ছেলেটা ভালো। তোর বাবা অফিস থেকে ফিরলে বলিস — কাল ছুটি, সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসব।"
সিনথিয়া: "বলব।"
সিনথিয়া মায়ের হাতটা ধরল টেবিলের ওপর।
সিনথিয়া: "তুমি খুশি তো?"
মা: "তুই খুশি থাকলেই আমি খুশি।"
খাওয়া শেষে সিনথিয়া নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাতের ব্রেসলেটটা দেখল — বাতির আলোয় ঝিলমিল করছে। ঠোঁটে এখনো অর্ণবের চুম্বনের স্বাদ। গায়ে এখনো তার গন্ধ।
আজকের দিনটা সত্যি ছিল। পরিষ্কার ছিল। ভালোবাসার ছিল। তিন মাসের খাঁচার পর — মুক্তির প্রথম দিন, ভালোবাসার দিন।
সে ফোনটা হাতে নিল। নাবিলাকে মেসেজ করল —
সিনথিয়া: "ডেট শেষ। সব পরে বলব।"
নাবিলা সাথে সাথে রিপ্লাই দিল —
নাবিলা: "সব মানে সব!"
সিনথিয়া হাসল। তারপর মেসেজ লিস্ট স্ক্রল করতে করতে একটা পুরনো মেসেজে চোখ আটকে গেল।
অচেনা নম্বর। কয়েক সপ্তাহ আগের।
"যখন ডাকব, আসবে।"
প্রিন্সিপাল। রেজা চৌধুরী।
তিন মাসে তিনি আর ডাকেননি — হয়তো পরীক্ষা, হয়তো ব্যস্ততা। সিনথিয়া প্রায় ভুলেই গেছিল। প্রায়।
কিন্তু মেসেজটা সে ডিলিট করেনি। কেন করেনি — সে নিজেও জানে না। হয়তো ভয়ে। হয়তো... অন্য কিছুতে।
সে ফোনটা বুকের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করল।
রেজাল্টের দিন আসছে — কয়েকদিন পর। অর্ণব যাবে। সেও যাবে।
আর সে জানে না — সেই দিন তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। খাঁচা খুলেছে — কিন্তু কিছু দরজা এখনো বন্ধ। কিছু ডাক এখনো বাকি।
ব্রেসলেটটা হাতে নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল — ঠোঁটে হাসি নিয়ে, মনে শান্তি নিয়ে। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখল — সমুদ্র। নীল পানি, সাদা বালি। আর অর্ণব তার পাশে হাঁটছে, হাত ধরে। সূর্য উঠছে দিগন্তে — নতুন দিনের, নতুন জীবনের সূর্য।
(চলবে)
সকালটা শুরু হয়েছিল একটা শব্দে — পরিচিত, প্রায় ভুলে যাওয়া একটা শব্দ।
সিনথিয়ার ফোনের রিংটোন।
তিন মাস। পুরো তিন মাস পর মা আজ সকালে আলমারি খুলে ফোনটা তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আলমারির চাবিটা মায়ের আঁচলে বাঁধা থাকত এই তিন মাস — সিনথিয়া কতবার সেই চাবিটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, গুনতে পারবে না।
মা: "এডমিশন পরীক্ষা শেষ। এখন আর বন্দি না।"
সাথে একটা হালকা হাসি — যেন নিজেও জানেন এই তিন মাস মেয়েটার ওপর কতটা ভারী ছিল।
সিনথিয়া: "সত্যি?"
মা: "সত্যি। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবি। রেজাল্টের আগে ঢিলেমি না।"
সিনথিয়া মাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে, অনেকক্ষণ। মায়ের গায়ে রান্নার গন্ধ, নিরাপত্তার গন্ধ।
মা: "আরে পাগলি! ফোন পেয়ে এত খুশি?"
সিনথিয়া: "খুব খুশি।"
ফোনটা হাতে নিয়ে সিনথিয়া অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে ধুলো জমেছিল — মুছে নিল কামিজের আঁচলে। তারপর পাওয়ার বাটন চাপল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ব্যাটারি শূন্যের কাছাকাছি — তাড়াতাড়ি চার্জে দিল।
চার্জ হতে হতে সে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে রোদ — তিন মাস ধরে যে রোদটা শুধু জানালা দিয়ে দেখেছে, বইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে। আজ সেই রোদে হাঁটবে। বাইরে যাবে। স্বাধীন।
ফোনটা একটু চার্জ হতেই নোটিফিকেশনের বন্যা শুরু হলো।
মিসড কল — তেইশটা। মেসেজ — গুনে শেষ করা যাবে না। তিন মাসের নীরবতা একসাথে চিৎকার করে উঠল।
সে প্রথমে নাবিলাকে ফোন করল। নাবিলা — তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, যার সাথে তিন মাস কোনো কথা হয়নি। বাটন ফোনটা ছিল শুধু আসিফের জন্য — মায়ের ভয়ে আর কাউকে নম্বর দেয়নি।
দুটো রিং-এর পরই ওপাশ থেকে চিৎকার —
নাবিলা: "তুই বেঁচে আছিস?!"
সিনথিয়া হেসে ফেলল — তিন মাস পর প্রথম সত্যিকারের হাসি, পেট থেকে ওঠা।
সিনথিয়া: "বেঁচে আছি। ফোন পেলাম আজ। মা আলমারি খুলে দিল।"
নাবিলা: "তিন মাস! তিন মাস তুই উধাও! আমি তোর বাসার সামনে দিয়ে গেছি কতবার — তোর মা বলে 'পড়ছে, ডিস্টার্ব করিস না'। আমি ভাবলাম তুই মরে গেছিস নাকি! নাকি তোর মা তোকে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে!"
সিনথিয়া: "প্রায় মরেই গেছিলাম। বন্দি জীবন।"
নাবিলা: "আসিফ স্যারের টিউশন কেমন ছিল?"
সিনথিয়া একটু থামল। আসিফ। শুক্রবারগুলো। "শুধু শরীর" — যেটা শুধু শরীর থাকেনি পুরোপুরি, কিন্তু প্রতিশ্রুতিও হয়নি। শেষ টিউশনের পর সে বলেছিল — "পরীক্ষা শেষ। আর দরকার নাই।" — আসিফ শুধু মাথা নেড়েছিল। কোনো নাটক হয়নি। ঠিক যেমন কথা ছিল।
সিনথিয়া: "ভালো ছিল। ফিজিক্স শিখেছি।"
নাবিলা: "শুধু ফিজিক্স?"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
দুজনে হাসল। তারপর নাবিলার গলা নরম হলো —
নাবিলা: "সত্যি বল তো — কেমন ছিলি?"
সিনথিয়া জানালার বাইরে তাকাল। কেমন ছিল? খাঁচায়। কিন্তু খাঁচার ভেতরেও একটা গোপন দরজা ছিল — যেটা দিয়ে মাঝে মাঝে হাওয়া আসত।
সিনথিয়া: "কঠিন ছিল। কিন্তু এখন মুক্ত।"
নাবিলা: "তাহলে আজ কী প্ল্যান?"
সিনথিয়া: "আজ অর্ণবের দিন।"
নাবিলা: "ওহো! ফ্রি বার্ডের প্রথম ডেট! যা, যা — ডিটেইলস পরে চাই। সব।"
সিনথিয়া: "পাগলি। আগে দেখা করি। তিন মাস পর!"
নাবিলা: "যা। আর শোন —"
সিনথিয়া: "বল।"
নাবিলা: "তোকে মিস করেছি। সত্যি।"
সিনথিয়ার গলা একটু ধরে এল।
সিনথিয়া: "আমিও। কাল দেখা করব। প্রমিস।"
ফোন রেখে সিনথিয়া গ্যালারি খুলল। তিন মাসের পুরনো ছবি — নাবিলার সাথে সেলফি, ছাদ পার্টির রাতের ছবি, অর্ণবের জন্মদিনের কেকের ছবি। আর একটা ছবিতে থামল — গত বছর পার্কে তোলা, অর্ণবের পাশে সে, দুজনে হাসছে। সেই হাসিটা আজ আবার ফিরে পেতে চায়।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল শেষ টিউশনের দিনটা। আসিফ সেদিন একটু আগেই এসেছিল। বই খোলেনি। শুধু বলেছিল —
আসিফের গলা তার মনে বাজল — "পরীক্ষা ভালো দিয়েছিস। আর দরকার নাই।"
সে বলেছিল — "আর দরকার নাই।" — আসিফ শুধু মাথা নেড়েছিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু থেমেছিল, তারপর বলেছিল — "ভালো থাকিস।" কোনো নাটক হয়নি। কোনো কান্না না। ঠিক যেমন কথা ছিল — শুধু শরীর, কোনো প্রতিশ্রুতি না।
সিনথিয়া বাটন ফোনটা বের করল — যেটা এখন আর দরকার নাই। সিমটা খুলে ভেঙে ফেলল দুই টুকরো। ফোনটা ড্রয়ারের গভীরে রেখে দিল। একটা অধ্যায় শেষ।
ফোন রেখে সিনথিয়া মেসেজগুলো স্ক্রল করল। অনেক মেসেজ — কিছু পড়ল, কিছু শুধু নাম দেখে রেখে দিল। যেগুলোর উত্তর আজ না, সেগুলো আপাতত থাক। আজকের দিনটা শুধু একজনের।
তারপর স্ক্রিনে অর্ণবের নামটা ভেসে উঠল — আর তার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। যেন সে জানত, যেন সে অপেক্ষায় ছিল।
অর্ণব: "ফ্রি?"
একটা শব্দ। কিন্তু সেই একটা শব্দে তিন মাসের অপেক্ষা, তিন মাসের দূরত্ব, তিন মাসের না-বলা কথা।
সিনথিয়া: "ফ্রি। পুরোপুরি ফ্রি।"
অর্ণব: "তাহলে আজ বিকেলটা আমার। কোনো আপত্তি?"
সিনথিয়া: "কোনো আপত্তি নাই।"
অর্ণব: "চারটায়। পুরনো জায়গায়।"
একটু থামল। তারপর নরম গলায় —
অর্ণব: "মিস করেছি তোকে।"
সিনথিয়া: "আমিও। অনেক।"
ফোন রেখে সিনথিয়া বিছানায় বসে পড়ল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে — যেন প্রথম ডেট। আসলে তো প্রথমই — তিন মাস পর আবার শুরু।
সে আলমারি খুলল। নীল কামিজটা বের করল — অর্ণবের প্রিয়, সে জানে। গত বছর অর্ণব বলেছিল — "নীল তোকে মানায়।" — সেই থেকে এই কামিজটা তার প্রিয়। চুলটা খুলে দিল — তিন মাসে চুলটা লম্বা হয়েছে, কোমর ছুঁইছুঁই। কাজলটা একটু গাঢ় করে দিল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি। কানে ছোট ঝুমকো — অর্ণবের দেওয়া, জন্মদিনে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল — একটু শুকিয়েছে, চোখের নিচে হালকা কালি। তিন মাসের বন্দিত্বের ছাপ এখনো মুখে। কিন্তু চোখে আজ আলো — মুক্তির আলো।
সে আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল মনে মনে — "তুই কে?"
উত্তর এল ভেতর থেকে — "আজ আমি শুধু সিনথিয়া। অর্ণবের সিনথিয়া।"
সে হাসল। আয়নার মেয়েটাও হাসল। তিন মাস পর প্রথমবার — নিজেকে চিনতে পারছে।
দুপুরে মায়ের সাথে ভাত খেল। মা ডাল বেড়ে দিতে দিতে বললেন —
মা: "কোথায় যাচ্ছিস বিকেলে?"
সিনথিয়া: "অর্ণবের সাথে দেখা করতে। রমনা পার্কে।"
মা: "সন্ধ্যার আগে ফিরবি।"
সিনথিয়া: "ফিরব। মা —"
মা: "বল।"
সিনথিয়া: "থ্যাংকস। এই তিন মাস... আমি জানি তুমি আমার ভালোর জন্যই করেছ।"
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
মা: "ভালো করে ঘুরে আয়। অনেক কষ্ট করেছিস।"
বাসা থেকে বেরিয়ে সিনথিয়া রিকশা নিল। রিকশায় উঠে সে বারবার ফোনটা দেখছে — যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এটা সত্যি তার হাতে। রাস্তায় মানুষ, দোকান, ভিড় — তিন মাস পর এই ভিড়টাও সুন্দর লাগছে।
বাতাস তার খোলা চুল উড়িয়ে নিচ্ছে। সে চুল সামলাতে সামলাতে হাসছে — নিজের মনেই। পাশের রিকশায় একটা বাচ্চা তার দিকে তাকিয়ে হাসল। সিনথিয়াও হাসল।
মনে মনে ভাবল — আজকের দিনটা সে অনেকদিন মনে রাখবে। খাঁচা থেকে বেরোনোর প্রথম দিন। আর সেই দিনটা অর্ণবের সাথে — এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
পার্কের গেট দেখা যাচ্ছে। তার বুক ধড়ফড় করছে — যেন প্রথমবার দেখা করতে যাচ্ছে। আসলে তো প্রথমবারই — নতুন করে শুরু।
বিকেল চারটা। রমনা পার্কের পুরনো গেট।
অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল — হালকা নীল শার্ট, চুলটা একটু বড় হয়েছে, হাতে একটা ছোট প্যাকেট। সিনথিয়াকে দেখে তার মুখে যে হাসিটা ফুটল, সেটা দেখে সিনথিয়ার বুকের ভেতর কিছু একটা গলে গেল — বরফ গলার মতো।
তিন মাস। তিন মাসে সে অনেক কিছু করেছে — অনেক হাত, অনেক ঠোঁট, অনেক গোপন রাত। ফাহিমের বাসা, আসিফের শুক্রবার, রনির দোকানের পেছনের ঘর — সব মনে পড়ে গেল একসাথে। কিন্তু এই একটা হাসির সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝল — এই মানুষটা আলাদা। এই মানুষটা তার "স্বাভাবিক" জীবন। তার আসল জীবন।
অর্ণব এগিয়ে এসে তার হাত ধরল। কোনো কথা না বলে। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরল — যেন ছেড়ে দিলে আবার হারিয়ে যাবে। তার হাতটা একটু কাঁপছিল।
অর্ণব: "চল।"
তারা পার্কের ভেতরে ঢুকল। বিকেলের আলো গাছের পাতা ভেদ করে ছায়া ফেলেছে পথে। পাখির ডাক, বাচ্চাদের হাসি, বাদামওয়ালার ডাক — সব মিলে একটা চেনা পৃথিবী। তিন মাস পর এই পৃথিবীতে ফেরা।
হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিল।
অর্ণব: "তোর জন্য।"
সিনথিয়া: "কী এটা?"
অর্ণব: "খুলে দেখ।"
ভেতরে একটা সিলভার ব্রেসলেট — সরু, সাদাসিধে, কিন্তু সুন্দর। ছোট ছোট নকশা কাটা।
সিনথিয়া: "এটা কেন?"
অর্ণব: "এডমিশন পরীক্ষা শেষের উপহার। তুই অনেক খেটেছিস। আমি জানি — তিন মাস তুই কীভাবে কাটিয়েছিস, আমি কল্পনা করতে পারি।"
সিনথিয়া ব্রেসলেটটা হাতে পরল। অর্ণব নিজে পরিয়ে দিল — তার আঙুলগুলো সিনথিয়ার কবজিতে একটু কাঁপছিল। হুকটা লাগাতে গিয়ে দুবার ফসকে গেল।
সিনথিয়া: "সুন্দর।"
অর্ণব: "তোর হাতে সব সুন্দর লাগে।"
সিনথিয়া হাসল — গাল লাল হয়ে গেল। তিন মাসে কত পুরুষ তাকে কত কথা বলেছে — কেউ নোংরা, কেউ বুনো, কেউ পাগল করা। কিন্তু এই একটা সাদাসিধে লাইন — "তোর হাতে সব সুন্দর লাগে" — তার গাল লাল করে দিল, বুক ধড়ফড় করিয়ে দিল। এটাই অর্ণব। এটাই তাদের ভালোবাসা। সাদা, সহজ, সত্যি।
অর্ণব পকেট থেকে ফোন বের করল।
অর্ণব: "একটা ছবি তুলি?"
সিনথিয়া: "তিন মাস পর প্রথম ছবি?"
অর্ণব: "হ্যাঁ। প্রমাণ থাকুক — তুই ফিরেছিস।"
তারা পাশাপাশি দাঁড়াল। অর্ণবের হাত তার কোমরে। সিনথিয়া মাথা হেলিয়ে দিল তার কাঁধে। ক্লিক।
ছবিটা দেখল দুজনে।
সিনথিয়া: "আমি কালো দেখাচ্ছি।"
অর্ণব: "তুই সুন্দর দেখাচ্ছিস। সবসময়ের মতো।"
সিনথিয়া: "আরেকটা তোল। এবার আমি তুলব।"
সে ফোনটা নিয়ে একটু দূরে গেল। অর্ণব পোজ দিল — হাত জোড়া, মাথা নিচু, নাটকীয় ভঙ্গি। সিনথিয়া হাসতে হাসতে ছবি তুলল।
সিনথিয়া: "এটা তোর মাকে পাঠিয়ে দেব — দেখো তোমার ছেলে কত বোকা।"
অর্ণব: "দিস না! মা বিশ্বাস করে ফেলবে!"
দুজনে হাসল — প্রাণখোলা হাসি। পাশ দিয়ে যাওয়া এক বয়স্ক দম্পতি তাদের দিকে তাকিয়ে হাসল। সিনথিয়ার মনে হলো — এই তো জীবন। এই সহজ আনন্দটাই তো সে তিন মাস ধরে মিস করেছে।
তারা হাঁটতে হাঁটতে পার্কের ভেতরের ফুচকার দোকানে গেল। কাঠের বেঞ্চিতে বসল পাশাপাশি।
সিনথিয়া: "ঝাল বেশি দেবেন মামা!"
অর্ণব: "তুই তো ঝাল খেতে পারিস না।"
সিনথিয়া: "পারি! তুই দেখিসনি। তিন মাসে অনেক কিছু বদলেছে।"
অর্ণব তার দিকে তাকাল — একটু গভীরভাবে।
অর্ণব: "তুই বদলেছিস?"
সিনথিয়া: "একটু। তুই?"
অর্ণব: "আমি একই আছি। তোর অপেক্ষায়।"
ফুচকা এল। সিনথিয়া একটা মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল — ঝালে চোখে পানি চলে এল।
অর্ণব: "বলেছিলাম!"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
অর্ণব হেসে তার চোখের পানি মুছে দিল আঙুল দিয়ে — আলতো, যত্নে। তারপর নিজের প্লেট থেকে একটা কম ঝালের ফুচকা তার মুখের সামনে ধরল।
অর্ণব: "এটা খা।"
সিনথিয়া তার হাত থেকে ফুচকাটা খেল। তাদের চোখাচোখি হলো — আর সেই মুহূর্তে পার্কের কোলাহল, ফুচকাওয়ালার ডাক, পাশের বেঞ্চির আড্ডা — সব মিলিয়ে গেল। শুধু দুজন। শুধু এই মুহূর্ত।
খাওয়া শেষে তারা আবার হাঁটল। এবার লেকের দিকে। পথে একটা আইসক্রিমের দোকান দেখে অর্ণব থামল।
অর্ণব: "একটা নিবি?"
সিনথিয়া: "দুটো। একটা তোর, একটা আমার।"
অর্ণব: "আগে তো একটাতেই দুজনে খেতাম।"
সিনথিয়া: "আগে ছোট ছিলাম। এখন বড় হয়েছি।"
অর্ণব: "কত বড়?"
সিনথিয়া: "অনেক বড়।"
দুজনে হাসল। দুটো আইসক্রিম নিয়ে তারা লেকের ধারের ঘাসে বসল। পানিতে হাঁস ভাসছে। দূরে কয়েকটা ছেলে ফুটবল খেলছে।
অর্ণব: "ভার্সিটিতে আমার প্রথম সেমিস্টার শেষ।"
সিনথিয়া: "রেজাল্ট কেমন?"
অর্ণব: "ভালো। তুই থাকলে আরো ভালো হতো। তুই তো আমার লাক।"
সিনথিয়া: "লাক না, আমি তোর টেনশন।"
অর্ণব: "সবচেয়ে সুন্দর টেনশন।"
সিনথিয়া আইসক্রিম চাটতে চাটতে জিজ্ঞেস করল —
সিনথিয়া: "আমি চান্স পাব তো?"
অর্ণব: "পাবি। তুই যেভাবে খেটেছিস — না পাওয়ার কোনো কারণ নাই।"
সিনথিয়া: "যদি না পাই?"
অর্ণব তার হাত ধরল।
অর্ণব: "তাহলে আবার দিবি। আমি আছি। তোর পাশে। সবসময়।"
সিনথিয়ার বুকের ভেতর আবার সেই চিনচিনে ব্যথাটা উঠল। অপরাধবোধ। এই মানুষটা — এত সাদা, এত সত্যি — আর সে? তিন মাসে সে যা করেছে...
ফাহিমের কথা মনে পড়ল — "পরশু" যেটা কখনো আসেনি। সে একটা মেসেজও পাঠাতে পারেনি। ফাহিম হয়তো ভেবেছে সে ভুলে গেছে। হয়তো ভালোই হয়েছে।
আসিফের কথা মনে পড়ল — শেষ শুক্রবার। "আর দরকার নাই" — সে বলেছিল। আসিফ শুধু তাকিয়েছিল — সেই শান্ত, গভীর দৃষ্টিতে। "ভালো থাকিস" — বলেছিল। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো ভাঙনও না। ঠিক যেমন কথা ছিল।
রনি, সজীব, নাবিলা — সবাই। একটা পুরো গোপন জীবন — যেটা অর্ণব জানে না, কোনোদিন জানবে না।
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। না। আজ না। আজ সে শুধু সিনথিয়া — অর্ণবের সিনথিয়া। পরিষ্কার, সাদা, ভালোবাসার। ওই জীবনটা অন্য কারো — "মিম" বা অন্য কেউ। আজকের সিনথিয়া শুধুই অর্ণবের।
সিনথিয়া: "আমিও মিস করেছি। প্রতিদিন।"
এটা মিথ্যে ছিল না। ভিড়ের মধ্যে, বুনো রাতগুলোর মধ্যেও — সে অর্ণবকে মিস করেছে। এই সহজতাটা মিস করেছে। এই নিরাপত্তাটা। এই "স্বাভাবিক" হওয়াটা।
অর্ণব তার কাঁধে হাত রাখল। সিনথিয়া মাথাটা তার কাঁধে হেলিয়ে দিল। এত সহজ। এত স্বাভাবিক। কোনো লুকোচুরি নাই, কোনো ভয় নাই, কোনো তাড়া নাই। শুধু দুজন মানুষ — যারা একে অপরকে ভালোবাসে।
তারা বসে রইল — অনেকক্ষণ। কথা কম, নীরবতা বেশি। কিন্তু সেই নীরবতায় সব কথা ছিল।
একটা হাঁস পানিতে ভেসে এল কাছে। সিনথিয়া আইসক্রিমের শেষ টুকরোটা ছিঁড়ে পানিতে ফেলল। হাঁসটা ঠোকর দিয়ে খেল।
সিনথিয়া: "দেখ, ও খাচ্ছে!"
অর্ণব: "তুই হাঁসকেও খাওয়াস। তোর মনটা এত নরম কেন?"
সিনথিয়া: "নরম না। শুধু... ভালো লাগে।"
অর্ণব: "আচ্ছা, সিরিয়াস কথা। তুই কোন ভার্সিটিতে চান্স চাস?"
সিনথিয়া: "ঢাবি। ইংরেজি। তুই তো জানিস।"
অর্ণব: "জানি। তুই পাবি। আমি বাজি ধরতে পারি।"
সিনথিয়া: "কী বাজি?"
অর্ণব: "তুই চান্স পেলে আমি তোকে কক্সবাজার নিয়ে যাব।"
সিনথিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
সিনথিয়া: "সত্যি?!"
অর্ণব: "সত্যি। সমুদ্র দেখবি আমার সাথে। সূর্যোদয়।"
সিনথিয়া: "আর যদি না পাই?"
অর্ণব: "তাহলেও নিয়ে যাব। শুধু একটু দেরিতে।"
সিনথিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
সিনথিয়া: "তুই এত ভালো কেন?"
অর্ণব: "তোর জন্য।"
আরো কয়েকটা হাঁস এল। তারা বসে বসে দেখল — পানিতে ঢেউ, আকাশে মেঘের ছায়া। সিনথিয়ার মনে হলো সময়টা থেমে গেছে। এই মুহূর্তটা যদি সারাজীবন থাকত।
একসময় সূর্য হেলতে শুরু করল। আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়ল। সিনথিয়া উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়িয়ে দিল।
সিনথিয়া: "চল, ওইদিকে যাই। সূর্য ডোবা দেখব।"
লেকের পশ্চিম পাশে একটা নির্জন কোণা — বড় বড় গাছ, ঘন ছায়া, কেউ আসে না সেদিকে। তারা গিয়ে বসল একটা পাথরের ওপর।
সূর্য ডুবছে — আকাশে কমলা, গোলাপি, বেগুনি রঙের খেলা। পানিতে সূর্যের প্রতিবিম্ব কাঁপছে, ভেঙে ভেঙে। বাতাসে শীতলতা নামছে।
অর্ণব তার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিল। তার আঙুলগুলো সিনথিয়ার আঙুলে জড়াল।
অর্ণব: "তুই জানিস, আমি কখনো কাউকে এভাবে চাইনি।"
সিনথিয়া: "কীভাবে?"
অর্ণব: "এভাবে — শান্তিতে। তোর পাশে বসে থাকলেই মনে হয় সব ঠিক আছে। পৃথিবীতে আর কিছু লাগবে না। কোনো টেনশন নাই, কোনো ভয় নাই। শুধু তুই আর আমি।"
সিনথিয়া তার দিকে তাকাল। অর্ণবের চোখে কোনো কামনা ছিল না — ছিল গভীর, শান্ত ভালোবাসা। এমন ভালোবাসা যেটা চায় না, শুধু দেয়।
সে নিজে এগিয়ে গিয়ে অর্ণবের ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
প্রথমে আলতো — শুধু ছোঁয়া। তারপর গভীর। অর্ণবের হাত তার গালে উঠে এল, আঙুলগুলো তার চুলে ডুবল। চুম্বনটা ধীর, মিষ্টি, সময় নিয়ে — যেন তিন মাসের দূরত্ব একটা একটা করে মুছে দিচ্ছে। যেন প্রতিটা সেকেন্ড বলছে — "আমি এখানে আছি, আমি যাইনি।"
সিনথিয়ার শরীরে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। এটা সেই বুনো আগুন না — যেটা অন্যরা জ্বালাত। এটা অন্য কিছু। নরম, গভীর, হৃদয় থেকে ওঠা। তার চোখে পানি এসে গেল — সে জানে না কেন। হয়তো মুক্তির আনন্দে। হয়তো ভালোবাসার ভারে।
তারা আলাদা হলো। দুজনেরই শ্বাস ভারী। সিনথিয়া অর্ণবের কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখল — চোখ বন্ধ। তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে লাগছে — গরম, মিষ্টি।
কতক্ষণ এভাবে ছিল, কেউ জানে না। সময় থেমে গেছিল। পৃথিবীতে শুধু দুটো হৃদস্পন্দন — এক তালে, এক ছন্দে।
সিনথিয়া ফিসফিস করল —
সিনথিয়া: "এই মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না।"
অর্ণব: "আমিও না।"
অর্ণব তার চোখের পানি দেখে চমকে উঠল।
অর্ণব: "কাঁদছিস কেন?"
সিনথিয়া: "জানি না। ভালো লাগছে। অনেক ভালো লাগছে।"
অর্ণব তাকে বুকে টেনে নিল। শক্ত করে। সিনথিয়া তার বুকে মাথা রেখে শুনল হার্টবিট — ধক ধক, দ্রুত, তার নিজের তালে।
অর্ণব: "তোর ঠোঁট এখনো মিষ্টি।"
সিনথিয়া: "তুই এখনো বোকা।"
অর্ণব: "তোর জন্য বোকাই থাকব। সারাজীবন।"
সিনথিয়া: "সারাজীবন অনেক লম্বা।"
অর্ণব: "তোর সাথে কাটালে ছোট মনে হবে।"
সূর্য ডুবে গেল। পার্কে বাতি জ্বলল — হলুদ আলোর ফোঁটা গাছের ফাঁকে ফাঁকে। তারা উঠতে চাইল না। সিনথিয়া অর্ণবের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। অর্ণব তার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল।
সিনথিয়া: "আজকের দিনটা শেষ না হোক।"
অর্ণব একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল —
অর্ণব: "মেসে চল। রুমমেটরা কেউ নাই। সবাই বাড়ি গেছে ছুটিতে।"
সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। সে জানত এর মানে কী। তিন মাস পর — তাদের প্রথমবার আবার।
সিনথিয়া: "তুই চাস?"
অর্ণব তার চোখের দিকে তাকাল — সরাসরি, সৎ।
অর্ণব: "তোকে চাই। শুধু তোকে। আজ। এখন।"
সিনথিয়া তার হাত ধরল — শক্ত করে।
সিনথিয়া: "চল।"
রিকশায় তারা পাশাপাশি বসল। অর্ণবের হাত তার কোমরে — শক্ত, অধিকার নিয়ে, কিন্তু নরম। সিনথিয়া মাথা হেলিয়ে দিল তার কাঁধে। রাস্তার বাতিগুলো সরে যাচ্ছে জানালা দিয়ে — হলুদ, কমলা, সাদা।
রিকশাওয়ালা প্যাডেল মারছে ছন্দে। বাতাসে রাতের গন্ধ — ভাজাপোড়া, ফুল, ধুলো। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছে — ভয়ে না, উত্তেজনায়। ভালোবাসার উত্তেজনায়।
অর্ণব: "ভয় পাচ্ছিস?"
সিনথিয়া: "একটু।"
অর্ণব: "আমাকে বিশ্বাস করিস?"
সিনথিয়া: "নিজের চেয়ে বেশি।"
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল — রিকশার মধ্যেই। রিকশাওয়ালা সামনে তাকিয়ে হাসল, কিছু বলল না।
সিনথিয়া: "তোর রুমমেটরা সত্যি নাই তো?"
অর্ণব: "সত্যি। সবাই বাড়ি গেছে। পুরো মেস ফাঁকা। শুধু আমরা।"
সিনথিয়া: "তাহলে ঠিক আছে।"
সে অর্ণবের হাতটা নিজের হাতে নিল। তাদের আঙুল জড়াজড়ি হয়ে গেল। রিকশা চলছে — ধীরে, ছন্দে। সিনথিয়ার মনে হলো এই পথটা যদি কখনো শেষ না হতো।
মেসের গেটে রিকশা থামল। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে ঢুকল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে — তিনতলা। করিডোর ফাঁকা, শুধু একটা টিউবলাইট জ্বলছে। অর্ণব দরজা খুলল।
ঘরটা ছোট, কিন্তু গোছানো। একটা বিছানা — চাদরটা পরিষ্কার, মনে হয় আজই বদলেছে। একটা টেবিল — বইয়ের স্তূপ। দেয়ালে কয়েকটা ছবি — বন্ধুদের সাথে, একটা সিনথিয়ার সাথে — পার্কে তোলা, গত বছরের। জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে — তারা ফুটেছে।
অর্ণব দরজা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। তারপর ধীরে ধীরে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে এল।
কোনো তাড়া ছিল না। কোনো বুনো ক্ষুধা ছিল না। শুধু ভালোবাসা — চোখে, হাতে, শ্বাসে।
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল। তারপর চোখের পাতায় — ডান, বাম। তারপর গালে। প্রতিটা চুম্বনে সময় নিল — যেন প্রতিটা ছোঁয়া মনে রাখতে চায়, যেন তিন মাসের প্রতিটা দিনের জন্য একটা করে চুমু।
সিনথিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে এল। তার শরীর শিথিল হয়ে গেল অর্ণবের হাতে। নিরাপদ। সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই হাতে কোনো দাবি নাই — শুধু ভালোবাসা।
অর্ণব তার কামিজের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলল। ধীরে। প্রতিটা বোতামের পর একটা চুমু — গলায়, কাঁধে, বুকের ওপরে। তার ঠোঁট গরম, নরম।
সিনথিয়া: "অর্ণব..."
অর্ণব: "হুম?"
সিনথিয়া: "ভালোবাসি।"
অর্ণব থামল। তার চোখে পানি চিকচিক করছে — বাতির আলোয় ঝিলমিল।
অর্ণব: "আমিও। অনেক। তুই জানিস না কতটা।"
সে সিনথিয়াকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়াল — আলতো, যেন সে কাচের তৈরি। তারপর নিজে পাশে শুল। তাদের শরীর একে অপরের সাথে মিশে গেল — ধীরে, নরমভাবে, কোনো জোর নাই।
এটা ছিল ভালোবাসা। শুধুই ভালোবাসা।
অর্ণব তার শরীরের প্রতিটা অংশে চুমু খেল — শ্রদ্ধার সাথে, ভালোবাসার সাথে। কাঁধে, বুকে, পেটে — প্রতিটা ছোঁয়ায় যত্ন। সিনথিয়া তার চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিল। তার শরীর জেগে উঠল — নরমভাবে, ফুলের পাপড়ি খোলার মতো, একটা একটা করে।
সিনথিয়া অর্ণবের শার্টের বোতাম খুলল — তার হাত কাঁপছিল। অর্ণবের বুক — চেনা, নিরাপদ। সে তার বুকে মাথা রাখল, হার্টবিট শুনল।
তারপর যখন তারা এক হলো, সিনথিয়ার চোখে পানি এসে গেল। অর্ণব সাথে সাথে থামল।
অর্ণব: "ব্যথা পাচ্ছিস?"
সিনথিয়া: "না। এটা... সুখের। অনেকদিন পর... এভাবে..."
অর্ণব তার চোখের পানি মুছে দিল আঙুল দিয়ে। তারপর কপালে চুমু খেল।
অর্ণব: "আমি আছি। ধীরে করব।"
তারপর আবার — ধীরে, গভীরে। তাদের চোখ একে অপরের থেকে সরল না। প্রতিটা নড়াচড়ায় ভালোবাসা। প্রতিটা শ্বাসে বিশ্বাস। প্রতিটা মুহূর্তে — "তুমি আমার, আমি তোমার।"
সিনথিয়া: "আরো কাছে আয়।"
অর্ণব তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তাদের শরীরের মধ্যে কোনো ফাঁক রইল না। হৃদস্পন্দন এক তালে — ধক ধক, ধক ধক।
সিনথিয়ার শরীরে একটা ঢেউ উঠল — নরম, গভীর, পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া। এটা সেই তীব্র, বুনো শিখর না — এটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, ধীরে এসে পুরোটা ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। সে অর্ণবের কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল —
সিনথিয়া: "ভালোবাসি... ভালোবাসি... ভালোবাসি..."
অর্ণব: "আমিও তোকে ভালোবাসি। শুধু তোকেই। আর কাউকে না। কোনোদিন না।"
সেই "আর কাউকে না" শুনে সিনথিয়ার বুকটা আবার চিনচিন করল — কিন্তু সে সেটা ঠেলে দিল দূরে। আজ না। আজ শুধু ভালোবাসা।
তারপর শান্তি। গভীর, নরম শান্তি। তারা একে অপরের বাহুতে শুয়ে রইল — ঘামে ভেজা, শ্বাস ভারী, কিন্তু মুখে হাসি। জানালা দিয়ে তারার আলো এসে পড়েছে বিছানায়।
অর্ণব তার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল — ধীরে, বারবার।
অর্ণব: "তুই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।"
সিনথিয়া: "তুইও। আমার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।"
অর্ণব: "নিরাপদ?"
সিনথিয়া: "তোর বুকে মাথা রাখলে মনে হয় পৃথিবীর কোনো খারাপ কিছু আমাকে ছুঁতে পারবে না।"
অর্ণব তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
অর্ণব: "পারবে না। আমি থাকতে না।"
তারা শুয়ে রইল — জানালা দিয়ে তারার আলো এসে পড়েছে বিছানায়, তাদের গায়ে।
সিনথিয়া: "অর্ণব?"
অর্ণব: "হুম?"
সিনথিয়া: "তুই কখনো ভেবেছিস — পাঁচ বছর পর আমরা কোথায় থাকব?"
অর্ণব একটু ভাবল।
অর্ণব: "আমি পাস করে চাকরি করব। তুই ভার্সিটি শেষ করবি। তারপর..."
সিনথিয়া: "তারপর?"
অর্ণব: "তারপর তোকে বিয়ে করব।"
সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। বিয়ে। এই শব্দটা তার গোপন জীবনে কখনো আসেনি — সেখানে শুধু শরীর ছিল, মুহূর্ত ছিল। কিন্তু এখানে — ভবিষ্যৎ।
সিনথিয়া: "তুই সিরিয়াস?"
অর্ণব: "পুরো সিরিয়াস। তুই ছাড়া আমি কাউকে ভাবতে পারি না।"
সিনথিয়া তার বুকে মুখ গুঁজল। চোখে পানি — আবার।
সিনথিয়া: "আমিও। তোকে ছাড়া আমিও কাউকে ভাবতে পারি না।"
এটা সত্যি ছিল। তার গোপন জীবনের সব পুরুষ — তারা শরীর ছিল, উত্তেজনা ছিল। কিন্তু ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যৎ শুধু একজনের সাথে — অর্ণবের সাথে।
অর্ণব তার মাথায় চুমু খেল।
অর্ণব: "ঘুমিয়ে পড়ছিস?"
সিনথিয়া: "না। শুধু... এই মুহূর্তটা ধরে রাখতে চাই।"
অর্ণব: "ধরে রাখ। আমি আছি।"
তারা শুয়ে রইল — অনেকক্ষণ। কথা কম। অর্ণব তার পিঠে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে। সিনথিয়া তার বুকের লোমে আঙুল ডুবিয়ে খেলছে।
সিনথিয়া: "তোর পরীক্ষা কবে থেকে?"
অর্ণব: "সামনের মাসে। তুই আমার নোটগুলো দেখে দিবি?"
সিনথিয়া: "দেব। তবে ফি লাগবে।"
অর্ণব: "কী ফি?"
সিনথিয়া: "প্রতিদিন একটা করে চুমু।"
অর্ণব: "ডিল।"
সে তার ঠোঁটে চুমু খেল — মিষ্টি, ছোট। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা। সিনথিয়া হাসতে হাসতে তাকে ঠেলে দিল।
সিনথিয়া: "থাম! সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। মা বলেছে সন্ধ্যার আগে ফিরতে।"
অর্ণব: "আরেকটু থাক।"
সিনথিয়া: "না। প্রথম দিনই দেরি করলে মা আর বেরোতে দেবে না।"
তারা উঠল। কাপড় পরল। অর্ণব তার চুল ঠিক করে দিল — আঙুল দিয়ে আঁচড়ে। সিনথিয়া তার শার্টের কলার ঠিক করে দিল।
আয়নায় দুজনকে দেখা গেল — পাশাপাশি। সিনথিয়া মনে মনে ভাবল — এই তো স্বাভাবিক জীবন। এই তো আসল। বাকি সব — স্বপ্নের মতো, অন্ধকারের মতো — সেটা অন্য কারো জীবন।
অর্ণব: "চল, তোকে বাসায় পৌঁছে দিই।"
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অর্ণব তার হাত ধরল — আঙুলে আঙুল জড়িয়ে। বাতাসে রাতের গন্ধ। দোকানগুলো বন্ধ হচ্ছে একটা একটা করে। রিকশার টুংটাং, দূরে কোথাও গানের সুর — সিনথিয়া সেদিকে কান দিল না।
তারা হাঁটল ধীরে — যেন পথটা শেষ না হয়।
অর্ণব: "আজকের দিনটা মনে থাকবে।"
সিনথিয়া: "আমারও।"
অর্ণব: "তিন মাস পর তোকে এভাবে পেয়ে... মনে হচ্ছে হারানো জিনিস ফিরে পেলাম।"
সিনথিয়া: "আমি হারাইনি। শুধু... দূরে ছিলাম।"
অর্ণব: "আর যাস না দূরে।"
সিনথিয়া: "যাব না।"
বাসার গেটের সামনে তারা দাঁড়াল। গেটের বাতিটা জ্বলছে। ভেতরে মায়ের ঘরে আলো।
অর্ণব তার কপালে চুমু খেল। তারপর ঠোঁটে — লম্বা, মিষ্টি, বিদায়ের।
অর্ণব: "রেজাল্টের দিন কলেজে যাবি তো?"
সিনথিয়া: "যাব। তুই যাবি?"
অর্ণব: "অবশ্যই। তোর রেজাল্ট আমি নিজে দেখতে চাই। সবার আগে।"
সিনথিয়া হাসল।
সিনথিয়া: "ভালো রেজাল্ট হলে কী দিবি?"
অর্ণব: "যা চাস।"
সিনথিয়া: "মনে রাখিস। কথা দিলি।"
অর্ণব: "দিলাম।"
আরেকটা চুমু — ছোট, মিষ্টি। তারপর সিনথিয়া গেটের ভেতরে ঢুকল। পেছন ফিরে দেখল — অর্ণব এখনো দাঁড়িয়ে, হাত নাড়ছে। বাতির আলোয় তার মুখটা উজ্জ্বল।
সে হাত নাড়ল। তারপর ভেতরে ঢুকে গেল।
গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে সে শুনল অর্ণবের পায়ের শব্দ — ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল — এখনো গরম, এখনো তার ছোঁয়া লেগে আছে।
উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতে উঠতে সে ভাবল — আজকের দিনে কোনো মিথ্যে ছিল না। কোনো ছদ্মবেশ না। শুধু সিনথিয়া আর অর্ণব। যেমনটা হওয়ার কথা ছিল সবসময়।
মা ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন।
মা: "কেমন কাটল?"
সিনথিয়া: "ভালো। খুব ভালো।"
মা: "মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যা, হাতমুখ ধুয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি।"
খেতে বসে মা ডালের বাটি এগিয়ে দিলেন।
মা: "অর্ণব কেমন আছে?"
সিনথিয়া: "ভালো। তোমাকে সালাম দিয়েছে।"
মা: "ছেলেটা ভালো। তোর বাবা অফিস থেকে ফিরলে বলিস — কাল ছুটি, সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসব।"
সিনথিয়া: "বলব।"
সিনথিয়া মায়ের হাতটা ধরল টেবিলের ওপর।
সিনথিয়া: "তুমি খুশি তো?"
মা: "তুই খুশি থাকলেই আমি খুশি।"
খাওয়া শেষে সিনথিয়া নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাতের ব্রেসলেটটা দেখল — বাতির আলোয় ঝিলমিল করছে। ঠোঁটে এখনো অর্ণবের চুম্বনের স্বাদ। গায়ে এখনো তার গন্ধ।
আজকের দিনটা সত্যি ছিল। পরিষ্কার ছিল। ভালোবাসার ছিল। তিন মাসের খাঁচার পর — মুক্তির প্রথম দিন, ভালোবাসার দিন।
সে ফোনটা হাতে নিল। নাবিলাকে মেসেজ করল —
সিনথিয়া: "ডেট শেষ। সব পরে বলব।"
নাবিলা সাথে সাথে রিপ্লাই দিল —
নাবিলা: "সব মানে সব!"
সিনথিয়া হাসল। তারপর মেসেজ লিস্ট স্ক্রল করতে করতে একটা পুরনো মেসেজে চোখ আটকে গেল।
অচেনা নম্বর। কয়েক সপ্তাহ আগের।
"যখন ডাকব, আসবে।"
প্রিন্সিপাল। রেজা চৌধুরী।
তিন মাসে তিনি আর ডাকেননি — হয়তো পরীক্ষা, হয়তো ব্যস্ততা। সিনথিয়া প্রায় ভুলেই গেছিল। প্রায়।
কিন্তু মেসেজটা সে ডিলিট করেনি। কেন করেনি — সে নিজেও জানে না। হয়তো ভয়ে। হয়তো... অন্য কিছুতে।
সে ফোনটা বুকের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করল।
রেজাল্টের দিন আসছে — কয়েকদিন পর। অর্ণব যাবে। সেও যাবে।
আর সে জানে না — সেই দিন তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। খাঁচা খুলেছে — কিন্তু কিছু দরজা এখনো বন্ধ। কিছু ডাক এখনো বাকি।
ব্রেসলেটটা হাতে নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল — ঠোঁটে হাসি নিয়ে, মনে শান্তি নিয়ে। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখল — সমুদ্র। নীল পানি, সাদা বালি। আর অর্ণব তার পাশে হাঁটছে, হাত ধরে। সূর্য উঠছে দিগন্তে — নতুন দিনের, নতুন জীবনের সূর্য।
(চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)