28-09-2026, 08:03 PM
«বন্দি»
এইচএসসি শেষ হওয়ার পরের দিনগুলো সিনথিয়ার জীবনে নেমে এলো অদ্ভুত এক শূন্যতা নিয়ে। পরীক্ষার টেনশন নেই, রেজাল্টের অপেক্ষা — মাঝখানে ঝুলে থাকা সময়। সে ভেবেছিল এই ফাঁকে একটু শ্বাস নেবে, নাবিলার সাথে দেখা করবে, ফাহিমের সেই "আবার কবে?"-এর উত্তর দেবে। কিন্তু মায়ের পরিকল্পনা ছিল অন্য।
তৃতীয় দিন সকালে মা ড্রয়িংরুমে বসিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন।
মা: "ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। এডমিশন কোচিং।"
সিনথিয়া: "কোথায়?"
মা: "কোথাও যেতে হবে না। স্যার বাসায় এসে পড়াবেন। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ — তিনটে সাবজেক্ট, তিনজন স্যার।"
সিনথিয়া: "আর বাইরে?"
মা: "বাইরে যাওয়ার দরকার কী? এই ক'মাস শুধু পড়া।"
সিনথিয়া: "ফোন?"
মা হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোনো রাগ নয়, কোনো চিৎকার নয় — শান্ত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতো।
মা: "দাও। রেজাল্টের পর ফেরত পাবে।"
সিনথিয়া ফোনটা দিল। দিতে দিতে আঙুল কাঁপছিল — রাগে, না ভয়ে, সে নিজেও বুঝল না। মা ফোনটা নিয়ে নিজের আলমারিতে তুলে রাখলেন, চাবি ঘুরিয়ে দিলেন। সেই চাবির শব্দটা সিনথিয়ার বুকে বাজল তালা পড়ার মতো।
সিনথিয়া: "এটা অন্যায়!"
মা: "অন্যায়?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ, অন্যায়! আমার ফোন, আমার জীবন — আপনি কেড়ে নিতে পারেন না!"
মা এবার তাকালেন — শান্ত চোখে, কিন্তু ভেতরে ইস্পাত।
মা: "তোমার জীবন? তোমার জীবন এখন বইয়ের ভেতর। বাইরের পৃথিবীটা পালিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু এডমিশনের সময়টা গেলে আর ফিরবে না।"
সিনথিয়া: "আপনি বুঝবেন না!"
মা: "আমি সব বুঝি। তুমিই বোঝো না — আমি তোমার শত্রু নই।"
সিনথিয়া আর কথা বাড়াল না। ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজার ওপাশে মায়ের পায়ের শব্দ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর সরে গেল।
ঘরে ফিরে সে বিছানায় বসে রইল অনেকক্ষণ। টেবিলের ওপর ফোনের খালি জায়গাটা তাকিয়ে ছিল তার দিকে — একটা শূন্য আয়তক্ষেত্র, ধুলোর দাগে ঘেরা। ওই জায়গাটায় গত কয়েক মাসে তার পুরো গোপন জীবনটা বাস করত। ফাহিমের মেসেজ — "পরশু দেখা হচ্ছে তো?" — উত্তর না পেয়ে সে এখন কী ভাবছে? হয়তো ভাবছে সিনথিয়া ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে। নাবিলা — ওর সাথে শেষ কথা হয়েছিল ছাদ পার্টির পরদিন সকালে। এখন? কিছু বলার উপায় নেই। রাহাত, সাকিব — ওদের নম্বরও ফোনের ভেতর বন্দি।
সিনথিয়া: "এটা জেল।"
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলল। আয়নার মেয়েটা তাকিয়ে রইল — চোখে রাগ, ঠোঁটে জেদ।
সিনথিয়া: "দেখি কতদিন আটকে রাখতে পারো।"
প্রথম সপ্তাহটা কাটল নিঃশব্দ বিদ্রোহে। প্রতিদিন সকালে সে আলমারিটার সামনে দিয়ে যেত — চাবিটা মায়ের আঁচলে বাঁধা, ঝনঝন শব্দ করে। একদিন মা গোসলখানায় ঢুকতেই সিনথিয়া আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল — হাত বাড়িয়েও থেমে গেল। চাবি ছাড়া কিছু করার নেই। আর চাবি চুরি করা — সেটা অন্য লেভেলের যুদ্ধ, যার জন্য সে এখনো প্রস্তুত নয়।
এক সন্ধ্যায় মা'র ফোনটা টেবিলে পড়ে ছিল। সিনথিয়ার আঙুল নিশপিশ করল — নাবিলার নম্বরটা তার মুখস্থ। একটা কল, শুধু একটা — "আমি ঠিক আছি" বলা। কিন্তু মা তখনই ঘরে ঢুকলেন, ফোনটা তুলে নিলেন। সুযোগটা হাতছাড়া হলো।
রাতে বিছানায় শুয়ে সে মনে মনে মেসেজ লিখত — ফাহিমকে: "আমি হারিয়ে যাইনি। আমাকে আটকে রেখেছে। পরশুটা মরে গেছে, কিন্তু আমি মরিনি।" নাবিলাকে: "তোর খুব মনে পড়ছে।" কাউকে পাঠানো হতো না। শব্দগুলো মাথার ভেতরেই জমা হতো, ভারী হতো, তারপর ঘুমের অতলে ডুবে যেত।
মা যা বললেন, সে করল — কিন্তু মুখে একটা কথাও বেশি বলল না। খাবার টেবিলে চুপ, ঘরে দরজা বন্ধ। মা বুঝলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। মায়েরা অনেক কিছু বোঝেন, বলার প্রয়োজন মনে করেন না।
তারপর এলো সেই বিকেল। দরজায় বেল বাজল — তিনটে, ধীরে ধীরে। মা দরজা খুললেন। সিনথিয়া নিজের ঘর থেকে শুনল অপরিচিত এক পুরুষকণ্ঠ — নিচু, শান্ত, ভদ্র।
আসিফ: "আমি আসিফ। ফিজিক্সের জন্য এসেছি।"
মা: "ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসুন, ভেতরে আসুন।"
সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল। লম্বা, ছিপছিপে এক যুবক — ত্রিশের কাছাকাছি বয়স হবে। চোখে চশমা, হাতে একটা পুরনো ব্যাগ, যার ভেতর থেকে বইয়ের কোণা বেরিয়ে আছে। চেহারায় কোনো চাকচিক্য নেই, কিন্তু চোখদুটো — চোখদুটো যেন সব দেখে ফেলে।
মা: "সিনথিয়া! স্যার এসেছেন!"
পড়ার ঘরটা ছোট — একটা টেবিল, দুটো চেয়ার, দেয়ালে তাকভর্তি বই। সিনথিয়া ঢুকল মুখ গোঁজ করে, বইটা টেবিলে ছুঁড়ে দিল প্রায়। আসিফ তাকালেন, হাসলেন হালকা।
আসিফ: "বসো।"
সিনথিয়া বসল — চেয়ারের কিনারায়, যেন যেকোনো মুহূর্তে উঠে যাবে।
আসিফ: "নাম তো জানি। আমি আসিফ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে মাস্টার্স। এখন একটা কোচিং সেন্টারে পড়াই, আর বাসায় বাসায় টিউশন করি।"
সিনথিয়া: "হুম।"
আসিফ: "ফিজিক্স কেমন লাগে?"
সিনথিয়া: "ভালো না।"
আসিফ হাসলেন — রাগলেন না, অবাকও হলেন না।
আসিফ: "সৎ উত্তর। ভালো। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী মিথ্যে বলে — 'ভালো লাগে স্যার'। তুমি অন্তত মিথ্যে বললে না।"
সিনথিয়া তার দিকে তাকাল — প্রথমবার, সোজা।
সিনথিয়া: "আমাকে পড়াতে এসেছেন, বন্ধু হতে নয়।"
আসিফ: "ঠিক। তাহলে পড়াই শুরু করি।"
প্রথম সেশনটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। আসিফ বোঝালেন — ভেক্টর, স্কেলার — আর সিনথিয়া ইচ্ছে করে বোকার ভান করল। একই প্রশ্ন তিনবার করল, ভুল উত্তর দিল জেনেশুনে। এটা ছিল তার প্রতিবাদ — তুমি আমার জেলের অংশ, তোমাকে আমি সহজ হতে দেব না।
কিন্তু আসিফ ধৈর্য হারালেন না। তৃতীয়বারও একই শান্ত গলায় বোঝালেন, যেন প্রথমবার।
আসিফ: "দেখো, ভেক্টরের দিকটা এভাবে ভাবো —"
সিনথিয়া: "বুঝিনি।"
আসিফ: "আচ্ছা, আরেকভাবে বলি।"
চতুর্থবারে সিনথিয়া নিজেই বিরক্ত হয়ে সঠিক উত্তরটা বলে ফেলল — আর সাথে সাথে বুঝল ফাঁদে পড়েছে। আসিফের ঠোঁটে হালকা হাসি।
আসিফ: "বুঝতে তো পারো। শুধু বুঝতে চাও না।"
সিনথিয়া: "আপনি জানেন না আমি কী চাই।"
আসিফ: "জানি না। কিন্তু অনুমান করতে পারি — এই ঘর, এই টেবিল, এই বই — এগুলোর কোনোটাই তুমি চাওনি। তাই তো?"
সিনথিয়া চুপ করে রইল। এই লোকটা — এই অপরিচিত লোকটা — এক ঘণ্টায় যা বুঝল, মা এক সপ্তাহে বোঝেননি। না, মা বুঝেছেন হয়তো। শুধু পাত্তা দেননি।
সেদিন যাওয়ার সময় আসিফ দরজার কাছে থেমে বললেন —
আসিফ: "পরশু আবার আসব। বইটা পড়ে রেখো। না পড়লেও ক্ষতি নেই — আমি আবার বোঝাব।"
সিনথিয়া: "আপনার ধৈর্য দেখে অবাক হচ্ছি।"
আসিফ: "ধৈর্য নয়। আমি জানি খাঁচার পাখি প্রথমে খাঁচার দরজায় ঠোকরায়, মানুষের হাতে নয়।"
তিনি চলে গেলেন। সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল — বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি। রাগ? না, অন্য কিছু। কেউ তাকে বুঝল — এই অনুভূতিটা তার কাছে নতুন ছিল না, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে, এই লোকটার কাছ থেকে — এটা বিপজ্জনক ছিল।
দ্বিতীয় সেশনে সে আরও কঠিন হলো। প্রশ্নের উত্তর দিল এক শব্দে।
আসিফ: "নিউটনের তৃতীয় সূত্রটা বলো তো।"
সিনথিয়া: "জানি না।"
আসিফ: "প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। মনে রেখো — এটা শুধু ফিজিক্সের সূত্র নয়।"
সিনথিয়া: "মানে?"
আসিফ: "মানে — তুমি যত জোরে দেয়ালে ধাক্কা দেবে, দেয়াল তত জোরে তোমাকেই ফিরিয়ে দেবে। কখনো কখনো হাল ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।"
সিনথিয়া: "আপনি দার্শনিকও?"
আসিফ: "না। শুধু অনেক ছাত্র পড়িয়েছি। তোমার মতো রাগী মেয়ে কম দেখিনি।"
সিনথিয়া: "আমি রাগী নই।"
আসিফ: "তাহলে কী?"
সিনথিয়া: "...বন্দি।"
শব্দটা বেরিয়ে গেল নিজের অজান্তে। আসিফ তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বইটা বন্ধ করলেন।
আসিফ: "আজ আর পড়া নয়।"
সিনথিয়া: "মা জানলে—"
আসিফ: "মা জানবেন তুমি পড়েছ। পনেরো মিনিট গল্প করি। বলো — বন্দি লাগছে কেন?"
আর সিনথিয়া — আশ্চর্যের ব্যাপার — বলতে শুরু করল। ফোনের কথা বলল না, ফাহিমের কথা বলল না, নাবিলার কথা বলল না। বলল শুধু — বাইরে যেতে পারে না, বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না, নিজের জীবনটা অন্যের হাতে। আসিফ শুনলেন — মাঝে মাঝে মাথা নাড়লেন, একবারও উপদেশ দিলেন না।
আসিফ: "কঠিন।"
সিনথিয়া: "শুধু এইটুকু?"
আসিফ: "এর বেশি বলার অধিকার আমার নেই। আমি তোমার স্যার, থেরাপিস্ট নই।"
সিনথিয়া হেসে ফেলল — নিজের অজান্তে, প্রথমবার। হাসিটা বেরিয়েই সে মুখ গম্ভীর করে ফেলল, যেন হাসিটা বিশ্বাসঘাতকতা।
সিনথিয়া: "হাসিনি।"
আসিফ: "হেসেছ। আমি দেখেছি।"
সিনথিয়া: "দেখেননি।"
আসিফ: "আচ্ছা, দেখিনি।"
তৃতীয় সেশনে একটা ঘটনা ঘটল। আসিফ একটা ডায়াগ্রাম বোঝাচ্ছিলেন, কলমটা সিনথিয়ার হাতের ওপর দিয়ে গেল — আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। সিনথিয়া হাতটা টেনে নিল যেন পুড়ে গেছে।
সিনথিয়া: "সরি।"
আসিফ: "আমার সরি বলা উচিত।"
কিন্তু তার চোখে কোনো দুঃখ ছিল না। ছিল অন্য কিছু — সতর্ক, মাপা, ধৈর্যশীল। সিনথিয়া বুঝল — এই লোকটা তাড়াহুড়ো করে না। শিকারির মতো নয়, জেলের মতো নয় — অন্যরকম। যেন সে জানে, অপেক্ষা করলেই ফল পাওয়া যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভয় পাইয়ে দিল। আর ভয়ের সাথে সাথে — উত্তেজিতও করল।
চতুর্থ সেশনে সিনথিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল — বাইরে গলির মোড়ে কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে, হাসির শব্দ ভেসে আসছে। আসিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, তারপর বললেন —
আসিফ: "বাইরে তাকিয়ে কী দেখো?"
সিনথিয়া: "স্বাধীনতা।"
আসিফ: "হুম। জানো, প্রজেক্টাইল মোশনে একটা বল যখন ছোঁড়া হয়, তখন সেটা কিছুক্ষণ মুক্ত থাকে — তারপর মাধ্যাকর্ষণ টেনে নামায়।"
সিনথিয়া: "আপনি সবকিছুতেই ফিজিক্স ঢোকান?"
আসিফ: "ফিজিক্স সব জায়গায় আছে। তোমার এই তাকানোটার মধ্যেও — চোখের আলো, দূরত্ব, আকাঙ্ক্ষার ভেক্টর।"
সিনথিয়া প্রায় হেসে ফেলল — এবার আর পুরোপুরি আটকাতে পারল না। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, আর সে তাড়াতাড়ি বইয়ের দিকে তাকাল।
সিনথিয়া: "পড়ান।"
আসিফ: "পড়াচ্ছি তো। তুমিই শুনছ না।"
সিনথিয়া: "শুনছি।"
সেদিন আসিফ যাওয়ার সময় সিনথিয়ার নোটবুকটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টালেন, যেন কিছু খুঁজছেন। তারপর নোটবুকটা ফিরিয়ে দিলেন।
আসিফ: "নোটগুলো গুছিয়ে লিখেছ। ভালো।"
তিনি চলে যাওয়ার পর সিনথিয়া নোটবুক খুলল — আর ভেতরে পেল একটা ভাঁজ করা চিরকুট। কাঁপা হাতে খুলল।
"যখন দম বন্ধ লাগবে — 01XXXXXXXXX"
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে দরজার দিকে তাকাল — বন্ধ। জানালার দিকে — মা রান্নাঘরে। সে নম্বরটা তিনবার পড়ল, মুখস্থ করল, তারপর চিরকুটটা নিয়ে বাথরুমে গেল। ম্যাচবাক্সটা ছিল বেসিনের পাশে। কাগজটা পুড়িয়ে ছাইটা কমোডে ফেলে দিল।
আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ জ্বলজ্বল।
সিনথিয়া: "এটা ভুল।"
কিন্তু মুখস্থ নম্বরটা মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
পরের সেশনে আসিফ এলেন একটা মোটা ফিজিক্স গাইড নিয়ে।
আসিফ: "এটা রাখো। ভেতরে কিছু দাগানো আছে — পরীক্ষায় আসার মতো।"
সিনথিয়া গাইডটা নিল। ভারী। আসিফ চোখ টিপলেন — এত সূক্ষ্ম যে মা দেখলেও বুঝতেন না। মা তখন চা নিয়ে ঢুকছিলেন।
মা: "চা খান স্যার।"
আসিফ: "ধন্যবাদ।"
মা চলে যাওয়ার পর সিনথিয়া গাইডটা খুলল। মাঝখানের পাতাগুলো কাটা — ফাঁপা। ভেতরে একটা ছোট বাটন ফোন, আর একটা চার্জার। একটা ছোট চিরকুট — "চার্জার বইয়ের ভেতর। রাতে। সাবধানে।"
সিনথিয়ার হাত কাঁপছিল। সে গাইডটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। আসিফ তখন বোর্ডে সূত্র লিখছেন, পেছন ফিরে।
সিনথিয়া: "স্যার।"
আসিফ: "হুম?"
সিনথিয়া: "...কিছু না।"
আসিফ: "ভালো। কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো।"
সেই রাতে — মা ঘুমিয়ে পড়ার পর, রাত বারোটায় — সিনথিয়া কম্বলের নিচে ফোনটা বের করল। বাটন ফোন, ছোট স্ক্রিন। সে নম্বরটা টিপল — মুখস্থ নম্বর, আঙুল নিজেই চলে গেল। দুটো রিং। তারপর —
আসিফ: "হ্যালো?"
কণ্ঠটা ফিসফিসে, নিচু। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।
সিনথিয়া: "আমি... সিনথিয়া।"
আসিফ: "জানি। দম বন্ধ লাগছিল?"
সিনথিয়া: "হুম।"
আসিফ: "তাহলে শ্বাস নাও। আমি শুনছি।"
আর সিনথিয়া বলতে শুরু করল — ফিসফিস করে, কম্বলের নিচে, অন্ধকারে। বলল খাঁচার কথা, মায়ের কথা, বাইরের পৃথিবীটার কথা যেটা এখন অধরা। ফাহিমের কথা বলল না। নাবিলার কথা বলল না। ওই গোপন জীবনটা — ওটা শুধু তার। কিন্তু খাঁচার কষ্টটা বলল, আর আসিফ শুনলেন।
আসিফ: "আমি হোস্টেলে থাকতাম। চার বছর। প্রথম এক বছর মনে হতো দেয়ালগুলো এগিয়ে আসছে।"
সিনথিয়া: "তারপর?"
আসিফ: "তারপর শিখলাম — দেয়ালের ভেতরেও জানালা বানানো যায়।"
সিনথিয়া: "কীভাবে?"
আসিফ: "এই যেমন — এখন। এই ফোনটা। এই কথা। এটাই জানালা।"
সিনথিয়া চুপ করে রইল। কম্বলের নিচে অন্ধকারে তার চোখ ভিজে উঠল — কেন, সে জানে না।
তৃতীয় রাতে সে জিজ্ঞেস করল —
সিনথিয়া: "যে চলে গেছিল... সে কে ছিল?"
আসিফ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর —
আসিফ: "ইউনিভার্সিটির জুনিয়র। দুই বছর ছিলাম একসাথে। তারপর ওর বাবা-মা বিয়ে ঠিক করল — প্রতিষ্ঠিত ছেলের সাথে। আমি তখন টিউশন করে চলতাম।"
সিনথিয়া: "খারাপ লেগেছিল?"
আসিফ: "তখন লেগেছিল। এখন মনে হয় — ভালোই হয়েছে। যে থাকার নয়, সে চলে যাওয়াই ভালো।"
সিনথিয়া: "আপনি কাউকে দোষ দেন না?"
আসিফ: "দোষ দিয়ে কী হবে? জীবন থেমে থাকে না।"
চতুর্থ রাতে আসিফ জিজ্ঞেস করলেন —
আসিফ: "তুমি কী চাও, সত্যি করে বলো তো?"
সিনথিয়া: "জানি না। শুধু... এই খাঁচা থেকে বেরোতে চাই। নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।"
আসিফ: "একদিন বেরোবে। ততদিন আমি আছি।"
"আছি" — এই ছোট্ট শব্দটা সিনথিয়ার বুকে রয়ে গেল অনেকক্ষণ। ফোন কাটার পরও, ঘুমের মধ্যেও। কেউ তার পাশে "আছে" — এই অনুভূতিটা তার কাছে বহুদিনের অচেনা ছিল।
পঞ্চম রাতে কথা আর শুধু কথা রইল না। আসিফের গলা নিচু হলো, ঘন হলো।
আসিফ: "আজ তুমি ক্লাসে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে।"
সিনথিয়া: "তাকাইনি।"
আসিফ: "তাকিয়েছিলে। আমি গুনেছি — সাতবার।"
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল অন্ধকারে।
সিনথিয়া: "আপনি গুনেন?"
আসিফ: "তোমার সবকিছুই গুনি।" একটু থেমে — "বাকিটা সামনাসামনি। ফোনে নয়।"
সিনথিয়া: "বাকিটা মানে?"
আসিফ: "ঘুমাও। কাল দেখা হবে।"
সিনথিয়া: "আপনি অদ্ভুত।"
আসিফ: "তুমিও। ঘুমাও এখন। কাল পড়া আছে।"
সিনথিয়া: "কাল আসবেন তো?"
আসিফ: "আসব।"
ফোন কাটার পর সিনথিয়া অনেকক্ষণ শুয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হালকা লাগছিল — যেন জানালা দিয়ে সত্যিই হাওয়া ঢুকছে।
এরপরের দিনগুলো বদলে গেল। টিউশন সেশনগুলো আর যুদ্ধক্ষেত্র রইল না — হলো অন্য কিছু। আসিফ পড়াতেন, সিনথিয়া শুনত — কিন্তু দুজনের মাঝে বাতাস ভারী হয়ে থাকত অব্যক্ত কিছুতে।
একদিন আসিফ একটা অঙ্ক বোঝাচ্ছিলেন — কলমটা সিনথিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলেন, তার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে।
আসিফ: "এভাবে — ধীরে —"
এবার সিনথিয়া হাত সরাল না। হাতটা রেখে দিল — তার হাতের নিচে, উষ্ণ। আসিফের আঙুল থেমে গেল এক মুহূর্ত, তারপর স্বাভাবিকভাবে সরে গেল। কিন্তু দুজনেই জানল — কিছু বদলেছে।
সিনথিয়া ইচ্ছে করে "ডাউট" বানাতে শুরু করল — যেসব জায়গা সে ভালোই বোঝে, সেখানেও প্রশ্ন করত, যাতে আসিফ ঝুঁকে আসেন, কাছে আসেন। পাশের ঘরে মা রান্না করছেন — কড়াইয়ের শব্দ, মসলার গন্ধ — আর এই ঘরে দুজন মানুষের নিঃশ্বাস একটু একটু করে কাছাকাছি। এই বিপদের উত্তেজনাটা সিনথিয়ার শিরায় শিরায় বাজত।
একদিন টেবিলের নিচে আসিফের হাত তার হাঁটুতে রাখলেন — হঠাৎ, কোনো ভূমিকা ছাড়াই। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মায়ের গলা —
মা: "সিনথিয়া! চা টা নিয়ে যা তো!"
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল, কিন্তু সে স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল —
সিনথিয়া: "আসছি, মা!"
আসিফের বুড়ো আঙুল তার হাঁটুতে একবার চাপ দিল — ধীরে — তারপর হাত সরিয়ে নিলেন, যেন কিছুই হয়নি। সিনথিয়া উঠে চা আনতে গেল — পা টলছিল। রান্নাঘরে মা জিজ্ঞেস করলেন মুখ লাল কেন — সে বলল গরম লাগছে। মা বিশ্বাস করলেন। ফিরে এসে দেখল আসিফ বইয়ের দিকে তাকিয়ে — কিন্তু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হালকা হাসি।
সিনথিয়া: "আপনি..."
আসিফ: "আমি কী?"
সিনথিয়া: "কিছু না। পড়ান।"
এক সন্ধ্যায় মা পাশের বাসায় গেলেন — প্রতিবেশীর মেয়ে অসুস্থ, দেখতে। বলে গেলেন আধঘণ্টায় ফিরবেন। আসিফ তখনো ছিলেন — সেশন শেষের দিকে।
বাইরে তখন বৃষ্টি নামল — হঠাৎ, জোরে। জানালার কাচে পানির ধারা। আসিফ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আসিফ: "বৃষ্টি।"
সিনথিয়া: "ভিজতে ইচ্ছে করছে।"
আসিফ: "আমারও করত। হোস্টেলে থাকতে ছাদে উঠে ভিজতাম।"
সিনথিয়া: "একা?"
আসিফ: "বেশিরভাগ সময় একা। একবার একজন ছিল —" তিনি থামলেন। "চলে গেছে।"
সিনথিয়া: "কেন?"
আসিফ: "আমি তখন কিছুই ছিলাম না। শুধু স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন দিয়ে সংসার চলে না — ও বলত।"
সিনথিয়া: "এখন?"
আসিফ: "এখন স্বপ্নও নেই, সংসারও নেই। শুধু পড়ানো।" তিনি হাসলেন — হালকা, বিষণ্ণ। "তোমার মতো রাগী মেয়েদের ফিজিক্স বোঝানো।"
সিনথিয়া: "আমি আর রাগী নই।"
আসিফ: "জানি।"
তারা বসে রইল — টেবিলের দুপাশে, বৃষ্টির শব্দে ঘেরা। তারপর আসিফ উঠে জানালার কাছে গেলেন। সিনথিয়াও গেল — নিজের অজান্তে। জানালার কাচে দুজনের প্রতিবিম্ব — কাছাকাছি, প্রায় ছুঁয়ে।
আসিফ ধীরে ঘুরলেন। তার কপাল সিনথিয়ার কপালে ঠেকল — হালকা, প্রশ্নের মতো। সিনথিয়া সরে গেল না। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড — তারপর তার ঠোঁট নেমে এলো।
চুমুটা ছিল ধীর। কোনো তাড়া নেই, কোনো দাবি নেই — শুধু উষ্ণতা। সিনথিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল প্রথমে, তারপর সাড়া দিল। তার হাত উঠে গেল আসিফের গালে — নিজের অজান্তে। বৃষ্টি পড়ছিল কাচে, আর এই ঘরে সময় থেমে ছিল।
যখন তারা আলাদা হলো, দুজনের নিঃশ্বাস ভারী।
সিনথিয়া: "এটা... ঠিক নয়।"
আসিফ: "জানি।"
সিনথিয়া: "তাহলে কেন?"
আসিফ: "কারণ মিথ্যে বলতে পারছি না। তোমাকে ভালো লাগে — এটা সত্যি। প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না — এটাও সত্যি।"
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল। এই সততাটা — নির্মম, পরিষ্কার — তাকে নাড়া দিল।
সিনথিয়া: "আমিও মিথ্যে বলব না। আমারও... ভালো লাগে।"
আসিফ: "তাহলে এটাই থাক। মিথ্যে নয়।"
তারা কিছুক্ষণ বসে রইল — একটু দূরে সরে, যেন চুমুটা দুজনকেই চমকে দিয়েছে। বৃষ্টির জোর কমে এলো, টিপটিপ শব্দে নামছে এখন। আসিফ ব্যাগটা কাঁধে নিলেন।
আসিফ: "আজ যাই।"
সিনথিয়া: "বৃষ্টিতে ভিজবেন।"
আসিফ: "ভেজা আমার অভ্যেস আছে।" দরজার কাছে থেমে — "আর শোনো — যা হলো, তার জন্য দুঃখিত নই। তুমি?"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — না।
তিনি বেরিয়ে গেলেন বৃষ্টির মধ্যে। সিনথিয়া জানালায় দাঁড়িয়ে দেখল — ভিজতে ভিজতে গলির মোড়ে মিলিয়ে যাচ্ছেন। তার আঙুল নিজের ঠোঁটে — এখনো উষ্ণ, এখনো কাঁপছে।
আধঘণ্টা পর মা ফিরলেন — ছাতা ঝাড়তে ঝাড়তে।
মা: "স্যার চলে গেছেন?"
সিনথিয়া: "হুম। অনেকক্ষণ আগে।"
মা খেয়াল করলেন না — মেয়ের গালের লালিমা, চোখের ঝিলমিল। মায়েরা অনেক কিছু বোঝেন, কিন্তু সবকিছু নয়।
পরদিন মা বাজারে গেলেন — বড় বাজার, ঘণ্টাখানেক লাগবে। আসিফ এলেন নির্ধারিত সময়ে। দরজা বন্ধ করে পড়ার ঘরে ঢুকতেই সিনথিয়া তার হাত ধরে টানল।
কোনো বই খোলা হলো না।
আসিফের হাত সিনথিয়ার কোমরে — কামিজের ওপর দিয়ে, তারপর ধীরে ওপরে। সিনথিয়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল যখন তার আঙুল কামিজের নিচে ঢুকল — খালি ত্বকে, পাঁজরের ওপর। সে হাঁপ ছাড়ল — জোরে, অসতর্ক।
সিনথিয়া: "আহ..."
আসিফ: "আস্তে।"
তার ঠোঁট তার গলায় — আর হাত আরও ওপরে। সিনথিয়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল — সপ্তাহের পর সপ্তাহ জমে থাকা সবকিছু একসাথে জেগে উঠছিল। তার হাত আসিফের চুলে, টেনে ধরল। আসিফের ঠোঁট এবার তার গলা বেয়ে নিচে নামল — কলারবোনে, কামিজের গলার কাছে। তার একটা হাত সিনথিয়ার কামিজের ফিতায় — আলগা করছে, ধীরে, যেন সময় নিচ্ছে। সিনথিয়ার মাথা পেছনে হেলে গেল। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ — প্রতিটা সেকেন্ড যেন চিৎকার করছে, "তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।"
সিনথিয়া: "দরজা..."
আসিফ: "বন্ধ।"
সিনথিয়া: "মা..."
আসিফ: "এক ঘণ্টা। আমাদের হাতে এক ঘণ্টা।"
তার হাত এবার তার পিঠে — খালি ত্বকে, মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে। সিনথিয়া কেঁপে উঠল — এতদিনের জমে থাকা সব ক্ষুধা একসাথে ফেটে পড়ছিল। সে আসিফের শার্টের বোতামে হাত দিল — প্রথমটা খুলল —
ঠিক তখনই — সিঁড়িতে স্যান্ডেলের শব্দ। খট্। খট্। খট্।
দুজনে ছিটকে আলাদা হলো। সিনথিয়া বইটা খুলে সামনে রাখল — উল্টো করে। আসিফ বোর্ডের দিকে ঘুরলেন — চক হাতে। দরজা খুলে মা ঢুকলেন — হাতে বাজারের ব্যাগ।
মা: "বাজার তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। পড়া কেমন চলছে?"
আসিফ: "ভালো। ভেক্টর শেষ, এখন স্কেলার।"
সিনথিয়া: "হুম।"
তার গাল লাল — মা খেয়াল করলেন না, বা করেও পাত্তা দিলেন না। মা রান্নাঘরে চলে গেলেন। সিনথিয়া আর আসিফ একে অপরের দিকে তাকাল — দুজনের বুকেই হাতুড়ি পিটছে।
সেশন শেষে দরজার কাছে আসিফ থামলেন। মা রান্নাঘরে। তিনি সিনথিয়ার দিকে ঝুঁকলেন — ফিসফিস করে, এত কাছে যে তার নিঃশ্বাস গালে লাগল।
আসিফ: "পরশু। মা বাইরে যাবে বলেছিলে না?"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — কথা বলার শক্তি ছিল না। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছিল।
আসিফ চলে গেলেন। সিনথিয়া দরজা বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার মনে একটাই শব্দ ঘুরছিল — পরশু। মা পরশু বাইরে যাবেন — বাজারে, ঘণ্টাখানেকের জন্য। ঘণ্টাখানেক মানে — সে ভাবনাটা শেষ করতে পারল না। শুধু জানত, পরশুর পর আর কিছু আগের মতো থাকবে না।
(চলবে)
এইচএসসি শেষ হওয়ার পরের দিনগুলো সিনথিয়ার জীবনে নেমে এলো অদ্ভুত এক শূন্যতা নিয়ে। পরীক্ষার টেনশন নেই, রেজাল্টের অপেক্ষা — মাঝখানে ঝুলে থাকা সময়। সে ভেবেছিল এই ফাঁকে একটু শ্বাস নেবে, নাবিলার সাথে দেখা করবে, ফাহিমের সেই "আবার কবে?"-এর উত্তর দেবে। কিন্তু মায়ের পরিকল্পনা ছিল অন্য।
তৃতীয় দিন সকালে মা ড্রয়িংরুমে বসিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন।
মা: "ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। এডমিশন কোচিং।"
সিনথিয়া: "কোথায়?"
মা: "কোথাও যেতে হবে না। স্যার বাসায় এসে পড়াবেন। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ — তিনটে সাবজেক্ট, তিনজন স্যার।"
সিনথিয়া: "আর বাইরে?"
মা: "বাইরে যাওয়ার দরকার কী? এই ক'মাস শুধু পড়া।"
সিনথিয়া: "ফোন?"
মা হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোনো রাগ নয়, কোনো চিৎকার নয় — শান্ত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতো।
মা: "দাও। রেজাল্টের পর ফেরত পাবে।"
সিনথিয়া ফোনটা দিল। দিতে দিতে আঙুল কাঁপছিল — রাগে, না ভয়ে, সে নিজেও বুঝল না। মা ফোনটা নিয়ে নিজের আলমারিতে তুলে রাখলেন, চাবি ঘুরিয়ে দিলেন। সেই চাবির শব্দটা সিনথিয়ার বুকে বাজল তালা পড়ার মতো।
সিনথিয়া: "এটা অন্যায়!"
মা: "অন্যায়?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ, অন্যায়! আমার ফোন, আমার জীবন — আপনি কেড়ে নিতে পারেন না!"
মা এবার তাকালেন — শান্ত চোখে, কিন্তু ভেতরে ইস্পাত।
মা: "তোমার জীবন? তোমার জীবন এখন বইয়ের ভেতর। বাইরের পৃথিবীটা পালিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু এডমিশনের সময়টা গেলে আর ফিরবে না।"
সিনথিয়া: "আপনি বুঝবেন না!"
মা: "আমি সব বুঝি। তুমিই বোঝো না — আমি তোমার শত্রু নই।"
সিনথিয়া আর কথা বাড়াল না। ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজার ওপাশে মায়ের পায়ের শব্দ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর সরে গেল।
ঘরে ফিরে সে বিছানায় বসে রইল অনেকক্ষণ। টেবিলের ওপর ফোনের খালি জায়গাটা তাকিয়ে ছিল তার দিকে — একটা শূন্য আয়তক্ষেত্র, ধুলোর দাগে ঘেরা। ওই জায়গাটায় গত কয়েক মাসে তার পুরো গোপন জীবনটা বাস করত। ফাহিমের মেসেজ — "পরশু দেখা হচ্ছে তো?" — উত্তর না পেয়ে সে এখন কী ভাবছে? হয়তো ভাবছে সিনথিয়া ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে। নাবিলা — ওর সাথে শেষ কথা হয়েছিল ছাদ পার্টির পরদিন সকালে। এখন? কিছু বলার উপায় নেই। রাহাত, সাকিব — ওদের নম্বরও ফোনের ভেতর বন্দি।
সিনথিয়া: "এটা জেল।"
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলল। আয়নার মেয়েটা তাকিয়ে রইল — চোখে রাগ, ঠোঁটে জেদ।
সিনথিয়া: "দেখি কতদিন আটকে রাখতে পারো।"
প্রথম সপ্তাহটা কাটল নিঃশব্দ বিদ্রোহে। প্রতিদিন সকালে সে আলমারিটার সামনে দিয়ে যেত — চাবিটা মায়ের আঁচলে বাঁধা, ঝনঝন শব্দ করে। একদিন মা গোসলখানায় ঢুকতেই সিনথিয়া আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল — হাত বাড়িয়েও থেমে গেল। চাবি ছাড়া কিছু করার নেই। আর চাবি চুরি করা — সেটা অন্য লেভেলের যুদ্ধ, যার জন্য সে এখনো প্রস্তুত নয়।
এক সন্ধ্যায় মা'র ফোনটা টেবিলে পড়ে ছিল। সিনথিয়ার আঙুল নিশপিশ করল — নাবিলার নম্বরটা তার মুখস্থ। একটা কল, শুধু একটা — "আমি ঠিক আছি" বলা। কিন্তু মা তখনই ঘরে ঢুকলেন, ফোনটা তুলে নিলেন। সুযোগটা হাতছাড়া হলো।
রাতে বিছানায় শুয়ে সে মনে মনে মেসেজ লিখত — ফাহিমকে: "আমি হারিয়ে যাইনি। আমাকে আটকে রেখেছে। পরশুটা মরে গেছে, কিন্তু আমি মরিনি।" নাবিলাকে: "তোর খুব মনে পড়ছে।" কাউকে পাঠানো হতো না। শব্দগুলো মাথার ভেতরেই জমা হতো, ভারী হতো, তারপর ঘুমের অতলে ডুবে যেত।
মা যা বললেন, সে করল — কিন্তু মুখে একটা কথাও বেশি বলল না। খাবার টেবিলে চুপ, ঘরে দরজা বন্ধ। মা বুঝলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। মায়েরা অনেক কিছু বোঝেন, বলার প্রয়োজন মনে করেন না।
তারপর এলো সেই বিকেল। দরজায় বেল বাজল — তিনটে, ধীরে ধীরে। মা দরজা খুললেন। সিনথিয়া নিজের ঘর থেকে শুনল অপরিচিত এক পুরুষকণ্ঠ — নিচু, শান্ত, ভদ্র।
আসিফ: "আমি আসিফ। ফিজিক্সের জন্য এসেছি।"
মা: "ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসুন, ভেতরে আসুন।"
সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল। লম্বা, ছিপছিপে এক যুবক — ত্রিশের কাছাকাছি বয়স হবে। চোখে চশমা, হাতে একটা পুরনো ব্যাগ, যার ভেতর থেকে বইয়ের কোণা বেরিয়ে আছে। চেহারায় কোনো চাকচিক্য নেই, কিন্তু চোখদুটো — চোখদুটো যেন সব দেখে ফেলে।
মা: "সিনথিয়া! স্যার এসেছেন!"
পড়ার ঘরটা ছোট — একটা টেবিল, দুটো চেয়ার, দেয়ালে তাকভর্তি বই। সিনথিয়া ঢুকল মুখ গোঁজ করে, বইটা টেবিলে ছুঁড়ে দিল প্রায়। আসিফ তাকালেন, হাসলেন হালকা।
আসিফ: "বসো।"
সিনথিয়া বসল — চেয়ারের কিনারায়, যেন যেকোনো মুহূর্তে উঠে যাবে।
আসিফ: "নাম তো জানি। আমি আসিফ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে মাস্টার্স। এখন একটা কোচিং সেন্টারে পড়াই, আর বাসায় বাসায় টিউশন করি।"
সিনথিয়া: "হুম।"
আসিফ: "ফিজিক্স কেমন লাগে?"
সিনথিয়া: "ভালো না।"
আসিফ হাসলেন — রাগলেন না, অবাকও হলেন না।
আসিফ: "সৎ উত্তর। ভালো। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী মিথ্যে বলে — 'ভালো লাগে স্যার'। তুমি অন্তত মিথ্যে বললে না।"
সিনথিয়া তার দিকে তাকাল — প্রথমবার, সোজা।
সিনথিয়া: "আমাকে পড়াতে এসেছেন, বন্ধু হতে নয়।"
আসিফ: "ঠিক। তাহলে পড়াই শুরু করি।"
প্রথম সেশনটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। আসিফ বোঝালেন — ভেক্টর, স্কেলার — আর সিনথিয়া ইচ্ছে করে বোকার ভান করল। একই প্রশ্ন তিনবার করল, ভুল উত্তর দিল জেনেশুনে। এটা ছিল তার প্রতিবাদ — তুমি আমার জেলের অংশ, তোমাকে আমি সহজ হতে দেব না।
কিন্তু আসিফ ধৈর্য হারালেন না। তৃতীয়বারও একই শান্ত গলায় বোঝালেন, যেন প্রথমবার।
আসিফ: "দেখো, ভেক্টরের দিকটা এভাবে ভাবো —"
সিনথিয়া: "বুঝিনি।"
আসিফ: "আচ্ছা, আরেকভাবে বলি।"
চতুর্থবারে সিনথিয়া নিজেই বিরক্ত হয়ে সঠিক উত্তরটা বলে ফেলল — আর সাথে সাথে বুঝল ফাঁদে পড়েছে। আসিফের ঠোঁটে হালকা হাসি।
আসিফ: "বুঝতে তো পারো। শুধু বুঝতে চাও না।"
সিনথিয়া: "আপনি জানেন না আমি কী চাই।"
আসিফ: "জানি না। কিন্তু অনুমান করতে পারি — এই ঘর, এই টেবিল, এই বই — এগুলোর কোনোটাই তুমি চাওনি। তাই তো?"
সিনথিয়া চুপ করে রইল। এই লোকটা — এই অপরিচিত লোকটা — এক ঘণ্টায় যা বুঝল, মা এক সপ্তাহে বোঝেননি। না, মা বুঝেছেন হয়তো। শুধু পাত্তা দেননি।
সেদিন যাওয়ার সময় আসিফ দরজার কাছে থেমে বললেন —
আসিফ: "পরশু আবার আসব। বইটা পড়ে রেখো। না পড়লেও ক্ষতি নেই — আমি আবার বোঝাব।"
সিনথিয়া: "আপনার ধৈর্য দেখে অবাক হচ্ছি।"
আসিফ: "ধৈর্য নয়। আমি জানি খাঁচার পাখি প্রথমে খাঁচার দরজায় ঠোকরায়, মানুষের হাতে নয়।"
তিনি চলে গেলেন। সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল — বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি। রাগ? না, অন্য কিছু। কেউ তাকে বুঝল — এই অনুভূতিটা তার কাছে নতুন ছিল না, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে, এই লোকটার কাছ থেকে — এটা বিপজ্জনক ছিল।
দ্বিতীয় সেশনে সে আরও কঠিন হলো। প্রশ্নের উত্তর দিল এক শব্দে।
আসিফ: "নিউটনের তৃতীয় সূত্রটা বলো তো।"
সিনথিয়া: "জানি না।"
আসিফ: "প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। মনে রেখো — এটা শুধু ফিজিক্সের সূত্র নয়।"
সিনথিয়া: "মানে?"
আসিফ: "মানে — তুমি যত জোরে দেয়ালে ধাক্কা দেবে, দেয়াল তত জোরে তোমাকেই ফিরিয়ে দেবে। কখনো কখনো হাল ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।"
সিনথিয়া: "আপনি দার্শনিকও?"
আসিফ: "না। শুধু অনেক ছাত্র পড়িয়েছি। তোমার মতো রাগী মেয়ে কম দেখিনি।"
সিনথিয়া: "আমি রাগী নই।"
আসিফ: "তাহলে কী?"
সিনথিয়া: "...বন্দি।"
শব্দটা বেরিয়ে গেল নিজের অজান্তে। আসিফ তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বইটা বন্ধ করলেন।
আসিফ: "আজ আর পড়া নয়।"
সিনথিয়া: "মা জানলে—"
আসিফ: "মা জানবেন তুমি পড়েছ। পনেরো মিনিট গল্প করি। বলো — বন্দি লাগছে কেন?"
আর সিনথিয়া — আশ্চর্যের ব্যাপার — বলতে শুরু করল। ফোনের কথা বলল না, ফাহিমের কথা বলল না, নাবিলার কথা বলল না। বলল শুধু — বাইরে যেতে পারে না, বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না, নিজের জীবনটা অন্যের হাতে। আসিফ শুনলেন — মাঝে মাঝে মাথা নাড়লেন, একবারও উপদেশ দিলেন না।
আসিফ: "কঠিন।"
সিনথিয়া: "শুধু এইটুকু?"
আসিফ: "এর বেশি বলার অধিকার আমার নেই। আমি তোমার স্যার, থেরাপিস্ট নই।"
সিনথিয়া হেসে ফেলল — নিজের অজান্তে, প্রথমবার। হাসিটা বেরিয়েই সে মুখ গম্ভীর করে ফেলল, যেন হাসিটা বিশ্বাসঘাতকতা।
সিনথিয়া: "হাসিনি।"
আসিফ: "হেসেছ। আমি দেখেছি।"
সিনথিয়া: "দেখেননি।"
আসিফ: "আচ্ছা, দেখিনি।"
তৃতীয় সেশনে একটা ঘটনা ঘটল। আসিফ একটা ডায়াগ্রাম বোঝাচ্ছিলেন, কলমটা সিনথিয়ার হাতের ওপর দিয়ে গেল — আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। সিনথিয়া হাতটা টেনে নিল যেন পুড়ে গেছে।
সিনথিয়া: "সরি।"
আসিফ: "আমার সরি বলা উচিত।"
কিন্তু তার চোখে কোনো দুঃখ ছিল না। ছিল অন্য কিছু — সতর্ক, মাপা, ধৈর্যশীল। সিনথিয়া বুঝল — এই লোকটা তাড়াহুড়ো করে না। শিকারির মতো নয়, জেলের মতো নয় — অন্যরকম। যেন সে জানে, অপেক্ষা করলেই ফল পাওয়া যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভয় পাইয়ে দিল। আর ভয়ের সাথে সাথে — উত্তেজিতও করল।
চতুর্থ সেশনে সিনথিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল — বাইরে গলির মোড়ে কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে, হাসির শব্দ ভেসে আসছে। আসিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, তারপর বললেন —
আসিফ: "বাইরে তাকিয়ে কী দেখো?"
সিনথিয়া: "স্বাধীনতা।"
আসিফ: "হুম। জানো, প্রজেক্টাইল মোশনে একটা বল যখন ছোঁড়া হয়, তখন সেটা কিছুক্ষণ মুক্ত থাকে — তারপর মাধ্যাকর্ষণ টেনে নামায়।"
সিনথিয়া: "আপনি সবকিছুতেই ফিজিক্স ঢোকান?"
আসিফ: "ফিজিক্স সব জায়গায় আছে। তোমার এই তাকানোটার মধ্যেও — চোখের আলো, দূরত্ব, আকাঙ্ক্ষার ভেক্টর।"
সিনথিয়া প্রায় হেসে ফেলল — এবার আর পুরোপুরি আটকাতে পারল না। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, আর সে তাড়াতাড়ি বইয়ের দিকে তাকাল।
সিনথিয়া: "পড়ান।"
আসিফ: "পড়াচ্ছি তো। তুমিই শুনছ না।"
সিনথিয়া: "শুনছি।"
সেদিন আসিফ যাওয়ার সময় সিনথিয়ার নোটবুকটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টালেন, যেন কিছু খুঁজছেন। তারপর নোটবুকটা ফিরিয়ে দিলেন।
আসিফ: "নোটগুলো গুছিয়ে লিখেছ। ভালো।"
তিনি চলে যাওয়ার পর সিনথিয়া নোটবুক খুলল — আর ভেতরে পেল একটা ভাঁজ করা চিরকুট। কাঁপা হাতে খুলল।
"যখন দম বন্ধ লাগবে — 01XXXXXXXXX"
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে দরজার দিকে তাকাল — বন্ধ। জানালার দিকে — মা রান্নাঘরে। সে নম্বরটা তিনবার পড়ল, মুখস্থ করল, তারপর চিরকুটটা নিয়ে বাথরুমে গেল। ম্যাচবাক্সটা ছিল বেসিনের পাশে। কাগজটা পুড়িয়ে ছাইটা কমোডে ফেলে দিল।
আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ জ্বলজ্বল।
সিনথিয়া: "এটা ভুল।"
কিন্তু মুখস্থ নম্বরটা মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
পরের সেশনে আসিফ এলেন একটা মোটা ফিজিক্স গাইড নিয়ে।
আসিফ: "এটা রাখো। ভেতরে কিছু দাগানো আছে — পরীক্ষায় আসার মতো।"
সিনথিয়া গাইডটা নিল। ভারী। আসিফ চোখ টিপলেন — এত সূক্ষ্ম যে মা দেখলেও বুঝতেন না। মা তখন চা নিয়ে ঢুকছিলেন।
মা: "চা খান স্যার।"
আসিফ: "ধন্যবাদ।"
মা চলে যাওয়ার পর সিনথিয়া গাইডটা খুলল। মাঝখানের পাতাগুলো কাটা — ফাঁপা। ভেতরে একটা ছোট বাটন ফোন, আর একটা চার্জার। একটা ছোট চিরকুট — "চার্জার বইয়ের ভেতর। রাতে। সাবধানে।"
সিনথিয়ার হাত কাঁপছিল। সে গাইডটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। আসিফ তখন বোর্ডে সূত্র লিখছেন, পেছন ফিরে।
সিনথিয়া: "স্যার।"
আসিফ: "হুম?"
সিনথিয়া: "...কিছু না।"
আসিফ: "ভালো। কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো।"
সেই রাতে — মা ঘুমিয়ে পড়ার পর, রাত বারোটায় — সিনথিয়া কম্বলের নিচে ফোনটা বের করল। বাটন ফোন, ছোট স্ক্রিন। সে নম্বরটা টিপল — মুখস্থ নম্বর, আঙুল নিজেই চলে গেল। দুটো রিং। তারপর —
আসিফ: "হ্যালো?"
কণ্ঠটা ফিসফিসে, নিচু। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।
সিনথিয়া: "আমি... সিনথিয়া।"
আসিফ: "জানি। দম বন্ধ লাগছিল?"
সিনথিয়া: "হুম।"
আসিফ: "তাহলে শ্বাস নাও। আমি শুনছি।"
আর সিনথিয়া বলতে শুরু করল — ফিসফিস করে, কম্বলের নিচে, অন্ধকারে। বলল খাঁচার কথা, মায়ের কথা, বাইরের পৃথিবীটার কথা যেটা এখন অধরা। ফাহিমের কথা বলল না। নাবিলার কথা বলল না। ওই গোপন জীবনটা — ওটা শুধু তার। কিন্তু খাঁচার কষ্টটা বলল, আর আসিফ শুনলেন।
আসিফ: "আমি হোস্টেলে থাকতাম। চার বছর। প্রথম এক বছর মনে হতো দেয়ালগুলো এগিয়ে আসছে।"
সিনথিয়া: "তারপর?"
আসিফ: "তারপর শিখলাম — দেয়ালের ভেতরেও জানালা বানানো যায়।"
সিনথিয়া: "কীভাবে?"
আসিফ: "এই যেমন — এখন। এই ফোনটা। এই কথা। এটাই জানালা।"
সিনথিয়া চুপ করে রইল। কম্বলের নিচে অন্ধকারে তার চোখ ভিজে উঠল — কেন, সে জানে না।
তৃতীয় রাতে সে জিজ্ঞেস করল —
সিনথিয়া: "যে চলে গেছিল... সে কে ছিল?"
আসিফ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর —
আসিফ: "ইউনিভার্সিটির জুনিয়র। দুই বছর ছিলাম একসাথে। তারপর ওর বাবা-মা বিয়ে ঠিক করল — প্রতিষ্ঠিত ছেলের সাথে। আমি তখন টিউশন করে চলতাম।"
সিনথিয়া: "খারাপ লেগেছিল?"
আসিফ: "তখন লেগেছিল। এখন মনে হয় — ভালোই হয়েছে। যে থাকার নয়, সে চলে যাওয়াই ভালো।"
সিনথিয়া: "আপনি কাউকে দোষ দেন না?"
আসিফ: "দোষ দিয়ে কী হবে? জীবন থেমে থাকে না।"
চতুর্থ রাতে আসিফ জিজ্ঞেস করলেন —
আসিফ: "তুমি কী চাও, সত্যি করে বলো তো?"
সিনথিয়া: "জানি না। শুধু... এই খাঁচা থেকে বেরোতে চাই। নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।"
আসিফ: "একদিন বেরোবে। ততদিন আমি আছি।"
"আছি" — এই ছোট্ট শব্দটা সিনথিয়ার বুকে রয়ে গেল অনেকক্ষণ। ফোন কাটার পরও, ঘুমের মধ্যেও। কেউ তার পাশে "আছে" — এই অনুভূতিটা তার কাছে বহুদিনের অচেনা ছিল।
পঞ্চম রাতে কথা আর শুধু কথা রইল না। আসিফের গলা নিচু হলো, ঘন হলো।
আসিফ: "আজ তুমি ক্লাসে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে।"
সিনথিয়া: "তাকাইনি।"
আসিফ: "তাকিয়েছিলে। আমি গুনেছি — সাতবার।"
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল অন্ধকারে।
সিনথিয়া: "আপনি গুনেন?"
আসিফ: "তোমার সবকিছুই গুনি।" একটু থেমে — "বাকিটা সামনাসামনি। ফোনে নয়।"
সিনথিয়া: "বাকিটা মানে?"
আসিফ: "ঘুমাও। কাল দেখা হবে।"
সিনথিয়া: "আপনি অদ্ভুত।"
আসিফ: "তুমিও। ঘুমাও এখন। কাল পড়া আছে।"
সিনথিয়া: "কাল আসবেন তো?"
আসিফ: "আসব।"
ফোন কাটার পর সিনথিয়া অনেকক্ষণ শুয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হালকা লাগছিল — যেন জানালা দিয়ে সত্যিই হাওয়া ঢুকছে।
এরপরের দিনগুলো বদলে গেল। টিউশন সেশনগুলো আর যুদ্ধক্ষেত্র রইল না — হলো অন্য কিছু। আসিফ পড়াতেন, সিনথিয়া শুনত — কিন্তু দুজনের মাঝে বাতাস ভারী হয়ে থাকত অব্যক্ত কিছুতে।
একদিন আসিফ একটা অঙ্ক বোঝাচ্ছিলেন — কলমটা সিনথিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলেন, তার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে।
আসিফ: "এভাবে — ধীরে —"
এবার সিনথিয়া হাত সরাল না। হাতটা রেখে দিল — তার হাতের নিচে, উষ্ণ। আসিফের আঙুল থেমে গেল এক মুহূর্ত, তারপর স্বাভাবিকভাবে সরে গেল। কিন্তু দুজনেই জানল — কিছু বদলেছে।
সিনথিয়া ইচ্ছে করে "ডাউট" বানাতে শুরু করল — যেসব জায়গা সে ভালোই বোঝে, সেখানেও প্রশ্ন করত, যাতে আসিফ ঝুঁকে আসেন, কাছে আসেন। পাশের ঘরে মা রান্না করছেন — কড়াইয়ের শব্দ, মসলার গন্ধ — আর এই ঘরে দুজন মানুষের নিঃশ্বাস একটু একটু করে কাছাকাছি। এই বিপদের উত্তেজনাটা সিনথিয়ার শিরায় শিরায় বাজত।
একদিন টেবিলের নিচে আসিফের হাত তার হাঁটুতে রাখলেন — হঠাৎ, কোনো ভূমিকা ছাড়াই। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মায়ের গলা —
মা: "সিনথিয়া! চা টা নিয়ে যা তো!"
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল, কিন্তু সে স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল —
সিনথিয়া: "আসছি, মা!"
আসিফের বুড়ো আঙুল তার হাঁটুতে একবার চাপ দিল — ধীরে — তারপর হাত সরিয়ে নিলেন, যেন কিছুই হয়নি। সিনথিয়া উঠে চা আনতে গেল — পা টলছিল। রান্নাঘরে মা জিজ্ঞেস করলেন মুখ লাল কেন — সে বলল গরম লাগছে। মা বিশ্বাস করলেন। ফিরে এসে দেখল আসিফ বইয়ের দিকে তাকিয়ে — কিন্তু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হালকা হাসি।
সিনথিয়া: "আপনি..."
আসিফ: "আমি কী?"
সিনথিয়া: "কিছু না। পড়ান।"
এক সন্ধ্যায় মা পাশের বাসায় গেলেন — প্রতিবেশীর মেয়ে অসুস্থ, দেখতে। বলে গেলেন আধঘণ্টায় ফিরবেন। আসিফ তখনো ছিলেন — সেশন শেষের দিকে।
বাইরে তখন বৃষ্টি নামল — হঠাৎ, জোরে। জানালার কাচে পানির ধারা। আসিফ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আসিফ: "বৃষ্টি।"
সিনথিয়া: "ভিজতে ইচ্ছে করছে।"
আসিফ: "আমারও করত। হোস্টেলে থাকতে ছাদে উঠে ভিজতাম।"
সিনথিয়া: "একা?"
আসিফ: "বেশিরভাগ সময় একা। একবার একজন ছিল —" তিনি থামলেন। "চলে গেছে।"
সিনথিয়া: "কেন?"
আসিফ: "আমি তখন কিছুই ছিলাম না। শুধু স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন দিয়ে সংসার চলে না — ও বলত।"
সিনথিয়া: "এখন?"
আসিফ: "এখন স্বপ্নও নেই, সংসারও নেই। শুধু পড়ানো।" তিনি হাসলেন — হালকা, বিষণ্ণ। "তোমার মতো রাগী মেয়েদের ফিজিক্স বোঝানো।"
সিনথিয়া: "আমি আর রাগী নই।"
আসিফ: "জানি।"
তারা বসে রইল — টেবিলের দুপাশে, বৃষ্টির শব্দে ঘেরা। তারপর আসিফ উঠে জানালার কাছে গেলেন। সিনথিয়াও গেল — নিজের অজান্তে। জানালার কাচে দুজনের প্রতিবিম্ব — কাছাকাছি, প্রায় ছুঁয়ে।
আসিফ ধীরে ঘুরলেন। তার কপাল সিনথিয়ার কপালে ঠেকল — হালকা, প্রশ্নের মতো। সিনথিয়া সরে গেল না। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড — তারপর তার ঠোঁট নেমে এলো।
চুমুটা ছিল ধীর। কোনো তাড়া নেই, কোনো দাবি নেই — শুধু উষ্ণতা। সিনথিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল প্রথমে, তারপর সাড়া দিল। তার হাত উঠে গেল আসিফের গালে — নিজের অজান্তে। বৃষ্টি পড়ছিল কাচে, আর এই ঘরে সময় থেমে ছিল।
যখন তারা আলাদা হলো, দুজনের নিঃশ্বাস ভারী।
সিনথিয়া: "এটা... ঠিক নয়।"
আসিফ: "জানি।"
সিনথিয়া: "তাহলে কেন?"
আসিফ: "কারণ মিথ্যে বলতে পারছি না। তোমাকে ভালো লাগে — এটা সত্যি। প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না — এটাও সত্যি।"
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল। এই সততাটা — নির্মম, পরিষ্কার — তাকে নাড়া দিল।
সিনথিয়া: "আমিও মিথ্যে বলব না। আমারও... ভালো লাগে।"
আসিফ: "তাহলে এটাই থাক। মিথ্যে নয়।"
তারা কিছুক্ষণ বসে রইল — একটু দূরে সরে, যেন চুমুটা দুজনকেই চমকে দিয়েছে। বৃষ্টির জোর কমে এলো, টিপটিপ শব্দে নামছে এখন। আসিফ ব্যাগটা কাঁধে নিলেন।
আসিফ: "আজ যাই।"
সিনথিয়া: "বৃষ্টিতে ভিজবেন।"
আসিফ: "ভেজা আমার অভ্যেস আছে।" দরজার কাছে থেমে — "আর শোনো — যা হলো, তার জন্য দুঃখিত নই। তুমি?"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — না।
তিনি বেরিয়ে গেলেন বৃষ্টির মধ্যে। সিনথিয়া জানালায় দাঁড়িয়ে দেখল — ভিজতে ভিজতে গলির মোড়ে মিলিয়ে যাচ্ছেন। তার আঙুল নিজের ঠোঁটে — এখনো উষ্ণ, এখনো কাঁপছে।
আধঘণ্টা পর মা ফিরলেন — ছাতা ঝাড়তে ঝাড়তে।
মা: "স্যার চলে গেছেন?"
সিনথিয়া: "হুম। অনেকক্ষণ আগে।"
মা খেয়াল করলেন না — মেয়ের গালের লালিমা, চোখের ঝিলমিল। মায়েরা অনেক কিছু বোঝেন, কিন্তু সবকিছু নয়।
পরদিন মা বাজারে গেলেন — বড় বাজার, ঘণ্টাখানেক লাগবে। আসিফ এলেন নির্ধারিত সময়ে। দরজা বন্ধ করে পড়ার ঘরে ঢুকতেই সিনথিয়া তার হাত ধরে টানল।
কোনো বই খোলা হলো না।
আসিফের হাত সিনথিয়ার কোমরে — কামিজের ওপর দিয়ে, তারপর ধীরে ওপরে। সিনথিয়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল যখন তার আঙুল কামিজের নিচে ঢুকল — খালি ত্বকে, পাঁজরের ওপর। সে হাঁপ ছাড়ল — জোরে, অসতর্ক।
সিনথিয়া: "আহ..."
আসিফ: "আস্তে।"
তার ঠোঁট তার গলায় — আর হাত আরও ওপরে। সিনথিয়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল — সপ্তাহের পর সপ্তাহ জমে থাকা সবকিছু একসাথে জেগে উঠছিল। তার হাত আসিফের চুলে, টেনে ধরল। আসিফের ঠোঁট এবার তার গলা বেয়ে নিচে নামল — কলারবোনে, কামিজের গলার কাছে। তার একটা হাত সিনথিয়ার কামিজের ফিতায় — আলগা করছে, ধীরে, যেন সময় নিচ্ছে। সিনথিয়ার মাথা পেছনে হেলে গেল। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ — প্রতিটা সেকেন্ড যেন চিৎকার করছে, "তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।"
সিনথিয়া: "দরজা..."
আসিফ: "বন্ধ।"
সিনথিয়া: "মা..."
আসিফ: "এক ঘণ্টা। আমাদের হাতে এক ঘণ্টা।"
তার হাত এবার তার পিঠে — খালি ত্বকে, মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে। সিনথিয়া কেঁপে উঠল — এতদিনের জমে থাকা সব ক্ষুধা একসাথে ফেটে পড়ছিল। সে আসিফের শার্টের বোতামে হাত দিল — প্রথমটা খুলল —
ঠিক তখনই — সিঁড়িতে স্যান্ডেলের শব্দ। খট্। খট্। খট্।
দুজনে ছিটকে আলাদা হলো। সিনথিয়া বইটা খুলে সামনে রাখল — উল্টো করে। আসিফ বোর্ডের দিকে ঘুরলেন — চক হাতে। দরজা খুলে মা ঢুকলেন — হাতে বাজারের ব্যাগ।
মা: "বাজার তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। পড়া কেমন চলছে?"
আসিফ: "ভালো। ভেক্টর শেষ, এখন স্কেলার।"
সিনথিয়া: "হুম।"
তার গাল লাল — মা খেয়াল করলেন না, বা করেও পাত্তা দিলেন না। মা রান্নাঘরে চলে গেলেন। সিনথিয়া আর আসিফ একে অপরের দিকে তাকাল — দুজনের বুকেই হাতুড়ি পিটছে।
সেশন শেষে দরজার কাছে আসিফ থামলেন। মা রান্নাঘরে। তিনি সিনথিয়ার দিকে ঝুঁকলেন — ফিসফিস করে, এত কাছে যে তার নিঃশ্বাস গালে লাগল।
আসিফ: "পরশু। মা বাইরে যাবে বলেছিলে না?"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — কথা বলার শক্তি ছিল না। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছিল।
আসিফ চলে গেলেন। সিনথিয়া দরজা বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার মনে একটাই শব্দ ঘুরছিল — পরশু। মা পরশু বাইরে যাবেন — বাজারে, ঘণ্টাখানেকের জন্য। ঘণ্টাখানেক মানে — সে ভাবনাটা শেষ করতে পারল না। শুধু জানত, পরশুর পর আর কিছু আগের মতো থাকবে না।
(চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)