28-09-2026, 01:01 PM
«ছাদ পার্টি»
শেষ পরীক্ষার ঘণ্টা বাজতেই সিনথিয়ার বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল। হল থেকে বেরিয়ে সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল — হাতে অ্যাডমিট কার্ড, কাঁধে ব্যাগ, আর মাথায় একটা অদ্ভুত হালকা ভাব। শেষ। এইচএসসি শেষ। আর কোনো রাত জাগা পড়া নেই, আর কোনো ভোরে ওঠা নেই, আর কোনো পরীক্ষার হলের ঘামে ভেজা হাত নেই। সে আকাশের দিকে তাকাল। বিকেলের রোদ নরম। সে হাসল — নিজের মনেই, বোকার মতো।
বাসায় ফিরে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে সে ফোনটা হাতে নিল। নাবিলার মেসেজ আগেই এসে গেছে।
নাবিলা: "আজ রাতে ছাদ। তুই আসছিস। কোনো অজুহাত না।"
সিনথিয়া হাসল। টাইপ করল।
সিনথিয়া: "কখন?"
নাবিলা: "সাতটা। লাইট লাগাচ্ছি। খাবার আমি। তুই শুধু আয়।"
সিনথিয়া: "মাকে কী বলব?"
নাবিলা: "বলবি আমার বাসায় থাকবি। মা তো বাইরে — ফুপুর বাসায় গেছে, কাল আসবে। পুরো বাসা খালি।"
সিনথিয়ার বুকটা একটু ধড়াস করল। পুরো বাসা খালি। নাবিলার মা নেই। শুধু ওরা দুজন। সে টাইপ করল।
সিনথিয়া: "আচ্ছা। আসছি।"
মাকে বলতে খুব একটা কষ্ট হলো না। মা নিজেই খুশি — মেয়ে পরীক্ষা শেষ করেছে, একটু আনন্দ করুক।
মা: "রাতে থাকবি? আচ্ছা, সাবধানে থাকিস। নাবিলার মাকে সালাম দিস।"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল। মিথ্যেটা গলায় আটকাল না — এতদিনে সে মিথ্যা বলতে শিখে গেছে।
সন্ধ্যা সাতটায় সে নাবিলাদের বাসায় পৌঁছাল। যাওয়ার আগে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ — নতুন কুর্তিটা পরেছে, হালকা কাজল দিয়েছে, চুল খুলে রেখেছে। পরীক্ষার কটা মাসে সে নিজের দিকে তাকায়নি। আজ আয়নায় নিজেকে দেখে তার ভালো লাগল — চোখে আবার সেই পুরনো ঝিলিক ফিরে এসেছে। মুক্তির ঝিলিক।
দরজা খুলতেই নাবিলা — চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, পরনে সাদা কুর্তি। তাকে দেখে সিনথিয়ার মুখে হাসি ফুটল।
নাবিলা: "এলি! আয়, ওপরে আয়।"
সিনথিয়া: "কী সেজেছিস!"
নাবিলা: "পার্টি বলে কথা।"
ছাদে উঠে সিনথিয়া থমকে দাঁড়াল। ছাদটা বদলে গেছে। রেলিং জুড়ে ফেয়ারি লাইটের মালা — হলুদ আলোয় পুরো ছাদ ঝলমল করছে। এক কোণে মাদুর পাতা, তার ওপর রঙিন কুশন। মাঝখানে একটা ছোট টেবিল — চিপসের প্যাকেট, বাদাম, মিষ্টি, আর বরফ ভরা বালতিতে কোল্ড ড্রিংকসের বোতল। এক পাশে ব্লুটুথ স্পিকার থেকে হালকা গান বাজছে।
সিনথিয়া: "ওয়াও!"
নাবিলা: "পছন্দ?"
সিনথিয়া: "খুব!"
নাবিলা তার হাত ধরে টানল।
নাবিলা: "আয়, বস। ওরা আসছে।"
সিনথিয়া মাদুরে বসল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা। ফেয়ারি লাইটের আলোয় নাবিলার মুখ ঝলমল করছে। সিনথিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্ত — তারপর চোখ সরিয়ে নিল। এই মেয়েটা। এই মেয়েটা তার সব জানে।
প্রথমে এল তানিয়া — হইচই করে, ব্যাগ দুলিয়ে।
তানিয়া: "পরীক্ষা শেষ! আমি মুক্ত!"
সবাই হেসে উঠল। তানিয়া সিনথিয়ার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
তানিয়া: "কেমিস্ট্রিতে কী লিখলি রে?"
সিনথিয়া: "যা মনে এল।"
তানিয়া: "আমি তো অর্গানিকের নাম শুনেই কেঁদে ফেলেছি।"
রিয়া হাসতে হাসতে বলল।
রিয়া: "আমাদের হলে এক স্যার ছিলেন — এত কড়া! একটা মেয়ে শুধু পাশে তাকিয়েছিল, স্যার তার খাতা নিয়ে গেলেন পাঁচ মিনিটের জন্য!"
তানিয়া: "ভাগ্যিস আমাদের হলে এমন হয়নি!"
সিনথিয়া একটু চুপ করে গেল। তার মনে পড়ল — তার হলে তো হয়েছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দিল।
নাবিলা: "কাঁদিস না, এখন পার্টি।"
এরপর এল রিয়া — চুপচাপ, হাসিমুখ, হাতে একটা গিফট ব্যাগ।
রিয়া: "সবার জন্য চকলেট। পরীক্ষা শেষের ট্রিট।"
তানিয়া: "রিয়া তুই সেরা!"
চারজনে গোল হয়ে বসল। কোল্ড ড্রিংকস খোলা হলো। বাদাম-চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ল। আর শুরু হলো আড্ডা — পরীক্ষার ভয়ংকর গল্প।
তানিয়া: "ফিজিক্সের দিন আমার হাত এত কাঁপছিল যে নামটাই ভুল লিখে ফেলেছিলাম!"
রিয়া: "আমি তো হলে ঢুকে সিট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দশ মিনিট ঘুরেছি।"
সিনথিয়া হাসছিল। তার মনে পড়ছিল অন্য কথা — পরীক্ষার হলের সেই সাইড রুম, ওয়াশরুমের সেই দুপুর — কিন্তু সেসব কথা এখানে বলার নয়। সে শুধু হাসল আর চিপস খেল।
নাবিলা: "আর আমি? ম্যাথের দিন প্রশ্ন দেখে মনে হলো এটা বাংলা না চাইনিজ!"
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। তানিয়া হাসতে হাসতে সিনথিয়ার গায়ে ঢলে পড়ল।
তানিয়া: "যাক, শেষ! এখন আর পড়া না!"
সিনথিয়া: "এখন শুধু ঘুম আর ঘুম!"
রিয়া: "আর রেজাল্টের টেনশন।"
নাবিলা: "ওইটা পরে। আজ শুধু আনন্দ।"
আড্ডার মাঝে রিয়া হঠাৎ বলল।
রিয়া: "অন্ত্যাক্ষরী খেলবি?"
তানিয়া: "হ্যাঁ! দুই টিম!"
দুই টিম হলো — সিনথিয়া-নাবিলা এক টিমে, তানিয়া-রিয়া অন্য টিমে। গান শুরু হলো। তানিয়া গলা ছেড়ে গাইল — সুর মাঝপথে এমনভাবে কাটল যে সবাই হেসে গড়াগড়ি খেল। রিয়া তানিয়ার মুখ চেপে ধরল।
রিয়া: "তুই গান গাস না, প্লিজ!"
তানিয়া: "এটা আমার স্টাইল!"
এরপর সিনথিয়ার পালা। সে নরম গলায় গাইল — চোখ বন্ধ করে, ফেয়ারি লাইটের আলোয় মুখ উজ্জ্বল। গান শেষ হতেই হাততালি পড়ল। নাবিলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাবিলা: "তুই এত ভালো গাস, জানতাম না।"
সিনথিয়া: "তুই কত কিছুই জানিস না।"
দুজনের চোখে চোখ পড়ল। এক মুহূর্ত নীরবতা। তানিয়া কাশল।
তানিয়া: "এই! খেলা চলছে! রোমান্স পরে!"
সবাই হাসল। খেলা চলল আরও কয়েক রাউন্ড। শেষে সিনথিয়া-নাবিলা জিতল। শাস্তি হিসেবে তানিয়া আর রিয়াকে একসাথে একটা ফানি ডান্স করতে হলো। দুজনে হাত-পা ছুড়ে উদ্ভট ভঙ্গিতে নাচল — সিনথিয়া হাসতে হাসতে পেটে হাত চেপে ধরল। নাবিলা ফোন বের করে ভিডিও করল।
নাবিলা: "এটা গ্রুপে দেব!"
তানিয়া: "দিস না! মান-সম্মান যাবে!"
এরপর ফটো সেশন। ফেয়ারি লাইটের সামনে চারজনে পোজ দিল — কখনো হাত তুলে, কখনো চোখ টিপে। সিনথিয়া আর নাবিলা পাশাপাশি দাঁড়াল — নাবিলার হাত সিনথিয়ার কোমরে। ছবি তোলার সময় নাবিলা ফিসফিস করল।
নাবিলা: "এই ছবিটা শুধু আমার।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সে কিছু বলল না — শুধু হাসল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলল।
নাবিলা স্পিকারের ভলিউম বাড়িয়ে দিল। গানের তালে তালে ছাদটা যেন নাচতে লাগল। তানিয়া উঠে দাঁড়াল।
তানিয়া: "নাচবি না?"
সিনথিয়া: "আমি? না রে!"
তানিয়া তার হাত ধরে টানল।
তানিয়া: "আয় না! পরীক্ষা শেষ!"
সিনথিয়া উঠল। প্রথমে লজ্জা লাগছিল, কিন্তু গানের তাল আর মুক্তির আনন্দে শরীর নিজে থেকেই নাচতে লাগল। সে ঘুরল, হাত তুলল, চুল উড়ল বাতাসে। তানিয়া তার সাথে তাল মেলাল। রিয়া হাততালি দিল।
আর নাবিলা — নাবিলা বসে বসে তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটা অন্যরকম ঝিলিক। সিনথিয়া নাচতে নাচতে তার দিকে তাকাল — চোখে চোখ পড়তেই নাবিলা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কিছু একটা ছিল। সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।
এরপর বাজল একটা জোরালো গান। তানিয়া চেঁচিয়ে উঠল।
তানিয়া: "এই গানে না নাচলে পাপ!"
সে নাবিলার হাত ধরে টানল।
তানিয়া: "তুইও আয়!"
নাবিলা: "আমি? না রে!"
তানিয়া: "আয় বলছি!"
নাবিলা উঠল — অনিচ্ছায়, হাসতে হাসতে। চারজনে গোল হয়ে নাচতে লাগল। তানিয়া উদ্ভট স্টেপ দিচ্ছিল — হাত ওপরে তুলে, কোমর দুলিয়ে। রিয়া তার নকল করছিল। সিনথিয়া হাসতে হাসতে নাচছিল। আর নাবিলা — নাবিলা নাচছিল সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে। গানের তালে দুজনের চোখ বারবার মিলছিল।
একবার নাচের ঘূর্ণিতে সিনথিয়া নাবিলার গায়ে হেলে পড়ল। নাবিলা তাকে ধরল — কোমর চেপে। এক মুহূর্ত দুজনে স্থির। চারপাশে গান, হাসি, আলো — কিন্তু ওদের মাঝে শুধু নীরবতা। তারপর তানিয়া চেঁচাল।
তানিয়া: "এই! নাচ!"
দুজনে সরে গেল। কিন্তু সিনথিয়ার কোমরে নাবিলার হাতের গরম ছাপ রয়ে গেল।
গান থামলে সিনথিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বসল। নাবিলা তার দিকে কোল্ড ড্রিংকস এগিয়ে দিল।
নাবিলা: "খা। ঘেমে গেছিস।"
সিনথিয়া: "তুই নাচলি না কেন?"
নাবিলা: "তোকে দেখছিলাম। তুই নাচলে ভালো লাগে।"
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "ওহো! কী চলছে!"
নাবিলা: "চুপ কর!"
সবাই হাসল। রিয়া চকলেট বিলাল। আড্ডা চলল — ভবিষ্যতের প্ল্যান, কোন কোচিং, কে কী পড়বে।
তানিয়া: "আমি তো মেডিকেলের স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছি।"
রিয়া: "আমি ভার্সিটি।"
নাবিলা: "আমি এখনো ভাবিনি। তুই?"
সিনথিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
সিনথিয়া: "দেখা যাক।"
আসলে তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরছিল — এতদিন যাদের সে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, পরীক্ষা শেষে তারা সবাই আবার ফিরে আসবে। ভাবতেই তার শরীরে শিহরণ খেলে গেল।
তানিয়া হঠাৎ চেঁচাল।
তানিয়া: "খেলা খেলবো! ট্রুথ অর ডেয়ার!"
নাবিলা: "ওহো! শুরু হয়ে গেল!"
রিয়া: "আমি খেলব!"
সিনথিয়া হাসল।
সিনথিয়া: "আমিও।"
খালি কোল্ড ড্রিংকসের বোতলটা মাঝখানে রাখা হলো। চারজনে গোল হয়ে বসল। ফেয়ারি লাইটের আলোয় সবার মুখ উজ্জ্বল।
তানিয়া: "নিয়ম জানিস তো? বোতল যার দিকে, সে ট্রুথ না ডেয়ার বাছবে।"
প্রথমে বোতল থামল রিয়ার দিকে।
রিয়া: "ট্রুথ।"
তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "তোর ক্রাশ কে? কলেজে?"
রিয়ার গাল লাল হয়ে গেল।
রিয়া: "বলব না!"
তানিয়া: "বলতেই হবে! নিয়ম!"
রিয়া ফিসফিস করে একটা নাম বলল। সবাই "ওহো" করে উঠল। রিয়া মুখ ঢাকল।
এরপর বোতল ঘুরে থামল তানিয়ার দিকে।
তানিয়া: "ডেয়ার!"
নাবিলা হাসল।
নাবিলা: "ডেয়ার? ঠিক আছে। সিনথিয়াকে কোল্ড ড্রিংকস খাইয়ে দে। হাত দিয়ে না — মুখে ধরে।"
তানিয়া: "এটা কী!"
সবাই হেসে উঠল। তানিয়া বোতলটা মুখে ধরে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে এল। সিনথিয়া হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল, কিন্তু তানিয়া ছাড়ল না। শেষে সিনথিয়া মুখ খুলল, তানিয়া বোতল কাত করল। কোল্ড ড্রিংকস গড়িয়ে পড়ল, কিছুটা সিনথিয়ার ঠোঁট বেয়ে গলায় নামল। সবাই হাততালি দিল।
সিনথিয়া: "তুই পাগল!"
তানিয়া: "ডেয়ার তো ডেয়ার!"
সিনথিয়া গলা মুছল। তার চোখ গেল নাবিলার দিকে — নাবিলা তাকিয়ে আছে। তার চোখে সেই ঝিলিক। সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল।
বোতল আবার ঘুরল। এবার থামল সিনথিয়ার দিকে।
নাবিলা: "ট্রুথ না ডেয়ার?"
সিনথিয়া: "ডেয়ার।"
তানিয়া আর রিয়া একসাথে চেঁচাল।
তানিয়া: "ডেয়ার!"
রিয়া ভাবল এক মুহূর্ত।
রিয়া: "নাবিলার কানে একটা সিক্রেট বল। এমন সিক্রেট যা আমরা শুনতে পাব না।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সিক্রেট? তার তো হাজারটা সিক্রেট। কিন্তু কোনটা বলবে? সে নাবিলার দিকে এগিয়ে গেল। নাবিলা কান এগিয়ে দিল। সিনথিয়া ফিসফিস করল।
সিনথিয়া: "তুই আজ খুব সুন্দর লাগছিস।"
নাবিলার গাল লাল হয়ে গেল। সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে চোখ। এক মুহূর্ত দুজনে চুপ। তারপর সবাই চেঁচাল।
তানিয়া: "কী বললি? কী বললি?"
নাবিলা: "বলব না! সিক্রেট!"
তানিয়া: "চিটিং!"
নাবিলা সিনথিয়ার হাত চেপে ধরল টেবিলের নিচে। সিনথিয়া চমকে উঠল, কিন্তু হাত সরাল না। নাবিলার আঙুল তার আঙুলে জড়িয়ে গেল। সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলে গেল।
খেলা চলল। বোতল ঘুরল। এবার নাবিলার পালা।
নাবিলা: "ডেয়ার।"
তানিয়া দুষ্টুমি করে হাসল।
তানিয়া: "সিনথিয়ার সাথে ডান্স কর। স্লো ডান্স। এক মিনিট।"
সিনথিয়া: "এই!"
নাবিলা উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়াল।
নাবিলা: "আয়।"
সিনথিয়া ইতস্তত করল এক মুহূর্ত — তারপর নাবিলার হাত ধরল। গান বদলে গেল — একটা নরম সুর। দুজনে ছাদের মাঝখানে দাঁড়াল। নাবিলার এক হাত সিনথিয়ার কোমরে, আরেক হাত তার হাতে। সিনথিয়ার হাত নাবিলার কাঁধে।
ওরা নাচতে লাগল। ধীরে। ফেয়ারি লাইটের আলোয়। তানিয়া আর রিয়া হাততালি দিচ্ছে, শিস দিচ্ছে। কিন্তু সিনথিয়ার কানে সেসব যাচ্ছিল না। সে শুধু নাবিলাকে অনুভব করছিল — তার শরীরের গরম, তার নিঃশ্বাস, তার কোমরে রাখা হাতটা একটু বেশিই চেপে ধরেছে।
নাবিলা ফিসফিস করল।
নাবিলা: "তুই কাঁপছিস।"
সিনথিয়া: "না।"
নাবিলা: "মিথ্যা বলিস না।"
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। নাবিলার ঠোঁট তার কানের এত কাছে — একটু এগোলেই ছুঁয়ে যাবে। সে চোখ বন্ধ করল। এক মিনিট যেন এক ঘণ্টা।
গান থামল। সবাই হাততালি দিল। দুজনে সরে গেল — কিন্তু সিনথিয়ার কোমরে নাবিলার হাতের ছাপ যেন রয়ে গেল।
তানিয়া: "তোরা দুজন তো পুরো কাপল!"
রিয়া: "সত্যিই! তোদের দেখে মনে হয় তোরা আলাদা হতেই পারবি না।"
নাবিলা: "পারব না তো।"
সিনথিয়া নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলা হাসছে — কিন্তু চোখে সেই গভীর কিছু।
তানিয়া হঠাৎ নতুন খেলার প্রস্তাব দিল।
তানিয়া: "স্টেয়ার গেম খেলবি? দুজন দুজনের চোখে তাকিয়ে থাকবি। যে আগে চোখ সরাবে বা হাসবে, সে হারবে।"
রিয়া: "আমি তানিয়ার সাথে!"
তানিয়া আর রিয়া মুখোমুখি বসল। দশ সেকেন্ডও টিকল না — তানিয়া হেসে ফেলল।
তানিয়া: "তোর চোখে কী আছে রে! হাসি পায়!"
সবাই হাসল। এবার পালা সিনথিয়া আর নাবিলার। দুজনে মুখোমুখি বসল — হাঁটুতে হাঁটু ঠেকে গেল।
নাবিলা: "রেডি?"
সিনথিয়া: "রেডি।"
দুজনে চোখে চোখ রাখল। সময় থমকে গেল। সিনথিয়া দেখল নাবিলার চোখের গভীরে — সেই চেনা আগুন, সেই অধিকারবোধ, সেই ভালোবাসা। নাবিলার ঠোঁটে হালকা হাসি। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। সে হাসতে চাইল না — কিন্তু ঠোঁট কাঁপছিল।
তানিয়া: "দশ সেকেন্ড!"
রিয়া: "পনেরো!"
তানিয়া: "বিশ! ওরা তো হারছেই না!"
ত্রিশ সেকেন্ড পার হলো। দুজনে তখনো তাকিয়ে। সিনথিয়ার চোখে পানি এসে গেল — না হাসির, না কান্নার — কিছু একটা। নাবিলা ধীরে তার হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার গাল ছুঁল।
নাবিলা: "তুই হারলি।"
সিনথিয়া: "কেন?"
নাবিলা: "তোর চোখে পানি।"
সিনথিয়া হেসে ফেলল। সবাই হাততালি দিল। কিন্তু সিনথিয়ার গালে নাবিলার আঙুলের ছোঁয়া রয়ে গেল — গরম।
তানিয়া: "তোদের খেলা দেখে মনে হচ্ছে আমরা এক্সট্রা!"
নাবিলা সিনথিয়ার হাত ধরল।
নাবিলা: "তোরা তো আছিসই।"
খেলা আরও চলল। ডেয়ারগুলো আরও দুষ্টু হলো।
তানিয়ার ডেয়ার পড়ল — তাকে একজন স্যারের নকল করতে হবে। তানিয়া উঠে দাঁড়িয়ে গলা গম্ভীর করে বলল।
তানিয়া: "এই! পেছনে কী কথা! খাতা দাও!"
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। রিয়া হাসতে হাসতে বলল।
রিয়া: "একদম স্যারের মতো!"
এরপর বোতল থামল সিনথিয়ার দিকে।
তানিয়া: "ট্রুথ! আর পালাবি না!"
সিনথিয়া: "আচ্ছা, ট্রুথ।"
রিয়া একটু ঝুঁকে এল।
রিয়া: "সত্যি বল — আজকাল কাউকে মিস করছিস?"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। কাউকে মিস? তার মাথায় একসাথে কত মুখ ভেসে উঠল। সে হাসল — একটু বেশি জোরে।
সিনথিয়া: "তোদের সবাইকে!"
তানিয়া: "মিথ্যা! চোখে দেখা যাচ্ছে!"
সিনথিয়া: "সত্যি বলছি!"
নাবিলা তার দিকে তাকাল — গভীর দৃষ্টিতে। যেন বলছে, আমি জানি। সিনথিয়া চোখ সরিয়ে নিল।
তানিয়া: "ছেড়ে দিলাম। কিন্তু একদিন বলতেই হবে!"
একে অপরকে চকলেট খাইয়ে দেওয়া, চোখ বেঁধে কণ্ঠ চেনা, কানে ফিসফিস করে প্রশংসা করা — প্রতিটা ডেয়ারে সিনথিয়া আর নাবিলা যেন একটু বেশিই জড়িয়ে যাচ্ছিল। তানিয়া আর রিয়া খেয়াল করছিল — আর টিজ করছিল।
তানিয়া: "তোরা দুজন বিয়ে করে ফেল!"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
কিন্তু তার গাল লাল। নাবিলা হাসছিল।
সময় গড়িয়ে গেল। রাত দশটা বাজতেই রিয়ার ফোন বাজল।
রিয়া: "মা ফোন করেছে। আমাকে যেতে হবে।"
তানিয়া: "আমিও যাই। বাবা রাগ করবে।"
নাবিলা: "আরেকটু থাক না!"
রিয়া: "না রে, কাল আসব।"
তানিয়া সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
তানিয়া: "তুই থাকছিস?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ, আজ এখানেই থাকব।"
তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "ওহো! নাইট স্টে!"
সিনথিয়া: "যা তো!"
রিয়া আর তানিয়া চলে গেল। সিনথিয়া আর নাবিলা তখনই নিচে নামল না। দুজনে ছাদের কিনারায় বসল — পা ঝুলিয়ে। নিচে রাস্তায় রিকশার টুংটাং, দূরে শহরের আলো। ওপরে তারা। ফেয়ারি লাইটের মালা হালকা দুলছিল বাতাসে।
নাবিলা: "ভালো লাগল আজ।"
সিনথিয়া: "আমারও।"
নাবিলা: "পরীক্ষার পর প্রথমবার মনে হলো — আমরা আবার আমরা।"
সিনথিয়া নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে। তার মুখে নরম আলো।
সিনথিয়া: "আমরা তো সবসময় আমরাই।"
নাবিলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
নাবিলা: "তাই থাকিস। কখনো বদলাস না।"
সিনথিয়ার বুকটা মুচড়ে উঠল। বদলাস না? সে তো কত বদলে গেছে — নাবিলা জানে না কতটা। সে নাবিলার হাত ধরল।
সিনথিয়া: "তুই থাকলে আমি ঠিক থাকব।"
দুজনে চুপ করে বসে রইল। বাতাসে ফেয়ারি লাইটের ঝলকানি। সিনথিয়া ভাবল — এই মুহূর্তটা যদি থেমে থাকত। কোনো গোপন নেই, কোনো ভয় নেই — শুধু তার সবচেয়ে কাছের মানুষটা।
নাবিলা: "চল, নিচে যাই। ঠান্ডা লাগছে।"
সিনথিয়া: "চল।"
ছাদে নীরবতা নামল পেছনে। শুধু ফেয়ারি লাইটের ঝলকানি আর দূরে শহরের আওয়াজ রইল। সিনথিয়া আর নাবিলা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।
নাবিলা: "শেষ। শুধু আমরা।"
সিনথিয়া: "শুধু আমরা।"
দুজনে একে অপরের দিকে তাকাল। বাতাসে কিছু একটা ভাসছিল — পুরনো, চেনা, গরম।
নাবিলা উঠে দাঁড়াল।
নাবিলা: "চল, গোছাই।"
দুজনে মিলে প্যাকেট গোছাল, বোতল তুলল, কুশন ভাঁজ করল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল — ইচ্ছে করে, নাকি অনিচ্ছে — কে জানে। প্রতিবার ছোঁয়ায় সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলছিল।
শেষ চকলেটটা নিয়ে দুজনে কাড়াকাড়ি লাগাল। নাবিলা চকলেটটা উঁচিয়ে ধরল।
নাবিলা: "আমার!"
সিনথিয়া: "আমার!"
সিনথিয়া লাফিয়ে চকলেটটা নিতে গেল — পা পিছলে নাবিলার গায়ে পড়ল। দুজনে মাদুরে গড়িয়ে পড়ল, হাসতে হাসতে। নাবিলা সিনথিয়ার ওপরে — চকলেটটা তখনো হাতে। সে চকলেটটা ভেঙে অর্ধেক সিনথিয়ার মুখে ধরল।
নাবিলা: "নে, খা।"
সিনথিয়া মুখ খুলল। নাবিলার আঙুল তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল। দুজনে এক মুহূর্ত চুপ। নাবিলার চোখ সিনথিয়ার ঠোঁটে। তারপর সে সরে গেল — উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়াল।
নাবিলা: "ওঠ।"
সিনথিয়া তার হাত ধরল। বুক ধড়ফড় করছিল। নাবিলা ফেয়ারি লাইটের সুইচ একটা একটা করে নেভাতে লাগল। ছাদটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবল — শুধু দূরের শহরের আলো রইল।
নিচে নেমে নাবিলা দরজা বন্ধ করল। পুরো বাসা খালি — নীরব। শুধু দুজনের পায়ের শব্দ।
নাবিলা: "মা কাল সকালে আসবে। পুরো রাত আমাদের।"
সিনথিয়া: "পুরো রাত?"
নাবিলা: "পুরো রাত।"
নাবিলার ঘরে ঢুকে সিনথিয়া ব্যাগটা রাখল। ঘরটা চেনা — কত রাত সে এখানে কাটিয়েছে। বিছানা, জানালা, সেই আয়না। তার বুক ধড়ফড় করছিল।
নাবিলা আলমারি খুলে একটা টি-শার্ট আর পাজামা বের করল।
নাবিলা: "নে, চেঞ্জ কর।"
সিনথিয়া: "তুই?"
নাবিলা: "আমিও করছি।"
দুজনে একে অপরের দিকে পিঠ করে দাঁড়াল — কিন্তু আয়নায় চোখ পড়তেই দুজনে হেসে ফেলল। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি।
সিনথিয়া: "তুই দেখছিস!"
নাবিলা: "তুইও!"
দুজনে হাসতে হাসতে চেঞ্জ করল। সিনথিয়া টি-শার্টটা পরল — নাবিলার টি-শার্ট, একটু বড়, কাঁধ থেকে ঝুলছে। নাবিলা তাকিয়ে রইল।
নাবিলা: "তোকে আমার জামায় ভালো লাগে।"
সিনথিয়া: "তোর সবকিছুতেই আমাকে ভালো লাগে।"
নাবিলা: "সত্যি।"
দুজনে বিছানায় বসল। নাবিলা চুল খুলল। সিনথিয়া তার চুলে হাত বুলাল — অভ্যাসবশত। নাবিলা চোখ বন্ধ করল।
সিনথিয়া: "মনে আছে? ক্লাস এইটে তোর চুলে জট পড়েছিল, আমি আধঘণ্টা ধরে ছাড়িয়েছিলাম।"
নাবিলা: "মনে আছে। তুই রেগে গিয়ে বলেছিলি — আর কোনোদিন চুল বাঁধবি না।"
সিনথিয়া: "আর তুই পরদিনই খোঁপা করে এসেছিলি।"
দুজনে হাসল। সিনথিয়া নাবিলার চুলে আঙুল চালাতে লাগল — ধীরে, আদরে। নাবিলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
নাবিলা: "তখন সব কত সহজ ছিল, না?"
সিনথিয়া: "এখন কঠিন?"
নাবিলা: "এখন... অন্যরকম।"
সিনথিয়া কিছু বলল না। সে জানত নাবিলা কী বলতে চাইছে। পরীক্ষার এই কটা মাসে ওদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল — পড়া, টেনশন, আর সিনথিয়ার গোপন জীবন। নাবিলা সব জানে না। অনেক কিছুই জানে না।
সিনথিয়ার ফোনটা বাজল। মায়ের মেসেজ।
মা: "পৌঁছেছিস? খেয়েছিস?"
সিনথিয়া টাইপ করল।
সিনথিয়া: "হ্যাঁ মা। খেয়েছি। তুমি ঘুমাও।"
মা: "আচ্ছা। সাবধানে থাকিস।"
ফোনটা রেখে সিনথিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাবিলা তার দিকে তাকাল।
নাবিলা: "মা?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ। গুড নাইট বলে দিলাম।"
নাবিলা: "আমার মাও ফোন করেছিল। বললাম সব ঠিক আছে।"
দুজনে চুপ করে বসল এক মুহূর্ত। জানালা দিয়ে রাতের বাতাস আসছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। নাবিলা সিনথিয়ার কোলে মাথা রাখল। সিনথিয়া চমকে উঠল — তারপর হাত বাড়িয়ে নাবিলার মাথায় হাত রাখল।
নাবিলা: "এইভাবে থাকি কিছুক্ষণ?"
সিনথিয়া: "থাক।"
নাবিলার নিঃশ্বাস তার পেটে লাগছিল — গরম। সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলে গেল। সে নাবিলার চুলে হাত বুলাতে লাগল। পুরনো অভ্যাস। পুরনো টান। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম লাগছিল — বাতাসে কিছু একটা ছিল।
নাবিলা: "মিস করেছি তোকে। পরীক্ষার সময়।"
সিনথিয়া: "আমিও। খুব।"
নাবিলা: "ফোনেও ঠিকমতো কথা হয়নি।"
সিনথিয়া: "মা পাশে থাকত।"
নাবিলা তার দিকে ঘুরল।
নাবিলা: "এখন মা নেই। কেউ নেই।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। নাবিলার চোখে সেই চেনা আগুন — যা সে «নাবিলার ঘর»-এ দেখেছিল, «দ্বিতীয়বার»-এ দেখেছিল। তার শরীর গরম হয়ে গেল।
সিনথিয়া: "নাবিলা..."
নাবিলা এগিয়ে এল। তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটের এক ইঞ্চি দূরে থামল।
নাবিলা: "বল। থামতে বললে থামব।"
সিনথিয়া কিছু বলল না। সে শুধু চোখ বন্ধ করল।
আর ঠিক তখনই — নাবিলার ফোনটা বাজল। টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। দুজনে চমকে উঠল। নাবিলা ফোনটার দিকে তাকাল — তারপর তার ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি ফুটল।
সিনথিয়া: "কে?"
নাবিলা ফোনটা হাতে নিল। মেসেজটা পড়ল। তার হাসি আরও গভীর হলো। সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
নাবিলা: "একজন আসছে।"
সিনথিয়া: "এত রাতে? কে?"
নাবিলা উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগোল।
নাবিলা: "দেখবি।"
দরজায় টোকা পড়ল — হালকা, তিনটে টোকা। নাবিলা দরজার দিকে হাত বাড়াল। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। কে আসতে পারে এত রাতে? নাবিলার হাসি দেখে মনে হচ্ছে — সে জানে। সে আগে থেকেই জানত।
নাবিলা: "রেডি?"
(চলবে)
শেষ পরীক্ষার ঘণ্টা বাজতেই সিনথিয়ার বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল। হল থেকে বেরিয়ে সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল — হাতে অ্যাডমিট কার্ড, কাঁধে ব্যাগ, আর মাথায় একটা অদ্ভুত হালকা ভাব। শেষ। এইচএসসি শেষ। আর কোনো রাত জাগা পড়া নেই, আর কোনো ভোরে ওঠা নেই, আর কোনো পরীক্ষার হলের ঘামে ভেজা হাত নেই। সে আকাশের দিকে তাকাল। বিকেলের রোদ নরম। সে হাসল — নিজের মনেই, বোকার মতো।
বাসায় ফিরে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে সে ফোনটা হাতে নিল। নাবিলার মেসেজ আগেই এসে গেছে।
নাবিলা: "আজ রাতে ছাদ। তুই আসছিস। কোনো অজুহাত না।"
সিনথিয়া হাসল। টাইপ করল।
সিনথিয়া: "কখন?"
নাবিলা: "সাতটা। লাইট লাগাচ্ছি। খাবার আমি। তুই শুধু আয়।"
সিনথিয়া: "মাকে কী বলব?"
নাবিলা: "বলবি আমার বাসায় থাকবি। মা তো বাইরে — ফুপুর বাসায় গেছে, কাল আসবে। পুরো বাসা খালি।"
সিনথিয়ার বুকটা একটু ধড়াস করল। পুরো বাসা খালি। নাবিলার মা নেই। শুধু ওরা দুজন। সে টাইপ করল।
সিনথিয়া: "আচ্ছা। আসছি।"
মাকে বলতে খুব একটা কষ্ট হলো না। মা নিজেই খুশি — মেয়ে পরীক্ষা শেষ করেছে, একটু আনন্দ করুক।
মা: "রাতে থাকবি? আচ্ছা, সাবধানে থাকিস। নাবিলার মাকে সালাম দিস।"
সিনথিয়া মাথা নাড়ল। মিথ্যেটা গলায় আটকাল না — এতদিনে সে মিথ্যা বলতে শিখে গেছে।
সন্ধ্যা সাতটায় সে নাবিলাদের বাসায় পৌঁছাল। যাওয়ার আগে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ — নতুন কুর্তিটা পরেছে, হালকা কাজল দিয়েছে, চুল খুলে রেখেছে। পরীক্ষার কটা মাসে সে নিজের দিকে তাকায়নি। আজ আয়নায় নিজেকে দেখে তার ভালো লাগল — চোখে আবার সেই পুরনো ঝিলিক ফিরে এসেছে। মুক্তির ঝিলিক।
দরজা খুলতেই নাবিলা — চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, পরনে সাদা কুর্তি। তাকে দেখে সিনথিয়ার মুখে হাসি ফুটল।
নাবিলা: "এলি! আয়, ওপরে আয়।"
সিনথিয়া: "কী সেজেছিস!"
নাবিলা: "পার্টি বলে কথা।"
ছাদে উঠে সিনথিয়া থমকে দাঁড়াল। ছাদটা বদলে গেছে। রেলিং জুড়ে ফেয়ারি লাইটের মালা — হলুদ আলোয় পুরো ছাদ ঝলমল করছে। এক কোণে মাদুর পাতা, তার ওপর রঙিন কুশন। মাঝখানে একটা ছোট টেবিল — চিপসের প্যাকেট, বাদাম, মিষ্টি, আর বরফ ভরা বালতিতে কোল্ড ড্রিংকসের বোতল। এক পাশে ব্লুটুথ স্পিকার থেকে হালকা গান বাজছে।
সিনথিয়া: "ওয়াও!"
নাবিলা: "পছন্দ?"
সিনথিয়া: "খুব!"
নাবিলা তার হাত ধরে টানল।
নাবিলা: "আয়, বস। ওরা আসছে।"
সিনথিয়া মাদুরে বসল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা। ফেয়ারি লাইটের আলোয় নাবিলার মুখ ঝলমল করছে। সিনথিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্ত — তারপর চোখ সরিয়ে নিল। এই মেয়েটা। এই মেয়েটা তার সব জানে।
প্রথমে এল তানিয়া — হইচই করে, ব্যাগ দুলিয়ে।
তানিয়া: "পরীক্ষা শেষ! আমি মুক্ত!"
সবাই হেসে উঠল। তানিয়া সিনথিয়ার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
তানিয়া: "কেমিস্ট্রিতে কী লিখলি রে?"
সিনথিয়া: "যা মনে এল।"
তানিয়া: "আমি তো অর্গানিকের নাম শুনেই কেঁদে ফেলেছি।"
রিয়া হাসতে হাসতে বলল।
রিয়া: "আমাদের হলে এক স্যার ছিলেন — এত কড়া! একটা মেয়ে শুধু পাশে তাকিয়েছিল, স্যার তার খাতা নিয়ে গেলেন পাঁচ মিনিটের জন্য!"
তানিয়া: "ভাগ্যিস আমাদের হলে এমন হয়নি!"
সিনথিয়া একটু চুপ করে গেল। তার মনে পড়ল — তার হলে তো হয়েছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দিল।
নাবিলা: "কাঁদিস না, এখন পার্টি।"
এরপর এল রিয়া — চুপচাপ, হাসিমুখ, হাতে একটা গিফট ব্যাগ।
রিয়া: "সবার জন্য চকলেট। পরীক্ষা শেষের ট্রিট।"
তানিয়া: "রিয়া তুই সেরা!"
চারজনে গোল হয়ে বসল। কোল্ড ড্রিংকস খোলা হলো। বাদাম-চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ল। আর শুরু হলো আড্ডা — পরীক্ষার ভয়ংকর গল্প।
তানিয়া: "ফিজিক্সের দিন আমার হাত এত কাঁপছিল যে নামটাই ভুল লিখে ফেলেছিলাম!"
রিয়া: "আমি তো হলে ঢুকে সিট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দশ মিনিট ঘুরেছি।"
সিনথিয়া হাসছিল। তার মনে পড়ছিল অন্য কথা — পরীক্ষার হলের সেই সাইড রুম, ওয়াশরুমের সেই দুপুর — কিন্তু সেসব কথা এখানে বলার নয়। সে শুধু হাসল আর চিপস খেল।
নাবিলা: "আর আমি? ম্যাথের দিন প্রশ্ন দেখে মনে হলো এটা বাংলা না চাইনিজ!"
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। তানিয়া হাসতে হাসতে সিনথিয়ার গায়ে ঢলে পড়ল।
তানিয়া: "যাক, শেষ! এখন আর পড়া না!"
সিনথিয়া: "এখন শুধু ঘুম আর ঘুম!"
রিয়া: "আর রেজাল্টের টেনশন।"
নাবিলা: "ওইটা পরে। আজ শুধু আনন্দ।"
আড্ডার মাঝে রিয়া হঠাৎ বলল।
রিয়া: "অন্ত্যাক্ষরী খেলবি?"
তানিয়া: "হ্যাঁ! দুই টিম!"
দুই টিম হলো — সিনথিয়া-নাবিলা এক টিমে, তানিয়া-রিয়া অন্য টিমে। গান শুরু হলো। তানিয়া গলা ছেড়ে গাইল — সুর মাঝপথে এমনভাবে কাটল যে সবাই হেসে গড়াগড়ি খেল। রিয়া তানিয়ার মুখ চেপে ধরল।
রিয়া: "তুই গান গাস না, প্লিজ!"
তানিয়া: "এটা আমার স্টাইল!"
এরপর সিনথিয়ার পালা। সে নরম গলায় গাইল — চোখ বন্ধ করে, ফেয়ারি লাইটের আলোয় মুখ উজ্জ্বল। গান শেষ হতেই হাততালি পড়ল। নাবিলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাবিলা: "তুই এত ভালো গাস, জানতাম না।"
সিনথিয়া: "তুই কত কিছুই জানিস না।"
দুজনের চোখে চোখ পড়ল। এক মুহূর্ত নীরবতা। তানিয়া কাশল।
তানিয়া: "এই! খেলা চলছে! রোমান্স পরে!"
সবাই হাসল। খেলা চলল আরও কয়েক রাউন্ড। শেষে সিনথিয়া-নাবিলা জিতল। শাস্তি হিসেবে তানিয়া আর রিয়াকে একসাথে একটা ফানি ডান্স করতে হলো। দুজনে হাত-পা ছুড়ে উদ্ভট ভঙ্গিতে নাচল — সিনথিয়া হাসতে হাসতে পেটে হাত চেপে ধরল। নাবিলা ফোন বের করে ভিডিও করল।
নাবিলা: "এটা গ্রুপে দেব!"
তানিয়া: "দিস না! মান-সম্মান যাবে!"
এরপর ফটো সেশন। ফেয়ারি লাইটের সামনে চারজনে পোজ দিল — কখনো হাত তুলে, কখনো চোখ টিপে। সিনথিয়া আর নাবিলা পাশাপাশি দাঁড়াল — নাবিলার হাত সিনথিয়ার কোমরে। ছবি তোলার সময় নাবিলা ফিসফিস করল।
নাবিলা: "এই ছবিটা শুধু আমার।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সে কিছু বলল না — শুধু হাসল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলল।
নাবিলা স্পিকারের ভলিউম বাড়িয়ে দিল। গানের তালে তালে ছাদটা যেন নাচতে লাগল। তানিয়া উঠে দাঁড়াল।
তানিয়া: "নাচবি না?"
সিনথিয়া: "আমি? না রে!"
তানিয়া তার হাত ধরে টানল।
তানিয়া: "আয় না! পরীক্ষা শেষ!"
সিনথিয়া উঠল। প্রথমে লজ্জা লাগছিল, কিন্তু গানের তাল আর মুক্তির আনন্দে শরীর নিজে থেকেই নাচতে লাগল। সে ঘুরল, হাত তুলল, চুল উড়ল বাতাসে। তানিয়া তার সাথে তাল মেলাল। রিয়া হাততালি দিল।
আর নাবিলা — নাবিলা বসে বসে তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটা অন্যরকম ঝিলিক। সিনথিয়া নাচতে নাচতে তার দিকে তাকাল — চোখে চোখ পড়তেই নাবিলা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কিছু একটা ছিল। সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।
এরপর বাজল একটা জোরালো গান। তানিয়া চেঁচিয়ে উঠল।
তানিয়া: "এই গানে না নাচলে পাপ!"
সে নাবিলার হাত ধরে টানল।
তানিয়া: "তুইও আয়!"
নাবিলা: "আমি? না রে!"
তানিয়া: "আয় বলছি!"
নাবিলা উঠল — অনিচ্ছায়, হাসতে হাসতে। চারজনে গোল হয়ে নাচতে লাগল। তানিয়া উদ্ভট স্টেপ দিচ্ছিল — হাত ওপরে তুলে, কোমর দুলিয়ে। রিয়া তার নকল করছিল। সিনথিয়া হাসতে হাসতে নাচছিল। আর নাবিলা — নাবিলা নাচছিল সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে। গানের তালে দুজনের চোখ বারবার মিলছিল।
একবার নাচের ঘূর্ণিতে সিনথিয়া নাবিলার গায়ে হেলে পড়ল। নাবিলা তাকে ধরল — কোমর চেপে। এক মুহূর্ত দুজনে স্থির। চারপাশে গান, হাসি, আলো — কিন্তু ওদের মাঝে শুধু নীরবতা। তারপর তানিয়া চেঁচাল।
তানিয়া: "এই! নাচ!"
দুজনে সরে গেল। কিন্তু সিনথিয়ার কোমরে নাবিলার হাতের গরম ছাপ রয়ে গেল।
গান থামলে সিনথিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বসল। নাবিলা তার দিকে কোল্ড ড্রিংকস এগিয়ে দিল।
নাবিলা: "খা। ঘেমে গেছিস।"
সিনথিয়া: "তুই নাচলি না কেন?"
নাবিলা: "তোকে দেখছিলাম। তুই নাচলে ভালো লাগে।"
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "ওহো! কী চলছে!"
নাবিলা: "চুপ কর!"
সবাই হাসল। রিয়া চকলেট বিলাল। আড্ডা চলল — ভবিষ্যতের প্ল্যান, কোন কোচিং, কে কী পড়বে।
তানিয়া: "আমি তো মেডিকেলের স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছি।"
রিয়া: "আমি ভার্সিটি।"
নাবিলা: "আমি এখনো ভাবিনি। তুই?"
সিনথিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
সিনথিয়া: "দেখা যাক।"
আসলে তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরছিল — এতদিন যাদের সে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, পরীক্ষা শেষে তারা সবাই আবার ফিরে আসবে। ভাবতেই তার শরীরে শিহরণ খেলে গেল।
তানিয়া হঠাৎ চেঁচাল।
তানিয়া: "খেলা খেলবো! ট্রুথ অর ডেয়ার!"
নাবিলা: "ওহো! শুরু হয়ে গেল!"
রিয়া: "আমি খেলব!"
সিনথিয়া হাসল।
সিনথিয়া: "আমিও।"
খালি কোল্ড ড্রিংকসের বোতলটা মাঝখানে রাখা হলো। চারজনে গোল হয়ে বসল। ফেয়ারি লাইটের আলোয় সবার মুখ উজ্জ্বল।
তানিয়া: "নিয়ম জানিস তো? বোতল যার দিকে, সে ট্রুথ না ডেয়ার বাছবে।"
প্রথমে বোতল থামল রিয়ার দিকে।
রিয়া: "ট্রুথ।"
তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "তোর ক্রাশ কে? কলেজে?"
রিয়ার গাল লাল হয়ে গেল।
রিয়া: "বলব না!"
তানিয়া: "বলতেই হবে! নিয়ম!"
রিয়া ফিসফিস করে একটা নাম বলল। সবাই "ওহো" করে উঠল। রিয়া মুখ ঢাকল।
এরপর বোতল ঘুরে থামল তানিয়ার দিকে।
তানিয়া: "ডেয়ার!"
নাবিলা হাসল।
নাবিলা: "ডেয়ার? ঠিক আছে। সিনথিয়াকে কোল্ড ড্রিংকস খাইয়ে দে। হাত দিয়ে না — মুখে ধরে।"
তানিয়া: "এটা কী!"
সবাই হেসে উঠল। তানিয়া বোতলটা মুখে ধরে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে এল। সিনথিয়া হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল, কিন্তু তানিয়া ছাড়ল না। শেষে সিনথিয়া মুখ খুলল, তানিয়া বোতল কাত করল। কোল্ড ড্রিংকস গড়িয়ে পড়ল, কিছুটা সিনথিয়ার ঠোঁট বেয়ে গলায় নামল। সবাই হাততালি দিল।
সিনথিয়া: "তুই পাগল!"
তানিয়া: "ডেয়ার তো ডেয়ার!"
সিনথিয়া গলা মুছল। তার চোখ গেল নাবিলার দিকে — নাবিলা তাকিয়ে আছে। তার চোখে সেই ঝিলিক। সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল।
বোতল আবার ঘুরল। এবার থামল সিনথিয়ার দিকে।
নাবিলা: "ট্রুথ না ডেয়ার?"
সিনথিয়া: "ডেয়ার।"
তানিয়া আর রিয়া একসাথে চেঁচাল।
তানিয়া: "ডেয়ার!"
রিয়া ভাবল এক মুহূর্ত।
রিয়া: "নাবিলার কানে একটা সিক্রেট বল। এমন সিক্রেট যা আমরা শুনতে পাব না।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। সিক্রেট? তার তো হাজারটা সিক্রেট। কিন্তু কোনটা বলবে? সে নাবিলার দিকে এগিয়ে গেল। নাবিলা কান এগিয়ে দিল। সিনথিয়া ফিসফিস করল।
সিনথিয়া: "তুই আজ খুব সুন্দর লাগছিস।"
নাবিলার গাল লাল হয়ে গেল। সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে চোখ। এক মুহূর্ত দুজনে চুপ। তারপর সবাই চেঁচাল।
তানিয়া: "কী বললি? কী বললি?"
নাবিলা: "বলব না! সিক্রেট!"
তানিয়া: "চিটিং!"
নাবিলা সিনথিয়ার হাত চেপে ধরল টেবিলের নিচে। সিনথিয়া চমকে উঠল, কিন্তু হাত সরাল না। নাবিলার আঙুল তার আঙুলে জড়িয়ে গেল। সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলে গেল।
খেলা চলল। বোতল ঘুরল। এবার নাবিলার পালা।
নাবিলা: "ডেয়ার।"
তানিয়া দুষ্টুমি করে হাসল।
তানিয়া: "সিনথিয়ার সাথে ডান্স কর। স্লো ডান্স। এক মিনিট।"
সিনথিয়া: "এই!"
নাবিলা উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়াল।
নাবিলা: "আয়।"
সিনথিয়া ইতস্তত করল এক মুহূর্ত — তারপর নাবিলার হাত ধরল। গান বদলে গেল — একটা নরম সুর। দুজনে ছাদের মাঝখানে দাঁড়াল। নাবিলার এক হাত সিনথিয়ার কোমরে, আরেক হাত তার হাতে। সিনথিয়ার হাত নাবিলার কাঁধে।
ওরা নাচতে লাগল। ধীরে। ফেয়ারি লাইটের আলোয়। তানিয়া আর রিয়া হাততালি দিচ্ছে, শিস দিচ্ছে। কিন্তু সিনথিয়ার কানে সেসব যাচ্ছিল না। সে শুধু নাবিলাকে অনুভব করছিল — তার শরীরের গরম, তার নিঃশ্বাস, তার কোমরে রাখা হাতটা একটু বেশিই চেপে ধরেছে।
নাবিলা ফিসফিস করল।
নাবিলা: "তুই কাঁপছিস।"
সিনথিয়া: "না।"
নাবিলা: "মিথ্যা বলিস না।"
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। নাবিলার ঠোঁট তার কানের এত কাছে — একটু এগোলেই ছুঁয়ে যাবে। সে চোখ বন্ধ করল। এক মিনিট যেন এক ঘণ্টা।
গান থামল। সবাই হাততালি দিল। দুজনে সরে গেল — কিন্তু সিনথিয়ার কোমরে নাবিলার হাতের ছাপ যেন রয়ে গেল।
তানিয়া: "তোরা দুজন তো পুরো কাপল!"
রিয়া: "সত্যিই! তোদের দেখে মনে হয় তোরা আলাদা হতেই পারবি না।"
নাবিলা: "পারব না তো।"
সিনথিয়া নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলা হাসছে — কিন্তু চোখে সেই গভীর কিছু।
তানিয়া হঠাৎ নতুন খেলার প্রস্তাব দিল।
তানিয়া: "স্টেয়ার গেম খেলবি? দুজন দুজনের চোখে তাকিয়ে থাকবি। যে আগে চোখ সরাবে বা হাসবে, সে হারবে।"
রিয়া: "আমি তানিয়ার সাথে!"
তানিয়া আর রিয়া মুখোমুখি বসল। দশ সেকেন্ডও টিকল না — তানিয়া হেসে ফেলল।
তানিয়া: "তোর চোখে কী আছে রে! হাসি পায়!"
সবাই হাসল। এবার পালা সিনথিয়া আর নাবিলার। দুজনে মুখোমুখি বসল — হাঁটুতে হাঁটু ঠেকে গেল।
নাবিলা: "রেডি?"
সিনথিয়া: "রেডি।"
দুজনে চোখে চোখ রাখল। সময় থমকে গেল। সিনথিয়া দেখল নাবিলার চোখের গভীরে — সেই চেনা আগুন, সেই অধিকারবোধ, সেই ভালোবাসা। নাবিলার ঠোঁটে হালকা হাসি। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। সে হাসতে চাইল না — কিন্তু ঠোঁট কাঁপছিল।
তানিয়া: "দশ সেকেন্ড!"
রিয়া: "পনেরো!"
তানিয়া: "বিশ! ওরা তো হারছেই না!"
ত্রিশ সেকেন্ড পার হলো। দুজনে তখনো তাকিয়ে। সিনথিয়ার চোখে পানি এসে গেল — না হাসির, না কান্নার — কিছু একটা। নাবিলা ধীরে তার হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার গাল ছুঁল।
নাবিলা: "তুই হারলি।"
সিনথিয়া: "কেন?"
নাবিলা: "তোর চোখে পানি।"
সিনথিয়া হেসে ফেলল। সবাই হাততালি দিল। কিন্তু সিনথিয়ার গালে নাবিলার আঙুলের ছোঁয়া রয়ে গেল — গরম।
তানিয়া: "তোদের খেলা দেখে মনে হচ্ছে আমরা এক্সট্রা!"
নাবিলা সিনথিয়ার হাত ধরল।
নাবিলা: "তোরা তো আছিসই।"
খেলা আরও চলল। ডেয়ারগুলো আরও দুষ্টু হলো।
তানিয়ার ডেয়ার পড়ল — তাকে একজন স্যারের নকল করতে হবে। তানিয়া উঠে দাঁড়িয়ে গলা গম্ভীর করে বলল।
তানিয়া: "এই! পেছনে কী কথা! খাতা দাও!"
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। রিয়া হাসতে হাসতে বলল।
রিয়া: "একদম স্যারের মতো!"
এরপর বোতল থামল সিনথিয়ার দিকে।
তানিয়া: "ট্রুথ! আর পালাবি না!"
সিনথিয়া: "আচ্ছা, ট্রুথ।"
রিয়া একটু ঝুঁকে এল।
রিয়া: "সত্যি বল — আজকাল কাউকে মিস করছিস?"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। কাউকে মিস? তার মাথায় একসাথে কত মুখ ভেসে উঠল। সে হাসল — একটু বেশি জোরে।
সিনথিয়া: "তোদের সবাইকে!"
তানিয়া: "মিথ্যা! চোখে দেখা যাচ্ছে!"
সিনথিয়া: "সত্যি বলছি!"
নাবিলা তার দিকে তাকাল — গভীর দৃষ্টিতে। যেন বলছে, আমি জানি। সিনথিয়া চোখ সরিয়ে নিল।
তানিয়া: "ছেড়ে দিলাম। কিন্তু একদিন বলতেই হবে!"
একে অপরকে চকলেট খাইয়ে দেওয়া, চোখ বেঁধে কণ্ঠ চেনা, কানে ফিসফিস করে প্রশংসা করা — প্রতিটা ডেয়ারে সিনথিয়া আর নাবিলা যেন একটু বেশিই জড়িয়ে যাচ্ছিল। তানিয়া আর রিয়া খেয়াল করছিল — আর টিজ করছিল।
তানিয়া: "তোরা দুজন বিয়ে করে ফেল!"
সিনথিয়া: "চুপ কর!"
কিন্তু তার গাল লাল। নাবিলা হাসছিল।
সময় গড়িয়ে গেল। রাত দশটা বাজতেই রিয়ার ফোন বাজল।
রিয়া: "মা ফোন করেছে। আমাকে যেতে হবে।"
তানিয়া: "আমিও যাই। বাবা রাগ করবে।"
নাবিলা: "আরেকটু থাক না!"
রিয়া: "না রে, কাল আসব।"
তানিয়া সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
তানিয়া: "তুই থাকছিস?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ, আজ এখানেই থাকব।"
তানিয়া চোখ টিপল।
তানিয়া: "ওহো! নাইট স্টে!"
সিনথিয়া: "যা তো!"
রিয়া আর তানিয়া চলে গেল। সিনথিয়া আর নাবিলা তখনই নিচে নামল না। দুজনে ছাদের কিনারায় বসল — পা ঝুলিয়ে। নিচে রাস্তায় রিকশার টুংটাং, দূরে শহরের আলো। ওপরে তারা। ফেয়ারি লাইটের মালা হালকা দুলছিল বাতাসে।
নাবিলা: "ভালো লাগল আজ।"
সিনথিয়া: "আমারও।"
নাবিলা: "পরীক্ষার পর প্রথমবার মনে হলো — আমরা আবার আমরা।"
সিনথিয়া নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে। তার মুখে নরম আলো।
সিনথিয়া: "আমরা তো সবসময় আমরাই।"
নাবিলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
নাবিলা: "তাই থাকিস। কখনো বদলাস না।"
সিনথিয়ার বুকটা মুচড়ে উঠল। বদলাস না? সে তো কত বদলে গেছে — নাবিলা জানে না কতটা। সে নাবিলার হাত ধরল।
সিনথিয়া: "তুই থাকলে আমি ঠিক থাকব।"
দুজনে চুপ করে বসে রইল। বাতাসে ফেয়ারি লাইটের ঝলকানি। সিনথিয়া ভাবল — এই মুহূর্তটা যদি থেমে থাকত। কোনো গোপন নেই, কোনো ভয় নেই — শুধু তার সবচেয়ে কাছের মানুষটা।
নাবিলা: "চল, নিচে যাই। ঠান্ডা লাগছে।"
সিনথিয়া: "চল।"
ছাদে নীরবতা নামল পেছনে। শুধু ফেয়ারি লাইটের ঝলকানি আর দূরে শহরের আওয়াজ রইল। সিনথিয়া আর নাবিলা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।
নাবিলা: "শেষ। শুধু আমরা।"
সিনথিয়া: "শুধু আমরা।"
দুজনে একে অপরের দিকে তাকাল। বাতাসে কিছু একটা ভাসছিল — পুরনো, চেনা, গরম।
নাবিলা উঠে দাঁড়াল।
নাবিলা: "চল, গোছাই।"
দুজনে মিলে প্যাকেট গোছাল, বোতল তুলল, কুশন ভাঁজ করল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল — ইচ্ছে করে, নাকি অনিচ্ছে — কে জানে। প্রতিবার ছোঁয়ায় সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলছিল।
শেষ চকলেটটা নিয়ে দুজনে কাড়াকাড়ি লাগাল। নাবিলা চকলেটটা উঁচিয়ে ধরল।
নাবিলা: "আমার!"
সিনথিয়া: "আমার!"
সিনথিয়া লাফিয়ে চকলেটটা নিতে গেল — পা পিছলে নাবিলার গায়ে পড়ল। দুজনে মাদুরে গড়িয়ে পড়ল, হাসতে হাসতে। নাবিলা সিনথিয়ার ওপরে — চকলেটটা তখনো হাতে। সে চকলেটটা ভেঙে অর্ধেক সিনথিয়ার মুখে ধরল।
নাবিলা: "নে, খা।"
সিনথিয়া মুখ খুলল। নাবিলার আঙুল তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল। দুজনে এক মুহূর্ত চুপ। নাবিলার চোখ সিনথিয়ার ঠোঁটে। তারপর সে সরে গেল — উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়াল।
নাবিলা: "ওঠ।"
সিনথিয়া তার হাত ধরল। বুক ধড়ফড় করছিল। নাবিলা ফেয়ারি লাইটের সুইচ একটা একটা করে নেভাতে লাগল। ছাদটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবল — শুধু দূরের শহরের আলো রইল।
নিচে নেমে নাবিলা দরজা বন্ধ করল। পুরো বাসা খালি — নীরব। শুধু দুজনের পায়ের শব্দ।
নাবিলা: "মা কাল সকালে আসবে। পুরো রাত আমাদের।"
সিনথিয়া: "পুরো রাত?"
নাবিলা: "পুরো রাত।"
নাবিলার ঘরে ঢুকে সিনথিয়া ব্যাগটা রাখল। ঘরটা চেনা — কত রাত সে এখানে কাটিয়েছে। বিছানা, জানালা, সেই আয়না। তার বুক ধড়ফড় করছিল।
নাবিলা আলমারি খুলে একটা টি-শার্ট আর পাজামা বের করল।
নাবিলা: "নে, চেঞ্জ কর।"
সিনথিয়া: "তুই?"
নাবিলা: "আমিও করছি।"
দুজনে একে অপরের দিকে পিঠ করে দাঁড়াল — কিন্তু আয়নায় চোখ পড়তেই দুজনে হেসে ফেলল। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি।
সিনথিয়া: "তুই দেখছিস!"
নাবিলা: "তুইও!"
দুজনে হাসতে হাসতে চেঞ্জ করল। সিনথিয়া টি-শার্টটা পরল — নাবিলার টি-শার্ট, একটু বড়, কাঁধ থেকে ঝুলছে। নাবিলা তাকিয়ে রইল।
নাবিলা: "তোকে আমার জামায় ভালো লাগে।"
সিনথিয়া: "তোর সবকিছুতেই আমাকে ভালো লাগে।"
নাবিলা: "সত্যি।"
দুজনে বিছানায় বসল। নাবিলা চুল খুলল। সিনথিয়া তার চুলে হাত বুলাল — অভ্যাসবশত। নাবিলা চোখ বন্ধ করল।
সিনথিয়া: "মনে আছে? ক্লাস এইটে তোর চুলে জট পড়েছিল, আমি আধঘণ্টা ধরে ছাড়িয়েছিলাম।"
নাবিলা: "মনে আছে। তুই রেগে গিয়ে বলেছিলি — আর কোনোদিন চুল বাঁধবি না।"
সিনথিয়া: "আর তুই পরদিনই খোঁপা করে এসেছিলি।"
দুজনে হাসল। সিনথিয়া নাবিলার চুলে আঙুল চালাতে লাগল — ধীরে, আদরে। নাবিলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
নাবিলা: "তখন সব কত সহজ ছিল, না?"
সিনথিয়া: "এখন কঠিন?"
নাবিলা: "এখন... অন্যরকম।"
সিনথিয়া কিছু বলল না। সে জানত নাবিলা কী বলতে চাইছে। পরীক্ষার এই কটা মাসে ওদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল — পড়া, টেনশন, আর সিনথিয়ার গোপন জীবন। নাবিলা সব জানে না। অনেক কিছুই জানে না।
সিনথিয়ার ফোনটা বাজল। মায়ের মেসেজ।
মা: "পৌঁছেছিস? খেয়েছিস?"
সিনথিয়া টাইপ করল।
সিনথিয়া: "হ্যাঁ মা। খেয়েছি। তুমি ঘুমাও।"
মা: "আচ্ছা। সাবধানে থাকিস।"
ফোনটা রেখে সিনথিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাবিলা তার দিকে তাকাল।
নাবিলা: "মা?"
সিনথিয়া: "হ্যাঁ। গুড নাইট বলে দিলাম।"
নাবিলা: "আমার মাও ফোন করেছিল। বললাম সব ঠিক আছে।"
দুজনে চুপ করে বসল এক মুহূর্ত। জানালা দিয়ে রাতের বাতাস আসছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। নাবিলা সিনথিয়ার কোলে মাথা রাখল। সিনথিয়া চমকে উঠল — তারপর হাত বাড়িয়ে নাবিলার মাথায় হাত রাখল।
নাবিলা: "এইভাবে থাকি কিছুক্ষণ?"
সিনথিয়া: "থাক।"
নাবিলার নিঃশ্বাস তার পেটে লাগছিল — গরম। সিনথিয়ার শরীরে শিহরণ খেলে গেল। সে নাবিলার চুলে হাত বুলাতে লাগল। পুরনো অভ্যাস। পুরনো টান। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম লাগছিল — বাতাসে কিছু একটা ছিল।
নাবিলা: "মিস করেছি তোকে। পরীক্ষার সময়।"
সিনথিয়া: "আমিও। খুব।"
নাবিলা: "ফোনেও ঠিকমতো কথা হয়নি।"
সিনথিয়া: "মা পাশে থাকত।"
নাবিলা তার দিকে ঘুরল।
নাবিলা: "এখন মা নেই। কেউ নেই।"
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করল। নাবিলার চোখে সেই চেনা আগুন — যা সে «নাবিলার ঘর»-এ দেখেছিল, «দ্বিতীয়বার»-এ দেখেছিল। তার শরীর গরম হয়ে গেল।
সিনথিয়া: "নাবিলা..."
নাবিলা এগিয়ে এল। তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটের এক ইঞ্চি দূরে থামল।
নাবিলা: "বল। থামতে বললে থামব।"
সিনথিয়া কিছু বলল না। সে শুধু চোখ বন্ধ করল।
আর ঠিক তখনই — নাবিলার ফোনটা বাজল। টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। দুজনে চমকে উঠল। নাবিলা ফোনটার দিকে তাকাল — তারপর তার ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি ফুটল।
সিনথিয়া: "কে?"
নাবিলা ফোনটা হাতে নিল। মেসেজটা পড়ল। তার হাসি আরও গভীর হলো। সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
নাবিলা: "একজন আসছে।"
সিনথিয়া: "এত রাতে? কে?"
নাবিলা উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগোল।
নাবিলা: "দেখবি।"
দরজায় টোকা পড়ল — হালকা, তিনটে টোকা। নাবিলা দরজার দিকে হাত বাড়াল। সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল। কে আসতে পারে এত রাতে? নাবিলার হাসি দেখে মনে হচ্ছে — সে জানে। সে আগে থেকেই জানত।
নাবিলা: "রেডি?"
(চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)