27-09-2026, 07:28 PM
মাঝে মাঝে বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে তার অতি ছেলেবেলার ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যগুলি। বাবার হাত ধরে মায়ের সংগে পুজোর প্যান্ডেলে গিয়ে পুজো দেখতে গেছে সে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে। একটু হাঁটলেই পায়ে ব্যাথা করত। বাবা তাকে কাঁধে চড়িয়ে দুই পা ধরে পুজো দেখত। মনে আছে একবার দশেরার বাজি পুড়োন দেখতে গেছিল তারা সবাই মিলে। একটা বড় মাঠে। কী উজ্জ্বল বাজির আলো। তার চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল। দুই চোখ বুজে ফেলেছিল সে। তারপর কী ভীষণ শব্দে বাজি ফাটতে শুরু করেছিল। তার বুক দুরু দুরু করে কাঁপছিল। কিন্তু ভীষণ মজা হচ্ছিল তার।
কেমন আছে বাবা এখন? শেষবার বাবাকে দেখছিল সে সাড়ে পাঁচ বছর আগে। তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সে। প্রায় অজ্ঞান, মাতাল হয়ে রিক্সায় শুয়ে তাদের বস্তির ঘরে ফিরছিল পরেশ। অসহায় হাঁ মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে লালা, মুখ ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। তার নাম, মায়ের নাম ধরে ডেকে ডেকে বিলাপ করে কাঁদছিল পরেশ। আবার হাহা করে ওঠে, যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে সঞ্জয়ের বুক। আর কি ফেরার রাস্তা একেবারেই নেই? তাদের জীবন থেকে অদৃশ্যই থাকবে তার জন্মদাতা বাবার উপস্থিতি?
বার্থডে সেলিব্রেশনের বড় একটা প্যাস্ট্রি অফিসের থেকেই আনার ব্যবস্থা করেছিল তাদের টিম লিড তনুশ্রী।
বিকেল চারটের দিকে তাদের ডিপার্টমেন্ট হেড বিজয় শর্মা সবার আগে অফিসের যে কোনও সেলিব্রেশনের জন্য নির্দিষ্ট ফাঁকা জায়গাটিতে এসে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে তারপর শখানেক সহকর্মীর ভিড় জমে যায় – তাদের বেশির ভাগই কম বয়েসী যুবক যুবতী। দেড়শো জনের ডিপার্টমেন্ট তাদের ন্যাশানাল গ্রিডের অ্যাকাউন্ট, প্রতি সপ্তাহে দুতিনজনের জন্মদিন পড়ে। আজ আর কারও নেই। সঞ্জয়কে আজ তাই সেলিব্রেশনের মধ্যমণি হয়ে একাই প্যাস্ট্রিটা কাটতে হল। সুমিত্রা কাল রাতেই অফিসে দেওয়ার জন্যে একটি কেক তৈরি করেছিল ও সকালে অফিসে আসার আগে সঞ্জয়ের হাতে সেটা মনে করে ধরিয়ে দিয়েছিল। সঞ্জয় সেটা বের করে দিতেই তার উপরেই সবাই হামলে পড়ে।
“মিসেস বানিয়েছেন? অপূর্ব!” বিজয় শর্মা সুমিত্রার বানানো কেকে এক কামড় দিয়ে বলে।
“আমি সুমিত্রাদির কাছ থেকে একদিন শিখে নেব রেসিপি,” তনুশ্রী সঞ্জয়ের চোখে চোখ রাখে।
“হ্যাঁ, আমাদের অফিসে অনেক নিরামিষাশী আছেন জেনে ডিম ছাড়াই বানিয়েছে ও,” সঞ্জয় উজ্জ্বল মুখে হাসে।
“তাই নাকি? এটা ডিম ছাড়া কেক! তাহলে তো শিখতেই হচ্ছে!” শ্যামলী সুদর্শনা তনুশ্রীর দুই চোখে খুশির ঝিলিক খেলে। তারপর আচমকাই সঞ্জয়ের চোখের গাঢ় দৃষ্টি রাখে সে। স্থির দৃষ্টি ধরে রাখে নির্বাক দু মুহূর্ত। সঞ্জয়ের বুক ধ্বক্ করে ওঠে। হতচকিত চমকে যায় সে। মা যা বলে তা কি সত্যি? তনুশ্রী তার প্রতি অনুরক্তা?
“হ্যাপি বার্থডে!” অভিজিৎ এসে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে। সঞ্জয়ের চিন্তায় চ্ছেদ পড়ে। তারপরেই অন্যান্যদের অভিনন্দন বার্তায় সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়।
“সঞ্জয়, মেনি হ্যাপি রিটার্নস,” তিলোত্তমা এগিয়ে আসে। তারপর একে একে সবার শুভেচ্ছায় সঞ্জয় প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মিনিট কয়েকের জন্যে - সূর্যশেখর, অনিমেষ, জয়িতা, মাধবী, দর্পনারায়ণ, সুনীল, অলকানন্দা।
তবে তার বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল দিনের শেষের জন্য, পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ার ঠিক আগেই একটা ইমেইল ঢুকল তার ইনবক্সে।
“শুভ জন্মদিন” সাবজেক্ট লেখা বাংলায়। ফ্রম সমুদ্র বসু। চকিতে মোবাইলে ঘড়ি দেখে সঞ্জয়। এখন তো সকাল সাড়ে সাতটা বাজে বোস্টনে। ডে লাইট সেভিং টাইম চলছে। সমুদ্রদা অফিসে এসে গেছে? সমুদ্র, তাদের সিস্টেম আর্কিটেক্ট, সাধারণতঃ একটু দেরিতে অফিসে আসে। নটা নাগাদ। তবে কনফারেন্স কল থাকলে একটু আগে আসে। আজ তো কোনও কোনও কল নেই!
“হাই সঞ্জয়, আই নো ইউ আর পারহ্যাপ্স নাউ হেডিং হোম। উইল কল ইউ লেট ইভিনিং – সমুদ্র,” সমুদ্রদা তাকে খুবই পছন্দ করে। সেটা গত অগাস্টে তাদের ইউ এস ট্যুর এর সময়তেই জানা হয়ে গিয়েছিল সকলের। কন-কলগুলোতে সঞ্জয় বুঝতে পারে যে সমুদ্রদা তার কন্ট্রিবিউশনটা সব সময়ই শুনতে চায়।
কোম্পানির বাস তাকে যথারীতি সঞ্জয়কে তাদের আবাসনের কাছের মোড়ে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে হেঁটে ফিরতে ফিরতে বাবার চিন্তা আবার সঞ্জয়ের মনে ফিরে এসে চেপে ধরে।
বাবার কথা ভাবলে বুকে সবসময়ই একটা হাহাকার উঠছে ইদানিং। কেন সে জানে না তার মনে হয় বাবা দুর্ভাগ্যের শিকার। বাবা মানুষটা অতটা খারাপ নয়, যতটা খারাপ ছিল তার স্বভাব। নাহলে যখন পরেশের চাকরি ছিল, সেই বিস্মৃতপ্রায় অতীতে বাবার সেই স্নেহময় রূপ – তা তো মিথ্যা নয়। সঞ্জয়ের প্রবল ইচ্ছে করে বাবাকে ডেকে নেয় সে তাদের মধ্যে। কিন্তু আবার ভয়ও করে ততোধিক।
কারণ তার মনে দগদগে হয়ে রয়েছে পাঁচ বছর আগের স্মৃতি। তার এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার তৃতীয় বর্ষ তখন। মাকে বলেছিল সে বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার কথা। প্রবল অনিচ্ছা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও সুমিত্রা ছেলের কথামত পরেশের কাছে গিয়েছিল। তার ফলাফল হয়েছিল এমন সাঙ্ঘাতিক যে সঞ্জয় বাবার কথা আর সুমিত্রা কাছে পাড়তেও পারবে না আর মনে হয় কোনওদিন। কোনওমতে চরম নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনা এড়িয়ে সুমিত্রা ফিরে এসেছিল সেদিন বাড়িতে।
সেই বিকেলে গঙ্গার নির্জন ঘাটে বসে সুমিত্রা নিজের বুকের আঁচল সরিয়ে ছেলেকে দেখিয়েছিল তার পিতৃদেবের কীর্তি। তার জান্তব অত্যাচার ও অবমাননার নখরাঘাতে চিরে যাওয়া বক্ষদেশ।
তার দেহের সেই কয়েক মুহূর্তের চরম পাশবিকতার চিহ্নের হয়ত নিরাময় হয়েছিল সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে। কিন্তু তার মনে যে দগদগে দাগ পড়েছিল তা মুছে যাবার নয়। হয়ত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে সারাজীবন।
সঞ্জয়ের মনে পড়ে যে গঙ্গার ঘাটে বসে সেই পড়ন্ত বেলায় সে মার কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেছিল। প্রতিজ্ঞা করেছিল যে সেই মুহূর্ত থেকে তাদের জীবনে বাবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব তার।
অতীতের বিষময় স্মৃতি ও রক্তের অমোঘটানের সঙ্ঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় সঞ্জয়। কেউ জানে না। কেউ জানতে পারে না। মাও না।
।। ৫ ।।
“এস,” সঞ্জয় কলিং বেল টিপতে সুমিত্রা তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেয়।
মার অপসৃয়মান সবুজ হলুদ ছাপা আটপৌরে সুতির শাড়ি পরিহিত শরীরের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে দেখে সঞ্জয়। গায়ে কালো ব্লাউজ। গর্ভাবস্থায় সাধারণতঃ হাউজকোট পরে থাকে সে। তার জন্মদিন, তাই বোধহয় শাড়ি।
সাতাশ সপ্তাহের গর্ভবতী সুমিত্রার দেহ আর একটু ভারি দেখতে লাগছে ও আর একটু যেন শ্লথগতি। খুবই স্বাভাবিক। গত পরশু, রবিবার সুমিত্রার ওজন করেছিল সঞ্জয়। এক কেজি বেড়েছে গত এক মাসে। এখন ঊনসত্তর কেজি হয়েছে। আগামি সপ্তাহ থেকে শুরু হবে তার গর্ভাবস্থার তৃতীয় ও চূড়ান্ত ত্রৈমাসিক।
সুমিত্রা গিয়ে ওদের ডাইনিং টেবিলে একটি চেয়ারে গিয়ে বসে। সেখানে কটি চেয়ারে বসে একজন মধ্য তিরিশের যুবতী নারী। একটি লাল, হলুদ ও নীলে মেশানো সিন্থেটিক শাড়ি পরা। হাতে অবাঙালি গোছে পরা অনেক রঙ বেরঙের কাচের চুড়ি। সিঁথিতে তার মেটে সিঁদুর। অন্য চেয়ারটিতে একটি কিশোরী মেয়ে। সে একটি সুদৃশ্য জংলা রঙের ফ্রক পরে রয়েছে।
সঞ্জয় তার ল্যাপটপটা তাদের থ্রি সিটার সোফায় রেখে পায়ের জুতোমোজা খুলে শুশেলফে তুলে রাখে। বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধোয় প্রতিদিনের মত সাবান দিয়ে। সুমিত্রার সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে আলাপরতা ভদ্রমহিলার দিকে একগাল হেসে তাকায়। যুবতী নারীটিও হেসে মাথা নাড়ান।
“ওগো, ইনি শালিনী রাই, আমাদের নিচের তলায় থাকেন। রোজ সকালে হাঁটতে গিয়ে আমাদের আলাপ। আর এই যে এনার মেয়ে লক্ষ্মী,” সুমিত্রা আলাপ করিয়ে দেয়।
সঞ্জয় হাত দুটো জড় করে নমস্কার করে। শালিনীও হেসে প্রতি নমস্কার করেন। মেয়েটিকে সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, “কোন ক্লাসে পড় তুমি লক্ষ্মী?”
“ক্লাস সেভেনে,” লক্ষ্মী মাথা নত করে লাজুক হাস্যমুখে উত্তর দেয়।
সঞ্জয় তাদের শোবার ঘরে ঢোকে। ভিতরের বাথরুমে গিয়ে অফিসের জামাকাপড় ছেড়ে একটি বক্সার প্যান্ট ও সবুজ টি শার্ট পরে। তারপর আবার শোবার ঘর থেকে বেরোয়। ডাইনিং স্পেসে ওদের পেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখে সংযুক্তা ও তার মেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার দিকে তাকায় ওরা। সঞ্জয় তাই দেখে থেমে দাঁড়ায়।
“দাদা, আমরা আজ আসি তাহলে, দিদির সংগে কথা বলে খুব ভাল লাগল,” শালিনী তার দিকে হেসে বলে। তার বলার ভঙ্গিতে সামান্য হিন্দিভাষী টান।
“আপনি খুব ভালো বাংলা বলেন,” সঞ্জয় হেসে বলে।
“চোদ্দ বছর হোয়ে গেল কোলকাতায় আছি আমি, এর জনম এখানেই,” শালিনী মেয়ের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে হেসে তাকায়।
“দাঁড়াও তোমাকে চা দিই,” সুমিত্রাও তার চেয়ার থেকে উঠে পড়ে।
সঞ্জয় হেসে বলে, “আবার আসবেন,” দরজার দিকে পা বাড়ায় সে।
মহিলাটিও পা বাড়ায়, “অবশ্যই। দিদিও তাই বলেছিল, কথা বলতে খুব ভালবাসে দিদি। আমার খুব ভাল লাগে। কত পড়াসুনা আছে দিদির!” শালিনীর গলায় প্রশংসা ফোটে।
সদর দরজা বন্ধ করে রান্নাঘরে এসে সঞ্জয় দেখে আঁচে জল বসিয়ে দিয়েছে সুমিত্রা। একটু পরেই ফুটতে শুরু করবে।
পাশে দাঁড়াতে সুমিত্রা ঘুরে দুহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। তার হাতের শাঁখাপলার ঝনক শব্দ সঞ্জয়ের কানে সঙ্গীতের মত বাজে বরাবরের মত। সে বামহাতে সুমিত্রার কোমর বেষ্টন করে আর আঁচলের আবরণ সরিয়ে দিয়ে তার স্ফীত উদরের নগ্ন ত্বকে অন্য হাত বুলোয় পরম আদরে। তারপর সুমিত্রার তুলে ধরা ওষ্ঠাধরে নামিয়ে আনে নিজের ঠোঁটদুটো। সুমিত্রা দুইচোখ বন্ধ করে ফেলে আবেশে। ধীরে ধীরে তার কুন্ঠিত লাজুক জিভ প্রবেশ করে তার সন্তানের মুখগহ্বরে। অনুভব করে ছেলের ডান হাত অচিরেই উঠে এসেছে তার বাম স্তনে। আঁচলের আবরণীর উপর দিয়ে ধীর লয়ে সঞ্জয় মর্দন করে মার স্তন। ক্ষণকাল পরেই চুম্বনরত দুই নরনারীর নিবিড় নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে যায় উনুনে চাপানো চায়ের ফুটন্ত জলের শব্দে।
“দাঁড়া সোনা, চায়ের জল হয়ে গেছে,” সুমিত্রা ছেলের বুকে হাত দিয়ে বিযুক্ত হয়। মুখ উপরে তুলে লাজুক হাসে। ডান হাত তুলে ছেলের ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা থুতু মুছে দেয় স্নেহের সঙ্গে।
চা তৈরি হয়ে গেলে সঞ্জয় দুহাতে দুটো বড় বড় কাপ চা নিয়ে গিয়ে তাদের ডাইনিং টেবিলে গিয়ে রাখে। তারপর আবার রান্নাঘরে ফিরে যায়।
আজ সুমিত্রা দুপুরের খাওয়ার পর দুটো তিনটে নাগাদ জন্মদিনের পায়েস রান্না করেছে একটা স্টিলের ডেচকিতে। তার প্রিয় গোবিন্দভোগ চালের পায়েস। সঞ্জয়ের মনে পড়ে আবার বহুদিন আগের প্রায় বিস্মৃত সেই ছেলেবেলার সুখস্মৃতি। এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ডেকচি থেকে দুই হাতা পায়েস একটা পোর্সেলিনের বাটিতে স্থানান্তর করে সে সঞ্জয়ের হাতে তুলে দেয়, “নে খা সোনা!” গভীর মায়াভরা চোখে ছেলের চোখে দৃষ্টি রাখে সুমিত্রা।
“খাইয়ে দাও মা,” সঞ্জয় আবদারের সুরে দুই চোখ বুজে হাঁ করে। সুমিত্রা চেয়ারে বসা ছেলের গায়ে ঘেঁষে দাঁড়ায়। সঞ্জয় তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করে তার বাম কাঁধে মায়ের স্তনের মৃদু ভারি নরম ছোঁয়া, বাম হাতের কনুইয়ে মার স্ফীত উদরে আলতো স্পর্শ। সে মাথা এলিয়ে দেয় মার বুকে। সুমিত্রা বাম হাতে চামচ ধরে বাটিটা থেকে একটু পায়েস তোলে। সন্তানের হাঁ মুখে পায়েস শুদ্ধ চামচ ঢুকোতে সঞ্জয় মুখ বন্ধ করে। অসীম তৃপ্তির সঙ্গে চুষে, চিবিয়ে ধীরে ধীরে খায়। বাম হাতে বেষ্টন করে ধরে মার কোমর। খেতে খেতে সেই হাতে মার তপতপে নরম নিতম্ব দলন করে সে খেয়াল মত। মুখের মিষ্টান্ন গলাধঃকরণ করার পর মুখ আপনা আপনিই হাঁ করে আবার। আবার সুমিত্রা পায়েস খাইয়ে দেয় তাকে।
“নে হল তো! এবারে চা টা খাই আমরা দুজনে। বল অফিসে আজ কি হল বল,” সুমিত্রা ছেলেকে খাইয়ে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসে বলে। সঞ্জয় মায়ের দিকে চায়। কি সুন্দর দেখতে লাগছে মাকে। ডিম্বাকৃতি মুখ আবার একট ভরাট হয়ে এসেছে বুঝি গত এক মাসে। সারাদিনের পরিশ্রমে সামান্য ঘর্মাক্ত মুখ উজ্জ্বল প্রতিমার মত।
“মা, জানো আজ সমুদ্রদা লিখেছে ফোন করবে সন্ধ্যার পর!” সঞ্জয় অফিসের সব ঘটনা জানানোর শেষে বলে।
সুমিত্রাকে ও গল্প করেছে গত আমেরিকা ভ্রমণের। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে তার মা শুনেছে সব। অবাক হয়েছে। কল্পনায় দেখেছে সম্পূর্ণ এক নতুন দেশের ছবি। যেন রূপকথার মত। সঞ্জয়ের মুখে সমুদ্রকে নিয়ে সুমিত্রা এত গল্প শুনেছে যে তার খুবই চেনা মনে হয় মানুষটাকে। এও জানে তার ছেলে সমুদ্রের খুবই প্রিয়পাত্র।
সুমিত্রা ঘরের দেয়াল ঘড়িটা দ্রুত দেখে। সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে! এত তাড়াতাড়ি তাদের দুজনের এই কথোপকথনের সময়টা শেষ হয়ে যায় রোজ! বুকে একটু উষ্মা উৎপন্ন হয় তার।
“সন্ধ্যা তো হয়ে গেছে কখন! তোর ফেরার আগেই তো রোজ আমার প্রদীপ দেখানো হয়ে যায়,” সুমিত্রা বলে।
আচম্বিতে সঞ্জয়ের ফোন শব্দ করে বেজে ওঠে।
অচেনা নম্বর। বিদেশের নয়। দেশেরই।
“হ্যালো!” সঞ্জয় ফোনটা তুলে বলে।
“বাপধন, শুনতে পাচ্ছ?” প্রায় অচেনা পুরুষকন্ঠ হলেও তাকে বাপধন নামে একজনই ডাকে। ছোটমামা। আর ছোটমামিও বেটে কিন্তু ছোটমামি তো পুরুষ নন, নারী।
“ছোটমামা?” সঞ্জয়ের গলায় বিস্ময় মিশ্রিত জিজ্ঞাসা।
“হ্যাঁ বাপধন। তোমার ছোটমামা বলছি। মা সঙ্গে আছে?” দীনবন্ধুর গলা শোনা যায় ফোনের অপর প্রান্তে।
“হ্যাঁ, ছোটমামা, মার সঙ্গে কথা বলবে তুমি?” কথা বলতে বলতে মার দিকে চোখ তুলে তাকায় সঞ্জয়।
তারা দেশে গেছিল গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। আজ প্রায় ছয় মাস পরে হঠাৎ ফোন ছোড়দার। তাছাড়া ফোনও তো ব্যবহার করত না ওই বাড়িতে কেউ। যদিও সঞ্জয়ের ফোন নিয়ে নিয়েছিল ওরা এখানে সুমিত্রারা ফেরত আসার আগে। কিছু বিপদ হয়নি তো? সুমিত্রা ছেলের মুখে মামার নাম শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
সে হাত বাড়ায় ছেলের দিকে। কথা বলতে চায়।
সঞ্জয় ফোনটা মায়ের হাতে তুলে দেয়।
“হ্যাঁ দাদা বলো। কেমন আছ তুমি? বৌঠান কেমন আছে, মলয়ের কি খবর, কেমন আছে তারা?” সুমিত্রা এক নিঃশ্বাসে দ্রুত প্রশ্নগুলো করে।
সঞ্জয় মার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে ছোটমামার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে মায়ের চেহারার পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। একবার যেন বলল, “কি হয়েছে বৌঠানের?”
তারপর শুনল ফোনের ও ধারের কথা। আর বলল, “তা রামপুরহাটের ডাক্তার কি বলল?”
তার একটু পর থেকে মা আর কথা বলছে না প্রায়। কেবল শুনছে আর অস্ফুটে বলছে দুএক শব্দ, “হ্যাঁ”, “তাহলে?” “কবে?”
মধ্য অক্টোবরের সন্ধ্যার প্রায় শীতল আবহাওয়া। মাথার উপরে ধীর লয়ে বৈদুতিক পাখা ঘুরছে। অথচ সুমিত্রার কপালে ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সঞ্জয় একটু সরে গিয়ে মার গা ঘেঁষে বসে। সুমিত্রা হাত বদল করে বাম হাতে ধরে ফোনটা। ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে ছেলের বাম হাত। বরফের মত ঠান্ডা হাত। সঞ্জয়ের বুক ছ্যাঁত করে ওঠে।
কি ব্যাপার? সে বাম হাতের আঙুলে আঁকড়ে মায়ের হাতের প্রতিটা আঙুল।
“হ্যাঁ দাদা, রাখছি দাদা, আমি সঞ্জুকে জানিয়ে দিচ্ছি দাদা! রাখছি তাহলে?” দাদার সঙ্গে কথা শেষ করে সুমিত্রা সুইচ টিপে ফোন বন্ধ করে। শূন্য দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকায় ।
“কি হয়েছে মা?” উৎকন্ঠিত সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।
“কি হবে বাবু?” কাঁপা গলায় ছেলেকে ডাকে সুমিত্রা।
“কি হয়েছে মা?” আবার বলে সঞ্জয়।
“বৌঠান আর ছোড়দা আসতে চাইছে!” ছোট্ট নিভৃত কক্ষটিতে যেন বজ্রপাত হল।
“এই আমাদের ফ্ল্যাটে?” সঞ্জয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কি হবে এবার? ছোটমামা মাকে ছয় মাসের গর্ভবতী দেখে কি বলবে? মামা তো জানে গত পাঁচ বছর মা বাবার থেকে আলাদা থাকে। কি উত্তর দেবে তারা?
“হ্যাঁ সোনা!” উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, তবু সুমিত্রা মুখ থেকে নিঃসৃত হয় শব্দ।
“কেন আসতে চাইছে মামা-মামি? কিছু বলল?” সঞ্জয় এবার জিগ্যেস করে চেয়ার থেকে উঠে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তার চা খাওয়া হয়ে গেছে। সুমিত্রা চা শেষ করার সময় পায়নি যদিও।
সুমিত্রা ধীরে ধীরে বলে, “বৌদির গ্যাস আর অম্বলের ধাত। অনেকদিন থেকেই ছিল। ইদানিং বেড়েছে খুব। সারারাত ঘুমোতে পারছে না। ওখানে তেমন ডাক্তার নেই। রামপুরহাটেও নিয়ে গেছিল ছোড়দা। ওখানের ডাক্তাররা বলেছে কোলকাতায় এসে বড় ডাক্তার দেখাতে,” সঞ্জয় একহাতে তার পিঠ ও ডান হাতে তার ডান ধরে সাহায্য করায় সুমিত্রাও উঠে দাঁড়ায়। তারপর মাকে ধরে তাদের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ঘরের টিউব লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বিছানা গিয়ে বসে তারা। সঞ্জয় চট করে উঠে গিয়ে তাদের ডাইনিং হলের পাখা বন্ধ করে দিয়ে আসে ও ফেরার সময় এই ঘরের পাখা চালিয়ে দেয়। সন্ধ্যা আটটা প্রায় বাজতে চলল। বাইরে দূর থেকে বাসের হর্ন এখনো শোনা যায়।
“ব্যালকনির দরজাটা খুলে দে সোনা,” সুমিত্রা বলে। সত্যিই ঘরটা যেন একটু গুমোট লাগছে। সঞ্জয় আবার বিছানা থেকে উঠে তাদের ঘরের পুবদিকের দরজাটা হাট করে খুলে দেয়।
ফিরে বিছানায় বসতে বসতে সে বলে, “এখন যদি তুমি ফোন করে বল যে দেওয়ালির দিকে আমরা এখানে থাকছি না, বেড়াতে বেরোচ্ছি?”
“হবে না মনে হয়। বৌঠানের এ রোগ অনেকদিনের পুরোন। দাদা বলবে, ‘কবে ফিরবি বল, তখন আসব’,” সুমিত্রা একটু ম্লান হেসে মাথা নাড়ে।
“তাহলে?”
“সেই তো ভাবছি,” সুমিত্রা তার দিকে তাকায়। তার মুখ থমথমে।
“আচ্ছা, যদি আমি বলি যে পাশের ফ্ল্যাটের এক পুরুষের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছিল, রোজ তুই যখন অফিসে?” সুমিত্রা মুখ তুলে বলে। সে একটা বালিশ তাদের বিছানার হেডবোর্ডে ঠেস দিয়ে তাতে হেলান দিয়ে শোয়। সঞ্জয়ের নগ্ন হাঁটুতে বাম হাত দিয়ে আদর করে।
“তারপর?” সঞ্জয় আরও বলতে বলে মাকে। আঁচলের তলায় মার পেটে হাত রাখে। সুমিত্রা যা বলছে তা শুনতেও মনোকষ্ট হয় তার।
“আমাকে বলেছিল বিয়ে করবে। কিন্তু পেটে বাচ্চা আসতেই সে চলে যায় আমার ছেড়ে,” সুমিত্রা বলে থেমে থেমে। কিন্তু এমন মিথ্যে কল্পনা তাকে আহত করে। তার দুই চোখে অশ্রু ঘনিয়ে আসে ছাপিয়ে।
“বলতে পারবে এসব কথা তুমি?” সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে। তার স্বর ভেঙে আসে। দৃষ্টিও আসে ঝাপসা হয়ে।
কথা বলতে পারে না সুমিত্রা, চোখে বুজে প্রবল বেগে দুধারে মাথা নাড়ে সে। বেদনায় মুখ বিকৃত হয়ে আসে তার। হঠাৎই যেন অবচেতনে অনুভব করে তার ওষ্ঠাধরের উপর একজোড়া নরম ঠোঁটের উপস্থিতি। হাঁ করে নিজের ঠোঁট দুটো হাল্কা ফাঁক করে খুলে ধরে সুমিত্রা। একটি সজীব, সিক্ত জিভ প্রবেশ করে তার মুখে। সে প্রাণপণে চুষে খেতে শুরু করে সেই জিভের মিষ্টরস। একটি বড় প্রিয় হাত তার গালের ঝরে পড়া অশ্রু মুছিয়ে দেয় অসীম আদরে।
অনেক্ষণ পরস্পরে শরীরে লিপ্ত হয়ে বসে থাকে তারা। তারা দুজনেই পূর্বে কখনো কাম বাসনা হীন এমন নিবিড় চুম্বন করেনি। ঘরে নিঃশব্দতা বিরাজ করে যেন অনন্তকাল। জেগে থাকে কেবল দুজনের মিশে যাওয়া নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মৃদু শব্দ ও মাথার উপরে ঘুরন্ত পাখার শব্দ।
সুমিত্রাই নৈঃশব্দ ভাঙে, “তাহলে?”
সঞ্জয়ের মাথায় একটি ভাবনার তরঙ্গ খেলে যায়। বৃদ্ধ পুরোহিত মশাই তাদের তাদের বিয়ে দিয়ে আশির্বাদ করেছিলেন। বলেছিলেন তাদের দুজনের মিলনে অনেক সন্তান-সন্ততিতে তাদের ঘর ভরে উঠবে। আরও বলেছিলেন তাদের প্রথম সন্তানের মুখ দর্শন করার আশায় তিনি উন্মুখ হয়ে থাকবেন। অনুরোধ করেছিলেন জন্মের পর তাঁকে দেখিয়ে নিয়ে যেতে।
“মা?” সে ডেকে ওঠে সুমিত্রাকে।
“কি সোনা?” সুমিত্রা ছেলের গালে হাত রাখে।
“পুরোহিত মশাইয়ের কাছে পরামর্শ নিলে কেমন হয়? তিনি নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন!” সঞ্জয় বলে।
“হ্যাঁ, উনি ঠিক পরামর্শ দেবেন। কবে যেতে পারবি? কাল পারবি?” সুমিত্রার ভিতরে একটা যেন তাড়ার সৃষ্টি হয়।
“ছোটমামারা কি শিগগিরই আমাদের ফ্ল্যাটে আসতে চায় মা?” সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।
“দেওয়ালির পরের দিন আসতে চাইছে,” সুমিত্রার খেয়াল হয় ও স্বাভাবিক উত্তেজনার চোটে দাদা কবে আসবে সেটা বলতেই ভুলে গেছে সঞ্জয়কে।
সঞ্জয় বিছানা থেকে নেমে দেয়ালে তাদের আলনার পাশে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার কাছে গিয়ে দেখে।
“দেওয়ালি ৩০ তারিখ রবিবার, মা। তারপরের দিন সোমবার, ৩১ শে অক্টোবর,” সঞ্জয় বিছানায় আগের মত সুমিত্রার পাশে বসে মুখোমুখি। ডান পাটা মেঝেতে নামিয়ে রাখে। তার বাম ঊরু সুমিত্রার শাড়িতে ঢাকা ডান ঊরু স্পর্শ করে।
“কোন গাড়িতে আসছে বলেছে ছোটমামা?” সঞ্জয় শুধোয়।
“ওসব জিগ্যেস করার সময় পেয়েছি নাকি? ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল,” সুমিত্রা এই এতক্ষণ পর একবার হাসে। সঞ্জয়ের বুক ভরে যায় মার হাসি দেখে। সে সুমিত্রার ম্লান মুখ সহ্য করতে পারেনা।
“তাহলে একবার জিগ্যেস করে নাও। মামার ফোন নাম্বারটা তোমার কাছে ছিল?”
“দাদার কোনও মোবাইল নম্বর তো ছিল না, মনে হয় নতুন নিয়েছে!” সুমিত্রা বলে। তার মনে পড়ে গত এপ্রিলে দেশের বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় দীনবন্ধু তার কাছ থেকে সঞ্জয়ের মোবাইল নাম্বারটা লিখে নিয়েছিল।
“দাঁড়াও আমি সেভ করে নিই আমার মোবাইলে, তারপর তোমাকে দিচ্ছি। মামাকে ফোন কর,” সঞ্জয় নিজের মোবাইলে মন দেয়।
“বাবু,” সুমিত্রার নজর দেয়ালের ঘড়িতে যায়, “আজ আর ফোন করা যাবে না, দাদারা খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে!”
সঞ্জয় মার কথা শুনে নিজের মোবাইলে সময়টা দেখে নেয়। রাত নটা বেজে গেছে।
“হ্যাঁ মা, চল খেতে যাই,” সে বাম পাটা খাট থেকে নামিয়ে মেঝেতে দাঁড়ায়। পুব দিকের খোলা দরজাটা বন্ধ করে। সুমিত্রার নামার জন্য অপেক্ষা করে। তারপর দুজনে একসঙ্গে রান্নাঘরের দিকে যায়।
সুমিত্রা ছেলের জন্মদিনে রাতে খাবার জন্যে পায়েস বানানোর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চ ব্যঞ্জনে রান্না করেছিল। ইলিশ মাছের মাথা দিচ্ছে পুঁই শাক ও কুমড়ো পটলের চচ্চড়ি, পাঁঠার মাংস, মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, সুগন্ধি পোলাও ও চাটনি । সঙ্গে পায়েস তো ছিলই।
ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে খেতে দুজনে টুকরো টাকরা গল্প করে।
“শালিনীর সাথে আমার আলাপ কয়েকদিন আগে মাত্র। ও বলেছিল আসবে। আজ এল মেয়েকে নিয়ে,” সুমিত্রা কথা পাড়ে।
সঞ্জয় হাসে। “যথারীতি সব জায়গাতেই তোমার ভক্তরা জুটে যায়,” তার চোখে কৌতুকের ঝিলিক।
“নে, নে বল চচ্চড়িটা কেমন হয়েছে?” সুমিত্রা লাজুক হেসে অন্য কথা বলে।
কেমন আছে বাবা এখন? শেষবার বাবাকে দেখছিল সে সাড়ে পাঁচ বছর আগে। তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সে। প্রায় অজ্ঞান, মাতাল হয়ে রিক্সায় শুয়ে তাদের বস্তির ঘরে ফিরছিল পরেশ। অসহায় হাঁ মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে লালা, মুখ ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। তার নাম, মায়ের নাম ধরে ডেকে ডেকে বিলাপ করে কাঁদছিল পরেশ। আবার হাহা করে ওঠে, যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে সঞ্জয়ের বুক। আর কি ফেরার রাস্তা একেবারেই নেই? তাদের জীবন থেকে অদৃশ্যই থাকবে তার জন্মদাতা বাবার উপস্থিতি?
বার্থডে সেলিব্রেশনের বড় একটা প্যাস্ট্রি অফিসের থেকেই আনার ব্যবস্থা করেছিল তাদের টিম লিড তনুশ্রী।
বিকেল চারটের দিকে তাদের ডিপার্টমেন্ট হেড বিজয় শর্মা সবার আগে অফিসের যে কোনও সেলিব্রেশনের জন্য নির্দিষ্ট ফাঁকা জায়গাটিতে এসে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে তারপর শখানেক সহকর্মীর ভিড় জমে যায় – তাদের বেশির ভাগই কম বয়েসী যুবক যুবতী। দেড়শো জনের ডিপার্টমেন্ট তাদের ন্যাশানাল গ্রিডের অ্যাকাউন্ট, প্রতি সপ্তাহে দুতিনজনের জন্মদিন পড়ে। আজ আর কারও নেই। সঞ্জয়কে আজ তাই সেলিব্রেশনের মধ্যমণি হয়ে একাই প্যাস্ট্রিটা কাটতে হল। সুমিত্রা কাল রাতেই অফিসে দেওয়ার জন্যে একটি কেক তৈরি করেছিল ও সকালে অফিসে আসার আগে সঞ্জয়ের হাতে সেটা মনে করে ধরিয়ে দিয়েছিল। সঞ্জয় সেটা বের করে দিতেই তার উপরেই সবাই হামলে পড়ে।
“মিসেস বানিয়েছেন? অপূর্ব!” বিজয় শর্মা সুমিত্রার বানানো কেকে এক কামড় দিয়ে বলে।
“আমি সুমিত্রাদির কাছ থেকে একদিন শিখে নেব রেসিপি,” তনুশ্রী সঞ্জয়ের চোখে চোখ রাখে।
“হ্যাঁ, আমাদের অফিসে অনেক নিরামিষাশী আছেন জেনে ডিম ছাড়াই বানিয়েছে ও,” সঞ্জয় উজ্জ্বল মুখে হাসে।
“তাই নাকি? এটা ডিম ছাড়া কেক! তাহলে তো শিখতেই হচ্ছে!” শ্যামলী সুদর্শনা তনুশ্রীর দুই চোখে খুশির ঝিলিক খেলে। তারপর আচমকাই সঞ্জয়ের চোখের গাঢ় দৃষ্টি রাখে সে। স্থির দৃষ্টি ধরে রাখে নির্বাক দু মুহূর্ত। সঞ্জয়ের বুক ধ্বক্ করে ওঠে। হতচকিত চমকে যায় সে। মা যা বলে তা কি সত্যি? তনুশ্রী তার প্রতি অনুরক্তা?
“হ্যাপি বার্থডে!” অভিজিৎ এসে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে। সঞ্জয়ের চিন্তায় চ্ছেদ পড়ে। তারপরেই অন্যান্যদের অভিনন্দন বার্তায় সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়।
“সঞ্জয়, মেনি হ্যাপি রিটার্নস,” তিলোত্তমা এগিয়ে আসে। তারপর একে একে সবার শুভেচ্ছায় সঞ্জয় প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মিনিট কয়েকের জন্যে - সূর্যশেখর, অনিমেষ, জয়িতা, মাধবী, দর্পনারায়ণ, সুনীল, অলকানন্দা।
তবে তার বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল দিনের শেষের জন্য, পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ার ঠিক আগেই একটা ইমেইল ঢুকল তার ইনবক্সে।
“শুভ জন্মদিন” সাবজেক্ট লেখা বাংলায়। ফ্রম সমুদ্র বসু। চকিতে মোবাইলে ঘড়ি দেখে সঞ্জয়। এখন তো সকাল সাড়ে সাতটা বাজে বোস্টনে। ডে লাইট সেভিং টাইম চলছে। সমুদ্রদা অফিসে এসে গেছে? সমুদ্র, তাদের সিস্টেম আর্কিটেক্ট, সাধারণতঃ একটু দেরিতে অফিসে আসে। নটা নাগাদ। তবে কনফারেন্স কল থাকলে একটু আগে আসে। আজ তো কোনও কোনও কল নেই!
“হাই সঞ্জয়, আই নো ইউ আর পারহ্যাপ্স নাউ হেডিং হোম। উইল কল ইউ লেট ইভিনিং – সমুদ্র,” সমুদ্রদা তাকে খুবই পছন্দ করে। সেটা গত অগাস্টে তাদের ইউ এস ট্যুর এর সময়তেই জানা হয়ে গিয়েছিল সকলের। কন-কলগুলোতে সঞ্জয় বুঝতে পারে যে সমুদ্রদা তার কন্ট্রিবিউশনটা সব সময়ই শুনতে চায়।
কোম্পানির বাস তাকে যথারীতি সঞ্জয়কে তাদের আবাসনের কাছের মোড়ে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে হেঁটে ফিরতে ফিরতে বাবার চিন্তা আবার সঞ্জয়ের মনে ফিরে এসে চেপে ধরে।
বাবার কথা ভাবলে বুকে সবসময়ই একটা হাহাকার উঠছে ইদানিং। কেন সে জানে না তার মনে হয় বাবা দুর্ভাগ্যের শিকার। বাবা মানুষটা অতটা খারাপ নয়, যতটা খারাপ ছিল তার স্বভাব। নাহলে যখন পরেশের চাকরি ছিল, সেই বিস্মৃতপ্রায় অতীতে বাবার সেই স্নেহময় রূপ – তা তো মিথ্যা নয়। সঞ্জয়ের প্রবল ইচ্ছে করে বাবাকে ডেকে নেয় সে তাদের মধ্যে। কিন্তু আবার ভয়ও করে ততোধিক।
কারণ তার মনে দগদগে হয়ে রয়েছে পাঁচ বছর আগের স্মৃতি। তার এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার তৃতীয় বর্ষ তখন। মাকে বলেছিল সে বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার কথা। প্রবল অনিচ্ছা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও সুমিত্রা ছেলের কথামত পরেশের কাছে গিয়েছিল। তার ফলাফল হয়েছিল এমন সাঙ্ঘাতিক যে সঞ্জয় বাবার কথা আর সুমিত্রা কাছে পাড়তেও পারবে না আর মনে হয় কোনওদিন। কোনওমতে চরম নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনা এড়িয়ে সুমিত্রা ফিরে এসেছিল সেদিন বাড়িতে।
সেই বিকেলে গঙ্গার নির্জন ঘাটে বসে সুমিত্রা নিজের বুকের আঁচল সরিয়ে ছেলেকে দেখিয়েছিল তার পিতৃদেবের কীর্তি। তার জান্তব অত্যাচার ও অবমাননার নখরাঘাতে চিরে যাওয়া বক্ষদেশ।
তার দেহের সেই কয়েক মুহূর্তের চরম পাশবিকতার চিহ্নের হয়ত নিরাময় হয়েছিল সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে। কিন্তু তার মনে যে দগদগে দাগ পড়েছিল তা মুছে যাবার নয়। হয়ত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে সারাজীবন।
সঞ্জয়ের মনে পড়ে যে গঙ্গার ঘাটে বসে সেই পড়ন্ত বেলায় সে মার কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেছিল। প্রতিজ্ঞা করেছিল যে সেই মুহূর্ত থেকে তাদের জীবনে বাবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব তার।
অতীতের বিষময় স্মৃতি ও রক্তের অমোঘটানের সঙ্ঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় সঞ্জয়। কেউ জানে না। কেউ জানতে পারে না। মাও না।
।। ৫ ।।
“এস,” সঞ্জয় কলিং বেল টিপতে সুমিত্রা তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেয়।
মার অপসৃয়মান সবুজ হলুদ ছাপা আটপৌরে সুতির শাড়ি পরিহিত শরীরের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে দেখে সঞ্জয়। গায়ে কালো ব্লাউজ। গর্ভাবস্থায় সাধারণতঃ হাউজকোট পরে থাকে সে। তার জন্মদিন, তাই বোধহয় শাড়ি।
সাতাশ সপ্তাহের গর্ভবতী সুমিত্রার দেহ আর একটু ভারি দেখতে লাগছে ও আর একটু যেন শ্লথগতি। খুবই স্বাভাবিক। গত পরশু, রবিবার সুমিত্রার ওজন করেছিল সঞ্জয়। এক কেজি বেড়েছে গত এক মাসে। এখন ঊনসত্তর কেজি হয়েছে। আগামি সপ্তাহ থেকে শুরু হবে তার গর্ভাবস্থার তৃতীয় ও চূড়ান্ত ত্রৈমাসিক।
সুমিত্রা গিয়ে ওদের ডাইনিং টেবিলে একটি চেয়ারে গিয়ে বসে। সেখানে কটি চেয়ারে বসে একজন মধ্য তিরিশের যুবতী নারী। একটি লাল, হলুদ ও নীলে মেশানো সিন্থেটিক শাড়ি পরা। হাতে অবাঙালি গোছে পরা অনেক রঙ বেরঙের কাচের চুড়ি। সিঁথিতে তার মেটে সিঁদুর। অন্য চেয়ারটিতে একটি কিশোরী মেয়ে। সে একটি সুদৃশ্য জংলা রঙের ফ্রক পরে রয়েছে।
সঞ্জয় তার ল্যাপটপটা তাদের থ্রি সিটার সোফায় রেখে পায়ের জুতোমোজা খুলে শুশেলফে তুলে রাখে। বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধোয় প্রতিদিনের মত সাবান দিয়ে। সুমিত্রার সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে আলাপরতা ভদ্রমহিলার দিকে একগাল হেসে তাকায়। যুবতী নারীটিও হেসে মাথা নাড়ান।
“ওগো, ইনি শালিনী রাই, আমাদের নিচের তলায় থাকেন। রোজ সকালে হাঁটতে গিয়ে আমাদের আলাপ। আর এই যে এনার মেয়ে লক্ষ্মী,” সুমিত্রা আলাপ করিয়ে দেয়।
সঞ্জয় হাত দুটো জড় করে নমস্কার করে। শালিনীও হেসে প্রতি নমস্কার করেন। মেয়েটিকে সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, “কোন ক্লাসে পড় তুমি লক্ষ্মী?”
“ক্লাস সেভেনে,” লক্ষ্মী মাথা নত করে লাজুক হাস্যমুখে উত্তর দেয়।
সঞ্জয় তাদের শোবার ঘরে ঢোকে। ভিতরের বাথরুমে গিয়ে অফিসের জামাকাপড় ছেড়ে একটি বক্সার প্যান্ট ও সবুজ টি শার্ট পরে। তারপর আবার শোবার ঘর থেকে বেরোয়। ডাইনিং স্পেসে ওদের পেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখে সংযুক্তা ও তার মেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার দিকে তাকায় ওরা। সঞ্জয় তাই দেখে থেমে দাঁড়ায়।
“দাদা, আমরা আজ আসি তাহলে, দিদির সংগে কথা বলে খুব ভাল লাগল,” শালিনী তার দিকে হেসে বলে। তার বলার ভঙ্গিতে সামান্য হিন্দিভাষী টান।
“আপনি খুব ভালো বাংলা বলেন,” সঞ্জয় হেসে বলে।
“চোদ্দ বছর হোয়ে গেল কোলকাতায় আছি আমি, এর জনম এখানেই,” শালিনী মেয়ের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে হেসে তাকায়।
“দাঁড়াও তোমাকে চা দিই,” সুমিত্রাও তার চেয়ার থেকে উঠে পড়ে।
সঞ্জয় হেসে বলে, “আবার আসবেন,” দরজার দিকে পা বাড়ায় সে।
মহিলাটিও পা বাড়ায়, “অবশ্যই। দিদিও তাই বলেছিল, কথা বলতে খুব ভালবাসে দিদি। আমার খুব ভাল লাগে। কত পড়াসুনা আছে দিদির!” শালিনীর গলায় প্রশংসা ফোটে।
সদর দরজা বন্ধ করে রান্নাঘরে এসে সঞ্জয় দেখে আঁচে জল বসিয়ে দিয়েছে সুমিত্রা। একটু পরেই ফুটতে শুরু করবে।
পাশে দাঁড়াতে সুমিত্রা ঘুরে দুহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। তার হাতের শাঁখাপলার ঝনক শব্দ সঞ্জয়ের কানে সঙ্গীতের মত বাজে বরাবরের মত। সে বামহাতে সুমিত্রার কোমর বেষ্টন করে আর আঁচলের আবরণ সরিয়ে দিয়ে তার স্ফীত উদরের নগ্ন ত্বকে অন্য হাত বুলোয় পরম আদরে। তারপর সুমিত্রার তুলে ধরা ওষ্ঠাধরে নামিয়ে আনে নিজের ঠোঁটদুটো। সুমিত্রা দুইচোখ বন্ধ করে ফেলে আবেশে। ধীরে ধীরে তার কুন্ঠিত লাজুক জিভ প্রবেশ করে তার সন্তানের মুখগহ্বরে। অনুভব করে ছেলের ডান হাত অচিরেই উঠে এসেছে তার বাম স্তনে। আঁচলের আবরণীর উপর দিয়ে ধীর লয়ে সঞ্জয় মর্দন করে মার স্তন। ক্ষণকাল পরেই চুম্বনরত দুই নরনারীর নিবিড় নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে যায় উনুনে চাপানো চায়ের ফুটন্ত জলের শব্দে।
“দাঁড়া সোনা, চায়ের জল হয়ে গেছে,” সুমিত্রা ছেলের বুকে হাত দিয়ে বিযুক্ত হয়। মুখ উপরে তুলে লাজুক হাসে। ডান হাত তুলে ছেলের ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা থুতু মুছে দেয় স্নেহের সঙ্গে।
চা তৈরি হয়ে গেলে সঞ্জয় দুহাতে দুটো বড় বড় কাপ চা নিয়ে গিয়ে তাদের ডাইনিং টেবিলে গিয়ে রাখে। তারপর আবার রান্নাঘরে ফিরে যায়।
আজ সুমিত্রা দুপুরের খাওয়ার পর দুটো তিনটে নাগাদ জন্মদিনের পায়েস রান্না করেছে একটা স্টিলের ডেচকিতে। তার প্রিয় গোবিন্দভোগ চালের পায়েস। সঞ্জয়ের মনে পড়ে আবার বহুদিন আগের প্রায় বিস্মৃত সেই ছেলেবেলার সুখস্মৃতি। এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ডেকচি থেকে দুই হাতা পায়েস একটা পোর্সেলিনের বাটিতে স্থানান্তর করে সে সঞ্জয়ের হাতে তুলে দেয়, “নে খা সোনা!” গভীর মায়াভরা চোখে ছেলের চোখে দৃষ্টি রাখে সুমিত্রা।
“খাইয়ে দাও মা,” সঞ্জয় আবদারের সুরে দুই চোখ বুজে হাঁ করে। সুমিত্রা চেয়ারে বসা ছেলের গায়ে ঘেঁষে দাঁড়ায়। সঞ্জয় তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করে তার বাম কাঁধে মায়ের স্তনের মৃদু ভারি নরম ছোঁয়া, বাম হাতের কনুইয়ে মার স্ফীত উদরে আলতো স্পর্শ। সে মাথা এলিয়ে দেয় মার বুকে। সুমিত্রা বাম হাতে চামচ ধরে বাটিটা থেকে একটু পায়েস তোলে। সন্তানের হাঁ মুখে পায়েস শুদ্ধ চামচ ঢুকোতে সঞ্জয় মুখ বন্ধ করে। অসীম তৃপ্তির সঙ্গে চুষে, চিবিয়ে ধীরে ধীরে খায়। বাম হাতে বেষ্টন করে ধরে মার কোমর। খেতে খেতে সেই হাতে মার তপতপে নরম নিতম্ব দলন করে সে খেয়াল মত। মুখের মিষ্টান্ন গলাধঃকরণ করার পর মুখ আপনা আপনিই হাঁ করে আবার। আবার সুমিত্রা পায়েস খাইয়ে দেয় তাকে।
“নে হল তো! এবারে চা টা খাই আমরা দুজনে। বল অফিসে আজ কি হল বল,” সুমিত্রা ছেলেকে খাইয়ে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসে বলে। সঞ্জয় মায়ের দিকে চায়। কি সুন্দর দেখতে লাগছে মাকে। ডিম্বাকৃতি মুখ আবার একট ভরাট হয়ে এসেছে বুঝি গত এক মাসে। সারাদিনের পরিশ্রমে সামান্য ঘর্মাক্ত মুখ উজ্জ্বল প্রতিমার মত।
“মা, জানো আজ সমুদ্রদা লিখেছে ফোন করবে সন্ধ্যার পর!” সঞ্জয় অফিসের সব ঘটনা জানানোর শেষে বলে।
সুমিত্রাকে ও গল্প করেছে গত আমেরিকা ভ্রমণের। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে তার মা শুনেছে সব। অবাক হয়েছে। কল্পনায় দেখেছে সম্পূর্ণ এক নতুন দেশের ছবি। যেন রূপকথার মত। সঞ্জয়ের মুখে সমুদ্রকে নিয়ে সুমিত্রা এত গল্প শুনেছে যে তার খুবই চেনা মনে হয় মানুষটাকে। এও জানে তার ছেলে সমুদ্রের খুবই প্রিয়পাত্র।
সুমিত্রা ঘরের দেয়াল ঘড়িটা দ্রুত দেখে। সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে! এত তাড়াতাড়ি তাদের দুজনের এই কথোপকথনের সময়টা শেষ হয়ে যায় রোজ! বুকে একটু উষ্মা উৎপন্ন হয় তার।
“সন্ধ্যা তো হয়ে গেছে কখন! তোর ফেরার আগেই তো রোজ আমার প্রদীপ দেখানো হয়ে যায়,” সুমিত্রা বলে।
আচম্বিতে সঞ্জয়ের ফোন শব্দ করে বেজে ওঠে।
অচেনা নম্বর। বিদেশের নয়। দেশেরই।
“হ্যালো!” সঞ্জয় ফোনটা তুলে বলে।
“বাপধন, শুনতে পাচ্ছ?” প্রায় অচেনা পুরুষকন্ঠ হলেও তাকে বাপধন নামে একজনই ডাকে। ছোটমামা। আর ছোটমামিও বেটে কিন্তু ছোটমামি তো পুরুষ নন, নারী।
“ছোটমামা?” সঞ্জয়ের গলায় বিস্ময় মিশ্রিত জিজ্ঞাসা।
“হ্যাঁ বাপধন। তোমার ছোটমামা বলছি। মা সঙ্গে আছে?” দীনবন্ধুর গলা শোনা যায় ফোনের অপর প্রান্তে।
“হ্যাঁ, ছোটমামা, মার সঙ্গে কথা বলবে তুমি?” কথা বলতে বলতে মার দিকে চোখ তুলে তাকায় সঞ্জয়।
তারা দেশে গেছিল গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। আজ প্রায় ছয় মাস পরে হঠাৎ ফোন ছোড়দার। তাছাড়া ফোনও তো ব্যবহার করত না ওই বাড়িতে কেউ। যদিও সঞ্জয়ের ফোন নিয়ে নিয়েছিল ওরা এখানে সুমিত্রারা ফেরত আসার আগে। কিছু বিপদ হয়নি তো? সুমিত্রা ছেলের মুখে মামার নাম শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
সে হাত বাড়ায় ছেলের দিকে। কথা বলতে চায়।
সঞ্জয় ফোনটা মায়ের হাতে তুলে দেয়।
“হ্যাঁ দাদা বলো। কেমন আছ তুমি? বৌঠান কেমন আছে, মলয়ের কি খবর, কেমন আছে তারা?” সুমিত্রা এক নিঃশ্বাসে দ্রুত প্রশ্নগুলো করে।
সঞ্জয় মার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে ছোটমামার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে মায়ের চেহারার পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। একবার যেন বলল, “কি হয়েছে বৌঠানের?”
তারপর শুনল ফোনের ও ধারের কথা। আর বলল, “তা রামপুরহাটের ডাক্তার কি বলল?”
তার একটু পর থেকে মা আর কথা বলছে না প্রায়। কেবল শুনছে আর অস্ফুটে বলছে দুএক শব্দ, “হ্যাঁ”, “তাহলে?” “কবে?”
মধ্য অক্টোবরের সন্ধ্যার প্রায় শীতল আবহাওয়া। মাথার উপরে ধীর লয়ে বৈদুতিক পাখা ঘুরছে। অথচ সুমিত্রার কপালে ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সঞ্জয় একটু সরে গিয়ে মার গা ঘেঁষে বসে। সুমিত্রা হাত বদল করে বাম হাতে ধরে ফোনটা। ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে ছেলের বাম হাত। বরফের মত ঠান্ডা হাত। সঞ্জয়ের বুক ছ্যাঁত করে ওঠে।
কি ব্যাপার? সে বাম হাতের আঙুলে আঁকড়ে মায়ের হাতের প্রতিটা আঙুল।
“হ্যাঁ দাদা, রাখছি দাদা, আমি সঞ্জুকে জানিয়ে দিচ্ছি দাদা! রাখছি তাহলে?” দাদার সঙ্গে কথা শেষ করে সুমিত্রা সুইচ টিপে ফোন বন্ধ করে। শূন্য দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকায় ।
“কি হয়েছে মা?” উৎকন্ঠিত সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।
“কি হবে বাবু?” কাঁপা গলায় ছেলেকে ডাকে সুমিত্রা।
“কি হয়েছে মা?” আবার বলে সঞ্জয়।
“বৌঠান আর ছোড়দা আসতে চাইছে!” ছোট্ট নিভৃত কক্ষটিতে যেন বজ্রপাত হল।
“এই আমাদের ফ্ল্যাটে?” সঞ্জয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কি হবে এবার? ছোটমামা মাকে ছয় মাসের গর্ভবতী দেখে কি বলবে? মামা তো জানে গত পাঁচ বছর মা বাবার থেকে আলাদা থাকে। কি উত্তর দেবে তারা?
“হ্যাঁ সোনা!” উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, তবু সুমিত্রা মুখ থেকে নিঃসৃত হয় শব্দ।
“কেন আসতে চাইছে মামা-মামি? কিছু বলল?” সঞ্জয় এবার জিগ্যেস করে চেয়ার থেকে উঠে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তার চা খাওয়া হয়ে গেছে। সুমিত্রা চা শেষ করার সময় পায়নি যদিও।
সুমিত্রা ধীরে ধীরে বলে, “বৌদির গ্যাস আর অম্বলের ধাত। অনেকদিন থেকেই ছিল। ইদানিং বেড়েছে খুব। সারারাত ঘুমোতে পারছে না। ওখানে তেমন ডাক্তার নেই। রামপুরহাটেও নিয়ে গেছিল ছোড়দা। ওখানের ডাক্তাররা বলেছে কোলকাতায় এসে বড় ডাক্তার দেখাতে,” সঞ্জয় একহাতে তার পিঠ ও ডান হাতে তার ডান ধরে সাহায্য করায় সুমিত্রাও উঠে দাঁড়ায়। তারপর মাকে ধরে তাদের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ঘরের টিউব লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বিছানা গিয়ে বসে তারা। সঞ্জয় চট করে উঠে গিয়ে তাদের ডাইনিং হলের পাখা বন্ধ করে দিয়ে আসে ও ফেরার সময় এই ঘরের পাখা চালিয়ে দেয়। সন্ধ্যা আটটা প্রায় বাজতে চলল। বাইরে দূর থেকে বাসের হর্ন এখনো শোনা যায়।
“ব্যালকনির দরজাটা খুলে দে সোনা,” সুমিত্রা বলে। সত্যিই ঘরটা যেন একটু গুমোট লাগছে। সঞ্জয় আবার বিছানা থেকে উঠে তাদের ঘরের পুবদিকের দরজাটা হাট করে খুলে দেয়।
ফিরে বিছানায় বসতে বসতে সে বলে, “এখন যদি তুমি ফোন করে বল যে দেওয়ালির দিকে আমরা এখানে থাকছি না, বেড়াতে বেরোচ্ছি?”
“হবে না মনে হয়। বৌঠানের এ রোগ অনেকদিনের পুরোন। দাদা বলবে, ‘কবে ফিরবি বল, তখন আসব’,” সুমিত্রা একটু ম্লান হেসে মাথা নাড়ে।
“তাহলে?”
“সেই তো ভাবছি,” সুমিত্রা তার দিকে তাকায়। তার মুখ থমথমে।
“আচ্ছা, যদি আমি বলি যে পাশের ফ্ল্যাটের এক পুরুষের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছিল, রোজ তুই যখন অফিসে?” সুমিত্রা মুখ তুলে বলে। সে একটা বালিশ তাদের বিছানার হেডবোর্ডে ঠেস দিয়ে তাতে হেলান দিয়ে শোয়। সঞ্জয়ের নগ্ন হাঁটুতে বাম হাত দিয়ে আদর করে।
“তারপর?” সঞ্জয় আরও বলতে বলে মাকে। আঁচলের তলায় মার পেটে হাত রাখে। সুমিত্রা যা বলছে তা শুনতেও মনোকষ্ট হয় তার।
“আমাকে বলেছিল বিয়ে করবে। কিন্তু পেটে বাচ্চা আসতেই সে চলে যায় আমার ছেড়ে,” সুমিত্রা বলে থেমে থেমে। কিন্তু এমন মিথ্যে কল্পনা তাকে আহত করে। তার দুই চোখে অশ্রু ঘনিয়ে আসে ছাপিয়ে।
“বলতে পারবে এসব কথা তুমি?” সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে। তার স্বর ভেঙে আসে। দৃষ্টিও আসে ঝাপসা হয়ে।
কথা বলতে পারে না সুমিত্রা, চোখে বুজে প্রবল বেগে দুধারে মাথা নাড়ে সে। বেদনায় মুখ বিকৃত হয়ে আসে তার। হঠাৎই যেন অবচেতনে অনুভব করে তার ওষ্ঠাধরের উপর একজোড়া নরম ঠোঁটের উপস্থিতি। হাঁ করে নিজের ঠোঁট দুটো হাল্কা ফাঁক করে খুলে ধরে সুমিত্রা। একটি সজীব, সিক্ত জিভ প্রবেশ করে তার মুখে। সে প্রাণপণে চুষে খেতে শুরু করে সেই জিভের মিষ্টরস। একটি বড় প্রিয় হাত তার গালের ঝরে পড়া অশ্রু মুছিয়ে দেয় অসীম আদরে।
অনেক্ষণ পরস্পরে শরীরে লিপ্ত হয়ে বসে থাকে তারা। তারা দুজনেই পূর্বে কখনো কাম বাসনা হীন এমন নিবিড় চুম্বন করেনি। ঘরে নিঃশব্দতা বিরাজ করে যেন অনন্তকাল। জেগে থাকে কেবল দুজনের মিশে যাওয়া নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মৃদু শব্দ ও মাথার উপরে ঘুরন্ত পাখার শব্দ।
সুমিত্রাই নৈঃশব্দ ভাঙে, “তাহলে?”
সঞ্জয়ের মাথায় একটি ভাবনার তরঙ্গ খেলে যায়। বৃদ্ধ পুরোহিত মশাই তাদের তাদের বিয়ে দিয়ে আশির্বাদ করেছিলেন। বলেছিলেন তাদের দুজনের মিলনে অনেক সন্তান-সন্ততিতে তাদের ঘর ভরে উঠবে। আরও বলেছিলেন তাদের প্রথম সন্তানের মুখ দর্শন করার আশায় তিনি উন্মুখ হয়ে থাকবেন। অনুরোধ করেছিলেন জন্মের পর তাঁকে দেখিয়ে নিয়ে যেতে।
“মা?” সে ডেকে ওঠে সুমিত্রাকে।
“কি সোনা?” সুমিত্রা ছেলের গালে হাত রাখে।
“পুরোহিত মশাইয়ের কাছে পরামর্শ নিলে কেমন হয়? তিনি নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন!” সঞ্জয় বলে।
“হ্যাঁ, উনি ঠিক পরামর্শ দেবেন। কবে যেতে পারবি? কাল পারবি?” সুমিত্রার ভিতরে একটা যেন তাড়ার সৃষ্টি হয়।
“ছোটমামারা কি শিগগিরই আমাদের ফ্ল্যাটে আসতে চায় মা?” সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।
“দেওয়ালির পরের দিন আসতে চাইছে,” সুমিত্রার খেয়াল হয় ও স্বাভাবিক উত্তেজনার চোটে দাদা কবে আসবে সেটা বলতেই ভুলে গেছে সঞ্জয়কে।
সঞ্জয় বিছানা থেকে নেমে দেয়ালে তাদের আলনার পাশে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার কাছে গিয়ে দেখে।
“দেওয়ালি ৩০ তারিখ রবিবার, মা। তারপরের দিন সোমবার, ৩১ শে অক্টোবর,” সঞ্জয় বিছানায় আগের মত সুমিত্রার পাশে বসে মুখোমুখি। ডান পাটা মেঝেতে নামিয়ে রাখে। তার বাম ঊরু সুমিত্রার শাড়িতে ঢাকা ডান ঊরু স্পর্শ করে।
“কোন গাড়িতে আসছে বলেছে ছোটমামা?” সঞ্জয় শুধোয়।
“ওসব জিগ্যেস করার সময় পেয়েছি নাকি? ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল,” সুমিত্রা এই এতক্ষণ পর একবার হাসে। সঞ্জয়ের বুক ভরে যায় মার হাসি দেখে। সে সুমিত্রার ম্লান মুখ সহ্য করতে পারেনা।
“তাহলে একবার জিগ্যেস করে নাও। মামার ফোন নাম্বারটা তোমার কাছে ছিল?”
“দাদার কোনও মোবাইল নম্বর তো ছিল না, মনে হয় নতুন নিয়েছে!” সুমিত্রা বলে। তার মনে পড়ে গত এপ্রিলে দেশের বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় দীনবন্ধু তার কাছ থেকে সঞ্জয়ের মোবাইল নাম্বারটা লিখে নিয়েছিল।
“দাঁড়াও আমি সেভ করে নিই আমার মোবাইলে, তারপর তোমাকে দিচ্ছি। মামাকে ফোন কর,” সঞ্জয় নিজের মোবাইলে মন দেয়।
“বাবু,” সুমিত্রার নজর দেয়ালের ঘড়িতে যায়, “আজ আর ফোন করা যাবে না, দাদারা খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে!”
সঞ্জয় মার কথা শুনে নিজের মোবাইলে সময়টা দেখে নেয়। রাত নটা বেজে গেছে।
“হ্যাঁ মা, চল খেতে যাই,” সে বাম পাটা খাট থেকে নামিয়ে মেঝেতে দাঁড়ায়। পুব দিকের খোলা দরজাটা বন্ধ করে। সুমিত্রার নামার জন্য অপেক্ষা করে। তারপর দুজনে একসঙ্গে রান্নাঘরের দিকে যায়।
সুমিত্রা ছেলের জন্মদিনে রাতে খাবার জন্যে পায়েস বানানোর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চ ব্যঞ্জনে রান্না করেছিল। ইলিশ মাছের মাথা দিচ্ছে পুঁই শাক ও কুমড়ো পটলের চচ্চড়ি, পাঁঠার মাংস, মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, সুগন্ধি পোলাও ও চাটনি । সঙ্গে পায়েস তো ছিলই।
ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে খেতে দুজনে টুকরো টাকরা গল্প করে।
“শালিনীর সাথে আমার আলাপ কয়েকদিন আগে মাত্র। ও বলেছিল আসবে। আজ এল মেয়েকে নিয়ে,” সুমিত্রা কথা পাড়ে।
সঞ্জয় হাসে। “যথারীতি সব জায়গাতেই তোমার ভক্তরা জুটে যায়,” তার চোখে কৌতুকের ঝিলিক।
“নে, নে বল চচ্চড়িটা কেমন হয়েছে?” সুমিত্রা লাজুক হেসে অন্য কথা বলে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)