নির্ভরতার ফাঁদ
পর্ব-২
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে মাহবুবের প্রেমিকা ছিল আয়রা। সমবয়সী। প্রেমটা শুরু হয়েছিল সহজভাবে, কিন্তু শেষ হয়নি সহজে। আসলে শেষ হওয়ার মতো কিছু আর বাকি ছিল না। আয়রাকে সে এতবার দেখেছিল, এতবার স্পর্শ করেছিল যে তার শরীর আর মন দুটোই যেন স্বচ্ছ কাঁচের ফ্রেমে বাঁধা একটা ছবি হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি কোণা সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুটে ঘুটে দেখেছে। আর যখন সব দেখা শেষ হয়ে যায়, তখন কৌতূহলও মরে যায়।
প্রতিদিন একই রকম কথোপকথন। একই রুটিন। একই হাসি, একই অভিযোগ, একই আবেগ। মাহবুবের মনে হয়েছিল জীবনটা কোন সাদামাটা বোতলে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোন রঙ নেই। তাই যখন আয়রা বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করল, সে শিক্ষার্থী জীবনের অজুহাত দিয়ে টালবাহানা করতে লাগল। আর একদিন হঠাৎ করেই আয়রার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল অন্য কারও সাথে। মাহবুব কষ্টের অভিনয় করেছিল ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল।
এরপর সে প্রতিজ্ঞা করেছিল—আর কোনো সম্পর্কে জড়াবে না। কিন্তু সপ্তাহ পার হতে না হতেই শরীরের চাহিদা তাকে অস্থির করে তুলল। আয়রার কাছে ফিরতে চেয়েছিল, আয়রা মানা করে দিল। তখন থেকেই সে সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠল।
তার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠল বিবাহিত নারীরা। কারণ তারা চাইলেই স্বামী সন্তান ফেলে চলে আসতে পারবে না, বিয়ের জন্য চাপও দেবে না। শুধু শারীরিক সুখ দেবে। এভাবেই তার জীবনে এসেছিল কয়েকজন—বন্ধুর স্ত্রী, পুরনো পরিচিতা, অনলাইনের কেউ কেউ। ধীরে ধীরে অন্যের বিয়ে করা স্ত্রীর প্রতি তার এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয়ে গেল।
শেষ এক বছর ধরে আছে মিলি আপা। বড় ভাই খালেদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন তিনি। সম্পর্কটা চলছে নিয়মিত।
মাহবুব নিজেকে দুশ্চরিত্র ভাবে না। শারীরিক চাহিদা মেটানোর অধিকার তার আছে । আর কোনো গভীর সম্পর্কে গেলে সেই সম্পর্কে একসময় তিক্ততা আসবেই। আর যদি সেই সম্পর্ক সারাজীবনের জন্য জরিয়ে যায় তখন কি হবে! তার তো একটাই জীবন। সেই জীবনকে কেন সে এভাবে নষ্ট করবে? তার যতো যৌন বাসনা রয়েছে তা পূরণের অধিকার তার আছে। তাই তার কাছে সে দুশ্চরিত্র নয়—নিরুপায়।
মা শর্মিলি আক্তার হয়তো কিছু টের পেয়েছিলেন। অথবা ছেলের বয়স বত্রিশ হয়ে গেছে, তবু সংসার করছে না দেখে চিন্তিত হয়েছিলেন। তাই জোরাজুরি শুরু করলেন বিয়ের জন্য। কয়েক মাস ধরেই মেয়ে দেখছিলেন তিনি। কিন্তু ছেলেকে এত যোগ্য পাত্র মনে করেন যে তার উপযুক্ত মেয়ে সহজে মিলছিল না।
এর মধ্যেই সন্ধান পেলেন তিন্নির। সুন্দরী, রূপবতী। বয়সে ছেলের থেকে একটু কম। শর্মিলির বিশ্বাস, একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে মেয়েটা গুণবতীও হবে।
মায়ের চাপেই মাহবুব মেয়ে দেখতে গিয়েছিল। মিলির সাথে সবকিছু তখনও ঠিকঠাক চলছিল। তবু তার মনে হয়েছিল, সামাজিকতার খাতিরে একটা বিয়ের সার্টিফিকেট থাকা মন্দ হবে না। বিবাহিত হয়েও যে অন্য নারীদের এখন নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারবে, সেই আত্মবিশ্বাস তার ছিল।
তিন্নির বাবা আকবর সাহেব ও ছোট বোনের জুঁইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল তাদের বসার ঘরে। এরপর ভেতরের ঘর থেকে বসার ঘরে ঢুকলেন একজন নারী। বয়স ৩৫ এর বেশি তবে ৪০ এর কম। মুখ গোলগাল। লম্বায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির মতো। সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী। গায়ের রং একসময় হয়তো দুধে-আলতা ছিল, কিন্তু সংসারের যাতাকলে পড়ে এখন একটু তামাটে হয়ে গেছে। মুখে হালকা একটু হাসি, তবে কপালে বোধহয় একটু চিন্তার চাপ দেখা গেলো।
মাহবুব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর চোখ সরিয়ে নিল। তার মনে কী চলছিল, বোঝা যায়নি।
তিন্নির বাবা-মা শর্মিলি ও মাহবুবের সাথে কথা বলতে লাগলেন। এরপর এল মেয়ে দেখার পালা।
তিন্নি এল খুব ঘরোয়া পোশাকে। একটা সাধারণ বাটিকের থ্রি-পিস আর মাথায় সাদা ওড়না। মেয়ে যেন মায়ের যৌবনকালের প্রতিচ্ছবি। মায়ের মতোই গোলগাল মুখ। মায়ের চেয়ে হয়তো এক ইঞ্চি লম্বা। গায়ের রং হলদেটে সাদা—যেন নাশপাতির চামড়া। অপরূপ সুন্দরী। যে দেখবে, সেই চাইবে আপন করে নিতে।
কিন্তু মাহবুবের চাহিদা একটু ভিন্ন। শুধু সুন্দরী হলেই তার হয় না। তার আরও কিছু চাই।
দুজনের মধ্যে টুকটাক কথা হলো। খুব বেশি কিছু নয়।
আসার সময় শর্মিলি আক্তার তিন্নির হাতে আংটি পরিয়ে দিয়ে এলেন।
শর্মিলি আর তার ছেলে চলে গেছেন। আকবর সাহেবের পরিবার বসার ঘরে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। শুধু একজন বাদে।
স্তব্ধ হয়ে নিজের ঘরে বসে ছিল তিন্নি। কী হয়ে গেল এটা? মাকে শত বুঝানোর পরও এটা কেন করল? কথা তো ছিল শুধু দেখে চলে যাবে। তাই তো সে তাদের সামনে আসতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু আংটি কেন পরাল? মা তো জানত সে নাদিমকে চায়। তারপরও কেন এটা হতে দিল?
খট করে ঘরের দরজা খুলে গেল।
“তুমি বাবাকে কেন বলছো না?” জিজ্ঞেস করল তিন্নি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর উত্তর দিলেন তিন্নির মা “তোর বাবা জানতে পারলে তোকে আস্ত রাখবে না। ঐ ছেলে তো দূরের কথা, তোর পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাবে। তোর বাবা এসব কখনো মেনে নেবে না।”
“তুমি না বললে আমি বলছি।” গলার স্বর ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যায় তিন্নির পক্ষে।
“যা বলে দেখ, কী হয়।” শান্ত গলায় বললেন তার মা।
মায়ের কথায় দমে যায় সে। বাবা খুব আদর করলেও কোনো এক আশ্চর্য কারণে খুব ভয় পায় সে বাবাকে। নিজের দীর্ঘ চুল চেপে ধরে বিছানায় বসে পড়ে অসহায় ভঙ্গিতে। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন তার মা।
ঢাকায় ফিরে আসার পর থেকেই মাহবুব অধীর আগ্রহে সময় কাটাচ্ছে। মাকে জানিয়ে দিয়েছে—মেয়ে তার পছন্দ হয়েছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই গোলগাল মুখখানা। তাকে পাওয়া একটু কঠিন হবে ঠিকই, কিন্তু অসম্ভব নয়।
পরদিন সকালেই তিন্নির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করল সে। নারায়ণগঞ্জে তার ছোটবেলার এক সহপাঠী আছে—হামিদ। পুলিশের এসআই। দুজনের মধ্যে খুব একটা কথা হয় না। ভালো বন্ধুও বলা চলে না। তবু মাহবুব জানে, কীভাবে কাজ করিয়ে নিতে হয়। হামিদের সাথে দেখা করে সে পরিষ্কার বলে দিল কী করতে হবে। হামিদ একটি খাম পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে সব খবর চলে এল—সিম কোম্পানি, সোশ্যাল মিডিয়া আর কলেজ থেকে। তিন্নিকে দেখে যে সন্দেহ হয়েছিল, তাই সত্যি। নাদিম নামের এক ছেলের সাথে মাস তিনেক ধরে প্রেমের সম্পর্ক আছে তিন্নির। ছেলেটা কিছু করে না। অনার্স শেষ করেছে। তিন্নিরই ডিপার্টমেন্টের দুই বছরের সিনিয়র।
নাদিমের কথা জানার পর মাহবুবের মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল। তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খুব একটা পাত্তা দিল না সে। মাকে জানিয়ে দিল—বিয়ের জন্য সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দ্রুতই বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করতে চায়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)