27-09-2026, 09:10 AM
পর্ব - ৪
দরজায় আবার শব্দ। এবার আরও জোরে।
ঠক ঠক ঠক।
"ভেতরে কে আছেন? দরজা খুলুন। পুলিশ।"
ঈশানীর বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কোলে রিশিকা তখনও ফুঁপিয়ে কাঁপছে। তুলসি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। বাথরুমের ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ঈশানী জানে দুটো মানুষ ভেতরে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশানী রিশিকার দিকে তাকাল। তার পাঁচ বছরের মেয়ে, সে যদি এখন কেঁদে ওঠে, যদি একটা শব্দ করে, তাহলে সব শেষ।
ঈশানী নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রিশিকাকে চুপ থাকতে বলল। তারপর তুলসির হাত ধরে তাকে পাশের বেডরুমে ঢুকিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, "দিদি, রিশিকাকে নিয়ে ভেতরে যাও। মুখে হাত দিয়ে রাখো। কোনো শব্দ করবে না। আমি যা করি করতে দাও।"
তুলসি ভয়ে মাথা নাড়ল। ঈশানী জানে, তুলসি পারবে না। রিশিকা পারবে না। এই মুহূর্তে তাকেই শক্ত থাকতে হবে। কারণ সে মা।
ঈশানী শাড়ির আঁচল ঠিক করল, চোখের জলটা মুছে নিল, একটা লম্বা শ্বাস নিল, তারপর দরজা খুলল।
বাইরে দুজন পুলিশ কনস্টেবল। হাতে লাঠি, কাঁধে ওয়্যারলেস। একজন খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
"আপনি এই ফ্ল্যাটে থাকেন? আপনার পরিচয় জানতে পারি?" একজন জিজ্ঞেস করল।
"জ্বী, আমি ঈশানী মুখার্জি। আমার স্বামী SBI বসিরহাট ব্রাঞ্চের ম্যানেজার অর্ক মুখার্জি।"
"আমরা জেল থেকে পালানো দুজন আসামীকে খুঁজছি। কাদের সর্দার আর গণেশ মন্ডল। খুব ডেঞ্জারাস লোক। এই এলাকাতেই ঢুকেছে বলে খবর আছে। আপনি কি আজ সন্ধ্যায় কোনো অচেনা লোককে এই বাড়িতে বা আশেপাশে দেখেছেন?"
ঈশানীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বাথরুমের দরজাটা তার পেছনেই। মনে হচ্ছে ওই দরজা ভেদ করে দুটো চোখ তার পিঠে বিঁধে আছে। কাদেরের বলা কথাটা কানে বাজছে - "মুখ খুললে তোর মেয়েকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।"
কিন্তু পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহিলাটি আর ভয় পেল না। তার ভেতরে মা হিসেবে একটা জেদ কাজ করছিল।
সে খুব শান্ত গলায় বলল, "না স্যার, আমি তো এইমাত্র বাজার থেকে ফিরলাম। গেটে কাউকে দেখিনি। আমি একাই থাকি মেয়েকে নিয়ে। আমার স্বামী এখনো ব্যাংক থেকে ফেরেনি।"
পুলিশটা একবার ভেতরে উঁকি দিল। ড্রয়িংরুমে বাজারের ব্যাগ পড়ে আছে, ডিম ভাঙা।
"ব্যাগ পড়ে আছে কেন?"
ঈশানী এক মুহূর্ত না ভেবে বলল, "বাজারের ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে গেছে। তাড়াহুড়োয় আসছিলাম, টিভিতে খবরটা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
পুলিশ দুজন একে অপরের দিকে তাকাল। একজন বলল, "ঠিক আছে ম্যাডাম, সাবধানে থাকবেন। দরজা বন্ধ করে রাখবেন। কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ১০০ ডায়াল করবেন। আমরা নিচে আছি।"
"আচ্ছা স্যার।"
পুলিশ সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। তাদের বুটের শব্দটা যতক্ষণ না মিলিয়ে গেল, ঈশানী দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ছিটকিনি লাগাল।
ঘরটা নিস্তব্ধ।
পাঁচ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড...
বাথরুমের দরজাটা আস্তে করে খুলল।
প্রথমে বেরিয়ে এল গণেশ, তারপর কাদের। দুজনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল। বাইরে বেরিয়ে কাদের দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা বড় শ্বাস নিল। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
গণেশ ফিসফিস করে বলল, "বস, বাঁচা গেল। মেয়েছেলেটার সাহস আছে।"
কাদের ঈশানীর দিকে তাকাল। তার চোখে এখন আর আগের সেই হিংস্রতা নেই, আছে একটা অবাক হওয়ার ভাব।
"তুই পুলিশকে মিথ্যা বললি কেন?" কাদের জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী তখনও রিশিকাকে বুকে ধরে আছে। বেডরুম থেকে তুলসি আর রিশিকাকে বের করে এনেছে। সে কাদেরের চোখে চোখ রেখে বলল, "আমার মেয়ের জন্য। আপনারা বাথরুমে ছিলেন, যদি পুলিশ ঢুকে আপনাদের দেখত, গোলাগুলি হতো। আমার মেয়েটা মাঝখানে পড়ে যেত। আমি সেটা হতে দিতে পারি না।"
এই কথাটা কাদেরকে আশ্বস্ত করল।
---
রাত তখন নটা।
বাইরের গলিতে পুলিশের গাড়ির শব্দ আর নেই। সব শান্ত।
কিন্তু ফ্ল্যাটের ভেতরের ছবিটা আজ অন্যরকম।
তুলসি অনেক আগেই চলে গেছে। যাওয়ার সময় বারবার বলে গেছে, "বৌদি, সাবধানে থেকো।"
ডাইনিং টেবিলে ভাত বেড়ে বসে আছে অর্ক। সারাদিন ব্যাংকের কাজে ক্লান্ত। পাশে বসে আছে কাদের আর গণেশ। তারাও ভাত খাচ্ছে। আর ঈশানী পরিবেশন করছে।
আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। টেবিলে কেক থাকার কথা ছিল, মোমবাতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু আজকের দিনটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে, তাই কেকটা আর বানানো হয়নি।
অর্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। টেবিলে শুধু অর্ক নয় বরং কাদির ও গনেশো তার সাথে বসে আছে।
এই দৃশ্যের পেছনে একটা গল্প আছে।
ফ্ল্যাশব্যাক - এক ঘণ্টা আগে
পুলিশ চলে যাওয়ার পর কাদের ঈশানীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
"আমাদের একটু আশ্রয় দে। আজ রাতটা। পুলিশ এখন সব জায়গায় নাকা লাগিয়েছে। বাইরে বেরোলেই ধরা পড়ে যাব।"
ঈশানী প্রথমে শক্ত গলায় বলেছিল, "না। অসম্ভব। আপনারা খুনি। আমি আপনাদের আশ্রয় দেব না। আপনারা এখনই বেরিয়ে যান।"
তখন কাদের হেসেছিল। পকেট থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে টেবিলে রেখেছিল।
ঈশানী চিরকুটটা খুলে দেখে তার পা কেঁপে উঠেছিল। সেখানে লেখা - অর্ক মুখার্জি, SBI বসিরহাট, বাসা - বসিরহাট কলেজপাড়া, মেয়ে - রিশিকা মুখার্জি, সেন্ট জেভিয়ার্স পাবলিক কলেজ, ক্লাস - নার্সারি।
"তুই ভাবছিস আমরা এমনি এমনি তোর ফ্ল্যাটে ঢুকেছি?" কাদের বলেছিল, "আমরা দুদিন ধরে এই এলাকা দেখছি। কোন ফ্ল্যাটে কে থাকে, সব খবর আমাদের কাছে আছে। তোর স্বামী কখন ব্যাংকে যায়, তোর মেয়ে কখন কলেজে যায়, সব।"
ঈশানীর মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। এত তথ্য এরা কিভাবে জানে?
কাদেরের গলাটা এবার নরম হলো, "দেখ, আমরা খারাপ লোক, মানছি। কিন্তু আমরা বাচ্চাদের ক্ষতি করি না। তুই আজ আমাদের বাঁচিয়েছিস। তুই আশ্রয় না দিলে আমরা তোর কোনো ক্ষতি করব না, আমরা চলেই যাব। কিন্তু পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তোর নামও জড়াবে। বলবে তুই আমাদের লুকিয়ে রেখেছিলি। তোর স্বামীর চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।"
ঈশানী বুঝতে পারছিল, সে একটা ফাঁদে পড়ে গেছে। ভয় দেখিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে কাদের তাকে বাধ্য করছে।
শেষ পর্যন্ত ঈশানী বলেছিল, "ঠিক আছে। আমার বাসার গেস্টরুমে থাকবেন। আমার স্বামী আর মেয়ের কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না। একটা আঁচড়ও না।"
"কথা দিলাম।" কাদির বলল।
বর্তমান
অর্ক ভাত মুখে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তুলসীর আপন বড় ভাই আপনারা, তাই না?"
গণেশ তাড়াতাড়ি বলল, "জ্বী, জ্বী দাদা। আপন ভাই।"
অর্ক কাদেরের দিকে তাকাল। কাদেরের মুখে সেই কাটা দাগটা স্পষ্ট।
"তবে কাদের নামটা কিভাবে হলো আপনার? কাদের তো অন্য সম্প্রদায়ের নাম হয়।"
প্রশ্নটা শুনেই কাদেরের কপালে ঘাম জমে গেল। সে কি বলবে বুঝতে পারল না। তার জীবনে সে অনেক পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছে, কিন্তু এইরকম ভদ্র, শিক্ষিত লোকের প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। সে অসহায়ভাবে ঈশানীর দিকে তাকাল।
ঈশানী সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল। সে চোখের ইশারায় কাদেরকে চুপ থাকতে বলল। তারপর অর্কর পাতে আরেকটু ডাল দিতে দিতে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আসলে হয়েছে কি জানো, অর্ক? তুলসীদির বাবা ভীষণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। উনি বলতেন, মানুষ হওয়াটাই আসল, মাযহাব তো পরে। তাই উনি ছেলেমেয়েদের নাম এমন রেখেছেন - একজনের নাম তুলসী, আরেকজনের নাম কাদের।"
অর্ক কথাটা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল।
"তাই নাকি! বাহ! এটা তো দারুণ ব্যাপার। সত্যিই তো, এমন মানসিকতাই তো দরকার।"
কাদেরও মাথা নেড়ে বলল, "জ্বী, জ্বী দাদা। বাবা ওইরকমই ছিল।"
অর্ক হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, "তোমরা যতদিন ইচ্ছা এখানে থাকো। কোনো অসুবিধা নেই। আসলে ঈশানী সারাদিন একা থাকে, রিশিকাকে নিয়ে। তাই তুলসীকে রাখা। তোমরা দুজন যখন এসেছ, ভালোই হলো। ঈশানী আর রিশিকার একটু খেয়াল রেখো। বর্ডার এলাকা তো, একটু দেখেশুনে রাখবে।"
অর্ক সরল মনে কথাগুলো বলে বেসিনে গেল।
আর টেবিলের দুপাশে বসে থাকা দুজন দাগী আসামী আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানী - তিনজনই একে অপরের দিকে তাকাল।
অর্ক তার স্ত্রী আর পাঁচ বছরের মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে গেল এমন দুজন লোকের হাতে, যারা খুনের মামলার আসামী, যাদের নামে পুরো জেলা তোলপাড়।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। ফ্ল্যাটের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা।
দেখা যাক, ভবিষ্যতে কি হয়।
দরজায় আবার শব্দ। এবার আরও জোরে।
ঠক ঠক ঠক।
"ভেতরে কে আছেন? দরজা খুলুন। পুলিশ।"
ঈশানীর বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কোলে রিশিকা তখনও ফুঁপিয়ে কাঁপছে। তুলসি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। বাথরুমের ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ঈশানী জানে দুটো মানুষ ভেতরে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশানী রিশিকার দিকে তাকাল। তার পাঁচ বছরের মেয়ে, সে যদি এখন কেঁদে ওঠে, যদি একটা শব্দ করে, তাহলে সব শেষ।
ঈশানী নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রিশিকাকে চুপ থাকতে বলল। তারপর তুলসির হাত ধরে তাকে পাশের বেডরুমে ঢুকিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, "দিদি, রিশিকাকে নিয়ে ভেতরে যাও। মুখে হাত দিয়ে রাখো। কোনো শব্দ করবে না। আমি যা করি করতে দাও।"
তুলসি ভয়ে মাথা নাড়ল। ঈশানী জানে, তুলসি পারবে না। রিশিকা পারবে না। এই মুহূর্তে তাকেই শক্ত থাকতে হবে। কারণ সে মা।
ঈশানী শাড়ির আঁচল ঠিক করল, চোখের জলটা মুছে নিল, একটা লম্বা শ্বাস নিল, তারপর দরজা খুলল।
বাইরে দুজন পুলিশ কনস্টেবল। হাতে লাঠি, কাঁধে ওয়্যারলেস। একজন খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
"আপনি এই ফ্ল্যাটে থাকেন? আপনার পরিচয় জানতে পারি?" একজন জিজ্ঞেস করল।
"জ্বী, আমি ঈশানী মুখার্জি। আমার স্বামী SBI বসিরহাট ব্রাঞ্চের ম্যানেজার অর্ক মুখার্জি।"
"আমরা জেল থেকে পালানো দুজন আসামীকে খুঁজছি। কাদের সর্দার আর গণেশ মন্ডল। খুব ডেঞ্জারাস লোক। এই এলাকাতেই ঢুকেছে বলে খবর আছে। আপনি কি আজ সন্ধ্যায় কোনো অচেনা লোককে এই বাড়িতে বা আশেপাশে দেখেছেন?"
ঈশানীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বাথরুমের দরজাটা তার পেছনেই। মনে হচ্ছে ওই দরজা ভেদ করে দুটো চোখ তার পিঠে বিঁধে আছে। কাদেরের বলা কথাটা কানে বাজছে - "মুখ খুললে তোর মেয়েকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।"
কিন্তু পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহিলাটি আর ভয় পেল না। তার ভেতরে মা হিসেবে একটা জেদ কাজ করছিল।
সে খুব শান্ত গলায় বলল, "না স্যার, আমি তো এইমাত্র বাজার থেকে ফিরলাম। গেটে কাউকে দেখিনি। আমি একাই থাকি মেয়েকে নিয়ে। আমার স্বামী এখনো ব্যাংক থেকে ফেরেনি।"
পুলিশটা একবার ভেতরে উঁকি দিল। ড্রয়িংরুমে বাজারের ব্যাগ পড়ে আছে, ডিম ভাঙা।
"ব্যাগ পড়ে আছে কেন?"
ঈশানী এক মুহূর্ত না ভেবে বলল, "বাজারের ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে গেছে। তাড়াহুড়োয় আসছিলাম, টিভিতে খবরটা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
পুলিশ দুজন একে অপরের দিকে তাকাল। একজন বলল, "ঠিক আছে ম্যাডাম, সাবধানে থাকবেন। দরজা বন্ধ করে রাখবেন। কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ১০০ ডায়াল করবেন। আমরা নিচে আছি।"
"আচ্ছা স্যার।"
পুলিশ সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। তাদের বুটের শব্দটা যতক্ষণ না মিলিয়ে গেল, ঈশানী দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ছিটকিনি লাগাল।
ঘরটা নিস্তব্ধ।
পাঁচ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড...
বাথরুমের দরজাটা আস্তে করে খুলল।
প্রথমে বেরিয়ে এল গণেশ, তারপর কাদের। দুজনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল। বাইরে বেরিয়ে কাদের দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা বড় শ্বাস নিল। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
গণেশ ফিসফিস করে বলল, "বস, বাঁচা গেল। মেয়েছেলেটার সাহস আছে।"
কাদের ঈশানীর দিকে তাকাল। তার চোখে এখন আর আগের সেই হিংস্রতা নেই, আছে একটা অবাক হওয়ার ভাব।
"তুই পুলিশকে মিথ্যা বললি কেন?" কাদের জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী তখনও রিশিকাকে বুকে ধরে আছে। বেডরুম থেকে তুলসি আর রিশিকাকে বের করে এনেছে। সে কাদেরের চোখে চোখ রেখে বলল, "আমার মেয়ের জন্য। আপনারা বাথরুমে ছিলেন, যদি পুলিশ ঢুকে আপনাদের দেখত, গোলাগুলি হতো। আমার মেয়েটা মাঝখানে পড়ে যেত। আমি সেটা হতে দিতে পারি না।"
এই কথাটা কাদেরকে আশ্বস্ত করল।
---
রাত তখন নটা।
বাইরের গলিতে পুলিশের গাড়ির শব্দ আর নেই। সব শান্ত।
কিন্তু ফ্ল্যাটের ভেতরের ছবিটা আজ অন্যরকম।
তুলসি অনেক আগেই চলে গেছে। যাওয়ার সময় বারবার বলে গেছে, "বৌদি, সাবধানে থেকো।"
ডাইনিং টেবিলে ভাত বেড়ে বসে আছে অর্ক। সারাদিন ব্যাংকের কাজে ক্লান্ত। পাশে বসে আছে কাদের আর গণেশ। তারাও ভাত খাচ্ছে। আর ঈশানী পরিবেশন করছে।
আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। টেবিলে কেক থাকার কথা ছিল, মোমবাতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু আজকের দিনটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে, তাই কেকটা আর বানানো হয়নি।
অর্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। টেবিলে শুধু অর্ক নয় বরং কাদির ও গনেশো তার সাথে বসে আছে।
এই দৃশ্যের পেছনে একটা গল্প আছে।
ফ্ল্যাশব্যাক - এক ঘণ্টা আগে
পুলিশ চলে যাওয়ার পর কাদের ঈশানীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
"আমাদের একটু আশ্রয় দে। আজ রাতটা। পুলিশ এখন সব জায়গায় নাকা লাগিয়েছে। বাইরে বেরোলেই ধরা পড়ে যাব।"
ঈশানী প্রথমে শক্ত গলায় বলেছিল, "না। অসম্ভব। আপনারা খুনি। আমি আপনাদের আশ্রয় দেব না। আপনারা এখনই বেরিয়ে যান।"
তখন কাদের হেসেছিল। পকেট থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে টেবিলে রেখেছিল।
ঈশানী চিরকুটটা খুলে দেখে তার পা কেঁপে উঠেছিল। সেখানে লেখা - অর্ক মুখার্জি, SBI বসিরহাট, বাসা - বসিরহাট কলেজপাড়া, মেয়ে - রিশিকা মুখার্জি, সেন্ট জেভিয়ার্স পাবলিক কলেজ, ক্লাস - নার্সারি।
"তুই ভাবছিস আমরা এমনি এমনি তোর ফ্ল্যাটে ঢুকেছি?" কাদের বলেছিল, "আমরা দুদিন ধরে এই এলাকা দেখছি। কোন ফ্ল্যাটে কে থাকে, সব খবর আমাদের কাছে আছে। তোর স্বামী কখন ব্যাংকে যায়, তোর মেয়ে কখন কলেজে যায়, সব।"
ঈশানীর মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। এত তথ্য এরা কিভাবে জানে?
কাদেরের গলাটা এবার নরম হলো, "দেখ, আমরা খারাপ লোক, মানছি। কিন্তু আমরা বাচ্চাদের ক্ষতি করি না। তুই আজ আমাদের বাঁচিয়েছিস। তুই আশ্রয় না দিলে আমরা তোর কোনো ক্ষতি করব না, আমরা চলেই যাব। কিন্তু পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তোর নামও জড়াবে। বলবে তুই আমাদের লুকিয়ে রেখেছিলি। তোর স্বামীর চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।"
ঈশানী বুঝতে পারছিল, সে একটা ফাঁদে পড়ে গেছে। ভয় দেখিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে কাদের তাকে বাধ্য করছে।
শেষ পর্যন্ত ঈশানী বলেছিল, "ঠিক আছে। আমার বাসার গেস্টরুমে থাকবেন। আমার স্বামী আর মেয়ের কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না। একটা আঁচড়ও না।"
"কথা দিলাম।" কাদির বলল।
বর্তমান
অর্ক ভাত মুখে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তুলসীর আপন বড় ভাই আপনারা, তাই না?"
গণেশ তাড়াতাড়ি বলল, "জ্বী, জ্বী দাদা। আপন ভাই।"
অর্ক কাদেরের দিকে তাকাল। কাদেরের মুখে সেই কাটা দাগটা স্পষ্ট।
"তবে কাদের নামটা কিভাবে হলো আপনার? কাদের তো অন্য সম্প্রদায়ের নাম হয়।"
প্রশ্নটা শুনেই কাদেরের কপালে ঘাম জমে গেল। সে কি বলবে বুঝতে পারল না। তার জীবনে সে অনেক পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছে, কিন্তু এইরকম ভদ্র, শিক্ষিত লোকের প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। সে অসহায়ভাবে ঈশানীর দিকে তাকাল।
ঈশানী সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল। সে চোখের ইশারায় কাদেরকে চুপ থাকতে বলল। তারপর অর্কর পাতে আরেকটু ডাল দিতে দিতে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আসলে হয়েছে কি জানো, অর্ক? তুলসীদির বাবা ভীষণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। উনি বলতেন, মানুষ হওয়াটাই আসল, মাযহাব তো পরে। তাই উনি ছেলেমেয়েদের নাম এমন রেখেছেন - একজনের নাম তুলসী, আরেকজনের নাম কাদের।"
অর্ক কথাটা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল।
"তাই নাকি! বাহ! এটা তো দারুণ ব্যাপার। সত্যিই তো, এমন মানসিকতাই তো দরকার।"
কাদেরও মাথা নেড়ে বলল, "জ্বী, জ্বী দাদা। বাবা ওইরকমই ছিল।"
অর্ক হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, "তোমরা যতদিন ইচ্ছা এখানে থাকো। কোনো অসুবিধা নেই। আসলে ঈশানী সারাদিন একা থাকে, রিশিকাকে নিয়ে। তাই তুলসীকে রাখা। তোমরা দুজন যখন এসেছ, ভালোই হলো। ঈশানী আর রিশিকার একটু খেয়াল রেখো। বর্ডার এলাকা তো, একটু দেখেশুনে রাখবে।"
অর্ক সরল মনে কথাগুলো বলে বেসিনে গেল।
আর টেবিলের দুপাশে বসে থাকা দুজন দাগী আসামী আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানী - তিনজনই একে অপরের দিকে তাকাল।
অর্ক তার স্ত্রী আর পাঁচ বছরের মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে গেল এমন দুজন লোকের হাতে, যারা খুনের মামলার আসামী, যাদের নামে পুরো জেলা তোলপাড়।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। ফ্ল্যাটের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা।
দেখা যাক, ভবিষ্যতে কি হয়।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)