27-09-2026, 08:39 AM
পর্ব - ৩
আজ ১৭ই মার্চ। অর্ক আর ঈশানীর ৬ষ্ঠ বিবাহবার্ষিকী।
সকাল থেকেই ফ্ল্যাটে একটা অন্যরকম গন্ধ। তুলসি দি সকাল সকাল এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। রিশিকা তার ছোট্ট হাতে একটা কার্ড বানিয়েছে, সেখানে লাল রঙ দিয়ে লেখা - HAPPY ANNIVERSARY MAA BABA।
অর্ক সকালে ব্যাংকে যাওয়ার সময় বলে গেছে, "আজ তাড়াতাড়ি ফিরব। SBI বসিরহাট ব্রাঞ্চের সব কাজ শেষ করে সোজা বাড়ি।"
ঈশানী ঠিক করেছিল, আজ বাইরে থেকে কেক কিনবে না। নিজের হাতে বানাবে। ইউটিউব দেখে রেসিপি লিখে রেখেছে। তাই সন্ধ্যা ছটার দিকে রিশিকা আর তুলসিকে ঘরে রেখে সে বাজারের দিকে গেল।
বসিরহাটের সন্ধ্যার বাজার তখন জমজমাট। মাইকে গান বাজছে, রাস্তায় ভ্যান, টোটো।
ঈশানী বেকারির দোকানে ঢুকে ময়দা, ডিম, ক্রিম, চেরি - সব নিচ্ছিল। দোকানের কোণায় একটা পুরনো টিভি চলছিল। হঠাৎ টিভির নিউজে একটা ব্রেকিং খবর ভেসে উঠল।
"বসিরহাট সাব-জেল থেকে পলাতক দুই দাগী আসামী। শীর্ষ সন্ত্রাসী কাদের সর্দার, বয়স ৫০, এবং তার সহযোগী গণেশ মন্ডল, বয়স ৪৫। দুজনেই খুন, অপহরণের মামলার আসামী। দেখা মাত্রই পুলিশের দেওয়া ১০০ নাম্বারে ফোন করুন।"
স্ক্রিনে দুটো ছবি। একজনের মুখে কাটা দাগ, চোখদুটো লাল।
ঈশানীর হাতটা কেঁপে উঠল। ব্যাগটা শক্ত করে ধরল। মনে মনে ভাবল, "হে ভগবান, এ কোন জায়গায় নিয়ে এল অর্ক আমাদের? যেখানে দিনে দুপুরে জেল ভেঙে আসামী পালায়? এখানে কোনো নিরাপত্তাই নেই।"
সে আর দেরি করল না। জিনিসগুলো নিয়ে দ্রুত পা চালাল বাড়ির দিকে।
গলির মুখটা আজ কেমন যেন বেশি অন্ধকার। ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে আলোটা জ্বলছে না। দোতলায় উঠে ঈশানী দেখল, তাদের ফ্ল্যাটের বাইরের কলাপসিবল গেটটা ভেজানো, কিন্তু ভেতরের কাঠের দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। একটা সরু আলোর রেখা বাইরে এসে পড়ছে।
বুকটা ধক করে উঠল। সে তো যাওয়ার সময় দরজা ভালো করে বন্ধ করে গিয়েছিল। তুলসি দি তো কখনো দরজা খুলে রাখে না।
সে আস্তে করে দরজায় হাত রাখল। মোচড় দিতেই দরজাটা খুলে গেল।
আর দরজা খুলতেই ঈশানীর পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। লম্বা, শক্তপোক্ত শরীর, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে বসন্তের দাগ আর একটা লম্বা কাটা দাগ চোয়াল থেকে কান পর্যন্ত নেমে গেছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এ আর কেউ না, টিভিতে দেখা সেই কাদের।
তার এক হাতে একটা দেশি পিস্তল, অন্য হাতে সে ধরে রেখেছে রিশিকাকে। ছোট্ট মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে কিন্তু কাঁদতেও পারছে না ভয়ে।
কোণায় মেঝেতে বসে আছে তুলসি। তার শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সে দুহাত জোড় করে কাঁদছে।
কাদের কর্কশ গলায় বলল, "শালী, এক পা আগালে এর অবস্থা খারাপ হবে। চুপচাপ বসে থাক।"
তুলসি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ওদের কিছু করবেন না। ও ছোট বাচ্চা। ওর মা আসলে আমি কী জবাব দেব? আমাকে মেরে ফেলেন, বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেন।"
তখনই ভেতরের ঘর থেকে আরেকজন লোক বেরিয়ে এল। গণেশ। বেঁটে, মোটা, মাথায় টাক। সে পুরো ফ্ল্যাটটা দেখে এসে বলল, "বস, আর কেউ নেই ঘরে। পুরো ফাঁকা।"
ঈশানীর হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। ডিম ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
সেই শব্দে রিশিকা দরজার দিকে তাকাল। মাকে দেখে তার বুক ফেটে গেল।
"মা!"
কাদের সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। পরনে একটা হালকা নীল তাঁতের শাড়ি, স্ট্রেইট চুলটা পিঠের ওপর ছড়ানো। বাজার থেকে ফিরেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তার মধ্যেও একটা অদ্ভুত মায়া, একটা তীব্র মমতা ফুটে উঠছে। চোখদুটো জলে ভরা, ঠোঁট কাঁপছে।
কাদের এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
ঈশানী নিজেকে সামলে চিৎকার করে উঠল, "আপনারা কারা? ছাড়ুন! ছাড়ুন আমার মেয়েকে! ওকে ছেড়ে দিন!"
সে সামনে এগোতে গেল।
কাদের সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা আরও শক্ত করে ধরল আর গর্জে উঠল, "খবরদার! এক পা এগোলে ভালো হবে না। যেখানে আছিস সেখানেই দাঁড়া!"
ঈশানী থেমে গেল। তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে হাত জোড় করল।
"কি চান আপনারা? টাকা? গয়না? সব নিয়ে যান। আলমারিতে যা আছে সব নিয়ে যান। শুধু আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দিন। ওর কোনো দোষ নেই।"
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। পুলিশের গাড়ির শব্দ। গলির মুখে এসে থেমেছে।
গণেশ দৌড়ে ব্যালকনিতে গেল। উঁকি দিয়ে দেখে এসে ফিসফিস করে বলল, "বস, পুলিশ। গলিতে ঢুকছে। মনে হয় প্রত্যেক বাড়ি চেক করবে।"
ঘরের ভেতরটা মুহূর্তে আরও থমথমে হয়ে গেল।
কাদেরের চোখে একটা হিংস্র অস্থিরতা। সে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "শোন, পুলিশ আসছে। যদি একটা কথাও বলেছিস আমাদের ব্যাপারে, যদি মুখ খুলেছিস - তাহলে মনে রাখিস, আমি জেলে গেলেও তোদের আমি ছাড়ব না। আমি আবার আসব। তোর মেয়েকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।"
তারপর সে গণেশকে ইশারা করল। দুজন দ্রুত পা টিপে টিপে বাথরুমের দিকে গেল। বাথরুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
বাইরে পুলিশের বুটের শব্দ ক্রমশ কাছে আসছে। সিঁড়িতে উঠছে।
ঈশানী দৌড়ে গিয়ে রিশিকাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। রিশিকা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তুলসিও উঠে এসে দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
তিনজন কাঁপছে। আর বাথরুমের ভেতর থেকে দুটো নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ শোনা যাচ্ছে।
দরজায় এবার কড়া নাড়ার শব্দ।
ঠক ঠক ঠক...
চলবে...
আজ ১৭ই মার্চ। অর্ক আর ঈশানীর ৬ষ্ঠ বিবাহবার্ষিকী।
সকাল থেকেই ফ্ল্যাটে একটা অন্যরকম গন্ধ। তুলসি দি সকাল সকাল এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। রিশিকা তার ছোট্ট হাতে একটা কার্ড বানিয়েছে, সেখানে লাল রঙ দিয়ে লেখা - HAPPY ANNIVERSARY MAA BABA।
অর্ক সকালে ব্যাংকে যাওয়ার সময় বলে গেছে, "আজ তাড়াতাড়ি ফিরব। SBI বসিরহাট ব্রাঞ্চের সব কাজ শেষ করে সোজা বাড়ি।"
ঈশানী ঠিক করেছিল, আজ বাইরে থেকে কেক কিনবে না। নিজের হাতে বানাবে। ইউটিউব দেখে রেসিপি লিখে রেখেছে। তাই সন্ধ্যা ছটার দিকে রিশিকা আর তুলসিকে ঘরে রেখে সে বাজারের দিকে গেল।
বসিরহাটের সন্ধ্যার বাজার তখন জমজমাট। মাইকে গান বাজছে, রাস্তায় ভ্যান, টোটো।
ঈশানী বেকারির দোকানে ঢুকে ময়দা, ডিম, ক্রিম, চেরি - সব নিচ্ছিল। দোকানের কোণায় একটা পুরনো টিভি চলছিল। হঠাৎ টিভির নিউজে একটা ব্রেকিং খবর ভেসে উঠল।
"বসিরহাট সাব-জেল থেকে পলাতক দুই দাগী আসামী। শীর্ষ সন্ত্রাসী কাদের সর্দার, বয়স ৫০, এবং তার সহযোগী গণেশ মন্ডল, বয়স ৪৫। দুজনেই খুন, অপহরণের মামলার আসামী। দেখা মাত্রই পুলিশের দেওয়া ১০০ নাম্বারে ফোন করুন।"
স্ক্রিনে দুটো ছবি। একজনের মুখে কাটা দাগ, চোখদুটো লাল।
ঈশানীর হাতটা কেঁপে উঠল। ব্যাগটা শক্ত করে ধরল। মনে মনে ভাবল, "হে ভগবান, এ কোন জায়গায় নিয়ে এল অর্ক আমাদের? যেখানে দিনে দুপুরে জেল ভেঙে আসামী পালায়? এখানে কোনো নিরাপত্তাই নেই।"
সে আর দেরি করল না। জিনিসগুলো নিয়ে দ্রুত পা চালাল বাড়ির দিকে।
গলির মুখটা আজ কেমন যেন বেশি অন্ধকার। ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে আলোটা জ্বলছে না। দোতলায় উঠে ঈশানী দেখল, তাদের ফ্ল্যাটের বাইরের কলাপসিবল গেটটা ভেজানো, কিন্তু ভেতরের কাঠের দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। একটা সরু আলোর রেখা বাইরে এসে পড়ছে।
বুকটা ধক করে উঠল। সে তো যাওয়ার সময় দরজা ভালো করে বন্ধ করে গিয়েছিল। তুলসি দি তো কখনো দরজা খুলে রাখে না।
সে আস্তে করে দরজায় হাত রাখল। মোচড় দিতেই দরজাটা খুলে গেল।
আর দরজা খুলতেই ঈশানীর পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। লম্বা, শক্তপোক্ত শরীর, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে বসন্তের দাগ আর একটা লম্বা কাটা দাগ চোয়াল থেকে কান পর্যন্ত নেমে গেছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এ আর কেউ না, টিভিতে দেখা সেই কাদের।
তার এক হাতে একটা দেশি পিস্তল, অন্য হাতে সে ধরে রেখেছে রিশিকাকে। ছোট্ট মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে কিন্তু কাঁদতেও পারছে না ভয়ে।
কোণায় মেঝেতে বসে আছে তুলসি। তার শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সে দুহাত জোড় করে কাঁদছে।
কাদের কর্কশ গলায় বলল, "শালী, এক পা আগালে এর অবস্থা খারাপ হবে। চুপচাপ বসে থাক।"
তুলসি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ওদের কিছু করবেন না। ও ছোট বাচ্চা। ওর মা আসলে আমি কী জবাব দেব? আমাকে মেরে ফেলেন, বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেন।"
তখনই ভেতরের ঘর থেকে আরেকজন লোক বেরিয়ে এল। গণেশ। বেঁটে, মোটা, মাথায় টাক। সে পুরো ফ্ল্যাটটা দেখে এসে বলল, "বস, আর কেউ নেই ঘরে। পুরো ফাঁকা।"
ঈশানীর হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। ডিম ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
সেই শব্দে রিশিকা দরজার দিকে তাকাল। মাকে দেখে তার বুক ফেটে গেল।
"মা!"
কাদের সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। পরনে একটা হালকা নীল তাঁতের শাড়ি, স্ট্রেইট চুলটা পিঠের ওপর ছড়ানো। বাজার থেকে ফিরেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তার মধ্যেও একটা অদ্ভুত মায়া, একটা তীব্র মমতা ফুটে উঠছে। চোখদুটো জলে ভরা, ঠোঁট কাঁপছে।
কাদের এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
ঈশানী নিজেকে সামলে চিৎকার করে উঠল, "আপনারা কারা? ছাড়ুন! ছাড়ুন আমার মেয়েকে! ওকে ছেড়ে দিন!"
সে সামনে এগোতে গেল।
কাদের সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা আরও শক্ত করে ধরল আর গর্জে উঠল, "খবরদার! এক পা এগোলে ভালো হবে না। যেখানে আছিস সেখানেই দাঁড়া!"
ঈশানী থেমে গেল। তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে হাত জোড় করল।
"কি চান আপনারা? টাকা? গয়না? সব নিয়ে যান। আলমারিতে যা আছে সব নিয়ে যান। শুধু আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দিন। ওর কোনো দোষ নেই।"
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। পুলিশের গাড়ির শব্দ। গলির মুখে এসে থেমেছে।
গণেশ দৌড়ে ব্যালকনিতে গেল। উঁকি দিয়ে দেখে এসে ফিসফিস করে বলল, "বস, পুলিশ। গলিতে ঢুকছে। মনে হয় প্রত্যেক বাড়ি চেক করবে।"
ঘরের ভেতরটা মুহূর্তে আরও থমথমে হয়ে গেল।
কাদেরের চোখে একটা হিংস্র অস্থিরতা। সে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "শোন, পুলিশ আসছে। যদি একটা কথাও বলেছিস আমাদের ব্যাপারে, যদি মুখ খুলেছিস - তাহলে মনে রাখিস, আমি জেলে গেলেও তোদের আমি ছাড়ব না। আমি আবার আসব। তোর মেয়েকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।"
তারপর সে গণেশকে ইশারা করল। দুজন দ্রুত পা টিপে টিপে বাথরুমের দিকে গেল। বাথরুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
বাইরে পুলিশের বুটের শব্দ ক্রমশ কাছে আসছে। সিঁড়িতে উঠছে।
ঈশানী দৌড়ে গিয়ে রিশিকাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। রিশিকা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তুলসিও উঠে এসে দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
তিনজন কাঁপছে। আর বাথরুমের ভেতর থেকে দুটো নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ শোনা যাচ্ছে।
দরজায় এবার কড়া নাড়ার শব্দ।
ঠক ঠক ঠক...
চলবে...



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)