পর্ব - ১
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশার মতো একটা পাতলা ধুলোর চাদর লেগে আছে উত্তর চব্বিশ পরগনার এই সীমান্ত ঘেঁষা শহরটার ওপর। জায়গাটার নাম বসিরহাট।
আকাশটা এখানে কলকাতার মতো নীল নয়। কেমন যেন ধূসর, ভারী। বাতাসে সবসময় একটা নোনতা গন্ধ, ইছামতীর ওপার থেকে ভেসে আসা।
ঈশানী জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার বয়স ছাব্বিশ, গায়ের রং দুধের ফর্সা, চোখদুটো টানা টানা, কাজল ছাড়াই গভীর কালো। কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলটা সে খোঁপা না করে ছেড়ে রেখেছে। কোলে ঘুমিয়ে আছে তার পাঁচ বছরের মেয়ে রিশিকা।
বাইরে সরু পিচের রাস্তা। ধুলো উড়ছে। দুটো চায়ের দোকান সবে ঝাঁপ খুলেছে। দূরে উঁচু পাঁচিল ঘেরা কিছু বাড়ি, যার গায়ে পানের পিক আর রাজনৈতিক পোস্টারের দাগ। এটা ঠিক শহরও নয়, গ্রামও নয়। মাঝামাঝি একটা জায়গা, যেখানে মানুষ থাকে, বাজার বসে, কিন্তু রাত হলেই সবাই দরজায় খিল দিয়ে দেয়।
তিনতলা একটা নতুন বাড়ির দোতলায় ওদের ফ্ল্যাট।
ঈশানীর স্বামী অর্ক মুখার্জি। বয়স উনত্রিশ। লম্বা, চওড়া কাঁধ, চোখে একটা জেদি, একরোখা ভাব। স্টেট ব্যাংক এর অফিসার। এবার ট্রান্সফার হয়ে এসেছে বসিরহাট ব্রাঞ্চে।
যখন চিঠিটা এসেছিল, অর্কর মা কেঁদে ফেলেছিলেন কলকাতার গড়িয়ার বাড়িতে বসে। বাবা বলেছিলেন, "অর্ক, বসিরহাট ভালো জায়গা না। ওটা বর্ডার এরিয়া। রাত-বিরেতে ঝামেলা লেগেই থাকে। তুই ট্রান্সফার আটকানোর জন্য অ্যাপ্লিকেশন কর।"
ঈশানীর মা-ও ফোনে বলেছিল, "তুই মেয়েটাকে নিয়ে ওখানে যাস না, ঈশানী। অর্ক একা গিয়ে থাকুক। রিশিকার কলেজটা এখানেই ভালো আছে।"
অর্ক কারো কথা শোনেনি। সে শুধু বলেছিল, "এটা আমার প্রথম ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের পোস্টিং। ক্যারিয়ারের জন্য আমাকে যেতেই হবে।"
আর ঈশানী? সে শুধু একটু হেসে বলেছিল, "অর্ক যেখানে, আমরাও সেখানে।"
তাই ছয় বছরের সংসার, একটা ছোট ট্রলি ব্যাগে গুছিয়ে নেওয়া কিছু শাড়ি, অর্কর দুটো ফর্মাল শার্ট, আর রিশিকার এক বাক্স খেলনা নিয়ে তারা চলে এসেছে এই ফ্ল্যাটে।
ফ্ল্যাটটা বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না, ভেতরটা এত সুন্দর। পরিষ্কার সাদা মেঝে, দক্ষিণমুখী বড় জানালা, আর একটা ছোট্ট ব্যালকনি যেখানে দাঁড়ালে ইছামতীর একটা সরু খাল দেখা যায়। প্রথমদিন অর্ক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "কি, খারাপ বলেছিলাম? জায়গাটা খারাপ না তো?"
ঈশানী হেসে মাথা নেড়েছিল। কিন্তু রাত যখন গভীর হয়, দূর থেকে যখন মাইকের আওয়াজ বা হঠাৎ কোনো বাইকের বিকট শব্দ ভেসে আসে, তখন রিশিকাকে বুকে জড়িয়ে তার বুকটা একটু কেঁপে ওঠে।
তিনদিনের মধ্যেই অর্ক একজন কাজের লোক ঠিক করে আনল। নাম তুলসি।
তুলসির বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। শ্যামলা গায়ের রং, শক্তপোক্ত শরীর, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। চোখে সারাজীবনের ক্লান্তি জমে আছে, কিন্তু হাতের কাজে ভীষণ নিপুণ। সকাল আটটায় আসবে, সন্ধ্যা ছটায় চলে যাবে।
আসলে ঘরের কাজের জন্য নয়, অর্কর চিন্তা ছিল অন্য জায়গায়। ব্যাংক থেকে ফিরতে তার সন্ধ্যা হয়ে যায়। এই অচেনা জায়গায় ঈশানী আর রিশিকাকে একা রেখে যেতে তার মন টানতো না।
প্রথমদিন সকালে তুলসি এল। পরনে একটা পুরনো ছাপা শাড়ি, হাতে স্টিলের টিফিন কৌটো। দরজায় দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল, "বৌদি, আমি তুলসি।"
ঈশানী দরজা খুলে হাসল, "এসো ভেতরে।"
রিশিকা তখন ড্রয়িংরুমে মেঝেতে বসে ছবি আঁকছিল। তুলসিকে দেখে সে বড় বড় চোখে তাকাল। তুলসিও অবাক হয়ে তাকাল। তার নিজের কোনো সন্তান নেই। বহু বছর আগে স্বামী তাকে ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে গেছে। সেই থেকে সে একাই থাকে, লোকের বাড়ি কাজ করে।
"বৌদি, আপনার মেয়ে বুঝি?" তুলসি জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ, রিশিকা। পাঁচ বছর বয়স। ভীষণ দুষ্টু।" ঈশানী মেয়েকে কোলে তুলে নিল। "রিশিকা, মাসিকে প্রণাম করো।"
রিশিকা ছোট্ট হাতে প্রণাম করল। তুলসি তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করল।
কাজ শুরু হলো। তুলসি ঘর মুছল, বাসন মাজল, রান্নাঘরে গিয়ে ডাল বসাল। ঈশানী তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। কলকাতায় তার নিজের শ্বাশুড়ি সব করে দিত, এখানে তাকে সব শিখতে হচ্ছে। তুলসি তাকে দেখিয়ে দিচ্ছিল, কোন মশলা কখন দিতে হয়।
কথায় কথায় তুলসি তার গল্প বলল। খুব সাধারণ গল্প, কিন্তু ভেতরটা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।
"আমার বর বিড়ি কারখানায় কাজ করত, বৌদি। রোজ মদ খেয়ে এসে মারধর করত। একদিন রাতে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেল, আর ফেরেনি। শুনেছি এখন বহরমপুরে আরেকটা সংসার করেছে। আমি আর খোঁজ করিনি।"
ঈশানী চুপ করে শুনছিল। তার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। এই শহরের ধুলোর মতোই রুক্ষ এই মহিলার জীবন, কিন্তু মুখে কোনো অভিযোগ নেই। সে তুলসির হাতটা ধরল।
"আজ থেকে তুমি একা নও, তুলসি দি। আমরা আছি। তুমি আমাদের সাথেই থাকবে।"
তুলসির চোখেও জল চলে এল। সে তাড়াতাড়ি আঁচলে মুছে নিল।
সেই থেকে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হলো। সকালবেলা তুলসি এলে রিশিকা দৌড়ে গিয়ে তার আঁচল ধরে। তুলসি তাকে কোলে নিয়ে গল্প বলে - ইছামতীর বাঁকে যে শঙ্খচূড় সাপ থাকে তার গল্প, বর্ডারের ওপারে যে আলো জ্বলে তার গল্প।
দুপুরে যখন অর্ক ব্যাংকে, রিশিকা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন দুই নারী বারান্দায় বসে চা খায়। তুলসি ফিসফিস করে বলে, "বৌদি, সন্ধ্যার পর মেয়েকে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িও না। এখানে রাত হলে অনেক কিছু হয়। ওই যে দূরে আলো দেখছ, ওখানে মাঝে মাঝে গোলমাল হয়। পুলিশ আসে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। সবাই চুপ করে থাকে।"
ঈশানী ভয় আর কৌতূহল নিয়ে শোনে। তার কলকাতার জীবনে এসব ছিল শুধু খবরের কাগজের হেডলাইন। এখানে এটা রোজকার জীবন।
সন্ধ্যায় অর্ক ফিরলে ঈশানী তাকে সব বলে। এর ম্যানেজারের কোয়ার্টারের গল্প, তুলসি দির হাতের রান্নার গল্প। অর্ক হেসে বলে, "ভয় পেও না, ঈশানী। আমি আছি তো। বসিরহাট ব্রাঞ্চে আমাকে সবাই চেনে এখন।"
রাত গভীর হয়। তুলসি চলে যায়। যাওয়ার আগে রিশিকার কপালে একটা চুমু দিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হয়।
ফ্ল্যাটের ভেতর তখন শুধু একটা টিউবলাইটের আলো। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। ইছামতীর দিক থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ছে।
ঈশানী রিশিকাকে বুকে নিয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা একটা আলোকিত দ্বীপের মতো। চারপাশে অন্ধকার একটা সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের নিচে কী আছে, কেউ জানে না।
অর্ক পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখে।
এভাবেই শুরু হলো তাদের নতুন জীবন। একটা নতুন শহর, একটা সীমান্তের শহর, একটা পাঁচ বছরের মেয়ে, আর দুই নারীর একটু একটু করে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব।
যে বন্ধুত্ব এখনো শুধু শুরু।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশার মতো একটা পাতলা ধুলোর চাদর লেগে আছে উত্তর চব্বিশ পরগনার এই সীমান্ত ঘেঁষা শহরটার ওপর। জায়গাটার নাম বসিরহাট।
আকাশটা এখানে কলকাতার মতো নীল নয়। কেমন যেন ধূসর, ভারী। বাতাসে সবসময় একটা নোনতা গন্ধ, ইছামতীর ওপার থেকে ভেসে আসা।
ঈশানী জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার বয়স ছাব্বিশ, গায়ের রং দুধের ফর্সা, চোখদুটো টানা টানা, কাজল ছাড়াই গভীর কালো। কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলটা সে খোঁপা না করে ছেড়ে রেখেছে। কোলে ঘুমিয়ে আছে তার পাঁচ বছরের মেয়ে রিশিকা।
বাইরে সরু পিচের রাস্তা। ধুলো উড়ছে। দুটো চায়ের দোকান সবে ঝাঁপ খুলেছে। দূরে উঁচু পাঁচিল ঘেরা কিছু বাড়ি, যার গায়ে পানের পিক আর রাজনৈতিক পোস্টারের দাগ। এটা ঠিক শহরও নয়, গ্রামও নয়। মাঝামাঝি একটা জায়গা, যেখানে মানুষ থাকে, বাজার বসে, কিন্তু রাত হলেই সবাই দরজায় খিল দিয়ে দেয়।
তিনতলা একটা নতুন বাড়ির দোতলায় ওদের ফ্ল্যাট।
ঈশানীর স্বামী অর্ক মুখার্জি। বয়স উনত্রিশ। লম্বা, চওড়া কাঁধ, চোখে একটা জেদি, একরোখা ভাব। স্টেট ব্যাংক এর অফিসার। এবার ট্রান্সফার হয়ে এসেছে বসিরহাট ব্রাঞ্চে।
যখন চিঠিটা এসেছিল, অর্কর মা কেঁদে ফেলেছিলেন কলকাতার গড়িয়ার বাড়িতে বসে। বাবা বলেছিলেন, "অর্ক, বসিরহাট ভালো জায়গা না। ওটা বর্ডার এরিয়া। রাত-বিরেতে ঝামেলা লেগেই থাকে। তুই ট্রান্সফার আটকানোর জন্য অ্যাপ্লিকেশন কর।"
ঈশানীর মা-ও ফোনে বলেছিল, "তুই মেয়েটাকে নিয়ে ওখানে যাস না, ঈশানী। অর্ক একা গিয়ে থাকুক। রিশিকার কলেজটা এখানেই ভালো আছে।"
অর্ক কারো কথা শোনেনি। সে শুধু বলেছিল, "এটা আমার প্রথম ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের পোস্টিং। ক্যারিয়ারের জন্য আমাকে যেতেই হবে।"
আর ঈশানী? সে শুধু একটু হেসে বলেছিল, "অর্ক যেখানে, আমরাও সেখানে।"
তাই ছয় বছরের সংসার, একটা ছোট ট্রলি ব্যাগে গুছিয়ে নেওয়া কিছু শাড়ি, অর্কর দুটো ফর্মাল শার্ট, আর রিশিকার এক বাক্স খেলনা নিয়ে তারা চলে এসেছে এই ফ্ল্যাটে।
ফ্ল্যাটটা বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না, ভেতরটা এত সুন্দর। পরিষ্কার সাদা মেঝে, দক্ষিণমুখী বড় জানালা, আর একটা ছোট্ট ব্যালকনি যেখানে দাঁড়ালে ইছামতীর একটা সরু খাল দেখা যায়। প্রথমদিন অর্ক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "কি, খারাপ বলেছিলাম? জায়গাটা খারাপ না তো?"
ঈশানী হেসে মাথা নেড়েছিল। কিন্তু রাত যখন গভীর হয়, দূর থেকে যখন মাইকের আওয়াজ বা হঠাৎ কোনো বাইকের বিকট শব্দ ভেসে আসে, তখন রিশিকাকে বুকে জড়িয়ে তার বুকটা একটু কেঁপে ওঠে।
তিনদিনের মধ্যেই অর্ক একজন কাজের লোক ঠিক করে আনল। নাম তুলসি।
তুলসির বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। শ্যামলা গায়ের রং, শক্তপোক্ত শরীর, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। চোখে সারাজীবনের ক্লান্তি জমে আছে, কিন্তু হাতের কাজে ভীষণ নিপুণ। সকাল আটটায় আসবে, সন্ধ্যা ছটায় চলে যাবে।
আসলে ঘরের কাজের জন্য নয়, অর্কর চিন্তা ছিল অন্য জায়গায়। ব্যাংক থেকে ফিরতে তার সন্ধ্যা হয়ে যায়। এই অচেনা জায়গায় ঈশানী আর রিশিকাকে একা রেখে যেতে তার মন টানতো না।
প্রথমদিন সকালে তুলসি এল। পরনে একটা পুরনো ছাপা শাড়ি, হাতে স্টিলের টিফিন কৌটো। দরজায় দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল, "বৌদি, আমি তুলসি।"
ঈশানী দরজা খুলে হাসল, "এসো ভেতরে।"
রিশিকা তখন ড্রয়িংরুমে মেঝেতে বসে ছবি আঁকছিল। তুলসিকে দেখে সে বড় বড় চোখে তাকাল। তুলসিও অবাক হয়ে তাকাল। তার নিজের কোনো সন্তান নেই। বহু বছর আগে স্বামী তাকে ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে গেছে। সেই থেকে সে একাই থাকে, লোকের বাড়ি কাজ করে।
"বৌদি, আপনার মেয়ে বুঝি?" তুলসি জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ, রিশিকা। পাঁচ বছর বয়স। ভীষণ দুষ্টু।" ঈশানী মেয়েকে কোলে তুলে নিল। "রিশিকা, মাসিকে প্রণাম করো।"
রিশিকা ছোট্ট হাতে প্রণাম করল। তুলসি তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করল।
কাজ শুরু হলো। তুলসি ঘর মুছল, বাসন মাজল, রান্নাঘরে গিয়ে ডাল বসাল। ঈশানী তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। কলকাতায় তার নিজের শ্বাশুড়ি সব করে দিত, এখানে তাকে সব শিখতে হচ্ছে। তুলসি তাকে দেখিয়ে দিচ্ছিল, কোন মশলা কখন দিতে হয়।
কথায় কথায় তুলসি তার গল্প বলল। খুব সাধারণ গল্প, কিন্তু ভেতরটা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।
"আমার বর বিড়ি কারখানায় কাজ করত, বৌদি। রোজ মদ খেয়ে এসে মারধর করত। একদিন রাতে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেল, আর ফেরেনি। শুনেছি এখন বহরমপুরে আরেকটা সংসার করেছে। আমি আর খোঁজ করিনি।"
ঈশানী চুপ করে শুনছিল। তার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। এই শহরের ধুলোর মতোই রুক্ষ এই মহিলার জীবন, কিন্তু মুখে কোনো অভিযোগ নেই। সে তুলসির হাতটা ধরল।
"আজ থেকে তুমি একা নও, তুলসি দি। আমরা আছি। তুমি আমাদের সাথেই থাকবে।"
তুলসির চোখেও জল চলে এল। সে তাড়াতাড়ি আঁচলে মুছে নিল।
সেই থেকে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হলো। সকালবেলা তুলসি এলে রিশিকা দৌড়ে গিয়ে তার আঁচল ধরে। তুলসি তাকে কোলে নিয়ে গল্প বলে - ইছামতীর বাঁকে যে শঙ্খচূড় সাপ থাকে তার গল্প, বর্ডারের ওপারে যে আলো জ্বলে তার গল্প।
দুপুরে যখন অর্ক ব্যাংকে, রিশিকা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন দুই নারী বারান্দায় বসে চা খায়। তুলসি ফিসফিস করে বলে, "বৌদি, সন্ধ্যার পর মেয়েকে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িও না। এখানে রাত হলে অনেক কিছু হয়। ওই যে দূরে আলো দেখছ, ওখানে মাঝে মাঝে গোলমাল হয়। পুলিশ আসে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। সবাই চুপ করে থাকে।"
ঈশানী ভয় আর কৌতূহল নিয়ে শোনে। তার কলকাতার জীবনে এসব ছিল শুধু খবরের কাগজের হেডলাইন। এখানে এটা রোজকার জীবন।
সন্ধ্যায় অর্ক ফিরলে ঈশানী তাকে সব বলে। এর ম্যানেজারের কোয়ার্টারের গল্প, তুলসি দির হাতের রান্নার গল্প। অর্ক হেসে বলে, "ভয় পেও না, ঈশানী। আমি আছি তো। বসিরহাট ব্রাঞ্চে আমাকে সবাই চেনে এখন।"
রাত গভীর হয়। তুলসি চলে যায়। যাওয়ার আগে রিশিকার কপালে একটা চুমু দিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হয়।
ফ্ল্যাটের ভেতর তখন শুধু একটা টিউবলাইটের আলো। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। ইছামতীর দিক থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ছে।
ঈশানী রিশিকাকে বুকে নিয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা একটা আলোকিত দ্বীপের মতো। চারপাশে অন্ধকার একটা সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের নিচে কী আছে, কেউ জানে না।
অর্ক পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখে।
এভাবেই শুরু হলো তাদের নতুন জীবন। একটা নতুন শহর, একটা সীমান্তের শহর, একটা পাঁচ বছরের মেয়ে, আর দুই নারীর একটু একটু করে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব।
যে বন্ধুত্ব এখনো শুধু শুরু।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)