26-09-2026, 07:07 PM
রাতের খাবার
ছায়াটা সরে গেছিল। ফোনের আলোটা নিভে গেছিল। আর সেই হালকা ক্লিক শব্দটা — প্রায় শোনা যায় না, তবু সিনথিয়ার কানে বাজছিল বারবার।
দুলাভাই দরজার দিকে তাকালেন। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজাটা টেনে দিলেন — ভেতর থেকে। ছিটকিনি লাগালেন না, শুধু ভেজিয়ে দিলেন। ফিরে এসে বিছানায় বসলেন। তার মুখে ঘাম।
«কে ছিল?» — সিনথিয়ার গলা ফিসফিসের চেয়েও নিচু, কাঁপা।
«জানি না।» — দুলাভাইয়ের চোখে অস্থিরতা। «হয়তো... তোর আপু। রান্নাঘর থেকে বেরিয়েছিল হয়তো। পানি নিতে।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল — এত জোরে যে মনে হচ্ছিল দুলাভাই শুনতে পাচ্ছেন। আপু। শিলা আপু। দেখে ফেলেছে? সবকিছু? তার গা শিউরে উঠল — লজ্জায়, ভয়ে, আতঙ্কে। চোখে পানি এসে গেল। «আমি... আমি মরে যাবো... আপু যদি...»
«শোন,» — দুলাভাই তার মুখটা দুই হাতে ধরলেন, চোখে চোখ রাখলেন — «যা হয়েছে, হয়েছে। আমি সামলাবো। আমি তোর দুলাভাই — এই বাড়ির কর্তা। তুই ভয় পাস না।» — তার কপালে চুমু খেলেন, দীর্ঘ। «নে, ওঠ। জামা পর। মুখ ধুয়ে আয়। আপু ডাকার আগেই আমাদের বাইরে যেতে হবে — স্বাভাবিকভাবে।»
সিনথিয়া বাথরুমে গেল। আয়নায় তাকাল — আর চমকে উঠল। এই মেয়েটা কে? চোখ দুটো ভেজা, কিন্তু জ্বলজ্বলে। ঠোঁট ফোলা — কামড়ানোর দাগ। গলায় লালচে ছাপ — দুলাভাইয়ের মুখের ছাপ। সে পানি ছিটাল মুখে — ঠান্ডা পানি — কিন্তু ভেতরের আগুন নিভল না। শরীরের ভেতরটা এখনো টনটন করছিল — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল — এক ঘণ্টা আগে সে আর কুমারী নেই। এই ভাবনায় তার বুক মোচড় দিল — ভয়, লজ্জা, আর... আর একটা অদ্ভুত গর্ব। সে কিছু করেছে — নিষিদ্ধ, ভয়ংকর — কিন্তু নিজের ইচ্ছেয়। কেউ জোর করেনি।
কিন্তু আপু দেখে ফেলেছে। এই ভাবনাটা ফিরে এলো — ঠান্ডা স্রোতের মতো। আপু কী ভাবছে? ঘেন্না করছে? মাকে বলে দেবে? তার হাত কাঁপছিল তোয়ালে ধরতে গিয়ে। «শান্ত হ,» — সে নিজেকেই বলল আয়নায় — «শান্ত হ, সিনথিয়া।»
সে ফিরে এসে দেখল দুলাভাই প্যান্ট-শার্ট পরে নিয়েছেন — চুল আঁচড়ে, এমন ভান যেন ঘুম থেকে উঠলেন। তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে অপরাধবোধ আর আদর, একসাথে। «শোন,» — তিনি ফিসফিস করলেন — «আপু যদি কিছু জিজ্ঞেস করে — তুই কিছু জানিস না। সব দোষ আমার। বুঝেছিস?»
«কিন্তু—»
«কোনো কিন্তু না।» — তিনি তার হাত চাপ দিলেন এক সেকেন্ডের জন্য — গরম, শক্ত। «আমি আছি।»
সিনথিয়া উঠল। পা কাঁপছিল। শরীরের ভেতরটা এখনো ব্যথা করছিল — মিষ্টি ব্যথা, গভীর ব্যথা — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল কী ঘটেছে। সে সালোয়ারটা তুলে পরল, কুর্তিটা — ভেজা কুর্তিটা বাথরুমে ধুয়ে নিংড়ে বারান্দায় মেলে দিল। অন্য একটা কুর্তি পরল — হালকা সবুজ। আয়নায় নিজেকে দেখল — চোখ লাল, ঠোঁট ফোলা, গলায়... গলায় একটা লাল দাগ। দুলাভাইয়ের দাঁতের দাগ। সে ওড়নাটা ভালো করে গলায় পেঁচিয়ে নিল।
বেরিয়ে দেখল দুলাভাই ড্রয়িংরুমে বসে আছেন — টিভি চালিয়ে, এমন ভান যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার হাত কাঁপছিল — রিমোটটা ধরা হাতে। সিনথিয়া সোফার এক কোণে বসল — দূরে, নিরাপদ দূরত্বে। দুজনের মধ্যে তিন হাত জায়গা — যেন দেয়াল।
তখনই রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «খাবার রেডি! আয়, সবাই!»
সিনথিয়ার পেট মোচড় দিল। খাবার? এই অবস্থায়? কিন্তু না গেলে সন্দেহ হবে। সে উঠল। দুলাভাইও উঠলেন। দুজনে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল — পাশাপাশি নয়, মুখোমুখি।
শিলা আপু খাবার বাড়ছিল — ভাত, ডাল, মাছ ভাজি, আলু ভর্তা। তার মুখ স্বাভাবিক। খুব স্বাভাবিক। সিনথিয়া তাকে দেখল — চুরি করে। আপুর চোখে কিছু ছিল? রাগ? ঘৃণা? কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। আপু হাসল — «কী রে, মুখটা এমন শুকনো কেন? শরীর খারাপ?»
«না... না আপু।» — সিনথিয়া ভাতে হাত দিল। হাত কাঁপছিল। «গরম লাগছিল।»
«এসি চালিয়ে দিই?»
«না না, ঠিক আছে।»
দুলাভাই চুপচাপ খাচ্ছিলেন — মাথা নিচু। এত চুপ যে আপু একবার তাকালেন — «তোমার কী হলো? মুখে কথা নেই?»
«কী আবার হবে।» — দুলাভাই জোর করে হাসলেন। «খিদে পেয়েছে। খাচ্ছি।»
«রনি ফোন করেছিল,» — আপু বললেন, ডাল ঢালতে ঢালতে — «আজ রাতে ফিরবে না। বন্ধুর বাসায় থাকবে। কাল সকালে আসবে।»
সিনথিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ভালো না খারাপ — বুঝতে পারল না। রনি নেই — মানে বাড়িতে শুধু তিনজন।
«তুই কাল কখন যাবি?» — আপু জিজ্ঞেস করল — স্বাভাবিক গলায়।
«কাল... দুপুরে। মা ফোন করেছিল।» — সিনথিয়া মিথ্যে বলল — আধা মিথ্যে। মা ফোন করেনি, কিন্তু কাল যাওয়ার কথা ছিল।
«আরেকদিন থাক না।» — আপু বলল — «তোর তো কলেজ ছুটি।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে কী যেন। «নাকি... থাকতে ইচ্ছে করছে না?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «না... মানে... থাকতে পারি।»
«থাক।» — আপু হাসল। «আমার ভালো লাগে তুই থাকলে।»
দুলাভাই হঠাৎ কাশলেন — জোরে, অস্বাভাবিক। পানির গ্লাস তুলতে গিয়ে হাত কেঁপে পানি ছলকে পড়ল টেবিলে। «সরি,» — তিনি তোয়ালে টানলেন।
আপু তাকে দেখল — ভ্রু কুঁচকে। «তোমার হাত কাঁপছে কেন?»
«কাঁপছে না।» — দুলাভাই জোর গলায় বললেন — কিন্তু হাতটা টেবিলের নিচে লুকালেন। «গরম লাগছে।»
«এসি তো চলছে।» — আপু ঠান্ডা গলায় বলল। তারপর সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তোর গরম লাগছে না?»
«না... ঠিক আছি।»
«হুম।» — আপু খেতে লাগল — কিন্তু তার চোখ দুজনের ওপর ঘুরছিল — শিকারি চোখ। «আচ্ছা সিনথিয়া, তোর বয়ফ্রেন্ড আছে?»
সিনথিয়া বিষম খেল। «কী!»
«বয়ফ্রেন্ড।» — আপু নির্বিকার। «তোর বয়সে তো থাকে। লুকাস না।»
«না আপু! নেই!» — সিনথিয়ার মুখ লাল।
«সত্যি?» — আপু ঝুঁকল সামনে — «কেউ পছন্দ করে না? কলেজে? পাড়ায়?»
«আপু!» — সিনথিয়া পানি খেল — গলা ভেজাতে।
«আরে, লজ্জা পাস কেন?» — আপু হাসল — «আমি তোর আপু। আমাকে বলা যায়।» — সে এক মুহূর্ত থামল। «নাকি... কেউ আছে, যার কথা আমাকে বলা যায় না?»
ঘরে নীরবতা। দুলাভাইয়ের চামচ থেমে গেল মাঝপথে। সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল।
«আমি... আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী বলছ,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল।
আপু তাকিয়ে রইল — দীর্ঘ, গভীর। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল — «আরে! মজা করছি! তোর মুখটা দেখ — সাদা হয়ে গেছে!» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «দেখেছো? কেমন ভয় পেয়ে গেল!»
দুলাভাই জোর করে হাসলেন — «হ্যাঁ... হ্যাঁ।» — কিন্তু তার কপালে ঘাম।
খাওয়া চলছিল। আপু গল্প করছিল — পাড়ার খবর, অফিসের খবর। স্বাভাবিক গল্প। কিন্তু সিনথিয়ার মনে হচ্ছিল প্রতিটা কথার নিচে কিছু লুকিয়ে আছে। আপু যখন তার দিকে তাকাচ্ছিল — সেই দৃষ্টিতে কি... জানা? সে বুঝতে পারছিল না। হয়তো তার মনের ভুল। হয়তো আপু কিছুই দেখেনি। হয়তো ছায়াটা ছিল... অন্য কিছু।
কিন্তু ফোনের আলোটা? ক্লিক শব্দটা?
«সিনথিয়া,» — আপু হঠাৎ বলল — «তুই আজ সারাদিন কী করলি?»
«কী... কী আবার। শুয়েছিলাম। ফোন দেখছিলাম।» — গলা শুকিয়ে গেছিল।
«হুম।» — আপু তাকে দেখল — দীর্ঘ, স্থির। তারপর হাসল — অদ্ভুত হাসি। «বড় হচ্ছিস।»
সিনথিয়ার হাত থেকে চামচটা পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। «মানে?»
«মানে...» — আপু উঠে পানি নিল — «মানে, কলেজে পড়িস, বড় তো হবিই।» — সে ফিরে তাকাল — চোখে ঝিলিক। «তাই না?»
দুলাভাই কাশলেন — জোরে। «পানি দাও।»
খাওয়া শেষ হলো। আপু প্লেট গোছাতে লাগল। সিনথিয়া সাহায্য করতে উঠল — হাত-পা ব্যস্ত রাখতে চাইছিল। রান্নাঘরে দুজনে — আপু বাসন ধুচ্ছিল, সিনথিয়া মুছছিল। নীরবতা। শুধু পানির শব্দ।
তারপর আপু বলল — নিচু গলায়, না তাকিয়ে — «সিনথিয়া।»
«হ্যাঁ আপু?»
«তুই আমাকে ভয় পাস?»
সিনথিয়ার হাত থেমে গেল। «কী... কী বলছ আপু?»
আপু তাকাল — এবার সরাসরি। চোখে চোখ। «আমি জিজ্ঞেস করছি — তুই আমাকে ভয় পাস কিনা।»
«না... না তো। কেন ভয় পাবো?»
আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর বাসনের দিকে ফিরল। «কিছু না। এমনিই।»
কিন্তু সিনথিয়া জানত — কিছু। নিশ্চয়ই কিছু।
হঠাৎ আপুর হাত তার হাতে লাগল — বাসন নিতে গিয়ে। আপু থামল না, কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্য তার আঙুল সিনথিয়ার কবজিতে চাপ দিল — ইচ্ছে করে। সিনথিয়া তাকাল — আপু তাকায়নি, বাসন ধুচ্ছিল। কিন্তু তার ঠোঁটে হালকা হাসি।
«আপু,» — সিনথিয়া সাহস করে বলল — «তুমি... তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?»
আপু থামল। পানির কল বন্ধ করল। ধীরে ধীরে তাকাল। «তুই কী করেছিস যে আমি রাগ করব?»
«আমি... জানি না।» — সিনথিয়ার গলা কাঁপছিল। «তোমার... তোমার ব্যবহার... অন্যরকম লাগছে।»
আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার গাল ছুঁল — ভেজা হাতে। «পাগলি।» — নরম গলায়। «আমি তোর আপু। আমি তোর ওপর রাগ করতে পারি?» — সে হাত সরিয়ে নিল। «নে, বাসন শেষ কর।»
কিন্তু যাওয়ার আগে — দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, না ফিরে — আপু বলল — «আর হ্যাঁ। লুকিয়ে কিছু করলে... ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। মনে রাখিস।»
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে রইল — হাতে ভেজা বাসন, বুক ধড়ফড়। আপু চলে গেল — কিন্তু কথাটা রয়ে গেল — বাতাসে, দেয়ালে, তার বুকে।
বাসন শেষ। আপু হাত মুছল। ড্রয়িংরুমে দুলাভাই টিভি দেখছিল — অথবা দেখার ভান করছিল। আপু দরজায় দাঁড়াল — «তুমি ঘরে যাও।»
দুলাভাই তাকাল — «কেন?»
«যাও।» — আপুর গলায় এমন কিছু ছিল যে দুলাভাই উঠে গেলেন — একবার সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে, চোখে সতর্কবার্তা। তিনি বেডরুমের দিকে গেলেন।
আপু সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তুইও আয়। আমার ঘরে।»
সিনথিয়ার পা জমে গেল। «আপু, আমি... আমার ঘুম পাচ্ছে...»
«আয়।» — একটাই শব্দ। নরম, কিন্তু অনড়।
সিনথিয়া গেল। পা টেনে টেনে। বেডরুমের দরজা খোলা ছিল। ভেতরে দুলাভাই বিছানায় বসে — মুখ সাদা। আপু ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। ক্লিক।
সেই শব্দ — ছিটকিনির ক্লিক — সিনথিয়ার বুকে বাজল।
«বোস।» — আপু বিছানার দিকে ইশারা করল। «দুজনেই।»
তারা বসল — পাশাপাশি, আপুর মুখোমুখি। আপু দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। তারপর ফোনটা বের করল। সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল।
«আপু...» — তার গলা ভেঙে গেল।
«চুপ।» — আপু ফোনটা তুলে ধরল। স্ক্রিনে — একটা ভিডিওর থাম্বনেইল। অন্ধকার ঘর। বিছানা। দুটো অস্পষ্ট শরীর। «চিনতে পারছিস?»
সিনথিয়া কাঁদতে শুরু করল — নিঃশব্দে, চোখের পানি গাল বেয়ে। «আপু... আমি... আমি দুঃখিত... আমি...»
«কাঁদিস না।» — আপুর গলা নরম হলো — আশ্চর্য নরম। সে বিছানায় বসল — সিনথিয়ার পাশে। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে। «শোন। আমি রাগ করিনি।»
সিনথিয়া তাকাল — অবিশ্বাসে। «কী...?»
«আমি রাগ করিনি, পাগলি।» — আপু হাসল — এবার সত্যিকারের হাসি। «আমি...» — সে থামল, দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলাম — পানি নিতে। তোদের ঘর থেকে শব্দ আসছিল। আমি... দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম।»
দুলাভাই মুখ নিচু করলেন — «শিলা, আমি...»
«তুমি চুপ করো।» — আপু তাকে থামাল — কিন্তু গলায় রাগ নেই। «আমি দেখলাম। অনেকক্ষণ দেখলাম।» — তার গলা নামল — প্রায় ফিসফিস। «তুই... তুই কাঁদছিলি না। তুই...» — আপু থামল, তারপর সত্যি গলায় — «তোর মুখে... আনন্দ ছিল। আমি দেখেছি। আর আমি...» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। আমার পা কাঁপছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গেলাম — কিন্তু রান্না করতে পারছিলাম না। আমার হাত কাঁপছিল। আমার...» — সে নিজের বুকের দিকে ইশারা করল — «এখানে আগুন জ্বলছিল।»
«শিলা...» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।
«তুমি জানো না,» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে জল আর আগুন, একসাথে — «তুমি জানো না আমি কতদিন ধরে...» — সে থামল। «তিন বছর। তিন বছর ধরে আমি তোমার বউ। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু...» — তার গলা ভাঙল — «কিন্তু আমি কখনো... আমি কখনো ভাবিনি আমি এটা চাইব। আজ... আজ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে... আমি বুঝলাম — আমি চাই। আমি...» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «আমি তোকে ঘেন্না করি না, পাগলি। আমি তোকে... আমি তোর জায়গায় নিজেকে দেখছিলাম।»
সে একটু থামল — শ্বাস নিল। «আর আমি... আমি ভিডিও করলাম। চল্লিশ সেকেন্ড। জানি না কেন — হাত নিজে নিজে চলছিল। তারপর ফোন লক করলাম — সেই ক্লিকটা শুনেছিস তোরা।»
সিনথিয়া মুখ ঢাকল হাতে — «আপু, প্লিজ... ডিলিট করে দাও... প্লিজ...»
আপু ফোনটা তুলল। সবার সামনে — গ্যালারি খুলল, ভিডিওটা সিলেক্ট করল, ডিলিট চাপল। «ডিলিট।» — সে ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল — খালি গ্যালারি। «ট্র্যাশ থেকেও ডিলিট। দেখ।» — সে ট্র্যাশ খুলে দেখাল — খালি। «শেষ। কেউ কোনোদিন দেখবে না।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল — «কেন... কেন ডিলিট করলে?»
«কারণ,» — আপু ফোনটা পাশে রাখল — «আমি তোদের শত্রু না। আমি...» — সে গভীর শ্বাস নিল। «আমি সত্যি কথাটা বলি? দেখে... আমার... আমার শরীর গরম হয়ে গেছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে... আমি নিজেকে...» — সে থামল, লাজুক হাসি। «বুঝতেই পারছিস।»
দুলাভাই তাকাল — চমকে। «শিলা!»
«কী শিলা?» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে আগুন। «তুমি ভাবো আমি জানি না তুমি কী চাও? তিন বছর ধরে তোমার সাথে আছি। তোমার চোখ আমি পড়তে পারি।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল। «আর তুই। তুই ভাবছিস আমি তোকে ঘেন্না করব? তুই জানিস আমি কেমন?» — আপু হাসল — দুষ্টু হাসি। «তোর দুলাভাই আমাকে বিছানায় কী কী বলে — শুনতে চাস?»
সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। «আপু!»
«শুনেছিস তো — দরজার ফাঁক দিয়ে।» — আপু চোখ টিপল। «ওই রাতে। মনে আছে?»
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। হ্যাঁ — মনে আছে। সেই রাত — দুলাভাইয়ের গলা, আপুর চিৎকার, নোংরা কথা। সেই রাতেই তার ভেতরে কিছু ভেঙেছিল — কিছু জেগেছিল।
«শোন,» — আপু তার হাত ধরল — «আমি ঘুরিয়ে কথা বলব না। আমি যা চাই, সরাসরি বলছি।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি চাই — তিনজন। একসাথে। আজ রাতে।»
ঘরে নীরবতা নামল — ভারী, ঘন।
সিনথিয়ার মাথা ঘুরছিল। «আপু... এটা... এটা কী বলছ...»
«আমি জানি এটা পাগলামি শোনাচ্ছে।» — আপু শান্ত গলায় বলল — «কিন্তু আমি সারাজীবন ভদ্র মেয়ে সেজে থেকেছি। আজ... আজ আমি ভদ্র থাকতে চাই না।» — সে সিনথিয়ার হাত চাপ দিল। «আর শোন — আমি তোকে জোর করছি না। একদম না। তুই না বললে — এই মুহূর্তে সব শেষ। আমি কোনোদিন এই রাতের কথা তুলব না। তোর দুলাভাইও তুলবে না।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «তাই না?»
দুলাভাই গভীর শ্বাস নিলেন — «শিলা, তুমি... তুমি সত্যি চাও?»
«আমি চাই।» — আপুর চোখে কোনো দ্বিধা নেই। «তুমি চাও না?»
দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন — তার মুখে যুদ্ধ। «শিলা, এটা... এটা ঠিক না। তুমি আমার বউ। ও... ও বাচ্চা মেয়ে।»
«বাচ্চা?» — আপু হাসল — তীক্ষ্ণ। «যে মেয়ে এক ঘণ্টা আগে তোমার বিছানায় ছিল — সে বাচ্চা? তুমিই তো...» — সে থামল, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে — নরম হলো। «সরি। আমি ওকে ছোট করছি না। আমি বলছি — ও জানে ও কী চায়। তাই না, সিনথিয়া?»
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — ধীরে।
«দেখো,» — আপু দুলাভাইয়ের দিকে ফিরল — «আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমি জানি — পুরুষের... চাহিদা থাকে। আমি তিন বছর ধরে তোমাকে খুশি করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজ আমি বুঝলাম — আমিও কিছু চাই। আমিও...» — তার গলা নামল — «আমিও চাই — নতুন কিছু। ভয়ংকর কিছু।» — সে উঠে দুলাভাইয়ের পাশে বসল — তার হাত ধরল। «তুমি আমাকে ভালোবাসো?»
«পাগলের মতো।» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।
«তাহলে আমার এই ইচ্ছেটা পূরণ করো।» — আপু তার চোখে চোখ রাখল। «আমি তোমাকে কোনোদিন কিছু চাইনি। আজ চাইছি।»
দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে প্রশ্ন, ভয়, আকাঙ্ক্ষা — সব একসাথে। «আমি... আমি শুধু চাই — কেউ কষ্ট না পাক।»
«কেউ কষ্ট পাবে না।» — আপু বলল। «নিয়ম থাকবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «শোন পাগলি। নিয়ম এক — যেকোনো সময়, যেকেউ "থামো" বললে — সব থেমে যাবে। সাথে সাথে। কোনো প্রশ্ন না। নিয়ম দুই — এটা আমাদের তিনজনের গোপন। কেউ কোনোদিন জানবে না — রনি না, তোর মা-বাবা না, কেউ না। নিয়ম তিন —» — সে হাসল — «কেউ লজ্জা পাবে না। যা হবে, আমরা তিনজন মিলে করব।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল আপুর দিকে। তার মাথায় ঝড়। ভয় — প্রচণ্ড ভয়। লজ্জা — গা পুড়ে যাওয়া লজ্জা। কিন্তু তার নিচে... আরেকটা কিছু। কৌতূহল। সেই কৌতূহল যেটা তাকে দরজার ফাঁকে টেনেছিল। যেটা তাকে দুলাভাইয়ের ঘরে টেনেছিল। যেটা এখনো জ্বলছিল — নিভেনি।
«আমি...» — তার গলা কাঁপছিল। «আমি ভয় পাচ্ছি, আপু।»
«আমিও পাচ্ছি।» — আপু সত্যি গলায় বলল। «প্রথমবার সবাই পায়।» — সে সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল — বোনের মতো, উষ্ণ। «তুই আমার বোনের মতো, সিনথিয়া। আমি তোকে কখনো কষ্ট দেবো না। বিশ্বাস কর।»
সিনথিয়ার চোখে পানি — এবার অন্যরকম। সে আপুকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার মশলা, সাবান, আর কিছু — নারীর গন্ধ। সিনথিয়ার মাথায় চিন্তা ছুটছিল — মা কী বলবে? সমাজ কী বলবে? কিন্তু তারপর মনে পড়ল — দুলাভাইয়ের হাত, তার মুখ, সেই ঢেউ — পায়ের আঙুল থেকে মাথা পর্যন্ত। শরীর মিথ্যে বলে না। শরীর চায়। আর আপু — আপু তাকে ঘেন্না করছে না। আপু তাকে বোন বলছে। আপু নিজে চাইছে।
«থামো» বললে সব থেমে যাবে। এই নিয়মটা তাকে সাহস দিচ্ছিল। সে ফাঁদে পড়ছে না। সে বেছে নিচ্ছে।
সে ছাড়ল আপুকে। তারপর ফিসফিস করে বলল — «আমি... চাই।»
আপু ছাড়ল তাকে — চোখে আনন্দ। «সত্যি?»
«সত্যি।» — সিনথিয়া মাথা নাড়ল — গাল লাল, কিন্তু চোখে আলো। «আমি চাই।»
দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন দুজনের দিকে — অবিশ্বাসে, কৃতজ্ঞতায়। «তাহলে...»
«তাহলে,» — আপু উঠে দাঁড়াল। ঘরের আলোটা কমিয়ে দিল — ডিম লাইট জ্বালাল। দরজার ছিটকিনি পরীক্ষা করল — বন্ধ। ফোনটা সাইলেন্ট করে ড্রয়ারে রাখল। তারপর বিছানার দিকে ফিরল — «তাহলে... শুরু করি?»
সিনথিয়া আর দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন। আপু হাসল — সেই হাসি যেটা সিনথিয়া আগে কখনো দেখেনি — মুক্ত, দুষ্টু, ক্ষুধার্ত। সে নিজের কুর্তির প্রথম বোতামটা খুলল। ধীরে। তারপর দ্বিতীয়টা।
দুলাভাইয়ের শ্বাস আটকে গেল। «শিলা...»
«চুপ।» — আপু তার দিকে তাকাল — চোখে সেই দাপট যেটা সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — সেই রাতে, যখন দুলাভাই আপুকে... — «আজ রাতে তুমি আমার কথা শুনবে। দুজনেই শুনবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে হাত বাড়াল। «এসো।»
সিনথিয়া কাঁপা হাতে আপুর হাত ধরল। আপু তাকে টেনে তুলল — বিছানার মাঝখানে। দুলাভাইও উঠল — অন্য পাশে। তিনজন — বিছানায়। এত কাছে যে তিনজনের শ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল।
আপু সিনথিয়ার মুখটা ধরল — দুই হাতে, আলতো। «ভয় পাস না,» — ফিসফিস করে — «আমি আছি।» — তারপর — ধীরে ধীরে — আপু তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটে ছোঁয়াল।
সিনথিয়ার পৃথিবী থেমে গেল। নারীর ঠোঁট। নরম। উষ্ণ। মিষ্টি। দুলাভাইয়ের চুমুর মতো নয় — অন্যরকম। আপু চুমু খেল — প্রথমে আলতো, তারপর গভীর। সিনথিয়ার হাত নিজে নিজে উঠে আপুর চুলে ডুবল।
পাশে — দুলাভাইয়ের ভারী শ্বাস। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে — কাঁপা। আপু এক হাতে তাকেও টানল — «এসো।» — তিনটে শরীর — একসাথে। তিনটে হৃৎপিণ্ড — এক ছন্দে।
আর বাইরে — করিডোরে — নীরবতা। রনি নেই। পৃথিবী নেই। শুধু এই ঘর — এই বিছানা — এই তিনজন।
ছায়াটা সরে গেছিল। ফোনের আলোটা নিভে গেছিল। আর সেই হালকা ক্লিক শব্দটা — প্রায় শোনা যায় না, তবু সিনথিয়ার কানে বাজছিল বারবার।
দুলাভাই দরজার দিকে তাকালেন। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজাটা টেনে দিলেন — ভেতর থেকে। ছিটকিনি লাগালেন না, শুধু ভেজিয়ে দিলেন। ফিরে এসে বিছানায় বসলেন। তার মুখে ঘাম।
«কে ছিল?» — সিনথিয়ার গলা ফিসফিসের চেয়েও নিচু, কাঁপা।
«জানি না।» — দুলাভাইয়ের চোখে অস্থিরতা। «হয়তো... তোর আপু। রান্নাঘর থেকে বেরিয়েছিল হয়তো। পানি নিতে।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল — এত জোরে যে মনে হচ্ছিল দুলাভাই শুনতে পাচ্ছেন। আপু। শিলা আপু। দেখে ফেলেছে? সবকিছু? তার গা শিউরে উঠল — লজ্জায়, ভয়ে, আতঙ্কে। চোখে পানি এসে গেল। «আমি... আমি মরে যাবো... আপু যদি...»
«শোন,» — দুলাভাই তার মুখটা দুই হাতে ধরলেন, চোখে চোখ রাখলেন — «যা হয়েছে, হয়েছে। আমি সামলাবো। আমি তোর দুলাভাই — এই বাড়ির কর্তা। তুই ভয় পাস না।» — তার কপালে চুমু খেলেন, দীর্ঘ। «নে, ওঠ। জামা পর। মুখ ধুয়ে আয়। আপু ডাকার আগেই আমাদের বাইরে যেতে হবে — স্বাভাবিকভাবে।»
সিনথিয়া বাথরুমে গেল। আয়নায় তাকাল — আর চমকে উঠল। এই মেয়েটা কে? চোখ দুটো ভেজা, কিন্তু জ্বলজ্বলে। ঠোঁট ফোলা — কামড়ানোর দাগ। গলায় লালচে ছাপ — দুলাভাইয়ের মুখের ছাপ। সে পানি ছিটাল মুখে — ঠান্ডা পানি — কিন্তু ভেতরের আগুন নিভল না। শরীরের ভেতরটা এখনো টনটন করছিল — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল — এক ঘণ্টা আগে সে আর কুমারী নেই। এই ভাবনায় তার বুক মোচড় দিল — ভয়, লজ্জা, আর... আর একটা অদ্ভুত গর্ব। সে কিছু করেছে — নিষিদ্ধ, ভয়ংকর — কিন্তু নিজের ইচ্ছেয়। কেউ জোর করেনি।
কিন্তু আপু দেখে ফেলেছে। এই ভাবনাটা ফিরে এলো — ঠান্ডা স্রোতের মতো। আপু কী ভাবছে? ঘেন্না করছে? মাকে বলে দেবে? তার হাত কাঁপছিল তোয়ালে ধরতে গিয়ে। «শান্ত হ,» — সে নিজেকেই বলল আয়নায় — «শান্ত হ, সিনথিয়া।»
সে ফিরে এসে দেখল দুলাভাই প্যান্ট-শার্ট পরে নিয়েছেন — চুল আঁচড়ে, এমন ভান যেন ঘুম থেকে উঠলেন। তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে অপরাধবোধ আর আদর, একসাথে। «শোন,» — তিনি ফিসফিস করলেন — «আপু যদি কিছু জিজ্ঞেস করে — তুই কিছু জানিস না। সব দোষ আমার। বুঝেছিস?»
«কিন্তু—»
«কোনো কিন্তু না।» — তিনি তার হাত চাপ দিলেন এক সেকেন্ডের জন্য — গরম, শক্ত। «আমি আছি।»
সিনথিয়া উঠল। পা কাঁপছিল। শরীরের ভেতরটা এখনো ব্যথা করছিল — মিষ্টি ব্যথা, গভীর ব্যথা — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল কী ঘটেছে। সে সালোয়ারটা তুলে পরল, কুর্তিটা — ভেজা কুর্তিটা বাথরুমে ধুয়ে নিংড়ে বারান্দায় মেলে দিল। অন্য একটা কুর্তি পরল — হালকা সবুজ। আয়নায় নিজেকে দেখল — চোখ লাল, ঠোঁট ফোলা, গলায়... গলায় একটা লাল দাগ। দুলাভাইয়ের দাঁতের দাগ। সে ওড়নাটা ভালো করে গলায় পেঁচিয়ে নিল।
বেরিয়ে দেখল দুলাভাই ড্রয়িংরুমে বসে আছেন — টিভি চালিয়ে, এমন ভান যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার হাত কাঁপছিল — রিমোটটা ধরা হাতে। সিনথিয়া সোফার এক কোণে বসল — দূরে, নিরাপদ দূরত্বে। দুজনের মধ্যে তিন হাত জায়গা — যেন দেয়াল।
তখনই রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «খাবার রেডি! আয়, সবাই!»
সিনথিয়ার পেট মোচড় দিল। খাবার? এই অবস্থায়? কিন্তু না গেলে সন্দেহ হবে। সে উঠল। দুলাভাইও উঠলেন। দুজনে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল — পাশাপাশি নয়, মুখোমুখি।
শিলা আপু খাবার বাড়ছিল — ভাত, ডাল, মাছ ভাজি, আলু ভর্তা। তার মুখ স্বাভাবিক। খুব স্বাভাবিক। সিনথিয়া তাকে দেখল — চুরি করে। আপুর চোখে কিছু ছিল? রাগ? ঘৃণা? কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। আপু হাসল — «কী রে, মুখটা এমন শুকনো কেন? শরীর খারাপ?»
«না... না আপু।» — সিনথিয়া ভাতে হাত দিল। হাত কাঁপছিল। «গরম লাগছিল।»
«এসি চালিয়ে দিই?»
«না না, ঠিক আছে।»
দুলাভাই চুপচাপ খাচ্ছিলেন — মাথা নিচু। এত চুপ যে আপু একবার তাকালেন — «তোমার কী হলো? মুখে কথা নেই?»
«কী আবার হবে।» — দুলাভাই জোর করে হাসলেন। «খিদে পেয়েছে। খাচ্ছি।»
«রনি ফোন করেছিল,» — আপু বললেন, ডাল ঢালতে ঢালতে — «আজ রাতে ফিরবে না। বন্ধুর বাসায় থাকবে। কাল সকালে আসবে।»
সিনথিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ভালো না খারাপ — বুঝতে পারল না। রনি নেই — মানে বাড়িতে শুধু তিনজন।
«তুই কাল কখন যাবি?» — আপু জিজ্ঞেস করল — স্বাভাবিক গলায়।
«কাল... দুপুরে। মা ফোন করেছিল।» — সিনথিয়া মিথ্যে বলল — আধা মিথ্যে। মা ফোন করেনি, কিন্তু কাল যাওয়ার কথা ছিল।
«আরেকদিন থাক না।» — আপু বলল — «তোর তো কলেজ ছুটি।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে কী যেন। «নাকি... থাকতে ইচ্ছে করছে না?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «না... মানে... থাকতে পারি।»
«থাক।» — আপু হাসল। «আমার ভালো লাগে তুই থাকলে।»
দুলাভাই হঠাৎ কাশলেন — জোরে, অস্বাভাবিক। পানির গ্লাস তুলতে গিয়ে হাত কেঁপে পানি ছলকে পড়ল টেবিলে। «সরি,» — তিনি তোয়ালে টানলেন।
আপু তাকে দেখল — ভ্রু কুঁচকে। «তোমার হাত কাঁপছে কেন?»
«কাঁপছে না।» — দুলাভাই জোর গলায় বললেন — কিন্তু হাতটা টেবিলের নিচে লুকালেন। «গরম লাগছে।»
«এসি তো চলছে।» — আপু ঠান্ডা গলায় বলল। তারপর সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তোর গরম লাগছে না?»
«না... ঠিক আছি।»
«হুম।» — আপু খেতে লাগল — কিন্তু তার চোখ দুজনের ওপর ঘুরছিল — শিকারি চোখ। «আচ্ছা সিনথিয়া, তোর বয়ফ্রেন্ড আছে?»
সিনথিয়া বিষম খেল। «কী!»
«বয়ফ্রেন্ড।» — আপু নির্বিকার। «তোর বয়সে তো থাকে। লুকাস না।»
«না আপু! নেই!» — সিনথিয়ার মুখ লাল।
«সত্যি?» — আপু ঝুঁকল সামনে — «কেউ পছন্দ করে না? কলেজে? পাড়ায়?»
«আপু!» — সিনথিয়া পানি খেল — গলা ভেজাতে।
«আরে, লজ্জা পাস কেন?» — আপু হাসল — «আমি তোর আপু। আমাকে বলা যায়।» — সে এক মুহূর্ত থামল। «নাকি... কেউ আছে, যার কথা আমাকে বলা যায় না?»
ঘরে নীরবতা। দুলাভাইয়ের চামচ থেমে গেল মাঝপথে। সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল।
«আমি... আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী বলছ,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল।
আপু তাকিয়ে রইল — দীর্ঘ, গভীর। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল — «আরে! মজা করছি! তোর মুখটা দেখ — সাদা হয়ে গেছে!» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «দেখেছো? কেমন ভয় পেয়ে গেল!»
দুলাভাই জোর করে হাসলেন — «হ্যাঁ... হ্যাঁ।» — কিন্তু তার কপালে ঘাম।
খাওয়া চলছিল। আপু গল্প করছিল — পাড়ার খবর, অফিসের খবর। স্বাভাবিক গল্প। কিন্তু সিনথিয়ার মনে হচ্ছিল প্রতিটা কথার নিচে কিছু লুকিয়ে আছে। আপু যখন তার দিকে তাকাচ্ছিল — সেই দৃষ্টিতে কি... জানা? সে বুঝতে পারছিল না। হয়তো তার মনের ভুল। হয়তো আপু কিছুই দেখেনি। হয়তো ছায়াটা ছিল... অন্য কিছু।
কিন্তু ফোনের আলোটা? ক্লিক শব্দটা?
«সিনথিয়া,» — আপু হঠাৎ বলল — «তুই আজ সারাদিন কী করলি?»
«কী... কী আবার। শুয়েছিলাম। ফোন দেখছিলাম।» — গলা শুকিয়ে গেছিল।
«হুম।» — আপু তাকে দেখল — দীর্ঘ, স্থির। তারপর হাসল — অদ্ভুত হাসি। «বড় হচ্ছিস।»
সিনথিয়ার হাত থেকে চামচটা পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। «মানে?»
«মানে...» — আপু উঠে পানি নিল — «মানে, কলেজে পড়িস, বড় তো হবিই।» — সে ফিরে তাকাল — চোখে ঝিলিক। «তাই না?»
দুলাভাই কাশলেন — জোরে। «পানি দাও।»
খাওয়া শেষ হলো। আপু প্লেট গোছাতে লাগল। সিনথিয়া সাহায্য করতে উঠল — হাত-পা ব্যস্ত রাখতে চাইছিল। রান্নাঘরে দুজনে — আপু বাসন ধুচ্ছিল, সিনথিয়া মুছছিল। নীরবতা। শুধু পানির শব্দ।
তারপর আপু বলল — নিচু গলায়, না তাকিয়ে — «সিনথিয়া।»
«হ্যাঁ আপু?»
«তুই আমাকে ভয় পাস?»
সিনথিয়ার হাত থেমে গেল। «কী... কী বলছ আপু?»
আপু তাকাল — এবার সরাসরি। চোখে চোখ। «আমি জিজ্ঞেস করছি — তুই আমাকে ভয় পাস কিনা।»
«না... না তো। কেন ভয় পাবো?»
আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর বাসনের দিকে ফিরল। «কিছু না। এমনিই।»
কিন্তু সিনথিয়া জানত — কিছু। নিশ্চয়ই কিছু।
হঠাৎ আপুর হাত তার হাতে লাগল — বাসন নিতে গিয়ে। আপু থামল না, কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্য তার আঙুল সিনথিয়ার কবজিতে চাপ দিল — ইচ্ছে করে। সিনথিয়া তাকাল — আপু তাকায়নি, বাসন ধুচ্ছিল। কিন্তু তার ঠোঁটে হালকা হাসি।
«আপু,» — সিনথিয়া সাহস করে বলল — «তুমি... তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?»
আপু থামল। পানির কল বন্ধ করল। ধীরে ধীরে তাকাল। «তুই কী করেছিস যে আমি রাগ করব?»
«আমি... জানি না।» — সিনথিয়ার গলা কাঁপছিল। «তোমার... তোমার ব্যবহার... অন্যরকম লাগছে।»
আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার গাল ছুঁল — ভেজা হাতে। «পাগলি।» — নরম গলায়। «আমি তোর আপু। আমি তোর ওপর রাগ করতে পারি?» — সে হাত সরিয়ে নিল। «নে, বাসন শেষ কর।»
কিন্তু যাওয়ার আগে — দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, না ফিরে — আপু বলল — «আর হ্যাঁ। লুকিয়ে কিছু করলে... ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। মনে রাখিস।»
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে রইল — হাতে ভেজা বাসন, বুক ধড়ফড়। আপু চলে গেল — কিন্তু কথাটা রয়ে গেল — বাতাসে, দেয়ালে, তার বুকে।
বাসন শেষ। আপু হাত মুছল। ড্রয়িংরুমে দুলাভাই টিভি দেখছিল — অথবা দেখার ভান করছিল। আপু দরজায় দাঁড়াল — «তুমি ঘরে যাও।»
দুলাভাই তাকাল — «কেন?»
«যাও।» — আপুর গলায় এমন কিছু ছিল যে দুলাভাই উঠে গেলেন — একবার সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে, চোখে সতর্কবার্তা। তিনি বেডরুমের দিকে গেলেন।
আপু সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তুইও আয়। আমার ঘরে।»
সিনথিয়ার পা জমে গেল। «আপু, আমি... আমার ঘুম পাচ্ছে...»
«আয়।» — একটাই শব্দ। নরম, কিন্তু অনড়।
সিনথিয়া গেল। পা টেনে টেনে। বেডরুমের দরজা খোলা ছিল। ভেতরে দুলাভাই বিছানায় বসে — মুখ সাদা। আপু ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। ক্লিক।
সেই শব্দ — ছিটকিনির ক্লিক — সিনথিয়ার বুকে বাজল।
«বোস।» — আপু বিছানার দিকে ইশারা করল। «দুজনেই।»
তারা বসল — পাশাপাশি, আপুর মুখোমুখি। আপু দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। তারপর ফোনটা বের করল। সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল।
«আপু...» — তার গলা ভেঙে গেল।
«চুপ।» — আপু ফোনটা তুলে ধরল। স্ক্রিনে — একটা ভিডিওর থাম্বনেইল। অন্ধকার ঘর। বিছানা। দুটো অস্পষ্ট শরীর। «চিনতে পারছিস?»
সিনথিয়া কাঁদতে শুরু করল — নিঃশব্দে, চোখের পানি গাল বেয়ে। «আপু... আমি... আমি দুঃখিত... আমি...»
«কাঁদিস না।» — আপুর গলা নরম হলো — আশ্চর্য নরম। সে বিছানায় বসল — সিনথিয়ার পাশে। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে। «শোন। আমি রাগ করিনি।»
সিনথিয়া তাকাল — অবিশ্বাসে। «কী...?»
«আমি রাগ করিনি, পাগলি।» — আপু হাসল — এবার সত্যিকারের হাসি। «আমি...» — সে থামল, দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলাম — পানি নিতে। তোদের ঘর থেকে শব্দ আসছিল। আমি... দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম।»
দুলাভাই মুখ নিচু করলেন — «শিলা, আমি...»
«তুমি চুপ করো।» — আপু তাকে থামাল — কিন্তু গলায় রাগ নেই। «আমি দেখলাম। অনেকক্ষণ দেখলাম।» — তার গলা নামল — প্রায় ফিসফিস। «তুই... তুই কাঁদছিলি না। তুই...» — আপু থামল, তারপর সত্যি গলায় — «তোর মুখে... আনন্দ ছিল। আমি দেখেছি। আর আমি...» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। আমার পা কাঁপছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গেলাম — কিন্তু রান্না করতে পারছিলাম না। আমার হাত কাঁপছিল। আমার...» — সে নিজের বুকের দিকে ইশারা করল — «এখানে আগুন জ্বলছিল।»
«শিলা...» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।
«তুমি জানো না,» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে জল আর আগুন, একসাথে — «তুমি জানো না আমি কতদিন ধরে...» — সে থামল। «তিন বছর। তিন বছর ধরে আমি তোমার বউ। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু...» — তার গলা ভাঙল — «কিন্তু আমি কখনো... আমি কখনো ভাবিনি আমি এটা চাইব। আজ... আজ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে... আমি বুঝলাম — আমি চাই। আমি...» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «আমি তোকে ঘেন্না করি না, পাগলি। আমি তোকে... আমি তোর জায়গায় নিজেকে দেখছিলাম।»
সে একটু থামল — শ্বাস নিল। «আর আমি... আমি ভিডিও করলাম। চল্লিশ সেকেন্ড। জানি না কেন — হাত নিজে নিজে চলছিল। তারপর ফোন লক করলাম — সেই ক্লিকটা শুনেছিস তোরা।»
সিনথিয়া মুখ ঢাকল হাতে — «আপু, প্লিজ... ডিলিট করে দাও... প্লিজ...»
আপু ফোনটা তুলল। সবার সামনে — গ্যালারি খুলল, ভিডিওটা সিলেক্ট করল, ডিলিট চাপল। «ডিলিট।» — সে ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল — খালি গ্যালারি। «ট্র্যাশ থেকেও ডিলিট। দেখ।» — সে ট্র্যাশ খুলে দেখাল — খালি। «শেষ। কেউ কোনোদিন দেখবে না।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল — «কেন... কেন ডিলিট করলে?»
«কারণ,» — আপু ফোনটা পাশে রাখল — «আমি তোদের শত্রু না। আমি...» — সে গভীর শ্বাস নিল। «আমি সত্যি কথাটা বলি? দেখে... আমার... আমার শরীর গরম হয়ে গেছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে... আমি নিজেকে...» — সে থামল, লাজুক হাসি। «বুঝতেই পারছিস।»
দুলাভাই তাকাল — চমকে। «শিলা!»
«কী শিলা?» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে আগুন। «তুমি ভাবো আমি জানি না তুমি কী চাও? তিন বছর ধরে তোমার সাথে আছি। তোমার চোখ আমি পড়তে পারি।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল। «আর তুই। তুই ভাবছিস আমি তোকে ঘেন্না করব? তুই জানিস আমি কেমন?» — আপু হাসল — দুষ্টু হাসি। «তোর দুলাভাই আমাকে বিছানায় কী কী বলে — শুনতে চাস?»
সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। «আপু!»
«শুনেছিস তো — দরজার ফাঁক দিয়ে।» — আপু চোখ টিপল। «ওই রাতে। মনে আছে?»
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। হ্যাঁ — মনে আছে। সেই রাত — দুলাভাইয়ের গলা, আপুর চিৎকার, নোংরা কথা। সেই রাতেই তার ভেতরে কিছু ভেঙেছিল — কিছু জেগেছিল।
«শোন,» — আপু তার হাত ধরল — «আমি ঘুরিয়ে কথা বলব না। আমি যা চাই, সরাসরি বলছি।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি চাই — তিনজন। একসাথে। আজ রাতে।»
ঘরে নীরবতা নামল — ভারী, ঘন।
সিনথিয়ার মাথা ঘুরছিল। «আপু... এটা... এটা কী বলছ...»
«আমি জানি এটা পাগলামি শোনাচ্ছে।» — আপু শান্ত গলায় বলল — «কিন্তু আমি সারাজীবন ভদ্র মেয়ে সেজে থেকেছি। আজ... আজ আমি ভদ্র থাকতে চাই না।» — সে সিনথিয়ার হাত চাপ দিল। «আর শোন — আমি তোকে জোর করছি না। একদম না। তুই না বললে — এই মুহূর্তে সব শেষ। আমি কোনোদিন এই রাতের কথা তুলব না। তোর দুলাভাইও তুলবে না।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «তাই না?»
দুলাভাই গভীর শ্বাস নিলেন — «শিলা, তুমি... তুমি সত্যি চাও?»
«আমি চাই।» — আপুর চোখে কোনো দ্বিধা নেই। «তুমি চাও না?»
দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন — তার মুখে যুদ্ধ। «শিলা, এটা... এটা ঠিক না। তুমি আমার বউ। ও... ও বাচ্চা মেয়ে।»
«বাচ্চা?» — আপু হাসল — তীক্ষ্ণ। «যে মেয়ে এক ঘণ্টা আগে তোমার বিছানায় ছিল — সে বাচ্চা? তুমিই তো...» — সে থামল, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে — নরম হলো। «সরি। আমি ওকে ছোট করছি না। আমি বলছি — ও জানে ও কী চায়। তাই না, সিনথিয়া?»
সিনথিয়া মাথা নাড়ল — ধীরে।
«দেখো,» — আপু দুলাভাইয়ের দিকে ফিরল — «আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমি জানি — পুরুষের... চাহিদা থাকে। আমি তিন বছর ধরে তোমাকে খুশি করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজ আমি বুঝলাম — আমিও কিছু চাই। আমিও...» — তার গলা নামল — «আমিও চাই — নতুন কিছু। ভয়ংকর কিছু।» — সে উঠে দুলাভাইয়ের পাশে বসল — তার হাত ধরল। «তুমি আমাকে ভালোবাসো?»
«পাগলের মতো।» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।
«তাহলে আমার এই ইচ্ছেটা পূরণ করো।» — আপু তার চোখে চোখ রাখল। «আমি তোমাকে কোনোদিন কিছু চাইনি। আজ চাইছি।»
দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে প্রশ্ন, ভয়, আকাঙ্ক্ষা — সব একসাথে। «আমি... আমি শুধু চাই — কেউ কষ্ট না পাক।»
«কেউ কষ্ট পাবে না।» — আপু বলল। «নিয়ম থাকবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «শোন পাগলি। নিয়ম এক — যেকোনো সময়, যেকেউ "থামো" বললে — সব থেমে যাবে। সাথে সাথে। কোনো প্রশ্ন না। নিয়ম দুই — এটা আমাদের তিনজনের গোপন। কেউ কোনোদিন জানবে না — রনি না, তোর মা-বাবা না, কেউ না। নিয়ম তিন —» — সে হাসল — «কেউ লজ্জা পাবে না। যা হবে, আমরা তিনজন মিলে করব।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল আপুর দিকে। তার মাথায় ঝড়। ভয় — প্রচণ্ড ভয়। লজ্জা — গা পুড়ে যাওয়া লজ্জা। কিন্তু তার নিচে... আরেকটা কিছু। কৌতূহল। সেই কৌতূহল যেটা তাকে দরজার ফাঁকে টেনেছিল। যেটা তাকে দুলাভাইয়ের ঘরে টেনেছিল। যেটা এখনো জ্বলছিল — নিভেনি।
«আমি...» — তার গলা কাঁপছিল। «আমি ভয় পাচ্ছি, আপু।»
«আমিও পাচ্ছি।» — আপু সত্যি গলায় বলল। «প্রথমবার সবাই পায়।» — সে সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল — বোনের মতো, উষ্ণ। «তুই আমার বোনের মতো, সিনথিয়া। আমি তোকে কখনো কষ্ট দেবো না। বিশ্বাস কর।»
সিনথিয়ার চোখে পানি — এবার অন্যরকম। সে আপুকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার মশলা, সাবান, আর কিছু — নারীর গন্ধ। সিনথিয়ার মাথায় চিন্তা ছুটছিল — মা কী বলবে? সমাজ কী বলবে? কিন্তু তারপর মনে পড়ল — দুলাভাইয়ের হাত, তার মুখ, সেই ঢেউ — পায়ের আঙুল থেকে মাথা পর্যন্ত। শরীর মিথ্যে বলে না। শরীর চায়। আর আপু — আপু তাকে ঘেন্না করছে না। আপু তাকে বোন বলছে। আপু নিজে চাইছে।
«থামো» বললে সব থেমে যাবে। এই নিয়মটা তাকে সাহস দিচ্ছিল। সে ফাঁদে পড়ছে না। সে বেছে নিচ্ছে।
সে ছাড়ল আপুকে। তারপর ফিসফিস করে বলল — «আমি... চাই।»
আপু ছাড়ল তাকে — চোখে আনন্দ। «সত্যি?»
«সত্যি।» — সিনথিয়া মাথা নাড়ল — গাল লাল, কিন্তু চোখে আলো। «আমি চাই।»
দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন দুজনের দিকে — অবিশ্বাসে, কৃতজ্ঞতায়। «তাহলে...»
«তাহলে,» — আপু উঠে দাঁড়াল। ঘরের আলোটা কমিয়ে দিল — ডিম লাইট জ্বালাল। দরজার ছিটকিনি পরীক্ষা করল — বন্ধ। ফোনটা সাইলেন্ট করে ড্রয়ারে রাখল। তারপর বিছানার দিকে ফিরল — «তাহলে... শুরু করি?»
সিনথিয়া আর দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন। আপু হাসল — সেই হাসি যেটা সিনথিয়া আগে কখনো দেখেনি — মুক্ত, দুষ্টু, ক্ষুধার্ত। সে নিজের কুর্তির প্রথম বোতামটা খুলল। ধীরে। তারপর দ্বিতীয়টা।
দুলাভাইয়ের শ্বাস আটকে গেল। «শিলা...»
«চুপ।» — আপু তার দিকে তাকাল — চোখে সেই দাপট যেটা সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — সেই রাতে, যখন দুলাভাই আপুকে... — «আজ রাতে তুমি আমার কথা শুনবে। দুজনেই শুনবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে হাত বাড়াল। «এসো।»
সিনথিয়া কাঁপা হাতে আপুর হাত ধরল। আপু তাকে টেনে তুলল — বিছানার মাঝখানে। দুলাভাইও উঠল — অন্য পাশে। তিনজন — বিছানায়। এত কাছে যে তিনজনের শ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল।
আপু সিনথিয়ার মুখটা ধরল — দুই হাতে, আলতো। «ভয় পাস না,» — ফিসফিস করে — «আমি আছি।» — তারপর — ধীরে ধীরে — আপু তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটে ছোঁয়াল।
সিনথিয়ার পৃথিবী থেমে গেল। নারীর ঠোঁট। নরম। উষ্ণ। মিষ্টি। দুলাভাইয়ের চুমুর মতো নয় — অন্যরকম। আপু চুমু খেল — প্রথমে আলতো, তারপর গভীর। সিনথিয়ার হাত নিজে নিজে উঠে আপুর চুলে ডুবল।
পাশে — দুলাভাইয়ের ভারী শ্বাস। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে — কাঁপা। আপু এক হাতে তাকেও টানল — «এসো।» — তিনটে শরীর — একসাথে। তিনটে হৃৎপিণ্ড — এক ছন্দে।
আর বাইরে — করিডোরে — নীরবতা। রনি নেই। পৃথিবী নেই। শুধু এই ঘর — এই বিছানা — এই তিনজন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)