26-09-2026, 06:55 PM
ভেজা সন্ধ্যা
সন্ধ্যা সাতটা।
দরজায় ছিটকিনির শব্দ হলো — রনি বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে ড্রয়িং রুমের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, «বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি, রাতে খাব না।»
আপু রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বললেন, «বেশি রাত করিস না।»
«আচ্ছা।»
দরজা বন্ধ হলো।
যাওয়ার আগে রনি একবার তাকিয়েছিল তার দিকে — গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার দিকে। সেই দৃষ্টি — দুপুরের সিনেমা হলের অন্ধকার মনে করিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি, চোখে একটা প্রশ্ন — «মনে আছে?» সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। দরজা বন্ধ হওয়ার পরেও সেই দৃষ্টি গায়ে লেগে রইল — গরম হয়ে।
ছিটকিনির ধাতব শব্দটা ফ্ল্যাটের ভেতর এক মুহূর্ত ঝুলে রইল — তারপর মিলিয়ে গেল রান্নাঘরের কড়াইয়ের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দে, আপুর গুনগুনে, আর ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসা টিভির গমগমে আওয়াজে।
সিনথিয়া গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে শুনল। ফ্ল্যাটটা হঠাৎ যেন ছোট হয়ে এসেছে — দেয়ালগুলো কাছে সরে এসেছে। এখন এই বাসায় মাত্র তিনজন — রান্নাঘরে আপু, ড্রয়িং রুমে দুলাভাই, আর সে।
সে বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে তানভীরের চারটা মেসেজ জ্বলজ্বল করছে — «কই তুই?» «মেসেজ দেখছিস না কেন?» «মিস করছি।» «মিম?» — দুপুরে সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে সে একটাও খোলেনি। এখনো খুলল না। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলে রইল — তারপর সরে গেল।
বুকের ভেতর মোচড় দিল। অপরাধবোধ — চাপা, কাঁটার মতো। তানভীর — যে গতরাতে তাকে «থাম।» বলে কাঁদিয়েছিল, যে আজ সকালে লিখেছিল «তুই কার?» — সে এখন অপেক্ষা করছে। আর সে — সে আজ দুপুরে আরেকটা পুরুষের ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল।
রনির মুখ মনে পড়ল — অন্ধকার হলে তার ভারী নিঃশ্বাস কানের কাছে, তার হাত তার কুর্তির নিচে উঠে আসা, তার আঙুলের সেই অচেনা ছন্দ — যা তার নিজের আঙুল কখনো শেখাতে পারেনি। তার দাঁত তার কাঁধে বসে যাওয়া — চাপা চিৎকারটা গিলে ফেলা। সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। উরুর মাঝখানে সেই চিনচিনে অনুভূতিটা ফিরে এলো — দুপুরের স্মৃতি শরীরে এখনো তাজা, যেন কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা নয়, কয়েক মিনিট আগের। সে পা দুটো চেপে ধরল, বালিশটা বুকে চেপে ধরল।
আর তানভীর? তানভীর তো কিছু জানে না। তানভীর ভাবে — মিম তার, শুধু তার। «তুই কার?» — «তোর। শুধু তোর।» — গতরাতে লিখেছিল সে। আর আজ দুপুরে সে আরেকজনের হাতে কেঁপেছে, আরেকজনের ঠোঁটে গলেছে। বুকের ভেতর মোচড়টা আরো গভীর হলো। কিন্তু অদ্ভুত — অপরাধবোধের পাশাপাশি একটা উত্তেজনাও, চাপা, নিষিদ্ধ। দুটো পুরুষ। দুটো দুনিয়া। একটা ফোনের স্ক্রিনে — দূরে, নিরাপদ। একটা... বাস্তবে — কাছে, বিপজ্জনক। সে কোনটা? নাকি দুটোই? এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই — শুধু শরীরে একটা অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু ফুটছে।
না। এখন তানভীর না। এখন রনিও না।
ফোনটা উল্টে রাখল বালিশের পাশে। কিন্তু বিছানায় বসে থাকা গেল না — শরীরে অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু একটা ফুটছে। সে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়াল এক মুহূর্ত — মেরুন কুর্তিটা গায়ে, রনি আজই কিনে দিয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ চকচক করছে। «ছি,» — ফিসফিস করে নিজেকেই বলল।
ড্রয়িং রুম থেকে টিভির শব্দ ভেসে আসছে। দুলাভাই সিনেমা দেখছেন।
সে পা টিপে টিপে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল। কেন — নিজেও জানত না। হয়তো একা ঘরে বসে থাকলে ভাবনাগুলো আরো গভীরে টানবে। হয়তো... অন্য কিছু।
দুলাভাই সোফায় হেলান দিয়ে বসে — একটা পা টেবিলে তোলা, হাতে পানির গ্লাস। টিভিতে কোনো অ্যাকশন সিনেমা — গোলাগুলি, ধাওয়া, চিৎকার। তাকে দেখে মুখে হাসি ফুটল, «আরে শালী! আয়, বোস। সিনেমাটা জমে উঠেছে।»
সিনথিয়া এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল দরজায়। তারপর এগিয়ে গেল — সোফার অন্য প্রান্তে নয়, মাঝখানে, তার থেকে এক হাত দূরে — বসল। কুর্তিটা টেনে হাঁটু ঢাকল।
দুলাভাই চোখ টিপলেন, «এত দূরে বসলে সিনেমার ডায়ালগ শোনা যাবে?»
«শোনা যাচ্ছে তো।» — সে হাসল। কিন্তু বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — কেন, বুঝতে পারছে না। নাকি বুঝতে চাইছে না।
দুলাভাই সিনেমার ডায়ালগের সাথে সাথে মন্তব্য করছিলেন — «এই ভিলেনটা বোকা, এভাবে কেউ গুলি চালায়?», «নায়িকা হিল পরে দৌড়াচ্ছে — হাস্যকর!» সিনথিয়া হাসছিল — কিন্তু হাসির আড়ালে তার সমস্ত স্নায়ু পাশের মানুষটার দিকে। তার গায়ের গন্ধ — সাবান আর হালকা ঘামের মিশ্রণ। সোফার হাতলে রাখা তার হাতের লোম। প্রতিটা নড়াচড়া সে টের পাচ্ছে — যেন শরীরে রাডার বসে গেছে। একবার তার কনুই তার বাহু ছুঁয়ে গেল — বিদ্যুৎ খেলে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। তিনি টের পেলেন কিনা — বোঝা গেল না।
সিনেমা চলছিল। পর্দায় গাড়ি উড়ছে, বোমা ফাটছে। কিন্তু সিনথিয়ার চোখ স্ক্রিনে আটকাচ্ছে না — বারবার আড়চোখে যাচ্ছে পাশের মানুষটার দিকে। এই মানুষটা। দুই রাত আগে দরজার ফাঁক দিয়ে যাকে দেখেছিল — সেই গলা, «বল, তুই কী?», সেই হাত আপুর চুলে, সেই... কপালের চুমু, ফিসফিস — «ভালোবাসি তোকে।» — সব মনে আছে। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা দৃশ্য — চোখ বন্ধ করলেই ভাসে।
দিনের বেলার এই হাসিখুশি মানুষটা আর রাতের ওই মানুষটা — একই শরীরে দুটো মানুষ। আর সে — এই সত্যিটা স্বীকার করতে তার গলা শুকিয়ে এলো — সে দুটোকেই দেখতে চায়। কাছ থেকে।
«কী ভাবছিস?» — দুলাভাইয়ের গলা হঠাৎ।
«কিছু না।» — তাড়াতাড়ি স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
«মিথ্যে বলছিস।» — তিনি হাসলেন। «মেয়েদের মুখ দেখলেই বোঝা যায় — ভেতরে কিছু চলছে।»
«আপনি তো মনোবিজ্ঞানী হয়ে গেলেন!»
«দুলাভাই সব জানে।» — তিনি পানির গ্লাসে চুমুক দিলেন। «বল তো — কলেজ কেমন চলছে?»
«ভালো।»
«পড়াশোনা?»
«ভালো।»
«আর...» — তিনি একটু ঝুঁকলেন তার দিকে, গলা নামিয়ে — «বয়ফ্রেন্ড আছে?»
সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। «দুলাভাই!»
«কী? জানতে চাওয়া অপরাধ নাকি?» — তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। «এই বয়সে তো থাকারই কথা। তোর আপুরও ছিল — আমি। তোর আপুকে পটাতে আমার তিন বছর লেগেছিল, জানিস?»
অজান্তেই সিনথিয়া হেসে ফেলল। «আপু পটেছিল?»
«পটবে না মানে? এই হাসি দেখে কে না পটবে!» — তিনি নিজের দিকে ইশারা করলেন। «তবে তোর আপু তোর মতো লাজুক ছিল না। ও ছিল ডেঞ্জারাস।»
«কীভাবে পটালেন?» — সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল — কৌতূহলে, ভুলে গিয়ে লজ্জা।
«প্রথমে বন্ধু হলাম। তারপর রোজ কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম — একবার বৃষ্টিতে ভিজে কাকভেজা। তোর আপু ছাতা নিয়ে এলো — নিজে ভিজে আমাকে ছাতা দিল।» — দুলাভাইয়ের চোখে দূরের আলো, ঠোঁটে নরম হাসি। «সেদিনই বুঝেছিলাম — এই মেয়েকে ছাড়া আমার চলবে না।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। ভালোবাসার গল্প — আর দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে দেখা সেই দৃশ্য — একই মানুষ, একই ভালোবাসা — শুধু রূপ আলাদা। দিনে ছাতা, রাতে... তার ভাবনা থেমে গেল — গাল গরম।
«আপু? ডেঞ্জারাস?» — সিনথিয়ার গলা কেঁপে গেল। ডেঞ্জারাস — দরজার ফাঁকে দেখা আপু — «আমাকে ছিঁড়ে ফেলো!» — হ্যাঁ, ডেঞ্জারাসই তো।
«তুই জানিস না তোর আপুকে।» — দুলাভাই চোখ টিপলেন। তিনি হাসতে হাসতে হাতটা তুললেন সোফার পিঠে — তার কাঁধের ঠিক পেছনে। হাতটা তাকে ছোঁয়নি — কিন্তু ছোঁয়ার দূরত্বে। সিনথিয়া কাঁধের পেছনে তার হাতের উষ্ণতা টের পাচ্ছে — না ছুঁয়েও ছোঁয়া। সে সোজা হয়ে বসল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না। কেন পিছিয়ে যাবে? দুলাভাই তো... শুধু দুলাভাই।
«আচ্ছা, বয়ফ্রেন্ড বাদ দে। অন্য প্রশ্ন।» — তিনি সোফায় আরেকটু ঘনিয়ে বসলেন। তাদের উরুর মাঝে এখন এক বিঘতও ফাঁক নেই — প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। «কিস করেছিস কখনো?»
«দুলাভাই!!» — সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠল। কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
«আহা, লজ্জা পাওয়ার কী আছে!» — তিনি হাসলেন — সেই চিরচেনা, সহজ হাসি। কিন্তু আজ সেই হাসির নিচে কিছু একটা আছে — যা সিনথিয়া চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত আগে সে দেখেছে এই মানুষটার অন্য মুখ। «আমি তোর দুলাভাই — ডাক্তারের মতো। ডাক্তারের কাছে লজ্জা কীসের?»
সে মুখ ফিরিয়ে নিল স্ক্রিনের দিকে। কিন্তু সরল না — এক ইঞ্চিও না। উরুর পাশে তার উরুর উষ্ণতা — কুর্তির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে টের পাচ্ছে। বুকের ভেতর কিছু একটা দপদপ করছে — জোরে, অসহ্য।
«বল না।» — তার গলা নরম হয়ে এলো, কিন্তু চোখে সেই দুষ্টুমি জ্বলজ্বল করছে। «করেছিস? একবারও?»
সিনথিয়া ঠোঁট কামড়াল। মাথা নাড়ল — না।
মিথ্যে। আজ দুপুরে — রনির ঠোঁট তার ঠোঁটে, তার জিভ... কিন্তু সেটা তো দুলাভাই জানেন না। জানতে পারবেন না।
«সত্যি?» — দুলাভাইয়ের ভ্রু উঠে গেল। «এই যুগের মেয়ে... কলেজে পড়ে... একটা কিসও হয়নি?»
«আমি... আমি ওসবে নেই।» — গলা কাঁপছিল।
«হুম।» — তিনি তাকে দেখলেন — উপর থেকে নিচ, ধীরে। সেই দৃষ্টি — সিনথিয়ার গায়ে কাঁটা দিল। «তাহলে তো তুই...» — তিনি ঝুঁকলেন আরো কাছে, ফিসফিস করে — «ভার্জিন, তাই না? কেউ তোর ভোদায় আঙুলও দেয়নি?»
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «দুলাভাই, আপনি... আপনি এসব কী জিজ্ঞেস করছেন!»
«আরে, মজা করছি!» — তিনি হেসে উঠলেন। কিন্তু হাসিটা থামার পর তার চোখ রয়ে গেল তার মুখে — ঠোঁটে, তারপর গলায়, তারপর আরো নিচে — মেরুন কুর্তির গলার কাছে, যেখানে ঘাম জমেছে। «তুই তো আমার ছোট বোনের মতো। বোনকে জিজ্ঞেস করা যায় না?» — চোখ আরো নিচে নামল — মেরুন কুর্তির বুকের ওপর। «তবে... দুধগুলো তো বেশ বড় হয়ে গেছে, শালী।»
ছোট বোন। শব্দটা কানে বিঁধল — কিন্তু শরীরে অন্য কিছু ঘটছিল। বিশ্বাসঘাতক শরীর — উরুর মাঝখানে চিনচিনে অনুভূতি, বুক ভারী। সে পা দুটো আরো চেপে ধরল।
ঘরে নীরবতা নামল — টিভির গোলাগুলির শব্দের নিচে চাপা, ভারী। সে চোখ তুলল — দুলাভাই তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়ল। কেউ চোখ সরাল না — এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড — যেন দুজনেই পরীক্ষা করছে, কে আগে হার মানবে। হার মানল সিনথিয়া — চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু বুকের ভেতর — জয়ীর ঢাক বাজছে।
ঠিক তখনই — দুলাভাইয়ের হাত। সোফার হাতলে রাখতে গিয়ে — নাকি ইচ্ছে করেই — তার উরুর ওপর পড়ল। কুর্তির কাপড়ের ওপর। ভারী, উষ্ণ।
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড।
সরল না।
সিনথিয়ার দম বন্ধ হয়ে এলো। হাতটা জ্বলছে — কাপড়ের ওপর দিয়ে তার ত্বকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে তাকাল তার দিকে। দুলাভাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে — মুখে নিরীহ ভাব, যেন হাতটা ওখানে ভুলে রয়ে গেছে, যেন তিনি টেরই পাননি। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে — একটা চাপা, জয়ী হাসি।
তিনি জানেন। তিনি ঠিক জানেন হাতটা কোথায়।
সে সরাল না। সিনথিয়াও «সরান» বলল না। গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না — যেন কেউ গলায় হাত চেপে ধরেছে। শুধু বসে রইল — পাথর হয়ে — আর ভেতরে ভেতরে পুড়তে লাগল।
এটা ঠিক না। সে জানে এটা ঠিক না। আপু পাশের ঘরে — কড়াই নাড়ছেন, গুনগুন করছেন — আর এখানে তার স্বামীর হাত তার উরুতে। কিন্তু জানা আর মানা এক নয়। হাতটা ভারী হয়ে আছে — প্রতিটা সেকেন্ডে ভারী হচ্ছে, যেন ওজন বাড়ছে। শরীরের প্রতিটা কোষ চিৎকার করছে — সরে যাও, উঠে যাও, চলে যাও। কিন্তু পা নড়ছে না। কারণ গভীরে, সত্যি গভীরে — সে চায় হাতটা থাকুক। চায় আরো কাছে আসুক। আর এই চাওয়াটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল — নিজের এই চাওয়া।
রান্নাঘর থেকে আপুর গলা ভেসে এলো — «চা খাবে তোমরা?»
দুজনেই চমকে উঠল। দুলাভাইয়ের হাত সরে গেল — স্বাভাবিকভাবে, অবলীলায়, যেন কিছুই হয়নি। «খাব!» — তিনি গলা চড়িয়ে বললেন। তারপর সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «বাঁচা গেল, তাই না?»
সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল — হাসি এলো না। বুকের ভেতর এখনো ঝড় বইছে। আপু রান্নাঘরে ফিরে গেলেন — কড়াইয়ের শব্দ আবার শুরু হলো। কিন্তু সোফায় বসা দুজনের মাঝে বাতাস ভারী হয়ে রইল — যেন কিছু একটা বলা হয়নি, যেন কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে।
সিনথিয়ার বুক ধড়াস ধড়াস করছিল। ধরা পড়ার ভয় — এক সেকেন্ডের জন্য আপু যদি বেরিয়ে আসতেন... আর সেই ভয়ের নিচে — একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ উত্তেজনা। আপু পাশের ঘরে কড়াই নাড়ছেন — আর এখানে, সোফায়...
«তুই ঘামছিস।» — দুলাভাই বললেন, তার কপালের দিকে তাকিয়ে।
«গরম লাগছে।» — গলা শুকনো।
«ফ্যান বাড়িয়ে দিই?» — তিনি উঠতে গেলেন — হাত বাড়ালেন টেবিলের দিকে — আর ঠিক তখনই —
হাতের গ্লাসটা কাত হলো।
পরে সিনথিয়া বহুবার ভেবেছে — এটা কি দুর্ঘটনা ছিল? সত্যিই হাত ফসকেছিল? নাকি... গ্লাসটা কাত হলো, পানি ছলকে উঠল — একটা ঢেউ — সোজা তার গায়ে। ঠান্ডা পানি ছড়িয়ে গেল মেরুন কুর্তির বুকে, গলার নিচে, দুই কাঁধের মাঝখানে। কাপড় ভিজে মুহূর্তে শরীরে লেপ্টে গেল — আঠার মতো।
«ওহ শিট! সরি সরি!» — দুলাভাই লাফিয়ে উঠলেন। হাত বাড়ালেন — যেন মুছে দেবেন — তারপর থেমে গেলেন মাঝপথে। কারণ ভেজা কুর্তির নিচে এখন সব স্পষ্ট — ব্রার আকৃতি, ভেজা কাপড়ে লেপ্টে থাকা বুকের ওঠানামা।
তার চোখ সেখানে আটকে গেল। এক সেকেন্ড — যেটা এক ঘণ্টা মনে হলো সিনথিয়ার। চোখ সরছে না। গিলছে দৃষ্টি দিয়ে।
সিনথিয়া দুই হাতে বুক ঢাকল। গাল পুড়ে যাচ্ছে — লজ্জায়, আর... অন্য কিছুতে। কারণ সেই দৃষ্টিতে লজ্জা ছিল না — ছিল ক্ষুধা। সে চিনতে পারল সেই ক্ষুধা। দরজার ফাঁকে দেখেছিল — এই একই চোখ।
«আমি... আমি বদলে আসছি।» — গলা কাঁপছে।
«হ্যাঁ হ্যাঁ, যা।» — দুলাভাইয়ের গলা অদ্ভুত শোনাল — ভারী, ঘন। «সরি, শালী। হাত ফসকে গেল... তবে ভিজে তোকে... খারাপ লাগছে না দেখতে।»
কিন্তু তার চোখ বলছিল — হাত ফসকায়নি। অন্তত পুরোটা না।
রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «কী হলো? চিৎকার কীসের?»
«কিছু না!» — দুলাভাই তাড়াতাড়ি বললেন, গলা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। «পানি পড়ে গেছে গ্লাস থেকে। শালীর কুর্তি ভিজে গেছে — বদলাতে গেছে।»
«সাবধানে ধরতে পারো না একটা গ্লাস?» — আপুর ধমক ভেসে এলো, কিন্তু তাতে স্নেহ। «সিনথিয়া, আমার আলমারি থেকে কিছু নিয়ে পর — তোর মাপের সালোয়ার-কামিজ আছে।»
একটু পরে আপু চা নিয়ে এলেন ড্রয়িং রুমে — দুই কাপ। সিনথিয়া তখন গেস্ট রুমে। দুলাভাই একা সোফায় — চায়ের কাপ হাতে, টিভির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আপু দেখলেন — তার কপালে ঘাম জমেছে। «কী হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি?»
«না না — গরম।» — তিনি তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক দিলেন।
আপু কাঁধ ঝাঁকিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন। দুলাভাই কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন — হাতটা কাঁপছিল, চা ছলকে উঠল সসারে। তিনি হাতটা মুঠো করলেন। গেস্ট রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন — অনেকক্ষণ।
«আমার আছে আপু!» — সিনথিয়া প্রায় দৌড়ে গেস্ট রুমের দিকে গেল — ভেজা কুর্তি গায়ে লেপ্টে, দুই হাতে বুক ঢেকে। করিডোরটা পার হতে হতে মনে হলো সবাই তাকিয়ে — যদিও কেউ নেই। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আপুর এক ঝলক দেখা গেল — কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছেন, গুনগুন করছেন। কিছু জানেন না। কিছু টের পাননি। এই না-জানাটাই সিনথিয়ার বুকে ছুরির মতো বিঁধল — আর তার নিচে, লজ্জাজনকভাবে, একটা শিহরণও। যেন সে কোনো গোপন খেলা খেলছে — যেখানে শুধু দুজন খেলোয়াড় জানে নিয়ম।
গেস্ট রুমে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল — কিন্তু ছিটকিনি তুলতে ভুলে গেল। মাথায় তখন শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছে — দুলাভাইয়ের চোখ, তার ভেজা বুকে আটকে থাকা, সরছে না। আর সেই হাত — তার উরুর ওপর — ভারী, উষ্ণ, সরেনি।
সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ভেজা কুর্তিটা টেনে খুলল — ভেজা কাপড় ত্বক থেকে ছাড়াতে হলো, চটচটে। নিচে ব্রা — বুকের ওপর ভেজা দাগ, কাপড় স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। সালোয়ারটা অল্প ভিজেছে উরুর কাছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — ভেজা চুলের গোছা গলায় লেপ্টে, ব্রা আর সালোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। গাল লাল। ঠোঁট কামড়ানো। চোখে — ভয়? নাকি অন্য কিছু?
তার হাত নিজে থেকেই উঠল — ভেজা দাগটার ওপর, বুকের ওপর। দুলাভাইয়ের চোখ যেখানে আটকে ছিল — ঠিক সেখানে। আঙুল বুলাল ধীরে। শরীরে শিহরণ বয়ে গেল — ঘাড় বেয়ে নিচে। দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে যা দেখেছিল — সেই হাত, সেই গলা, সেই চোখ — এখন সেই মানুষটার চোখ তার শরীরে আটকে ছিল। ভাবতেই উরুর মাঝখানে দপদপ করে উঠল। তার হাত নিচে নামতে লাগল — পেট বেয়ে, সালোয়ারের কোমরের দিকে —
ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»
বিছানায় রাখা নীল কামিজটা হাতে নিল — সেই কামিজ, যেটা পরে সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল। পরতে যাবে — ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»
আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলল। খুলবে? এখন? এই অবস্থায়?
ঠিক তখনই —
ক্যাঁচ।
দরজা খুলছে। ধীরে। একটু একটু করে।
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল বিছানায় — «মিম?» জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে, কিন্তু তার চোখ এখন দরজায়। «কে—» — গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। শুধু বাতাস বেরোল।
দরজার ফাঁকে — প্রথমে একটা ছায়া। তারপর — দুলাভাই।
করিডোরের আলো তার পেছনে — সিলুয়েট হয়ে দাঁড়িয়ে। এক হাত দরজার হাতলে — স্থির। তিনি থমকে গেছেন। তার চোখ — তার শরীরে।
সময় থেমে গেল।
তার চোখ নামছে — ধীরে, যেন প্রতিটা ইঞ্চি গুনছে। ভেজা চুল গলায় লেপ্টে — কাঁধ — ব্রার স্ট্র্যাপ — ভেজা দাগ লেগে থাকা ব্রা — পেট — সালোয়ারের কোমরবন্ধ — উরু। তারপর আবার উপরে — থামছে বুকে। সরছে না।
সিনথিয়ার হাত দুটো অসাড় হয়ে গেছে। বুক ঢাকতে ভুলে গেছে — হাত দুটো পাশে ঝুলছে, নীল কামিজটা এক হাতে ধরা — মেঝেতে পড়তে পড়তে আটকে আছে আঙুলে। সে শুধু তাকিয়ে — তার চোখে।
«আমি...» — দুলাভাইয়ের গলা ভাঙা, অচেনা। «দরজা... খোলা ছিল। আমি শুধু... সরি বলতে এসেছিলাম। পানির ব্যাপারে...»
কিন্তু তিনি সরলেন না। এক পাও পেছালেন না। দরজার হাতলে ধরা হাতটা শক্ত হয়ে আছে — শিরা ফুলে উঠেছে।
সিনথিয়াও নড়ল না। নড়তে পারল না। পা দুটো মেঝেতে গেঁথে গেছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে বাজছে — মনে হলো করিডোর পর্যন্ত শোনা যাবে, আপু শুনতে পাবেন রান্নাঘর থেকে।
লজ্জা — হ্যাঁ, লজ্জা ছিল। গাল পুড়ে যাচ্ছে, কান গরম। কিন্তু লজ্জার নিচে — আরো কিছু। যা সে চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত ধরে এই অনুভূতির সাথে বাস করছে। উত্তেজনা। তীব্র, নিষিদ্ধ উত্তেজনা।
দুই রাত আগে সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — আপুকে, দুলাভাইকে। আজ — দুলাভাই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছেন — তাকে। চক্রটা পূর্ণ হলো। দেখার মানুষটা আজ দেখার বস্তু। আর দেখা হওয়াটা... ভালো লাগছে। ভয়ংকরভাবে ভালো লাগছে।
তার চোখে ভয় নেই — সিনথিয়া দেখল। বিস্ময় আছে, ক্ষুধা আছে — কিন্তু ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তিনি ভেতরে ঢুকতে চান — শরীরটা সামনে ঝুঁকেছে, অজান্তেই। কিন্তু পা নড়ছে না। যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল আটকে রেখেছে।
তার নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে এখন — ভারী, অগভীর। দরজার হাতলে ধরা আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেছে চাপে। সিনথিয়া দেখল — তার চোখে একটা যুদ্ধ চলছে। একটা মানুষ ফিরে যেতে চায় — ভদ্র, সংযত, হাসিখুশি দুলাভাই। আরেকটা মানুষ — দরজার ফাঁকের ওই রাতের মানুষটা — থাকতে চায়। দেখতে চায়। আরো দেখতে চায়।
«তুমি...» — তিনি ফিসফিস করলেন। আর কিছু বলতে পারলেন না।
ঘরে শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ — ভারী, অগভীর, একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে। বাইরে রান্নাঘরে কড়াইয়ের শব্দ, আপুর গুনগুন — অন্য এক দুনিয়ার শব্দ। এই ঘরে — এই মুহূর্তে — শুধু তারা দুজন।
সিনথিয়ার আঙুল থেকে নীল কামিজটা খসে পড়ল মেঝেতে — নিঃশব্দে।
তার গলায় কিছু একটা নড়ল — ঢোক গিললেন তিনি। সিনথিয়া দেখল — তার চোখের পাতা কাঁপছে। এই শক্ত, নিশ্চিত মানুষটা — দরজার ফাঁকের ওই রাতের রাজা, যার এক কথায় আপু কেঁপেছিল — এখন কাঁপছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে — প্রায় নগ্ন একটা মেয়ের সামনে — কাঁপছে। এই দৃশ্যটা সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা জাগিয়ে দিল — কী, সে জানে না। শক্তি? নাকি আরো গভীর, আরো অন্ধকার কিছু?
কেউ নড়ল না।
(চলবে...)
সন্ধ্যা সাতটা।
দরজায় ছিটকিনির শব্দ হলো — রনি বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে ড্রয়িং রুমের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, «বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি, রাতে খাব না।»
আপু রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বললেন, «বেশি রাত করিস না।»
«আচ্ছা।»
দরজা বন্ধ হলো।
যাওয়ার আগে রনি একবার তাকিয়েছিল তার দিকে — গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার দিকে। সেই দৃষ্টি — দুপুরের সিনেমা হলের অন্ধকার মনে করিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি, চোখে একটা প্রশ্ন — «মনে আছে?» সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। দরজা বন্ধ হওয়ার পরেও সেই দৃষ্টি গায়ে লেগে রইল — গরম হয়ে।
ছিটকিনির ধাতব শব্দটা ফ্ল্যাটের ভেতর এক মুহূর্ত ঝুলে রইল — তারপর মিলিয়ে গেল রান্নাঘরের কড়াইয়ের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দে, আপুর গুনগুনে, আর ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসা টিভির গমগমে আওয়াজে।
সিনথিয়া গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে শুনল। ফ্ল্যাটটা হঠাৎ যেন ছোট হয়ে এসেছে — দেয়ালগুলো কাছে সরে এসেছে। এখন এই বাসায় মাত্র তিনজন — রান্নাঘরে আপু, ড্রয়িং রুমে দুলাভাই, আর সে।
সে বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে তানভীরের চারটা মেসেজ জ্বলজ্বল করছে — «কই তুই?» «মেসেজ দেখছিস না কেন?» «মিস করছি।» «মিম?» — দুপুরে সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে সে একটাও খোলেনি। এখনো খুলল না। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলে রইল — তারপর সরে গেল।
বুকের ভেতর মোচড় দিল। অপরাধবোধ — চাপা, কাঁটার মতো। তানভীর — যে গতরাতে তাকে «থাম।» বলে কাঁদিয়েছিল, যে আজ সকালে লিখেছিল «তুই কার?» — সে এখন অপেক্ষা করছে। আর সে — সে আজ দুপুরে আরেকটা পুরুষের ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল।
রনির মুখ মনে পড়ল — অন্ধকার হলে তার ভারী নিঃশ্বাস কানের কাছে, তার হাত তার কুর্তির নিচে উঠে আসা, তার আঙুলের সেই অচেনা ছন্দ — যা তার নিজের আঙুল কখনো শেখাতে পারেনি। তার দাঁত তার কাঁধে বসে যাওয়া — চাপা চিৎকারটা গিলে ফেলা। সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। উরুর মাঝখানে সেই চিনচিনে অনুভূতিটা ফিরে এলো — দুপুরের স্মৃতি শরীরে এখনো তাজা, যেন কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা নয়, কয়েক মিনিট আগের। সে পা দুটো চেপে ধরল, বালিশটা বুকে চেপে ধরল।
আর তানভীর? তানভীর তো কিছু জানে না। তানভীর ভাবে — মিম তার, শুধু তার। «তুই কার?» — «তোর। শুধু তোর।» — গতরাতে লিখেছিল সে। আর আজ দুপুরে সে আরেকজনের হাতে কেঁপেছে, আরেকজনের ঠোঁটে গলেছে। বুকের ভেতর মোচড়টা আরো গভীর হলো। কিন্তু অদ্ভুত — অপরাধবোধের পাশাপাশি একটা উত্তেজনাও, চাপা, নিষিদ্ধ। দুটো পুরুষ। দুটো দুনিয়া। একটা ফোনের স্ক্রিনে — দূরে, নিরাপদ। একটা... বাস্তবে — কাছে, বিপজ্জনক। সে কোনটা? নাকি দুটোই? এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই — শুধু শরীরে একটা অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু ফুটছে।
না। এখন তানভীর না। এখন রনিও না।
ফোনটা উল্টে রাখল বালিশের পাশে। কিন্তু বিছানায় বসে থাকা গেল না — শরীরে অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু একটা ফুটছে। সে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়াল এক মুহূর্ত — মেরুন কুর্তিটা গায়ে, রনি আজই কিনে দিয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ চকচক করছে। «ছি,» — ফিসফিস করে নিজেকেই বলল।
ড্রয়িং রুম থেকে টিভির শব্দ ভেসে আসছে। দুলাভাই সিনেমা দেখছেন।
সে পা টিপে টিপে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল। কেন — নিজেও জানত না। হয়তো একা ঘরে বসে থাকলে ভাবনাগুলো আরো গভীরে টানবে। হয়তো... অন্য কিছু।
দুলাভাই সোফায় হেলান দিয়ে বসে — একটা পা টেবিলে তোলা, হাতে পানির গ্লাস। টিভিতে কোনো অ্যাকশন সিনেমা — গোলাগুলি, ধাওয়া, চিৎকার। তাকে দেখে মুখে হাসি ফুটল, «আরে শালী! আয়, বোস। সিনেমাটা জমে উঠেছে।»
সিনথিয়া এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল দরজায়। তারপর এগিয়ে গেল — সোফার অন্য প্রান্তে নয়, মাঝখানে, তার থেকে এক হাত দূরে — বসল। কুর্তিটা টেনে হাঁটু ঢাকল।
দুলাভাই চোখ টিপলেন, «এত দূরে বসলে সিনেমার ডায়ালগ শোনা যাবে?»
«শোনা যাচ্ছে তো।» — সে হাসল। কিন্তু বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — কেন, বুঝতে পারছে না। নাকি বুঝতে চাইছে না।
দুলাভাই সিনেমার ডায়ালগের সাথে সাথে মন্তব্য করছিলেন — «এই ভিলেনটা বোকা, এভাবে কেউ গুলি চালায়?», «নায়িকা হিল পরে দৌড়াচ্ছে — হাস্যকর!» সিনথিয়া হাসছিল — কিন্তু হাসির আড়ালে তার সমস্ত স্নায়ু পাশের মানুষটার দিকে। তার গায়ের গন্ধ — সাবান আর হালকা ঘামের মিশ্রণ। সোফার হাতলে রাখা তার হাতের লোম। প্রতিটা নড়াচড়া সে টের পাচ্ছে — যেন শরীরে রাডার বসে গেছে। একবার তার কনুই তার বাহু ছুঁয়ে গেল — বিদ্যুৎ খেলে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। তিনি টের পেলেন কিনা — বোঝা গেল না।
সিনেমা চলছিল। পর্দায় গাড়ি উড়ছে, বোমা ফাটছে। কিন্তু সিনথিয়ার চোখ স্ক্রিনে আটকাচ্ছে না — বারবার আড়চোখে যাচ্ছে পাশের মানুষটার দিকে। এই মানুষটা। দুই রাত আগে দরজার ফাঁক দিয়ে যাকে দেখেছিল — সেই গলা, «বল, তুই কী?», সেই হাত আপুর চুলে, সেই... কপালের চুমু, ফিসফিস — «ভালোবাসি তোকে।» — সব মনে আছে। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা দৃশ্য — চোখ বন্ধ করলেই ভাসে।
দিনের বেলার এই হাসিখুশি মানুষটা আর রাতের ওই মানুষটা — একই শরীরে দুটো মানুষ। আর সে — এই সত্যিটা স্বীকার করতে তার গলা শুকিয়ে এলো — সে দুটোকেই দেখতে চায়। কাছ থেকে।
«কী ভাবছিস?» — দুলাভাইয়ের গলা হঠাৎ।
«কিছু না।» — তাড়াতাড়ি স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
«মিথ্যে বলছিস।» — তিনি হাসলেন। «মেয়েদের মুখ দেখলেই বোঝা যায় — ভেতরে কিছু চলছে।»
«আপনি তো মনোবিজ্ঞানী হয়ে গেলেন!»
«দুলাভাই সব জানে।» — তিনি পানির গ্লাসে চুমুক দিলেন। «বল তো — কলেজ কেমন চলছে?»
«ভালো।»
«পড়াশোনা?»
«ভালো।»
«আর...» — তিনি একটু ঝুঁকলেন তার দিকে, গলা নামিয়ে — «বয়ফ্রেন্ড আছে?»
সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। «দুলাভাই!»
«কী? জানতে চাওয়া অপরাধ নাকি?» — তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। «এই বয়সে তো থাকারই কথা। তোর আপুরও ছিল — আমি। তোর আপুকে পটাতে আমার তিন বছর লেগেছিল, জানিস?»
অজান্তেই সিনথিয়া হেসে ফেলল। «আপু পটেছিল?»
«পটবে না মানে? এই হাসি দেখে কে না পটবে!» — তিনি নিজের দিকে ইশারা করলেন। «তবে তোর আপু তোর মতো লাজুক ছিল না। ও ছিল ডেঞ্জারাস।»
«কীভাবে পটালেন?» — সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল — কৌতূহলে, ভুলে গিয়ে লজ্জা।
«প্রথমে বন্ধু হলাম। তারপর রোজ কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম — একবার বৃষ্টিতে ভিজে কাকভেজা। তোর আপু ছাতা নিয়ে এলো — নিজে ভিজে আমাকে ছাতা দিল।» — দুলাভাইয়ের চোখে দূরের আলো, ঠোঁটে নরম হাসি। «সেদিনই বুঝেছিলাম — এই মেয়েকে ছাড়া আমার চলবে না।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। ভালোবাসার গল্প — আর দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে দেখা সেই দৃশ্য — একই মানুষ, একই ভালোবাসা — শুধু রূপ আলাদা। দিনে ছাতা, রাতে... তার ভাবনা থেমে গেল — গাল গরম।
«আপু? ডেঞ্জারাস?» — সিনথিয়ার গলা কেঁপে গেল। ডেঞ্জারাস — দরজার ফাঁকে দেখা আপু — «আমাকে ছিঁড়ে ফেলো!» — হ্যাঁ, ডেঞ্জারাসই তো।
«তুই জানিস না তোর আপুকে।» — দুলাভাই চোখ টিপলেন। তিনি হাসতে হাসতে হাতটা তুললেন সোফার পিঠে — তার কাঁধের ঠিক পেছনে। হাতটা তাকে ছোঁয়নি — কিন্তু ছোঁয়ার দূরত্বে। সিনথিয়া কাঁধের পেছনে তার হাতের উষ্ণতা টের পাচ্ছে — না ছুঁয়েও ছোঁয়া। সে সোজা হয়ে বসল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না। কেন পিছিয়ে যাবে? দুলাভাই তো... শুধু দুলাভাই।
«আচ্ছা, বয়ফ্রেন্ড বাদ দে। অন্য প্রশ্ন।» — তিনি সোফায় আরেকটু ঘনিয়ে বসলেন। তাদের উরুর মাঝে এখন এক বিঘতও ফাঁক নেই — প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। «কিস করেছিস কখনো?»
«দুলাভাই!!» — সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠল। কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
«আহা, লজ্জা পাওয়ার কী আছে!» — তিনি হাসলেন — সেই চিরচেনা, সহজ হাসি। কিন্তু আজ সেই হাসির নিচে কিছু একটা আছে — যা সিনথিয়া চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত আগে সে দেখেছে এই মানুষটার অন্য মুখ। «আমি তোর দুলাভাই — ডাক্তারের মতো। ডাক্তারের কাছে লজ্জা কীসের?»
সে মুখ ফিরিয়ে নিল স্ক্রিনের দিকে। কিন্তু সরল না — এক ইঞ্চিও না। উরুর পাশে তার উরুর উষ্ণতা — কুর্তির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে টের পাচ্ছে। বুকের ভেতর কিছু একটা দপদপ করছে — জোরে, অসহ্য।
«বল না।» — তার গলা নরম হয়ে এলো, কিন্তু চোখে সেই দুষ্টুমি জ্বলজ্বল করছে। «করেছিস? একবারও?»
সিনথিয়া ঠোঁট কামড়াল। মাথা নাড়ল — না।
মিথ্যে। আজ দুপুরে — রনির ঠোঁট তার ঠোঁটে, তার জিভ... কিন্তু সেটা তো দুলাভাই জানেন না। জানতে পারবেন না।
«সত্যি?» — দুলাভাইয়ের ভ্রু উঠে গেল। «এই যুগের মেয়ে... কলেজে পড়ে... একটা কিসও হয়নি?»
«আমি... আমি ওসবে নেই।» — গলা কাঁপছিল।
«হুম।» — তিনি তাকে দেখলেন — উপর থেকে নিচ, ধীরে। সেই দৃষ্টি — সিনথিয়ার গায়ে কাঁটা দিল। «তাহলে তো তুই...» — তিনি ঝুঁকলেন আরো কাছে, ফিসফিস করে — «ভার্জিন, তাই না? কেউ তোর ভোদায় আঙুলও দেয়নি?»
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «দুলাভাই, আপনি... আপনি এসব কী জিজ্ঞেস করছেন!»
«আরে, মজা করছি!» — তিনি হেসে উঠলেন। কিন্তু হাসিটা থামার পর তার চোখ রয়ে গেল তার মুখে — ঠোঁটে, তারপর গলায়, তারপর আরো নিচে — মেরুন কুর্তির গলার কাছে, যেখানে ঘাম জমেছে। «তুই তো আমার ছোট বোনের মতো। বোনকে জিজ্ঞেস করা যায় না?» — চোখ আরো নিচে নামল — মেরুন কুর্তির বুকের ওপর। «তবে... দুধগুলো তো বেশ বড় হয়ে গেছে, শালী।»
ছোট বোন। শব্দটা কানে বিঁধল — কিন্তু শরীরে অন্য কিছু ঘটছিল। বিশ্বাসঘাতক শরীর — উরুর মাঝখানে চিনচিনে অনুভূতি, বুক ভারী। সে পা দুটো আরো চেপে ধরল।
ঘরে নীরবতা নামল — টিভির গোলাগুলির শব্দের নিচে চাপা, ভারী। সে চোখ তুলল — দুলাভাই তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়ল। কেউ চোখ সরাল না — এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড — যেন দুজনেই পরীক্ষা করছে, কে আগে হার মানবে। হার মানল সিনথিয়া — চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু বুকের ভেতর — জয়ীর ঢাক বাজছে।
ঠিক তখনই — দুলাভাইয়ের হাত। সোফার হাতলে রাখতে গিয়ে — নাকি ইচ্ছে করেই — তার উরুর ওপর পড়ল। কুর্তির কাপড়ের ওপর। ভারী, উষ্ণ।
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড।
সরল না।
সিনথিয়ার দম বন্ধ হয়ে এলো। হাতটা জ্বলছে — কাপড়ের ওপর দিয়ে তার ত্বকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে তাকাল তার দিকে। দুলাভাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে — মুখে নিরীহ ভাব, যেন হাতটা ওখানে ভুলে রয়ে গেছে, যেন তিনি টেরই পাননি। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে — একটা চাপা, জয়ী হাসি।
তিনি জানেন। তিনি ঠিক জানেন হাতটা কোথায়।
সে সরাল না। সিনথিয়াও «সরান» বলল না। গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না — যেন কেউ গলায় হাত চেপে ধরেছে। শুধু বসে রইল — পাথর হয়ে — আর ভেতরে ভেতরে পুড়তে লাগল।
এটা ঠিক না। সে জানে এটা ঠিক না। আপু পাশের ঘরে — কড়াই নাড়ছেন, গুনগুন করছেন — আর এখানে তার স্বামীর হাত তার উরুতে। কিন্তু জানা আর মানা এক নয়। হাতটা ভারী হয়ে আছে — প্রতিটা সেকেন্ডে ভারী হচ্ছে, যেন ওজন বাড়ছে। শরীরের প্রতিটা কোষ চিৎকার করছে — সরে যাও, উঠে যাও, চলে যাও। কিন্তু পা নড়ছে না। কারণ গভীরে, সত্যি গভীরে — সে চায় হাতটা থাকুক। চায় আরো কাছে আসুক। আর এই চাওয়াটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল — নিজের এই চাওয়া।
রান্নাঘর থেকে আপুর গলা ভেসে এলো — «চা খাবে তোমরা?»
দুজনেই চমকে উঠল। দুলাভাইয়ের হাত সরে গেল — স্বাভাবিকভাবে, অবলীলায়, যেন কিছুই হয়নি। «খাব!» — তিনি গলা চড়িয়ে বললেন। তারপর সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «বাঁচা গেল, তাই না?»
সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল — হাসি এলো না। বুকের ভেতর এখনো ঝড় বইছে। আপু রান্নাঘরে ফিরে গেলেন — কড়াইয়ের শব্দ আবার শুরু হলো। কিন্তু সোফায় বসা দুজনের মাঝে বাতাস ভারী হয়ে রইল — যেন কিছু একটা বলা হয়নি, যেন কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে।
সিনথিয়ার বুক ধড়াস ধড়াস করছিল। ধরা পড়ার ভয় — এক সেকেন্ডের জন্য আপু যদি বেরিয়ে আসতেন... আর সেই ভয়ের নিচে — একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ উত্তেজনা। আপু পাশের ঘরে কড়াই নাড়ছেন — আর এখানে, সোফায়...
«তুই ঘামছিস।» — দুলাভাই বললেন, তার কপালের দিকে তাকিয়ে।
«গরম লাগছে।» — গলা শুকনো।
«ফ্যান বাড়িয়ে দিই?» — তিনি উঠতে গেলেন — হাত বাড়ালেন টেবিলের দিকে — আর ঠিক তখনই —
হাতের গ্লাসটা কাত হলো।
পরে সিনথিয়া বহুবার ভেবেছে — এটা কি দুর্ঘটনা ছিল? সত্যিই হাত ফসকেছিল? নাকি... গ্লাসটা কাত হলো, পানি ছলকে উঠল — একটা ঢেউ — সোজা তার গায়ে। ঠান্ডা পানি ছড়িয়ে গেল মেরুন কুর্তির বুকে, গলার নিচে, দুই কাঁধের মাঝখানে। কাপড় ভিজে মুহূর্তে শরীরে লেপ্টে গেল — আঠার মতো।
«ওহ শিট! সরি সরি!» — দুলাভাই লাফিয়ে উঠলেন। হাত বাড়ালেন — যেন মুছে দেবেন — তারপর থেমে গেলেন মাঝপথে। কারণ ভেজা কুর্তির নিচে এখন সব স্পষ্ট — ব্রার আকৃতি, ভেজা কাপড়ে লেপ্টে থাকা বুকের ওঠানামা।
তার চোখ সেখানে আটকে গেল। এক সেকেন্ড — যেটা এক ঘণ্টা মনে হলো সিনথিয়ার। চোখ সরছে না। গিলছে দৃষ্টি দিয়ে।
সিনথিয়া দুই হাতে বুক ঢাকল। গাল পুড়ে যাচ্ছে — লজ্জায়, আর... অন্য কিছুতে। কারণ সেই দৃষ্টিতে লজ্জা ছিল না — ছিল ক্ষুধা। সে চিনতে পারল সেই ক্ষুধা। দরজার ফাঁকে দেখেছিল — এই একই চোখ।
«আমি... আমি বদলে আসছি।» — গলা কাঁপছে।
«হ্যাঁ হ্যাঁ, যা।» — দুলাভাইয়ের গলা অদ্ভুত শোনাল — ভারী, ঘন। «সরি, শালী। হাত ফসকে গেল... তবে ভিজে তোকে... খারাপ লাগছে না দেখতে।»
কিন্তু তার চোখ বলছিল — হাত ফসকায়নি। অন্তত পুরোটা না।
রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «কী হলো? চিৎকার কীসের?»
«কিছু না!» — দুলাভাই তাড়াতাড়ি বললেন, গলা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। «পানি পড়ে গেছে গ্লাস থেকে। শালীর কুর্তি ভিজে গেছে — বদলাতে গেছে।»
«সাবধানে ধরতে পারো না একটা গ্লাস?» — আপুর ধমক ভেসে এলো, কিন্তু তাতে স্নেহ। «সিনথিয়া, আমার আলমারি থেকে কিছু নিয়ে পর — তোর মাপের সালোয়ার-কামিজ আছে।»
একটু পরে আপু চা নিয়ে এলেন ড্রয়িং রুমে — দুই কাপ। সিনথিয়া তখন গেস্ট রুমে। দুলাভাই একা সোফায় — চায়ের কাপ হাতে, টিভির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আপু দেখলেন — তার কপালে ঘাম জমেছে। «কী হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি?»
«না না — গরম।» — তিনি তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক দিলেন।
আপু কাঁধ ঝাঁকিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন। দুলাভাই কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন — হাতটা কাঁপছিল, চা ছলকে উঠল সসারে। তিনি হাতটা মুঠো করলেন। গেস্ট রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন — অনেকক্ষণ।
«আমার আছে আপু!» — সিনথিয়া প্রায় দৌড়ে গেস্ট রুমের দিকে গেল — ভেজা কুর্তি গায়ে লেপ্টে, দুই হাতে বুক ঢেকে। করিডোরটা পার হতে হতে মনে হলো সবাই তাকিয়ে — যদিও কেউ নেই। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আপুর এক ঝলক দেখা গেল — কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছেন, গুনগুন করছেন। কিছু জানেন না। কিছু টের পাননি। এই না-জানাটাই সিনথিয়ার বুকে ছুরির মতো বিঁধল — আর তার নিচে, লজ্জাজনকভাবে, একটা শিহরণও। যেন সে কোনো গোপন খেলা খেলছে — যেখানে শুধু দুজন খেলোয়াড় জানে নিয়ম।
গেস্ট রুমে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল — কিন্তু ছিটকিনি তুলতে ভুলে গেল। মাথায় তখন শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছে — দুলাভাইয়ের চোখ, তার ভেজা বুকে আটকে থাকা, সরছে না। আর সেই হাত — তার উরুর ওপর — ভারী, উষ্ণ, সরেনি।
সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ভেজা কুর্তিটা টেনে খুলল — ভেজা কাপড় ত্বক থেকে ছাড়াতে হলো, চটচটে। নিচে ব্রা — বুকের ওপর ভেজা দাগ, কাপড় স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। সালোয়ারটা অল্প ভিজেছে উরুর কাছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — ভেজা চুলের গোছা গলায় লেপ্টে, ব্রা আর সালোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। গাল লাল। ঠোঁট কামড়ানো। চোখে — ভয়? নাকি অন্য কিছু?
তার হাত নিজে থেকেই উঠল — ভেজা দাগটার ওপর, বুকের ওপর। দুলাভাইয়ের চোখ যেখানে আটকে ছিল — ঠিক সেখানে। আঙুল বুলাল ধীরে। শরীরে শিহরণ বয়ে গেল — ঘাড় বেয়ে নিচে। দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে যা দেখেছিল — সেই হাত, সেই গলা, সেই চোখ — এখন সেই মানুষটার চোখ তার শরীরে আটকে ছিল। ভাবতেই উরুর মাঝখানে দপদপ করে উঠল। তার হাত নিচে নামতে লাগল — পেট বেয়ে, সালোয়ারের কোমরের দিকে —
ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»
বিছানায় রাখা নীল কামিজটা হাতে নিল — সেই কামিজ, যেটা পরে সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল। পরতে যাবে — ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»
আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলল। খুলবে? এখন? এই অবস্থায়?
ঠিক তখনই —
ক্যাঁচ।
দরজা খুলছে। ধীরে। একটু একটু করে।
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল বিছানায় — «মিম?» জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে, কিন্তু তার চোখ এখন দরজায়। «কে—» — গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। শুধু বাতাস বেরোল।
দরজার ফাঁকে — প্রথমে একটা ছায়া। তারপর — দুলাভাই।
করিডোরের আলো তার পেছনে — সিলুয়েট হয়ে দাঁড়িয়ে। এক হাত দরজার হাতলে — স্থির। তিনি থমকে গেছেন। তার চোখ — তার শরীরে।
সময় থেমে গেল।
তার চোখ নামছে — ধীরে, যেন প্রতিটা ইঞ্চি গুনছে। ভেজা চুল গলায় লেপ্টে — কাঁধ — ব্রার স্ট্র্যাপ — ভেজা দাগ লেগে থাকা ব্রা — পেট — সালোয়ারের কোমরবন্ধ — উরু। তারপর আবার উপরে — থামছে বুকে। সরছে না।
সিনথিয়ার হাত দুটো অসাড় হয়ে গেছে। বুক ঢাকতে ভুলে গেছে — হাত দুটো পাশে ঝুলছে, নীল কামিজটা এক হাতে ধরা — মেঝেতে পড়তে পড়তে আটকে আছে আঙুলে। সে শুধু তাকিয়ে — তার চোখে।
«আমি...» — দুলাভাইয়ের গলা ভাঙা, অচেনা। «দরজা... খোলা ছিল। আমি শুধু... সরি বলতে এসেছিলাম। পানির ব্যাপারে...»
কিন্তু তিনি সরলেন না। এক পাও পেছালেন না। দরজার হাতলে ধরা হাতটা শক্ত হয়ে আছে — শিরা ফুলে উঠেছে।
সিনথিয়াও নড়ল না। নড়তে পারল না। পা দুটো মেঝেতে গেঁথে গেছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে বাজছে — মনে হলো করিডোর পর্যন্ত শোনা যাবে, আপু শুনতে পাবেন রান্নাঘর থেকে।
লজ্জা — হ্যাঁ, লজ্জা ছিল। গাল পুড়ে যাচ্ছে, কান গরম। কিন্তু লজ্জার নিচে — আরো কিছু। যা সে চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত ধরে এই অনুভূতির সাথে বাস করছে। উত্তেজনা। তীব্র, নিষিদ্ধ উত্তেজনা।
দুই রাত আগে সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — আপুকে, দুলাভাইকে। আজ — দুলাভাই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছেন — তাকে। চক্রটা পূর্ণ হলো। দেখার মানুষটা আজ দেখার বস্তু। আর দেখা হওয়াটা... ভালো লাগছে। ভয়ংকরভাবে ভালো লাগছে।
তার চোখে ভয় নেই — সিনথিয়া দেখল। বিস্ময় আছে, ক্ষুধা আছে — কিন্তু ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তিনি ভেতরে ঢুকতে চান — শরীরটা সামনে ঝুঁকেছে, অজান্তেই। কিন্তু পা নড়ছে না। যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল আটকে রেখেছে।
তার নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে এখন — ভারী, অগভীর। দরজার হাতলে ধরা আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেছে চাপে। সিনথিয়া দেখল — তার চোখে একটা যুদ্ধ চলছে। একটা মানুষ ফিরে যেতে চায় — ভদ্র, সংযত, হাসিখুশি দুলাভাই। আরেকটা মানুষ — দরজার ফাঁকের ওই রাতের মানুষটা — থাকতে চায়। দেখতে চায়। আরো দেখতে চায়।
«তুমি...» — তিনি ফিসফিস করলেন। আর কিছু বলতে পারলেন না।
ঘরে শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ — ভারী, অগভীর, একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে। বাইরে রান্নাঘরে কড়াইয়ের শব্দ, আপুর গুনগুন — অন্য এক দুনিয়ার শব্দ। এই ঘরে — এই মুহূর্তে — শুধু তারা দুজন।
সিনথিয়ার আঙুল থেকে নীল কামিজটা খসে পড়ল মেঝেতে — নিঃশব্দে।
তার গলায় কিছু একটা নড়ল — ঢোক গিললেন তিনি। সিনথিয়া দেখল — তার চোখের পাতা কাঁপছে। এই শক্ত, নিশ্চিত মানুষটা — দরজার ফাঁকের ওই রাতের রাজা, যার এক কথায় আপু কেঁপেছিল — এখন কাঁপছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে — প্রায় নগ্ন একটা মেয়ের সামনে — কাঁপছে। এই দৃশ্যটা সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা জাগিয়ে দিল — কী, সে জানে না। শক্তি? নাকি আরো গভীর, আরো অন্ধকার কিছু?
কেউ নড়ল না।
(চলবে...)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)