Thread Rating:
  • 9 Vote(s) - 1.89 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি
#12
শপিং

সকালটা এলো অন্যরকম আলো নিয়ে।

সিনথিয়ার ঘুম ভাঙল গেস্ট রুমের অচেনা বিছানায় — এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না সে কোথায়। তারপর সব মনে পড়ে গেল — আপুর বাসা, দরজার ফাঁক, তানভীরের রাতভর মেসেজ। তার গাল গরম হয়ে উঠল কম্বলের নিচে। ফোনটা হাতে নিল — তানভীরের শেষ মেসেজ: «ঘুমা। স্বপ্নে আমি আসব।» সে হাসল, ফোনটা বুকে চেপে ধরল।

দরজায় টোকা। আপুর গলা — «সিনথিয়া! ওঠ! নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!»

ডাইনিং টেবিলে বসে সিনথিয়া চোখ তুলতে পারছিল না। আপু স্বাভাবিক — পরোটা ভাজছেন, হাসছেন। দুলাভাই অফিসের শার্ট পরে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন — সেই হাসিখুশি মানুষটা, যাকে দুই রাত আগে দরজার ফাঁক দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখেছে সে। এই দুটো মানুষ কি এক? এই ভাবনায় তার বুকের ভেতর কেমন করল।

আপু তার প্লেটে পরোটা তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে বললেন, «মাকে ফোন করেছিলাম — তুই আজও থাকছিস।»

সিনথিয়া চমকে তাকাল। আপুর চোখে সেই চেনা হাসি — গতকাল সকালের সেই হাসি, যার মানে সে এখন বোঝে। তার গলা শুকিয়ে গেল। «আপু...»

«খা,» আপু চোখ টিপলেন। «আজ তোর দুলাভাইয়ের ছুটি নেই, আমারও অফিস। তুই আর রনি বাসায় থাকবি।»

সিনথিয়া মাথা নিচু করে পরোটা ছিঁড়ল। আপুর এই চোখ টিপ — এর মানে সে জানে। গতকাল সকালের সেই ফিসফিস — «তুই কাল রাতে জেগে ছিলি, তাই না?» — এখনো তার কানে বাজে। আপু রাগ করেনি। আপু হেসেছিল। এই ভাবনায় তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত সাহস জন্ম নিল — যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গোপনটা কেউ জেনে ফেলার পরেও পৃথিবীটা ভাঙেনি।

দুলাভাই বেরোনোর সময় আপুর কপালে চুমু খেলেন — হালকা, স্বাভাবিক, সবার সামনে। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে দেখা সেই দৃশ্য — সেই কপালের চুমু — «ভালোবাসি তোকে।» একই মানুষ। একই হাত। দিনের আলোয় ভদ্র, রাতের অন্ধকারে বন্য। তার গাল গরম হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল।

দুলাভাই কাগজ থেকে মুখ তুললেন। «রনি!»

ছোট ঘর থেকে রনি বেরিয়ে এলো — চুলে হাত বুলাতে বুলাতে। পঁচিশ বছর বয়স, লম্বা-চওড়া না হলেও টানটান গড়ন, চোখে একটা সহজ হাসি। সিনথিয়া তাকে ভালো করে দেখল এই প্রথম — সেদিন রাতের খাবারে নামটা শুনেছিল শুধু।

«শালীকে নিয়ে একটু শপিং-এ যাস তো,» দুলাভাই বললেন। «মেয়েটা বেড়াতে এসেছে, কিছু কিনে দে। টাকা আমি দিচ্ছি।»

রনির চোখ সিনথিয়ার দিকে এলো — এক সেকেন্ডের জন্য আটকে রইল। তার ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটা ফুটল — ধীর, অদ্ভুত হাসি। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। কেন যেন মনে হলো — এই হাসির পেছনে কিছু আছে।

«ঠিক আছে ভাই,» রনি বলল। «তুমি রেডি হও, সিনথিয়া।»

নিজের নামটা তার মুখে শুনে সিনথিয়ার কেমন লাগল — অচেনা, অথচ ভালো লাগা। সে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে দ্বিধায় পড়ল — কোনটা পরবে? নীল কামিজটা — যেটা পরে তানভীরের জন্য ছবি তুলেছিল? নাকি গাঢ় সবুজটা? তার আঙুল থমকে রইল সবুজটার ওপর। কেন যেন আজ সাজতে ইচ্ছে করছে। রনির জন্য? এই ভাবনাটা আসতেই সে আয়নার মেয়েটাকে চোখ রাঙাল — কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল নিজের অজান্তে।

রিকশায় উঠতে গিয়ে বিপত্তি — রিকশাটা ছোট, দুজনে বসতে গায়ে গা লাগে। রনি একপাশে সরে বসল, «আরাম করে বসো।» রিকশা চলতে শুরু করল। বাঁক নেওয়ার সময় রিকশাটা দুলল — রনির বাহু এসে ঠেকল তার বাহুতে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। কেউ সরল না।

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। বাহুর ওইটুকু ছোঁয়ায় তার সারা গায়ে শিহরণ বয়ে গেল। রনি তাকাল তার দিকে — চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই তাকাল সামনে। কিন্তু বাহুটা সরল না।

«এই নীলটা তোমায় মানায়,» রনি বলল হঠাৎ। «মানে... কামিজটা।»

«থ্যাংকস,» সিনথিয়া ফিসফিস করল। তার গাল জ্বলছে — সে টের পাচ্ছে।

«তুমি... কলেজে পড়ো, তাই না?» রনি জিজ্ঞেস করল। «কোন ইয়ার?»

«সেকেন্ড ইয়ার,» সে বলল। নিরাপদ কথা। সহজ কথা। কিন্তু তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ থামছে না।

রনি হাসল। «আমার বোন থাকলে তোমার বয়সীই হতো।» একটু থেমে বলল, «তুমি হাসলে...» — সে থেমে গেল, মাথা নাড়ল। «কিছু না।»

«বলো না,» সিনথিয়া বলল — নিজের গলার আগ্রহ শুনে নিজেই চমকে উঠল।

রনি তাকাল তার দিকে — সরাসরি, গভীর করে। «তুমি হাসলে সুন্দর লাগে। খুব।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর কিছু একটা গলে গেল। সে জানালার বাইরে তাকাল — রাস্তা, দোকান, মানুষ — কিছুই দেখতে পেল না। শুধু শুনতে পেল নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ। আর বাহুতে লেগে থাকা তার বাহুর উষ্ণতা।

রিকশা জ্যামে আটকাল। রনি ফোন বের করে কী যেন দেখল — হাসল নিজের মনে। «কী?» সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল। «বন্ধু মিম পাঠিয়েছে,» রনি ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল — একটা ফানি ভিডিও। দুজনে একসাথে হাসল — মাথা কাছাকাছি এসে গেল স্ক্রিন দেখতে। রনির চুলের গন্ধ পেল সিনথিয়া — শ্যাম্পু আর রোদের গন্ধ। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল।

তানভীরের কথা মনে পড়ল হঠাৎ — গতরাতে তার মেসেজ: «তুই শুধু আমার হাতটা ধরে থাকবি।» অপরাধবোধটা ছুঁয়ে গেল তাকে — ঠান্ডা আঙুলের মতো। কিন্তু রনির বাহু তখনো তার বাহুতে লেগে — উষ্ণ, সত্যি, জীবন্ত। ফোনের স্ক্রিনের মানুষটা দূরে — অনেক দূরে। আর এই মানুষটা — এখানে। তার পাশে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য — অপরাধবোধটাকে ঠেলে সরিয়ে দিল। আজকের দিনটা... আজকের দিনটা শুধু আজকের।

শপিং মলের ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগতেই সিনথিয়ার শরীরটা জুড়িয়ে গেল। ভেতরে ঝলমলে আলো, দোকানের সারি, মানুষের ভিড়। রনি হাঁটছে তার পাশে — একটু কাছে, প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি কাছে।

«কী কিনবে?» রনি জিজ্ঞেস করল।

«জানি না,» সিনথিয়া বলল। «আপু বলেছে... মানে, দুলাভাই বলেছে...»

«ভাইয়ের টাকায় শপিং — এই সুযোগ ছাড়া যায়?» রনি হাসল। «চলো, ওই দোকানটায় যাই।»

কুর্তির দোকান। সিনথিয়া হ্যাঙারে ঝোলানো রঙিন কুর্তিগুলো দেখতে লাগল — হাত বুলিয়ে কাপড় অনুভব করল। রনি দাঁড়িয়ে দেখছিল তাকে — সে টের পাচ্ছিল পিঠে তার দৃষ্টি। এই অনুভূতিটা — কারো চোখে নিজেকে সুন্দর লাগা — তার বুকের ভেতর অদ্ভুত মিষ্টি ব্যথা তুলল।

«এই মেরুনটা দেখো,» রনি একটা কুর্তি তুলে ধরল। «তোমার গায়ের রঙে...» — সে থামল, হাসল। «ট্রাই করে দেখো।»

ট্রায়াল রুম — আসলে শুধু একটা পর্দা ঘেরা কোণা। সিনথিয়া ভেতরে ঢুকে পর্দা টেনে দিল। কামিজটা খুলতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল। কেন কাঁপছে? পর্দার ওপারে রনি দাঁড়িয়ে — এই ভাবনাটাই তার শ্বাস ঘন করে তুলল। মেরুন কুর্তিটা গলিয়ে নিল। আয়নায় দেখল নিজেকে — চোখে চকচকে ভাব, ঠোঁটে অজানা হাসি।

«হয়েছে?» পর্দার ওপার থেকে রনির গলা।

«এক মিনিট,» সে বলল — গলাটা নিজের কানেই অচেনা লাগল।

পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এলো। রনি তাকাল — আর তাকিয়েই রইল। তার চোখ সিনথিয়ার মুখ থেকে নামল গলায়, কাঁধে — থমকে রইল এক মুহূর্ত বেশি। সিনথিয়ার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দটা এত জোরে — মনে হলো রনি শুনতে পাবে।

«এই রঙটা...» রনি এগিয়ে এলো এক পা। «তোমাকে...» — সে থামল। তার হাত উঠল — সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো — কিন্তু সে শুধু কুর্তির হাতাটা ঠিক করে দিল, যেটা উল্টে ছিল। আঙুলের ডগা ছুঁয়ে গেল তার কব্জি। একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল সিনথিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে।

«পারফেক্ট,» রনি ফিসফিস করল। তার চোখ তখনো সিনথিয়ার চোখে। «এটা নিচ্ছি।»

«দামটা...» সিনথিয়া ট্যাগটা দেখে চমকে উঠল।

«ভাই দেবে,» রনি হাসল। «আর ভাই না দিলে... আমি দেব।»

«কেন?» সে জিজ্ঞেস করল — গলা কাঁপছে।

রনি উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল — সেই দৃষ্টিতে, যার মানে সিনথিয়া বুঝতে পারছিল, বুঝতে চাইছিল না। দোকানদার প্যাকেট এগিয়ে দিল।

আরো দুটো দোকান ঘুরল তারা। রনি একটা টপ তুলে ধরল — হালকা গোলাপি। «এটা ট্রাই করো।»

আবার পর্দার ভেতর। এবার সিনথিয়ার হাত আরো বেশি কাঁপছিল। পর্দার ওপারে রনির উপস্থিতি — তার নিঃশ্বাসের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছে সে। টপটা পরে পর্দা সরাল।

«পর্দা খুলে দেখাও না একটু,» রনি বলল — গলায় দুষ্টুমি। «ভেতরে কী হচ্ছে দেখতে দাও।»

«অসভ্য!» সিনথিয়া হেসে ফেলল — কিন্তু তার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকে আছে। এই খুনসুটি, এই দুষ্টুমি — তানভীরের মেসেজের মতো, কিন্তু এটা সামনাসামনি, এটা সত্যিকারের মানুষ, সত্যিকারের চোখ।

রনি হাসল — কিন্তু হাসির নিচে কিছু একটা ছিল। গভীর, অন্ধকার কিছু। «সরি,» সে বলল। «মজা করছিলাম।»

«জানি,» সিনথিয়া বলল। কিন্তু তার বুক বলছিল — মজা না। এটা মজা না।

তৃতীয় দোকানটা ছোট — সালোয়ার-কামিজের। সিনথিয়া একটা হালকা সবুজ কামিজ হাতে নিল। রনি দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের মুখে — কিন্তু তার চোখ আয়নার দিকে। সিনথিয়া কামিজটা গায়ে ধরে আয়নায় দেখল — আয়নায় রনির প্রতিবিম্ব। সে তাকিয়ে আছে। সরাসরি। তাদের চোখ আয়নায় মিলল — দুজনেই সরিয়ে নিল তাড়াতাড়ি। কিন্তু সিনথিয়ার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল।

«এটা নাও,» রনি বলল — গলা একটু ভারী। «সবুজটা তোমায়... ভালো লাগবে।»

প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে বেরোতে বেরোতে সিনথিয়া টের পেল — রনি ইচ্ছে করে তার হাতের প্যাকেটগুলো নিয়ে নিল। তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল প্যাকেটের হাতলে — এক সেকেন্ডের জন্য। দুজনেই থমকে গেল। তারপর রনি প্যাকেটগুলো নিয়ে হাঁটতে লাগল — যেন কিছু হয়নি। কিন্তু সিনথিয়া দেখল — তার কান লাল হয়ে আছে।

ফুড কোর্টে ভিড়। ছোট্ট একটা টেবিল পেল তারা — মুখোমুখি বসতে গেলে হাঁটুতে হাঁটু লাগে। রনি দুটো কোল্ড কফি নিয়ে এলো।

«খিদে পেয়েছে?» সে জিজ্ঞেস করল।

«একটু,» সিনথিয়া বলল। আসলে তার পেটে খিদে নয় — অন্য কিছু। প্রজাপতির মতো কিছু উড়ছে ভেতরে।

কফিতে চুমুক দিতে দিতে রনি তাকিয়ে রইল তার দিকে। টেবিলের নিচে তার হাঁটু সিনথিয়ার হাঁটুতে ঠেকল — প্রথমে মনে হলো ভুলে। কিন্তু সরাল না। সিনথিয়াও সরাল না। দুটো হাঁটু লেগে রইল — উষ্ণ, চাপা, গোপন। টেবিলের ওপরে সব স্বাভাবিক — কফি, হাসি, কথা। টেবিলের নিচে — অন্য একটা গল্প।

«তুমি খুব সুন্দর, জানো?» রনি বলল হঠাৎ — গলা নিচু, শুধু তার জন্য।

সিনথিয়ার হাত থমকে গেল কফির মগে। «সব মেয়েকেই বলো?»

«না,» রনি মাথা নাড়ল — চোখ সরাল না। «শুধু তোমাকে। সত্যি বলছি।»

তার গাল জ্বলে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নিল — কিন্তু হাঁটুটা সরাল না। সরাতে ইচ্ছে করল না।

«সেদিন রাতে খাবার টেবিলে...» রনি বলল, «তুমি হাসছিলে। আমি দেখছিলাম।»

«দেখছিলে?» তার গলা কাঁপল।

«হ্যাঁ।» একটু থেমে। «তোমাকে দেখতে ভালো লাগে।»

সিনথিয়ার ফোনটা বাজল পকেটে — মেসেজ। সে বের করে দেখল — তানভীর: «কী করছিস?» তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। অপরাধবোধ — ঠান্ডা স্রোতের মতো। সে ফোনটা উল্টে টেবিলে রাখল। উত্তর দিল না।

«বয়ফ্রেন্ড?» রনির গলায় কিছু একটা — হালকা, কিন্তু নিচে চাপা।

«না!» সিনথিয়া তাড়াতাড়ি বলল — বেশি তাড়াতাড়ি। «মানে... বন্ধু।»

রনি হাসল — কিন্তু হাসিটা পৌঁছল না চোখে। «বন্ধু, হ্যাঁ?» টেবিলের নিচে তার হাঁটু একটু চাপ দিল তার হাঁটুতে। «তোমার মতো মেয়ের বন্ধু অনেক থাকবে।»

«তুমি...» সিনথিয়া বলতে গিয়ে থেমে গেল। কী বলবে? তুমি ফ্লার্ট করছ? তুমি আমাকে পছন্দ করো? তার ঠোঁট কাঁপল। «তুমি এরকম... সবার সাথে?»

«কীরকম?» রনি ঝুঁকল টেবিলের ওপর দিয়ে — তার মুখ এখন খুব কাছে। সিনথিয়া তার নিঃশ্বাসের গন্ধ পেল — কফি আর কিছু। «বলো। কীরকম?»

সিনথিয়া কিছু বলতে পারল না। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। রনির চোখ তার ঠোঁটে নামল এক সেকেন্ডের জন্য — তারপর আবার চোখে। এই এক সেকেন্ডে সিনথিয়ার সারা শরীরে আগুন ধরে গেল।

কফি শেষের দিকে রনি হঠাৎ ঝুঁকল টেবিলের ওপর দিয়ে। সিনথিয়া পিছিয়ে গেল একটু — চমকে। রনির বুড়ো আঙুল এসে ঠেকল তার ঠোঁটের কোণে — মুছে দিল কফির একটা ফোঁটা।

সময় থেমে গেল।

তার আঙুল তার ঠোঁটে — উষ্ণ, এক সেকেন্ডের জন্য। সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ। রনির চোখ তার ঠোঁটে — তারপর চোখে। সে হাতটা সরিয়ে নিল ধীরে — অনিচ্ছায়, যেন সরাতে কষ্ট হচ্ছে।

«সরি,» সে ফিসফিস করল। «ফোঁটা লেগেছিল।»

«ইটস ওকে,» সিনথিয়ার গলা কাঁপছে। তার ঠোঁটের কোণে এখনো তার আঙুলের উষ্ণতা লেগে আছে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরল — ঠিক সেই জায়গাটা, যেখানে সে ছুঁয়েছিল।

«খাওয়া শেষ?» রনি জিজ্ঞেস করল — গলা ভারী। «চলো, একটু হাঁটি।»

তারা হাঁটল — দোকানের সারি পেরিয়ে, এসকেলেটরে উঠে। ভিড়ের মধ্যে রনির হাত একবার তার পিঠে ঠেকল — ভিড় সরাতে, হয়তো। কিন্তু হাতটা এক সেকেন্ড বেশি রইল। সিনথিয়া কিছু বলল না। তার কাঁধের ওইটুকু উষ্ণতা সারা গায়ে ছড়িয়ে গেল। এসকেলেটর থেকে নামতে গিয়ে সে একটু টলে গেল — রনি তার হাতটা ধরে ফেলল। ধরেই রইল — নামার পরেও। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ছেড়ে দিল — ধীরে, অনিচ্ছায়। দুজনেই তাকাল অন্যদিকে। কিন্তু সিনথিয়ার হাতের তালুতে তখনো তার আঙুলের ছাপ লেগে রইল।

মলের ওপর তলাটা ফাঁকা — কয়েকটা বন্ধ দোকান, একটা সরু করিডোর। রনি হঠাৎ থেমে গেল। সিনথিয়াও থামল।

তার মুখের ভাব বদলে গেছে — সারাদিনের হালকা হাসিটা উধাও, চোখে গভীর কিছু। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। «কী হয়েছে?» — তার গলা শুকিয়ে গেছে।

«সিনথিয়া,» সে বলল। তার গলা বদলে গেছে — হালকা ভাবটা উধাও। «তোমাকে একটা কথা বলব।»

সিনথিয়ার হাসি মিলিয়ে গেল। «কী কথা?»

রনি তাকাল এদিক-ওদিক — কেউ নেই। তারপর তার চোখ এলো সিনথিয়ার চোখে — গভীর, স্থির।

«সেদিন রাতে... তোমাকে দেখেছি।»

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «কী... কী দেখেছ?» — ফিসফিস।

«দরজার ফাঁকে।» রনি এক পা এগিয়ে এলো। «তুমি... দেখছিলে। ভাই-ভাবীকে।»

পৃথিবীটা দুলে উঠল। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে কাঠ। «আমি... আমি...»

«আর তোমার হাত...» রনি থামল না — গলা নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ছুরির মতো। «তোমার হাত কামিজের নিচে ছিল। আমি দেখেছি, সিনথিয়া। সব দেখেছি।»

«না...» তার চোখে পানি এসে গেল। «প্লিজ... কাউকে বলবে না... প্লিজ... আপুকে না... দুলাভাইকে না... প্লিজ...» তার গলা ভেঙে যাচ্ছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। ধরা পড়ে গেছে। সব শেষ।

«শশশ...» রনি তার হাত ধরল — শক্ত করে না, নরম করে। «বলব না। কাউকে না। শপথ।»

সিনথিয়া তাকাল তার দিকে — চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। «সত্যি?»

«সত্যি।» রনি তার হাতটা ছাড়ল না। «আর... আরেকটা কথা আছে।»

«কী?»

রনি একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। চোখ নামিয়ে নিল এক মুহূর্তের জন্য — তারপর আবার তাকাল।

«আমিও দেখি।»

«কী?»

«মাঝে মাঝে।» তার গলা ফিসফিসের চেয়ে একটু বেশি। «ভাই-ভাবীকে। দরজার ফাঁক দিয়ে। যেমন তুমি দেখেছিলে... আমিও দেখি।»

সিনথিয়া স্তব্ধ। «তুমি...?»

«হ্যাঁ।» রনির ঠোঁটে তিক্ত হাসি। «আমি খারাপ মানুষ, তাই না? নিজের ভাই-ভাবীকে...» সে মাথা নাড়ল। «কিন্তু থামতে পারি না।»

একটা দীর্ঘ নীরবতা। করিডোরে শুধু এসির শব্দ।

«আমি তোমাকে জাজ করছি না, সিনথিয়া,» রনি বলল — এবার তার গলা নরম। «সেদিন তোমাকে ওইভাবে দেখে...» — সে থামল, চোখ সরিয়ে নিল। «আমার... ভালো লেগেছিল। তোমাকে দেখে। তোমার... ওই রূপটা দেখে।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর ঝড়। লজ্জা — প্রচণ্ড লজ্জা। কিন্তু তার নিচে — অন্য কিছু। একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ উত্তেজনা। কেউ তাকে দেখেছে — তার সবচেয়ে গোপন মুহূর্তে — আর সেই দেখাটা তাকে... ঘৃণা করেনি। চেয়েছে।

«তুমি... আমার দিকে...?» সে ফিসফিস করল।

«হ্যাঁ,» রনি স্বীকার করল — চোখে চোখ রেখে। «সেদিন রাত থেকে তোমাকে ভুলতে পারছি না। দরজার ফাঁকে ঝুঁকে থাকা তুমি... তোমার হাত...» তার গলা ভারী হয়ে এলো। «আমি জানি এটা ঠিক না। কিন্তু...»

সিনথিয়ার মাথার ভেতর ঝড়। সেদিন রাতের দৃশ্যটা ভেসে উঠল — দরজার ফাঁক, হলদে আলো, তার নিজের হাত কামিজের নিচে। আর পেছনে — অন্ধকারে — রনি দাঁড়িয়ে দেখছিল। তাকে দেখছিল। তার সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে লজ্জার মুহূর্তটা — কেউ দেখে ফেলেছে। তার পেটের ভেতর মোচড় দিল।

কিন্তু তারপর — অন্য ভাবনা। রনি ঘৃণা করেনি। রনি কাউকে বলেনি। দুই দিন ধরে এই গোপনটা একা বয়ে বেড়িয়েছে — আর আজ বলছে — তাকে দেখে তার ভালো লেগেছিল।

লজ্জার নিচে — সেই অদ্ভুত উত্তেজনাটা আবার মাথা তুলল। কেউ তাকে চেয়েছে — তার ওই রূপটাকে চেয়েছে — যে রূপটাকে সে নিজেও ভয় পায়, ভালোবাসে। তানভীর তাকে চায় মিম হিসেবে — ফোনের স্ক্রিনে। রনি তাকে দেখেছে — সত্যিকারের তাকে — দরজার ফাঁকে কাঁপতে থাকা তাকে — আর তাতেও চেয়েছে।

«তুমি...» তার গলা ফিসফিসের চেয়ে বেশি বেরোল না। «তুমি আমাকে... ওইভাবে দেখেও...»

«ভয় পেয়ো না,» সে বলল হঠাৎ — যেন তার মনের ভয়টা পড়তে পেরেছে। «আমি জোর করব না। তুমি না চাইলে কিছু হবে না। শুধু...» — তার হাতটা সিনথিয়ার হাতের ওপর রইল — উষ্ণ, ভারী। «শুধু জানতে চাই — তুমিও কি...?»

সিনথিয়া তাকাল তাদের হাতের দিকে — তার ছোট্ট হাতটা তার বড় হাতের নিচে। সে সরাল না। সরাতে পারল না। তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধড়ফড় করছে — মনে হচ্ছে রনি শুনতে পাচ্ছে।

«আমি জানি না,» সে ফিসফিস করল। সত্যি কথা। সে জানে না। ভয় করছে — কিন্তু ভয়ের নিচে আগুন।

রনির বুড়ো আঙুল তার হাতের পিঠে ঘষল — ধীরে, একবার। সিনথিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নেমে গেল।

«সিনেমা দেখবে?» রনি জিজ্ঞেস করল হঠাৎ — গলা আবার হালকা, কিন্তু চোখে সেই গভীরতা।

«কোনটা?» সিনথিয়ার গলা কাঁপছে।

রনি হাসল — সেই ধীর হাসি। «যেটায় অন্ধকার বেশি।»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। সে বুঝল — ঠিক বুঝল — এর মানে কী। তার বলা উচিত না। তানভীরের কথা মনে পড়ল — «তুই শুধু আমার হাতটা ধরে থাকবি।» আপুর কথা মনে পড়ল। মায়ের কথা। সব মনে পড়ল — আর সব ভেসে গেল রনির চোখের দিকে তাকিয়ে।

«আচ্ছা,» সে বলল।

টিকিট কাউন্টারে রনি দুটো টিকিট কাটল — পেছনের সারি। সিনথিয়ার হাত তখনো তার হাতে — কাউন্টার থেকে থিয়েটারের দরজা পর্যন্ত সে ছাড়ল না। অন্ধকার গলি দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছে — সে জানে না সে কী করতে যাচ্ছে। জানে শুধু — ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।

সিটে বসে রনি পপকর্নের প্যাকেটটা মাঝখানে রাখল। তাদের কাঁধ লেগে আছে — অন্ধকারে, ভিড়ের আড়ালে। সিনথিয়া পপকর্ন নিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে ফেলল রনির আঙুল — দুজনেই থমকে গেল। রনি প্যাকেটটা সরিয়ে রাখল একপাশে।

থিয়েটারের ভেতর অন্ধকার। ট্রেলার চলছে পর্দায় — আলো-ছায়ার ঝলকানি। তারা বসল একদম পেছনের সারিতে, কোণার দিকে — আশেপাশে কেউ নেই। সিনথিয়ার হাত কোলের ওপর — কাঁপছে।

আলোটা আরো কমে এলো। সিনেমা শুরু হলো।

অন্ধকারে — তার হাতের ওপর আরেকটা হাত এলো। রনির আঙুল তার আঙুল খুঁজে নিল — জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। সিনথিয়া সরাল না।

পর্দায় কী চলছে — সে দেখতে পেল না। শুধু টের পেল — অন্ধকারে তার পাশে বসা মানুষটার নিঃশ্বাস, তার হাতের উষ্ণতা, তার বুড়ো আঙুলের ধীর ঘষা তার তালুতে। তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।

রনি ঝুঁকল তার কানের কাছে — তার নিঃশ্বাস লাগল তার ঘাড়ে। ফিসফিস করে বলল —

«ভয় পাচ্ছ?»

সিনথিয়ার ঠোঁট কাঁপল। «না।»

একটু নীরবতা। তারপর — «মিথ্যে বলো না।»

আর অন্ধকার আরো গভীর হলো।

পর্দায় নায়ক-নায়িকা — সিনথিয়া দেখল না। তার সারা মনোযোগ — কানের কাছে রনির নিঃশ্বাসে, হাতে তার হাতের চাপে। রনির আঙুল এবার তার তালুতে ছোট্ট বৃত্ত আঁকল — ধীরে। সিনথিয়ার ঠোঁট থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এলো — সে তাড়াতাড়ি ঠোঁট চাপল।

রনি হাসল — অন্ধকারে তার হাসির শব্দ শুনতে পেল সে। তার ঠোঁট এবার তার কানের লতির কাছে — ছুঁল না, কিন্তু এত কাছে যে... «শশশ,» সে ফিসফিস করল। «কেউ শুনতে পাবে।»

সিনথিয়ার সারা শরীর কাঁপছে। ভয় — হ্যাঁ, ভয় করছে। কিন্তু ভয়ের চেয়ে বড় — চাওয়া। সে রনির হাতটা আরো শক্ত করে ধরল। অন্ধকারে — কেউ দেখছে না — সে তার মাথাটা একটু হেলিয়ে দিল রনির কাঁধের দিকে।

(চলবে...)
Like Reply


Messages In This Thread
RE: সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি - by midnightkalamkar - 26-09-2026, 06:22 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)