26-09-2026, 06:18 PM
আরেকটা দিন
ঘুম ভাঙল শরীরের ব্যথায়।
প্রথমে সিনথিয়া বুঝতে পারল না — ব্যথাটা ঠিক কোথায়। তারপর ধীরে ধীরে টের পেল — উরুতে, কোমরের গভীরে, এমন এক জায়গায় যার নাম সে জোরে উচ্চারণ করতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করেই শুয়ে রইল কিছুক্ষণ — নড়তে ইচ্ছে করছিল না, ভয়ও করছিল। আর চোখ বন্ধ করতেই — দুটো রাত একসাথে ভেসে উঠল।
গত পরশু রাত — দরজার ফাঁক। হলদে আলোর রেখা। আপুর কাতরানি — «আমাকে শেষ করে দাও!» দুলাভাইয়ের গলা — «বল, কার তুই?» আর তার নিজের হাত — কামিজের নিচে, নড়ছে, থামছে না।
গতকাল রাত — ফোনের স্ক্রিনের নীল আলো। তানভীরের লেখা — «থাম।» — আর তার ভিক্ষা — «প্লিজ... আর পারছি না...» — তারপর «এখন। ছাড়।» — আর সেই বিস্ফোরণ, বালিশে মুখ গুঁজে চাপা চিৎকার।
তার মনে পড়ল — শেষে তানভীরের গলা বদলে গেছিল। নরম হয়ে। «তুই ঠিক আছিস?» — «ভয় পাসনি তো?» — সে লিখেছিল — «না। ভয় পাব কেন? তুমি তো আমার।» — ওপাশে অনেকক্ষণ টাইপিং... তারপর — «ঘুমা এখন। কাল সকালে... আবার।»
আবার। এই শব্দটা তার বুকের ভেতর এখনো ঘুরছে। আবার মানে — আজ। আজ সকাল। আজ রাত।
সে উঠে বসল। শরীরটা ভারী লাগছে — কিন্তু এই ভারটা অচেনা নয় এখন। গতকাল সকালেও এমন লেগেছিল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটল — তারপর সে হাসিটা হাত দিয়ে ঢাকল, যেন কেউ দেখে ফেলবে। কেউ নেই — ঘর খালি। তবু লজ্জা।
«দুটো রাত।» — সে ফিসফিস করে বলল খালি ঘরে। «মাত্র দুটো রাতে আমি...» — বাক্যটা শেষ করতে পারল না। শেষ করার দরকারও নেই। সে জানে সে কী হয়ে গেছে।
সিনথিয়া চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল — তারপর হাসিটা মিলিয়ে গেল লজ্জায়। দুটো রাত। মাত্র দুটো রাতে সে কত কিছু দেখে ফেলেছে, কত কিছু করে ফেলেছে।
পাশে ফোনটা। তুলে নিল। তানভীরের শেষ মেসেজ — রাত তিনটেয় পাঠানো — «কাল সকালে... আবার।»
কাল সকাল। মানে — আজ।
তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। আজ সকাল। আজকের দিনটা। আজকের রাতটা। সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল — গেস্ট রুমের ছোট্ট আয়না। ভেতরের মেয়েটাকে দেখল। একই মুখ, একই চোখ — কিন্তু চোখের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। গত পরশুর মেয়েটা ছিল কৌতূহলী। গতকালের মেয়েটা... জানে। জানে শরীর কী চায়, জানে সমর্পণে কী সুখ।
«আমি কি খারাপ হয়ে যাচ্ছি?» — আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল মনে মনে।
আয়নার মেয়েটা হাসল — «নাকি আসল হচ্ছি?»
সে বিছানায় ফিরে এলো। বালিশের নিচে হাত ঢুকাল — তার গোপন ডায়েরি। ছোট্ট নোটবুকটা বের করল, কলম হাতে নিল।
«আজ সকালে ঘুম ভাঙল ব্যথা নিয়ে। ভালো ব্যথা? খারাপ ব্যথা? জানি না। শুধু জানি — আমি আর আগের আমি নেই।
গত পরশু রাতে আমি দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখেছি — আপু আর দুলাভাইকে। যা দেখেছি, তা লিখতে পারব না — হাত কাঁপে। শুধু এইটুকু লিখি — আপু সুখী ছিল। খুব সুখী। আর আমি — আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চোখ সরাতে পারছিলাম না। আমার হাত... আমার হাত আমার কথা শোনেনি।
আর গতকাল রাতে — তানভীর। ওর কথাগুলো এখনো কানে বাজে। "থাম।" — ওই একটা শব্দে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠেছিল। আমি ওর কথায়... শেষ হয়ে গেছিলাম।
আমি কি খারাপ? আপু তো খারাপ না। আপু যদি এটা চাইতে পারে — তাহলে আমি কেন পারব না?»
সে ডায়েরি বন্ধ করে বালিশের নিচে রেখে দিল। বুকটা হালকা লাগল — যেন কাউকে বলে ফেলেছে, নিজেকেই।
সে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাইরে এলো। রান্নাঘর থেকে খুন্তির শব্দ, ভাজির গন্ধ। আপু রান্না করছে। ডাইনিং টেবিলে দুলাভাই — ফোনে কী যেন দেখছেন, চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছেন।
আর — রনি।
সিনথিয়া থমকে গেল দরজায়। রনি — দুলাভাইয়ের ছোট ভাই — টেবিলে বসে, চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম। দুদিন আগে রাতের খাবারে দুলাভাই বলেছিলেন — পঁচিশ বছর, মোবাইলের দোকানে কাজ করে, ছোট ঘরটায় থাকে। সিনথিয়া তখন নামটা মনেও রাখেনি। এখন — এই সকালে — প্রথমবার ভালো করে দেখল। লম্বা, রোগা, গালে হালকা দাড়ির ছায়া।
রনি তাকাল। «শালী, গুড মর্নিং।» — হাসল, অলস, বন্ধুসুলভ।
«গুড মর্নিং, ভাইয়া।» — সিনথিয়া বসল।
«রাতে ঘুম হয়েছে?» — রনি জিজ্ঞেস করল, চায়ে চুমুক দিয়ে।
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হ্যাঁ... হয়েছে।»
«মনে হলো না।» — রনি হাসল। «চোখ লাল। রাত জেগে ফোন ঘাঁটো নাকি?»
«না! মানে... একটু।» — সিনথিয়া তোতলাল।
রনি আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল — সেই ধীর হাসিটা ঠোঁটে। সিনথিয়ার মনে হলো — এই ছেলে কি কিছু জানে? না, কী জানবে? সে তো কিছু দেখেনি। দেখার কথাও না। তবু — বুকের ভেতর কেমন কাঁপুনি।
«রনি।» — দুলাভাইয়ের গলা। «শালীকে এভাবে তাকিয়ে দেখছিস কেন? প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?»
সবাই হেসে উঠল। রনিও হাসল — «ভাইয়া, তোমার শালী তো দেখছি লাজুক।»
সিনথিয়া প্লেটে মুখ গুঁজল। কান জ্বলছে।
কিন্তু রনির চোখ — তার ওপর এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। একটা অদ্ভুত, ধীর হাসি ঠোঁটে। সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিল। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি — যেন কেউ তার ভেতরটা দেখে ফেলেছে, যা সে লুকিয়ে রেখেছে। সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, কী ভাবছি।
নাস্তা এলো — পরোটা, ডিম ভাজি, চা। সিনথিয়া খেতে বসল — আর তখনই শুরু হলো যন্ত্রণাটা।
কারণ সে তাকাতে পারছিল না। স্বাভাবিকভাবে তাকাতে পারছিল না।
দুলাভাই চায়ের কাপ তুললেন — সেই হাত। সেই হাত যা গত পরশু রাতে আপুর চুলের মুঠি ধরেছিল। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিল — আর চোখ পড়ল আপুর গলায়। কলারবোনের ঠিক ওপরে — একটা হালকা লাল দাগ। ছোট্ট, গোল।
সিনথিয়া জানে ওটা কী। এখন জানে।
তার কান গরম হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি প্লেটের দিকে তাকাল।
«কী রে, ঘুম হয়নি?» — আপুর গলা। «চোখ লাল।»
«না... মানে... হয়েছে।» — সিনথিয়া তোতলাল।
দুলাভাই ফোন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, «রাত জেগে পড়াশোনা, নাকি?»
সিনথিয়ার গলায় পরোটা আটকে গেল। কাশতে কাশতে পানি খেল। রনি হেসে ফেলল। আপু হাসল। দুলাভাই এবার তাকালেন — চোখে মজা — «আরে আস্তে খা, শালী। কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।»
«দুলাভাই!» — সিনথিয়া কৃত্রিম রাগ দেখাল।
«আচ্ছা আচ্ছা।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «তবে শোন — আজ রনি তোকে শপিংয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা ইচ্ছে কিনবি। শালীর আবদার বলে কথা।»
«আমার কিছু লাগবে না, দুলাভাই।»
«লাগবে না মানে?» — দুলাভাই চোখ বড় করলেন। «মেয়েদের শপিং লাগে না — এটা আমি বিশ্বাস করি না।»
রনি হাসল — «ভাইয়া ঠিক বলেছে। চলো, শালী। আজ তোমাকে ঘুরিয়ে আনি।»
«তোমাকে» — সিনথিয়া লক্ষ্য করল, রনি তাকে «তুমি» বলছে। দুলাভাই «তুই» বলে। এই «তুমি»টা কেমন... দূরের, আবার কাছের। তার কান গরম হয়ে উঠল।
সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চোখ — বিশ্বাসঘাতক চোখ — আবার চলে গেল আপুর গলার সেই দাগে।
আর ঠিক তখনই আপু তাকাল। সরাসরি।
দুজনের চোখ আটকে গেল। আপু দেখল — সিনথিয়া কোথায় তাকিয়ে আছে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর আপুর ঠোঁটে ফুটে উঠল একটা ধীর, গভীর হাসি — জানা হাসি, রাগ নেই, তাড়া নেই। যেন বলছে — আমি জানি তুই কী দেখছিস। আর তুই জানিস আমি জানি।
সিনথিয়ার পেটের ভেতর মোচড় দিল। সে চোখ নামিয়ে নিল। কান দুটো জ্বলছে।
বাকি নাস্তাটা সে প্রায় না তাকিয়েই খেল। প্লেটের দিকে চোখ, কিন্তু মন অন্য কোথাও। দুলাভাইয়ের গলা কানে আসছে — অফিসের গল্প, হাসি। আপুর গলা — নরম, স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। যেন গত পরশু রাতে কিছুই ঘটেনি।
কিন্তু সিনথিয়া জানে। তার শরীর জানে। প্রতিটা হাসির আড়ালে সে শুনতে পাচ্ছে সেই রাতের কাতরানি। প্রতিটা স্বাভাবিক কথার নিচে সে দেখতে পাচ্ছে সেই দৃশ্য।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর — সে ঈর্ষা করছে। হ্যাঁ — আপুকে। আপুর ওই নির্লজ্জ, পরিপূর্ণ সুখকে। সে চায় — সেও চায় — কেউ তাকে ওইভাবে চাক। ওইভাবে... ভালোবাসুক।
চা শেষ করে সে উঠল। «আমি প্লেটগুলো নিয়ে যাচ্ছি।»
নাস্তা শেষে আপু রান্নাঘরে টিফিন গোছাচ্ছিল। সিনথিয়া প্লেট নিয়ে ঢুকল — সাহায্যের ভান, আসলে পালানোর জায়গা খুঁজছিল।
আপু তাকাল না। বক্সে ভাত তুলতে তুলতে বলল, «শোন।»
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হুঁ?»
আপু এবার তাকাল — নরম চোখে। «লজ্জা পাস না।»
রক্ত সিনথিয়ার মুখে উঠে এলো। «আপু, আমি—»
«তোর বয়সে কৌতূহল থাকবেই।» — আপু হাসল, মায়ের মতো, বোনের মতো। «আমি জানি — ওই রাতে তুই জেগে ছিলি।»
সিনথিয়ার হাত থেকে প্লেটটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে সিঙ্ক ধরে দাঁড়াল। «আপু... আমি... আমি ইচ্ছে করে—»
«শশশ।» — আপু তার হাত চেপে ধরল। «শুনেছিস কিছু? দেখেছিস?»
সিনথিয়া মাথা নাড়তে পারল না, না-ও বলতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল — জ্বলন্ত গাল, নত চোখ।
আপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল — কিন্তু হাসিটা রইল। «স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছু হয়, পাগলি। সেটা খারাপ না। ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না — তোকে তো বলেছিলাম, অনেক গভীর কিছু।»
সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «আপু... তুমি রাগ করোনি?»
«রাগ?» — আপু হেসে ফেলল। «তোর ওপর রাগ করে কী হবে? তুই তো আমার ছোট বোন।» — তারপর চোখ টিপল — «তবে হ্যাঁ — যা দেখেছিস, যা শুনেছিস — সেটা আমাদের মধ্যে থাক। বুঝলি?»
সিনথিয়া জোরে জোরে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর একটা পাথর নেমে গেল — হালকা লাগল, অদ্ভুতভাবে।
আপু একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল, «জানিস, আমারও একসময় ভয় করত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম... আমি ভাবতাম — এটা কি ঠিক? ভালো মেয়েরা কি এসব চায়?» — সে হাসল। «তারপর বুঝলাম — চাওয়াটাই স্বাভাবিক। লজ্জার কিছু নেই। শুধু... সঠিক মানুষটার সাথে।»
সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «দুলাভাই... ভালো?»
«খুব।» — আপুর চোখে একটা নরম আলো। «ও আমাকে বোঝে। আমার সবটুকু জানে — আর ভালোবাসে।» — তারপর সিনথিয়ার গাল টিপে দিল — «তুই যখন বড় হবি, বুঝবি। তাড়াহুড়ো করিস না, পাগলি।»
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। «আপু... একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»
«কর।»
«তুমি... প্রথমে ভয় পাওনি?» — তার গলা কাঁপছিল। «মানে... ওইসব... কথা...»
আপু হাসল — গভীর, জানা হাসি। «পেয়েছিলাম। খুব।» — সে সিনথিয়ার হাত ধরল। «কিন্তু ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসাথে থাকতে পারে, জানিস? ভয় পেলেই যে খারাপ, তা না।»
সিনথিয়া তাকাল — আপুর চোখে কোনো লজ্জা নেই, কোনো ভান নেই। শুধু সত্যি।
«মনে রাখবি —» আপু বলল, «— যে তোকে ভয় দেখায়, সে ভালোবাসে না। যে তোর ভয়টা বোঝে — সে-ই আসল।»
আপু টিফিন বক্স বন্ধ করল। «আর শোন — আজ আরেকদিন থেকে যা।»
«আপু?»
«কাল সকালে যাস। তোর মাকে আমি ফোন করে দিচ্ছি — বলব আমার শরীরটা ভালো না, তুই থাকলে ভালো লাগবে।» — আপু চোখ টিপল। «কী, থাকবি তো?»
সিনথিয়ার বুকের ভেতর আনন্দে লাফিয়ে উঠল — এত জোরে যে সে ভয় পেল আপু শুনতে পাবে। আরেকটা দিন। মানে — আরেকটা রাত। মানে — তানভীর।
«থাকব!» — বলে ফেলল এত তাড়াতাড়ি, এত উৎসাহে — যে আপু হেসে ফেলল।
«এত খুশি?» — আপু ভ্রু তুলল। «আমাকে এত ভালোবাসিস?»
«হ্যাঁ!» — সিনথিয়া আপুকে জড়িয়ে ধরল — লজ্জা ঢাকার জন্য, আনন্দ ঢাকার জন্য। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার, সাবানের — আর সেই দাগটা, কলারবোনের ওপরে, এখন খুব কাছে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল।
আপু ফোন বের করল। «দাঁড়া, তোর মাকে ফোন করে দিই।» — কানে ধরে — «হ্যালো, খালাম্মা... হ্যাঁ, আমি শিলা... শোনো না, সিনথিয়াকে আজ আরেকদিন রাখছি... না না, ওর কোনো দোষ না, আমারই শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, ও থাকলে ভালো লাগবে... হ্যাঁ হ্যাঁ, কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব... আচ্ছা, রাখছি।»
সিনথিয়া দম বন্ধ করে শুনছিল। আপু ফোন রেখে চোখ টিপল — «ডান।»
সিনথিয়ার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি — অপরাধবোধ আর উত্তেজনা একসাথে। মা জানে না — মা কোনোদিন জানবে না — এই «আরেকদিন» মানে আসলে কী। মানে — তানভীরের সাথে আরেকটা রাত।
ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে সিনথিয়া সোফায় বসল। দুলাভাই জুতো পরছেন, আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে। রনি তখনো টেবিলে — চায়ে চুমুক দিচ্ছে, ফোন ঘাঁটছে।
টেবিলের নিচে — সিনথিয়ার ফোন ভাইব্রেট করল।
তানভীর: «ঘুম ভাঙল মহারানির?»
সে ঠোঁট কামড়ে হাসল। টাইপ করল — «ভাঙল। তুই?»
«আমি তো ঘুমাইনি। তোর কথা ভেবে ভেবে রাত পার।»
«মিথ্যুক।»
«সত্যি। কাল রাতে তুই অন্যরকম ছিলি, মিম।»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। টেবিলের ওপর আপু ব্যাগ নিচ্ছে, দুলাভাই দরজার দিকে যাচ্ছে — আর টেবিলের নিচে তার আঙুল চলছে।
«কীরকম?» — লিখল সে।
«আমার। পুরোপুরি আমার।»
সে ফোনটা একটু নামিয়ে রাখল — বুক ধড়ফড় করছে। তারপর আবার তুলল।
«আজ রাতেও আমি আছি। দশটার পর। একা থাকবি।»
সিনথিয়া টাইপ করল — «আজও আপুর বাসায় থাকছি। কাল বাড়ি যাব।»
«তাহলে আজ রাতেও...»
«হুম।»
«লজ্জা পাচ্ছিস?»
সে এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর লিখল — «তোর সাথে না।»
ওপাশে — টাইপিং... টাইপিং... তারপর এলো — «এই কথাটা মনে রাখিস। আজ রাতে মনে করিয়ে দেব।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকের কাছে নামিয়ে রাখল। বুক ধড়ফড় করছে। টেবিলের ওপর — আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে, দুলাভাই জুতোর ফিতে বাঁধছে — আর টেবিলের নিচে — তার গোপন দুনিয়া।
ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল।
«দেবরটা দেখতে কেমন?»
সিনথিয়া চমকে গেল। «কেন?»
«এমনি। আমার মিমকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে — জানতে হবে না?»
সে হাসল — ঠোঁট কামড়ে। «সাধারণ।»
«মিথ্যা বলছিস।»
«তুই কী করে জানলি?»
«তোর "সাধারণ" মানেই অসাধারণ। আমি তোকে চিনি।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল — এই ছেলে তাকে চেনে। সত্যিই চেনে। মিমকে চেনে।
«শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে যা। মজা কর। কিন্তু মনে রাখবি — তুই কার?»
«তোর।» — সে লিখল, আঙুল কাঁপছে। «শুধু তোর।»
«ভালো মেয়ে। আজ রাতে পুরস্কার পাবি।»
সিনথিয়ার আঙুল থমকে গেল স্ক্রিনের ওপর। «পুরস্কার?»
«হুম। আজ রাতে দেখবি।»
«এখন বল না...»
«না। অপেক্ষা কর। অপেক্ষায় মজা বেশি — মনে আছে তো?»
তার গাল জ্বলে উঠল। মনে আছে। খুব মনে আছে — গতকাল রাতে «থাম।» বলে তানভীর তাকে কতক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছিল। আর সেই অপেক্ষার পর... ওহ।
«তুই খুব খারাপ।» — লিখল সে।
«তোর জন্য। শুধু তোর জন্য।»
সিনথিয়া ফোনটা রেখে দিল — ঠিক তখনই দুলাভাইয়ের গলা — «শালী!»
সে চমকে তাকাল। দুলাভাই দরজায় দাঁড়িয়ে — জুতো পরা, ব্যাগ কাঁধে। «তোর আপু বলল আজ থাকছিস। ভালো করেছিস।» — হাসলেন সেই চেনা, উষ্ণ হাসি। «আর শোন —» — তিনি রনির দিকে তাকালেন — «তুই আজ দোকানে যাস না।»
রনি ফোন থেকে চোখ তুলল। «কেন?»
«শালীকে নিয়ে শপিংয়ে যা। ওর কিছু পছন্দ করে কিনে দে — মেয়ে মানুষ, ঘুরতে ভালোবাসে।» — দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «যা ইচ্ছে কিনবি। বিল আমি দেব।»
«আরে না না, দুলাভাই—» — সিনথিয়া বলতে গেল।
«চুপ।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «দুলাভাইয়ের আদর নিতে হয়।»
রনি কাঁধ ঝাঁকাল। «আচ্ছা, ভাইয়া।»
আর তারপর — রনি তাকাল সিনথিয়ার দিকে। সরাসরি। তার চোখ — এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। ঠোঁটে সেই অদ্ভুত, ধীর হাসি — সকালের নাস্তার টেবিলের মতো। যেন সে কিছু জানে। যেন সে কিছু দেখেছে।
সিনথিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।
«যা, রেডি হয়ে নে।» — আপু দরজা থেকে বলল। «আর রনি — ওকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাস।»
দরজা বন্ধ হলো। আপু আর দুলাভাই অফিসে। ফ্ল্যাটে রইল — সিনথিয়া আর রনি।
গেস্ট রুমে এসে সিনথিয়া দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল।
কী পরবে? হাত বাড়িয়ে দিল আলমারিতে রাখা ব্যাগের দিকে। আঙুল থমকে গেল — নীল কামিজটার ওপর। সেই কামিজ — যেটা পরে সে তানভীরকে কাঁধের ছবি পাঠিয়েছিল। যেটা পরে সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে কামিজটা তুলে নিল। গায়ে দিল। আয়নায় দেখল — নিজেকে।
নীল কামিজ। এই কামিজ পরেই সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল — মুখ ছাড়া, শুধু কাঁধ। তানভীর লিখেছিল — «তুই আজ আমাকে মেরে ফেলবি, মিম।» সেই রাতেই সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়েছিল — এই কামিজ পরেই। কামিজটা যেন সাক্ষী — সবকিছুর।
সে ওড়নাটা ভালো করে গোছাল। চুলে চিরুনি বুলাল। আয়নার মেয়েটাকে দেখল — গাল লাল, চোখ জ্বলজ্বলে।
বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কেন? সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল। শপিং তো — সাধারণ শপিং। দুলাভাইয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে। কিন্তু হাতুড়িটা থামছে না।
কারণ — রনির সেই হাসি। সেই এক মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে থাকা। যেন সে কিছু জানে।
«ধুর।» — সে নিজেকে বকল আয়নায়। «কী ভাবছি আমি? ও তো শুধু...» — শুধু কী? সে জানে না। শুধু এইটুকু জানে — রনির চোখে তাকালে তার অস্বস্তি হয়। এমন অস্বস্তি — যেন কেউ তার গোপন ডায়েরি পড়ে ফেলেছে।
ফোনটা বাজল। তানভীর।
«শপিং? কার সাথে?»
সিনথিয়া থমকে গেল। কী লিখবে? সত্যি? «দুলাভাইয়ের ভাইয়ের সাথে» — এতে দোষ কী? তানভীর তো জানে না এরা কারা, কোথায়।
«আপুর দেবরের সাথে।» — লিখল সে। «দুলাভাই পাঠাচ্ছে।»
«দেবর? কত বড়?»
«বড়। পঁচিশ।»
ওপাশে একটু চুপ। টাইপিং... তারপর — «সাবধানে থাকবি।»
সিনথিয়া হাসল। «ঈর্ষা হচ্ছে?»
«হচ্ছে। তুই আমার। ভুলে যাস না।»
«ভুলব না।» — সে লিখল। তারপর আরেকটা — «আমার জন্য কী কিনবি জিজ্ঞেস করছিলি না? তোর জন্য কিছু কিনব না।»
«মিথ্যুক। আমার মিম মিথ্যুক।»
«যা ভাগ।»
«আচ্ছা শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে গিয়ে আমার জন্য একটা কিছু কিনবি।»
«বললাম তো — কিনব না।»
«কিনবি। ছোট্ট কিছু। যেটা দেখলে তোর কথা মনে পড়বে।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «কীরকম?»
«তুই জানিস কীরকম।»
সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল এক মুহূর্ত। তারপর ব্যাগে রাখল। আয়নায় শেষবার দেখল নিজেকে — চুল ঠিক করল, ওড়না গোছাল। বুকের হাতুড়িটা এখনো থামেনি।
«শান্ত হ।» — সে আয়নার মেয়েটাকে বলল। «শুধু শপিং। শুধু... শপিং।»
আয়নার মেয়েটা বিশ্বাস করল না। সিনথিয়াও করল না।
বাইরে এলো। রনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে — চাবি হাতে, ফোন পকেটে। তাকে দেখে তাকাল। আবার — সেই দৃষ্টি। মাথা থেকে পা পর্যন্ত — একবার। ধীরে। তারপর ঠোঁটে হাসি।
«চলো, সিনথিয়া।»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই প্রথম রনি তার নাম ধরে ডাকল। এত... কাছ থেকে।
সে পা বাড়াল। রনি দরজা খুলে ধরল। সিঁড়ির দিকে এগোল তারা — পাশাপাশি। পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ — ক্লিক।
সিঁড়ির মুখে রনি থমকে দাঁড়াল। «শোনো।»
সিনথিয়া তাকাল। «হুঁ?»
রনি একটু ঝুঁকল — গলা নামিয়ে বলল, «তুমি রাতে... ভালো ঘুমাও তো?»
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «মানে?»
রনি হাসল — সেই ধীর, অদ্ভুত হাসি। «মানে — নতুন জায়গায় অনেকের ঘুম হয় না। তাই জিজ্ঞেস করলাম।» — সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। «চলো।»
সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। বুকের ভেতর হাতুড়ি। «তুমি রাতে ভালো ঘুমাও তো?» — এটা কি শুধুই একটা প্রশ্ন? নাকি... অন্য কিছু?
সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, বেশি ভাবছি। পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে।
নিচে রনি দাঁড়িয়ে — তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে, তার দিকেই। «আসো।» — হাত বাড়িয়ে দিল, যেন সিঁড়িটা পিচ্ছিল।
সিনথিয়া তার হাত ধরল না — রেলিং ধরল। রনির হাতটা এক মুহূর্ত বাতাসে রইল — তারপর নেমে গেল। তার ঠোঁটে সেই হাসি।
«সাবধানে।» — বলল রনি।
দিনের আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সিনথিয়া টের পেল — তার হাত কাঁপছে। কেন কাঁপছে, সে জানে না। শুধু জানে — আজকের দিনটা সাধারণ হবে না।
(চলবে...)
ঘুম ভাঙল শরীরের ব্যথায়।
প্রথমে সিনথিয়া বুঝতে পারল না — ব্যথাটা ঠিক কোথায়। তারপর ধীরে ধীরে টের পেল — উরুতে, কোমরের গভীরে, এমন এক জায়গায় যার নাম সে জোরে উচ্চারণ করতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করেই শুয়ে রইল কিছুক্ষণ — নড়তে ইচ্ছে করছিল না, ভয়ও করছিল। আর চোখ বন্ধ করতেই — দুটো রাত একসাথে ভেসে উঠল।
গত পরশু রাত — দরজার ফাঁক। হলদে আলোর রেখা। আপুর কাতরানি — «আমাকে শেষ করে দাও!» দুলাভাইয়ের গলা — «বল, কার তুই?» আর তার নিজের হাত — কামিজের নিচে, নড়ছে, থামছে না।
গতকাল রাত — ফোনের স্ক্রিনের নীল আলো। তানভীরের লেখা — «থাম।» — আর তার ভিক্ষা — «প্লিজ... আর পারছি না...» — তারপর «এখন। ছাড়।» — আর সেই বিস্ফোরণ, বালিশে মুখ গুঁজে চাপা চিৎকার।
তার মনে পড়ল — শেষে তানভীরের গলা বদলে গেছিল। নরম হয়ে। «তুই ঠিক আছিস?» — «ভয় পাসনি তো?» — সে লিখেছিল — «না। ভয় পাব কেন? তুমি তো আমার।» — ওপাশে অনেকক্ষণ টাইপিং... তারপর — «ঘুমা এখন। কাল সকালে... আবার।»
আবার। এই শব্দটা তার বুকের ভেতর এখনো ঘুরছে। আবার মানে — আজ। আজ সকাল। আজ রাত।
সে উঠে বসল। শরীরটা ভারী লাগছে — কিন্তু এই ভারটা অচেনা নয় এখন। গতকাল সকালেও এমন লেগেছিল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটল — তারপর সে হাসিটা হাত দিয়ে ঢাকল, যেন কেউ দেখে ফেলবে। কেউ নেই — ঘর খালি। তবু লজ্জা।
«দুটো রাত।» — সে ফিসফিস করে বলল খালি ঘরে। «মাত্র দুটো রাতে আমি...» — বাক্যটা শেষ করতে পারল না। শেষ করার দরকারও নেই। সে জানে সে কী হয়ে গেছে।
সিনথিয়া চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল — তারপর হাসিটা মিলিয়ে গেল লজ্জায়। দুটো রাত। মাত্র দুটো রাতে সে কত কিছু দেখে ফেলেছে, কত কিছু করে ফেলেছে।
পাশে ফোনটা। তুলে নিল। তানভীরের শেষ মেসেজ — রাত তিনটেয় পাঠানো — «কাল সকালে... আবার।»
কাল সকাল। মানে — আজ।
তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। আজ সকাল। আজকের দিনটা। আজকের রাতটা। সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল — গেস্ট রুমের ছোট্ট আয়না। ভেতরের মেয়েটাকে দেখল। একই মুখ, একই চোখ — কিন্তু চোখের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। গত পরশুর মেয়েটা ছিল কৌতূহলী। গতকালের মেয়েটা... জানে। জানে শরীর কী চায়, জানে সমর্পণে কী সুখ।
«আমি কি খারাপ হয়ে যাচ্ছি?» — আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল মনে মনে।
আয়নার মেয়েটা হাসল — «নাকি আসল হচ্ছি?»
সে বিছানায় ফিরে এলো। বালিশের নিচে হাত ঢুকাল — তার গোপন ডায়েরি। ছোট্ট নোটবুকটা বের করল, কলম হাতে নিল।
«আজ সকালে ঘুম ভাঙল ব্যথা নিয়ে। ভালো ব্যথা? খারাপ ব্যথা? জানি না। শুধু জানি — আমি আর আগের আমি নেই।
গত পরশু রাতে আমি দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখেছি — আপু আর দুলাভাইকে। যা দেখেছি, তা লিখতে পারব না — হাত কাঁপে। শুধু এইটুকু লিখি — আপু সুখী ছিল। খুব সুখী। আর আমি — আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চোখ সরাতে পারছিলাম না। আমার হাত... আমার হাত আমার কথা শোনেনি।
আর গতকাল রাতে — তানভীর। ওর কথাগুলো এখনো কানে বাজে। "থাম।" — ওই একটা শব্দে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠেছিল। আমি ওর কথায়... শেষ হয়ে গেছিলাম।
আমি কি খারাপ? আপু তো খারাপ না। আপু যদি এটা চাইতে পারে — তাহলে আমি কেন পারব না?»
সে ডায়েরি বন্ধ করে বালিশের নিচে রেখে দিল। বুকটা হালকা লাগল — যেন কাউকে বলে ফেলেছে, নিজেকেই।
সে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাইরে এলো। রান্নাঘর থেকে খুন্তির শব্দ, ভাজির গন্ধ। আপু রান্না করছে। ডাইনিং টেবিলে দুলাভাই — ফোনে কী যেন দেখছেন, চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছেন।
আর — রনি।
সিনথিয়া থমকে গেল দরজায়। রনি — দুলাভাইয়ের ছোট ভাই — টেবিলে বসে, চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম। দুদিন আগে রাতের খাবারে দুলাভাই বলেছিলেন — পঁচিশ বছর, মোবাইলের দোকানে কাজ করে, ছোট ঘরটায় থাকে। সিনথিয়া তখন নামটা মনেও রাখেনি। এখন — এই সকালে — প্রথমবার ভালো করে দেখল। লম্বা, রোগা, গালে হালকা দাড়ির ছায়া।
রনি তাকাল। «শালী, গুড মর্নিং।» — হাসল, অলস, বন্ধুসুলভ।
«গুড মর্নিং, ভাইয়া।» — সিনথিয়া বসল।
«রাতে ঘুম হয়েছে?» — রনি জিজ্ঞেস করল, চায়ে চুমুক দিয়ে।
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হ্যাঁ... হয়েছে।»
«মনে হলো না।» — রনি হাসল। «চোখ লাল। রাত জেগে ফোন ঘাঁটো নাকি?»
«না! মানে... একটু।» — সিনথিয়া তোতলাল।
রনি আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল — সেই ধীর হাসিটা ঠোঁটে। সিনথিয়ার মনে হলো — এই ছেলে কি কিছু জানে? না, কী জানবে? সে তো কিছু দেখেনি। দেখার কথাও না। তবু — বুকের ভেতর কেমন কাঁপুনি।
«রনি।» — দুলাভাইয়ের গলা। «শালীকে এভাবে তাকিয়ে দেখছিস কেন? প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?»
সবাই হেসে উঠল। রনিও হাসল — «ভাইয়া, তোমার শালী তো দেখছি লাজুক।»
সিনথিয়া প্লেটে মুখ গুঁজল। কান জ্বলছে।
কিন্তু রনির চোখ — তার ওপর এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। একটা অদ্ভুত, ধীর হাসি ঠোঁটে। সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিল। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি — যেন কেউ তার ভেতরটা দেখে ফেলেছে, যা সে লুকিয়ে রেখেছে। সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, কী ভাবছি।
নাস্তা এলো — পরোটা, ডিম ভাজি, চা। সিনথিয়া খেতে বসল — আর তখনই শুরু হলো যন্ত্রণাটা।
কারণ সে তাকাতে পারছিল না। স্বাভাবিকভাবে তাকাতে পারছিল না।
দুলাভাই চায়ের কাপ তুললেন — সেই হাত। সেই হাত যা গত পরশু রাতে আপুর চুলের মুঠি ধরেছিল। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিল — আর চোখ পড়ল আপুর গলায়। কলারবোনের ঠিক ওপরে — একটা হালকা লাল দাগ। ছোট্ট, গোল।
সিনথিয়া জানে ওটা কী। এখন জানে।
তার কান গরম হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি প্লেটের দিকে তাকাল।
«কী রে, ঘুম হয়নি?» — আপুর গলা। «চোখ লাল।»
«না... মানে... হয়েছে।» — সিনথিয়া তোতলাল।
দুলাভাই ফোন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, «রাত জেগে পড়াশোনা, নাকি?»
সিনথিয়ার গলায় পরোটা আটকে গেল। কাশতে কাশতে পানি খেল। রনি হেসে ফেলল। আপু হাসল। দুলাভাই এবার তাকালেন — চোখে মজা — «আরে আস্তে খা, শালী। কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।»
«দুলাভাই!» — সিনথিয়া কৃত্রিম রাগ দেখাল।
«আচ্ছা আচ্ছা।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «তবে শোন — আজ রনি তোকে শপিংয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা ইচ্ছে কিনবি। শালীর আবদার বলে কথা।»
«আমার কিছু লাগবে না, দুলাভাই।»
«লাগবে না মানে?» — দুলাভাই চোখ বড় করলেন। «মেয়েদের শপিং লাগে না — এটা আমি বিশ্বাস করি না।»
রনি হাসল — «ভাইয়া ঠিক বলেছে। চলো, শালী। আজ তোমাকে ঘুরিয়ে আনি।»
«তোমাকে» — সিনথিয়া লক্ষ্য করল, রনি তাকে «তুমি» বলছে। দুলাভাই «তুই» বলে। এই «তুমি»টা কেমন... দূরের, আবার কাছের। তার কান গরম হয়ে উঠল।
সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চোখ — বিশ্বাসঘাতক চোখ — আবার চলে গেল আপুর গলার সেই দাগে।
আর ঠিক তখনই আপু তাকাল। সরাসরি।
দুজনের চোখ আটকে গেল। আপু দেখল — সিনথিয়া কোথায় তাকিয়ে আছে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর আপুর ঠোঁটে ফুটে উঠল একটা ধীর, গভীর হাসি — জানা হাসি, রাগ নেই, তাড়া নেই। যেন বলছে — আমি জানি তুই কী দেখছিস। আর তুই জানিস আমি জানি।
সিনথিয়ার পেটের ভেতর মোচড় দিল। সে চোখ নামিয়ে নিল। কান দুটো জ্বলছে।
বাকি নাস্তাটা সে প্রায় না তাকিয়েই খেল। প্লেটের দিকে চোখ, কিন্তু মন অন্য কোথাও। দুলাভাইয়ের গলা কানে আসছে — অফিসের গল্প, হাসি। আপুর গলা — নরম, স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। যেন গত পরশু রাতে কিছুই ঘটেনি।
কিন্তু সিনথিয়া জানে। তার শরীর জানে। প্রতিটা হাসির আড়ালে সে শুনতে পাচ্ছে সেই রাতের কাতরানি। প্রতিটা স্বাভাবিক কথার নিচে সে দেখতে পাচ্ছে সেই দৃশ্য।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর — সে ঈর্ষা করছে। হ্যাঁ — আপুকে। আপুর ওই নির্লজ্জ, পরিপূর্ণ সুখকে। সে চায় — সেও চায় — কেউ তাকে ওইভাবে চাক। ওইভাবে... ভালোবাসুক।
চা শেষ করে সে উঠল। «আমি প্লেটগুলো নিয়ে যাচ্ছি।»
নাস্তা শেষে আপু রান্নাঘরে টিফিন গোছাচ্ছিল। সিনথিয়া প্লেট নিয়ে ঢুকল — সাহায্যের ভান, আসলে পালানোর জায়গা খুঁজছিল।
আপু তাকাল না। বক্সে ভাত তুলতে তুলতে বলল, «শোন।»
সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হুঁ?»
আপু এবার তাকাল — নরম চোখে। «লজ্জা পাস না।»
রক্ত সিনথিয়ার মুখে উঠে এলো। «আপু, আমি—»
«তোর বয়সে কৌতূহল থাকবেই।» — আপু হাসল, মায়ের মতো, বোনের মতো। «আমি জানি — ওই রাতে তুই জেগে ছিলি।»
সিনথিয়ার হাত থেকে প্লেটটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে সিঙ্ক ধরে দাঁড়াল। «আপু... আমি... আমি ইচ্ছে করে—»
«শশশ।» — আপু তার হাত চেপে ধরল। «শুনেছিস কিছু? দেখেছিস?»
সিনথিয়া মাথা নাড়তে পারল না, না-ও বলতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল — জ্বলন্ত গাল, নত চোখ।
আপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল — কিন্তু হাসিটা রইল। «স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছু হয়, পাগলি। সেটা খারাপ না। ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না — তোকে তো বলেছিলাম, অনেক গভীর কিছু।»
সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «আপু... তুমি রাগ করোনি?»
«রাগ?» — আপু হেসে ফেলল। «তোর ওপর রাগ করে কী হবে? তুই তো আমার ছোট বোন।» — তারপর চোখ টিপল — «তবে হ্যাঁ — যা দেখেছিস, যা শুনেছিস — সেটা আমাদের মধ্যে থাক। বুঝলি?»
সিনথিয়া জোরে জোরে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর একটা পাথর নেমে গেল — হালকা লাগল, অদ্ভুতভাবে।
আপু একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল, «জানিস, আমারও একসময় ভয় করত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম... আমি ভাবতাম — এটা কি ঠিক? ভালো মেয়েরা কি এসব চায়?» — সে হাসল। «তারপর বুঝলাম — চাওয়াটাই স্বাভাবিক। লজ্জার কিছু নেই। শুধু... সঠিক মানুষটার সাথে।»
সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «দুলাভাই... ভালো?»
«খুব।» — আপুর চোখে একটা নরম আলো। «ও আমাকে বোঝে। আমার সবটুকু জানে — আর ভালোবাসে।» — তারপর সিনথিয়ার গাল টিপে দিল — «তুই যখন বড় হবি, বুঝবি। তাড়াহুড়ো করিস না, পাগলি।»
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। «আপু... একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»
«কর।»
«তুমি... প্রথমে ভয় পাওনি?» — তার গলা কাঁপছিল। «মানে... ওইসব... কথা...»
আপু হাসল — গভীর, জানা হাসি। «পেয়েছিলাম। খুব।» — সে সিনথিয়ার হাত ধরল। «কিন্তু ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসাথে থাকতে পারে, জানিস? ভয় পেলেই যে খারাপ, তা না।»
সিনথিয়া তাকাল — আপুর চোখে কোনো লজ্জা নেই, কোনো ভান নেই। শুধু সত্যি।
«মনে রাখবি —» আপু বলল, «— যে তোকে ভয় দেখায়, সে ভালোবাসে না। যে তোর ভয়টা বোঝে — সে-ই আসল।»
আপু টিফিন বক্স বন্ধ করল। «আর শোন — আজ আরেকদিন থেকে যা।»
«আপু?»
«কাল সকালে যাস। তোর মাকে আমি ফোন করে দিচ্ছি — বলব আমার শরীরটা ভালো না, তুই থাকলে ভালো লাগবে।» — আপু চোখ টিপল। «কী, থাকবি তো?»
সিনথিয়ার বুকের ভেতর আনন্দে লাফিয়ে উঠল — এত জোরে যে সে ভয় পেল আপু শুনতে পাবে। আরেকটা দিন। মানে — আরেকটা রাত। মানে — তানভীর।
«থাকব!» — বলে ফেলল এত তাড়াতাড়ি, এত উৎসাহে — যে আপু হেসে ফেলল।
«এত খুশি?» — আপু ভ্রু তুলল। «আমাকে এত ভালোবাসিস?»
«হ্যাঁ!» — সিনথিয়া আপুকে জড়িয়ে ধরল — লজ্জা ঢাকার জন্য, আনন্দ ঢাকার জন্য। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার, সাবানের — আর সেই দাগটা, কলারবোনের ওপরে, এখন খুব কাছে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল।
আপু ফোন বের করল। «দাঁড়া, তোর মাকে ফোন করে দিই।» — কানে ধরে — «হ্যালো, খালাম্মা... হ্যাঁ, আমি শিলা... শোনো না, সিনথিয়াকে আজ আরেকদিন রাখছি... না না, ওর কোনো দোষ না, আমারই শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, ও থাকলে ভালো লাগবে... হ্যাঁ হ্যাঁ, কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব... আচ্ছা, রাখছি।»
সিনথিয়া দম বন্ধ করে শুনছিল। আপু ফোন রেখে চোখ টিপল — «ডান।»
সিনথিয়ার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি — অপরাধবোধ আর উত্তেজনা একসাথে। মা জানে না — মা কোনোদিন জানবে না — এই «আরেকদিন» মানে আসলে কী। মানে — তানভীরের সাথে আরেকটা রাত।
ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে সিনথিয়া সোফায় বসল। দুলাভাই জুতো পরছেন, আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে। রনি তখনো টেবিলে — চায়ে চুমুক দিচ্ছে, ফোন ঘাঁটছে।
টেবিলের নিচে — সিনথিয়ার ফোন ভাইব্রেট করল।
তানভীর: «ঘুম ভাঙল মহারানির?»
সে ঠোঁট কামড়ে হাসল। টাইপ করল — «ভাঙল। তুই?»
«আমি তো ঘুমাইনি। তোর কথা ভেবে ভেবে রাত পার।»
«মিথ্যুক।»
«সত্যি। কাল রাতে তুই অন্যরকম ছিলি, মিম।»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। টেবিলের ওপর আপু ব্যাগ নিচ্ছে, দুলাভাই দরজার দিকে যাচ্ছে — আর টেবিলের নিচে তার আঙুল চলছে।
«কীরকম?» — লিখল সে।
«আমার। পুরোপুরি আমার।»
সে ফোনটা একটু নামিয়ে রাখল — বুক ধড়ফড় করছে। তারপর আবার তুলল।
«আজ রাতেও আমি আছি। দশটার পর। একা থাকবি।»
সিনথিয়া টাইপ করল — «আজও আপুর বাসায় থাকছি। কাল বাড়ি যাব।»
«তাহলে আজ রাতেও...»
«হুম।»
«লজ্জা পাচ্ছিস?»
সে এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর লিখল — «তোর সাথে না।»
ওপাশে — টাইপিং... টাইপিং... তারপর এলো — «এই কথাটা মনে রাখিস। আজ রাতে মনে করিয়ে দেব।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকের কাছে নামিয়ে রাখল। বুক ধড়ফড় করছে। টেবিলের ওপর — আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে, দুলাভাই জুতোর ফিতে বাঁধছে — আর টেবিলের নিচে — তার গোপন দুনিয়া।
ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল।
«দেবরটা দেখতে কেমন?»
সিনথিয়া চমকে গেল। «কেন?»
«এমনি। আমার মিমকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে — জানতে হবে না?»
সে হাসল — ঠোঁট কামড়ে। «সাধারণ।»
«মিথ্যা বলছিস।»
«তুই কী করে জানলি?»
«তোর "সাধারণ" মানেই অসাধারণ। আমি তোকে চিনি।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল — এই ছেলে তাকে চেনে। সত্যিই চেনে। মিমকে চেনে।
«শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে যা। মজা কর। কিন্তু মনে রাখবি — তুই কার?»
«তোর।» — সে লিখল, আঙুল কাঁপছে। «শুধু তোর।»
«ভালো মেয়ে। আজ রাতে পুরস্কার পাবি।»
সিনথিয়ার আঙুল থমকে গেল স্ক্রিনের ওপর। «পুরস্কার?»
«হুম। আজ রাতে দেখবি।»
«এখন বল না...»
«না। অপেক্ষা কর। অপেক্ষায় মজা বেশি — মনে আছে তো?»
তার গাল জ্বলে উঠল। মনে আছে। খুব মনে আছে — গতকাল রাতে «থাম।» বলে তানভীর তাকে কতক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছিল। আর সেই অপেক্ষার পর... ওহ।
«তুই খুব খারাপ।» — লিখল সে।
«তোর জন্য। শুধু তোর জন্য।»
সিনথিয়া ফোনটা রেখে দিল — ঠিক তখনই দুলাভাইয়ের গলা — «শালী!»
সে চমকে তাকাল। দুলাভাই দরজায় দাঁড়িয়ে — জুতো পরা, ব্যাগ কাঁধে। «তোর আপু বলল আজ থাকছিস। ভালো করেছিস।» — হাসলেন সেই চেনা, উষ্ণ হাসি। «আর শোন —» — তিনি রনির দিকে তাকালেন — «তুই আজ দোকানে যাস না।»
রনি ফোন থেকে চোখ তুলল। «কেন?»
«শালীকে নিয়ে শপিংয়ে যা। ওর কিছু পছন্দ করে কিনে দে — মেয়ে মানুষ, ঘুরতে ভালোবাসে।» — দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «যা ইচ্ছে কিনবি। বিল আমি দেব।»
«আরে না না, দুলাভাই—» — সিনথিয়া বলতে গেল।
«চুপ।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «দুলাভাইয়ের আদর নিতে হয়।»
রনি কাঁধ ঝাঁকাল। «আচ্ছা, ভাইয়া।»
আর তারপর — রনি তাকাল সিনথিয়ার দিকে। সরাসরি। তার চোখ — এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। ঠোঁটে সেই অদ্ভুত, ধীর হাসি — সকালের নাস্তার টেবিলের মতো। যেন সে কিছু জানে। যেন সে কিছু দেখেছে।
সিনথিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।
«যা, রেডি হয়ে নে।» — আপু দরজা থেকে বলল। «আর রনি — ওকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাস।»
দরজা বন্ধ হলো। আপু আর দুলাভাই অফিসে। ফ্ল্যাটে রইল — সিনথিয়া আর রনি।
গেস্ট রুমে এসে সিনথিয়া দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল।
কী পরবে? হাত বাড়িয়ে দিল আলমারিতে রাখা ব্যাগের দিকে। আঙুল থমকে গেল — নীল কামিজটার ওপর। সেই কামিজ — যেটা পরে সে তানভীরকে কাঁধের ছবি পাঠিয়েছিল। যেটা পরে সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে কামিজটা তুলে নিল। গায়ে দিল। আয়নায় দেখল — নিজেকে।
নীল কামিজ। এই কামিজ পরেই সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল — মুখ ছাড়া, শুধু কাঁধ। তানভীর লিখেছিল — «তুই আজ আমাকে মেরে ফেলবি, মিম।» সেই রাতেই সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়েছিল — এই কামিজ পরেই। কামিজটা যেন সাক্ষী — সবকিছুর।
সে ওড়নাটা ভালো করে গোছাল। চুলে চিরুনি বুলাল। আয়নার মেয়েটাকে দেখল — গাল লাল, চোখ জ্বলজ্বলে।
বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কেন? সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল। শপিং তো — সাধারণ শপিং। দুলাভাইয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে। কিন্তু হাতুড়িটা থামছে না।
কারণ — রনির সেই হাসি। সেই এক মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে থাকা। যেন সে কিছু জানে।
«ধুর।» — সে নিজেকে বকল আয়নায়। «কী ভাবছি আমি? ও তো শুধু...» — শুধু কী? সে জানে না। শুধু এইটুকু জানে — রনির চোখে তাকালে তার অস্বস্তি হয়। এমন অস্বস্তি — যেন কেউ তার গোপন ডায়েরি পড়ে ফেলেছে।
ফোনটা বাজল। তানভীর।
«শপিং? কার সাথে?»
সিনথিয়া থমকে গেল। কী লিখবে? সত্যি? «দুলাভাইয়ের ভাইয়ের সাথে» — এতে দোষ কী? তানভীর তো জানে না এরা কারা, কোথায়।
«আপুর দেবরের সাথে।» — লিখল সে। «দুলাভাই পাঠাচ্ছে।»
«দেবর? কত বড়?»
«বড়। পঁচিশ।»
ওপাশে একটু চুপ। টাইপিং... তারপর — «সাবধানে থাকবি।»
সিনথিয়া হাসল। «ঈর্ষা হচ্ছে?»
«হচ্ছে। তুই আমার। ভুলে যাস না।»
«ভুলব না।» — সে লিখল। তারপর আরেকটা — «আমার জন্য কী কিনবি জিজ্ঞেস করছিলি না? তোর জন্য কিছু কিনব না।»
«মিথ্যুক। আমার মিম মিথ্যুক।»
«যা ভাগ।»
«আচ্ছা শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে গিয়ে আমার জন্য একটা কিছু কিনবি।»
«বললাম তো — কিনব না।»
«কিনবি। ছোট্ট কিছু। যেটা দেখলে তোর কথা মনে পড়বে।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «কীরকম?»
«তুই জানিস কীরকম।»
সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল এক মুহূর্ত। তারপর ব্যাগে রাখল। আয়নায় শেষবার দেখল নিজেকে — চুল ঠিক করল, ওড়না গোছাল। বুকের হাতুড়িটা এখনো থামেনি।
«শান্ত হ।» — সে আয়নার মেয়েটাকে বলল। «শুধু শপিং। শুধু... শপিং।»
আয়নার মেয়েটা বিশ্বাস করল না। সিনথিয়াও করল না।
বাইরে এলো। রনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে — চাবি হাতে, ফোন পকেটে। তাকে দেখে তাকাল। আবার — সেই দৃষ্টি। মাথা থেকে পা পর্যন্ত — একবার। ধীরে। তারপর ঠোঁটে হাসি।
«চলো, সিনথিয়া।»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই প্রথম রনি তার নাম ধরে ডাকল। এত... কাছ থেকে।
সে পা বাড়াল। রনি দরজা খুলে ধরল। সিঁড়ির দিকে এগোল তারা — পাশাপাশি। পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ — ক্লিক।
সিঁড়ির মুখে রনি থমকে দাঁড়াল। «শোনো।»
সিনথিয়া তাকাল। «হুঁ?»
রনি একটু ঝুঁকল — গলা নামিয়ে বলল, «তুমি রাতে... ভালো ঘুমাও তো?»
সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «মানে?»
রনি হাসল — সেই ধীর, অদ্ভুত হাসি। «মানে — নতুন জায়গায় অনেকের ঘুম হয় না। তাই জিজ্ঞেস করলাম।» — সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। «চলো।»
সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। বুকের ভেতর হাতুড়ি। «তুমি রাতে ভালো ঘুমাও তো?» — এটা কি শুধুই একটা প্রশ্ন? নাকি... অন্য কিছু?
সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, বেশি ভাবছি। পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে।
নিচে রনি দাঁড়িয়ে — তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে, তার দিকেই। «আসো।» — হাত বাড়িয়ে দিল, যেন সিঁড়িটা পিচ্ছিল।
সিনথিয়া তার হাত ধরল না — রেলিং ধরল। রনির হাতটা এক মুহূর্ত বাতাসে রইল — তারপর নেমে গেল। তার ঠোঁটে সেই হাসি।
«সাবধানে।» — বলল রনি।
দিনের আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সিনথিয়া টের পেল — তার হাত কাঁপছে। কেন কাঁপছে, সে জানে না। শুধু জানে — আজকের দিনটা সাধারণ হবে না।
(চলবে...)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)