26-09-2026, 05:53 PM
আপুর বাসা
পরিকল্পনাটা এসেছিল দুপুরে, ভাত খাওয়ার টেবিলে। মা ডালের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "শিলা ফোন করেছিল সকালে। বলল সিনথিয়াকে এক রাতের জন্য পাঠিয়ে দাও — ওর নাকি খুব একা একা লাগছে, সোহেল অফিসের কাজে ব্যস্ত।"
সিনথিয়ার হাত থেমে গেল ভাতের ওপর। শিলা আপু! মায়ের খালাতো বোনের মেয়ে, তার চেয়ে দশ বছরের বড়, কিন্তু সম্পর্কটা বোনের চেয়েও ঘনিষ্ঠ। তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছে, সোহেল দুলাভাইয়ের সাথে সংসার — শহরের অন্য প্রান্তে একটা ছোট ফ্ল্যাটে।
"যাবি?" মা জিজ্ঞেস করলেন।
সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠতে চাইল, কিন্তু নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল, "যাই। আপুর বাসায় তো অনেকদিন যাওয়া হয় না।"
মনের ভেতর তখন অন্য হিসেব চলছিল। আপুর বাসা মানে — নিজের ঘর, নিজের দরজা, কেউ টোকা দেবে না মাঝরাতে। মানে তানভীরের সাথে খোলাখুলি কথা বলার একটা পুরো রাত। তার বুকের ভেতরটা টিপটিপ করে উঠল।
বিকেলে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেল। দুটো জামা, একটা ওড়না, টুথব্রাশ — আর ফোনের চার্জারটা সে ওড়নার ভাঁজে লুকিয়ে রাখল, যেন কোনো নিষিদ্ধ জিনিস পাচার করছে। চার্জার ছাড়া এক রাত — অকল্পনীয়। মা দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, "চার্জার লুকাচ্ছিস কেন?" — তাই লুকিয়েই রাখল।
আলমারি খুলে জামা বাছতে গিয়ে সে থমকে গেল। কোনটা নেবে? আপুর বাসায় কে দেখবে — কিন্তু তানভীরের ডেয়ারের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল। মুখ ছাড়া ছবি... কাঁধের... সে একটা হালকা নীল কামিজ তুলে নিল — গলাটা একটু বড়। আয়নার সামনে ধরে দেখল নিজেকে। "তুই কী ভাবছিস, সিনথিয়া?" আয়নার মেয়েটা হাসল — সেই রহস্যময় হাসি, যা গত কয়েকদিনে তার চেনা হয়ে গেছে।
"শোন," মা দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, "আপুর কথা শুনবি। রাত জাগবি না। আর ফোনে বেশি সময় নষ্ট করবি না।"
"আচ্ছা মা," সিনথিয়া মাথা নাড়ল — মুখে অনুগত মেয়ের ভাব, মনে তখন তানভীরের গত রাতের মেসেজটা বাজছে — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»
ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরোনোর আগে সে নাবিলাকে মেসেজ করল — "আপুর বাসায় যাচ্ছি, এক রাত থাকব।"
জবাব এলো সাথে সাথে — "ওয়াও! এনজয় কর! আর শোন — আপুর বাসা মানেই ফ্রিডম। ?"
সিনথিয়া হাসল। নাবিলা যদি জানত, এই ফ্রিডমটা সে কী কাজে লাগাতে চায়! কিন্তু মিমের কথা সে নাবিলাকেও বলেনি — এই গোপনটা শুধু তার। মেসেজটা ডিলিট করে দিল সে, অভ্যেসবশত।
মা নিজেই তাকে রিকশায় তুলে দিলেন আপুর বাসা পর্যন্ত। পথে মা বললেন, "শিলা তোকে খুব ভালোবাসে। ওর নিজের তো কোনো বোন নেই।"
সিনথিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। বিকেলের আলোয় শহরটা ঝলমল করছিল। তার মনে হচ্ছিল — আজকের রাতটা অন্যরকম হবে। কেন, তা সে জানত না। শুধু বুকের ভেতর একটা চাপা ঢেউ টের পাচ্ছিল।
মা বললেন, "শিলার বাসায় গিয়ে বেশি ফোন ঘাঁটবি না, বুঝলি? ওরা ভাববে মেয়ে সারাদিন ফোনে।"
"আচ্ছা মা," সিনথিয়া বলল — আর মনে মনে হাসল। মা যদি জানতেন, ফোনটাই আজ রাতের সবচেয়ে দরকারি জিনিস।
রিকশা গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠল। দোকানপাট, ভিড়, হর্নের শব্দ। সিনথিয়ার মনে পড়ল গত রাতে তানভীরের শেষ মেসেজ — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো।» সে জানত ডেয়ারটা কী। ছবি। মুখ ছাড়া। ভাবতেই তার পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল — ভয় আর উত্তেজনার মিশেল।
আপুর ফ্ল্যাটটা ছিল তিনতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সিনথিয়ার মনে হলো — এই সিঁড়িটা যেন তার পুরনো জীবন থেকে নতুন কিছুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মা নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন।
দরজা খুলতেই শিলা আপু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন — "আরে! আমার বোন এসেছে!" জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। আপুর গায়ে রান্নার গন্ধ, চুলে শ্যাম্পুর — চেনা, আপন গন্ধ। "আয় আয়, ভেতরে আয়। মা, আপনি ভেতরে আসবেন না?"
"না রে, বাসায় কাজ আছে," মা হাসলেন। "মেয়েটাকে দেখে রাখিস।"
"চিন্তা করবেন না!" আপু সিনথিয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।
"মা কেমন আছে? সিয়াম?" আপু একসাথে দশটা প্রশ্ন করলেন।
মা চা খেয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে সিনথিয়ার কানে ফিসফিস করে বললেন, "ভদ্রভাবে থাকবি।"
দরজা বন্ধ হতেই আপু তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরে। "আয়, তোকে আমার সংসার দেখাই।" ছোট্ট ফ্ল্যাট — দুটো বেডরুম, একটা ড্রয়িং-ডাইনিং, রান্নাঘর। কিন্তু প্রতিটা কোণায় আপুর হাতের ছোঁয়া — পর্দায় ফুলের ছাপ, টেবিলে ছোট্ট মানিপ্ল্যান্ট, দেয়ালে বিয়ের ছবি।
"এই ঘরটা তোর," আপু গেস্ট রুমের দরজা খুলে দিলেন। ছোট্ট ঘর, একটা সিঙ্গেল খাট, আলমারি, জানালা দিয়ে বাইরের গলি দেখা যায়। "বাথরুমটা এই পাশে," আপু দেখিয়ে দিলেন অ্যাটাচড বাথরুম। সিনথিয়ার মনে মনে হিসেব মিলে গেল — দরজা বন্ধ, নিজের বাথরুম। পারফেক্ট।
ব্যাগটা খাটের ওপর রেখে সে জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে গলি, ওপাশে আরেকটা বিল্ডিং। আপু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। "খুশি তো?"
"খুব," সিনথিয়া বলল — আর সত্যিই খুশি ছিল। এই ফ্ল্যাটে একটা উষ্ণতা আছে, যা তাদের বাসায় নেই — হয়তো নতুন সংসারের গন্ধ।
ড্রয়িং রুমের দেয়ালে বিয়ের বড় ছবি — আপু লাল শাড়িতে, দুলাভাই শেরওয়ানিতে। "দুলাভাইকে সেদিন কী লাগছিল!" সিনথিয়া বলল।
"আর এখন দেখ," আপু হাসলেন। "ভুঁড়ি বেরোচ্ছে।" দুজনে হাসল। আপু ছবিটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, "তিন বছর হয়ে গেল। মনে হয় সেদিন।" তার চোখে কী যেন একটা ঝিলিক — যা সিনথিয়া তখন বুঝল না।
দুপুরের খাবারটা হলো উৎসবের মতো। আপু রেঁধেছিলেন ইলিশ ভাজি, ডাল, শাক — সিনথিয়ার পছন্দের সব। টেবিলে বসে আপু বললেন, "তোর জন্য স্পেশাল। সোহেল তো ইলিশের কাঁটা বাছতে পারে না, আমি বেছে দিই।"
"আপু তুমি কত ভালো," সিনথিয়া বলল, মুখে ভাত নিয়ে।
"ভালো না হলে সংসার চলে?" আপু হাসলেন। "শোন, বিয়ের পর মেয়েদের একটা নতুন জীবন শুরু হয়। প্রথম প্রথম কষ্ট হয় — নতুন বাসা, নতুন মানুষ। কিন্তু তারপর... তারপর এই বাসাটাই নিজের হয়ে যায়।" তার চোখে কী যেন একটা স্বপ্নিল ভাব।
খেতে খেতে আপু গল্প জুড়লেন — পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির কাণ্ড, অফিসের নতুন কলিগ, সোহেল দুলাভাইয়ের ভুলে যাওয়ার অভ্যেস।
"আর তুই?" আপু হঠাৎ চোখ টিপে বললেন, "কলেজে কেউ আছে নাকি? সত্যি করে বল।"
সিনথিয়ার গলায় ভাত আটকে গেল। কাশতে কাশতে বলল, "ধুর আপু! কী যে বলো!"
"আহা, লজ্জা পাচ্ছে!" আপু হাসতে হাসতে বললেন, "তোর বয়সে আমারও..." — থেমে গেলেন, রহস্যময় হাসি হাসলেন। "যাকগে। যখন হবে, আমাকে আগে বলবি। প্রমিস?"
"প্রমিস," সিনথিয়া বলল — আর মনের ভেতর তানভীরের মুখটা ভেসে উঠল। যাকে সে কখনো দেখেনি, যার আসল নাম ছাড়া কিছু জানে না, অথচ যার কাছে সে নিজের শরীরের মাপ পর্যন্ত বলে দিয়েছে।
খাওয়ার পর দুজনে ড্রয়িং রুমে বসল। আপু পান বানিয়ে দিলেন।
"তোর মা ফোনে বলছিল, তুই আজকাল ফোনে বেশি থাকিস," আপু হঠাৎ বললেন, পান মুখে দিয়ে।
সিনথিয়ার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। "না তো... মানে, পড়ার গ্রুপ আছে।"
"আহা, ধরা পড়ে গেছিস!" আপু হাসলেন। "ভয় পাস না। তোর বয়সে আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে..." থেমে গেলেন। "যাকগে। শুধু একটা কথা — যা-ই করিস, নিজেকে বাঁচিয়ে করিস। দুনিয়াটা ভালো না, বোন।"
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। আপুর কথাগুলো যেন তার গোপনটার ওপর আলো ফেলছিল। "আপু..."
"বল।"
"তুমি... তুমি কখনো কাউকে লুকিয়ে ভালোবেসেছ?"
আপু একটু চুপ করে রইলেন। তারপর নরম গলায় বললেন, "বিয়ের আগে... তোর দুলাভাইকেই। বাবা-মা জানত না প্রথমে।" হাসলেন। "ভালোবাসা লুকিয়ে রাখা যায় না বেশিদিন। একসময় বেরিয়ে আসেই।" বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল। আপু তার কলেজের গল্প শুনলেন মন দিয়ে — নাবিলার দুষ্টুমি, তানিশার ভয়, পরীক্ষার চাপ।
"তুই বদলে যাচ্ছিস," আপু হঠাৎ বললেন, তার মুখটা ভালো করে দেখে। "চোখে কী যেন একটা... বড় হয়ে যাচ্ছিস তুই।"
সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। "কী যে বলো!"
"মেয়েরা বুঝতে পারে," আপু হাসলেন। "যাক, ভালোই। বড় হওয়া খারাপ না।"
বিকেলে দুজনে বারান্দায় বসল। আপু চা বানিয়ে আনলেন। নিচে গলিতে বাচ্চারা খেলছিল।
"তোর দুলাভাইটা না," আপু হঠাৎ বললেন, "বিয়ের আগে কী লাজুক ছিল জানিস? কথা বলতেই লাল হয়ে যেত।" হেসে ফেললেন। "আর এখন..."
"এখন কী?" সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল।
"এখন..." আপু রহস্যময় হাসি হাসলেন। "বড় হলে বুঝবি। বিয়ের পর মানুষ বদলে যায়। ভালোর জন্যই বদলায়।" তার গালে হালকা লালচে আভা।
সিনথিয়ার কৌতূহল হলো, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগল। আপু নিজেই বললেন, "শোন, একটা কথা বলি — স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, সেটা নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। বাইরের মানুষ বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে... ভেতরে একটা আলাদা দুনিয়া থাকে।"
"তুমি দুলাভাইকে ভালোবাসো?" সিনথিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
আপু তার হাতটা ধরলেন। "পাগলের মতো।" একটু থেমে — "তুই যখন কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসবি, তখন বুঝবি — ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না। অনেক... অনেক গভীর কিছু।"
সন্ধ্যা সাতটার দিকে দরজায় চাবির শব্দ হলো। "এসে গেছে তোর দুলাভাই," আপু উঠে দাঁড়ালেন।
সোহেল দুলাভাই ঢুকলেন — লম্বা, হাসিখুশি মুখ, অফিসের শার্টের হাতা গুটানো। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। "শালী এসেছে শুনে মিষ্টি না আনলে চলে?" বলে প্যাকেটটা উঁচু করে দেখালেন। সিনথিয়াকে দেখে চোখ বড় বড় করে বললেন, "আরে! শালী সাহেবা! কবে এলে?"
"আজই দুলাভাই," সিনথিয়া হাসল।
"বাহ! তাহলে তো আজ পার্টি!" দুলাভাই মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখে বললেন, "তোমার আপু তো সকাল থেকে বলছে — সিনথিয়া আসছে, সিনথিয়া আসছে। আমি তো ভাবলাম প্রধানমন্ত্রী আসছেন!"
সবাই হেসে উঠল। দুলাভাই এমনই — যেখানেই যান, হাসি নিয়ে যান। সিনথিয়ার মনে আছে, বিয়ের সময় এই মানুষটাই তাকে বলেছিলেন, "তুমি আমার ছোট বোনের মতো। কোনো দরকার হলে সবার আগে আমাকে বলবে।"
দুলাভাই ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলেন। "তো শালী সাহেবা, কলেজ কেমন চলছে? কোনো পাগল ছেলে পেছনে ঘুরঘুর করে?"
"দুলাভাই!" সিনথিয়া লজ্জা পেল।
"আরে লজ্জা পাওয়ার কী আছে!" দুলাভাই হাসলেন। "তোমার বয়সে আমিও..." আপু কটমট করে তাকাতেই থেমে গেলেন। "আচ্ছা আচ্ছা, বলছি না।"
আপু চা নিয়ে এলেন। দুলাভাই চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "তোমার আপুটা জানো, আজ সকালে কী করেছে? আমার অফিসের ফাইল লুকিয়ে রেখেছে, যাতে আমি দেরি করে যাই!"
"মিথ্যে!" আপু প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু হাসছিলেন।
"সত্যি! এই মহিলা আমাকে অফিসে যেতে দিতে চায় না।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। "বুঝলে শালী, বিয়ে করো না। স্বাধীনতা শেষ।"
"তুমি তো মহাসুখে আছো," আপু তার কাঁধে একটা কিল মারলেন। দুলাভাই হেসে আপুর হাতটা ধরে ফেললেন — এক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু সিনথিয়া দেখল। সেই এক সেকেন্ডে দুজনের চোখে কী যেন একটা খেলা করে গেল — যা সে বুঝল না, কিন্তু টের পেল।
রাতের খাবারটা হলো হইচই করে। দুলাভাই অফিসের মজার গল্প বললেন — বস একবার মিটিংয়ে "I am very confusion" বলেছিলেন, সবাই মুখ চেপে হেসেছিল। আর এক কলিগ প্রেজেন্টেশনে নিজের নামের বানান ভুল লিখে এসেছিলেন। "বস রেগে বললেন, তোমার নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারো না? কলিগ বলল, স্যার, টেনশনে ভুল হয়ে গেছে!" আপু মাঝে মাঝে "আহা, বানিয়ে বলছ!" বলে ধমক দিলেন, দুলাভাই "সত্যি বলছি!" বলে হাত তুললেন। সিনথিয়া হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা পেয়ে গেল।
"তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?" দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন।
"ভালো," সিনথিয়া বলল।
"কোনো ছেলে টিজ করলে আমাকে বলবে," দুলাভাই চোখ টিপলেন। "শালীর সম্মান রক্ষা করা দুলাভাইয়ের পবিত্র দায়িত্ব!"
"তুমি থামবে?" আপু হেসে তার পিঠে একটা চাপড় মারলেন।
খেতে খেতে আপু বললেন, "ও হ্যাঁ — রনি আজ বাইরে খেয়ে আসবে বলেছে। ওর ভাতটা ঢেকে রেখো।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমার ছোট ভাই — রনি। পঁচিশ বছর বয়স, মোবাইলের দোকানে কাজ করে। ছোট ঘরটায় থাকে আমাদের সাথেই।" সিনথিয়া মাথা নাড়ল — নামটা তখন মনে রাখার মতো কিছু মনে হলো না।
খেতে খেতে দুলাভাই বললেন, "শালী, একটা সত্যি কথা বলো তো — তোমার আপু রান্নায় কেমন?"
"খুব ভালো," সিনথিয়া বলল।
"দেখলে?" দুলাভাই আপুর দিকে তাকালেন। "শালী সার্টিফিকেট দিল। এখন থেকে প্রতিদিন ইলিশ রাঁধবে।"
"প্রতিদিন ইলিশ খেলে তোমার পকেট ফাঁকা," আপু হাসলেন।
"পকেট ফাঁকা হলেও মন ভরা," দুলাভাই বললেন — আর আপুর দিকে এমনভাবে তাকালেন, যাতে সিনথিয়ার মনে হলো সে যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া উচিত। আপু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলেন — তিন বছরের বিবাহিতা নারীর গালে লাজুক লালচে আভা। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল। এতদিনের সংসারেও... এত ভালোবাসা থাকে?
খাওয়ার পর দুলাভাই টিভি দেখতে বসলেন, আপু রান্নাঘর গোছালেন। সিনথিয়া সাহায্য করতে গেলে আপু তাড়িয়ে দিলেন — "যা, তোর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে। সারাদিন তো ঘুরেছিস।"
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠল। এই তো — নিজের একটা রাত। কেউ টোকা দেবে না। কেউ জিজ্ঞেস করবে না।
সে ফোনটা বের করল। তানভীর অনলাইন ছিল।
«এসে গেছি,» সে লিখল। «আপুর বাসায়।»
«কেমন লাগছে?» জবাব এলো সাথে সাথে। «আপু কী বলল?»
«ভালো। আপু আমাকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছিল।»
«আর তুই কী বললি?»
«বললাম কেউ নেই।» সে একটু থেমে লিখল, «মিথ্যে বললাম।»
«ভালো করেছিস।» তানভীর লিখল। «আমি তোর সিক্রেট। সিক্রেটই থাকি।»
সিনথিয়া বিছানায় শুয়ে পড়ল, ফোনটা বুকের ওপর। «তুমি কী করছ?»
«শুয়ে আছি। তোর কথা ভাবছি।»
«মিথ্যুক।»
«সত্যি।» একটু থেমে — «তুই যখন বললি আপু তোকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছে, আমার হিংসে হলো।»
«হিংসে? কেন?»
«কারণ আমি চাই তুই শুধু আমার কথা ভাবিস।»
সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। এই অধিকারবোধটা — আগে কেউ তার ওপর দেখায়নি। «তুমি তো আমার কিছুই দেখোনি,» সে লিখল।
«দেখিনি বলেই তো পাগল হয়ে আছি।»
কথা এগোল। দুলাভাইয়ের মজার গল্প, আপুর রান্না — সব শেয়ার করল সে। তানভীর মন দিয়ে শুনল, মাঝে মাঝে হাসির ইমোজি পাঠাল। তারপর একসময় লিখল —
«মনে আছে? কালকের ডেয়ারটা?»
সিনথিয়ার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হলো। «মনে আছে।»
«তাহলে?»
সে বিছানায় উঠে বসল। ঘরের বাতিটা জ্বলছিল। বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল। «একটু দাঁড়াও।»
বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। মুখ ছাড়া ছবি — কাঁধ, গলা... সে কামিজের গলাটা একটু নামিয়ে দিল। আয়নায় দেখল — ঘাড়ের বাঁক, কাঁধের রেখা, গলার নিচের ছোট্ট তিলটা। মুখটা ফ্রেমের বাইরে রাখল সাবধানে।
প্রথম ছবিটা তুলে দেখল — মুখের একটু অংশ চলে এসেছে। ডিলিট। দ্বিতীয়টা — আলো কম। ডিলিট। তৃতীয়বার সে ফোনটা একটু উঁচু করে ধরল, মাথাটা ফ্রেমের বাইরে রেখে। ক্লিক।
দেখল — নরম হলুদ আলোয় তার ঘাড় আর কাঁধ, গলার নিচে সেই ছোট্ট তিল। রহস্যময়, সুন্দর। তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না — এটা সে।
হাত কাঁপছিল। পাঠানোর আগে এক মুহূর্ত থমকে গেল — একবার পাঠিয়ে দিলে আর ফেরত নেওয়া যাবে না। তারপর চোখ বন্ধ করে সেন্ড চাপল।
তিন সেকেন্ড নীরবতা। তারপর —
«তুই... এটা তুই?»
«হ্যাঁ।»
«আমার হাত কাঁপছে, মিম।» তানভীর লিখল। «তুই এত সুন্দর... এইটুকু দেখেই আমি...»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। «বেশি বোলো না।»
«সত্যি বলছি।» তারপর একটু থেমে — «তোর এই তিলটা... গলার নিচে... আমি ওখানে...» থেমে গেল। «সরি। বেশি বলে ফেললাম?»
«না,» সিনথিয়া লিখল — অবাক হয়ে নিজের সাহসে। «বলো।»
সে রাতটা কাটল কথায় কথায়। তানভীর আজ অন্যরকম — ছবিটা দেখার পর তার গলায় একটা নতুন অধিকার জন্মেছে, কিন্তু ভদ্রতার সীমা সে পার করল না। শুধু মাঝে মাঝে এমন কথা বলল, যাতে সিনথিয়ার কান গরম হয়ে উঠল।
«তুই জানিস,» তানভীর লিখল, «আজ তুই আমাকে বিশ্বাস করলি। এই ছবিটা... তুই কাউকে দিসনি আগে, তাই না?»
«না। তুমিই প্রথম।»
«তাহলে আমি ভাগ্যবান।» একটু থেমে — «প্রমিস কর, এই ছবিটা শুধু আমার থাকবে।»
«প্রমিস।» সিনথিয়া লিখল — আর মনে হলো, এই প্রমিসটা রাখা সহজ। কারণ ছবিটা তোলার সময় সে শুধু তার কথাই ভেবেছিল।
«আর একটা কথা,» তানভীর লিখল। «একদিন... তোকে সামনে থেকে দেখতে চাই।»
«কবে?»
«যেদিন তুই চাইবি।»
«তোর আপু ঘুমিয়ে গেছে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«হ্যাঁ। দুলাভাইও। পুরো বাসা শান্ত।»
«আর তুই জেগে আছিস... আমার জন্য।»
«হয়তো।»
«হয়তো মানে হ্যাঁ। তুই আজকাল হয়তো বলতে শিখেছিস।» তানভীর লিখল। «আমার ভালো লাগে — তোর এই লাজুক সাহস।»
সিনথিয়া হাসল। «তুমি কবি হয়ে যাচ্ছ।»
«তোর জন্য কবি হতেও রাজি।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। বাইরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। এই অচেনা ঘরে, অচেনা বিছানায়, সে এক অচেনা ছেলের সাথে কথা বলছে — যাকে সে কখনো দেখেনি। অথচ মনে হচ্ছে, এই মানুষটাই তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে।
«ঘুমাবি না?» একসময় তানভীর জিজ্ঞেস করল। রাত তখন একটা।
«ঘুম পাচ্ছে না।»
«আমারও না।» একটু থেমে — «তোর ছবিটা আবার দেখছি।»
সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজল। «পাগল।»
«তোর জন্য।»
অনেক রাতে কথা থামল। «গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে আসিস।»
«গুড নাইট।»
ফোনটা বালিশের পাশে রাখল সে। কিন্তু ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলেই তানভীরের কথাগুলো কানে বাজছিল — «তোর এই তিলটা...» সে গলার নিচে হাত রাখল, সেই তিলটার ওপর। যেন তার আঙুল নয়, অন্য কারো আঙুল। শিউরে উঠল।
"কী হচ্ছে আমার?" সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে। এই অনুভূতিটা নতুন — ভয় নয়, লজ্জা নয়। কিছু একটা... জেগে উঠছে ভেতরে। শরীরে একটা অস্থিরতা — ছবিটা পাঠানোর পর থেকে। যেন কিছু একটা শুরু হয়ে গেছে, যা আর থামবে না।
গলা শুকিয়ে আসছিল। পানির তেষ্টা পেল। সে উঠে দরজা খুলল — করিডোরে পা দিতেই থমকে গেল।
অন্ধকার। পুরো ফ্ল্যাট ডুবে আছে নীরবতায়। শুধু ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে রাস্তার আলোর একটা ফালি এসে পড়েছে মেঝেতে। খালি পায়ে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ। ফ্রিজের গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
সে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দিকে এগোল। আর তখনই শুনল —
একটা শব্দ। চাপা, অদ্ভুত। আপুর বেডরুমের দিক থেকে।
সে থেমে গেল। কান পাতল।
আবার — এবার স্পষ্ট। একটা কাতরানি। নারীকণ্ঠ। আপুর গলা!
তারপর — চটাস! যেন কেউ কাউকে চড় মারল। আর সাথে সাথে আপুর গলায় একটা তীব্র শীৎকার — কিন্তু... কিন্তু সেটা ব্যথার নয়। সেটা... আনন্দের?
সিনথিয়ার পা মেঝেতে গেঁথে গেল।
সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ফিরে যাবে? এগোবে? পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে।
ভেতর থেকে দুলাভাইয়ের গলা আবার ভেসে এলো — এবার কয়েকটা শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। কর্কশ, অশ্লীল শব্দ — যা সিনথিয়া শুধু ভিডিওতে শুনেছে, বাস্তবে কখনো না। তার কান গরম হয়ে উঠল, গাল জ্বলতে লাগল।
আর আপু — আপু সেই শব্দগুলো শুনে হাসছিলেন! শুধু হাসছিলেন না — উপভোগ করছিলেন, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তার গলার সুরে।
দুলাভাইয়ের গলা ভেসে এলো — নিচু, ভারী, কর্কশ। কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু সুরটা... সুরটা সে চিনত। ভিডিওতে শোনা পুরুষদের সুর।
আর আপু — আপু হাসছিলেন। চাপা, কাঁপা হাসি। তারপর আবার সেই শব্দ — চটাস! আর আপুর গলায় দীর্ঘ, কাতর শীৎকার।
সিনথিয়ার হাতটা দেয়ালে ঠেকে গেল। হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে মনে হচ্ছিল আপুদের ঘর পর্যন্ত শোনা যাবে।
ভেতরে যা হচ্ছে — সেটা ভিডিওর মতো। কিন্তু ভিডিওর চেয়েও... বেশি। বেশি বর্বর, বেশি বন্য। দুলাভাইয়ের গলায় এমন একটা অধিকার, এমন একটা হিংস্রতা — যা দিনের বেলার হাসিখুশি মানুষটার সাথে মিলছিল না।
আর আপু — আপু উপভোগ করছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
সিনথিয়া নড়তে পারল না। পানির কথা ভুলে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার করিডোরে, দেয়ালে হাত রেখে — আর শব্দগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
তার মনের ভেতর তখন ঝড়। দিনের বেলার দুলাভাই — হাসিখুশি, মজার মানুষ — আর এই গলার মানুষটা কি একই? আপু — যে তাকে বিকেলে বলেছিলেন "ভালোবাসা অনেক গভীর কিছু" — এই কি সেই গভীরতা?
সে টের পেল, তার নিজের শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। লজ্জায়, উত্তেজনায়, ভয়ে — নাকি... নাকি অন্য কিছুতে? সে জানত না। শুধু জানত — সে এখান থেকে নড়তে পারছে না।
পানির গ্লাসের কথা মনেই রইল না। তার কান এখন শুধু ওই দরজার দিকে — যেখান থেকে ভেসে আসছে এমন শব্দ, যা তার সমস্ত জানা দুনিয়াকে উল্টে দিচ্ছে। আপু — তার আদরের আপু — আর দুলাভাই — সেই হাসিখুশি মানুষটা। তাদের এই রূপ সে কল্পনাও করেনি।
পরিকল্পনাটা এসেছিল দুপুরে, ভাত খাওয়ার টেবিলে। মা ডালের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "শিলা ফোন করেছিল সকালে। বলল সিনথিয়াকে এক রাতের জন্য পাঠিয়ে দাও — ওর নাকি খুব একা একা লাগছে, সোহেল অফিসের কাজে ব্যস্ত।"
সিনথিয়ার হাত থেমে গেল ভাতের ওপর। শিলা আপু! মায়ের খালাতো বোনের মেয়ে, তার চেয়ে দশ বছরের বড়, কিন্তু সম্পর্কটা বোনের চেয়েও ঘনিষ্ঠ। তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছে, সোহেল দুলাভাইয়ের সাথে সংসার — শহরের অন্য প্রান্তে একটা ছোট ফ্ল্যাটে।
"যাবি?" মা জিজ্ঞেস করলেন।
সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠতে চাইল, কিন্তু নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল, "যাই। আপুর বাসায় তো অনেকদিন যাওয়া হয় না।"
মনের ভেতর তখন অন্য হিসেব চলছিল। আপুর বাসা মানে — নিজের ঘর, নিজের দরজা, কেউ টোকা দেবে না মাঝরাতে। মানে তানভীরের সাথে খোলাখুলি কথা বলার একটা পুরো রাত। তার বুকের ভেতরটা টিপটিপ করে উঠল।
বিকেলে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেল। দুটো জামা, একটা ওড়না, টুথব্রাশ — আর ফোনের চার্জারটা সে ওড়নার ভাঁজে লুকিয়ে রাখল, যেন কোনো নিষিদ্ধ জিনিস পাচার করছে। চার্জার ছাড়া এক রাত — অকল্পনীয়। মা দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, "চার্জার লুকাচ্ছিস কেন?" — তাই লুকিয়েই রাখল।
আলমারি খুলে জামা বাছতে গিয়ে সে থমকে গেল। কোনটা নেবে? আপুর বাসায় কে দেখবে — কিন্তু তানভীরের ডেয়ারের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল। মুখ ছাড়া ছবি... কাঁধের... সে একটা হালকা নীল কামিজ তুলে নিল — গলাটা একটু বড়। আয়নার সামনে ধরে দেখল নিজেকে। "তুই কী ভাবছিস, সিনথিয়া?" আয়নার মেয়েটা হাসল — সেই রহস্যময় হাসি, যা গত কয়েকদিনে তার চেনা হয়ে গেছে।
"শোন," মা দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, "আপুর কথা শুনবি। রাত জাগবি না। আর ফোনে বেশি সময় নষ্ট করবি না।"
"আচ্ছা মা," সিনথিয়া মাথা নাড়ল — মুখে অনুগত মেয়ের ভাব, মনে তখন তানভীরের গত রাতের মেসেজটা বাজছে — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»
ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরোনোর আগে সে নাবিলাকে মেসেজ করল — "আপুর বাসায় যাচ্ছি, এক রাত থাকব।"
জবাব এলো সাথে সাথে — "ওয়াও! এনজয় কর! আর শোন — আপুর বাসা মানেই ফ্রিডম। ?"
সিনথিয়া হাসল। নাবিলা যদি জানত, এই ফ্রিডমটা সে কী কাজে লাগাতে চায়! কিন্তু মিমের কথা সে নাবিলাকেও বলেনি — এই গোপনটা শুধু তার। মেসেজটা ডিলিট করে দিল সে, অভ্যেসবশত।
মা নিজেই তাকে রিকশায় তুলে দিলেন আপুর বাসা পর্যন্ত। পথে মা বললেন, "শিলা তোকে খুব ভালোবাসে। ওর নিজের তো কোনো বোন নেই।"
সিনথিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। বিকেলের আলোয় শহরটা ঝলমল করছিল। তার মনে হচ্ছিল — আজকের রাতটা অন্যরকম হবে। কেন, তা সে জানত না। শুধু বুকের ভেতর একটা চাপা ঢেউ টের পাচ্ছিল।
মা বললেন, "শিলার বাসায় গিয়ে বেশি ফোন ঘাঁটবি না, বুঝলি? ওরা ভাববে মেয়ে সারাদিন ফোনে।"
"আচ্ছা মা," সিনথিয়া বলল — আর মনে মনে হাসল। মা যদি জানতেন, ফোনটাই আজ রাতের সবচেয়ে দরকারি জিনিস।
রিকশা গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠল। দোকানপাট, ভিড়, হর্নের শব্দ। সিনথিয়ার মনে পড়ল গত রাতে তানভীরের শেষ মেসেজ — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো।» সে জানত ডেয়ারটা কী। ছবি। মুখ ছাড়া। ভাবতেই তার পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল — ভয় আর উত্তেজনার মিশেল।
আপুর ফ্ল্যাটটা ছিল তিনতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সিনথিয়ার মনে হলো — এই সিঁড়িটা যেন তার পুরনো জীবন থেকে নতুন কিছুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মা নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন।
দরজা খুলতেই শিলা আপু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন — "আরে! আমার বোন এসেছে!" জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। আপুর গায়ে রান্নার গন্ধ, চুলে শ্যাম্পুর — চেনা, আপন গন্ধ। "আয় আয়, ভেতরে আয়। মা, আপনি ভেতরে আসবেন না?"
"না রে, বাসায় কাজ আছে," মা হাসলেন। "মেয়েটাকে দেখে রাখিস।"
"চিন্তা করবেন না!" আপু সিনথিয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।
"মা কেমন আছে? সিয়াম?" আপু একসাথে দশটা প্রশ্ন করলেন।
মা চা খেয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে সিনথিয়ার কানে ফিসফিস করে বললেন, "ভদ্রভাবে থাকবি।"
দরজা বন্ধ হতেই আপু তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরে। "আয়, তোকে আমার সংসার দেখাই।" ছোট্ট ফ্ল্যাট — দুটো বেডরুম, একটা ড্রয়িং-ডাইনিং, রান্নাঘর। কিন্তু প্রতিটা কোণায় আপুর হাতের ছোঁয়া — পর্দায় ফুলের ছাপ, টেবিলে ছোট্ট মানিপ্ল্যান্ট, দেয়ালে বিয়ের ছবি।
"এই ঘরটা তোর," আপু গেস্ট রুমের দরজা খুলে দিলেন। ছোট্ট ঘর, একটা সিঙ্গেল খাট, আলমারি, জানালা দিয়ে বাইরের গলি দেখা যায়। "বাথরুমটা এই পাশে," আপু দেখিয়ে দিলেন অ্যাটাচড বাথরুম। সিনথিয়ার মনে মনে হিসেব মিলে গেল — দরজা বন্ধ, নিজের বাথরুম। পারফেক্ট।
ব্যাগটা খাটের ওপর রেখে সে জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে গলি, ওপাশে আরেকটা বিল্ডিং। আপু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। "খুশি তো?"
"খুব," সিনথিয়া বলল — আর সত্যিই খুশি ছিল। এই ফ্ল্যাটে একটা উষ্ণতা আছে, যা তাদের বাসায় নেই — হয়তো নতুন সংসারের গন্ধ।
ড্রয়িং রুমের দেয়ালে বিয়ের বড় ছবি — আপু লাল শাড়িতে, দুলাভাই শেরওয়ানিতে। "দুলাভাইকে সেদিন কী লাগছিল!" সিনথিয়া বলল।
"আর এখন দেখ," আপু হাসলেন। "ভুঁড়ি বেরোচ্ছে।" দুজনে হাসল। আপু ছবিটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, "তিন বছর হয়ে গেল। মনে হয় সেদিন।" তার চোখে কী যেন একটা ঝিলিক — যা সিনথিয়া তখন বুঝল না।
দুপুরের খাবারটা হলো উৎসবের মতো। আপু রেঁধেছিলেন ইলিশ ভাজি, ডাল, শাক — সিনথিয়ার পছন্দের সব। টেবিলে বসে আপু বললেন, "তোর জন্য স্পেশাল। সোহেল তো ইলিশের কাঁটা বাছতে পারে না, আমি বেছে দিই।"
"আপু তুমি কত ভালো," সিনথিয়া বলল, মুখে ভাত নিয়ে।
"ভালো না হলে সংসার চলে?" আপু হাসলেন। "শোন, বিয়ের পর মেয়েদের একটা নতুন জীবন শুরু হয়। প্রথম প্রথম কষ্ট হয় — নতুন বাসা, নতুন মানুষ। কিন্তু তারপর... তারপর এই বাসাটাই নিজের হয়ে যায়।" তার চোখে কী যেন একটা স্বপ্নিল ভাব।
খেতে খেতে আপু গল্প জুড়লেন — পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির কাণ্ড, অফিসের নতুন কলিগ, সোহেল দুলাভাইয়ের ভুলে যাওয়ার অভ্যেস।
"আর তুই?" আপু হঠাৎ চোখ টিপে বললেন, "কলেজে কেউ আছে নাকি? সত্যি করে বল।"
সিনথিয়ার গলায় ভাত আটকে গেল। কাশতে কাশতে বলল, "ধুর আপু! কী যে বলো!"
"আহা, লজ্জা পাচ্ছে!" আপু হাসতে হাসতে বললেন, "তোর বয়সে আমারও..." — থেমে গেলেন, রহস্যময় হাসি হাসলেন। "যাকগে। যখন হবে, আমাকে আগে বলবি। প্রমিস?"
"প্রমিস," সিনথিয়া বলল — আর মনের ভেতর তানভীরের মুখটা ভেসে উঠল। যাকে সে কখনো দেখেনি, যার আসল নাম ছাড়া কিছু জানে না, অথচ যার কাছে সে নিজের শরীরের মাপ পর্যন্ত বলে দিয়েছে।
খাওয়ার পর দুজনে ড্রয়িং রুমে বসল। আপু পান বানিয়ে দিলেন।
"তোর মা ফোনে বলছিল, তুই আজকাল ফোনে বেশি থাকিস," আপু হঠাৎ বললেন, পান মুখে দিয়ে।
সিনথিয়ার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। "না তো... মানে, পড়ার গ্রুপ আছে।"
"আহা, ধরা পড়ে গেছিস!" আপু হাসলেন। "ভয় পাস না। তোর বয়সে আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে..." থেমে গেলেন। "যাকগে। শুধু একটা কথা — যা-ই করিস, নিজেকে বাঁচিয়ে করিস। দুনিয়াটা ভালো না, বোন।"
সিনথিয়া মাথা নিচু করল। আপুর কথাগুলো যেন তার গোপনটার ওপর আলো ফেলছিল। "আপু..."
"বল।"
"তুমি... তুমি কখনো কাউকে লুকিয়ে ভালোবেসেছ?"
আপু একটু চুপ করে রইলেন। তারপর নরম গলায় বললেন, "বিয়ের আগে... তোর দুলাভাইকেই। বাবা-মা জানত না প্রথমে।" হাসলেন। "ভালোবাসা লুকিয়ে রাখা যায় না বেশিদিন। একসময় বেরিয়ে আসেই।" বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল। আপু তার কলেজের গল্প শুনলেন মন দিয়ে — নাবিলার দুষ্টুমি, তানিশার ভয়, পরীক্ষার চাপ।
"তুই বদলে যাচ্ছিস," আপু হঠাৎ বললেন, তার মুখটা ভালো করে দেখে। "চোখে কী যেন একটা... বড় হয়ে যাচ্ছিস তুই।"
সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। "কী যে বলো!"
"মেয়েরা বুঝতে পারে," আপু হাসলেন। "যাক, ভালোই। বড় হওয়া খারাপ না।"
বিকেলে দুজনে বারান্দায় বসল। আপু চা বানিয়ে আনলেন। নিচে গলিতে বাচ্চারা খেলছিল।
"তোর দুলাভাইটা না," আপু হঠাৎ বললেন, "বিয়ের আগে কী লাজুক ছিল জানিস? কথা বলতেই লাল হয়ে যেত।" হেসে ফেললেন। "আর এখন..."
"এখন কী?" সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল।
"এখন..." আপু রহস্যময় হাসি হাসলেন। "বড় হলে বুঝবি। বিয়ের পর মানুষ বদলে যায়। ভালোর জন্যই বদলায়।" তার গালে হালকা লালচে আভা।
সিনথিয়ার কৌতূহল হলো, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগল। আপু নিজেই বললেন, "শোন, একটা কথা বলি — স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, সেটা নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। বাইরের মানুষ বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে... ভেতরে একটা আলাদা দুনিয়া থাকে।"
"তুমি দুলাভাইকে ভালোবাসো?" সিনথিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
আপু তার হাতটা ধরলেন। "পাগলের মতো।" একটু থেমে — "তুই যখন কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসবি, তখন বুঝবি — ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না। অনেক... অনেক গভীর কিছু।"
সন্ধ্যা সাতটার দিকে দরজায় চাবির শব্দ হলো। "এসে গেছে তোর দুলাভাই," আপু উঠে দাঁড়ালেন।
সোহেল দুলাভাই ঢুকলেন — লম্বা, হাসিখুশি মুখ, অফিসের শার্টের হাতা গুটানো। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। "শালী এসেছে শুনে মিষ্টি না আনলে চলে?" বলে প্যাকেটটা উঁচু করে দেখালেন। সিনথিয়াকে দেখে চোখ বড় বড় করে বললেন, "আরে! শালী সাহেবা! কবে এলে?"
"আজই দুলাভাই," সিনথিয়া হাসল।
"বাহ! তাহলে তো আজ পার্টি!" দুলাভাই মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখে বললেন, "তোমার আপু তো সকাল থেকে বলছে — সিনথিয়া আসছে, সিনথিয়া আসছে। আমি তো ভাবলাম প্রধানমন্ত্রী আসছেন!"
সবাই হেসে উঠল। দুলাভাই এমনই — যেখানেই যান, হাসি নিয়ে যান। সিনথিয়ার মনে আছে, বিয়ের সময় এই মানুষটাই তাকে বলেছিলেন, "তুমি আমার ছোট বোনের মতো। কোনো দরকার হলে সবার আগে আমাকে বলবে।"
দুলাভাই ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলেন। "তো শালী সাহেবা, কলেজ কেমন চলছে? কোনো পাগল ছেলে পেছনে ঘুরঘুর করে?"
"দুলাভাই!" সিনথিয়া লজ্জা পেল।
"আরে লজ্জা পাওয়ার কী আছে!" দুলাভাই হাসলেন। "তোমার বয়সে আমিও..." আপু কটমট করে তাকাতেই থেমে গেলেন। "আচ্ছা আচ্ছা, বলছি না।"
আপু চা নিয়ে এলেন। দুলাভাই চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "তোমার আপুটা জানো, আজ সকালে কী করেছে? আমার অফিসের ফাইল লুকিয়ে রেখেছে, যাতে আমি দেরি করে যাই!"
"মিথ্যে!" আপু প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু হাসছিলেন।
"সত্যি! এই মহিলা আমাকে অফিসে যেতে দিতে চায় না।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। "বুঝলে শালী, বিয়ে করো না। স্বাধীনতা শেষ।"
"তুমি তো মহাসুখে আছো," আপু তার কাঁধে একটা কিল মারলেন। দুলাভাই হেসে আপুর হাতটা ধরে ফেললেন — এক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু সিনথিয়া দেখল। সেই এক সেকেন্ডে দুজনের চোখে কী যেন একটা খেলা করে গেল — যা সে বুঝল না, কিন্তু টের পেল।
রাতের খাবারটা হলো হইচই করে। দুলাভাই অফিসের মজার গল্প বললেন — বস একবার মিটিংয়ে "I am very confusion" বলেছিলেন, সবাই মুখ চেপে হেসেছিল। আর এক কলিগ প্রেজেন্টেশনে নিজের নামের বানান ভুল লিখে এসেছিলেন। "বস রেগে বললেন, তোমার নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারো না? কলিগ বলল, স্যার, টেনশনে ভুল হয়ে গেছে!" আপু মাঝে মাঝে "আহা, বানিয়ে বলছ!" বলে ধমক দিলেন, দুলাভাই "সত্যি বলছি!" বলে হাত তুললেন। সিনথিয়া হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা পেয়ে গেল।
"তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?" দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন।
"ভালো," সিনথিয়া বলল।
"কোনো ছেলে টিজ করলে আমাকে বলবে," দুলাভাই চোখ টিপলেন। "শালীর সম্মান রক্ষা করা দুলাভাইয়ের পবিত্র দায়িত্ব!"
"তুমি থামবে?" আপু হেসে তার পিঠে একটা চাপড় মারলেন।
খেতে খেতে আপু বললেন, "ও হ্যাঁ — রনি আজ বাইরে খেয়ে আসবে বলেছে। ওর ভাতটা ঢেকে রেখো।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমার ছোট ভাই — রনি। পঁচিশ বছর বয়স, মোবাইলের দোকানে কাজ করে। ছোট ঘরটায় থাকে আমাদের সাথেই।" সিনথিয়া মাথা নাড়ল — নামটা তখন মনে রাখার মতো কিছু মনে হলো না।
খেতে খেতে দুলাভাই বললেন, "শালী, একটা সত্যি কথা বলো তো — তোমার আপু রান্নায় কেমন?"
"খুব ভালো," সিনথিয়া বলল।
"দেখলে?" দুলাভাই আপুর দিকে তাকালেন। "শালী সার্টিফিকেট দিল। এখন থেকে প্রতিদিন ইলিশ রাঁধবে।"
"প্রতিদিন ইলিশ খেলে তোমার পকেট ফাঁকা," আপু হাসলেন।
"পকেট ফাঁকা হলেও মন ভরা," দুলাভাই বললেন — আর আপুর দিকে এমনভাবে তাকালেন, যাতে সিনথিয়ার মনে হলো সে যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া উচিত। আপু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলেন — তিন বছরের বিবাহিতা নারীর গালে লাজুক লালচে আভা। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল। এতদিনের সংসারেও... এত ভালোবাসা থাকে?
খাওয়ার পর দুলাভাই টিভি দেখতে বসলেন, আপু রান্নাঘর গোছালেন। সিনথিয়া সাহায্য করতে গেলে আপু তাড়িয়ে দিলেন — "যা, তোর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে। সারাদিন তো ঘুরেছিস।"
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠল। এই তো — নিজের একটা রাত। কেউ টোকা দেবে না। কেউ জিজ্ঞেস করবে না।
সে ফোনটা বের করল। তানভীর অনলাইন ছিল।
«এসে গেছি,» সে লিখল। «আপুর বাসায়।»
«কেমন লাগছে?» জবাব এলো সাথে সাথে। «আপু কী বলল?»
«ভালো। আপু আমাকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছিল।»
«আর তুই কী বললি?»
«বললাম কেউ নেই।» সে একটু থেমে লিখল, «মিথ্যে বললাম।»
«ভালো করেছিস।» তানভীর লিখল। «আমি তোর সিক্রেট। সিক্রেটই থাকি।»
সিনথিয়া বিছানায় শুয়ে পড়ল, ফোনটা বুকের ওপর। «তুমি কী করছ?»
«শুয়ে আছি। তোর কথা ভাবছি।»
«মিথ্যুক।»
«সত্যি।» একটু থেমে — «তুই যখন বললি আপু তোকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছে, আমার হিংসে হলো।»
«হিংসে? কেন?»
«কারণ আমি চাই তুই শুধু আমার কথা ভাবিস।»
সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। এই অধিকারবোধটা — আগে কেউ তার ওপর দেখায়নি। «তুমি তো আমার কিছুই দেখোনি,» সে লিখল।
«দেখিনি বলেই তো পাগল হয়ে আছি।»
কথা এগোল। দুলাভাইয়ের মজার গল্প, আপুর রান্না — সব শেয়ার করল সে। তানভীর মন দিয়ে শুনল, মাঝে মাঝে হাসির ইমোজি পাঠাল। তারপর একসময় লিখল —
«মনে আছে? কালকের ডেয়ারটা?»
সিনথিয়ার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হলো। «মনে আছে।»
«তাহলে?»
সে বিছানায় উঠে বসল। ঘরের বাতিটা জ্বলছিল। বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল। «একটু দাঁড়াও।»
বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। মুখ ছাড়া ছবি — কাঁধ, গলা... সে কামিজের গলাটা একটু নামিয়ে দিল। আয়নায় দেখল — ঘাড়ের বাঁক, কাঁধের রেখা, গলার নিচের ছোট্ট তিলটা। মুখটা ফ্রেমের বাইরে রাখল সাবধানে।
প্রথম ছবিটা তুলে দেখল — মুখের একটু অংশ চলে এসেছে। ডিলিট। দ্বিতীয়টা — আলো কম। ডিলিট। তৃতীয়বার সে ফোনটা একটু উঁচু করে ধরল, মাথাটা ফ্রেমের বাইরে রেখে। ক্লিক।
দেখল — নরম হলুদ আলোয় তার ঘাড় আর কাঁধ, গলার নিচে সেই ছোট্ট তিল। রহস্যময়, সুন্দর। তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না — এটা সে।
হাত কাঁপছিল। পাঠানোর আগে এক মুহূর্ত থমকে গেল — একবার পাঠিয়ে দিলে আর ফেরত নেওয়া যাবে না। তারপর চোখ বন্ধ করে সেন্ড চাপল।
তিন সেকেন্ড নীরবতা। তারপর —
«তুই... এটা তুই?»
«হ্যাঁ।»
«আমার হাত কাঁপছে, মিম।» তানভীর লিখল। «তুই এত সুন্দর... এইটুকু দেখেই আমি...»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। «বেশি বোলো না।»
«সত্যি বলছি।» তারপর একটু থেমে — «তোর এই তিলটা... গলার নিচে... আমি ওখানে...» থেমে গেল। «সরি। বেশি বলে ফেললাম?»
«না,» সিনথিয়া লিখল — অবাক হয়ে নিজের সাহসে। «বলো।»
সে রাতটা কাটল কথায় কথায়। তানভীর আজ অন্যরকম — ছবিটা দেখার পর তার গলায় একটা নতুন অধিকার জন্মেছে, কিন্তু ভদ্রতার সীমা সে পার করল না। শুধু মাঝে মাঝে এমন কথা বলল, যাতে সিনথিয়ার কান গরম হয়ে উঠল।
«তুই জানিস,» তানভীর লিখল, «আজ তুই আমাকে বিশ্বাস করলি। এই ছবিটা... তুই কাউকে দিসনি আগে, তাই না?»
«না। তুমিই প্রথম।»
«তাহলে আমি ভাগ্যবান।» একটু থেমে — «প্রমিস কর, এই ছবিটা শুধু আমার থাকবে।»
«প্রমিস।» সিনথিয়া লিখল — আর মনে হলো, এই প্রমিসটা রাখা সহজ। কারণ ছবিটা তোলার সময় সে শুধু তার কথাই ভেবেছিল।
«আর একটা কথা,» তানভীর লিখল। «একদিন... তোকে সামনে থেকে দেখতে চাই।»
«কবে?»
«যেদিন তুই চাইবি।»
«তোর আপু ঘুমিয়ে গেছে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«হ্যাঁ। দুলাভাইও। পুরো বাসা শান্ত।»
«আর তুই জেগে আছিস... আমার জন্য।»
«হয়তো।»
«হয়তো মানে হ্যাঁ। তুই আজকাল হয়তো বলতে শিখেছিস।» তানভীর লিখল। «আমার ভালো লাগে — তোর এই লাজুক সাহস।»
সিনথিয়া হাসল। «তুমি কবি হয়ে যাচ্ছ।»
«তোর জন্য কবি হতেও রাজি।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। বাইরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। এই অচেনা ঘরে, অচেনা বিছানায়, সে এক অচেনা ছেলের সাথে কথা বলছে — যাকে সে কখনো দেখেনি। অথচ মনে হচ্ছে, এই মানুষটাই তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে।
«ঘুমাবি না?» একসময় তানভীর জিজ্ঞেস করল। রাত তখন একটা।
«ঘুম পাচ্ছে না।»
«আমারও না।» একটু থেমে — «তোর ছবিটা আবার দেখছি।»
সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজল। «পাগল।»
«তোর জন্য।»
অনেক রাতে কথা থামল। «গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে আসিস।»
«গুড নাইট।»
ফোনটা বালিশের পাশে রাখল সে। কিন্তু ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলেই তানভীরের কথাগুলো কানে বাজছিল — «তোর এই তিলটা...» সে গলার নিচে হাত রাখল, সেই তিলটার ওপর। যেন তার আঙুল নয়, অন্য কারো আঙুল। শিউরে উঠল।
"কী হচ্ছে আমার?" সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে। এই অনুভূতিটা নতুন — ভয় নয়, লজ্জা নয়। কিছু একটা... জেগে উঠছে ভেতরে। শরীরে একটা অস্থিরতা — ছবিটা পাঠানোর পর থেকে। যেন কিছু একটা শুরু হয়ে গেছে, যা আর থামবে না।
গলা শুকিয়ে আসছিল। পানির তেষ্টা পেল। সে উঠে দরজা খুলল — করিডোরে পা দিতেই থমকে গেল।
অন্ধকার। পুরো ফ্ল্যাট ডুবে আছে নীরবতায়। শুধু ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে রাস্তার আলোর একটা ফালি এসে পড়েছে মেঝেতে। খালি পায়ে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ। ফ্রিজের গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
সে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দিকে এগোল। আর তখনই শুনল —
একটা শব্দ। চাপা, অদ্ভুত। আপুর বেডরুমের দিক থেকে।
সে থেমে গেল। কান পাতল।
আবার — এবার স্পষ্ট। একটা কাতরানি। নারীকণ্ঠ। আপুর গলা!
তারপর — চটাস! যেন কেউ কাউকে চড় মারল। আর সাথে সাথে আপুর গলায় একটা তীব্র শীৎকার — কিন্তু... কিন্তু সেটা ব্যথার নয়। সেটা... আনন্দের?
সিনথিয়ার পা মেঝেতে গেঁথে গেল।
সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ফিরে যাবে? এগোবে? পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে।
ভেতর থেকে দুলাভাইয়ের গলা আবার ভেসে এলো — এবার কয়েকটা শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। কর্কশ, অশ্লীল শব্দ — যা সিনথিয়া শুধু ভিডিওতে শুনেছে, বাস্তবে কখনো না। তার কান গরম হয়ে উঠল, গাল জ্বলতে লাগল।
আর আপু — আপু সেই শব্দগুলো শুনে হাসছিলেন! শুধু হাসছিলেন না — উপভোগ করছিলেন, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তার গলার সুরে।
দুলাভাইয়ের গলা ভেসে এলো — নিচু, ভারী, কর্কশ। কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু সুরটা... সুরটা সে চিনত। ভিডিওতে শোনা পুরুষদের সুর।
আর আপু — আপু হাসছিলেন। চাপা, কাঁপা হাসি। তারপর আবার সেই শব্দ — চটাস! আর আপুর গলায় দীর্ঘ, কাতর শীৎকার।
সিনথিয়ার হাতটা দেয়ালে ঠেকে গেল। হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে মনে হচ্ছিল আপুদের ঘর পর্যন্ত শোনা যাবে।
ভেতরে যা হচ্ছে — সেটা ভিডিওর মতো। কিন্তু ভিডিওর চেয়েও... বেশি। বেশি বর্বর, বেশি বন্য। দুলাভাইয়ের গলায় এমন একটা অধিকার, এমন একটা হিংস্রতা — যা দিনের বেলার হাসিখুশি মানুষটার সাথে মিলছিল না।
আর আপু — আপু উপভোগ করছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
সিনথিয়া নড়তে পারল না। পানির কথা ভুলে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার করিডোরে, দেয়ালে হাত রেখে — আর শব্দগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
তার মনের ভেতর তখন ঝড়। দিনের বেলার দুলাভাই — হাসিখুশি, মজার মানুষ — আর এই গলার মানুষটা কি একই? আপু — যে তাকে বিকেলে বলেছিলেন "ভালোবাসা অনেক গভীর কিছু" — এই কি সেই গভীরতা?
সে টের পেল, তার নিজের শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। লজ্জায়, উত্তেজনায়, ভয়ে — নাকি... নাকি অন্য কিছুতে? সে জানত না। শুধু জানত — সে এখান থেকে নড়তে পারছে না।
পানির গ্লাসের কথা মনেই রইল না। তার কান এখন শুধু ওই দরজার দিকে — যেখান থেকে ভেসে আসছে এমন শব্দ, যা তার সমস্ত জানা দুনিয়াকে উল্টে দিচ্ছে। আপু — তার আদরের আপু — আর দুলাভাই — সেই হাসিখুশি মানুষটা। তাদের এই রূপ সে কল্পনাও করেনি।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)