26-09-2026, 05:41 PM
ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার
«খেলব।»
মেসেজটা পাঠিয়ে সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, যেন স্ক্রিনের আলোটা কেউ দেখে ফেলবে। ঘর অন্ধকার। দরজায় ছিটকিনি। পাশের ঘর থেকে বাবার নাক ডাকার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। মা অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে। সিয়ামের ঘর নীরব। আর সে — কম্বলের নিচে, মিম হয়ে, এক অচেনা ছেলের সঙ্গে খেলতে বসেছে এমন এক খেলা, যার নাম শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে।
ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার।
স্ক্রিনে তিনটে ডট নাচছে। তানভীর টাইপ করছে। সিনথিয়ার আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ভাবল — নাবিলা যদি জানত! নাবিলার নিয়ম ছিল স্পষ্ট — ইনবক্সে কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আর সে সেই নিয়মটা ভেঙেছে সেই প্রথম দিনই, আর এখন ভাঙছে আরও গভীরে। কিন্তু নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই গোপনতাটাই সিনথিয়াকে সাহস দিচ্ছিল — মিম যা করবে, তার দায় সিনথিয়ার নয়। অন্তত আজ রাতে সে নিজেকে এটাই বোঝাল।
তানভীরের মেসেজ এলো।
«নিয়ম শুনবি আগে?»
«বলো।»
«এক — যা-ই জিজ্ঞেস করি, সত্যি বলতে হবে। কিন্তু চাইলে একটা প্রশ্ন স্কিপ করতে পারবি। শুধু একটা। দুই — ডেয়ার দিলে করতে হবে, কিন্তু যদি খুব অস্বস্তি লাগে, বলবি। জোর করব না। তিন —»
একটু থামল। ডটগুলো নাচল আবার।
«তিন — মাঝরাতে এই খেলা খেলার জন্য তুই যে সাহসটা দেখালি, তার জন্য আমার সম্মান।»
সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। এই ছেলেটা — তেইশ বছরের এই অচেনা ছেলেটা — কথা বলতে জানে। ভদ্র, কিন্তু প্রতিটা কথার নিচে একটা দুষ্টু স্রোত। যেন নদীর ওপরের পানি শান্ত, নিচে টান।
«তাহলে শুরু করি?» সে লিখল।
«তুই শুরু কর। ট্রুথ না ডেয়ার?»
সিনথিয়া ভাবল এক মুহূর্ত। ডেয়ার নিলে কী দেবে কে জানে। নিরাপদ দিক থেকে শুরু করা ভালো।
«ট্রুথ।»
«আচ্ছা। সহজ দিয়ে শুরু করি।» একটু বিরতি। «এই মুহূর্তে তুই কী পরে আছিস?»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। এটাই সহজ প্রশ্ন? সে নিজের দিকে তাকাল কম্বলের নিচে — পুরনো একটা নরম কামিজ, গলার কাছটা একটু ঢিলে, নিচে সুতির পাজামা। মায়ের পুরনো কামিজ, যেটা এখন তার গায়ে হয়। এতে লজ্জার কী আছে? কিন্তু তানভীরের প্রশ্নের ভঙ্গিতে — «এই মুহূর্তে» — যেন সে তাকে দেখতে পাচ্ছে। যেন অন্ধকার ঘরে কেউ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
«পুরনো একটা কামিজ। আর পাজামা।»
«রং?»
«হালকা নীল। কেন, তুমি কি কল্পনা করছ?»
ডট নাচল। তারপর — «হয়তো।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। এই «হয়তো» শব্দটার ভেতর কত কিছু লুকিয়ে! সে কম্বলটা আরও টেনে নিল গায়ে, যেন কল্পনার চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করছে। অথচ ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা — কেউ তাকে কল্পনা করছে। সিনথিয়াকে কেউ কোনোদিন কল্পনা করেনি। মিমকে করছে।
«এবার আমার পালা,» সে লিখল দ্রুত, বিষয় বদলাতে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।»
সিনথিয়া ভাবল। কী ডেয়ার দেবে? সে তো এই খেলায় নতুন। নাবিলার সঙ্গে কখনো খেলেনি। গ্রুপে দেখেছে মেয়েরা ডেয়ার দেয় — কিন্তু সেসব ছিল মেয়েদের মধ্যে। এটা অন্যরকম।
«ডেয়ার — আমাকে একটা মজার ঘটনা বলো। তোমার জীবনের সবচেয়ে বোকার মতো মুহূর্ত।»
তানভীরের উত্তর আসতে দেরি হলো না। «ক্লাস নাইনে থাকতে, কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে উঠেছিলাম। মাঝপথে ভুলে গেলাম। পুরো হল নীরব। আমি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম — «কবিতাটা এত সুন্দর যে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে ভুলে গেছি।» পুরো হল হেসে উঠল। শিক্ষকরা পর্যন্ত।»
সিনথিয়া হেসে ফেলল, হাত দিয়ে মুখ চেপে যাতে শব্দ না হয়। «তুমি তো চালাক!»
«বাঁচার জন্য মানুষ কত কী করে। এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ট্রুথ।»
এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল। সিনথিয়া বুঝতে পারল — এবারের প্রশ্নটা সহজ হবে না।
«বলবি?» এলো প্রথমে।
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। এই «বলবি?» — তানভীরের এই ভদ্রতাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সে জোর করে না, ঠেলে দেয় না। শুধু দরজাটা খুলে রাখে, আর সিনথিয়া নিজেই ভেতরে ঢুকে পড়ে।
«বলো।»
«তোর... মাপটা কত?»
এক মুহূর্ত সিনথিয়া বুঝতেই পারল না। তারপর বুঝল — আর কান গরম হয়ে গেল। মাপ! শরীরের মাপ! এই প্রশ্নটা তাকে আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। দর্জির দোকানেও মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। আয়নার সামনে সে নিজে মেপেছে একবার — ফিতা দিয়ে, কাঁপা হাতে, দরজা বন্ধ করে।
৩৪-২৮-৩৬।
সংখ্যাগুলো তার মনে গেঁথে আছে। অর্ধেক গর্ব, অর্ধেক লজ্জা। গর্ব — কারণ গ্রুপের মেয়েরা বলে এই মাপটা «পারফেক্ট»। লজ্জা — কারণ এটা বলা মানে নিজের শরীরটাকে কারও সামনে খুলে ধরা, সংখ্যায়।
«স্কিপ করবি?» তানভীর লিখল, তার দ্বিধা টের পেয়ে। «মনে আছে, একটা স্কিপ আছে তোর।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। স্কিপ করবে? এটাই তো খেলা — সত্যি বলা। আর মিম তো সত্যি বলার জন্যই। সিনথিয়া হলে হয়তো পালাত। মিম পালায় না।
তার আঙুল কাঁপছিল। তবু টাইপ করল।
«৩৪-২৮-৩৬।»
পাঠিয়ে দিয়েই সে ফোনটা উল্টে দিল বালিশে, যেন উত্তরটা দেখতে চায় না। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কী ভাববে ছেলেটা? খুব... বেশি ভাববে? নাকি হাসবে?
ফোনটা তুলল আবার।
«ওয়াও।»
শুধু এই একটা শব্দ। তারপর — «সত্যি বলছি, মিম — এই সংখ্যাগুলো শুনে আমার... আমি জানি না কী বলব। তুই জানিস তুই কতটা...?»
সে শেষ করল না। করতে হলো না। সিনথিয়া বুঝল। আর এই অসমাপ্ত বাক্যটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁল — তানভীর crude হতে পারত। অনেক ছেলে হতো। রাফি হয়েছিল। কিন্তু তানভীর থেমে গেল — যেন সিনথিয়ার সম্মানের সীমানায় এসে দাঁড়িয়ে গেল, ভেতরে ঢুকল না।
«তুমি ভদ্র,» সিনথিয়া লিখল। «এটা তোমার সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি, জানো?»
«মানে?»
«মানে — তুমি যদি অভদ্র হতে, আমি ব্লক করে দিতাম। ভদ্র বলেই আটকে গেছি।»
«তাহলে আমার ভদ্রতাই আমার ফাঁদ?»
«তোমার ফাঁদে আমি নিজেই পা দিয়েছি।»
লিখে ফেলেই সিনথিয়া চমকে উঠল। এত সাহসী কথা সে কোথা থেকে বলছে? সিনথিয়া — কলেজের চুপচাপ মেয়েটা, যে ক্লাসে হাত তুলতে ভয় পায় — সে এমন কথা বলতে পারে? পারে না। কিন্তু মিম পারে। মিমের আঙুলে কোনো ভয় নেই।
«এবার আমি,» তানভীর লিখল। «ট্রুথ।»
সিনথিয়া ভাবল — এবার সে একটু সাহসী হবে। «তুমি কি কখনো কাউকে... সত্যিকারের পছন্দ করেছ?»
«একজনকে করেছিলাম।»
«তারপর?»
«সে জানতই না। আমি বলিনি। ভয় পেয়েছিলাম।» একটু থেমে — «তোর মতো।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «আমার মতো মানে?»
«মানে — তুইও তো কাউকে পছন্দ করিস, যে জানে না। তাই না?»
সে থমকে গেল। আরিফ। চশমার পেছনের সেই চোখ, কলেজ গেটের সেই হাসি। তানভীর কী করে জানল? নাকি শুধুই আন্দাজ?
«হয়তো,» সে লিখল।
«তার নাম বলবি না, জানি। শুধু এটা বল — সে কি তোকে কখনো ছুঁয়েছে?»
প্রশ্নটা এত সরাসরি এলো যে সিনথিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ছোঁয়া। এই শব্দটা — «ছোঁয়া» — তার শরীরে যেন সত্যিকারের ছোঁয়ার মতো লাগল।
সত্যিটা হলো — না। কেউ তাকে কখনো ছোঁয়নি। মা ছাড়া, বাবা ছাড়া — সেভাবে কেউ না। আরিফ তো দূরের কথা, তার হাতও কখনো ধরেনি। তার শরীরটা এখনো কারও হাতের স্পর্শ পায়নি — শুধু তার নিজের, অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, লজ্জায়।
«না,» সে লিখল। «কেউ না।»
এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল না। শুধু একটা মেসেজ এলো — «তাহলে তুই... একদম...?»
«হ্যাঁ।»
«ওহ, মিম।»
এই «ওহ, মিম» — এর মধ্যে এত কিছু ছিল। অবাক হওয়া, কৌতূহল, আর... একটা নরম সম্মান। যেন সে কোনো দামি জিনিসের সামনে দাঁড়িয়েছে, ছুঁতে ভয় পাচ্ছে।
«তুমি হাসছ না তো?» সিনথিয়া লিখল, হঠাৎ ভয় পেয়ে।
«হাসব কেন? আমি... আমি আসলে খুশি।»
«খুশি কেন?»
«কারণ — তুই আমাকে এই সত্যিটা বললি। এত বড় সত্যি। মানে তুই আমাকে বিশ্বাস করিস।»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। বিশ্বাস। এই শব্দটা আজ রাতে প্রথমবার সত্যি মনে হলো। সে তানভীরকে চেনে না। তার মুখ দেখেনি, গলা শোনেনি। অথচ তাকে সে এমন কথা বলছে, যা নাবিলাকেও বলেনি। যা আয়নার মেয়েটাকেও ফিসফিস করে বলতে লজ্জা পায়।
«এবার তোমার পালা,» সে লিখল গলা শুকিয়ে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ট্রুথ,» এলো উত্তর।
সিনথিয়া এবার একটু দুষ্টু হতে চাইল। «রাতে ঘুমানোর আগে তুমি কী ভাবো? সত্যি বলবা।»
«তোকে।»
একটাই শব্দ। সিনথিয়ার পুরো শরীরে শিহরন বয়ে গেল। «মিথ্যা!»
«সত্যি। গত কয়েক রাত ধরে। তোর মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। তুই অনলাইন এলেই...» সে থামল। «এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।» সিনথিয়া লিখল — আর সঙ্গে সঙ্গেই ভয় পেল। কেন ডেয়ার নিল? ট্রুথই তো নিরাপদ ছিল!
«ভয় পাচ্ছিস?»
«একটু।»
«তাহলে শোন — ডেয়ারটা কঠিন, কিন্তু খারাপ না। আমি চাই...» ডট নাচল। «আমি চাই তুই নিজেকে বর্ণনা করবি। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ধীরে ধীরে। যেমন দেখছিস, তেমন।»
সিনথিয়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে গেল। নিজেকে বর্ণনা করা! আয়নার সামনে দাঁড়ানোর কথা ভাবতেই তার মনে পড়ল দুপুরের সেই মুহূর্তটা — দরজা বন্ধ করে, কামিজ তুলে, নিজেকে প্রথমবার সত্যিকারের দেখা। «তুই সুন্দর» — আয়নার মেয়েটাকে সে বলেছিল।
কিন্তু সেটা ছিল নিজের কাছে। এটা — একজন ছেলেকে লিখে পাঠানো। প্রতিটা শব্দে নিজেকে খুলে ধরা।
«এটা... এটা খুব...» সে লিখল।
«বলবি?» তানভীর লিখল। «যদি না চাস, অন্য ডেয়ার দেবো।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল অন্ধকার ছাদের দিকে। ফ্যানটা ঘুরছে মৃদু শব্দে। তার শরীরটা কম্বলের নিচে গরম হয়ে উঠেছে। সে ভাবল — মিম কী করবে? মিম লজ্জা পায়, কিন্তু মিম পালায় না। আর... আর ভেতরে ভেতরে, সত্যি কথা হলো — সে চায়। চায় কেউ তাকে দেখুক। শুধু সংখ্যায় নয় — কথায়। চায় কেউ তার শরীরটাকে সুন্দর বলুক, যেভাবে সে আয়নায় নিজেকে বলেছিল।
«আচ্ছা,» সে লিখল। «কিন্তু ধীরে ধীরে। একটা একটা করে।»
«আমি অপেক্ষা করব। যতক্ষণ লাগে।»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনায় সে দাঁড়াল আয়নার সামনে। আর আঙুল চলতে লাগল।
«আমার চুল... কোমর পর্যন্ত। কালো। ভেজা থাকলে আরও কালো দেখায়।»
«দেখতে পাচ্ছি,» তানভীর লিখল। «তারপর?»
«কপালটা... ছোট। চোখ... বড় বড়। মা বলে হরিণের মতো।»
«হরিণের মতো চোখ... আর?»
সিনথিয়ার গাল জ্বলছে, কিন্তু আঙুল থামছে না। যেন কথাগুলো নিজে নিজে বেরিয়ে আসছে — বহুদিনের জমে থাকা কথা।
«ঠোঁট... নিচেরটা একটু ভারী। হাসলে...» সে থামল। «তুমি হাসছ?»
«একদম না। আমি শুনছি। শুধু শুনছি।»
সে চালিয়ে গেল। «গলা... সরু। গলার নিচে...» তার আঙুল কাঁপল। «বুক... তুমি তো মাপ জানোই।»
«জানি। কিন্তু তোর মুখে শুনতে চাই।»
সিনথিয়া দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়াল। «ভারী। গোল।... বোঁটাগুলো...» সে লিখতে পারল না। মুছে দিল। আবার লিখল — «বাদামি।»
«মিম...» শুধু তার নাম। কিন্তু সেই নাম ডাকার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে এভাবে ডাকেনি — এত... মনোযোগ দিয়ে।
«কোমর সরু। পেটে... একটু মেদ আছে। লজ্জা লাগে।»
«লজ্জার কিছু নেই। আমার ভালো লাগছে — তুই যেমন, তেমন।»
«নিতম্ব... ভারী।» সে লিখল দ্রুত, যেন শব্দটা তাড়াতাড়ি পার করে দিতে চায়। «পা... লম্বা। পায়ের আঙুলগুলো ছোট ছোট।»
«শেষ?»
«শেষ।»
একটু নীরবতা। তারপর তানভীরের মেসেজ — দীর্ঘ।
«মিম, তুই জানিস তুই কী করলি? তুই আমাকে তোর আয়নাটা দেখালি। আর আমি... আমি সারাজীবন এই বর্ণনাটা মনে রাখব। তুই সুন্দর। তোর লজ্জাটাও সুন্দর। তোর সাহসটাও।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখ বন্ধ। এই মুহূর্তে সে অনুভব করল — কেউ তাকে দেখেছে। সত্যিকারের দেখা। সিনথিয়াকে কলেজে কেউ দেখে না — সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। বাড়িতে সে «মেয়ে» — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে। কিন্তু মিম — মিমকে একজন দেখল। প্রতিটা বক্ররেখা, প্রতিটা লজ্জা, প্রতিটা গর্ব — সব।
«তুমি কাঁদাচ্ছ আমাকে,» সে লিখল।
«কাঁদিস না। হাস। তোর হাসিটা আমি কল্পনা করতে পারছি — হরিণের মতো চোখে।»
সিনথিয়া হাসল — চোখে পানি নিয়ে। বাইরে রাত গভীর। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে কখন, টের পায়নি।
«এবার...» সে লিখল। «আমার পালা। ট্রুথ।»
«ডেয়ার,» এলো উত্তর — তানভীর এবার নিজেই ডেয়ার নিল।
সিনথিয়া ভাবল। তার ভেতরের দুষ্টু মিমটা এবার জেগে উঠেছে — সেই মিম, যে আয়নার সামনে নিজেকে «সুন্দর» বলেছিল।
«ডেয়ার — তুমি এখন কী পরে আছো, সেটা বর্ণনা করো। আমার মতো করে।»
তানভীরের উত্তর এলো দ্রুত। «একটা পুরনো টি-শার্ট। আর...» ডট নাচল। «আর শর্টস।»
«শুধু?»
«শুধু। গরম লাগছে।»
সিনথিয়ার কল্পনায় ভেসে উঠল একটা ছবি — অন্ধকার ঘর, একটা ছেলে, পুরনো টি-শার্ট। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরাল কল্পনা থেকে। «এবার তুমি। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।»
এবার তানভীরের ডেয়ার এলো — আর সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা থমকে গেল।
«কল্পনা কর — আমি এখন তোর পাশে শুয়ে আছি। কম্বলের নিচে। অন্ধকারে। তুই কী করবি? শুধু বলবি — লিখে। কিছু করতে হবে না। শুধু... বল।»
সিনথিয়া পড়ল বারবার। «শুধু বলবি। কিছু করতে হবে না।» তানভীর জানে — সে বুঝতে পারছে সিনথিয়া কোথায় আছে, কী অবস্থায়। আর সে তাকে নিরাপদ রাখছে — কথার মধ্যে, কাজের বাইরে।
কিন্তু «শুধু বলা»-টাই তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ বলতে গেলে কল্পনা করতে হয়। আর কল্পনা করলে শরীর জেগে ওঠে।
তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধড়ফড় করছে যে মনে হচ্ছে তানভীর শুনতে পাবে — যেন ফোনের ভেতর দিয়ে শব্দটা পৌঁছে যাবে।
«বলবি?» এলো আবার — সেই ভদ্র প্রশ্ন।
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনা করল — পাশে কেউ শুয়ে আছে। গরম নিঃশ্বাস। অন্ধকারে একটা উপস্থিতি।
«প্রথমে...» সে টাইপ করল, মুছল, আবার লিখল। «প্রথমে আমি তোমার দিকে তাকাব। অন্ধকারে তোমার মুখটা দেখার চেষ্টা করব।»
«তারপর?»
«তারপর... তোমার বুকের ওপর মাথা রাখব। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনব।»
«শুনতে পাচ্ছিস?»
«হ্যাঁ। খুব জোরে ধড়ফড় করছে। আমারটার মতো।»
ডট নাচল অনেকক্ষণ। «আর?»
সিনথিয়ার আঙুল এবার আর কাঁপছে না। কল্পনাটা তাকে নিয়ে গেছে অন্য কোথাও — যেখানে লজ্জা নেই, শুধু সত্যি আছে।
«তোমার হাতটা... আমার চুলে। তুমি আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিচ্ছ। আর আমি... আমি তোমার গলার কাছে মুখ গুঁজে দিয়েছি। তোমার গন্ধ...» সে থামল। «তোমার গন্ধ কেমন, আমি জানি না। কিন্তু কল্পনায়... ভালো।»
«মিম।»
«আর...» সে লিখল, এবার আর থামল না। «আমি চাইব তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো। শক্ত করে। যেন আমি কোথাও পালাতে না পারি। যেন... যেন আমি শুধু তোমার। এই রাতটার জন্য।»
নীরবতা। দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়া ভাবল — বেশি বলে ফেলল? খুব বেশি?
তারপর এলো — «তুই জানিস তুই কী বললি?»
«জানি।»
«আমি এখন... আমি জানি না কী বলব। শুধু এটা বলি — তুই যদি সত্যি আমার পাশে থাকতিস, আমি তোকে ছাড়তাম না। কিন্তু...»
«কিন্তু?»
«কিন্তু তোর অনুমতি ছাড়া একটা আঙুলও নাড়াতাম না।»
সিনথিয়ার চোখে আবার পানি এলো। এই ছেলেটা — এই অচেনা, তেইশ বছরের ছেলেটা — তাকে এমন সম্মান দিচ্ছে, যা সে বাস্তব জীবনে কখনো পায়নি। বাস্তবে ছেলেরা তাকে দেখেই না। আর এখানে — অন্ধকারে, কল্পনায় — একজন তাকে রানির মতো রাখছে।
«তুমি... তুমি খুব ভালো, তানভীর,» সে লিখল।
«ভালো না। শুধু... তোকে হারাতে চাই না।»
এই কথাটার পর দুজনেই একটু চুপ রইল। শুধু ডটগুলো মাঝে মাঝে নাচছিল — যেন দুজনেই টাইপ করছে, মুছছে, আবার টাইপ করছে।
অবশেষে তানভীর লিখল — «শেষ রাউন্ড। ট্রুথ। আর এটা... এটা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।»
«বলবি?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «বলো।»
«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস... কারও কথা ভেবে?»
প্রশ্নটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল — লজ্জার আগুন, আর... আর অন্য কিছুর।
সত্যিটা — হ্যাঁ। গত রাতে। আরিফের মুখ কল্পনায়। কম্বলের নিচে, অন্ধকারে, মা'র টোকার আগের সেই অসমাপ্ত মুহূর্ত। সে বলবে? এই সত্যিটা বলা মানে নিজের সবচেয়ে গোপন দরজাটা খুলে দেওয়া।
«একটা স্কিপ বাকি আছে তোর,» তানভীর লিখল নরম করে। «চাইলে ব্যবহার কর।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল ছাদের দিকে। স্কিপ। সে স্কিপ করতে পারে। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে সে যা যা বলেছে — মাপ, আয়নার বর্ণনা, কল্পনার আলিঙ্গন — সব বলার পর এই একটা সত্যি লুকিয়ে কী লাভ? মিম তো সত্যি বলার জন্যই।
«হ্যাঁ,» সে লিখল। শুধু এই একটা শব্দ।
«কাকে ভেবে?»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। আরিফের মুখ ভেসে উঠল — চশমা, হাসি। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, আরিফের মুখটা একটু ঝাপসা। তার জায়গায় অন্য একটা মুখ — যার চেহারা সে জানে না, শুধু কথা জানে। ভদ্র কথা, দুষ্টু কথা।
«একজনকে,» সে লিখল। «যাকে আমি চিনি না।»
«আমাকে?»
সিনথিয়া উত্তর দিল না। শুধু লিখল — «হয়তো।»
আর এই «হয়তো»-টাই ছিল আজ রাতের সবচেয়ে সত্যি উত্তর।
সে ফোনটা এক মুহূর্তের জন্য নামিয়ে রাখল বালিশে। বুকের ভেতরটা এমন করছে যেন সে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে — এক পা এগোলেই পড়ে যাওয়া, অথচ পেছনে ফেরার ইচ্ছেটাই মরে গেছে। মিম তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সিনথিয়া — সিনথিয়া শুধু অনুসরণ করছে, চোখ বন্ধ করে।
অনেকক্ষণ কেউ কিছু লিখল না। সিনথিয়া শুধু তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — «হয়তো» শব্দটা সেখানে জ্বলছে, আর সে জানে তানভীরও তাকিয়ে আছে।
অবশেষে তানভীর লিখল — «আমার পালা। শেষ প্রশ্ন। ট্রুথ।»
«বলো।»
«তোর একটা গোপন কথা বল — যা পৃথিবীর কেউ জানে না। শুধু আমি জানব।»
সিনথিয়া থমকে গেল। গোপন কথা — যা কেউ জানে না। তার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো সত্যি ভিড় করল। যে সে আঠারো, বিশ নয়। যে সে মিরপুরে থাকে, ধানমন্ডিতে নয়। যে তার নাম সিনথিয়া, মিম নয়। যে নাবিলাও জানে না এই অ্যাকাউন্টের কথা।
কিন্তু এগুলো বলা যাবে না। এগুলো বললে মিম মরে যাবে। আর মিম মরলে... এই রাতটাও মরে যাবে।
তাহলে কোন সত্যিটা বলবে? কোনটা সেই গোপন কথা, যা বললে মিম বাঁচবে, মরবে না — বরং আরও সত্যি হবে?
সে চোখ বন্ধ করল। আর হঠাৎ বুঝল — সবচেয়ে বড় গোপন কথাটা আসলে মিম নিজেই।
«আমি...» সে টাইপ করল ধীরে ধীরে। «আমি বাস্তবে যেমন, এখানে তেমন নই।»
«মানে?»
«মানে — বাস্তবে আমি চুপচাপ। কেউ আমাকে লক্ষ্য করে না। আমি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাই। কিন্তু এখানে... তোমার সামনে... আমি যা বলতে চাই, বলতে পারি। যা ভাবি, লিখতে পারি।» সে থামল, তারপর লিখল — «মিম আসলে আমি। আসল আমি। আর বাইরের আমি... সেটাই মুখোশ।»
এই কথাগুলো লিখে সিনথিয়ার বুকটা হালকা হয়ে গেল — যেন বহুদিনের একটা পাথর নেমে গেল। এটাই সত্যি। সিনথিয়া — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে, পড়ুয়া মেয়ে — সেটা সবার জন্য সাজানো একটা চরিত্র। আর মিম — রাতের অন্ধকারে, কম্বলের নিচে, অচেনা একজনের সামনে নিজেকে খুলে ধরা মেয়েটা — সেটাই সে। আসল সে।
তানভীরের উত্তর এলো দেরিতে — কিন্তু ভারী।
«তাহলে আজ রাতে আমি ভাগ্যবান। কারণ আমি আসল তোকে চিনলাম। যাকে পৃথিবীর কেউ চেনে না।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখের কোণ ভিজে গেছে। «তুমি আমাকে... দেখেছ। সত্যিকারের।»
«প্রতিটা শব্দে।»
ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। দুজনেই জানে — এবার থামতে হবে। কিন্তু কেউ থামতে চাইছে না।
«কাল আবার?» সিনথিয়া লিখল — আর লিখেই লজ্জা পেল। এতটা চাওয়া কি ঠিক?
«প্রতিদিন,» তানভীর লিখল। «যতদিন তুই চাস।»
«শুভরাত্রি, তানভীর।»
«শুভরাত্রি, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে — যেখানে তুই চাস।»
সিনথিয়া হাসল। ফোনটা রাখতে যাবে — ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ এলো।
«আর শোন।»
«বলো।»
ডট নাচল। অনেকক্ষণ। তারপর —
«কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»
সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর।
ছবি। মুখ ছাড়া — কিন্তু তবু ছবি। তার শরীরের ছবি। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না, ভুলেও না।
সে উত্তর দিল না। টাইপ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল মেসেজটার দিকে — অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, ফোনের নীল আলোয় তার মুখটা ভাসছে।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
বালিশের পাশে রাখা ডায়েরিটা টেনে নিল — «গোপন ডায়েরি»। কলমটা হাতে নিয়ে একটা লাইন লিখল, তারপর কলম থামিয়ে রেখে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে।
«মিম আজ একটু বেশি সত্যি হয়ে গেল।»
«খেলব।»
মেসেজটা পাঠিয়ে সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, যেন স্ক্রিনের আলোটা কেউ দেখে ফেলবে। ঘর অন্ধকার। দরজায় ছিটকিনি। পাশের ঘর থেকে বাবার নাক ডাকার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। মা অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে। সিয়ামের ঘর নীরব। আর সে — কম্বলের নিচে, মিম হয়ে, এক অচেনা ছেলের সঙ্গে খেলতে বসেছে এমন এক খেলা, যার নাম শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে।
ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার।
স্ক্রিনে তিনটে ডট নাচছে। তানভীর টাইপ করছে। সিনথিয়ার আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ভাবল — নাবিলা যদি জানত! নাবিলার নিয়ম ছিল স্পষ্ট — ইনবক্সে কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আর সে সেই নিয়মটা ভেঙেছে সেই প্রথম দিনই, আর এখন ভাঙছে আরও গভীরে। কিন্তু নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই গোপনতাটাই সিনথিয়াকে সাহস দিচ্ছিল — মিম যা করবে, তার দায় সিনথিয়ার নয়। অন্তত আজ রাতে সে নিজেকে এটাই বোঝাল।
তানভীরের মেসেজ এলো।
«নিয়ম শুনবি আগে?»
«বলো।»
«এক — যা-ই জিজ্ঞেস করি, সত্যি বলতে হবে। কিন্তু চাইলে একটা প্রশ্ন স্কিপ করতে পারবি। শুধু একটা। দুই — ডেয়ার দিলে করতে হবে, কিন্তু যদি খুব অস্বস্তি লাগে, বলবি। জোর করব না। তিন —»
একটু থামল। ডটগুলো নাচল আবার।
«তিন — মাঝরাতে এই খেলা খেলার জন্য তুই যে সাহসটা দেখালি, তার জন্য আমার সম্মান।»
সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। এই ছেলেটা — তেইশ বছরের এই অচেনা ছেলেটা — কথা বলতে জানে। ভদ্র, কিন্তু প্রতিটা কথার নিচে একটা দুষ্টু স্রোত। যেন নদীর ওপরের পানি শান্ত, নিচে টান।
«তাহলে শুরু করি?» সে লিখল।
«তুই শুরু কর। ট্রুথ না ডেয়ার?»
সিনথিয়া ভাবল এক মুহূর্ত। ডেয়ার নিলে কী দেবে কে জানে। নিরাপদ দিক থেকে শুরু করা ভালো।
«ট্রুথ।»
«আচ্ছা। সহজ দিয়ে শুরু করি।» একটু বিরতি। «এই মুহূর্তে তুই কী পরে আছিস?»
সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। এটাই সহজ প্রশ্ন? সে নিজের দিকে তাকাল কম্বলের নিচে — পুরনো একটা নরম কামিজ, গলার কাছটা একটু ঢিলে, নিচে সুতির পাজামা। মায়ের পুরনো কামিজ, যেটা এখন তার গায়ে হয়। এতে লজ্জার কী আছে? কিন্তু তানভীরের প্রশ্নের ভঙ্গিতে — «এই মুহূর্তে» — যেন সে তাকে দেখতে পাচ্ছে। যেন অন্ধকার ঘরে কেউ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
«পুরনো একটা কামিজ। আর পাজামা।»
«রং?»
«হালকা নীল। কেন, তুমি কি কল্পনা করছ?»
ডট নাচল। তারপর — «হয়তো।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। এই «হয়তো» শব্দটার ভেতর কত কিছু লুকিয়ে! সে কম্বলটা আরও টেনে নিল গায়ে, যেন কল্পনার চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করছে। অথচ ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা — কেউ তাকে কল্পনা করছে। সিনথিয়াকে কেউ কোনোদিন কল্পনা করেনি। মিমকে করছে।
«এবার আমার পালা,» সে লিখল দ্রুত, বিষয় বদলাতে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।»
সিনথিয়া ভাবল। কী ডেয়ার দেবে? সে তো এই খেলায় নতুন। নাবিলার সঙ্গে কখনো খেলেনি। গ্রুপে দেখেছে মেয়েরা ডেয়ার দেয় — কিন্তু সেসব ছিল মেয়েদের মধ্যে। এটা অন্যরকম।
«ডেয়ার — আমাকে একটা মজার ঘটনা বলো। তোমার জীবনের সবচেয়ে বোকার মতো মুহূর্ত।»
তানভীরের উত্তর আসতে দেরি হলো না। «ক্লাস নাইনে থাকতে, কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে উঠেছিলাম। মাঝপথে ভুলে গেলাম। পুরো হল নীরব। আমি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম — «কবিতাটা এত সুন্দর যে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে ভুলে গেছি।» পুরো হল হেসে উঠল। শিক্ষকরা পর্যন্ত।»
সিনথিয়া হেসে ফেলল, হাত দিয়ে মুখ চেপে যাতে শব্দ না হয়। «তুমি তো চালাক!»
«বাঁচার জন্য মানুষ কত কী করে। এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ট্রুথ।»
এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল। সিনথিয়া বুঝতে পারল — এবারের প্রশ্নটা সহজ হবে না।
«বলবি?» এলো প্রথমে।
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। এই «বলবি?» — তানভীরের এই ভদ্রতাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সে জোর করে না, ঠেলে দেয় না। শুধু দরজাটা খুলে রাখে, আর সিনথিয়া নিজেই ভেতরে ঢুকে পড়ে।
«বলো।»
«তোর... মাপটা কত?»
এক মুহূর্ত সিনথিয়া বুঝতেই পারল না। তারপর বুঝল — আর কান গরম হয়ে গেল। মাপ! শরীরের মাপ! এই প্রশ্নটা তাকে আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। দর্জির দোকানেও মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। আয়নার সামনে সে নিজে মেপেছে একবার — ফিতা দিয়ে, কাঁপা হাতে, দরজা বন্ধ করে।
৩৪-২৮-৩৬।
সংখ্যাগুলো তার মনে গেঁথে আছে। অর্ধেক গর্ব, অর্ধেক লজ্জা। গর্ব — কারণ গ্রুপের মেয়েরা বলে এই মাপটা «পারফেক্ট»। লজ্জা — কারণ এটা বলা মানে নিজের শরীরটাকে কারও সামনে খুলে ধরা, সংখ্যায়।
«স্কিপ করবি?» তানভীর লিখল, তার দ্বিধা টের পেয়ে। «মনে আছে, একটা স্কিপ আছে তোর।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। স্কিপ করবে? এটাই তো খেলা — সত্যি বলা। আর মিম তো সত্যি বলার জন্যই। সিনথিয়া হলে হয়তো পালাত। মিম পালায় না।
তার আঙুল কাঁপছিল। তবু টাইপ করল।
«৩৪-২৮-৩৬।»
পাঠিয়ে দিয়েই সে ফোনটা উল্টে দিল বালিশে, যেন উত্তরটা দেখতে চায় না। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কী ভাববে ছেলেটা? খুব... বেশি ভাববে? নাকি হাসবে?
ফোনটা তুলল আবার।
«ওয়াও।»
শুধু এই একটা শব্দ। তারপর — «সত্যি বলছি, মিম — এই সংখ্যাগুলো শুনে আমার... আমি জানি না কী বলব। তুই জানিস তুই কতটা...?»
সে শেষ করল না। করতে হলো না। সিনথিয়া বুঝল। আর এই অসমাপ্ত বাক্যটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁল — তানভীর crude হতে পারত। অনেক ছেলে হতো। রাফি হয়েছিল। কিন্তু তানভীর থেমে গেল — যেন সিনথিয়ার সম্মানের সীমানায় এসে দাঁড়িয়ে গেল, ভেতরে ঢুকল না।
«তুমি ভদ্র,» সিনথিয়া লিখল। «এটা তোমার সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি, জানো?»
«মানে?»
«মানে — তুমি যদি অভদ্র হতে, আমি ব্লক করে দিতাম। ভদ্র বলেই আটকে গেছি।»
«তাহলে আমার ভদ্রতাই আমার ফাঁদ?»
«তোমার ফাঁদে আমি নিজেই পা দিয়েছি।»
লিখে ফেলেই সিনথিয়া চমকে উঠল। এত সাহসী কথা সে কোথা থেকে বলছে? সিনথিয়া — কলেজের চুপচাপ মেয়েটা, যে ক্লাসে হাত তুলতে ভয় পায় — সে এমন কথা বলতে পারে? পারে না। কিন্তু মিম পারে। মিমের আঙুলে কোনো ভয় নেই।
«এবার আমি,» তানভীর লিখল। «ট্রুথ।»
সিনথিয়া ভাবল — এবার সে একটু সাহসী হবে। «তুমি কি কখনো কাউকে... সত্যিকারের পছন্দ করেছ?»
«একজনকে করেছিলাম।»
«তারপর?»
«সে জানতই না। আমি বলিনি। ভয় পেয়েছিলাম।» একটু থেমে — «তোর মতো।»
সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «আমার মতো মানে?»
«মানে — তুইও তো কাউকে পছন্দ করিস, যে জানে না। তাই না?»
সে থমকে গেল। আরিফ। চশমার পেছনের সেই চোখ, কলেজ গেটের সেই হাসি। তানভীর কী করে জানল? নাকি শুধুই আন্দাজ?
«হয়তো,» সে লিখল।
«তার নাম বলবি না, জানি। শুধু এটা বল — সে কি তোকে কখনো ছুঁয়েছে?»
প্রশ্নটা এত সরাসরি এলো যে সিনথিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ছোঁয়া। এই শব্দটা — «ছোঁয়া» — তার শরীরে যেন সত্যিকারের ছোঁয়ার মতো লাগল।
সত্যিটা হলো — না। কেউ তাকে কখনো ছোঁয়নি। মা ছাড়া, বাবা ছাড়া — সেভাবে কেউ না। আরিফ তো দূরের কথা, তার হাতও কখনো ধরেনি। তার শরীরটা এখনো কারও হাতের স্পর্শ পায়নি — শুধু তার নিজের, অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, লজ্জায়।
«না,» সে লিখল। «কেউ না।»
এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল না। শুধু একটা মেসেজ এলো — «তাহলে তুই... একদম...?»
«হ্যাঁ।»
«ওহ, মিম।»
এই «ওহ, মিম» — এর মধ্যে এত কিছু ছিল। অবাক হওয়া, কৌতূহল, আর... একটা নরম সম্মান। যেন সে কোনো দামি জিনিসের সামনে দাঁড়িয়েছে, ছুঁতে ভয় পাচ্ছে।
«তুমি হাসছ না তো?» সিনথিয়া লিখল, হঠাৎ ভয় পেয়ে।
«হাসব কেন? আমি... আমি আসলে খুশি।»
«খুশি কেন?»
«কারণ — তুই আমাকে এই সত্যিটা বললি। এত বড় সত্যি। মানে তুই আমাকে বিশ্বাস করিস।»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। বিশ্বাস। এই শব্দটা আজ রাতে প্রথমবার সত্যি মনে হলো। সে তানভীরকে চেনে না। তার মুখ দেখেনি, গলা শোনেনি। অথচ তাকে সে এমন কথা বলছে, যা নাবিলাকেও বলেনি। যা আয়নার মেয়েটাকেও ফিসফিস করে বলতে লজ্জা পায়।
«এবার তোমার পালা,» সে লিখল গলা শুকিয়ে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ট্রুথ,» এলো উত্তর।
সিনথিয়া এবার একটু দুষ্টু হতে চাইল। «রাতে ঘুমানোর আগে তুমি কী ভাবো? সত্যি বলবা।»
«তোকে।»
একটাই শব্দ। সিনথিয়ার পুরো শরীরে শিহরন বয়ে গেল। «মিথ্যা!»
«সত্যি। গত কয়েক রাত ধরে। তোর মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। তুই অনলাইন এলেই...» সে থামল। «এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।» সিনথিয়া লিখল — আর সঙ্গে সঙ্গেই ভয় পেল। কেন ডেয়ার নিল? ট্রুথই তো নিরাপদ ছিল!
«ভয় পাচ্ছিস?»
«একটু।»
«তাহলে শোন — ডেয়ারটা কঠিন, কিন্তু খারাপ না। আমি চাই...» ডট নাচল। «আমি চাই তুই নিজেকে বর্ণনা করবি। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ধীরে ধীরে। যেমন দেখছিস, তেমন।»
সিনথিয়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে গেল। নিজেকে বর্ণনা করা! আয়নার সামনে দাঁড়ানোর কথা ভাবতেই তার মনে পড়ল দুপুরের সেই মুহূর্তটা — দরজা বন্ধ করে, কামিজ তুলে, নিজেকে প্রথমবার সত্যিকারের দেখা। «তুই সুন্দর» — আয়নার মেয়েটাকে সে বলেছিল।
কিন্তু সেটা ছিল নিজের কাছে। এটা — একজন ছেলেকে লিখে পাঠানো। প্রতিটা শব্দে নিজেকে খুলে ধরা।
«এটা... এটা খুব...» সে লিখল।
«বলবি?» তানভীর লিখল। «যদি না চাস, অন্য ডেয়ার দেবো।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল অন্ধকার ছাদের দিকে। ফ্যানটা ঘুরছে মৃদু শব্দে। তার শরীরটা কম্বলের নিচে গরম হয়ে উঠেছে। সে ভাবল — মিম কী করবে? মিম লজ্জা পায়, কিন্তু মিম পালায় না। আর... আর ভেতরে ভেতরে, সত্যি কথা হলো — সে চায়। চায় কেউ তাকে দেখুক। শুধু সংখ্যায় নয় — কথায়। চায় কেউ তার শরীরটাকে সুন্দর বলুক, যেভাবে সে আয়নায় নিজেকে বলেছিল।
«আচ্ছা,» সে লিখল। «কিন্তু ধীরে ধীরে। একটা একটা করে।»
«আমি অপেক্ষা করব। যতক্ষণ লাগে।»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনায় সে দাঁড়াল আয়নার সামনে। আর আঙুল চলতে লাগল।
«আমার চুল... কোমর পর্যন্ত। কালো। ভেজা থাকলে আরও কালো দেখায়।»
«দেখতে পাচ্ছি,» তানভীর লিখল। «তারপর?»
«কপালটা... ছোট। চোখ... বড় বড়। মা বলে হরিণের মতো।»
«হরিণের মতো চোখ... আর?»
সিনথিয়ার গাল জ্বলছে, কিন্তু আঙুল থামছে না। যেন কথাগুলো নিজে নিজে বেরিয়ে আসছে — বহুদিনের জমে থাকা কথা।
«ঠোঁট... নিচেরটা একটু ভারী। হাসলে...» সে থামল। «তুমি হাসছ?»
«একদম না। আমি শুনছি। শুধু শুনছি।»
সে চালিয়ে গেল। «গলা... সরু। গলার নিচে...» তার আঙুল কাঁপল। «বুক... তুমি তো মাপ জানোই।»
«জানি। কিন্তু তোর মুখে শুনতে চাই।»
সিনথিয়া দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়াল। «ভারী। গোল।... বোঁটাগুলো...» সে লিখতে পারল না। মুছে দিল। আবার লিখল — «বাদামি।»
«মিম...» শুধু তার নাম। কিন্তু সেই নাম ডাকার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে এভাবে ডাকেনি — এত... মনোযোগ দিয়ে।
«কোমর সরু। পেটে... একটু মেদ আছে। লজ্জা লাগে।»
«লজ্জার কিছু নেই। আমার ভালো লাগছে — তুই যেমন, তেমন।»
«নিতম্ব... ভারী।» সে লিখল দ্রুত, যেন শব্দটা তাড়াতাড়ি পার করে দিতে চায়। «পা... লম্বা। পায়ের আঙুলগুলো ছোট ছোট।»
«শেষ?»
«শেষ।»
একটু নীরবতা। তারপর তানভীরের মেসেজ — দীর্ঘ।
«মিম, তুই জানিস তুই কী করলি? তুই আমাকে তোর আয়নাটা দেখালি। আর আমি... আমি সারাজীবন এই বর্ণনাটা মনে রাখব। তুই সুন্দর। তোর লজ্জাটাও সুন্দর। তোর সাহসটাও।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখ বন্ধ। এই মুহূর্তে সে অনুভব করল — কেউ তাকে দেখেছে। সত্যিকারের দেখা। সিনথিয়াকে কলেজে কেউ দেখে না — সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। বাড়িতে সে «মেয়ে» — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে। কিন্তু মিম — মিমকে একজন দেখল। প্রতিটা বক্ররেখা, প্রতিটা লজ্জা, প্রতিটা গর্ব — সব।
«তুমি কাঁদাচ্ছ আমাকে,» সে লিখল।
«কাঁদিস না। হাস। তোর হাসিটা আমি কল্পনা করতে পারছি — হরিণের মতো চোখে।»
সিনথিয়া হাসল — চোখে পানি নিয়ে। বাইরে রাত গভীর। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে কখন, টের পায়নি।
«এবার...» সে লিখল। «আমার পালা। ট্রুথ।»
«ডেয়ার,» এলো উত্তর — তানভীর এবার নিজেই ডেয়ার নিল।
সিনথিয়া ভাবল। তার ভেতরের দুষ্টু মিমটা এবার জেগে উঠেছে — সেই মিম, যে আয়নার সামনে নিজেকে «সুন্দর» বলেছিল।
«ডেয়ার — তুমি এখন কী পরে আছো, সেটা বর্ণনা করো। আমার মতো করে।»
তানভীরের উত্তর এলো দ্রুত। «একটা পুরনো টি-শার্ট। আর...» ডট নাচল। «আর শর্টস।»
«শুধু?»
«শুধু। গরম লাগছে।»
সিনথিয়ার কল্পনায় ভেসে উঠল একটা ছবি — অন্ধকার ঘর, একটা ছেলে, পুরনো টি-শার্ট। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরাল কল্পনা থেকে। «এবার তুমি। ট্রুথ না ডেয়ার?»
«ডেয়ার।»
এবার তানভীরের ডেয়ার এলো — আর সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা থমকে গেল।
«কল্পনা কর — আমি এখন তোর পাশে শুয়ে আছি। কম্বলের নিচে। অন্ধকারে। তুই কী করবি? শুধু বলবি — লিখে। কিছু করতে হবে না। শুধু... বল।»
সিনথিয়া পড়ল বারবার। «শুধু বলবি। কিছু করতে হবে না।» তানভীর জানে — সে বুঝতে পারছে সিনথিয়া কোথায় আছে, কী অবস্থায়। আর সে তাকে নিরাপদ রাখছে — কথার মধ্যে, কাজের বাইরে।
কিন্তু «শুধু বলা»-টাই তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ বলতে গেলে কল্পনা করতে হয়। আর কল্পনা করলে শরীর জেগে ওঠে।
তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধড়ফড় করছে যে মনে হচ্ছে তানভীর শুনতে পাবে — যেন ফোনের ভেতর দিয়ে শব্দটা পৌঁছে যাবে।
«বলবি?» এলো আবার — সেই ভদ্র প্রশ্ন।
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনা করল — পাশে কেউ শুয়ে আছে। গরম নিঃশ্বাস। অন্ধকারে একটা উপস্থিতি।
«প্রথমে...» সে টাইপ করল, মুছল, আবার লিখল। «প্রথমে আমি তোমার দিকে তাকাব। অন্ধকারে তোমার মুখটা দেখার চেষ্টা করব।»
«তারপর?»
«তারপর... তোমার বুকের ওপর মাথা রাখব। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনব।»
«শুনতে পাচ্ছিস?»
«হ্যাঁ। খুব জোরে ধড়ফড় করছে। আমারটার মতো।»
ডট নাচল অনেকক্ষণ। «আর?»
সিনথিয়ার আঙুল এবার আর কাঁপছে না। কল্পনাটা তাকে নিয়ে গেছে অন্য কোথাও — যেখানে লজ্জা নেই, শুধু সত্যি আছে।
«তোমার হাতটা... আমার চুলে। তুমি আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিচ্ছ। আর আমি... আমি তোমার গলার কাছে মুখ গুঁজে দিয়েছি। তোমার গন্ধ...» সে থামল। «তোমার গন্ধ কেমন, আমি জানি না। কিন্তু কল্পনায়... ভালো।»
«মিম।»
«আর...» সে লিখল, এবার আর থামল না। «আমি চাইব তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো। শক্ত করে। যেন আমি কোথাও পালাতে না পারি। যেন... যেন আমি শুধু তোমার। এই রাতটার জন্য।»
নীরবতা। দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়া ভাবল — বেশি বলে ফেলল? খুব বেশি?
তারপর এলো — «তুই জানিস তুই কী বললি?»
«জানি।»
«আমি এখন... আমি জানি না কী বলব। শুধু এটা বলি — তুই যদি সত্যি আমার পাশে থাকতিস, আমি তোকে ছাড়তাম না। কিন্তু...»
«কিন্তু?»
«কিন্তু তোর অনুমতি ছাড়া একটা আঙুলও নাড়াতাম না।»
সিনথিয়ার চোখে আবার পানি এলো। এই ছেলেটা — এই অচেনা, তেইশ বছরের ছেলেটা — তাকে এমন সম্মান দিচ্ছে, যা সে বাস্তব জীবনে কখনো পায়নি। বাস্তবে ছেলেরা তাকে দেখেই না। আর এখানে — অন্ধকারে, কল্পনায় — একজন তাকে রানির মতো রাখছে।
«তুমি... তুমি খুব ভালো, তানভীর,» সে লিখল।
«ভালো না। শুধু... তোকে হারাতে চাই না।»
এই কথাটার পর দুজনেই একটু চুপ রইল। শুধু ডটগুলো মাঝে মাঝে নাচছিল — যেন দুজনেই টাইপ করছে, মুছছে, আবার টাইপ করছে।
অবশেষে তানভীর লিখল — «শেষ রাউন্ড। ট্রুথ। আর এটা... এটা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।»
«বলবি?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «বলো।»
«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস... কারও কথা ভেবে?»
প্রশ্নটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল — লজ্জার আগুন, আর... আর অন্য কিছুর।
সত্যিটা — হ্যাঁ। গত রাতে। আরিফের মুখ কল্পনায়। কম্বলের নিচে, অন্ধকারে, মা'র টোকার আগের সেই অসমাপ্ত মুহূর্ত। সে বলবে? এই সত্যিটা বলা মানে নিজের সবচেয়ে গোপন দরজাটা খুলে দেওয়া।
«একটা স্কিপ বাকি আছে তোর,» তানভীর লিখল নরম করে। «চাইলে ব্যবহার কর।»
সিনথিয়া তাকিয়ে রইল ছাদের দিকে। স্কিপ। সে স্কিপ করতে পারে। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে সে যা যা বলেছে — মাপ, আয়নার বর্ণনা, কল্পনার আলিঙ্গন — সব বলার পর এই একটা সত্যি লুকিয়ে কী লাভ? মিম তো সত্যি বলার জন্যই।
«হ্যাঁ,» সে লিখল। শুধু এই একটা শব্দ।
«কাকে ভেবে?»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। আরিফের মুখ ভেসে উঠল — চশমা, হাসি। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, আরিফের মুখটা একটু ঝাপসা। তার জায়গায় অন্য একটা মুখ — যার চেহারা সে জানে না, শুধু কথা জানে। ভদ্র কথা, দুষ্টু কথা।
«একজনকে,» সে লিখল। «যাকে আমি চিনি না।»
«আমাকে?»
সিনথিয়া উত্তর দিল না। শুধু লিখল — «হয়তো।»
আর এই «হয়তো»-টাই ছিল আজ রাতের সবচেয়ে সত্যি উত্তর।
সে ফোনটা এক মুহূর্তের জন্য নামিয়ে রাখল বালিশে। বুকের ভেতরটা এমন করছে যেন সে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে — এক পা এগোলেই পড়ে যাওয়া, অথচ পেছনে ফেরার ইচ্ছেটাই মরে গেছে। মিম তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সিনথিয়া — সিনথিয়া শুধু অনুসরণ করছে, চোখ বন্ধ করে।
অনেকক্ষণ কেউ কিছু লিখল না। সিনথিয়া শুধু তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — «হয়তো» শব্দটা সেখানে জ্বলছে, আর সে জানে তানভীরও তাকিয়ে আছে।
অবশেষে তানভীর লিখল — «আমার পালা। শেষ প্রশ্ন। ট্রুথ।»
«বলো।»
«তোর একটা গোপন কথা বল — যা পৃথিবীর কেউ জানে না। শুধু আমি জানব।»
সিনথিয়া থমকে গেল। গোপন কথা — যা কেউ জানে না। তার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো সত্যি ভিড় করল। যে সে আঠারো, বিশ নয়। যে সে মিরপুরে থাকে, ধানমন্ডিতে নয়। যে তার নাম সিনথিয়া, মিম নয়। যে নাবিলাও জানে না এই অ্যাকাউন্টের কথা।
কিন্তু এগুলো বলা যাবে না। এগুলো বললে মিম মরে যাবে। আর মিম মরলে... এই রাতটাও মরে যাবে।
তাহলে কোন সত্যিটা বলবে? কোনটা সেই গোপন কথা, যা বললে মিম বাঁচবে, মরবে না — বরং আরও সত্যি হবে?
সে চোখ বন্ধ করল। আর হঠাৎ বুঝল — সবচেয়ে বড় গোপন কথাটা আসলে মিম নিজেই।
«আমি...» সে টাইপ করল ধীরে ধীরে। «আমি বাস্তবে যেমন, এখানে তেমন নই।»
«মানে?»
«মানে — বাস্তবে আমি চুপচাপ। কেউ আমাকে লক্ষ্য করে না। আমি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাই। কিন্তু এখানে... তোমার সামনে... আমি যা বলতে চাই, বলতে পারি। যা ভাবি, লিখতে পারি।» সে থামল, তারপর লিখল — «মিম আসলে আমি। আসল আমি। আর বাইরের আমি... সেটাই মুখোশ।»
এই কথাগুলো লিখে সিনথিয়ার বুকটা হালকা হয়ে গেল — যেন বহুদিনের একটা পাথর নেমে গেল। এটাই সত্যি। সিনথিয়া — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে, পড়ুয়া মেয়ে — সেটা সবার জন্য সাজানো একটা চরিত্র। আর মিম — রাতের অন্ধকারে, কম্বলের নিচে, অচেনা একজনের সামনে নিজেকে খুলে ধরা মেয়েটা — সেটাই সে। আসল সে।
তানভীরের উত্তর এলো দেরিতে — কিন্তু ভারী।
«তাহলে আজ রাতে আমি ভাগ্যবান। কারণ আমি আসল তোকে চিনলাম। যাকে পৃথিবীর কেউ চেনে না।»
সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখের কোণ ভিজে গেছে। «তুমি আমাকে... দেখেছ। সত্যিকারের।»
«প্রতিটা শব্দে।»
ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। দুজনেই জানে — এবার থামতে হবে। কিন্তু কেউ থামতে চাইছে না।
«কাল আবার?» সিনথিয়া লিখল — আর লিখেই লজ্জা পেল। এতটা চাওয়া কি ঠিক?
«প্রতিদিন,» তানভীর লিখল। «যতদিন তুই চাস।»
«শুভরাত্রি, তানভীর।»
«শুভরাত্রি, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে — যেখানে তুই চাস।»
সিনথিয়া হাসল। ফোনটা রাখতে যাবে — ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ এলো।
«আর শোন।»
«বলো।»
ডট নাচল। অনেকক্ষণ। তারপর —
«কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»
সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর।
ছবি। মুখ ছাড়া — কিন্তু তবু ছবি। তার শরীরের ছবি। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না, ভুলেও না।
সে উত্তর দিল না। টাইপ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল মেসেজটার দিকে — অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, ফোনের নীল আলোয় তার মুখটা ভাসছে।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
বালিশের পাশে রাখা ডায়েরিটা টেনে নিল — «গোপন ডায়েরি»। কলমটা হাতে নিয়ে একটা লাইন লিখল, তারপর কলম থামিয়ে রেখে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে।
«মিম আজ একটু বেশি সত্যি হয়ে গেল।»


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)