26-09-2026, 05:39 PM
প্রথম কথা
পরদিনটা সিনথিয়ার কাটল এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনে। দিনের আলোয় সে ছিল সেই চেনা সিনথিয়া — ক্লাসে মনোযোগী ছাত্রী, টিফিনে নাবিলার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, বাসায় মা'র সাহায্যকারী মেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য একটা মেয়ে জেগে ছিল — মিম। রাতের অন্ধকারে ফোনের স্ক্রিনে যার জন্ম হয়েছিল, দিনের আলোতেও যে ঘুমাচ্ছিল না।
কলেজে নাবিলা তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকাল, "কী রে, আজ এত চুপচাপ কেন?"
"কিছু না," সিনথিয়া ব্যাগের ফিতা নাড়াচাড়া করল। "রাতে ঘুম হয়নি।"
নাবিলা চোখ টিপল, "ঘুম হয়নি, না? গ্রুপে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি বুঝি?"
সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। "তুই কী করে জানলি?"
"তোর চোখ দেখে।" নাবিলা হাসল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, "শোন, সাবধানে থাকিস। আর মনে রাখিস আমার কথা — কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না। ওই ছেলেগুলোর মুখে মধু, মনে বিষ।"
সিনথিয়া গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। কারণ গত রাতে, মিম আক্তারের ইনবক্সে, ইতিমধ্যে তিনটা মেসেজ জমা হয়েছিল। আর সে সেগুলো পড়েছিল। সবগুলো। একটাও উত্তর দেয়নি — কিন্তু পড়েছিল। আর পড়ার সময় তার হাত কাঁপছিল।
সারাদিন ক্লাসে তার মন ছিল ওই তিনটা মেসেজে। বাংলা ম্যাডাম যখন সন্ধি-সমাস পড়াচ্ছিলেন, সিনথিয়ার চোখ ছিল বোর্ডে, কিন্তু মন ছিল ফোনের স্ক্রিনে — কে লিখেছে? কী লিখেছে? টিফিনে তানিশা যখন গল্প করছিল পাড়ার একটা বিয়ে নিয়ে, সিনথিয়া শুনছিল না। তার ভেতরে মিম ফিসফিস করছিল — "খুলে দেখ... একবার দেখ..."
বাসায় ফিরে সে অপেক্ষা করল রাতের। মা'র সঙ্গে রান্নায় হাত লাগাল, সিয়ামের পড়া দেখিয়ে দিল, বাবার সঙ্গে খবরের শিরোনাম নিয়ে দুটো কথা বলল। সবই যান্ত্রিক। তার আসল জীবন শুরু হবে রাত এগারোটার পর, যখন দরজার ছিটকিনি লাগবে।
অবশেষে রাত হলো। দরজা বন্ধ, লাইট নেভানো, ইয়ারফোন কানে। কাঁপা হাতে সে মিম আক্তারের অ্যাকাউন্টে ঢুকল। ইনবক্সে তিনটা নাম জ্বলজ্বল করছিল। প্রথমটা খুলতেই তার মুখটা কুঁচকে গেল।
রাফি। বয়স ২৪। প্রোফাইল ছবিতে জিম করা শরীর, সানগ্লাস পরা মুখ।
«হাই।»
«কী রে মাল, রিপ্লাই দিস না কেন?»
«ছবি দে একটা। ফিগারটা কেমন দেখি। শরম পাস না, আমি কাউকে দেখাব না।»
সিনথিয়ার গা ঘিনঘিন করে উঠল। ওই শব্দটা — যেন সে মানুষ না, বাজারের পণ্য। তার মনে পড়ল নাবিলার গলা — "কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না, ব্লক করে দিবি।" এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। ব্লক বাটনে আঙুল রাখল, এক সেকেন্ড থমকাল, তারপর চাপ দিল।
হয়ে গেছে। রাফি নামের ছেলেটা তার জগৎ থেকে মুছে গেল।
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু সেই ধড়ফড়ানির ভেতরে একটা অদ্ভুত গর্বও ছিল। সে পেরেছে। সে নিজেকে বাঁচিয়েছে। নাবিলা যদি জানত, বলত — "এই তো আমার বান্ধবী।" কিন্তু নাবিলা জানবে না। কারণ নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই ভাবনাটা আসতেই গর্বের পাশাপাশি একটা চিনচিনে অপরাধবোধও জাগল। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু — আর সে-ই নাবিলার কাছে মিথ্যে বলছে। প্রতিদিন। প্রতিটা হাসির আড়ালে।
সে মিমের প্রোফাইলটা খুলল। প্রোফাইল ছবিতে একটা সিলুয়েট — মুখহীন এক মেয়ের অবয়ব, ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। নিজের কোনো ছবি সে দেবে না — এই একটা নিয়ম সে ভাঙবে না, কখনো না। কভারে একটা উক্তি — «রাত আমাদের উলঙ্গ করে।» বন্ধুর তালিকায় সংখ্যা বাড়ছে — অচেনা নাম, অচেনা মুখ। এই জগতে সে কেউ না — আবার সবাই। আসল জীবনে সে সিনথিয়া — ভদ্র, শান্ত, নিয়ম মানা মেয়ে। এখানে সে মিম — যে ব্লক করতে পারে এক সেকেন্ডে, যে খেলতে জানে কথার খেলা। এই দুটো মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ফিরে যাওয়ার রাস্তা সে আর দেখতে পাচ্ছিল না। আর সত্যি বলতে কী — সে ফিরতে চাইছিলও না।
সে দ্বিতীয় মেসেজটা খুলল। নামটা অচেনা — সুমন, না রানা, কী যেন। ছবিতে একটা ঝাপসা সেলফি।
«Hi.»
«kemon acho?»
«tumi ki Dhaka te thako?»
«reply dao na ken?»
সিনথিয়া পড়ল, আর হাই তুলল। এই ছেলেটার মধ্যে কোনো আগুন নেই — শুধু শুকনো, বিরক্তিকর ভদ্রতা। যেন পরীক্ষার খাতায় লেখা রচনা। সে উত্তর দিল না। ফোনটা একপাশে রেখে পানি খেল। এই ছেলেটাকে সে ভুলেই গেল প্রায় — কিন্তু ইনবক্সে তার নামটা জ্বলতে থাকল, অপেক্ষায়। সিনথিয়া ঠিক করল — কিছু মেসেজের উত্তর না দেওয়াই উত্তর।
তারপর তৃতীয় নামটা। তানভীর।
এই নামটা খুলতে তার আঙুল একটু বেশি কাঁপল। গত রাতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার সময়ই সে ছেলেটার প্রোফাইলটা দেখেছিল — সাধারণ ছবি, হাসিমুখ, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। বয়স ২৩। আর প্রথম মেসেজটা ছিল অন্যদের মতো না — ভদ্র, প্রায় লাজুক।
«হাই মিম। আমি তানভীর।»
«গ্রুপে তোমার কমেন্টটা পড়লাম — 'প্রথমবার' পোস্টটায় তুমি লিখেছিলে, 'ভয়টা আসলে লজ্জার না, অজানার।'»
«সত্যি কথা। আর সুন্দর করে লিখেছ। তোমার লেখার হাত ভালো।»
সিনথিয়া মেসেজটা আবার পড়ল। তৃতীয়বার। তার গাল গরম হয়ে উঠল — কেউ তার লেখার প্রশংসা করেছে! আসল জীবনে কেউ কখনো তার লেখা পড়েইনি। আর এই অচেনা ছেলেটা — তার একটা সামান্য কমেন্ট মনে রেখেছে, কোট করেছে।
তার আঙুল কিবোর্ডের ওপর ঘুরল। উত্তর দেবে? নাবিলার নিয়ম বলছে — দিবি না। কিন্তু... এ তো রাফির মতো না। এ ভদ্র। এ তার লেখা নিয়ে কথা বলছে, শরীর নিয়ে না। একটা উত্তর দিলে কী এমন ক্ষতি?
"শুধু একটা," সে নিজেকে বলল। "ভদ্রভাবে।"
«ধন্যবাদ।» — পাঠিয়ে দিল। তারপর ফোনটা বুকের ওপর রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো বোমা ফাটার অপেক্ষায়।
উত্তর এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
«আরে! রিপ্লাই দিলে! ভাবলাম দেবে না।»
«তুমি কী করো, মিম? পড়ো?»
সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে লিখল — মিথ্যেটা এখন তার জিভে সহজ হয়ে গেছে।
«পড়ি। কলেজে।»
«কোন কলেজ?»
«নাম বলব না।» সঙ্গে একটা ?।
«হাহা, রহস্যময়ী! ঠিক আছে, জোর করব না।»
«বয়স কত তোমার?»
«বিশ।» — মিথ্যেটা লিখতে তার হাত একটুও কাঁপল না। আঠারো বললে ছেলেটা হয়তো "বাচ্চা" বলে চলে যাবে। বিশ — নিরাপদ, প্রাপ্তবয়স্ক।
«আমি তেইশ। চাকরি করি, একটা প্রাইভেট ফার্মে।»
«থাকো কোথায়?»
«ধানমন্ডি। তুমি?»
«ঢাকাতেই।»
এভাবে কথা এগোল। তানভীর মজার ছেলে — কথায় কথায় হাসায়, কিন্তু কখনো সীমা ছাড়ায় না। সে জিজ্ঞেস করল তার প্রিয় বই, প্রিয় গান। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে সত্যি কথাও বলছে মাঝে মাঝে। রবীন্দ্রনাথের "শেষের কবিতা" তার প্রিয় — এটা সত্যি। বৃষ্টি ভালো লাগে — সত্যি। মিথ্যে আর সত্যি মিলে মিম যেন একটা আসল মানুষ হয়ে উঠছিল।
«তুমি জানো,» তানভীর লিখল একসময়, «গ্রুপে এত মেয়ে আছে, কিন্তু তোমার মতো করে কেউ লেখে না। তোমার কথায়... কী যেন আছে। সত্যি আছে।»
সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। এই প্রথম কেউ তাকে দেখল — আসল তাকে না, মিমকে — কিন্তু তবু দেখল। সে লিখল, «তুমি খুব মিষ্টি করে কথা বলো।»
«শুধু মিষ্টি? আর কিছু না?» সঙ্গে একটা ?।
সিনথিয়া হেসে ফেলল — নিঃশব্দে, বালিশে মুখ গুঁজে। «দুষ্টুও।»
«সেটা তো তুমি এখনো দেখোনি।»
এই লাইনটা পড়ে তার শ্বাস এক মুহূর্ত আটকে গেল। দুষ্টু। শব্দটার মধ্যে একটা ইঙ্গিত ছিল — হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। তার আঙুল থমকে রইল কিবোর্ডের ওপর। এগোবে? না থামবে?
মিম এগোল।
«দেখাও তাহলে।»
পাঠানোর পরই সে ফোনটা উল্টে রাখল, যেন নিজের সাহস থেকে নিজেই পালাচ্ছে। তার কান গরম, গাল লাল। "আমি এটা লিখলাম? আমি?" — আয়নার মেয়েটা হাসছিল — রহস্যময়, সাহসী হাসি।
তানভীরের উত্তর এলো ধীরে। যেন সেও ভাবছে, মাপছে।
«তুমি সত্যিই অন্যরকম, মিম।»
«গ্রুপের অন্য মেয়েরা... ওরা হয় ভয় পায়, নয়তো শুরুতেই সব দিয়ে দেয়। তুমি... তুমি খেলাটা জানো।»
«কোন খেলা?»
«কথার খেলা। টানার খেলা।»
সিনথিয়ার শরীরে একটা শিরশিরানি বয়ে গেল। টানার খেলা। সে বুঝতে পারছিল — এই ছেলেটা শুধু মজা করছে না। সে তাকে পড়ছে, বুঝছে। আর সেও... সেও তাকে বুঝতে দিচ্ছে।
«তুমি ভয় পাচ্ছ না?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«কিসের ভয়?»
«আমার। এই কথাগুলোর।»
সিনথিয়া সত্যি কথাটা লিখল — «পাচ্ছি। একটু। কিন্তু ভালোও লাগছে।»
«ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসঙ্গেই থাকে, মিম। যেখানে ভয় নেই, সেখানে মজাও নেই।»
কথা আরও গভীর রাতে গড়াল। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে, বাসার সব শব্দ থেমে গেছে, শুধু সিনথিয়ার বুকের ধড়ফড়ানি আর ফোনের স্ক্রিনের আলো। তানভীরের মেসেজগুলো আসছিল ধীরে ধীরে — যেন সে প্রতিটা লাইন মেপে মেপে লিখছে।
«একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»
«কর।»
«রাগ করবি না তো?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «কর না।»
«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস?»
সময় যেন থেমে গেল। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রশ্নটার উত্তর সে জানে। গত রাতে — আয়নার সামনে, বালিশে মুখ গুঁজে, মা'র টোকার আগে। কিন্তু মুখে বলা আর চ্যাটে লেখা — দুটো আলাদা জিনিস। লিখে ফেললে সেটা থেকে যাবে। স্ক্রিনে। তার নামে — মিমের নামে।
তার আঙুল টাইপ করল, মুছল, আবার টাইপ করল। শেষে শুধু একটা শব্দ পাঠাল।
«হুম।»
«কখন?»
«কাল রাতে।»
«আর এখন?»
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «এখন কী?»
«এখন কি ভিজে আছিস?»
"ভিজে" — শব্দটা পড়ে তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল। কারণ সত্যিটা হলো — হ্যাঁ। প্যান্টির ভেতরটা ভিজে চপচপ করছে, উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি শুরু হয়ে গেছে। সে এতক্ষণ নিজেকে বোঝাচ্ছিল এটা শুধু কথা — কিন্তু শরীর তো মিথ্যে বলে না।
«তানভীর...»
«বল না। আমি জোর করছি না। শুধু জানতে চাই। বলবি?»
এই "বলবি?" — এই একটা শব্দে সিনথিয়ার ভেতরের সব বাধা ভেঙে গেল। সে জোর করছে না। সে অনুমতি চাইছে। আর এই ভদ্রতাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত করছিল — একটা ছেলে, যে চাইলে খারাপ হতে পারত, সে ভদ্র থাকছে। তার জন্য।
«হুম। ভিজে আছি।»
পাঠানোর পর সে ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, চোখ বন্ধ করল। "আমি এটা লিখলাম। আমি সত্যিই লিখলাম।" লজ্জায় তার কান গরম, কিন্তু লজ্জার নিচে — একটা অদ্ভুত, মিষ্টি উত্তেজনা। যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়েছে, আর পড়ার বদলে উড়ছে।
তানভীরের উত্তর এলো — «উফফ। তুই জানিস তুই কী করছিস আমার সাথে?»
«কী?»
«আমার ধোনটা এখন শক্ত হয়ে আছে। তোর কথা ভেবে।»
সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করতে চাইল — নিঃশব্দে। ওই শব্দটা সে শুনেছে ছেলেদের মুখে, রাস্তায়, ফিসফিস করে। কিন্তু কেউ কখনো তার জন্য — তার কথা ভেবে — এভাবে বলেনি। তার শরীরের প্রতিটা কোষ যেন জেগে উঠল।
«তানভীর!!»
«সত্যি কথা বললাম। রাগ করলি?»
সে রাগ করেনি। এটাই তো ভয়ের কথা — সে রাগ করেনি। সে লিখল, «না।» আর এই "না" লিখতে গিয়ে তার হাত একটুও কাঁপল না। মিম এখন আর ভয় পাচ্ছে না। মিম উপভোগ করছে।
«তুই দেখতে কেমন, মিম?» তানভীর জিজ্ঞেস করল। «আমি কল্পনা করতে চাই।»
সিনথিয়া ভাবল। ছবি দেওয়া যাবে না — নাবিলার প্রথম নিয়ম। কিন্তু কথায় বর্ণনা? কথায় তো মুখ দেখা যায় না। সে লিখল, খেলার ছলে —
«লম্বা না, খাটোও না। চুল লম্বা — কোমর পর্যন্ত। গায়ের রং শ্যামলা।»
«আর?»
«আর কী?»
«তোর দুধগুলো কেমন?»
সিনথিয়া চমকে উঠল। ওই শব্দটা — তার শরীরের সবচেয়ে গোপন অংশের নাম। এই ছেলেটা এখন তার শরীরের কথা জিজ্ঞেস করছে — সরাসরি, লজ্জা ছাড়া। তার প্রথম ইচ্ছে হলো ফোনটা রেখে দেওয়ার। কিন্তু দ্বিতীয় ইচ্ছেটা — যেটা জিতল — সেটা বলল, "উত্তর দে।"
«কেন? জানতে ইচ্ছে করে?»
«খুব। কল্পনা করতে।»
«বড়।» — সে লিখল, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢাকল হাতে। «তোর ভালো লাগবে।»
«উফফ, মিম। তুই আমাকে মেরে ফেলবি।»
সিনথিয়া হাসল — একটা বিজয়ীর হাসি। এই প্রথম সে বুঝল — শুধু ছেলেরাই চায় না। মেয়েরাও চাওয়াতে পারে। তার একটা "বড়" শব্দে একটা তেইশ বছরের ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষমতাটা — এই অদ্ভুত, গোপন ক্ষমতাটা — তার মাথা ঘুরিয়ে দিল।
«তোর ভোদাটা কেমন?» তানভীর লিখল। «ভিজে তো আছেই, জানি। কিন্তু... কখনো কেউ ছুঁয়েছে?»
«না।» — সত্যি কথা। আরিফের কল্পনা ছাড়া কেউ না।
«তাহলে আমি প্রথম হবো — কল্পনায়।»
«তানভীর...»
«একটা খারাপ কথা বলব? তুই যদি না চাস, বলব না। বলবি?»
সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল। «বল।»
«তোকে চুদতে ইচ্ছে করছে, মিম। এত ইচ্ছে করছে যে হাত কাঁপছে।»
ঘরটা ঘুরতে লাগল। সবচেয়ে নিষিদ্ধ শব্দটা — যেটা শুনলে ভালো মেয়েরা কানে আঙুল দেয়। কিন্তু সিনথিয়া কানে আঙুল দিল না। সে ফোনটা আরও শক্ত করে ধরল। তার উরুর মাঝখানে এখন আগুন জ্বলছে — সত্যিকারের আগুন। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছিল — সালোয়ারের ওপর দিয়ে চাপ দিচ্ছিল। সে থামাল না নিজেকে।
«আমারও।» — সে লিখল। «আমারও ইচ্ছে করছে।»
«সত্যি?»
«সত্যি।»
«তুই জানিস, তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, মিম। তুই লজ্জা পাস, কিন্তু পালাস না।»
এই লাইনটা পড়ে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে বুঝেছে। কেউ তার ভয়টাকে সম্মান করেছে, তাকে "নষ্ট" বলেনি। সে লিখল, «তুমি খুব ভালো, তানভীর।»
«ভালো? না দুষ্টু?»
«দুটোই।»
«তাহলে শোন, দুষ্টু তানভীর একটা কথা বলবে — তুই এখন যা করছিস, থামিস না।»
সিনথিয়া চমকে উঠল। "সে কী করে জানল?" — তার হাত তো সত্যিই... সে তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে নিল, গাল লাল করে। «তুমি কী করে জানলে?!»
«তোর মেসেজের গতি দেখে।» সঙ্গে একটা ?। «আমি তোকে পড়তে পারি, মিম।»
সিনথিয়া আর পারল না। সে ফোনটা একপাশে রেখে বালিশে মুখ গুঁজল, শরীরটা কুঁকড়ে গেল। লজ্জা, উত্তেজনা, ভয়, আনন্দ — সব একসঙ্গে। তার ভেতরে মিম হাসছিল — "দেখলি? তুই পারিস।"
অনেকক্ষণ পর সে ফোনটা তুলল। তানভীর লিখেছে — «ঘুমিয়ে গেলি?»
«না।»
«তাহলে শোন। আজকের জন্য এতটুকুই। বেশি এগোলে তুই ভয় পাবি, আমি চাই না। ধীরে ধীরে, ঠিক আছে?»
সিনথিয়ার বুকটা ভরে উঠল। এই ছেলেটা থামতে জানে। সীমা জানে। «ঠিক আছে।»
«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»
«গুড নাইট।»
ফোনটা রেখে সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে রইল। তার শরীর এখনো জ্বলছে, উরুর মাঝখানে এখনো দপদপ করছে — অসমাপ্ত। কিন্তু আজ সে নিজেকে ছোঁবে না। আজকের রাতটা সে শুধু অনুভব করবে — এই নতুন, অচেনা, ভয়ংকর সুন্দর অনুভূতিটা।
আর তখনই — দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো মা'র গলা, "সিনথিয়া? এখনো জেগে আছিস?"
তার রক্ত হিম হয়ে গেল। "হ্যাঁ মা... ঘুমাচ্ছি।"
"ফোনটা রেখে ঘুমা।"
"রাখছি মা।"
পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। সিনথিয়া ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম এলো না। তার মাথায় ঘুরছিল তানভীরের কথাগুলো — সেই নিষিদ্ধ শব্দগুলো, সেই সাহসী স্বীকারোক্তি। যা সে একসময় ঘৃণা করত, ভয় পেত — এখন তাই তার কানে গানের মতো বাজছে।
আর তারপর এলো অপরাধবোধটা। নাবিলার মুখ ভেসে উঠল — "কেউ মেসেজ করলে উত্তর দিবি না।" সে উত্তর দিয়েছে। শুধু দিয়েইনি — সে এমন কথা বলেছে, যা নাবিলা শুনলে... নাবিলা কী বলত? "তুই পাগল হয়ে গেছিস?" নাকি বুঝত?
"ক্ষমা করিস, নাবিলা," সে ফিসফিস করল অন্ধকারে। "এটা তোকে বলতে পারব না। এটা একটা গোপনের ভেতরে আরেকটা গোপন।"
এই ভাবনাটা তাকে কাঁদিয়ে দিল প্রায়। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের মানুষ — আর সে-ই নাবিলার কাছে সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা বলছে। কিন্তু তানভীরকে ছাড়তেও পারবে না সে। এই দ্বন্দ্বটা — এই টানাটানিটা — তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল। তবু... তবু সে জানত, আগামীকাল রাতেও সে ফোনটা খুলবে। মিমকে সে আর বোতলে ভরতে পারবে না।
পরদিন কলেজে সিনথিয়া নিজেকে আয়নায় দেখে চমকে উঠল — চোখের নিচে কালি, কিন্তু ঠোঁটে একটা অচেনা হাসি। যেন রাতে কেউ তার মুখটা বদলে দিয়ে গেছে।
নাবিলা তাকে দেখেই থমকে গেল। "কী রে? তোর চোখে কী যেন..."
"কী?" সিনথিয়া সতর্ক হলো।
"জানি না।" নাবিলা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। "মনে হচ্ছে তুই কিছু লুকাচ্ছিস। প্রেমে পড়লি নাকি?"
সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড এক লাফ দিল। "ধুর! কী যে বলিস!"
"তাহলে ফোনে এত কী করিস আজকাল? গতকালও দেখলাম টিফিনে ফোন নিয়ে হাসছিলি।" নাবিলার চোখ সরু হলো। "গ্রুপে কিছু হচ্ছে? কেউ মেসেজ করেছে?"
এই প্রশ্নটা শুনে সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। নাবিলা — যে তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে — সে টের পেয়ে গেছে। কিন্তু সে বলতে পারবে না। মিমের কথা বলা মানে সব বলা — তানভীরের কথা, রাতের কথাগুলো, "ভিজে আছি"। নাবিলার সামনে এই কথাগুলো উচ্চারণ করা অসম্ভব।
"না রে," সে মিথ্যে বলল — আর এই মিথ্যেটা আগেরগুলোর চেয়ে ভারী লাগল। "এমনিই। একটা গল্প পড়ছিলাম।"
নাবিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। "ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখিস — আমি তোর বন্ধু। কিছু হলে আমাকে বলবি।"
"বলব।" — আরেকটা মিথ্যে।
সেদিন সারাদিন সিনথিয়ার মন ছিল অস্থির। ক্লাসে বসে সে ভাবছিল — নাবিলাকে কি বলে দেবে? সব? কিন্তু তারপরই মনে পড়ল তানভীরের মেসেজ — "তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।" নাবিলা কি এটা বুঝবে? নাকি বলবে, "ছেলেটা তোকে ব্যবহার করছে"? সিনথিয়া জানত না। আর না জানার ভয়েই সে চুপ করে রইল।
বাসায় ফিরে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল — কিন্তু পারল না। রাতের খাবারে মা জিজ্ঞেস করলেন, "তোর কী হয়েছে? মুখটা এত লাল কেন?"
"গরম লাগছে," সে বলল, আর তাড়াতাড়ি ভাত শেষ করে উঠে গেল।
সেদিন বিকেলে পড়ার টেবিলে বসে সে তিনবার ফোনটা হাতে নিয়েছিল — শুধু দেখতে, তানভীর কিছু লিখেছে কিনা। প্রতিবারই নিজেকে বকেছে — দিনের বেলায় না, ধরা পড়ে যাবি। কিন্তু মন মানেনি। মা যখন চা নিয়ে এলেন, সে তাড়াতাড়ি ফোনটা বইয়ের নিচে লুকাল। মা কিছু টের পেলেন না — কিন্তু সিনথিয়ার মনে হলো, তার মুখে সব লেখা আছে। রাতের খাবারটা সে প্রায় না চিবিয়েই গিলল। সিয়াম জিজ্ঞেস করল, "আপু, তোর কী হয়েছে?" সে বলল, "কিছু না।" — আজকের দিনে এই দুটো শব্দই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যে।
রাত এগারোটা। দরজার ছিটকিনি। ফোনের আলো। মিম জেগে উঠল।
তানভীর ইতিমধ্যে অনলাইন। «এই যে! অপেক্ষা করছিলাম।»
সিনথিয়ার বুকটা উষ্ণ হয়ে উঠল। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে! «সত্যি?»
«সত্যি। সারাদিন তোর কথা ভেবেছি।»
«কী ভেবেছ?»
«বলব? রাগ করবি না?»
«বল।»
«ভেবেছি — তোর চুলগুলো কেমন হবে খোলা অবস্থায়। কোমর পর্যন্ত চুল... আমি যদি তোর পেছনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ে চুমু খাই...»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনাটা এত জীবন্ত — তার ঘাড়ে যেন সত্যিই কারো নিঃশ্বাস লাগছে। «তানভীর...»
«হুম?»
«তুমি এত সুন্দর করে কী করে বলো?»
«কারণ তুই সুন্দর করে শুনিস।»
এভাবে কথা এগোল — আরও গভীরে, আরও কাছে। তানভীর আজ আরও সাহসী। সে জিজ্ঞেস করল তার পছন্দ-অপছন্দ, তার ভয়, তার স্বপ্ন। আর প্রতিটা উত্তরের পর বলল — «আরও বল। তোর কথা শুনতে ভালো লাগে।» সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে এমন কথা বলছে, যা সে কাউকে কখনো বলেনি। এমনকি নাবিলাকেও না। যে সে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি, কিন্তু ভালোবাসতে চায়। যে সে ভয় পায় — ধরা পড়ার, ভুল করার, হারিয়ে যাওয়ার।
«তুই জানিস, মিম,» তানভীর লিখল, «তুই আমার দেখা সবচেয়ে সত্যি মেয়ে।»
«আমি তো মিথ্যে নামে কথা বলছি।» — সিনথিয়া লিখে ফেলল, তারপর চমকে উঠল। এত সত্যি কথা কেন বলল?
«নামটা মিথ্যে হতে পারে,» তানভীর লিখল, «কিন্তু তুই মিথ্যে না। আমি টের পাই।»
সিনথিয়ার চোখ ভিজে উঠল। এই অচেনা ছেলেটা — যাকে সে কখনো দেখেনি — সে তাকে নাবিলার চেয়েও ভালো বুঝছে। এই ভাবনাটা আসতেই অপরাধবোধটা আবার ফিরে এলো, আরও তীব্র হয়ে। "নাবিলা, আমি তোকে ঠকাচ্ছি।" কিন্তু সে ফোনটা রাখতে পারল না।
রাত একটা বেজে গেল। সিনথিয়ার চোখ জ্বলছে, কিন্তু ঘুমের কথা মনেও হচ্ছে না। তখন তানভীর লিখল —
«মিম।»
«হুম?»
«একটা গেম খেলবি?»
সিনথিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। «কী গেম?»
«ট্রুথ অর ডেয়ার।»
সময় থেমে গেল। ট্রুথ অর ডেয়ার — সত্যি না সাহস। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে এই গেম মানে কী। সত্যি বলতে হবে — নগ্ন সত্যি। আর ডেয়ার মানে — যা বলা হবে, তা করতে হবে। তার হাত কাঁপছিল। তার বুক ধড়ফড় করছিল। ভয় — আর সেই ভয়ের নিচে, চাপা, মিষ্টি উত্তেজনা।
সে টাইপ করল। মুছল। আবার টাইপ করল।
«খেলব।»
পরদিনটা সিনথিয়ার কাটল এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনে। দিনের আলোয় সে ছিল সেই চেনা সিনথিয়া — ক্লাসে মনোযোগী ছাত্রী, টিফিনে নাবিলার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, বাসায় মা'র সাহায্যকারী মেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য একটা মেয়ে জেগে ছিল — মিম। রাতের অন্ধকারে ফোনের স্ক্রিনে যার জন্ম হয়েছিল, দিনের আলোতেও যে ঘুমাচ্ছিল না।
কলেজে নাবিলা তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকাল, "কী রে, আজ এত চুপচাপ কেন?"
"কিছু না," সিনথিয়া ব্যাগের ফিতা নাড়াচাড়া করল। "রাতে ঘুম হয়নি।"
নাবিলা চোখ টিপল, "ঘুম হয়নি, না? গ্রুপে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি বুঝি?"
সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। "তুই কী করে জানলি?"
"তোর চোখ দেখে।" নাবিলা হাসল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, "শোন, সাবধানে থাকিস। আর মনে রাখিস আমার কথা — কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না। ওই ছেলেগুলোর মুখে মধু, মনে বিষ।"
সিনথিয়া গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। কারণ গত রাতে, মিম আক্তারের ইনবক্সে, ইতিমধ্যে তিনটা মেসেজ জমা হয়েছিল। আর সে সেগুলো পড়েছিল। সবগুলো। একটাও উত্তর দেয়নি — কিন্তু পড়েছিল। আর পড়ার সময় তার হাত কাঁপছিল।
সারাদিন ক্লাসে তার মন ছিল ওই তিনটা মেসেজে। বাংলা ম্যাডাম যখন সন্ধি-সমাস পড়াচ্ছিলেন, সিনথিয়ার চোখ ছিল বোর্ডে, কিন্তু মন ছিল ফোনের স্ক্রিনে — কে লিখেছে? কী লিখেছে? টিফিনে তানিশা যখন গল্প করছিল পাড়ার একটা বিয়ে নিয়ে, সিনথিয়া শুনছিল না। তার ভেতরে মিম ফিসফিস করছিল — "খুলে দেখ... একবার দেখ..."
বাসায় ফিরে সে অপেক্ষা করল রাতের। মা'র সঙ্গে রান্নায় হাত লাগাল, সিয়ামের পড়া দেখিয়ে দিল, বাবার সঙ্গে খবরের শিরোনাম নিয়ে দুটো কথা বলল। সবই যান্ত্রিক। তার আসল জীবন শুরু হবে রাত এগারোটার পর, যখন দরজার ছিটকিনি লাগবে।
অবশেষে রাত হলো। দরজা বন্ধ, লাইট নেভানো, ইয়ারফোন কানে। কাঁপা হাতে সে মিম আক্তারের অ্যাকাউন্টে ঢুকল। ইনবক্সে তিনটা নাম জ্বলজ্বল করছিল। প্রথমটা খুলতেই তার মুখটা কুঁচকে গেল।
রাফি। বয়স ২৪। প্রোফাইল ছবিতে জিম করা শরীর, সানগ্লাস পরা মুখ।
«হাই।»
«কী রে মাল, রিপ্লাই দিস না কেন?»
«ছবি দে একটা। ফিগারটা কেমন দেখি। শরম পাস না, আমি কাউকে দেখাব না।»
সিনথিয়ার গা ঘিনঘিন করে উঠল। ওই শব্দটা — যেন সে মানুষ না, বাজারের পণ্য। তার মনে পড়ল নাবিলার গলা — "কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না, ব্লক করে দিবি।" এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। ব্লক বাটনে আঙুল রাখল, এক সেকেন্ড থমকাল, তারপর চাপ দিল।
হয়ে গেছে। রাফি নামের ছেলেটা তার জগৎ থেকে মুছে গেল।
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু সেই ধড়ফড়ানির ভেতরে একটা অদ্ভুত গর্বও ছিল। সে পেরেছে। সে নিজেকে বাঁচিয়েছে। নাবিলা যদি জানত, বলত — "এই তো আমার বান্ধবী।" কিন্তু নাবিলা জানবে না। কারণ নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই ভাবনাটা আসতেই গর্বের পাশাপাশি একটা চিনচিনে অপরাধবোধও জাগল। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু — আর সে-ই নাবিলার কাছে মিথ্যে বলছে। প্রতিদিন। প্রতিটা হাসির আড়ালে।
সে মিমের প্রোফাইলটা খুলল। প্রোফাইল ছবিতে একটা সিলুয়েট — মুখহীন এক মেয়ের অবয়ব, ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। নিজের কোনো ছবি সে দেবে না — এই একটা নিয়ম সে ভাঙবে না, কখনো না। কভারে একটা উক্তি — «রাত আমাদের উলঙ্গ করে।» বন্ধুর তালিকায় সংখ্যা বাড়ছে — অচেনা নাম, অচেনা মুখ। এই জগতে সে কেউ না — আবার সবাই। আসল জীবনে সে সিনথিয়া — ভদ্র, শান্ত, নিয়ম মানা মেয়ে। এখানে সে মিম — যে ব্লক করতে পারে এক সেকেন্ডে, যে খেলতে জানে কথার খেলা। এই দুটো মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ফিরে যাওয়ার রাস্তা সে আর দেখতে পাচ্ছিল না। আর সত্যি বলতে কী — সে ফিরতে চাইছিলও না।
সে দ্বিতীয় মেসেজটা খুলল। নামটা অচেনা — সুমন, না রানা, কী যেন। ছবিতে একটা ঝাপসা সেলফি।
«Hi.»
«kemon acho?»
«tumi ki Dhaka te thako?»
«reply dao na ken?»
সিনথিয়া পড়ল, আর হাই তুলল। এই ছেলেটার মধ্যে কোনো আগুন নেই — শুধু শুকনো, বিরক্তিকর ভদ্রতা। যেন পরীক্ষার খাতায় লেখা রচনা। সে উত্তর দিল না। ফোনটা একপাশে রেখে পানি খেল। এই ছেলেটাকে সে ভুলেই গেল প্রায় — কিন্তু ইনবক্সে তার নামটা জ্বলতে থাকল, অপেক্ষায়। সিনথিয়া ঠিক করল — কিছু মেসেজের উত্তর না দেওয়াই উত্তর।
তারপর তৃতীয় নামটা। তানভীর।
এই নামটা খুলতে তার আঙুল একটু বেশি কাঁপল। গত রাতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার সময়ই সে ছেলেটার প্রোফাইলটা দেখেছিল — সাধারণ ছবি, হাসিমুখ, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। বয়স ২৩। আর প্রথম মেসেজটা ছিল অন্যদের মতো না — ভদ্র, প্রায় লাজুক।
«হাই মিম। আমি তানভীর।»
«গ্রুপে তোমার কমেন্টটা পড়লাম — 'প্রথমবার' পোস্টটায় তুমি লিখেছিলে, 'ভয়টা আসলে লজ্জার না, অজানার।'»
«সত্যি কথা। আর সুন্দর করে লিখেছ। তোমার লেখার হাত ভালো।»
সিনথিয়া মেসেজটা আবার পড়ল। তৃতীয়বার। তার গাল গরম হয়ে উঠল — কেউ তার লেখার প্রশংসা করেছে! আসল জীবনে কেউ কখনো তার লেখা পড়েইনি। আর এই অচেনা ছেলেটা — তার একটা সামান্য কমেন্ট মনে রেখেছে, কোট করেছে।
তার আঙুল কিবোর্ডের ওপর ঘুরল। উত্তর দেবে? নাবিলার নিয়ম বলছে — দিবি না। কিন্তু... এ তো রাফির মতো না। এ ভদ্র। এ তার লেখা নিয়ে কথা বলছে, শরীর নিয়ে না। একটা উত্তর দিলে কী এমন ক্ষতি?
"শুধু একটা," সে নিজেকে বলল। "ভদ্রভাবে।"
«ধন্যবাদ।» — পাঠিয়ে দিল। তারপর ফোনটা বুকের ওপর রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো বোমা ফাটার অপেক্ষায়।
উত্তর এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
«আরে! রিপ্লাই দিলে! ভাবলাম দেবে না।»
«তুমি কী করো, মিম? পড়ো?»
সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে লিখল — মিথ্যেটা এখন তার জিভে সহজ হয়ে গেছে।
«পড়ি। কলেজে।»
«কোন কলেজ?»
«নাম বলব না।» সঙ্গে একটা ?।
«হাহা, রহস্যময়ী! ঠিক আছে, জোর করব না।»
«বয়স কত তোমার?»
«বিশ।» — মিথ্যেটা লিখতে তার হাত একটুও কাঁপল না। আঠারো বললে ছেলেটা হয়তো "বাচ্চা" বলে চলে যাবে। বিশ — নিরাপদ, প্রাপ্তবয়স্ক।
«আমি তেইশ। চাকরি করি, একটা প্রাইভেট ফার্মে।»
«থাকো কোথায়?»
«ধানমন্ডি। তুমি?»
«ঢাকাতেই।»
এভাবে কথা এগোল। তানভীর মজার ছেলে — কথায় কথায় হাসায়, কিন্তু কখনো সীমা ছাড়ায় না। সে জিজ্ঞেস করল তার প্রিয় বই, প্রিয় গান। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে সত্যি কথাও বলছে মাঝে মাঝে। রবীন্দ্রনাথের "শেষের কবিতা" তার প্রিয় — এটা সত্যি। বৃষ্টি ভালো লাগে — সত্যি। মিথ্যে আর সত্যি মিলে মিম যেন একটা আসল মানুষ হয়ে উঠছিল।
«তুমি জানো,» তানভীর লিখল একসময়, «গ্রুপে এত মেয়ে আছে, কিন্তু তোমার মতো করে কেউ লেখে না। তোমার কথায়... কী যেন আছে। সত্যি আছে।»
সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। এই প্রথম কেউ তাকে দেখল — আসল তাকে না, মিমকে — কিন্তু তবু দেখল। সে লিখল, «তুমি খুব মিষ্টি করে কথা বলো।»
«শুধু মিষ্টি? আর কিছু না?» সঙ্গে একটা ?।
সিনথিয়া হেসে ফেলল — নিঃশব্দে, বালিশে মুখ গুঁজে। «দুষ্টুও।»
«সেটা তো তুমি এখনো দেখোনি।»
এই লাইনটা পড়ে তার শ্বাস এক মুহূর্ত আটকে গেল। দুষ্টু। শব্দটার মধ্যে একটা ইঙ্গিত ছিল — হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। তার আঙুল থমকে রইল কিবোর্ডের ওপর। এগোবে? না থামবে?
মিম এগোল।
«দেখাও তাহলে।»
পাঠানোর পরই সে ফোনটা উল্টে রাখল, যেন নিজের সাহস থেকে নিজেই পালাচ্ছে। তার কান গরম, গাল লাল। "আমি এটা লিখলাম? আমি?" — আয়নার মেয়েটা হাসছিল — রহস্যময়, সাহসী হাসি।
তানভীরের উত্তর এলো ধীরে। যেন সেও ভাবছে, মাপছে।
«তুমি সত্যিই অন্যরকম, মিম।»
«গ্রুপের অন্য মেয়েরা... ওরা হয় ভয় পায়, নয়তো শুরুতেই সব দিয়ে দেয়। তুমি... তুমি খেলাটা জানো।»
«কোন খেলা?»
«কথার খেলা। টানার খেলা।»
সিনথিয়ার শরীরে একটা শিরশিরানি বয়ে গেল। টানার খেলা। সে বুঝতে পারছিল — এই ছেলেটা শুধু মজা করছে না। সে তাকে পড়ছে, বুঝছে। আর সেও... সেও তাকে বুঝতে দিচ্ছে।
«তুমি ভয় পাচ্ছ না?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«কিসের ভয়?»
«আমার। এই কথাগুলোর।»
সিনথিয়া সত্যি কথাটা লিখল — «পাচ্ছি। একটু। কিন্তু ভালোও লাগছে।»
«ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসঙ্গেই থাকে, মিম। যেখানে ভয় নেই, সেখানে মজাও নেই।»
কথা আরও গভীর রাতে গড়াল। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে, বাসার সব শব্দ থেমে গেছে, শুধু সিনথিয়ার বুকের ধড়ফড়ানি আর ফোনের স্ক্রিনের আলো। তানভীরের মেসেজগুলো আসছিল ধীরে ধীরে — যেন সে প্রতিটা লাইন মেপে মেপে লিখছে।
«একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»
«কর।»
«রাগ করবি না তো?»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «কর না।»
«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস?»
সময় যেন থেমে গেল। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রশ্নটার উত্তর সে জানে। গত রাতে — আয়নার সামনে, বালিশে মুখ গুঁজে, মা'র টোকার আগে। কিন্তু মুখে বলা আর চ্যাটে লেখা — দুটো আলাদা জিনিস। লিখে ফেললে সেটা থেকে যাবে। স্ক্রিনে। তার নামে — মিমের নামে।
তার আঙুল টাইপ করল, মুছল, আবার টাইপ করল। শেষে শুধু একটা শব্দ পাঠাল।
«হুম।»
«কখন?»
«কাল রাতে।»
«আর এখন?»
সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «এখন কী?»
«এখন কি ভিজে আছিস?»
"ভিজে" — শব্দটা পড়ে তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল। কারণ সত্যিটা হলো — হ্যাঁ। প্যান্টির ভেতরটা ভিজে চপচপ করছে, উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি শুরু হয়ে গেছে। সে এতক্ষণ নিজেকে বোঝাচ্ছিল এটা শুধু কথা — কিন্তু শরীর তো মিথ্যে বলে না।
«তানভীর...»
«বল না। আমি জোর করছি না। শুধু জানতে চাই। বলবি?»
এই "বলবি?" — এই একটা শব্দে সিনথিয়ার ভেতরের সব বাধা ভেঙে গেল। সে জোর করছে না। সে অনুমতি চাইছে। আর এই ভদ্রতাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত করছিল — একটা ছেলে, যে চাইলে খারাপ হতে পারত, সে ভদ্র থাকছে। তার জন্য।
«হুম। ভিজে আছি।»
পাঠানোর পর সে ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, চোখ বন্ধ করল। "আমি এটা লিখলাম। আমি সত্যিই লিখলাম।" লজ্জায় তার কান গরম, কিন্তু লজ্জার নিচে — একটা অদ্ভুত, মিষ্টি উত্তেজনা। যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়েছে, আর পড়ার বদলে উড়ছে।
তানভীরের উত্তর এলো — «উফফ। তুই জানিস তুই কী করছিস আমার সাথে?»
«কী?»
«আমার ধোনটা এখন শক্ত হয়ে আছে। তোর কথা ভেবে।»
সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করতে চাইল — নিঃশব্দে। ওই শব্দটা সে শুনেছে ছেলেদের মুখে, রাস্তায়, ফিসফিস করে। কিন্তু কেউ কখনো তার জন্য — তার কথা ভেবে — এভাবে বলেনি। তার শরীরের প্রতিটা কোষ যেন জেগে উঠল।
«তানভীর!!»
«সত্যি কথা বললাম। রাগ করলি?»
সে রাগ করেনি। এটাই তো ভয়ের কথা — সে রাগ করেনি। সে লিখল, «না।» আর এই "না" লিখতে গিয়ে তার হাত একটুও কাঁপল না। মিম এখন আর ভয় পাচ্ছে না। মিম উপভোগ করছে।
«তুই দেখতে কেমন, মিম?» তানভীর জিজ্ঞেস করল। «আমি কল্পনা করতে চাই।»
সিনথিয়া ভাবল। ছবি দেওয়া যাবে না — নাবিলার প্রথম নিয়ম। কিন্তু কথায় বর্ণনা? কথায় তো মুখ দেখা যায় না। সে লিখল, খেলার ছলে —
«লম্বা না, খাটোও না। চুল লম্বা — কোমর পর্যন্ত। গায়ের রং শ্যামলা।»
«আর?»
«আর কী?»
«তোর দুধগুলো কেমন?»
সিনথিয়া চমকে উঠল। ওই শব্দটা — তার শরীরের সবচেয়ে গোপন অংশের নাম। এই ছেলেটা এখন তার শরীরের কথা জিজ্ঞেস করছে — সরাসরি, লজ্জা ছাড়া। তার প্রথম ইচ্ছে হলো ফোনটা রেখে দেওয়ার। কিন্তু দ্বিতীয় ইচ্ছেটা — যেটা জিতল — সেটা বলল, "উত্তর দে।"
«কেন? জানতে ইচ্ছে করে?»
«খুব। কল্পনা করতে।»
«বড়।» — সে লিখল, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢাকল হাতে। «তোর ভালো লাগবে।»
«উফফ, মিম। তুই আমাকে মেরে ফেলবি।»
সিনথিয়া হাসল — একটা বিজয়ীর হাসি। এই প্রথম সে বুঝল — শুধু ছেলেরাই চায় না। মেয়েরাও চাওয়াতে পারে। তার একটা "বড়" শব্দে একটা তেইশ বছরের ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষমতাটা — এই অদ্ভুত, গোপন ক্ষমতাটা — তার মাথা ঘুরিয়ে দিল।
«তোর ভোদাটা কেমন?» তানভীর লিখল। «ভিজে তো আছেই, জানি। কিন্তু... কখনো কেউ ছুঁয়েছে?»
«না।» — সত্যি কথা। আরিফের কল্পনা ছাড়া কেউ না।
«তাহলে আমি প্রথম হবো — কল্পনায়।»
«তানভীর...»
«একটা খারাপ কথা বলব? তুই যদি না চাস, বলব না। বলবি?»
সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল। «বল।»
«তোকে চুদতে ইচ্ছে করছে, মিম। এত ইচ্ছে করছে যে হাত কাঁপছে।»
ঘরটা ঘুরতে লাগল। সবচেয়ে নিষিদ্ধ শব্দটা — যেটা শুনলে ভালো মেয়েরা কানে আঙুল দেয়। কিন্তু সিনথিয়া কানে আঙুল দিল না। সে ফোনটা আরও শক্ত করে ধরল। তার উরুর মাঝখানে এখন আগুন জ্বলছে — সত্যিকারের আগুন। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছিল — সালোয়ারের ওপর দিয়ে চাপ দিচ্ছিল। সে থামাল না নিজেকে।
«আমারও।» — সে লিখল। «আমারও ইচ্ছে করছে।»
«সত্যি?»
«সত্যি।»
«তুই জানিস, তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, মিম। তুই লজ্জা পাস, কিন্তু পালাস না।»
এই লাইনটা পড়ে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে বুঝেছে। কেউ তার ভয়টাকে সম্মান করেছে, তাকে "নষ্ট" বলেনি। সে লিখল, «তুমি খুব ভালো, তানভীর।»
«ভালো? না দুষ্টু?»
«দুটোই।»
«তাহলে শোন, দুষ্টু তানভীর একটা কথা বলবে — তুই এখন যা করছিস, থামিস না।»
সিনথিয়া চমকে উঠল। "সে কী করে জানল?" — তার হাত তো সত্যিই... সে তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে নিল, গাল লাল করে। «তুমি কী করে জানলে?!»
«তোর মেসেজের গতি দেখে।» সঙ্গে একটা ?। «আমি তোকে পড়তে পারি, মিম।»
সিনথিয়া আর পারল না। সে ফোনটা একপাশে রেখে বালিশে মুখ গুঁজল, শরীরটা কুঁকড়ে গেল। লজ্জা, উত্তেজনা, ভয়, আনন্দ — সব একসঙ্গে। তার ভেতরে মিম হাসছিল — "দেখলি? তুই পারিস।"
অনেকক্ষণ পর সে ফোনটা তুলল। তানভীর লিখেছে — «ঘুমিয়ে গেলি?»
«না।»
«তাহলে শোন। আজকের জন্য এতটুকুই। বেশি এগোলে তুই ভয় পাবি, আমি চাই না। ধীরে ধীরে, ঠিক আছে?»
সিনথিয়ার বুকটা ভরে উঠল। এই ছেলেটা থামতে জানে। সীমা জানে। «ঠিক আছে।»
«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»
«গুড নাইট।»
ফোনটা রেখে সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে রইল। তার শরীর এখনো জ্বলছে, উরুর মাঝখানে এখনো দপদপ করছে — অসমাপ্ত। কিন্তু আজ সে নিজেকে ছোঁবে না। আজকের রাতটা সে শুধু অনুভব করবে — এই নতুন, অচেনা, ভয়ংকর সুন্দর অনুভূতিটা।
আর তখনই — দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো মা'র গলা, "সিনথিয়া? এখনো জেগে আছিস?"
তার রক্ত হিম হয়ে গেল। "হ্যাঁ মা... ঘুমাচ্ছি।"
"ফোনটা রেখে ঘুমা।"
"রাখছি মা।"
পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। সিনথিয়া ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম এলো না। তার মাথায় ঘুরছিল তানভীরের কথাগুলো — সেই নিষিদ্ধ শব্দগুলো, সেই সাহসী স্বীকারোক্তি। যা সে একসময় ঘৃণা করত, ভয় পেত — এখন তাই তার কানে গানের মতো বাজছে।
আর তারপর এলো অপরাধবোধটা। নাবিলার মুখ ভেসে উঠল — "কেউ মেসেজ করলে উত্তর দিবি না।" সে উত্তর দিয়েছে। শুধু দিয়েইনি — সে এমন কথা বলেছে, যা নাবিলা শুনলে... নাবিলা কী বলত? "তুই পাগল হয়ে গেছিস?" নাকি বুঝত?
"ক্ষমা করিস, নাবিলা," সে ফিসফিস করল অন্ধকারে। "এটা তোকে বলতে পারব না। এটা একটা গোপনের ভেতরে আরেকটা গোপন।"
এই ভাবনাটা তাকে কাঁদিয়ে দিল প্রায়। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের মানুষ — আর সে-ই নাবিলার কাছে সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা বলছে। কিন্তু তানভীরকে ছাড়তেও পারবে না সে। এই দ্বন্দ্বটা — এই টানাটানিটা — তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল। তবু... তবু সে জানত, আগামীকাল রাতেও সে ফোনটা খুলবে। মিমকে সে আর বোতলে ভরতে পারবে না।
পরদিন কলেজে সিনথিয়া নিজেকে আয়নায় দেখে চমকে উঠল — চোখের নিচে কালি, কিন্তু ঠোঁটে একটা অচেনা হাসি। যেন রাতে কেউ তার মুখটা বদলে দিয়ে গেছে।
নাবিলা তাকে দেখেই থমকে গেল। "কী রে? তোর চোখে কী যেন..."
"কী?" সিনথিয়া সতর্ক হলো।
"জানি না।" নাবিলা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। "মনে হচ্ছে তুই কিছু লুকাচ্ছিস। প্রেমে পড়লি নাকি?"
সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড এক লাফ দিল। "ধুর! কী যে বলিস!"
"তাহলে ফোনে এত কী করিস আজকাল? গতকালও দেখলাম টিফিনে ফোন নিয়ে হাসছিলি।" নাবিলার চোখ সরু হলো। "গ্রুপে কিছু হচ্ছে? কেউ মেসেজ করেছে?"
এই প্রশ্নটা শুনে সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। নাবিলা — যে তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে — সে টের পেয়ে গেছে। কিন্তু সে বলতে পারবে না। মিমের কথা বলা মানে সব বলা — তানভীরের কথা, রাতের কথাগুলো, "ভিজে আছি"। নাবিলার সামনে এই কথাগুলো উচ্চারণ করা অসম্ভব।
"না রে," সে মিথ্যে বলল — আর এই মিথ্যেটা আগেরগুলোর চেয়ে ভারী লাগল। "এমনিই। একটা গল্প পড়ছিলাম।"
নাবিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। "ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখিস — আমি তোর বন্ধু। কিছু হলে আমাকে বলবি।"
"বলব।" — আরেকটা মিথ্যে।
সেদিন সারাদিন সিনথিয়ার মন ছিল অস্থির। ক্লাসে বসে সে ভাবছিল — নাবিলাকে কি বলে দেবে? সব? কিন্তু তারপরই মনে পড়ল তানভীরের মেসেজ — "তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।" নাবিলা কি এটা বুঝবে? নাকি বলবে, "ছেলেটা তোকে ব্যবহার করছে"? সিনথিয়া জানত না। আর না জানার ভয়েই সে চুপ করে রইল।
বাসায় ফিরে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল — কিন্তু পারল না। রাতের খাবারে মা জিজ্ঞেস করলেন, "তোর কী হয়েছে? মুখটা এত লাল কেন?"
"গরম লাগছে," সে বলল, আর তাড়াতাড়ি ভাত শেষ করে উঠে গেল।
সেদিন বিকেলে পড়ার টেবিলে বসে সে তিনবার ফোনটা হাতে নিয়েছিল — শুধু দেখতে, তানভীর কিছু লিখেছে কিনা। প্রতিবারই নিজেকে বকেছে — দিনের বেলায় না, ধরা পড়ে যাবি। কিন্তু মন মানেনি। মা যখন চা নিয়ে এলেন, সে তাড়াতাড়ি ফোনটা বইয়ের নিচে লুকাল। মা কিছু টের পেলেন না — কিন্তু সিনথিয়ার মনে হলো, তার মুখে সব লেখা আছে। রাতের খাবারটা সে প্রায় না চিবিয়েই গিলল। সিয়াম জিজ্ঞেস করল, "আপু, তোর কী হয়েছে?" সে বলল, "কিছু না।" — আজকের দিনে এই দুটো শব্দই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যে।
রাত এগারোটা। দরজার ছিটকিনি। ফোনের আলো। মিম জেগে উঠল।
তানভীর ইতিমধ্যে অনলাইন। «এই যে! অপেক্ষা করছিলাম।»
সিনথিয়ার বুকটা উষ্ণ হয়ে উঠল। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে! «সত্যি?»
«সত্যি। সারাদিন তোর কথা ভেবেছি।»
«কী ভেবেছ?»
«বলব? রাগ করবি না?»
«বল।»
«ভেবেছি — তোর চুলগুলো কেমন হবে খোলা অবস্থায়। কোমর পর্যন্ত চুল... আমি যদি তোর পেছনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ে চুমু খাই...»
সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনাটা এত জীবন্ত — তার ঘাড়ে যেন সত্যিই কারো নিঃশ্বাস লাগছে। «তানভীর...»
«হুম?»
«তুমি এত সুন্দর করে কী করে বলো?»
«কারণ তুই সুন্দর করে শুনিস।»
এভাবে কথা এগোল — আরও গভীরে, আরও কাছে। তানভীর আজ আরও সাহসী। সে জিজ্ঞেস করল তার পছন্দ-অপছন্দ, তার ভয়, তার স্বপ্ন। আর প্রতিটা উত্তরের পর বলল — «আরও বল। তোর কথা শুনতে ভালো লাগে।» সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে এমন কথা বলছে, যা সে কাউকে কখনো বলেনি। এমনকি নাবিলাকেও না। যে সে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি, কিন্তু ভালোবাসতে চায়। যে সে ভয় পায় — ধরা পড়ার, ভুল করার, হারিয়ে যাওয়ার।
«তুই জানিস, মিম,» তানভীর লিখল, «তুই আমার দেখা সবচেয়ে সত্যি মেয়ে।»
«আমি তো মিথ্যে নামে কথা বলছি।» — সিনথিয়া লিখে ফেলল, তারপর চমকে উঠল। এত সত্যি কথা কেন বলল?
«নামটা মিথ্যে হতে পারে,» তানভীর লিখল, «কিন্তু তুই মিথ্যে না। আমি টের পাই।»
সিনথিয়ার চোখ ভিজে উঠল। এই অচেনা ছেলেটা — যাকে সে কখনো দেখেনি — সে তাকে নাবিলার চেয়েও ভালো বুঝছে। এই ভাবনাটা আসতেই অপরাধবোধটা আবার ফিরে এলো, আরও তীব্র হয়ে। "নাবিলা, আমি তোকে ঠকাচ্ছি।" কিন্তু সে ফোনটা রাখতে পারল না।
রাত একটা বেজে গেল। সিনথিয়ার চোখ জ্বলছে, কিন্তু ঘুমের কথা মনেও হচ্ছে না। তখন তানভীর লিখল —
«মিম।»
«হুম?»
«একটা গেম খেলবি?»
সিনথিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। «কী গেম?»
«ট্রুথ অর ডেয়ার।»
সময় থেমে গেল। ট্রুথ অর ডেয়ার — সত্যি না সাহস। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে এই গেম মানে কী। সত্যি বলতে হবে — নগ্ন সত্যি। আর ডেয়ার মানে — যা বলা হবে, তা করতে হবে। তার হাত কাঁপছিল। তার বুক ধড়ফড় করছিল। ভয় — আর সেই ভয়ের নিচে, চাপা, মিষ্টি উত্তেজনা।
সে টাইপ করল। মুছল। আবার টাইপ করল।
«খেলব।»


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)