26-09-2026, 05:36 PM
মুখোশ
রাত এগারোটা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাসার সব আলো নিভে গেছে — বাবার ঘর থেকে ভেসে আসছে চাপা নাক ডাকার শব্দ, সিয়ামের ঘর অন্ধকার, মা'র ঘরের দরজা বন্ধ। শুধু সিনথিয়ার ঘরে জ্বলছে একটুকরো নীলচে আলো — কম্বলের নিচে লুকিয়ে রাখা ফোনের স্ক্রিনের আলো।
দরজার ছিটকিনিটা সে আজ নিজে লাগিয়েছে, খুব সাবধানে, যেন কোনো শব্দ না হয়। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল — মা'র সেই টোকা, দোরগোড়ায় থেমে যাওয়া সেই ঢেউ, সেই অতৃপ্তি যা সারাদিন তার শরীরে ঘুরে বেড়িয়েছে ছায়ার মতো। কলেজে ক্লাসের ফাঁকে, টিফিনে, বাসায় ফেরার রিকশায় — বারবার তার মনে পড়েছে সেই মুহূর্তটা, যখন সে প্রায় পৌঁছে গেছিল। আর প্রতিবার মনে পড়তেই উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে, লজ্জায় তার কান লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু আজ রাতে তার মাথায় অন্য একটা চিন্তা ঘুরছে। ২৭ জুনের পরিকল্পনাটা তো আছেই — সেদিন বাসা ফাঁকা থাকবে, সেদিন কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু তার আগে, এই অপেক্ষার দিনগুলোতে সে কী করবে? শুধু দেখে যাবে? শুধু পড়ে যাবে?
গত রাতে গ্রুপে সে দেখেছিল — মেয়েরা নিজেদের কথা লিখছে। নিজেদের ভয়, নিজেদের আনন্দ, নিজেদের শরীরের কথা। পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছিল — ইস, যদি সেও লিখতে পারত! যদি সেও বলতে পারত — «আমারও এমন হয়»! কিন্তু তার আসল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে সে কী করে লিখবে? ওই অ্যাকাউন্টে তার ছবি আছে, পরিবারের মানুষ আছে, আত্মীয়রা আছে, নাবিলা আছে। ওখানে একটা বোল্ড কমেন্ট করলেই খবর ছড়িয়ে পড়বে।
তাহলে?
সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবল। আর ভাবতে ভাবতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো — এমন একটা চিন্তা, যা ভাবতেই তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল।
একটা নতুন অ্যাকাউন্ট। একটা নকল পরিচয়। একটা মুখোশ।
মুখোশ পরলে কেউ চিনবে না। মুখোশের আড়ালে সে যা খুশি বলতে পারবে, যা খুশি লিখতে পারবে। কেউ জানবে না এই মেয়েটা আসলে মিরপুরের সেই লাজুক কলেজছাত্রী, যাকে সবাই «ভদ্র মেয়ে» বলে চেনে।
তার হাত কাঁপছিল উত্তেজনায়। কিন্তু সাথে সাথে আরেকটা ভয়ও এলো — নাবিলা তো বলেছিল, কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে ব্লক করে দিবি, নিজের ছবি দিবি না। নাবিলা যদি জানতে পারে সে নকল অ্যাকাউন্ট খুলে ছেলেদের সাথে কথা বলছে? নাবিলা রেগে যাবে। নাবিলা বলবে — «তুই পাগল হয়ে গেছিস!»
তাই সিনথিয়া সিদ্ধান্ত নিল — কাউকে বলবে না। নাবিলাকেও না। এই গোপন কথাটা শুধু তার থাকবে। তার জীবনে প্রথমবার, সে একটা এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সম্পূর্ণ একা — কারও পরামর্শ ছাড়া, কারও অনুমতি ছাড়া। এই একাকীত্বটাই তাকে অদ্ভুত একটা শক্তি দিল। সে আর কারও ছোট বোন না, কারও মেয়ে না, কারও বান্ধবী না। সে শুধু সে।
কাঁপা আঙুলে সে ফেসবুক অ্যাপ থেকে লগআউট করল। তারপর «নতুন অ্যাকাউন্ট খুলুন» বোতামে চাপ দিল।
নাম কী দেবে? তার আসল নাম তো দেওয়া যাবে না। এমন একটা নাম চাই, যা শুনলে কেউ সন্দেহ করবে না, যা ভিড়ে হারিয়ে যাবে। সে ভাবল... মিম। হ্যাঁ, মিম। ছোট, মিষ্টি, সাধারণ — হাজারটা মেয়ের নাম। পদবি? আক্তার। সবচেয়ে সাধারণ পদবি। মিম আক্তার — এই নামে ফেসবুকে লাখ লাখ মেয়ে আছে। কেউ খুঁজে পাবে না।
সে টাইপ করল — মিম আক্তার।
বয়স? আঠারো লিখলে... না। আঠারো লিখলে গ্রুপে ঢুকতে দেবে ঠিকই, কিন্তু সে চায় একটু বড় সাজতে। বিশ। হ্যাঁ, বিশ বছর। দুই বছরের মিথ্যে — তার জীবনের প্রথম পরিকল্পিত মিথ্যে, যা সে লিখছে নিজের হাতে। টাইপ করতে গিয়ে তার আঙুল এক মুহূর্ত থমকে রইল। বিশ। সে এখন বিশ। এই ছোট্ট সংখ্যাটা তাকে যেন দুই বছরের বড় করে দিল, দুই বছরের সাহসী করে দিল।
ঠিকানা? মিরপুর তো লেখা যাবে না। সে ভাবল — কোথায়? ধানমন্ডি। হ্যাঁ, ধানমন্ডি। মিরপুর থেকে অনেক দূরে, অন্য একটা জগৎ। কেউ সন্দেহ করবে না।
কলেজ? সে লিখল — «ঢাকার একটা কলেজে পড়ি।» ইচ্ছে করেই অস্পষ্ট রাখল। যত কম তথ্য, তত নিরাপদ।
তারপর এলো ছবির পালা। প্রোফাইল ফটো ছাড়া অ্যাকাউন্টটা মরা মরা লাগবে, কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু নিজের মুখের ছবি? কখনো না। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না।
সিনথিয়া উঠে বসল। জানালার পর্দাটা একটু সরাল — বাইরে চাঁদের আলো। সে ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল, চুলগুলো খুলে দিল। তারপর ফোনটা উঁচু করে, মুখটা পাশে ঘুরিয়ে, শাটার চাপল।
ছবিটা দেখল — চাঁদের আলোয় তার সিলুয়েট। খোলা চুল, মুখটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু গালের একটা রেখা আর কাঁধের বাঁক দেখা যাচ্ছে। মুখ চেনার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ছবিটা... সুন্দর। রহস্যময়। ঠিক যেমনটা সে চেয়েছিল।
শাটারের শব্দটা অন্ধকার ঘরে যেন বড় বড় শোনাল। সিনথিয়া দ্রুত জানালা থেকে সরে এলো, বুক ধড়ফড় করছে। সে এইমাত্র নিজের প্রথম নকল ছবি তুলল। সে এইমাত্র একটা মিথ্যে পরিচয়ের প্রথম ইট গাঁথল।
ছবিটা প্রোফাইলে বসাল। তারপর বায়োতে লিখল — «চাঁদ দেখতে ভালোবাসি।» সহজ, নিরীহ, কিন্তু একটু রহস্যময়।
ব্যস। মিম আক্তার জন্ম নিল — রাত বারোটা বাজার কয়েক মিনিট আগে, মিরপুরের একটা অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে।
সে প্রোফাইলটা আবার খুলে দেখল — ওপর থেকে নিচে। মিম আক্তার। বিশ বছর। ধানমন্ডি, ঢাকা। চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। এই মেয়েটা কে? সিনথিয়া ভাবল। এই মেয়েটা কি সে-ই? নাকি অন্য কেউ — যাকে সে এতদিন ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল, আর আজ রাতে মুক্তি দিল? তার মনে হলো, মিম আসলে নতুন কেউ না। মিম হলো সিনথিয়ার সেই অংশ, যাকে সে কখনো বাইরে আসতে দেয়নি। আজ সে দরজা খুলে দিয়েছে।
সে ছবিটা জুম করে দেখল — কোথাও মুখের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে কিনা। না। শুধু অন্ধকার আর আলোর খেলা। তবু তার ভয় করছিল — যদি কেউ চিনে ফেলে? যদি নাবিলা দেখে? সে দ্রুত মাথা নাড়ল। নাবিলা জানবে না। কেউ জানবে না। এই ছবি, এই নাম, এই মেয়ে — সব শুধু তার।
সিনথিয়া নতুন অ্যাকাউন্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। শূন্য বন্ধু, শূন্য পোস্ট, একটা চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। কিন্তু এই শূন্যতার ভেতরেই যেন একটা পুরো নতুন জীবন লুকিয়ে আছে। সে অনুভব করল — সে দুজন হয়ে গেছে। একজন সিনথিয়া, যে কাল সকালে উঠে কলেজে যাবে, মা'র কথা শুনবে, ভদ্র মেয়ে সেজে থাকবে। আরেকজন মিম, যে এখন জেগে আছে, যে ভয় পায় না, যে যা খুশি বলতে পারে।
এবার গ্রুপে ঢোকার পালা। সে সার্চ বারে টাইপ করল — «? Only 18+ ?»। গ্রুপটা এলো। «যোগ দিন» বোতামে চাপ দিল।
তিনটে প্রশ্ন এলো। প্রথমটা — «আপনার বয়স কি ১৮ বা তার বেশি?» সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। মিমের বয়স বিশ। সে টিক দিল — হ্যাঁ। দ্বিতীয়টা — «গ্রুপের নিয়ম মানবেন?» — হ্যাঁ। তৃতীয়টা — «নিজের আসল ছবি দিয়ে জয়েন করেছেন?» — এই প্রশ্নে তার হাত এক মুহূর্ত থামল। তারপর সে টিক দিল — হ্যাঁ। আরেকটা মিথ্যে। মিথ্যেগুলো এখন সহজ হয়ে আসছে।
«অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। অ্যাডমিন অনুমোদন করলে আপনি যোগ দিতে পারবেন।»
এবার অপেক্ষা। সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক মিনিট। সে ভাবল — যদি অ্যাডমিন বুঝে ফেলে এটা নকল অ্যাকাউন্ট? যদি রিজেক্ট করে দেয়? তাহলে এই রাতের সব উত্তেজনা মাটি।
পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... সে প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল।
«অভিনন্দন! আপনি «? Only 18+ ?» গ্রুপে যোগ দিয়েছেন।»
সিনথিয়ার মুখে হাসি ফুটল — এমন হাসি, যা সে অনেকদিন হাসেনি। সে ভেতরে ঢুকল।
গ্রুপটা একই আছে — সেই পোস্ট, সেই কমেন্ট, সেই ভিডিও। কিন্তু আজ সবকিছু অন্যরকম লাগছে। কারণ আজ সে দর্শক না। আজ সে মিম। আজ সে বলতে পারে।
সে একটা পোস্ট খুলল — একটা মেয়ে লিখেছে তার প্রথম ভালোবাসার কথা, কীভাবে একটা ছেলে প্রথমবার তার হাত ধরেছিল। নিচে মেয়েরা নিজেদের গল্প শেয়ার করছে — «আমারও এমন হয়েছিল!», «পড়ে চোখে পানি চলে এলো।» মিম একটা কমেন্টে লাইক দিল — শুধু লাইক, এখনো কথা বলার সাহস হয়নি। আরেকটা পোস্টে একটা মেয়ে মজার একটা ছবি শেয়ার করেছে। মিম হেসে ফেলল অন্ধকারে, মুখে হাত চাপা দিয়ে — যেন কেউ শুনে ফেলবে। এই হাসিটা, এই স্বাধীনতাটা — নিজের আসল নামে সে কখনো পেত না।
সে স্ক্রল করতে লাগল। একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল — সেই পোস্টটা, যেটা গত রাতে সে পড়েছিল। «মেয়েরা মাস্টারবেশন করে — এটা স্বাভাবিক। যারা বলে করে না, তারা মিথ্যে বলে।» নিচে শয়ে শয়ে কমেন্ট। মেয়েরা নিজেদের গল্প লিখছে — কেউ লিখেছে প্রথমবারের ভয়, কেউ লিখেছে এখনকার আনন্দ।
সিনথিয়ার আঙুল কমেন্ট বক্সের ওপর ঘুরছিল। লিখবে? লিখবে না? তার আসল পরিচয়ে সে কখনো সাহস পেত না। কিন্তু সে তো এখন সিনথিয়া না। সে মিম।
সে টাইপ করতে শুরু করল। প্রথমে লিখল, মুছল। আবার লিখল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে।
অবশেষে সে লিখল — «আমি নতুন। এতদিন ভাবতাম শুধু আমারই এমন হয়, আর আমি খারাপ। আজ বুঝলাম — নিজের শরীরকে চেনা কোনো পাপ না। ধন্যবাদ এই পোস্টটার জন্য।»
পোস্ট বোতামে চাপ দেওয়ার আগে তার হাত কাঁপছিল। তারপর... চাপ দিল।
হয়ে গেল। তার প্রথম বোল্ড কমেন্ট। মিমের প্রথম কথা।
সে ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করল। এক... দুই... তিন... ফোনটা ভাইব্রেট করল। একটা লাইক। তারপর আরেকটা। তারপর কমেন্ট — একটা মেয়ে লিখেছে, «ওয়েলকাম আপু! ঠিক বলেছো।» আরেকজন — «সাহসী মেয়ে!» সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা ফুলে উঠল। মিমকে সবাই পছন্দ করছে। মিমকে সবাই বাহবা দিচ্ছে।
কমেন্ট আসতেই থাকল। একটা মেয়ে লিখল — «আমিও প্রথমে ভয় পেতাম আপু। তুমি একা না।» মিম জবাব দিল — «ধন্যবাদ। তোমার কথা শুনে সাহস পেলাম।» এই ছোট্ট আদান-প্রদানেই তার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। অচেনা মেয়েরা, অচেনা জায়গা থেকে — তবু যেন সবাই একটা গোপন বোন-সমাজের সদস্য। সিনথিয়া ভাবল — বাইরের জগতে মেয়েরা এত খোলাখুলি কথা বলে না। কিন্তু এই গ্রুপে, এই মুখোশের আড়ালে, সবাই সত্যি।
কিন্তু তার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একটা কমেন্ট এলো একটা ছেলের থেকে — «ইনবক্সে আসো, কথা বলি।» সিনথিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত ওই ছেলের প্রোফাইলে ঢুকল — জিমের আয়নায় তোলা শার্টখোলা ছবি, বায়োতে লেখা «ব্যাড বয়»। তার বমি পাচ্ছিল। না। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে।
আর তখনই শুরু হলো আসল ঝড়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। একটা... দুটো... পাঁচটা... দশটা। নোটিফিকেশন বাজতেই থাকল। মিমের ওই একটা কমেন্ট আর চাঁদ-আলোর ছবি যেন গ্রুপের ছেলেদের পাগল করে দিয়েছে।
সিনথিয়া রিকোয়েস্টের লিস্ট খুলল। নাবিলার নিয়মগুলো তার মাথায় বাজছিল — যেন নাবিলা তার পাশে বসে ফিসফিস করছে। সে প্রতিটা প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। শার্টখোলা ছবি — বাতিল। বায়োতে «প্লেবয়» লেখা — বাতিল। প্রোফাইলে কোনো ছবিই নেই, শুধু একটা কার্টুন — বাতিল। একটা রিকোয়েস্ট এলো — প্রোফাইলে একটা ফুলের ছবি, নাম «রাজু»। সিনথিয়া ভাবল, ফুলের ছবি মানে ভদ্র? সে প্রোফাইলে ঢুকল — ভেতরে শুধু শেয়ার করা নোংরা রসিকতা। বাতিল। আরেকটা — নাম «অর্ণব», ছবিতে সানগ্লাস পরা সেলফি। মেসেজ — «হাই সুন্দরী, কেমন আছো?» এই সম্বোধনেই তার গা ঘিনঘিন করল। বাতিল। প্রতিটা বাতিলের সাথে সাথে তার আঙুল আরও দ্রুত, আরও নিশ্চিত হচ্ছিল। সে শিখে যাচ্ছে — এই জঙ্গলে কী করে বাঁচতে হয়। নাবিলা যদি দেখত, গর্ব করত। একজনের মেসেজ এলো রিকোয়েস্টের সাথেই — «হাই মাগি, কথা বলবা?» সিনথিয়ার পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই ভাষা! এই নোংরামি! সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে লোকটাকে ব্লক করে দিল। ব্লক বোতামে চাপ দিতে দিতে তার মনে হলো — সে যেন একটা তলোয়ার চালাচ্ছে। মিম দুর্বল না। মিম নিজেকে রক্ষা করতে জানে।
বেশিরভাগ রিকোয়েস্টই ছিল এমন — নোংরা, তাড়াহুড়ো, লোভী। সে একের পর এক বাতিল করে দিল। কিন্তু তারপর একটা রিকোয়েস্টে তার চোখ আটকে গেল।
তানভীর। বয়স তেইশ। প্রোফাইল ছবিতে একটা ভদ্র ছেলে — কালো পাঞ্জাবি পরা, কোনো একটা অনুষ্ঠানে তোলা ছবি, মুখে হালকা হাসি। চোখদুটো শান্ত। কোনো শার্টখোলা নোংরামি নেই, বায়োতে কোনো «ব্যাড বয়» নেই। শুধু লেখা — «বই পড়তে ভালোবাসি।»
আর রিকোয়েস্টের সাথে একটা মেসেজ — «হ্যালো। আপনার কমেন্টটা পড়লাম গ্রুপে। খুব সুন্দর করে লিখেছেন। আমি তানভীর। কথা বলা যাবে?»
সিনথিয়া মেসেজটা তিনবার পড়ল। «আপনি» — কতদিন কেউ তাকে «আপনি» বলে সম্বোধন করেনি এই জগতে! এই একটা শব্দেই লোকটা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেল। ভদ্র। ধীর। তাড়াহুড়ো নেই।
সে আরও দুটো রিকোয়েস্ট বেছে নিল। একটা মেয়ের — প্রিয়া, একুশ বছর, যে তার কমেন্টে «ওয়েলকাম আপু!» লিখেছিল। মেয়েদের সাথে কথা বলা নিরাপদ। আরেকটা ছেলের — সাকিব, যার মেসেজ ছিল সংক্ষিপ্ত আর ভদ্র — «হাই, গ্রুপে নতুনদের সাথে পরিচিত হতে চাই।» প্রোফাইলটা স্বাভাবিক। সে সাবধানে অ্যাকসেপ্ট করল।
তিনজন। মিমের প্রথম তিনজন বন্ধু।
সবার আগে মেসেজ এলো তানভীরের। «ধন্যবাদ অ্যাকসেপ্ট করার জন্য।»
মিম টাইপ করল — «স্বাগতম।» তারপর থামল। সে কী লিখবে? সিনথিয়া হলে এতক্ষণে লজ্জায় ফোন রেখে দিত। কিন্তু মিম লজ্জা পায় না। মিম লিখল — «এত রাতে জেগে আছেন?»
জবাব এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে — «আপনিও তো জেগে আছেন। রাত জাগা মানুষদের ঘুম কম আসে।»
সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। লোকটা কথা বলতে জানে।
«কী করেন?» — তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«কলেজে পড়ি,» মিম লিখল। তারপর সাবধানে যোগ করল — «ঢাকার একটা কলেজে। আপনি?»
«আমি চাকরি করি। ছোটখাটো একটা ফার্মে।» সহজ, সত্যি মনে হলো। «থাকি মোহাম্মদপুরে। আপনি?»
সিনথিয়ার আঙুল এক মুহূর্ত থামল। তারপর লিখল — «ধানমন্ডি।» মিথ্যেটা এখন আর কাঁপুনি তোলে না। মিথ্যে এখন তার ভাষা।
«ওহ, কাছেই তো,» তানভীর লিখল। «আপনার নামটা সুন্দর — মিম।»
«ধন্যবাদ।»
«এই নামে কেউ ডাকে?»
মিম লিখল — «এখন আপনি ডাকলেন।»
পাঠানোর পর সিনথিয়া নিজেই চমকে উঠল। এটা সে লিখল? এই ফ্লার্ট, এই খেলা — এটা কোথা থেকে এলো? সিনথিয়া তো এমন না! কিন্তু মিম এমন। মিমের ভেতরে যেন আরেকটা মেয়ে বাস করে — সাহসী, চালাক, যে জানে কী বললে ছেলেদের বুক ধড়ফড় করে।
তানভীরের জবাব এলো — «তাহলে আমি ভাগ্যবান।» সাথে একটা হাসির ইমোজি।
সিনথিয়া কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে হাসল। তার গাল গরম। তার বুক ধড়ফড় করছে। এটা কী হচ্ছে? একটা অচেনা ছেলের সাথে মাঝরাতে কথা বলছে সে — আর ভালো লাগছে!
তানভীর লিখল — «সত্যি বলতে, আপনার কমেন্টটা পড়ে মনে হলো আপনি ভেতর থেকে খুব সাহসী। কিন্তু বাইরে থেকে হয়তো লাজুক। ঠিক বলছি?»
সিনথিয়ার হাসি থেমে গেল। কী করে বুঝল? সে তো মিমকে চেনে না! সে সিনথিয়াকে চেনে না! তবু এত নির্ভুলভাবে পড়ে ফেলল?
«অনুমান,» তানভীর লিখল, যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। «আমি মানুষ পড়তে পারি। এটা আমার অভ্যাস।»
«ভয়ংকর অভ্যাস,» মিম লিখল।
«ভয় পাবেন না। আমি ভালো মানুষ।»
«ভালো মানুষরা এত রাতে জেগে থাকে না,» মিম লিখল, সাহস করে।
«তাহলে আমিও খারাপ, আপনিও খারাপ,» তানভীরের জবাব। «দুই খারাপ মানুষের আড্ডা।»
মিম হেসে ফেলল। «আমি খারাপ না।»
«এখনো না,» তানভীর লিখল। «কিন্তু রাত এখনো অনেক বাকি।»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই লোকটা... এই লোকটা কথায় কথায় ফাঁদ পাতে। ভদ্র ফাঁদ। সে টের পাচ্ছে, তবু পা দিচ্ছে।
আর তখনই তানভীরের পরের মেসেজটা এলো — আর এই মেসেজটা পড়ে সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল।
«এই রাতে, একা ঘরে, ফোনের আলোয়... কী ভাবছেন, মিম?»
সরাসরি প্রশ্ন। ভদ্র ভাষায়, কিন্তু ভেতরে দুষ্টুমি। সিনথিয়া টের পেল তার উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে। লোকটা জানে। লোকটা বোঝে এই রাতের ভাষা।
সে কী লিখবে? «কিছু না» — এই মিথ্যেটা খুব সহজ। কিন্তু মিম কি মিথ্যে বলবে?
ঠিক তখনই প্রিয়ার মেসেজ এলো — «হাই আপু! আমি প্রিয়া। তোমার কমেন্টটা খুব ভালো লাগল।» মিষ্টি, নিরীহ। মিম জবাব দিল — «হাই প্রিয়া! ধন্যবাদ।» প্রিয়া লিখল — «তুমি কি ঢাকায় থাকো?» — «হ্যাঁ, ধানমন্ডিতে। তুমি?» — «আমি উত্তরা।» মেয়েদের সাথে কথা বলা এত সহজ, এত নির্ভার।
আর সাকিব লিখেছে — «হাই মিম। কী করো?» মিম সংক্ষেপে জবাব দিল — «কলেজে পড়ি।» সাকিব — «কোন কলেজ?» মিম সাবধানে লিখল — «নাম বলতে চাই না, প্রাইভেসি।» সাকিব — «ওহ, ঠিক আছে।» ভালো, বুঝদার ছেলে।
তিনটে চ্যাট, তিন রকম মিম। প্রিয়ার কাছে সে বড় আপু — মিষ্টি, সহজ। সাকিবের কাছে সে সাবধানী — মাপা, দূরত্ব রাখা। আর তানভীরের কাছে... তানভীরের কাছে সে অন্য কেউ। এমন কেউ, যাকে সে নিজেও চেনে না এখনো।
সে এক মুহূর্তের জন্য থামল। এইমাত্র যা ঘটল, তা কি স্বাভাবিক? এক ঘণ্টা আগে সে ছিল শুধু সিনথিয়া — একটা ভদ্র, লাজুক মেয়ে। আর এখন সে তিনজন মানুষের সাথে তিন রকম কথা বলছে, তিনটে মুখোশ পরে। তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ভালো লাগছিল। যেন সে এতদিন একটা ছোট ঘরে বন্দি ছিল, আর আজ কেউ দরজা খুলে দিয়েছে।
সে তানভীরের প্রশ্নে ফিরে গেল — «কী ভাবছেন, মিম?»
মিম লিখল — «কিছু না।»
জবাব এলো সাথে সাথে — «মিথ্যে বলছেন।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। «কী করে বুঝলেন?»
«কারণ আমিও কিছু ভাবছি,» তানভীর লিখল। «আর আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজন একই জিনিস ভাবছি।»
ঘরের অন্ধকারটা হঠাৎ আরও গাঢ় মনে হলো। ফোনের আলোটা আরও নীল। সিনথিয়া টের পেল তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছে — সালোয়ারের ওপর দিয়ে, উরুর মাঝখানে। সে চমকে হাতটা সরিয়ে নিল। না। এখন না। এখন সে কথা বলছে।
কিন্তু তানভীর থামল না। «মিম,» সে লিখল, «আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে। অনেকদিন এমন কারও সাথে কথা হয়নি, যে বোঝে।»
«আমিও,» মিম লিখল। আর এটা সত্যি ছিল। এই অচেনা ছেলেটা, এই মাঝরাত, এই গোপন পরিচয় — সব মিলিয়ে তার মনে হচ্ছিল সে ভাসছে।
«কাল আবার কথা হবে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«হবে,» মিম লিখল। «আমি এখানেই থাকব।»
«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»
«গুড নাইট।»
সে তানভীরের প্রোফাইলটা আবার খুলল। ছবিটা বড় করে দেখল — কালো পাঞ্জাবি, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। এই মানুষটা আসলে কে? সত্যিই ভালো, নাকি ভালো সাজার ভান? মিমের মন বলল — যাচাই করার সময় আছে। আজ শুধু কথা। কাল... কাল দেখা যাবে।
চ্যাটটা শেষ হলো। কিন্তু সিনথিয়ার ঘুম এলো না। সে ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কানে বাজছে তানভীরের শেষ কথাটা — «স্বপ্নে দেখা হবে।» সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে ভেসে উঠল একটা মুখ — কালো পাঞ্জাবি পরা, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। তানভীর। যাকে সে কখনো দেখেনি, তবু যেন চেনে।
ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল। নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। আরও তিনটে। তারপর আরও দুটো। ইনবক্সে নতুন মেসেজ — «হাই মিম, কথা বলবা?» অচেনা নাম। সিনথিয়া প্রোফাইলটা দেখল — স্বাভাবিক মনে হলো। সে রিকোয়েস্টটা ঝুলিয়ে রাখল। কাল দেখা যাবে।
নোটিফিকেশন থামছিল না। মিম আক্তার — এক ঘণ্টা আগেও যার অস্তিত্ব ছিল না — এখন তার ইনবক্স ভরে উঠছে, তার নামে মানুষ কথা বলতে চাইছে।
সিনথিয়া ফোনটা পাশে রেখে দিল। অন্ধকারে শুয়ে সে ফিসফিস করে বলল —
«মিম।»
নামটা অন্ধকারে ভেসে রইল। তার নিজের কণ্ঠে, তার নিজের ঘরে — একটা নতুন নাম, একটা নতুন মেয়ে। সিনথিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে এই বাসায়। কিন্তু মিম জেগে আছে — ফোনের ভেতর, রাতের ভেতর, তার বুকের ভেতর।
সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে মিমের মুখটা ভেসে উঠল — চাঁদ-আলোর সিলুয়েট, খোলা চুল, অদেখা মুখ। এই মেয়েটা কাল কী করবে? কাদের সাথে কথা বলবে? কতদূর যাবে? সিনথিয়া জানে না। সে শুধু জানে — দরজাটা খুলে গেছে। আর বন্ধ করার ইচ্ছে তার নেই।
(চলবে...)
রাত এগারোটা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাসার সব আলো নিভে গেছে — বাবার ঘর থেকে ভেসে আসছে চাপা নাক ডাকার শব্দ, সিয়ামের ঘর অন্ধকার, মা'র ঘরের দরজা বন্ধ। শুধু সিনথিয়ার ঘরে জ্বলছে একটুকরো নীলচে আলো — কম্বলের নিচে লুকিয়ে রাখা ফোনের স্ক্রিনের আলো।
দরজার ছিটকিনিটা সে আজ নিজে লাগিয়েছে, খুব সাবধানে, যেন কোনো শব্দ না হয়। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল — মা'র সেই টোকা, দোরগোড়ায় থেমে যাওয়া সেই ঢেউ, সেই অতৃপ্তি যা সারাদিন তার শরীরে ঘুরে বেড়িয়েছে ছায়ার মতো। কলেজে ক্লাসের ফাঁকে, টিফিনে, বাসায় ফেরার রিকশায় — বারবার তার মনে পড়েছে সেই মুহূর্তটা, যখন সে প্রায় পৌঁছে গেছিল। আর প্রতিবার মনে পড়তেই উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে, লজ্জায় তার কান লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু আজ রাতে তার মাথায় অন্য একটা চিন্তা ঘুরছে। ২৭ জুনের পরিকল্পনাটা তো আছেই — সেদিন বাসা ফাঁকা থাকবে, সেদিন কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু তার আগে, এই অপেক্ষার দিনগুলোতে সে কী করবে? শুধু দেখে যাবে? শুধু পড়ে যাবে?
গত রাতে গ্রুপে সে দেখেছিল — মেয়েরা নিজেদের কথা লিখছে। নিজেদের ভয়, নিজেদের আনন্দ, নিজেদের শরীরের কথা। পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছিল — ইস, যদি সেও লিখতে পারত! যদি সেও বলতে পারত — «আমারও এমন হয়»! কিন্তু তার আসল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে সে কী করে লিখবে? ওই অ্যাকাউন্টে তার ছবি আছে, পরিবারের মানুষ আছে, আত্মীয়রা আছে, নাবিলা আছে। ওখানে একটা বোল্ড কমেন্ট করলেই খবর ছড়িয়ে পড়বে।
তাহলে?
সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবল। আর ভাবতে ভাবতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো — এমন একটা চিন্তা, যা ভাবতেই তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল।
একটা নতুন অ্যাকাউন্ট। একটা নকল পরিচয়। একটা মুখোশ।
মুখোশ পরলে কেউ চিনবে না। মুখোশের আড়ালে সে যা খুশি বলতে পারবে, যা খুশি লিখতে পারবে। কেউ জানবে না এই মেয়েটা আসলে মিরপুরের সেই লাজুক কলেজছাত্রী, যাকে সবাই «ভদ্র মেয়ে» বলে চেনে।
তার হাত কাঁপছিল উত্তেজনায়। কিন্তু সাথে সাথে আরেকটা ভয়ও এলো — নাবিলা তো বলেছিল, কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে ব্লক করে দিবি, নিজের ছবি দিবি না। নাবিলা যদি জানতে পারে সে নকল অ্যাকাউন্ট খুলে ছেলেদের সাথে কথা বলছে? নাবিলা রেগে যাবে। নাবিলা বলবে — «তুই পাগল হয়ে গেছিস!»
তাই সিনথিয়া সিদ্ধান্ত নিল — কাউকে বলবে না। নাবিলাকেও না। এই গোপন কথাটা শুধু তার থাকবে। তার জীবনে প্রথমবার, সে একটা এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সম্পূর্ণ একা — কারও পরামর্শ ছাড়া, কারও অনুমতি ছাড়া। এই একাকীত্বটাই তাকে অদ্ভুত একটা শক্তি দিল। সে আর কারও ছোট বোন না, কারও মেয়ে না, কারও বান্ধবী না। সে শুধু সে।
কাঁপা আঙুলে সে ফেসবুক অ্যাপ থেকে লগআউট করল। তারপর «নতুন অ্যাকাউন্ট খুলুন» বোতামে চাপ দিল।
নাম কী দেবে? তার আসল নাম তো দেওয়া যাবে না। এমন একটা নাম চাই, যা শুনলে কেউ সন্দেহ করবে না, যা ভিড়ে হারিয়ে যাবে। সে ভাবল... মিম। হ্যাঁ, মিম। ছোট, মিষ্টি, সাধারণ — হাজারটা মেয়ের নাম। পদবি? আক্তার। সবচেয়ে সাধারণ পদবি। মিম আক্তার — এই নামে ফেসবুকে লাখ লাখ মেয়ে আছে। কেউ খুঁজে পাবে না।
সে টাইপ করল — মিম আক্তার।
বয়স? আঠারো লিখলে... না। আঠারো লিখলে গ্রুপে ঢুকতে দেবে ঠিকই, কিন্তু সে চায় একটু বড় সাজতে। বিশ। হ্যাঁ, বিশ বছর। দুই বছরের মিথ্যে — তার জীবনের প্রথম পরিকল্পিত মিথ্যে, যা সে লিখছে নিজের হাতে। টাইপ করতে গিয়ে তার আঙুল এক মুহূর্ত থমকে রইল। বিশ। সে এখন বিশ। এই ছোট্ট সংখ্যাটা তাকে যেন দুই বছরের বড় করে দিল, দুই বছরের সাহসী করে দিল।
ঠিকানা? মিরপুর তো লেখা যাবে না। সে ভাবল — কোথায়? ধানমন্ডি। হ্যাঁ, ধানমন্ডি। মিরপুর থেকে অনেক দূরে, অন্য একটা জগৎ। কেউ সন্দেহ করবে না।
কলেজ? সে লিখল — «ঢাকার একটা কলেজে পড়ি।» ইচ্ছে করেই অস্পষ্ট রাখল। যত কম তথ্য, তত নিরাপদ।
তারপর এলো ছবির পালা। প্রোফাইল ফটো ছাড়া অ্যাকাউন্টটা মরা মরা লাগবে, কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু নিজের মুখের ছবি? কখনো না। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না।
সিনথিয়া উঠে বসল। জানালার পর্দাটা একটু সরাল — বাইরে চাঁদের আলো। সে ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল, চুলগুলো খুলে দিল। তারপর ফোনটা উঁচু করে, মুখটা পাশে ঘুরিয়ে, শাটার চাপল।
ছবিটা দেখল — চাঁদের আলোয় তার সিলুয়েট। খোলা চুল, মুখটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু গালের একটা রেখা আর কাঁধের বাঁক দেখা যাচ্ছে। মুখ চেনার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ছবিটা... সুন্দর। রহস্যময়। ঠিক যেমনটা সে চেয়েছিল।
শাটারের শব্দটা অন্ধকার ঘরে যেন বড় বড় শোনাল। সিনথিয়া দ্রুত জানালা থেকে সরে এলো, বুক ধড়ফড় করছে। সে এইমাত্র নিজের প্রথম নকল ছবি তুলল। সে এইমাত্র একটা মিথ্যে পরিচয়ের প্রথম ইট গাঁথল।
ছবিটা প্রোফাইলে বসাল। তারপর বায়োতে লিখল — «চাঁদ দেখতে ভালোবাসি।» সহজ, নিরীহ, কিন্তু একটু রহস্যময়।
ব্যস। মিম আক্তার জন্ম নিল — রাত বারোটা বাজার কয়েক মিনিট আগে, মিরপুরের একটা অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে।
সে প্রোফাইলটা আবার খুলে দেখল — ওপর থেকে নিচে। মিম আক্তার। বিশ বছর। ধানমন্ডি, ঢাকা। চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। এই মেয়েটা কে? সিনথিয়া ভাবল। এই মেয়েটা কি সে-ই? নাকি অন্য কেউ — যাকে সে এতদিন ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল, আর আজ রাতে মুক্তি দিল? তার মনে হলো, মিম আসলে নতুন কেউ না। মিম হলো সিনথিয়ার সেই অংশ, যাকে সে কখনো বাইরে আসতে দেয়নি। আজ সে দরজা খুলে দিয়েছে।
সে ছবিটা জুম করে দেখল — কোথাও মুখের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে কিনা। না। শুধু অন্ধকার আর আলোর খেলা। তবু তার ভয় করছিল — যদি কেউ চিনে ফেলে? যদি নাবিলা দেখে? সে দ্রুত মাথা নাড়ল। নাবিলা জানবে না। কেউ জানবে না। এই ছবি, এই নাম, এই মেয়ে — সব শুধু তার।
সিনথিয়া নতুন অ্যাকাউন্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। শূন্য বন্ধু, শূন্য পোস্ট, একটা চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। কিন্তু এই শূন্যতার ভেতরেই যেন একটা পুরো নতুন জীবন লুকিয়ে আছে। সে অনুভব করল — সে দুজন হয়ে গেছে। একজন সিনথিয়া, যে কাল সকালে উঠে কলেজে যাবে, মা'র কথা শুনবে, ভদ্র মেয়ে সেজে থাকবে। আরেকজন মিম, যে এখন জেগে আছে, যে ভয় পায় না, যে যা খুশি বলতে পারে।
এবার গ্রুপে ঢোকার পালা। সে সার্চ বারে টাইপ করল — «? Only 18+ ?»। গ্রুপটা এলো। «যোগ দিন» বোতামে চাপ দিল।
তিনটে প্রশ্ন এলো। প্রথমটা — «আপনার বয়স কি ১৮ বা তার বেশি?» সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। মিমের বয়স বিশ। সে টিক দিল — হ্যাঁ। দ্বিতীয়টা — «গ্রুপের নিয়ম মানবেন?» — হ্যাঁ। তৃতীয়টা — «নিজের আসল ছবি দিয়ে জয়েন করেছেন?» — এই প্রশ্নে তার হাত এক মুহূর্ত থামল। তারপর সে টিক দিল — হ্যাঁ। আরেকটা মিথ্যে। মিথ্যেগুলো এখন সহজ হয়ে আসছে।
«অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। অ্যাডমিন অনুমোদন করলে আপনি যোগ দিতে পারবেন।»
এবার অপেক্ষা। সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক মিনিট। সে ভাবল — যদি অ্যাডমিন বুঝে ফেলে এটা নকল অ্যাকাউন্ট? যদি রিজেক্ট করে দেয়? তাহলে এই রাতের সব উত্তেজনা মাটি।
পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... সে প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল।
«অভিনন্দন! আপনি «? Only 18+ ?» গ্রুপে যোগ দিয়েছেন।»
সিনথিয়ার মুখে হাসি ফুটল — এমন হাসি, যা সে অনেকদিন হাসেনি। সে ভেতরে ঢুকল।
গ্রুপটা একই আছে — সেই পোস্ট, সেই কমেন্ট, সেই ভিডিও। কিন্তু আজ সবকিছু অন্যরকম লাগছে। কারণ আজ সে দর্শক না। আজ সে মিম। আজ সে বলতে পারে।
সে একটা পোস্ট খুলল — একটা মেয়ে লিখেছে তার প্রথম ভালোবাসার কথা, কীভাবে একটা ছেলে প্রথমবার তার হাত ধরেছিল। নিচে মেয়েরা নিজেদের গল্প শেয়ার করছে — «আমারও এমন হয়েছিল!», «পড়ে চোখে পানি চলে এলো।» মিম একটা কমেন্টে লাইক দিল — শুধু লাইক, এখনো কথা বলার সাহস হয়নি। আরেকটা পোস্টে একটা মেয়ে মজার একটা ছবি শেয়ার করেছে। মিম হেসে ফেলল অন্ধকারে, মুখে হাত চাপা দিয়ে — যেন কেউ শুনে ফেলবে। এই হাসিটা, এই স্বাধীনতাটা — নিজের আসল নামে সে কখনো পেত না।
সে স্ক্রল করতে লাগল। একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল — সেই পোস্টটা, যেটা গত রাতে সে পড়েছিল। «মেয়েরা মাস্টারবেশন করে — এটা স্বাভাবিক। যারা বলে করে না, তারা মিথ্যে বলে।» নিচে শয়ে শয়ে কমেন্ট। মেয়েরা নিজেদের গল্প লিখছে — কেউ লিখেছে প্রথমবারের ভয়, কেউ লিখেছে এখনকার আনন্দ।
সিনথিয়ার আঙুল কমেন্ট বক্সের ওপর ঘুরছিল। লিখবে? লিখবে না? তার আসল পরিচয়ে সে কখনো সাহস পেত না। কিন্তু সে তো এখন সিনথিয়া না। সে মিম।
সে টাইপ করতে শুরু করল। প্রথমে লিখল, মুছল। আবার লিখল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে।
অবশেষে সে লিখল — «আমি নতুন। এতদিন ভাবতাম শুধু আমারই এমন হয়, আর আমি খারাপ। আজ বুঝলাম — নিজের শরীরকে চেনা কোনো পাপ না। ধন্যবাদ এই পোস্টটার জন্য।»
পোস্ট বোতামে চাপ দেওয়ার আগে তার হাত কাঁপছিল। তারপর... চাপ দিল।
হয়ে গেল। তার প্রথম বোল্ড কমেন্ট। মিমের প্রথম কথা।
সে ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করল। এক... দুই... তিন... ফোনটা ভাইব্রেট করল। একটা লাইক। তারপর আরেকটা। তারপর কমেন্ট — একটা মেয়ে লিখেছে, «ওয়েলকাম আপু! ঠিক বলেছো।» আরেকজন — «সাহসী মেয়ে!» সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা ফুলে উঠল। মিমকে সবাই পছন্দ করছে। মিমকে সবাই বাহবা দিচ্ছে।
কমেন্ট আসতেই থাকল। একটা মেয়ে লিখল — «আমিও প্রথমে ভয় পেতাম আপু। তুমি একা না।» মিম জবাব দিল — «ধন্যবাদ। তোমার কথা শুনে সাহস পেলাম।» এই ছোট্ট আদান-প্রদানেই তার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। অচেনা মেয়েরা, অচেনা জায়গা থেকে — তবু যেন সবাই একটা গোপন বোন-সমাজের সদস্য। সিনথিয়া ভাবল — বাইরের জগতে মেয়েরা এত খোলাখুলি কথা বলে না। কিন্তু এই গ্রুপে, এই মুখোশের আড়ালে, সবাই সত্যি।
কিন্তু তার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একটা কমেন্ট এলো একটা ছেলের থেকে — «ইনবক্সে আসো, কথা বলি।» সিনথিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত ওই ছেলের প্রোফাইলে ঢুকল — জিমের আয়নায় তোলা শার্টখোলা ছবি, বায়োতে লেখা «ব্যাড বয়»। তার বমি পাচ্ছিল। না। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে।
আর তখনই শুরু হলো আসল ঝড়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। একটা... দুটো... পাঁচটা... দশটা। নোটিফিকেশন বাজতেই থাকল। মিমের ওই একটা কমেন্ট আর চাঁদ-আলোর ছবি যেন গ্রুপের ছেলেদের পাগল করে দিয়েছে।
সিনথিয়া রিকোয়েস্টের লিস্ট খুলল। নাবিলার নিয়মগুলো তার মাথায় বাজছিল — যেন নাবিলা তার পাশে বসে ফিসফিস করছে। সে প্রতিটা প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। শার্টখোলা ছবি — বাতিল। বায়োতে «প্লেবয়» লেখা — বাতিল। প্রোফাইলে কোনো ছবিই নেই, শুধু একটা কার্টুন — বাতিল। একটা রিকোয়েস্ট এলো — প্রোফাইলে একটা ফুলের ছবি, নাম «রাজু»। সিনথিয়া ভাবল, ফুলের ছবি মানে ভদ্র? সে প্রোফাইলে ঢুকল — ভেতরে শুধু শেয়ার করা নোংরা রসিকতা। বাতিল। আরেকটা — নাম «অর্ণব», ছবিতে সানগ্লাস পরা সেলফি। মেসেজ — «হাই সুন্দরী, কেমন আছো?» এই সম্বোধনেই তার গা ঘিনঘিন করল। বাতিল। প্রতিটা বাতিলের সাথে সাথে তার আঙুল আরও দ্রুত, আরও নিশ্চিত হচ্ছিল। সে শিখে যাচ্ছে — এই জঙ্গলে কী করে বাঁচতে হয়। নাবিলা যদি দেখত, গর্ব করত। একজনের মেসেজ এলো রিকোয়েস্টের সাথেই — «হাই মাগি, কথা বলবা?» সিনথিয়ার পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই ভাষা! এই নোংরামি! সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে লোকটাকে ব্লক করে দিল। ব্লক বোতামে চাপ দিতে দিতে তার মনে হলো — সে যেন একটা তলোয়ার চালাচ্ছে। মিম দুর্বল না। মিম নিজেকে রক্ষা করতে জানে।
বেশিরভাগ রিকোয়েস্টই ছিল এমন — নোংরা, তাড়াহুড়ো, লোভী। সে একের পর এক বাতিল করে দিল। কিন্তু তারপর একটা রিকোয়েস্টে তার চোখ আটকে গেল।
তানভীর। বয়স তেইশ। প্রোফাইল ছবিতে একটা ভদ্র ছেলে — কালো পাঞ্জাবি পরা, কোনো একটা অনুষ্ঠানে তোলা ছবি, মুখে হালকা হাসি। চোখদুটো শান্ত। কোনো শার্টখোলা নোংরামি নেই, বায়োতে কোনো «ব্যাড বয়» নেই। শুধু লেখা — «বই পড়তে ভালোবাসি।»
আর রিকোয়েস্টের সাথে একটা মেসেজ — «হ্যালো। আপনার কমেন্টটা পড়লাম গ্রুপে। খুব সুন্দর করে লিখেছেন। আমি তানভীর। কথা বলা যাবে?»
সিনথিয়া মেসেজটা তিনবার পড়ল। «আপনি» — কতদিন কেউ তাকে «আপনি» বলে সম্বোধন করেনি এই জগতে! এই একটা শব্দেই লোকটা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেল। ভদ্র। ধীর। তাড়াহুড়ো নেই।
সে আরও দুটো রিকোয়েস্ট বেছে নিল। একটা মেয়ের — প্রিয়া, একুশ বছর, যে তার কমেন্টে «ওয়েলকাম আপু!» লিখেছিল। মেয়েদের সাথে কথা বলা নিরাপদ। আরেকটা ছেলের — সাকিব, যার মেসেজ ছিল সংক্ষিপ্ত আর ভদ্র — «হাই, গ্রুপে নতুনদের সাথে পরিচিত হতে চাই।» প্রোফাইলটা স্বাভাবিক। সে সাবধানে অ্যাকসেপ্ট করল।
তিনজন। মিমের প্রথম তিনজন বন্ধু।
সবার আগে মেসেজ এলো তানভীরের। «ধন্যবাদ অ্যাকসেপ্ট করার জন্য।»
মিম টাইপ করল — «স্বাগতম।» তারপর থামল। সে কী লিখবে? সিনথিয়া হলে এতক্ষণে লজ্জায় ফোন রেখে দিত। কিন্তু মিম লজ্জা পায় না। মিম লিখল — «এত রাতে জেগে আছেন?»
জবাব এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে — «আপনিও তো জেগে আছেন। রাত জাগা মানুষদের ঘুম কম আসে।»
সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। লোকটা কথা বলতে জানে।
«কী করেন?» — তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«কলেজে পড়ি,» মিম লিখল। তারপর সাবধানে যোগ করল — «ঢাকার একটা কলেজে। আপনি?»
«আমি চাকরি করি। ছোটখাটো একটা ফার্মে।» সহজ, সত্যি মনে হলো। «থাকি মোহাম্মদপুরে। আপনি?»
সিনথিয়ার আঙুল এক মুহূর্ত থামল। তারপর লিখল — «ধানমন্ডি।» মিথ্যেটা এখন আর কাঁপুনি তোলে না। মিথ্যে এখন তার ভাষা।
«ওহ, কাছেই তো,» তানভীর লিখল। «আপনার নামটা সুন্দর — মিম।»
«ধন্যবাদ।»
«এই নামে কেউ ডাকে?»
মিম লিখল — «এখন আপনি ডাকলেন।»
পাঠানোর পর সিনথিয়া নিজেই চমকে উঠল। এটা সে লিখল? এই ফ্লার্ট, এই খেলা — এটা কোথা থেকে এলো? সিনথিয়া তো এমন না! কিন্তু মিম এমন। মিমের ভেতরে যেন আরেকটা মেয়ে বাস করে — সাহসী, চালাক, যে জানে কী বললে ছেলেদের বুক ধড়ফড় করে।
তানভীরের জবাব এলো — «তাহলে আমি ভাগ্যবান।» সাথে একটা হাসির ইমোজি।
সিনথিয়া কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে হাসল। তার গাল গরম। তার বুক ধড়ফড় করছে। এটা কী হচ্ছে? একটা অচেনা ছেলের সাথে মাঝরাতে কথা বলছে সে — আর ভালো লাগছে!
তানভীর লিখল — «সত্যি বলতে, আপনার কমেন্টটা পড়ে মনে হলো আপনি ভেতর থেকে খুব সাহসী। কিন্তু বাইরে থেকে হয়তো লাজুক। ঠিক বলছি?»
সিনথিয়ার হাসি থেমে গেল। কী করে বুঝল? সে তো মিমকে চেনে না! সে সিনথিয়াকে চেনে না! তবু এত নির্ভুলভাবে পড়ে ফেলল?
«অনুমান,» তানভীর লিখল, যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। «আমি মানুষ পড়তে পারি। এটা আমার অভ্যাস।»
«ভয়ংকর অভ্যাস,» মিম লিখল।
«ভয় পাবেন না। আমি ভালো মানুষ।»
«ভালো মানুষরা এত রাতে জেগে থাকে না,» মিম লিখল, সাহস করে।
«তাহলে আমিও খারাপ, আপনিও খারাপ,» তানভীরের জবাব। «দুই খারাপ মানুষের আড্ডা।»
মিম হেসে ফেলল। «আমি খারাপ না।»
«এখনো না,» তানভীর লিখল। «কিন্তু রাত এখনো অনেক বাকি।»
সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই লোকটা... এই লোকটা কথায় কথায় ফাঁদ পাতে। ভদ্র ফাঁদ। সে টের পাচ্ছে, তবু পা দিচ্ছে।
আর তখনই তানভীরের পরের মেসেজটা এলো — আর এই মেসেজটা পড়ে সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল।
«এই রাতে, একা ঘরে, ফোনের আলোয়... কী ভাবছেন, মিম?»
সরাসরি প্রশ্ন। ভদ্র ভাষায়, কিন্তু ভেতরে দুষ্টুমি। সিনথিয়া টের পেল তার উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে। লোকটা জানে। লোকটা বোঝে এই রাতের ভাষা।
সে কী লিখবে? «কিছু না» — এই মিথ্যেটা খুব সহজ। কিন্তু মিম কি মিথ্যে বলবে?
ঠিক তখনই প্রিয়ার মেসেজ এলো — «হাই আপু! আমি প্রিয়া। তোমার কমেন্টটা খুব ভালো লাগল।» মিষ্টি, নিরীহ। মিম জবাব দিল — «হাই প্রিয়া! ধন্যবাদ।» প্রিয়া লিখল — «তুমি কি ঢাকায় থাকো?» — «হ্যাঁ, ধানমন্ডিতে। তুমি?» — «আমি উত্তরা।» মেয়েদের সাথে কথা বলা এত সহজ, এত নির্ভার।
আর সাকিব লিখেছে — «হাই মিম। কী করো?» মিম সংক্ষেপে জবাব দিল — «কলেজে পড়ি।» সাকিব — «কোন কলেজ?» মিম সাবধানে লিখল — «নাম বলতে চাই না, প্রাইভেসি।» সাকিব — «ওহ, ঠিক আছে।» ভালো, বুঝদার ছেলে।
তিনটে চ্যাট, তিন রকম মিম। প্রিয়ার কাছে সে বড় আপু — মিষ্টি, সহজ। সাকিবের কাছে সে সাবধানী — মাপা, দূরত্ব রাখা। আর তানভীরের কাছে... তানভীরের কাছে সে অন্য কেউ। এমন কেউ, যাকে সে নিজেও চেনে না এখনো।
সে এক মুহূর্তের জন্য থামল। এইমাত্র যা ঘটল, তা কি স্বাভাবিক? এক ঘণ্টা আগে সে ছিল শুধু সিনথিয়া — একটা ভদ্র, লাজুক মেয়ে। আর এখন সে তিনজন মানুষের সাথে তিন রকম কথা বলছে, তিনটে মুখোশ পরে। তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ভালো লাগছিল। যেন সে এতদিন একটা ছোট ঘরে বন্দি ছিল, আর আজ কেউ দরজা খুলে দিয়েছে।
সে তানভীরের প্রশ্নে ফিরে গেল — «কী ভাবছেন, মিম?»
মিম লিখল — «কিছু না।»
জবাব এলো সাথে সাথে — «মিথ্যে বলছেন।»
সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। «কী করে বুঝলেন?»
«কারণ আমিও কিছু ভাবছি,» তানভীর লিখল। «আর আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজন একই জিনিস ভাবছি।»
ঘরের অন্ধকারটা হঠাৎ আরও গাঢ় মনে হলো। ফোনের আলোটা আরও নীল। সিনথিয়া টের পেল তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছে — সালোয়ারের ওপর দিয়ে, উরুর মাঝখানে। সে চমকে হাতটা সরিয়ে নিল। না। এখন না। এখন সে কথা বলছে।
কিন্তু তানভীর থামল না। «মিম,» সে লিখল, «আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে। অনেকদিন এমন কারও সাথে কথা হয়নি, যে বোঝে।»
«আমিও,» মিম লিখল। আর এটা সত্যি ছিল। এই অচেনা ছেলেটা, এই মাঝরাত, এই গোপন পরিচয় — সব মিলিয়ে তার মনে হচ্ছিল সে ভাসছে।
«কাল আবার কথা হবে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।
«হবে,» মিম লিখল। «আমি এখানেই থাকব।»
«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»
«গুড নাইট।»
সে তানভীরের প্রোফাইলটা আবার খুলল। ছবিটা বড় করে দেখল — কালো পাঞ্জাবি, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। এই মানুষটা আসলে কে? সত্যিই ভালো, নাকি ভালো সাজার ভান? মিমের মন বলল — যাচাই করার সময় আছে। আজ শুধু কথা। কাল... কাল দেখা যাবে।
চ্যাটটা শেষ হলো। কিন্তু সিনথিয়ার ঘুম এলো না। সে ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কানে বাজছে তানভীরের শেষ কথাটা — «স্বপ্নে দেখা হবে।» সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে ভেসে উঠল একটা মুখ — কালো পাঞ্জাবি পরা, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। তানভীর। যাকে সে কখনো দেখেনি, তবু যেন চেনে।
ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল। নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। আরও তিনটে। তারপর আরও দুটো। ইনবক্সে নতুন মেসেজ — «হাই মিম, কথা বলবা?» অচেনা নাম। সিনথিয়া প্রোফাইলটা দেখল — স্বাভাবিক মনে হলো। সে রিকোয়েস্টটা ঝুলিয়ে রাখল। কাল দেখা যাবে।
নোটিফিকেশন থামছিল না। মিম আক্তার — এক ঘণ্টা আগেও যার অস্তিত্ব ছিল না — এখন তার ইনবক্স ভরে উঠছে, তার নামে মানুষ কথা বলতে চাইছে।
সিনথিয়া ফোনটা পাশে রেখে দিল। অন্ধকারে শুয়ে সে ফিসফিস করে বলল —
«মিম।»
নামটা অন্ধকারে ভেসে রইল। তার নিজের কণ্ঠে, তার নিজের ঘরে — একটা নতুন নাম, একটা নতুন মেয়ে। সিনথিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে এই বাসায়। কিন্তু মিম জেগে আছে — ফোনের ভেতর, রাতের ভেতর, তার বুকের ভেতর।
সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে মিমের মুখটা ভেসে উঠল — চাঁদ-আলোর সিলুয়েট, খোলা চুল, অদেখা মুখ। এই মেয়েটা কাল কী করবে? কাদের সাথে কথা বলবে? কতদূর যাবে? সিনথিয়া জানে না। সে শুধু জানে — দরজাটা খুলে গেছে। আর বন্ধ করার ইচ্ছে তার নেই।
(চলবে...)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)