Yesterday, 03:52 PM
১২(ক)—শুধু তুমিই আছো ,হৃদয় মাঝে।
আনুমানিক এক বছর পর.....
প্ল্যাটফর্মের বাইরে থেকে শুনতে পেলাম, ডাউন ফালাকনুমা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে। ঘড়িতে তখন পনেরোটা তিরিশ।
আকাশের দিকে মাথা তুলে দেখলাম, শরৎকালের নীল আকাশটা যেন ধুয়ে-মুছে আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে । নীলের বুকজুড়ে সাদা সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছিল। আকাশে-বাতাসে পুজোর গন্ধের আমেজ।
প্ল্যাটফর্মের বাইরে তখন একঝাঁক তরুণ-তরুণীর দল, সকলে মিলে হাসি-ঠাট্টায় মশগুল। কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে ট্রলি। পুজোর ছুটি। হোস্টেল থেকে তাই বাড়ি ফেরার পালা।
দিল্লি, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, অরুণাচল প্রদেশ বাদ নেই কোনো কিছুই ।
হিমাচল প্রদেশ থেকে তামিলনাড়ু , আসাম থেকে গুজরাট দেশের কোনা কোনা থেকে আসা সব উইডখোরগুলো এক জায়গাতেই জড়ো হয়েছে আরকি ।
কেউ টানছে সুট্টা , কেউ দারুর বোতল নিয়ে আড্ডা জমিয়েছে, আর তার মাঝেই চলছে হাসি-ঠাট্টার ফোয়ারা , চিৎকার-চেঁচামেচি।
ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনেই , আমার তাই আলভিদা জানাতেই হল, হোস্টেলের প্রথম বর্ষের আরও দুজন রুমমেট কে।
একজন যাবে কেরালা। ওর জন্য ডাউন সাঁতরাগাছি-তিরুবনন্তপুরম নর্থ স্পেশাল।
আর আরেকজনের বাড়ি আমাদের রাজ্যেরই লাল মাটির দেশ বাঁকুড়া। ও ধরবে ডাউন হলদিয়া-আসানসোল এক্সপ্রেস।
কাঁধে একটা পিঠ ব্যাগ আর হাতে ল্যাপটবের ব্যাগটা নিয়ে ,হোস্টেলের রুমমেট দের সাথে সুট্টার শেষ টান টেনে আর গলায় দারু ঢেলে ,আমি ছুটলাম ফালাকনুমা সুপারফাস্ট ধরতে,এক্সপ্রেসের গতিতেই ।
পুজোর ছুটি তাই, হোস্টেল নামক পাগলাগারদ ছেড়ে যে যার বাড়ির পথে!
ছুটতে ছুটতে, দৌড়াতে দৌড়াতে, ঝাঁপিয়ে পড়ে, লোকজনের ধাক্কা-ঠেলা-গুঁতো খেতে খেতে একেবারে পিংপং বলের মতো বাউন্স হয়ে ,
প্ল্যাটফর্মে জনঅরণ্যের মাঝে হাঁপাতে-হাঁপাতে ,ঘামতে-ঘামতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সভ্য-ভদ্রলোক জনের সাথেই। অন্তত সেটাই আমার মনে হয়েছিল ।
ট্রেন ঢুকলো প্লাটফর্মে।
প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে সেই সব সভ্য-ভদ্রলোকেরা ট্রান্সফর্ম হয়ে মধ্যযুগীয় বর্বর যাযাবরে পরিণত হয়ে গেলেন,আর আমাকে কোমরের ধাক্কায় তুলে দিলেন ট্রেনের কামরায়।
নে, এবার কাকে কামড়াবি, কামড়া!
পুজোর সময়ের ট্রেন। তিল ধারণের জায়গাটুকুও নেই। নিজেকে আলু, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, টমেটোর বস্তা বললেও সম্মান করা হয়।
কামরায় সাথে ছিল কলেজের আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব , দাদা-দিদিদের চেনা-জানা মুখ।
আর তারই সঙ্গে ছিল সরগম ,বিভিন্ন ভাষার, সুর সংগীতের মেলবন্ধন। মিলে সুর মেরা তুমহারা।
বাদুড় কিংবা বাঁদর ঝোলা হয়ে, এর-ওর ঘাড়ে-মাথায় চেপে ঝিকঝিক করতে করতে হাওড়া স্টেশনে যখন এসে থামলাম, তখন সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে ছয়টা।
হাওড়া স্টেশনে নেমে স্পাইডারম্যানের মতো উড়তে উড়তে, চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে একটা ক্যাব বুক করলাম।
পকেটের মোবাইল টা বেজে উঠল,
— "বুবু ,কদ্দুর রে তুই !"
— " এই তো আসছি ই ই ই ই ই মা ,গঙ্গাটা পেরোনোর পরিকল্পনা চলছে হাঁপাতে হাঁপাতে সাঁতার কেটে !"
— " এই চুপ ! ট্রেন থেকে নেমেছিস তো ঠিক ঠাক !"
— " খালি এক্সট্রা কথা !"
— " খাবার গরম করবো কখন ?"
— "হাওড়া স্টেশন থেকে ক্যাব বুক করেছি মা ,তবে খাবার দাবার গরম করার প্রয়োজন নেই। "
— "ম্যাপে রাস্তার যা সুন্দর পরিস্থিতি দেখছি মা , লাল গাইছে গান ,পথে এবার নামো সাথী ! পথ তো লালে লাল !"
— "বেশি চিন্তা করোনা মা !হামাগুড়ি দিয়েও হোক,লাউ গড়গড় করে গড়াতে গড়াতেই হোক , বাড়ি ঠিক পৌঁছে যাবোই কাল ভোর বেলার দিকে !"
— " কি যে বলে ছেলেটা! কিছুই বুঝি না !"
— " এই তুই চুপ কর তো !"
— " রাখ ফোন !"
— " রুবি ঢুকে জানাবি !"
এসিতে বসে ক্যাবে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হল , শালা ,জীবনে বেঁচে গেলাম এ যাত্রায় । ট্রেনে আরেকটু হলেই প্রাণটাই বেঘোরে চলে যেত।
ফাঁটা বাঁশে বিচি পর্যন্ত আটকে দিয়েছিল ,কি ভয়ংকর পাবলিক রে ভাই !
ক্যাবে বসেও শুনতে পেলাম ওই রাজস্থানি সংগীত রুনা আন্টি লায়লা হয়ে গাইছেন ,
“ও লাল, মেরি পাট রাখিয়ো, বালা ঝুলে লালন।”
তোমার লাল আসছে মা !
চিন্তা নেই !
যাইহোক ,তিন মাস বাদে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া ব্রিজ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো, যাক বাবা, চেনা-পরিচিত জায়গায় ঢুকে পড়েছি। পাবলিকের মারধর খাবার আর চিন্তা নেই।
ক্যাবের জানলাটা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম মায়ের কথা। আর ফেলে আসা বছর খানিক আগের কথাগুলোই।
আসলে মা ছাড়া আমার যেমন অস্তিত্বই থাকত না , ঠিক তেমনি মা ছাড়া আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি, যতটুকুই পৌঁছেছি, সেটাও হতো না।
মা আমার জন্যেই মুম্বাইয়ের সেই ফরেন এমএনসি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। এখন কলকাতাতেই চাকরি করে। তবে সে এমএনসি নয়।
বাবা আমাকে ফোন করে বলেছিল আমেরিকায় যেতে। আমি বাবাকে বলে দিয়েছিলাম, মা আমার সাথেই কলকাতায় থাকবে। অতএব, আমাকে নিয়ে তোমার কোনো চিন্তা করার দরকার নেই।
তুমি তোমার জায়গায়, তোমার মতো ভালো থেকো, সুস্থ থেকো বাবা।
শেষ বছরটি মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতার মধ্যেই কেটেছে আমার।
মা ছাড়া আমি JEE Advanced ক্র্যাক করতে পারতাম না ,সে আমি জানি, আর জানে আমার মা ।
তাই বছর খানিক আগে ,এয়ারপোর্ট থেকে মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর আমি ভেবেছিলাম, বেশ তো হলো, আমার ভালোই মজা হলো,মাকে পেয়ে গেলাম প্রতি রাতের জন্যে।
কিন্তু বাড়ি ফিরে মা আমাকে খুব ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, মায়ের বাড়ি ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।
মা আমাকে সুপথে পরিচালিত করে, কঠোর নিয়মের আবর্তের মধ্যে, সময় বেঁধে পড়াশোনা করিয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাইয়ে দেওয়ার জন্যেই, মায়ের আমার কাছে ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য ছিল।
তাই মা ও দিদুনের কড়া শাসন, শিষ্টাচারেই কেটেছিল আমার শেষ বছরটি।
আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে যাওয়ার পর বাবা খুশি হয়েছিল বটে, তবে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ইভেন্টসে মা পেয়েছিল গোল্ড আর বাবা সিলভার।
তাই ওই ব্যাপারে আমি দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে , বাবা ও মায়ের কাঁধ উঁচু করে,দুজনের একটি করে হাত তুলে ধরে, দুই ভারত-পাকিস্তান নামক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়নদের উৎসাহিত করেছিলাম।
কারণ, আমার এই জন্মের জন্য দুই পরস্পর বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী , প্রতিযোগী হিসেবে বাসরশয্যা নামক রেসলিং কম্পিটিশন এ সমানভাবে লড়াই করেছিলেন ফুলসজ্জা নামক কুস্তির আখড়ায় , ঘাম ও ঝরিয়ে ছিলেন একসাথে, এককালে।
এর বেশি আমি আর কিছুই বলতে পারব না!
মায়ের মুখে শুনেছিলাম, ভাস্কর আঙ্কেল অন্য আরেকজন পাত্রী খুঁজে বিয়ে করেছেন। উনি বর্তমানে সুখে-শান্তিতেই আছেন।
আর আমার মা?
আমার জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। ত্যাগ স্বীকার করেছে।
রাতের পর রাত আমার পাশে বসে, ঢুলতে ঢুলতে রাত জেগে আমি ঠিকমতো পড়ছি কি না, সেটা লক্ষ্য করেছে মা । আমার পড়াশোনার ব্যাপারে ,প্রয়োজনে যথা সামর্থ সাহায্য করেছে।
পরের দিন অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় অফিস গেছে। জোঁকের মতো পড়ে থেকেছে আমার উপর।
‘বুবু, এটা সেন্ড কর, বুবু, ওটা সেন্ড কর।’ অফিসের কাজের ফাঁকে এই সব করেছে মা।
মা যা যা করেছে, সব আমার জন্যেই।
এতে মা কী পেল?
মা ও আমার সম্পর্কের সমীকরণ স্বল্প সময়ের মধ্যেই যে গভীর আবেগ, মায়া, ভালোবাসা , ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড(MnO₂)ক্যাটালিস্টের মতন,
মা ছেলের শারীরিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল, শেষ এক বছরে তার লেশমাত্র ছিল না বললেই চলে ।
তাছাড়া, শেষ বছরটিতে মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতা, আর শিষ্টাচারের ফাঁক-ফোকরেও সে সব প্রবেশ করতে পারেনি মা ও আমার মধ্যে।
আর আমার মনেও মায়ের প্রতি ছিল না কোনো সংশয় আর অশান্তি। কারণ আমি তো বুঝেই গিয়েছিলাম, মা আমার ছিল, আছে আর থাকবেও।
তবে মা আমাকে একটাই কথা দিয়েছিল,'আগে JEE Advanced হবে ক্র্যাক , আর ঠিক সেই বছরই জন্মদিনে তুই আমার কাছে যে গিফট চাইবি, সেটাই পাবি।'
তাই আমার কর্তব্য ছিল ,JEE Advanced নামক হরধনুটিকে ক্র্যাক করে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া।
আমি মায়ের জন্যে সব করতে পারি, মা-ও আমার জন্যে সবকিছুই করতে পারে। হ্যায় ,মা আমার জন্যে সব কিছুই করতে পারে।
এমনকি, মা আমার জন্যে সবকিছুই নির্দ্বিধায় ছেড়েও দিতে জানে।
মা শুধু আমাকে ভালোবাসতেই জানে! নিজের জীবনের থেকেও মা আমাকে বেশি ভালোবাসতে জানে! সে আমি জানি !
তবে মা আমার সাথে প্রেম করতে জানে না!
— "হ্যালো, হ্যালো ,মা, শুনতে পাচ্ছ মামনি !"
— "আমি, রুবি!"
— "তুমি আমার জন্যে মাইক্রোওভেন অন করো!"
— "আমি আসছি মা!"
রাস্তার জ্যামে আটকে বেকার লাগছিল।
মায়ের মুখটা সামনে থেকে তিন মাস বাদে নয়, মনে হচ্ছিল তিন বছর বাদে গিয়ে দেখব।
একবার ভাবছিলাম ,ক্যাব থেকে নেবে , রাস্তার ফুটপাত দিয়ে জগিং করতে করতে বাড়ি চলে যাই।
গাড়িতে বসে ছটফট-ছটফট করছিলাম। কার সঙ্গে ভাট বকব, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
সামনে পেলাম ক্যাবের ড্রাইভার আঙ্কেলকে।
— "আঙ্কেল, এত্ত রাস্তা জ্যাম।"
— "এলাকার সব গাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেছে নাকি!"
— "আচ্ছা আঙ্কেল ,টেসলা ফ্লাইং কারটা কবে কলকাতায় লঞ্চ করছে বলুন তো?"
— "হুম, কো নাহি পাতা, বাবু!"
হামাগুড়ি দিতে দিতে, গড়াতে গড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে এপার্টমেন্টের সামনে এসে পৌঁছুলাম।
লিফটে সুইচ টিপেছি, কী মনে হলো, যাই তো গ্যারাজে আমার প্রিয় সারথিটিকে দেখে আসি ।
দৌড়ালাম গ্যারাজের দিকে। নববধূর মতো ঘোমটা তুলে, মায়ের কিনে দেওয়া হিমালয়ানকে দেখলাম!
ওমা! আমাকে দেখে , একপাশে মুখ ফিরিয়ে লজ্জা পাচ্ছে আমার হিমালয়ান। আমাকে তিনমাস পর দেখছে তো, তাই হবে বোধয়!
তাই আমার রয়্যাল মেমসাহেবের হেডলাইটে টোকা মেরে,ঘোমটা দিয়ে আবারো ঢেকে রাখলাম।
দৌড়ালাম লিফটের দিকেই।
লিফটে চেপে উপরে উঠছি, এক তলা, দু-তলা, আর বুকের ভিতরটা ঢিশ ঢিশ করছে।
ইসসস, মাকে তিন মাস পর হলেও, তিন বছর পর দেখছি তো! তাই মাকে দেখেই অনেক কিছু করতে হবে, সেই কবে থেকে হোস্টেলে প্ল্যান করে রেখেছি।
সব ঠিকঠাক পারবো তো করতে?
তিনতলায় এসেই ‘টিরিং’ করে লিফট থমকে দাঁড়ালো!
লিফটের বাইরে পা রাখলাম!
ওমা, দেখি কি ,নাইটি পরে ঐশ্বর্যা আন্টি তো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আমারই প্রতীক্ষায় !
কিন্তু আমার স্ক্রিপ্টে যে ছিল, আমি টিং টং করে কলিং বেল বাজাবো। মা গেট খুলবে !
সঞ্জয় বনশালি অ্যাকশন বলবে !
ধুস শালা!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলাম।
মায়ের চোখে চোখ রেখে,
— “কেমন আছো, পারো!”
— “না, মানে মা!”
— “কেমন আছো, মা!”
মা আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালো।
আমার জঘন্য এক্সপ্রেশনের জন্যেই বোধহয়!
— “ মা ,পালাট কে দেখো গে নাহি মেরা চেহেরা!"
মায়ের ভুরু আরও কুঁচকে গেল।
মা হয়তো ভাবছিল,
ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠালাম।
তিন মাস পর ,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে ছেলে কি পাগল হয়ে বাড়ি ফিরে এল নাকি?
আর আমি কী করবো, স্ক্রিপ্ট ধরে, শেষ এক মাস আগে থেকেই , হোস্টেলের রুমমেট কেরালা আর বাঁকুড়াকে পালা করে পারো ভেবে রিহার্সেল করেছি। স্ক্রিপ্টে যা থাকবে, তাই তো করবো। নাকি !
মায়ের চোখে চোখ রেখে, পকেট থেকে তিনটে দেশলাই বাক্স বের করলাম।
তার মধ্যে দুটো দেশলাই বাক্স মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে, মাকে বুঝিয়ে দিলাম ওই দুটো দেশলাই বাক্স ফাঁকা। ওতে কোনো দেশলাই কাঠি নেই।
তাই ওই দুটো খালি দেশলাই বাক্স মায়ের হাতে দিয়ে দিলাম।
আর আমার হাতে থাকা তিন নম্বর দেশলাই বাক্সটি মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে দিতেই শব্দ হলো। মাকে বুঝিয়ে দিলাম, এতে দেশলাই কাঠি আছে বটে। কিন্তু কম!
আমি ওই দেশলাই বাক্সটি খুলে মাকে দেখালাম, আর মাত্র তিনটে দেশলাই কাঠি ওতে অবশিষ্ট আছে।
তার মধ্যে একটা দেশলাই কাঠি বক্স থেকে বের করে, দেশলাই বক্সটি বন্ধ করে দিলাম।
আর হাতে থাকা দেশলাইটি ,দেশলাই বাক্সের বারুদের গায়ে ঠুকে, ওই দেশলাই কাঠিটি জ্বালিয়ে মা ও আমার চোখের ঠিক মাঝখানে ধরলাম।
মায়ের চোখের তারায় দেখতে পেলাম, আমার আঙুলে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখার প্রতিফলনটিকেই।
আর আমি মাকে বললাম,
— “আজ অষ্টআশিতম দিন!”
— “মা, আমি তোমাকে চোখের সামনে থেকে ঠিক সাতাশি দিন পর দেখছি!”
আসলে মা যেদিন আমাকে কলেজের হোস্টেলে ভর্তি করে, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, ঠিক সেদিন আমি বাড়ি থেকে মাকে সঙ্গে নিয়ে হোস্টেলে যাবার সময়,
তিনটে দেশলাই বাক্সে, প্রতিটা দেশলাই বাক্সে, গুনে গুনে তিরিশটা দেশলাই কাঠি ভরে, মোট নব্বইটা দেশলাই কাঠি ,হোস্টেলে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম ।
আমি জানতাম পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাব। মায়ের সাথে আমার দেখা হবে।
তাই একটা একটা করে দেশলাই কাঠি প্রতিদিন রাত ঠিক বারোটা বাজার এক মিনিট আগে জ্বালিয়ে দিতাম। ওই জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখাটিকে দেখতে দেখতে আমার মায়ের মুখটা মনে পড়তো।
আর ভাবতাম, আরও একটা দিন কমে এল।
আমি প্রতিদিন কানের সামনে দেশলাই বাক্সটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে ভাবতাম, দেশলাই কাঠিগুলো কবে শেষ হবে আর তারসাথে আমার প্রতীক্ষার পালা।
আমি দেখতে থাকলাম, আমার আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটার শিখা মায়ের চোখের তারার মাঝে টলমল করে জ্বলছে!
আমি মায়ের সামনেই এসে গেছি !
আমি তো মায়ের চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম রোমান্টিক শারুক নজরেই ।
মাও আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল তন্ময় হয়েই।
কিন্তু মা দেখছিল সেই তাঁর বুবু সোনাকে। রোমান্টিক তন্ময়কে, মোটে ভি নয়।
— " ঠোঁট কিন্তু কালো হয়ে যাচ্ছে বুবু !"
— " দিনে কটা করে হয়ে যাচ্ছে ,শুনি !"
ফ্ল্যাটের সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ,দুইহাত মেলে ,আঁকড়ে ধরলাম দরজার দুপাশের ফ্রেমদুটিকে। আর মাকে মৃদু স্বরে বললাম ,
— " আস্তে ,দিদুন ঘরে আছে না !"
— " না ,নেই ! ওই সুতপাদি দের বাড়ি গেছে !"
— " কিন্তু এসে যাবে এক্ষুনি ! তুই আসছিস ,ফোন করে বলে দিয়েছি মাকে! "
মা ,একটু থেমে !
— " ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?"
— "ঢুকবি না ?"
আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম ,
আমি যতই মাকে বিদ্যা বালান আন্টি ভাবি না কেন ,মা আমাকে শারুক ,ফারুক কোনোদিনই ভাবে না !
মায়ের কাছে আমি ওই , বুবু সোনাই থেকে যাব চিরকাল !
আমি মায়ের পিছন পিছন ঘরের বারান্দায় ঢুকলাম। আর মাকে নিজের কাছে ডাকলাম।
তারপর হাটু মুড়ে বসে ,মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে ,নিজের কোলে তুলে নিলাম। আর উঠে দাঁড়িয়ে মাকে কোলে তুলে গোল গোল পাক খেতে থাকলাম।
আর মা তো খিল খিল করে হাসতে হাসতে আমাকে বলতে থাকলো ,
— " বুবু ,দেখ আমি কিন্তু আগের থেকে অনেক ভারী হয়ে গেছি !"
— "আমার মাথা ঘুরছে কিন্তু !"
— " হো ,হো ,হো !"
— "আমাকে নিচে নামা !"
— "প্লিজ ! প্লিজ ! সোনা !"
— " আমার মাথা ঘুরছে !"
— " হি !হি !হি !"
আমি মাকে নিজের কোল থেকে নিচে নামালাম।
আর মা কপালে হাত দিয়ে চক্কর সামলাতে সামলাতে আমাকে বলল ,
— " ইসসসস, আমার ওজন দুই কিলোগ্রাম বেড়ে গেছে ! জানিস তুই !
— " বাষট্টি কেজি!"
আমিও মাকে বললাম ,
— " তুমি দিন দিন প্রস্থে বাড়ছো ,আর আমি উচ্চতায় !"
— " পাঁচ ফুট এগারো !"
— " ইসস মা আর এক ইঞ্চি কি লম্বা হবো না আমি !"
— " ভারী একেবারে লম্বু হয়েছেন ছেলে!"
— " আরেকটু হয়ে যেতে পারিস !"
— " যদি ,ওই সিগেরেট ফোঁকা ছেড়ে ,দুধ খাওয়া ধরিস !"
— " আমি তো সেটাই চাই মা !"
— " ব্যাস ! থাক ! বুঝে গেছি !"
— " তোর পরের সেন্টেন্স টা কি হবে !"
মা আমি দুজনেই হাসতে থাকলাম দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে।
মাতৃদেহের তনুলতাটিকে জড়িয়ে ধরে, তাঁর হিমেল পরশের স্নিগ্ধ অনুভূতিতে, এক যুগ পর যেন ফিরে পেলাম মাতৃঅঙ্গের সেই সুপরিচিত ঘ্রাণটিকেই।
মাতৃক্রোড়ের সুকোমল নিবিড় স্পর্শে আমার তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল হৃদয়ে যেন খুঁজে পেল চিরচেনা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের প্রশান্তির অনুভূতি।
আর আমি ভাবলাম, আমি তো মায়ের সব সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই এসেছি শেষ এক বছর ধরে,
— “বুবু, উঠবি না বই ছেড়ে!”
— “বুবু, টাস্ক কমপ্লিট না করে ঘুমোতে পারবি না কিন্তু!”
— “বুবু, মোবাইলের সব গেম আনইনস্টল কর!”
— “বুবু, আজকে বাইরে আড্ডা দিতে যেতে পারবি না।”
আমি তো মায়ের কথা অমান্য করিনি।
হরধনু তো ভঙ্গ করেই ফেলেছি আমি, আর সেটা তো মায়ের জন্যেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তবুও কি আমি মাকে পাবো না!
মাকে আমি আর কোনোদিন মার্লবোরো খেতে দেখিনি। কারণ আমি মাকে সিগারেট খেতে বারণ করেছিলাম। মা আমার কথা রেখেছিল, বাধ্য মায়ের মতোই।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল, মাকে সেই ভাস্কর আঙ্কেলের দেওয়া মার্লবোরোর প্যাকেট থেকে সিগারেট চুরি করে, ছাদে গিয়ে টানতে টানতে, দায়িত্ব নিয়ে আমিই প্যাকেট খালি করে ফেলেছিলাম।
তবে একদিন মা আমাকে বলেছিল,
— “লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট ফুঁকছিস নিজে, আর লোককে জ্ঞানপাপীর মতো জ্ঞান দিতে যাবার দরকারটা কী!"
আমি মাকে সহাস্যে বলেছিলাম,
— “কারণ তুমি আমার মা। "
— “ওসব চলবে না !তাই!"
মা সিগারেট খাবে, তারপর মদ খাবে ,ঐসব আমার পছন্দ নয়।
— “আমি যা খুশি খেতে পারি। "
— “কারণ আমি তো চ্যাংড়া ছেলে!"
সেদিন মা আমার কান মুলে ধরেছিল। আর বলেছিল ,
— “তোর এই ফালতু লজিক গুলো না , আমি বলেই মাথা নিচু করে , কান পেতে শুনছি ! বুঝতে পেরেছিস তো !"
আর অন্য কোনো মা হলে না , শুনতো না ! বুঝেছিস তো ! তোকে জাস্ট ইগনোর করতো !"
মা রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগলো , আর বলতে বলতে গেল ,
— " আর জলখাবার কি খাবি?তোর জন্যে পাস্তা করেছিলাম !মাইক্রোওভেনে গরম করে রেখেছি।”
— " নাকি একেবারে রাতের ডিনারই খাবি এক্ষুনি ?"
— " না ,না এক্ষুনি কি ডিনার !"
— "পাস্তা দাও ! আমাকে ক্লাবে যেতে হবে !"
— "বনি,আদভিক ,আমির আমার জন্যে ক্লাবে অপেক্ষা করছে সেই কখন থেকে !"
আমি মায়ের পিছন পিছন রান্নাঘরে গিয়ে ওভেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আর এক এক করে খাবারের সসপ্যানের ঢাকনা খুলে দেখতে থাকলাম আমার জন্যে রাতের ডিনারে কী আয়োজন।
দেখলাম একটায় চিলি চিকেন। আরেকটি পালং পনির।
ওটা অবশ্য ঘাস-পাতা প্রেমী দিদুনের জন্যেই ছিল।
আমি সসপ্যানের ঢাকনা খুলে এক পিস চিলি চিকেন মুখে ঢোকাতে যাব,
মা চিৎকার করতে শুরু করল,
— "কোথায় বাইরে থেকে এসেছিস। হাত-মুখ ধোয়া নেই, কিছু নেই, রাখ মাংসটা, ফেলে দে ওটা!"
আমি মুখে পুরে নিলাম মাংসের পিস।
— "ইসস, কী জন্মের নোংরা! ছি!"
মা আমাকে বকাঝকা করছিল। ওটা অবশ্য কমন ব্যাপার!
টিং টং করে বেল বেজে উঠল। আমি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
— "আরে, কখন থেকে বলছি জানিস, সুতপা আর শেফালীকে, আমার নাতি আসবে এক্ষুনি, আমি যাই, আমি যাই, আর আমাকে ছাড়ছেই না!"
আমি দিদুনকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম!
তারপর দিদুনের পা জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম, শুনলাম মায়ের চিৎকার,
— "এই না, বুবু, একদম না।"
— "মায়ের সাথে ওটা তুই করিস না! মায়ের কিন্তু মাথা ঘুরে যাবে!"
— "খবরদার বলছি কিন্তু!"
মায়ের চিৎকারে ভয় পেয়েই গেছিলাম। শেষমেশ দিদুনকে প্রণাম করেই নিস্তার দিয়ে দিলাম।
আমি হাত মুখ ধুয়ে হাপুস হুপুস করে পাস্তা খাচ্ছিলাম। কোপ কোপ করেই। ক্লাবে যেতে হবে।
মা টেবিলের সামনে আমার খাওয়া দেখছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
— " এ আবার কেমন খাওয়া হচ্ছে শুনি ,বুবু !"
আমি মাথা তুললাম না। এমনিতেই হোস্টেলের যা খাবার দাবার,তাতে মুখে চরা পড়ে গেছিল। মায়ের হাতের খাবার জিভ ছুঁতেই , সেটার রেটিং লেভেল এমনিতেই টেন ষ্টার!
মা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে আমার মুখের সামনের দিকে বসলো।
আর চিবুকে হাত দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
আমি খেতে খেতে থমকে গেলাম।
ভাবলাম ,যাক মাও তাহলে আমাকে দেখছে।
জয় লাল বাবার জয়। মাকে তাহলে পটিয়ে ফেলেছি।
— " আমার ছেলে কি কম যায় ? আই আই টি !"
— " আমি অপর্ণাকে বলেছি , আমার ছেলের পাশে টিনাকে মানাবে বেশ !"
আমি থ মেরে কিছুক্ষন ভাবলাম !
আর মনে মনে বললাম , লাল বাবা কে ভরসা করাই...না থাক !
— "আচ্ছা মা ,বাড়িতে ভালো কোয়ালিটির ইঁদুর মারার বিষ আছে? "
— " দু চার প্যাকেট দাও তো !"
— "জলে গুলে ঢোক গিলে খেয়ে ফেলি !"
— "তারপর পুজোটা নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে ,মোবাইলে গেম খেলে পের করে দেব !"
— "ভালো হবে কি সেটা ?"
আমার প্রিয় সারথিটি কে গ্যারেজ থেকে বের করে ক্লাবে গেলাম।
ক্লাবে দৌড়ে ঢুকেই চিৎকার করে ,
— " ওই বাইনচোদ গুলো ,চলে এসেছি রে আমি ! কোথায় রে তোরা !"
সাথে সাথে দৌড়ে এল আদভিক ,আমির আর বনি !
যেদিন ওদের ছেড়ে হোস্টেলে গিয়েছিলাম ,ওদের জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম।
একটা বিষয় ,ওই দিন বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে ধরে উপলব্দি করেছিলাম ,
ছোটবেলার বন্ধুদের ওই প্রাণ খুলে বাইনচোদ বলে খিস্তি দিয়ে যে শান্তিটা পাওয়া যায় মনে ,সেই তৃপ্তিটা বোধয় আর কোনো বন্ধুদের সাথেই পাওয়া যায় না!
বন্ধুদের জন্যে কিছু চকলেট টফি নিয়ে এসেছিলাম।
সেদিন অনেক রাত হয়ে গেছিল ।
তাই ওদের সাথে কিছুক্ষণ ইয়ার্কি-ফাজলামি মেরে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
আনুমানিক এক বছর পর.....
প্ল্যাটফর্মের বাইরে থেকে শুনতে পেলাম, ডাউন ফালাকনুমা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে। ঘড়িতে তখন পনেরোটা তিরিশ।
আকাশের দিকে মাথা তুলে দেখলাম, শরৎকালের নীল আকাশটা যেন ধুয়ে-মুছে আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে । নীলের বুকজুড়ে সাদা সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছিল। আকাশে-বাতাসে পুজোর গন্ধের আমেজ।
প্ল্যাটফর্মের বাইরে তখন একঝাঁক তরুণ-তরুণীর দল, সকলে মিলে হাসি-ঠাট্টায় মশগুল। কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে ট্রলি। পুজোর ছুটি। হোস্টেল থেকে তাই বাড়ি ফেরার পালা।
দিল্লি, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, অরুণাচল প্রদেশ বাদ নেই কোনো কিছুই ।
হিমাচল প্রদেশ থেকে তামিলনাড়ু , আসাম থেকে গুজরাট দেশের কোনা কোনা থেকে আসা সব উইডখোরগুলো এক জায়গাতেই জড়ো হয়েছে আরকি ।
কেউ টানছে সুট্টা , কেউ দারুর বোতল নিয়ে আড্ডা জমিয়েছে, আর তার মাঝেই চলছে হাসি-ঠাট্টার ফোয়ারা , চিৎকার-চেঁচামেচি।
ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনেই , আমার তাই আলভিদা জানাতেই হল, হোস্টেলের প্রথম বর্ষের আরও দুজন রুমমেট কে।
একজন যাবে কেরালা। ওর জন্য ডাউন সাঁতরাগাছি-তিরুবনন্তপুরম নর্থ স্পেশাল।
আর আরেকজনের বাড়ি আমাদের রাজ্যেরই লাল মাটির দেশ বাঁকুড়া। ও ধরবে ডাউন হলদিয়া-আসানসোল এক্সপ্রেস।
কাঁধে একটা পিঠ ব্যাগ আর হাতে ল্যাপটবের ব্যাগটা নিয়ে ,হোস্টেলের রুমমেট দের সাথে সুট্টার শেষ টান টেনে আর গলায় দারু ঢেলে ,আমি ছুটলাম ফালাকনুমা সুপারফাস্ট ধরতে,এক্সপ্রেসের গতিতেই ।
পুজোর ছুটি তাই, হোস্টেল নামক পাগলাগারদ ছেড়ে যে যার বাড়ির পথে!
ছুটতে ছুটতে, দৌড়াতে দৌড়াতে, ঝাঁপিয়ে পড়ে, লোকজনের ধাক্কা-ঠেলা-গুঁতো খেতে খেতে একেবারে পিংপং বলের মতো বাউন্স হয়ে ,
প্ল্যাটফর্মে জনঅরণ্যের মাঝে হাঁপাতে-হাঁপাতে ,ঘামতে-ঘামতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সভ্য-ভদ্রলোক জনের সাথেই। অন্তত সেটাই আমার মনে হয়েছিল ।
ট্রেন ঢুকলো প্লাটফর্মে।
প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে সেই সব সভ্য-ভদ্রলোকেরা ট্রান্সফর্ম হয়ে মধ্যযুগীয় বর্বর যাযাবরে পরিণত হয়ে গেলেন,আর আমাকে কোমরের ধাক্কায় তুলে দিলেন ট্রেনের কামরায়।
নে, এবার কাকে কামড়াবি, কামড়া!
পুজোর সময়ের ট্রেন। তিল ধারণের জায়গাটুকুও নেই। নিজেকে আলু, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, টমেটোর বস্তা বললেও সম্মান করা হয়।
কামরায় সাথে ছিল কলেজের আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব , দাদা-দিদিদের চেনা-জানা মুখ।
আর তারই সঙ্গে ছিল সরগম ,বিভিন্ন ভাষার, সুর সংগীতের মেলবন্ধন। মিলে সুর মেরা তুমহারা।
বাদুড় কিংবা বাঁদর ঝোলা হয়ে, এর-ওর ঘাড়ে-মাথায় চেপে ঝিকঝিক করতে করতে হাওড়া স্টেশনে যখন এসে থামলাম, তখন সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে ছয়টা।
হাওড়া স্টেশনে নেমে স্পাইডারম্যানের মতো উড়তে উড়তে, চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে একটা ক্যাব বুক করলাম।
পকেটের মোবাইল টা বেজে উঠল,
— "বুবু ,কদ্দুর রে তুই !"
— " এই তো আসছি ই ই ই ই ই মা ,গঙ্গাটা পেরোনোর পরিকল্পনা চলছে হাঁপাতে হাঁপাতে সাঁতার কেটে !"
— " এই চুপ ! ট্রেন থেকে নেমেছিস তো ঠিক ঠাক !"
— " খালি এক্সট্রা কথা !"
— " খাবার গরম করবো কখন ?"
— "হাওড়া স্টেশন থেকে ক্যাব বুক করেছি মা ,তবে খাবার দাবার গরম করার প্রয়োজন নেই। "
— "ম্যাপে রাস্তার যা সুন্দর পরিস্থিতি দেখছি মা , লাল গাইছে গান ,পথে এবার নামো সাথী ! পথ তো লালে লাল !"
— "বেশি চিন্তা করোনা মা !হামাগুড়ি দিয়েও হোক,লাউ গড়গড় করে গড়াতে গড়াতেই হোক , বাড়ি ঠিক পৌঁছে যাবোই কাল ভোর বেলার দিকে !"
— " কি যে বলে ছেলেটা! কিছুই বুঝি না !"
— " এই তুই চুপ কর তো !"
— " রাখ ফোন !"
— " রুবি ঢুকে জানাবি !"
এসিতে বসে ক্যাবে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হল , শালা ,জীবনে বেঁচে গেলাম এ যাত্রায় । ট্রেনে আরেকটু হলেই প্রাণটাই বেঘোরে চলে যেত।
ফাঁটা বাঁশে বিচি পর্যন্ত আটকে দিয়েছিল ,কি ভয়ংকর পাবলিক রে ভাই !
ক্যাবে বসেও শুনতে পেলাম ওই রাজস্থানি সংগীত রুনা আন্টি লায়লা হয়ে গাইছেন ,
“ও লাল, মেরি পাট রাখিয়ো, বালা ঝুলে লালন।”
তোমার লাল আসছে মা !
চিন্তা নেই !
যাইহোক ,তিন মাস বাদে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া ব্রিজ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো, যাক বাবা, চেনা-পরিচিত জায়গায় ঢুকে পড়েছি। পাবলিকের মারধর খাবার আর চিন্তা নেই।
ক্যাবের জানলাটা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম মায়ের কথা। আর ফেলে আসা বছর খানিক আগের কথাগুলোই।
আসলে মা ছাড়া আমার যেমন অস্তিত্বই থাকত না , ঠিক তেমনি মা ছাড়া আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি, যতটুকুই পৌঁছেছি, সেটাও হতো না।
মা আমার জন্যেই মুম্বাইয়ের সেই ফরেন এমএনসি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। এখন কলকাতাতেই চাকরি করে। তবে সে এমএনসি নয়।
বাবা আমাকে ফোন করে বলেছিল আমেরিকায় যেতে। আমি বাবাকে বলে দিয়েছিলাম, মা আমার সাথেই কলকাতায় থাকবে। অতএব, আমাকে নিয়ে তোমার কোনো চিন্তা করার দরকার নেই।
তুমি তোমার জায়গায়, তোমার মতো ভালো থেকো, সুস্থ থেকো বাবা।
শেষ বছরটি মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতার মধ্যেই কেটেছে আমার।
মা ছাড়া আমি JEE Advanced ক্র্যাক করতে পারতাম না ,সে আমি জানি, আর জানে আমার মা ।
তাই বছর খানিক আগে ,এয়ারপোর্ট থেকে মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর আমি ভেবেছিলাম, বেশ তো হলো, আমার ভালোই মজা হলো,মাকে পেয়ে গেলাম প্রতি রাতের জন্যে।
কিন্তু বাড়ি ফিরে মা আমাকে খুব ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, মায়ের বাড়ি ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।
মা আমাকে সুপথে পরিচালিত করে, কঠোর নিয়মের আবর্তের মধ্যে, সময় বেঁধে পড়াশোনা করিয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাইয়ে দেওয়ার জন্যেই, মায়ের আমার কাছে ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য ছিল।
তাই মা ও দিদুনের কড়া শাসন, শিষ্টাচারেই কেটেছিল আমার শেষ বছরটি।
আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে যাওয়ার পর বাবা খুশি হয়েছিল বটে, তবে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ইভেন্টসে মা পেয়েছিল গোল্ড আর বাবা সিলভার।
তাই ওই ব্যাপারে আমি দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে , বাবা ও মায়ের কাঁধ উঁচু করে,দুজনের একটি করে হাত তুলে ধরে, দুই ভারত-পাকিস্তান নামক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়নদের উৎসাহিত করেছিলাম।
কারণ, আমার এই জন্মের জন্য দুই পরস্পর বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী , প্রতিযোগী হিসেবে বাসরশয্যা নামক রেসলিং কম্পিটিশন এ সমানভাবে লড়াই করেছিলেন ফুলসজ্জা নামক কুস্তির আখড়ায় , ঘাম ও ঝরিয়ে ছিলেন একসাথে, এককালে।
এর বেশি আমি আর কিছুই বলতে পারব না!
মায়ের মুখে শুনেছিলাম, ভাস্কর আঙ্কেল অন্য আরেকজন পাত্রী খুঁজে বিয়ে করেছেন। উনি বর্তমানে সুখে-শান্তিতেই আছেন।
আর আমার মা?
আমার জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। ত্যাগ স্বীকার করেছে।
রাতের পর রাত আমার পাশে বসে, ঢুলতে ঢুলতে রাত জেগে আমি ঠিকমতো পড়ছি কি না, সেটা লক্ষ্য করেছে মা । আমার পড়াশোনার ব্যাপারে ,প্রয়োজনে যথা সামর্থ সাহায্য করেছে।
পরের দিন অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় অফিস গেছে। জোঁকের মতো পড়ে থেকেছে আমার উপর।
‘বুবু, এটা সেন্ড কর, বুবু, ওটা সেন্ড কর।’ অফিসের কাজের ফাঁকে এই সব করেছে মা।
মা যা যা করেছে, সব আমার জন্যেই।
এতে মা কী পেল?
মা ও আমার সম্পর্কের সমীকরণ স্বল্প সময়ের মধ্যেই যে গভীর আবেগ, মায়া, ভালোবাসা , ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড(MnO₂)ক্যাটালিস্টের মতন,
মা ছেলের শারীরিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল, শেষ এক বছরে তার লেশমাত্র ছিল না বললেই চলে ।
তাছাড়া, শেষ বছরটিতে মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতা, আর শিষ্টাচারের ফাঁক-ফোকরেও সে সব প্রবেশ করতে পারেনি মা ও আমার মধ্যে।
আর আমার মনেও মায়ের প্রতি ছিল না কোনো সংশয় আর অশান্তি। কারণ আমি তো বুঝেই গিয়েছিলাম, মা আমার ছিল, আছে আর থাকবেও।
তবে মা আমাকে একটাই কথা দিয়েছিল,'আগে JEE Advanced হবে ক্র্যাক , আর ঠিক সেই বছরই জন্মদিনে তুই আমার কাছে যে গিফট চাইবি, সেটাই পাবি।'
তাই আমার কর্তব্য ছিল ,JEE Advanced নামক হরধনুটিকে ক্র্যাক করে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া।
আমি মায়ের জন্যে সব করতে পারি, মা-ও আমার জন্যে সবকিছুই করতে পারে। হ্যায় ,মা আমার জন্যে সব কিছুই করতে পারে।
এমনকি, মা আমার জন্যে সবকিছুই নির্দ্বিধায় ছেড়েও দিতে জানে।
মা শুধু আমাকে ভালোবাসতেই জানে! নিজের জীবনের থেকেও মা আমাকে বেশি ভালোবাসতে জানে! সে আমি জানি !
তবে মা আমার সাথে প্রেম করতে জানে না!
— "হ্যালো, হ্যালো ,মা, শুনতে পাচ্ছ মামনি !"
— "আমি, রুবি!"
— "তুমি আমার জন্যে মাইক্রোওভেন অন করো!"
— "আমি আসছি মা!"
রাস্তার জ্যামে আটকে বেকার লাগছিল।
মায়ের মুখটা সামনে থেকে তিন মাস বাদে নয়, মনে হচ্ছিল তিন বছর বাদে গিয়ে দেখব।
একবার ভাবছিলাম ,ক্যাব থেকে নেবে , রাস্তার ফুটপাত দিয়ে জগিং করতে করতে বাড়ি চলে যাই।
গাড়িতে বসে ছটফট-ছটফট করছিলাম। কার সঙ্গে ভাট বকব, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
সামনে পেলাম ক্যাবের ড্রাইভার আঙ্কেলকে।
— "আঙ্কেল, এত্ত রাস্তা জ্যাম।"
— "এলাকার সব গাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেছে নাকি!"
— "আচ্ছা আঙ্কেল ,টেসলা ফ্লাইং কারটা কবে কলকাতায় লঞ্চ করছে বলুন তো?"
— "হুম, কো নাহি পাতা, বাবু!"
হামাগুড়ি দিতে দিতে, গড়াতে গড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে এপার্টমেন্টের সামনে এসে পৌঁছুলাম।
লিফটে সুইচ টিপেছি, কী মনে হলো, যাই তো গ্যারাজে আমার প্রিয় সারথিটিকে দেখে আসি ।
দৌড়ালাম গ্যারাজের দিকে। নববধূর মতো ঘোমটা তুলে, মায়ের কিনে দেওয়া হিমালয়ানকে দেখলাম!
ওমা! আমাকে দেখে , একপাশে মুখ ফিরিয়ে লজ্জা পাচ্ছে আমার হিমালয়ান। আমাকে তিনমাস পর দেখছে তো, তাই হবে বোধয়!
তাই আমার রয়্যাল মেমসাহেবের হেডলাইটে টোকা মেরে,ঘোমটা দিয়ে আবারো ঢেকে রাখলাম।
দৌড়ালাম লিফটের দিকেই।
লিফটে চেপে উপরে উঠছি, এক তলা, দু-তলা, আর বুকের ভিতরটা ঢিশ ঢিশ করছে।
ইসসস, মাকে তিন মাস পর হলেও, তিন বছর পর দেখছি তো! তাই মাকে দেখেই অনেক কিছু করতে হবে, সেই কবে থেকে হোস্টেলে প্ল্যান করে রেখেছি।
সব ঠিকঠাক পারবো তো করতে?
তিনতলায় এসেই ‘টিরিং’ করে লিফট থমকে দাঁড়ালো!
লিফটের বাইরে পা রাখলাম!
ওমা, দেখি কি ,নাইটি পরে ঐশ্বর্যা আন্টি তো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আমারই প্রতীক্ষায় !
কিন্তু আমার স্ক্রিপ্টে যে ছিল, আমি টিং টং করে কলিং বেল বাজাবো। মা গেট খুলবে !
সঞ্জয় বনশালি অ্যাকশন বলবে !
ধুস শালা!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলাম।
মায়ের চোখে চোখ রেখে,
— “কেমন আছো, পারো!”
— “না, মানে মা!”
— “কেমন আছো, মা!”
মা আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালো।
আমার জঘন্য এক্সপ্রেশনের জন্যেই বোধহয়!
— “ মা ,পালাট কে দেখো গে নাহি মেরা চেহেরা!"
মায়ের ভুরু আরও কুঁচকে গেল।
মা হয়তো ভাবছিল,
ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠালাম।
তিন মাস পর ,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে ছেলে কি পাগল হয়ে বাড়ি ফিরে এল নাকি?
আর আমি কী করবো, স্ক্রিপ্ট ধরে, শেষ এক মাস আগে থেকেই , হোস্টেলের রুমমেট কেরালা আর বাঁকুড়াকে পালা করে পারো ভেবে রিহার্সেল করেছি। স্ক্রিপ্টে যা থাকবে, তাই তো করবো। নাকি !
মায়ের চোখে চোখ রেখে, পকেট থেকে তিনটে দেশলাই বাক্স বের করলাম।
তার মধ্যে দুটো দেশলাই বাক্স মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে, মাকে বুঝিয়ে দিলাম ওই দুটো দেশলাই বাক্স ফাঁকা। ওতে কোনো দেশলাই কাঠি নেই।
তাই ওই দুটো খালি দেশলাই বাক্স মায়ের হাতে দিয়ে দিলাম।
আর আমার হাতে থাকা তিন নম্বর দেশলাই বাক্সটি মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে দিতেই শব্দ হলো। মাকে বুঝিয়ে দিলাম, এতে দেশলাই কাঠি আছে বটে। কিন্তু কম!
আমি ওই দেশলাই বাক্সটি খুলে মাকে দেখালাম, আর মাত্র তিনটে দেশলাই কাঠি ওতে অবশিষ্ট আছে।
তার মধ্যে একটা দেশলাই কাঠি বক্স থেকে বের করে, দেশলাই বক্সটি বন্ধ করে দিলাম।
আর হাতে থাকা দেশলাইটি ,দেশলাই বাক্সের বারুদের গায়ে ঠুকে, ওই দেশলাই কাঠিটি জ্বালিয়ে মা ও আমার চোখের ঠিক মাঝখানে ধরলাম।
মায়ের চোখের তারায় দেখতে পেলাম, আমার আঙুলে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখার প্রতিফলনটিকেই।
আর আমি মাকে বললাম,
— “আজ অষ্টআশিতম দিন!”
— “মা, আমি তোমাকে চোখের সামনে থেকে ঠিক সাতাশি দিন পর দেখছি!”
আসলে মা যেদিন আমাকে কলেজের হোস্টেলে ভর্তি করে, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, ঠিক সেদিন আমি বাড়ি থেকে মাকে সঙ্গে নিয়ে হোস্টেলে যাবার সময়,
তিনটে দেশলাই বাক্সে, প্রতিটা দেশলাই বাক্সে, গুনে গুনে তিরিশটা দেশলাই কাঠি ভরে, মোট নব্বইটা দেশলাই কাঠি ,হোস্টেলে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম ।
আমি জানতাম পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাব। মায়ের সাথে আমার দেখা হবে।
তাই একটা একটা করে দেশলাই কাঠি প্রতিদিন রাত ঠিক বারোটা বাজার এক মিনিট আগে জ্বালিয়ে দিতাম। ওই জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখাটিকে দেখতে দেখতে আমার মায়ের মুখটা মনে পড়তো।
আর ভাবতাম, আরও একটা দিন কমে এল।
আমি প্রতিদিন কানের সামনে দেশলাই বাক্সটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে ভাবতাম, দেশলাই কাঠিগুলো কবে শেষ হবে আর তারসাথে আমার প্রতীক্ষার পালা।
আমি দেখতে থাকলাম, আমার আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটার শিখা মায়ের চোখের তারার মাঝে টলমল করে জ্বলছে!
আমি মায়ের সামনেই এসে গেছি !
আমি তো মায়ের চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম রোমান্টিক শারুক নজরেই ।
মাও আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল তন্ময় হয়েই।
কিন্তু মা দেখছিল সেই তাঁর বুবু সোনাকে। রোমান্টিক তন্ময়কে, মোটে ভি নয়।
— " ঠোঁট কিন্তু কালো হয়ে যাচ্ছে বুবু !"
— " দিনে কটা করে হয়ে যাচ্ছে ,শুনি !"
ফ্ল্যাটের সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ,দুইহাত মেলে ,আঁকড়ে ধরলাম দরজার দুপাশের ফ্রেমদুটিকে। আর মাকে মৃদু স্বরে বললাম ,
— " আস্তে ,দিদুন ঘরে আছে না !"
— " না ,নেই ! ওই সুতপাদি দের বাড়ি গেছে !"
— " কিন্তু এসে যাবে এক্ষুনি ! তুই আসছিস ,ফোন করে বলে দিয়েছি মাকে! "
মা ,একটু থেমে !
— " ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?"
— "ঢুকবি না ?"
আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম ,
আমি যতই মাকে বিদ্যা বালান আন্টি ভাবি না কেন ,মা আমাকে শারুক ,ফারুক কোনোদিনই ভাবে না !
মায়ের কাছে আমি ওই , বুবু সোনাই থেকে যাব চিরকাল !
আমি মায়ের পিছন পিছন ঘরের বারান্দায় ঢুকলাম। আর মাকে নিজের কাছে ডাকলাম।
তারপর হাটু মুড়ে বসে ,মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে ,নিজের কোলে তুলে নিলাম। আর উঠে দাঁড়িয়ে মাকে কোলে তুলে গোল গোল পাক খেতে থাকলাম।
আর মা তো খিল খিল করে হাসতে হাসতে আমাকে বলতে থাকলো ,
— " বুবু ,দেখ আমি কিন্তু আগের থেকে অনেক ভারী হয়ে গেছি !"
— "আমার মাথা ঘুরছে কিন্তু !"
— " হো ,হো ,হো !"
— "আমাকে নিচে নামা !"
— "প্লিজ ! প্লিজ ! সোনা !"
— " আমার মাথা ঘুরছে !"
— " হি !হি !হি !"
আমি মাকে নিজের কোল থেকে নিচে নামালাম।
আর মা কপালে হাত দিয়ে চক্কর সামলাতে সামলাতে আমাকে বলল ,
— " ইসসসস, আমার ওজন দুই কিলোগ্রাম বেড়ে গেছে ! জানিস তুই !
— " বাষট্টি কেজি!"
আমিও মাকে বললাম ,
— " তুমি দিন দিন প্রস্থে বাড়ছো ,আর আমি উচ্চতায় !"
— " পাঁচ ফুট এগারো !"
— " ইসস মা আর এক ইঞ্চি কি লম্বা হবো না আমি !"
— " ভারী একেবারে লম্বু হয়েছেন ছেলে!"
— " আরেকটু হয়ে যেতে পারিস !"
— " যদি ,ওই সিগেরেট ফোঁকা ছেড়ে ,দুধ খাওয়া ধরিস !"
— " আমি তো সেটাই চাই মা !"
— " ব্যাস ! থাক ! বুঝে গেছি !"
— " তোর পরের সেন্টেন্স টা কি হবে !"
মা আমি দুজনেই হাসতে থাকলাম দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে।
মাতৃদেহের তনুলতাটিকে জড়িয়ে ধরে, তাঁর হিমেল পরশের স্নিগ্ধ অনুভূতিতে, এক যুগ পর যেন ফিরে পেলাম মাতৃঅঙ্গের সেই সুপরিচিত ঘ্রাণটিকেই।
মাতৃক্রোড়ের সুকোমল নিবিড় স্পর্শে আমার তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল হৃদয়ে যেন খুঁজে পেল চিরচেনা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের প্রশান্তির অনুভূতি।
আর আমি ভাবলাম, আমি তো মায়ের সব সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই এসেছি শেষ এক বছর ধরে,
— “বুবু, উঠবি না বই ছেড়ে!”
— “বুবু, টাস্ক কমপ্লিট না করে ঘুমোতে পারবি না কিন্তু!”
— “বুবু, মোবাইলের সব গেম আনইনস্টল কর!”
— “বুবু, আজকে বাইরে আড্ডা দিতে যেতে পারবি না।”
আমি তো মায়ের কথা অমান্য করিনি।
হরধনু তো ভঙ্গ করেই ফেলেছি আমি, আর সেটা তো মায়ের জন্যেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তবুও কি আমি মাকে পাবো না!
মাকে আমি আর কোনোদিন মার্লবোরো খেতে দেখিনি। কারণ আমি মাকে সিগারেট খেতে বারণ করেছিলাম। মা আমার কথা রেখেছিল, বাধ্য মায়ের মতোই।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল, মাকে সেই ভাস্কর আঙ্কেলের দেওয়া মার্লবোরোর প্যাকেট থেকে সিগারেট চুরি করে, ছাদে গিয়ে টানতে টানতে, দায়িত্ব নিয়ে আমিই প্যাকেট খালি করে ফেলেছিলাম।
তবে একদিন মা আমাকে বলেছিল,
— “লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট ফুঁকছিস নিজে, আর লোককে জ্ঞানপাপীর মতো জ্ঞান দিতে যাবার দরকারটা কী!"
আমি মাকে সহাস্যে বলেছিলাম,
— “কারণ তুমি আমার মা। "
— “ওসব চলবে না !তাই!"
মা সিগারেট খাবে, তারপর মদ খাবে ,ঐসব আমার পছন্দ নয়।
— “আমি যা খুশি খেতে পারি। "
— “কারণ আমি তো চ্যাংড়া ছেলে!"
সেদিন মা আমার কান মুলে ধরেছিল। আর বলেছিল ,
— “তোর এই ফালতু লজিক গুলো না , আমি বলেই মাথা নিচু করে , কান পেতে শুনছি ! বুঝতে পেরেছিস তো !"
আর অন্য কোনো মা হলে না , শুনতো না ! বুঝেছিস তো ! তোকে জাস্ট ইগনোর করতো !"
মা রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগলো , আর বলতে বলতে গেল ,
— " আর জলখাবার কি খাবি?তোর জন্যে পাস্তা করেছিলাম !মাইক্রোওভেনে গরম করে রেখেছি।”
— " নাকি একেবারে রাতের ডিনারই খাবি এক্ষুনি ?"
— " না ,না এক্ষুনি কি ডিনার !"
— "পাস্তা দাও ! আমাকে ক্লাবে যেতে হবে !"
— "বনি,আদভিক ,আমির আমার জন্যে ক্লাবে অপেক্ষা করছে সেই কখন থেকে !"
আমি মায়ের পিছন পিছন রান্নাঘরে গিয়ে ওভেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আর এক এক করে খাবারের সসপ্যানের ঢাকনা খুলে দেখতে থাকলাম আমার জন্যে রাতের ডিনারে কী আয়োজন।
দেখলাম একটায় চিলি চিকেন। আরেকটি পালং পনির।
ওটা অবশ্য ঘাস-পাতা প্রেমী দিদুনের জন্যেই ছিল।
আমি সসপ্যানের ঢাকনা খুলে এক পিস চিলি চিকেন মুখে ঢোকাতে যাব,
মা চিৎকার করতে শুরু করল,
— "কোথায় বাইরে থেকে এসেছিস। হাত-মুখ ধোয়া নেই, কিছু নেই, রাখ মাংসটা, ফেলে দে ওটা!"
আমি মুখে পুরে নিলাম মাংসের পিস।
— "ইসস, কী জন্মের নোংরা! ছি!"
মা আমাকে বকাঝকা করছিল। ওটা অবশ্য কমন ব্যাপার!
টিং টং করে বেল বেজে উঠল। আমি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
— "আরে, কখন থেকে বলছি জানিস, সুতপা আর শেফালীকে, আমার নাতি আসবে এক্ষুনি, আমি যাই, আমি যাই, আর আমাকে ছাড়ছেই না!"
আমি দিদুনকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম!
তারপর দিদুনের পা জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম, শুনলাম মায়ের চিৎকার,
— "এই না, বুবু, একদম না।"
— "মায়ের সাথে ওটা তুই করিস না! মায়ের কিন্তু মাথা ঘুরে যাবে!"
— "খবরদার বলছি কিন্তু!"
মায়ের চিৎকারে ভয় পেয়েই গেছিলাম। শেষমেশ দিদুনকে প্রণাম করেই নিস্তার দিয়ে দিলাম।
আমি হাত মুখ ধুয়ে হাপুস হুপুস করে পাস্তা খাচ্ছিলাম। কোপ কোপ করেই। ক্লাবে যেতে হবে।
মা টেবিলের সামনে আমার খাওয়া দেখছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
— " এ আবার কেমন খাওয়া হচ্ছে শুনি ,বুবু !"
আমি মাথা তুললাম না। এমনিতেই হোস্টেলের যা খাবার দাবার,তাতে মুখে চরা পড়ে গেছিল। মায়ের হাতের খাবার জিভ ছুঁতেই , সেটার রেটিং লেভেল এমনিতেই টেন ষ্টার!
মা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে আমার মুখের সামনের দিকে বসলো।
আর চিবুকে হাত দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
আমি খেতে খেতে থমকে গেলাম।
ভাবলাম ,যাক মাও তাহলে আমাকে দেখছে।
জয় লাল বাবার জয়। মাকে তাহলে পটিয়ে ফেলেছি।
— " আমার ছেলে কি কম যায় ? আই আই টি !"
— " আমি অপর্ণাকে বলেছি , আমার ছেলের পাশে টিনাকে মানাবে বেশ !"
আমি থ মেরে কিছুক্ষন ভাবলাম !
আর মনে মনে বললাম , লাল বাবা কে ভরসা করাই...না থাক !
— "আচ্ছা মা ,বাড়িতে ভালো কোয়ালিটির ইঁদুর মারার বিষ আছে? "
— " দু চার প্যাকেট দাও তো !"
— "জলে গুলে ঢোক গিলে খেয়ে ফেলি !"
— "তারপর পুজোটা নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে ,মোবাইলে গেম খেলে পের করে দেব !"
— "ভালো হবে কি সেটা ?"
আমার প্রিয় সারথিটি কে গ্যারেজ থেকে বের করে ক্লাবে গেলাম।
ক্লাবে দৌড়ে ঢুকেই চিৎকার করে ,
— " ওই বাইনচোদ গুলো ,চলে এসেছি রে আমি ! কোথায় রে তোরা !"
সাথে সাথে দৌড়ে এল আদভিক ,আমির আর বনি !
যেদিন ওদের ছেড়ে হোস্টেলে গিয়েছিলাম ,ওদের জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম।
একটা বিষয় ,ওই দিন বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে ধরে উপলব্দি করেছিলাম ,
ছোটবেলার বন্ধুদের ওই প্রাণ খুলে বাইনচোদ বলে খিস্তি দিয়ে যে শান্তিটা পাওয়া যায় মনে ,সেই তৃপ্তিটা বোধয় আর কোনো বন্ধুদের সাথেই পাওয়া যায় না!
বন্ধুদের জন্যে কিছু চকলেট টফি নিয়ে এসেছিলাম।
সেদিন অনেক রাত হয়ে গেছিল ।
তাই ওদের সাথে কিছুক্ষণ ইয়ার্কি-ফাজলামি মেরে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)