Yesterday, 03:51 PM
১১(গ)—শুধু তোমারই প্রতীক্ষায়।
মা হেলমেট পরে আমার বাইকের পিছনে একপাশে পা রেখে বসেছিল। সকালের দিকে রাস্তায় খুব একটা যানজট ছিল না।
তাই সো সো করে কিছুদূর বাইক চালিয়ে মুকুন্দপুর হয়ে রুবি, সায়েন্স সিটি, ইএম বাইপাস ধরে, চিংড়িঘাটা, উল্টোডাঙা, বাগুইআটি হয়ে সোজা এয়ারপোর্টে এসে পৌছালাম মাকে নিয়েই।
রাস্তায় আসার সময় মায়ের সাথে একটা কথাও আমি বলিনি। মাও অবশ্য কোনো কথাই বলছিল না আমার সাথে।
আমি বাইকটা এয়ারপোর্টের পার্কিং জোনে নিয়ে গিয়ে থামালাম। মা বাইক থেকে নামল।
মায়ের চোখ দুটো যেন আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে উঠল।
তারপর আমার সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। গটগট করে মায়ের হিল জুতোর শব্দটা লোকজনের কোলাহল ,সকালের ব্যস্ততার মধ্যেও কেমন স্পষ্ট হয়ে কানে এসে লাগছিল।
মায়ের হাতে ছিল ছোট্ট একটা লাগেজ ব্যাগ।
আমি মায়ের হাঁটার সুনিপুণ ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হাঁটছিলাম।
মায়ের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে । চিবুকটা ছিল সামান্য উঁচুতে , আর শিরদাঁড়া ছিল টানটান সোজা। মায়ের প্রতিটা পদক্ষেপের মধ্যেই যেন আমি আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তাকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম ।
ক্লিপের আঁটা মায়ের বারগান্ডি কালার করা চুলগুলো গোছা ধরা বেগুনি রঙের মোরগঝুঁটি ফুলের মতোই হাঁটার ছন্দে দুলছিল।
মা যত এক পা, দু পা করে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই আমার চোখের সামনে বদলে যাচ্ছিল আমার চেনা সেই স্নেহময়ী মা টা ।
মনে হচ্ছিল, আমার পরিচিত মমতাময়ী মা ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। তার জায়গায়, আমার চোখের সামনে তৈরি হয়ে উঠছে কর্পোরেট জগতের এক আত্মবিশ্বাসী নারী মূর্তি ।
আমি শুধু চুপ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, আর নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হেঁটে চলছিলাম,হন হন করে ,মায়ের পায়ের গতিতেই।
আর ঠিক তখনই,
একটা ইনভিক্টো এসে থামল এয়ারপোর্টের গেটের সামনে।
গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে চোখে পড়ল কালো জুতোর একজোড়া। তারপর গাঢ় নীল স্যুট পরা, চোখে সানগ্লাস ,পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমে এলেন ভাস্কর আঙ্কেল।
মা ভাস্কর আঙ্কেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল। সঙ্গে আমিও।
উনি গাড়িটা নিয়ে ড্রাইভারকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। তারপর ভাস্কর আঙ্কেলের দিকে মা এগিয়ে গেল, আর ভাস্কর আঙ্কেলও আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
—“গুড মর্নিং, টম!”
ভাস্কর আঙ্কেল সহাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
—“মর্নিং, আঙ্কেল।”
আমি ওনাকে বললাম। ভাস্কর আঙ্কেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম।
উনি আমাকে বললেন,
—“টম, তাহলে আমি তোমার মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাই। ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে যে আমাদের ।”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“গুড বাই আঙ্কেল ! টাটা !”
আর মা আমার দিকে তাকিয়ে, চোখে চোখ রেখে ভেজা চোখে বলল,
—“তুই বাড়ি ফিরে যা বুবু ! আমি আসছি, কেমন!”
মা কে বিদায় জানিয়ে, বিমানবন্দরের একপাশের কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে যেন একে একে ফিরে আসা স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে ,
কখন যে চোখের কোণে জল জমে উঠেছিল, নিজেই টের পাইনি।
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমাকেও এবার এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতে হবে।
হঠাৎ কেন, সঠিক জানি না,এয়ারপোর্টের গেটের মুখ থেকে পিছন ফিরে হাঁটতে নেব বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে,একটা পা বাড়িয়েছি শুধু,
ওমনি আমার স্বপ্নে দেখা ,সেই পরীটা,আমার কানের কাছে এসে কিছু একটা বলে গেল গুন্ গুন্ করে !
আমি থমকে দাঁড়ালাম। এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স গেটের ঠিক উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম।
পরীটা যেন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে গেল, মায়ের জন্য দুহাত মেলে,মায়েরই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকো চুপটি করে !
সাথে সাথেই আমার শরীরের ভিতর দিয়ে একটা ঢেউয়ের তরঙ্গ খেলে গেল নিজের থেকেই।
আমার দুটো পা আর কিছুতেই নাড়াতেই পারছিলাম না। সামনের দিকে এগোতেও পারছিলাম না যেন। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে থমকে দাঁড় করিয়ে রাখলো একই জায়গায়।
আমার মাথা ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যেতে থাকল আকাশের পানে । চোখের পাতা দুটো নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন কোথা থেকে এসে, পাখির ডানার মতো, কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে দিল আমার দুই বাহু।
দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি, মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষায়!
মা ফিরে আসছে!
মা এয়ারপোর্টেই আছে! মা আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যায়নি!
আমি অনুভূতি পেলাম, মায়ের চেনা-পরিচিত সেই সুবাসটা যেন আমার গায়ের অনেক অনেক কাছেই ফিরে এসেছে।
আমার কাঁধের দুপাশ জড়িয়ে ধরেছে মায়ের সেই নরম দুটি হাত।
পিছন ফিরে ঘুরে দেখার আমার প্রয়োজন পড়ল না।
মানুষের কোলাহল, ব্যস্ততার মাঝে, আমি দু -চোখ বন্ধ করে ,দুহাত মেলে অনুভব করলাম, মায়ের মাথাটা ঠেকে রয়েছে আমার ঠিক কাঁধের পিছনেই।
আর তারই সঙ্গে আমার কাঁধের দিকের জামার কাপড়টা ধীরে ধীরে ভিজে যাচ্ছে।
মা কাঁদছে!
মা কাঁপা গলায় আমাকে বলল,
—“আমাকে তো ফিরে আসতেই হবে তোর কাছে !”
—“কিন্তু তুই?
—“কেন ?”
আমিও ভেজা গলায় মাকে বললাম ,
—“আমিও দাঁড়িয়েই ছিলাম, তোমারই ফিরে আসার প্রতীক্ষায়।”
—“আর তুমি কি ভেবেছিলে মা ,আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করতে চলে যাব , তোমাকে ফেলে রেখে ! "
কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম, ভাস্কর আঙ্কেলও এসে দাঁড়ালেন আমার আর মায়ের সামনে।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে বললেন,
—“তোমার মা তো আমাকে বলেই দিল, ‘আমাকে নাকি বিয়ে করতে পারবে না!’”
—“ঠিক আছে তবে!”
—“তাহলে টম, আমার জন্যে একটা কাজ করো দেখি। একজন পাত্রী খুঁজে দাও তাহলে আমার জন্যে !”
—“আমাকেও তো কাউকে না কাউকে বিয়ে করতে হবে তো ,নাকি !"
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে সবার প্রথমে মাথা ঝুকিয়ে প্রণাম করলাম।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,
—“ হঠাৎ প্রণাম করলে যে আমাকে ?"
উনি আমার কান্ড দেখে হেসে ফেললেন।
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম ,
—“ আঙ্কেল ,বিয়ে বাড়িতে সবার মাঝে আপনাকে প্রণাম করাটা পেন্ডিং রেখেছিলাম। "
—“ ঠিক এই দিনটার জন্যেই !"
তারপর আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“একটা দারুণ পাত্রীর সন্ধান আমার কাছেই আছে। সুন্দরী, স্লিম, গায়ের রং ফর্সা, সুমুখশ্রী, শিক্ষিতা, গৃহকাজে নিপুণা,উচ্চতায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি ।
—“কিন্তু বয়সটাই একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, বুঝলেন আঙ্কেল!”
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে মজা করেই বললেন,
—“পাত্রীর কী বা নাম তাহার?”
—“কী বা তাহার বংশপরিচয়?”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে হাসতে হাসতে বললাম,
—“পাত্রীর নাম প্রভা মিত্র!”
—“আমার দিদুন!”
—“চলবে?”
মা, আমি আর ভাস্কর আঙ্কেল আমরা তিনজনেই হেসে উঠলাম!
তারপর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বলল,
—“ আচ্ছা, তাহলে চলি, ভাস্কর! আমি তো সবকিছুই সামনাসামনি বলে দিলাম তোমাকে।"
—“ আর , আমি তো অফিসের এইচ.আর ডিপার্টমেন্ট কে রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়েই দিলাম তোমার সামনেই ।"
—“ আমি মেডিক্যাল লিভ নিয়ে কিছুদিন পরে অফিসে গিয়ে নলেজ ট্রান্সফার করব তাহলে!”
ভাস্কর আঙ্কেল মাকে বললেন,
—“ঠিক আছে, অনামিকা। তুমি নয়, আরও ক’টা দিন মেডিক্যাল লিভে থাকো।
—“আমাকে তো তোমার মতো মেডিকেল নিলে চলবে না , অফিসে ঢুকতে হবে। "
—“আর এই যে তোমাদের মা ব্যাটার চক্করে পড়ে ,আমার ফ্লাইট মিস হয়ে গেল!
—“দেখি, পরের কোনো ফ্লাইটে টিকিট পাই কি না!”
আমি আর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বিদায় জানিয়ে, মাকে বাইকের পিছনে চাপিয়ে, বাড়ির পথেই রওনা দিলাম ।
মা হেলমেট পরে আমার বাইকের পিছনে একপাশে পা রেখে বসেছিল। সকালের দিকে রাস্তায় খুব একটা যানজট ছিল না।
তাই সো সো করে কিছুদূর বাইক চালিয়ে মুকুন্দপুর হয়ে রুবি, সায়েন্স সিটি, ইএম বাইপাস ধরে, চিংড়িঘাটা, উল্টোডাঙা, বাগুইআটি হয়ে সোজা এয়ারপোর্টে এসে পৌছালাম মাকে নিয়েই।
রাস্তায় আসার সময় মায়ের সাথে একটা কথাও আমি বলিনি। মাও অবশ্য কোনো কথাই বলছিল না আমার সাথে।
আমি বাইকটা এয়ারপোর্টের পার্কিং জোনে নিয়ে গিয়ে থামালাম। মা বাইক থেকে নামল।
মায়ের চোখ দুটো যেন আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে উঠল।
তারপর আমার সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। গটগট করে মায়ের হিল জুতোর শব্দটা লোকজনের কোলাহল ,সকালের ব্যস্ততার মধ্যেও কেমন স্পষ্ট হয়ে কানে এসে লাগছিল।
মায়ের হাতে ছিল ছোট্ট একটা লাগেজ ব্যাগ।
আমি মায়ের হাঁটার সুনিপুণ ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হাঁটছিলাম।
মায়ের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে । চিবুকটা ছিল সামান্য উঁচুতে , আর শিরদাঁড়া ছিল টানটান সোজা। মায়ের প্রতিটা পদক্ষেপের মধ্যেই যেন আমি আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তাকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম ।
ক্লিপের আঁটা মায়ের বারগান্ডি কালার করা চুলগুলো গোছা ধরা বেগুনি রঙের মোরগঝুঁটি ফুলের মতোই হাঁটার ছন্দে দুলছিল।
মা যত এক পা, দু পা করে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই আমার চোখের সামনে বদলে যাচ্ছিল আমার চেনা সেই স্নেহময়ী মা টা ।
মনে হচ্ছিল, আমার পরিচিত মমতাময়ী মা ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। তার জায়গায়, আমার চোখের সামনে তৈরি হয়ে উঠছে কর্পোরেট জগতের এক আত্মবিশ্বাসী নারী মূর্তি ।
আমি শুধু চুপ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, আর নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হেঁটে চলছিলাম,হন হন করে ,মায়ের পায়ের গতিতেই।
আর ঠিক তখনই,
একটা ইনভিক্টো এসে থামল এয়ারপোর্টের গেটের সামনে।
গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে চোখে পড়ল কালো জুতোর একজোড়া। তারপর গাঢ় নীল স্যুট পরা, চোখে সানগ্লাস ,পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমে এলেন ভাস্কর আঙ্কেল।
মা ভাস্কর আঙ্কেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল। সঙ্গে আমিও।
উনি গাড়িটা নিয়ে ড্রাইভারকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। তারপর ভাস্কর আঙ্কেলের দিকে মা এগিয়ে গেল, আর ভাস্কর আঙ্কেলও আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
—“গুড মর্নিং, টম!”
ভাস্কর আঙ্কেল সহাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
—“মর্নিং, আঙ্কেল।”
আমি ওনাকে বললাম। ভাস্কর আঙ্কেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম।
উনি আমাকে বললেন,
—“টম, তাহলে আমি তোমার মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাই। ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে যে আমাদের ।”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“গুড বাই আঙ্কেল ! টাটা !”
আর মা আমার দিকে তাকিয়ে, চোখে চোখ রেখে ভেজা চোখে বলল,
—“তুই বাড়ি ফিরে যা বুবু ! আমি আসছি, কেমন!”
মা কে বিদায় জানিয়ে, বিমানবন্দরের একপাশের কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে যেন একে একে ফিরে আসা স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে ,
কখন যে চোখের কোণে জল জমে উঠেছিল, নিজেই টের পাইনি।
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমাকেও এবার এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতে হবে।
হঠাৎ কেন, সঠিক জানি না,এয়ারপোর্টের গেটের মুখ থেকে পিছন ফিরে হাঁটতে নেব বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে,একটা পা বাড়িয়েছি শুধু,
ওমনি আমার স্বপ্নে দেখা ,সেই পরীটা,আমার কানের কাছে এসে কিছু একটা বলে গেল গুন্ গুন্ করে !
আমি থমকে দাঁড়ালাম। এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স গেটের ঠিক উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম।
পরীটা যেন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে গেল, মায়ের জন্য দুহাত মেলে,মায়েরই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকো চুপটি করে !
সাথে সাথেই আমার শরীরের ভিতর দিয়ে একটা ঢেউয়ের তরঙ্গ খেলে গেল নিজের থেকেই।
আমার দুটো পা আর কিছুতেই নাড়াতেই পারছিলাম না। সামনের দিকে এগোতেও পারছিলাম না যেন। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে থমকে দাঁড় করিয়ে রাখলো একই জায়গায়।
আমার মাথা ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যেতে থাকল আকাশের পানে । চোখের পাতা দুটো নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন কোথা থেকে এসে, পাখির ডানার মতো, কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে দিল আমার দুই বাহু।
দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি, মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষায়!
মা ফিরে আসছে!
মা এয়ারপোর্টেই আছে! মা আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যায়নি!
আমি অনুভূতি পেলাম, মায়ের চেনা-পরিচিত সেই সুবাসটা যেন আমার গায়ের অনেক অনেক কাছেই ফিরে এসেছে।
আমার কাঁধের দুপাশ জড়িয়ে ধরেছে মায়ের সেই নরম দুটি হাত।
পিছন ফিরে ঘুরে দেখার আমার প্রয়োজন পড়ল না।
মানুষের কোলাহল, ব্যস্ততার মাঝে, আমি দু -চোখ বন্ধ করে ,দুহাত মেলে অনুভব করলাম, মায়ের মাথাটা ঠেকে রয়েছে আমার ঠিক কাঁধের পিছনেই।
আর তারই সঙ্গে আমার কাঁধের দিকের জামার কাপড়টা ধীরে ধীরে ভিজে যাচ্ছে।
মা কাঁদছে!
মা কাঁপা গলায় আমাকে বলল,
—“আমাকে তো ফিরে আসতেই হবে তোর কাছে !”
—“কিন্তু তুই?
—“কেন ?”
আমিও ভেজা গলায় মাকে বললাম ,
—“আমিও দাঁড়িয়েই ছিলাম, তোমারই ফিরে আসার প্রতীক্ষায়।”
—“আর তুমি কি ভেবেছিলে মা ,আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করতে চলে যাব , তোমাকে ফেলে রেখে ! "
কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম, ভাস্কর আঙ্কেলও এসে দাঁড়ালেন আমার আর মায়ের সামনে।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে বললেন,
—“তোমার মা তো আমাকে বলেই দিল, ‘আমাকে নাকি বিয়ে করতে পারবে না!’”
—“ঠিক আছে তবে!”
—“তাহলে টম, আমার জন্যে একটা কাজ করো দেখি। একজন পাত্রী খুঁজে দাও তাহলে আমার জন্যে !”
—“আমাকেও তো কাউকে না কাউকে বিয়ে করতে হবে তো ,নাকি !"
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে সবার প্রথমে মাথা ঝুকিয়ে প্রণাম করলাম।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,
—“ হঠাৎ প্রণাম করলে যে আমাকে ?"
উনি আমার কান্ড দেখে হেসে ফেললেন।
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম ,
—“ আঙ্কেল ,বিয়ে বাড়িতে সবার মাঝে আপনাকে প্রণাম করাটা পেন্ডিং রেখেছিলাম। "
—“ ঠিক এই দিনটার জন্যেই !"
তারপর আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“একটা দারুণ পাত্রীর সন্ধান আমার কাছেই আছে। সুন্দরী, স্লিম, গায়ের রং ফর্সা, সুমুখশ্রী, শিক্ষিতা, গৃহকাজে নিপুণা,উচ্চতায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি ।
—“কিন্তু বয়সটাই একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, বুঝলেন আঙ্কেল!”
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে মজা করেই বললেন,
—“পাত্রীর কী বা নাম তাহার?”
—“কী বা তাহার বংশপরিচয়?”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে হাসতে হাসতে বললাম,
—“পাত্রীর নাম প্রভা মিত্র!”
—“আমার দিদুন!”
—“চলবে?”
মা, আমি আর ভাস্কর আঙ্কেল আমরা তিনজনেই হেসে উঠলাম!
তারপর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বলল,
—“ আচ্ছা, তাহলে চলি, ভাস্কর! আমি তো সবকিছুই সামনাসামনি বলে দিলাম তোমাকে।"
—“ আর , আমি তো অফিসের এইচ.আর ডিপার্টমেন্ট কে রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়েই দিলাম তোমার সামনেই ।"
—“ আমি মেডিক্যাল লিভ নিয়ে কিছুদিন পরে অফিসে গিয়ে নলেজ ট্রান্সফার করব তাহলে!”
ভাস্কর আঙ্কেল মাকে বললেন,
—“ঠিক আছে, অনামিকা। তুমি নয়, আরও ক’টা দিন মেডিক্যাল লিভে থাকো।
—“আমাকে তো তোমার মতো মেডিকেল নিলে চলবে না , অফিসে ঢুকতে হবে। "
—“আর এই যে তোমাদের মা ব্যাটার চক্করে পড়ে ,আমার ফ্লাইট মিস হয়ে গেল!
—“দেখি, পরের কোনো ফ্লাইটে টিকিট পাই কি না!”
আমি আর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বিদায় জানিয়ে, মাকে বাইকের পিছনে চাপিয়ে, বাড়ির পথেই রওনা দিলাম ।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)