Yesterday, 03:50 PM
আমি দেখলাম, মা মাথাটা নিচু করেই রেখেছে।
মায়ের কাঁধ দুটো যেন হালকা দুলে উঠল। মাথাটাও সামান্য ঢেউ খেলে উঠল।
আর বিছানার চাদরের ওপর টপ টপ করে গড়িয়ে পড়তে থাকল মায়ের চোখের জল।
— “আমি তো তোর নষ্ট মা, কিন্তু তুই নষ্ট ছেলে হবি কেন?”
মা আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মায়ের চোখ দুটি সেদিন কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে উঠেছিল।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি সেদিন।
আর আমার সেদিন এটাই মনে হয়েছিল ,মা আমার উপর শুধু রেগেই নেই।
মায়ের এই ভেজা চোখের দৃষ্টিতে মিশে আছে দুঃখ, অভিমান আর অপমানের নির্যাস।
আমার ইচ্ছে করছিল মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। অনেক, অনেক কাঁদি।
আমি মাকে ‘নষ্ট মা’ বলে ফেলেছি । অথচ সেই মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল মাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিতে! কিন্তু পারিনি।
আমার হাত দুটো কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, নিজের গালেই নিজে চড় মারি।
আমি খুব শান্ত,মৃদু স্বরে মাকে বললাম ,
—" আমার ভুল হয়ে গেছে মা!"
—"আমাকে ক্ষমা করে দাও তুমি!"
আমি কিছুক্ষন চুপ করেই থাকলাম । মা ও আমাকে কিছুই বলল না। মাথা নিচু করেই বসে থাকলো।
—"মা ,আর কোনোদিন এসব আজে বাজে কথা তোমাকে বলবো না আমি!"
—"কথা দিচ্ছি মা ! সরি মা ! প্লিজ ! প্লিজ ! মা!"
—"আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা !"
মা খুব ধীরে আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আর আমার চোখের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষন ।
মায়ের চোখ লাল হয়ে গল গল করে গড়িয়ে পড়তে থাকলো জল।
মা দুহাত তুলে , আমাকে কাছে ডেকে বলল ,
—" আয় এদিকে !"
আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছিলাম।
মা নিজের থেকেই আমাকে নিজের বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলো। আমি মায়ের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কাঁদলাম। মা আমার মাথাটা চেপে ধরে থাকলো দুহাত দিয়ে জড়িয়ে নিজের বুকের মাঝে ।
আর আমি আমার নিজের এই কলঙ্কিত পাপিষ্ঠ মুখটাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলাম মায়ের বুকের মাঝে।
মায়ের চোখের জল গড়িয়ে পড়লো আমার কাঁধের উপরেই।
মায়ের শীতল বুকের মাঝে আমার মাথাটা ধীরে ধীরে দুলে উঠছিল, আর কাঁপছিল মায়ের কাঁধ দুটি ,নিঃশব্দ কান্নার ভারে।
আমি মায়ের কোলে মাথা পেতে শুয়ে ছিলাম সেদিন,আর মায়ের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলছিলাম আমরা দুজনে।
মা আমার কপাল বেয়ে ধীরে ধীরে চুলের দিকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
মায়ের হাতের মোলায়েম পরশে আমার মনটা যেন স্নিগ্ধ, শান্ত, শীতল এক অনুভূতিতে ভরে উঠেছিল।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো আমার স্প্যানিশ গিটারটার পাশেই রাখা মায়ের ভায়োলিনের বক্সটার দিকে।
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “মা, তোমার মনে আছে, এবার ছুটিতে এসে একদিন তোমাকে আমি বলেছিলাম, আমাকে একদিন তুমি তোমার ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাবে!”
— “আজকে একটু বাজাবে, মা, ওই ভায়োলিনটা? আমি কত্ত দিন শুনি না, তোমার ওই বেহালাটার বো-এর টান।”
— “মা, তোমার মনে আছে, ছোট্টবেলায় আমি যখন তোমার কাছে যেতাম, তুমি আমাকে ছুটির দিনে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে!”
— “আজ একটু শোনাবে?... মা!”
মা মাথা নিচু করেই মাথা নাড়লো। আর আমাকে বলল ,
— " ঠিক আছে !"
সেদিন মা চেয়ারে বসে আমাকে ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাচ্ছিল।
মা বেহালাটা বাঁ কাঁধে তুলে থুতনির নিচে আলতো করে চেপে ধরল। বাঁ হাতের আঙুলগুলো তারের উপর নড়াচড়া করতে লাগল। আর ডান হাতে ধরা বো-টা ধীরে ধীরে তারের উপর দিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল।
মায়ের ময়ূরপুচ্ছের মতো চুলগুলো একপাশের গালটিকে আড়াল করে ঝুলে পড়ল । তারই সাথে একপাশের কেশগুচ্ছ দুলতে থাকল ভায়োলিনের বো-এর ছন্দে।
আমি মায়ের বাজানো ভায়োলিনটার করুণ শব্দটা কানে ভেসে আসতেই সঙ্গে সঙ্গে মাকে থেমে যেতে বললাম।
— “আচ্ছা, মা, তুমি ভায়োলিনের এই পরিচিত একই বিষণ্ণ সুরটা কেন বারবার বাজাও, বলো তো?”
একটা আশ্চর্য বিষয় আমি সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম।
আমি তো ঘুমের মধ্যে প্রায়ই সেই শান্ত নদীর ধারে একাকী সাদা পরীটাকে দেখি, যার চেহারাটা অনেকটা আমার মায়ের মতো। স্বপ্নে তার সঙ্গে প্রায় দিনই দেখা হয় আমার। কিন্তু কথা বলা আর হয় না।
সে আমাকে এক মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলে।
কিন্তু যেদিন , আমার মা ছুটিতে সবে এসেছিল আমার কাছে। আর আমি সেদিন রাতে ওই পরীটার স্বপ্নও দেখেছিলাম ওই দিনেই ।
কিন্তু তার ঠিক পরেই, আমি আরেকটাও স্বপ্ন দেখেছিলাম সেই দিন । মা গভীর রাতে বারান্দায় একাকী ভায়োলিনটা বাজাচ্ছিল আর কাঁদছিল ।
আর আমার ঘুমের গভীরে স্বপ্নে শুনতে পাওয়া ,মায়ের পরিচিত সেই ভায়োলিনের করুণ সুরটার সঙ্গে সেই দিনের মায়ের ভায়োলিনের সুর একদম এক।
কেন? মা একই করুণ সুর বারবার বাজাবে কেন?
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “আচ্ছা, মা, তোমার তো অনেক গানের সুর তোলা আছে এই ভায়োলিনের বো-এর টানে। এই একই করুণ সুরটাই বারবার বাজাও কেন তুমি?”
মা সেদিন আমাকে বলেছিল ,
— “ আমার মন যখন যেমন থাকে, আমার ভায়োলিনের বো-এর টানও সেই দিকেই সুর তোলে। এটা আমি কিছুই করতে পারি না। এটা আমার মন টাই আমাকে বলে দেয় !"
— “কিন্তু তার মানে মা , তোমার মন এখন খারাপ ,তাই তো !"
— " আচ্ছা বুবু ,তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি।
তুই কি এই করুণ সুরটা আগে, মানে কিছুদিন আগে আমাকে বাজাতে শুনে ছিলিস? "
আমি মাকে বললাম ,
— " হ্যা ,আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম ! তুমি মাঝরাত্তিরে স্বপ্নের মধ্যে এই ভায়োলিনের করুন সুরটাই বাজাচ্ছিলে আর কাঁদছিলে। !
যে স্বপ্নটা আমার একদম ভালো লাগেনি মা। বিশ্রী স্বপ্ন ছিল ওটা। একদম বাজে। "
— " কি আশ্চর্য জানিস তো বুবু ,আমিও জানিস ঠিক এই স্বপ্নটাই দেখেছিলাম। আমি ভায়োলিনের এই সুরটাই বাজাচ্ছি !বারান্দায় বসে। আর কাঁদছি !
তুইও এসে ছিলিস আমার স্বপ্নে ! আর আমাকে থামিয়ে দিয়ে ছিলিস তুই ! আমার এই ভায়োলিনের করুণ সুর, তুই আমাকে বাজাতে দিসনি। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম।"
— "তার মানে?"
আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— "এটা কী করে সম্ভব, মা? স্বপ্ন আবার এক হয় নাকি?"
মা আমাকে বলল,
— "আসলে আমি এই করুণ সুরটা তোকে আগে ছোট্ট বেলায় ,অনেকবার বাজিয়ে শুনিয়েছি তো, তাই তোর এটা পরিচিত সুর ছিল আগের থেকেই!"
— "তাই তোর আর আমার স্বপ্নটা বোধ হয় মিলে গেছে! তাই হয়তো হবে !"
— "রাতে যে স্বপ্ন দেখি, মানে কি কিছু আছে তার!"
কিন্তু আমি ভাবছিলাম, স্বপ্ন, আবার একই স্বপ্ন দুজনে এক সাথে দেখছি। ওই সেই বালিশের তলায় মায়ের প্যান্টি ঢুকে যাবার মতো রহস্যজনক ব্যাপারটা না খানিকটা!
ঠিক সেই সময়ে মনে মনে ভাবছিলাম, আমি একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও, মানুষের এই স্বপ্ন দেখার রহস্যটা আমার কাছে রহস্যের মতোই লাগে চিরকাল।
এর অনেকটাই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে যদিও, কিন্তু ঠিক কেন মানুষ স্বপ্ন দেখে, তার সম্পূর্ণ উত্তর এখনও বিজ্ঞানের কাছেও নেই।
মানুষ যে ঘুমের মধ্যে কী স্বপ্ন দেখে, আর কেনই বা দেখে, সে একমাত্র ঈশ্বরই জানে!
আর তাই আজ ও , এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনেক অনেক রহস্যের সমাধান, বিজ্ঞানের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।
আমি মায়ের সেই ভায়োলিনটা যত্ন করে জায়গামতো দেয়ালে টাঙিয়ে রেখে দিতে দিতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবছিলাম, এও আবার হয় নাকি রে বাবা!
তারপর মাকে বললাম ,
— " মা ,তুমি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও তো !"
আমি মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলাম। দুজনেই পাশ ফিরে, মুখোমুখি। আর মা নিঃশব্দ রাতে আমাকে মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে থাকল,
— " বুবু, তুই কাল আর কলেজের ক্লাসগুলো বন্ধ করবি না , কোচিং ক্লাস যেমন চলছে চলুক।
— "তোর বাবা যখন ডাকবে, তখন চলে যাবি। আমি তোকে আটকাবো না। কক্ষনো না !"
— "পরে তুই হয়তো কথা শোনাবি আমাকে, 'মা, তুমিই তো বাবার কাছে যেতে বারণ করেছিলে আমাকে!'"
— "আমি তোদের বাপ ব্যাটার মধ্যে নেই কিন্তু !"
মা আমাকে কথা গুলো বলছিল। আর আমি ভাবছিলাম,মা আমাকে নিজের থেকে দূরে বহুদূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। মায়ের মনে এতটুকুও কি মায়া ,মমতা নেই আমার জন্যে!
মা আমাকে নিজের কাছে রাখতে পারলো না তাহলে !
কিন্তু আমি মায়ের মায়ামাখা চোখের দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষন । মায়ের চোখের মনি আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতে পারছিল না সেদিন ।
আমি দেখেছিলাম , মায়ের চোখের মণি ছিল বড্ড অস্থির ,আর তারই সাথে মায়ের মনটাও! মায়ের স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ দৃষ্টির সাথেই কথা বলছিলাম এক,আর মায়ের মুখের কথা, কান দিয়ে শুনতে পাচ্ছি আরেক!
সেদিন মায়ের পাশে শুয়ে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, তা আমার মনে নেই। আর সেদিনই আমি সেই পরীটার স্বপ্নটাই দেখেছিলাম।
ধোঁয়াটে এক নির্জন, শান্ত জায়গা ,চারদিক পাহাড়ে ঘেরা। সেই নির্জনতার মাঝখানে কুলকুল শব্দে বয়ে চলা শান্ত নদীটির ধারে বসে আছে সেই সাদা পোশাকের পরীটি।
ঠিক যেন পরীর বেশ ধারণকারী আমার মাকেই আমি দেখছি।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে, সেদিন ওই সাদা পরীটা আমার সঙ্গে কোনো ছলনার মায়াজালে আমাকে আবদ্ধ করল না।
আমি ধীরে ধীরে, শান্ত পায়ে হেঁটে পরীটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমি পরীটার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে তাকিয়ে ওকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরীটা বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। বোধহয় লজ্জা পাচ্ছিল। আমি ওমন করে তাকিয়ে ছিলাম, তাই হবে বোধহয়।
আমি পরীটার পাশেই চুপ করে গিয়ে বসে রইলাম।
নিঃশব্দ, ঠান্ডা সেই জায়গাটিতে বসে কুলকুল ধারায় বয়ে চলা নদীটির জলতরঙ্গের শব্দে ,মন দিয়ে কান পাতলাম।
আমি ওই শান্ত নদীটার কাচের মতো স্বচ্ছ জলের ধারায় হাত ডুবিয়ে জল ছিটিয়ে খেলা করছিলাম একা একাই।
কী নরম, পাতলা আর ঠান্ডা সেই নদীর বয়ে চলা জলের ধারা ,যেন মনে হচ্ছিল, শিশিরভেজা কচি দূর্বা ঘাসের ডগা ছুঁয়ে আছি।
কিছুক্ষণ পর ওই পরীটাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— "ওই সাদা পরী, তুমি আমার মাকে আমার কাছে এনে দিতে পারো?
আমি তো মাকে বড় ভালোবাসি! মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে!"
পরীটা সেদিন আমার করুণ, বিষাদমাখা মুখটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
ঠিক আমার মায়ের মতোই তার চোখের চাহনি।
আমি সেদিন পরীটাকে একদম সামনে থেকেই দেখতেও পেয়েছিলাম। তার আগে পরীটা আমাকে কিছুতেই ধরা দিত না।
আমার মনে হয়েছিল সেদিন, এ তো হুবহু আমার মা! খালি পরীর বেশ ধারণ করে আছে।
পরীটা আমাকে দেখে হাসছিল । আমাকে দেখে পরীটা ছলনাময় হাসি হাসছিল বলে সেদিন আমার তখন পরীটার উপর ভারী রাগ হয়েছিল।
আর পরীটা আমাকে শুধু বলল,
— "তোমার মা তো তোমারই!"
আমি পরীটাকে বললাম,
— "কিন্তু মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর আমাকেও বহু দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।"
পরীটা খিলখিল করে হেসে বলল,
— "দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে থেকো তারই প্রতীক্ষায়।"
ঠিক তার পরেই আচমকা আমার ঘুমটা ভেঙে গেল অ্যালার্মের শব্দে।
আমি ঘুমের ঘোরে চমকে উঠলাম ।
তারপর জানালাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভোরের প্রভাতী আলো ফুটে উঠেছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ মায়ের ছুটির শেষে বিদায়ের পালা!
মা বোধহয় গতকাল রাতে আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে, আমার ঘরের টেবিল ক্লকের অ্যালার্মটা সেট করে রেখেই, দিদুনের ঘরে ঘুমোতে চলে গিয়েছিল।
আমি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই খাটে বসেছিলাম, দুই পা ঝুলিয়ে।
ভাবলাম, ইসসস! এত তাড়াতাড়ি ভোর হয়ে গেল কেন?
আমি তো পরীটার সাথে কথা বলছিলাম, কথাই শেষ হল না আমার!
মায়ের চলে যাবার সময় হয়ে এল !
তারপর ভাবলাম,
এরপর তো এই ঘর থেকে মিলিয়ে যাবে মায়ের সান্নিধ্যের সেই মলিন সুবাসটাও।
ঘরটাও আগের মত শান্ত হয়ে যাবে।
মা আমার ঘরে ঢুকল খুব ধীরে আর শান্ত পায়ে।
মা তখন পরিপাটি করে চুল বেঁধে, মেরুন রঙের চুড়িদার পরে, গায়ে ওড়না জড়িয়ে আমার ঘরে ঢুকে বলল,
—“ঘুম ভাঙলো তাহলে তোর !"
—“বুবু, চল, আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসবি!”
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মা আমার চোখের সামনে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মায়ের চোখের মণি দুটো সেদিন কেমন অস্থির মনে হচ্ছিল আমার। মায়ের চোখের মণিকে আমি চিনি।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ,কম্পিউটারের উপরে রাখা শোপিসটার দিকে আঙুল তুলে মাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম ,
— “মা, ওটা নিয়ে যাবে না তোমার সাথে !”
মা আমার শোপিসটার দিকে তাকাল। তারপর মা আমার কম্পিউটারের সামনে গিয়ে, আমার উপহার দেওয়া শোপিসটার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
— “আমার হার্টবিটস তোর সাথেই থাকুক।”
— “চল, চল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আমি মাকে আর কিছুই বলিনি ।
আমি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম ।
দিদুনও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল, মা চলে যাবে বলে। মা আর আমার জন্যে চা বানিয়ে এনে দিয়েছিল দিদুন ।
আমি প্লেট হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম।
মাও চা খাচ্ছিল, তবে মা আমার দিক থেকে পিছন ফিরে দিদুনের সাথেই গল্প করছিল, চায়ের প্লেট হাতেই।
আমি আড়চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি মায়ের চোখে চোখ রাখতেই মা ঘুরে যাচ্ছিল। তবে মা আর দিদুনের মধ্যে কথা চলছিল।
আমিও ঘুরে যাচ্ছিলাম মায়ের সাথেই। এইভাবে ঘুরে ঘুরে, লুকোচুরি খেলাটা মা আর আমার মধ্যে চলছিল নিঃশব্দে।
মা কিছুতেই আমার চোখের দিকে তাকাবে না। আর আমিও মায়ের চোখের পিছন ছাড়বো না।
মায়ের চায়ের কাপের শেষ চুমুক দিয়ে ,কাপটা টেবিলে নামিয়ে , মা দিদুনকে প্রণাম করল।
আমিও মাকে প্রণাম করতে গেলাম।
মা পা সরিয়ে নিল। তারপর আমাকে আঙুল তুলে বলল,
—“আগে তুই তোর দিদুনকে প্রণাম কর!”
আমি দিদুন, তারপর মা ,দুজনকেই প্রণাম করলাম।
ঘর থেকে বেরোনোর সময় দিদুনের চোখে জল।
দিদুন কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল,
—“ভালোভাবে থাকিস মা! আর পৌঁছে ফোন করিস!”
—“আর ছেলের সাথে ফোনে অশান্তি করবি না একদম!”
আমি গ্যারাজ থেকে বাইক বের করে, মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
মায়ের কাঁধ দুটো যেন হালকা দুলে উঠল। মাথাটাও সামান্য ঢেউ খেলে উঠল।
আর বিছানার চাদরের ওপর টপ টপ করে গড়িয়ে পড়তে থাকল মায়ের চোখের জল।
— “আমি তো তোর নষ্ট মা, কিন্তু তুই নষ্ট ছেলে হবি কেন?”
মা আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মায়ের চোখ দুটি সেদিন কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে উঠেছিল।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি সেদিন।
আর আমার সেদিন এটাই মনে হয়েছিল ,মা আমার উপর শুধু রেগেই নেই।
মায়ের এই ভেজা চোখের দৃষ্টিতে মিশে আছে দুঃখ, অভিমান আর অপমানের নির্যাস।
আমার ইচ্ছে করছিল মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। অনেক, অনেক কাঁদি।
আমি মাকে ‘নষ্ট মা’ বলে ফেলেছি । অথচ সেই মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল মাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিতে! কিন্তু পারিনি।
আমার হাত দুটো কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, নিজের গালেই নিজে চড় মারি।
আমি খুব শান্ত,মৃদু স্বরে মাকে বললাম ,
—" আমার ভুল হয়ে গেছে মা!"
—"আমাকে ক্ষমা করে দাও তুমি!"
আমি কিছুক্ষন চুপ করেই থাকলাম । মা ও আমাকে কিছুই বলল না। মাথা নিচু করেই বসে থাকলো।
—"মা ,আর কোনোদিন এসব আজে বাজে কথা তোমাকে বলবো না আমি!"
—"কথা দিচ্ছি মা ! সরি মা ! প্লিজ ! প্লিজ ! মা!"
—"আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা !"
মা খুব ধীরে আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আর আমার চোখের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষন ।
মায়ের চোখ লাল হয়ে গল গল করে গড়িয়ে পড়তে থাকলো জল।
মা দুহাত তুলে , আমাকে কাছে ডেকে বলল ,
—" আয় এদিকে !"
আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছিলাম।
মা নিজের থেকেই আমাকে নিজের বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলো। আমি মায়ের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কাঁদলাম। মা আমার মাথাটা চেপে ধরে থাকলো দুহাত দিয়ে জড়িয়ে নিজের বুকের মাঝে ।
আর আমি আমার নিজের এই কলঙ্কিত পাপিষ্ঠ মুখটাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলাম মায়ের বুকের মাঝে।
মায়ের চোখের জল গড়িয়ে পড়লো আমার কাঁধের উপরেই।
মায়ের শীতল বুকের মাঝে আমার মাথাটা ধীরে ধীরে দুলে উঠছিল, আর কাঁপছিল মায়ের কাঁধ দুটি ,নিঃশব্দ কান্নার ভারে।
আমি মায়ের কোলে মাথা পেতে শুয়ে ছিলাম সেদিন,আর মায়ের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলছিলাম আমরা দুজনে।
মা আমার কপাল বেয়ে ধীরে ধীরে চুলের দিকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
মায়ের হাতের মোলায়েম পরশে আমার মনটা যেন স্নিগ্ধ, শান্ত, শীতল এক অনুভূতিতে ভরে উঠেছিল।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো আমার স্প্যানিশ গিটারটার পাশেই রাখা মায়ের ভায়োলিনের বক্সটার দিকে।
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “মা, তোমার মনে আছে, এবার ছুটিতে এসে একদিন তোমাকে আমি বলেছিলাম, আমাকে একদিন তুমি তোমার ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাবে!”
— “আজকে একটু বাজাবে, মা, ওই ভায়োলিনটা? আমি কত্ত দিন শুনি না, তোমার ওই বেহালাটার বো-এর টান।”
— “মা, তোমার মনে আছে, ছোট্টবেলায় আমি যখন তোমার কাছে যেতাম, তুমি আমাকে ছুটির দিনে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে!”
— “আজ একটু শোনাবে?... মা!”
মা মাথা নিচু করেই মাথা নাড়লো। আর আমাকে বলল ,
— " ঠিক আছে !"
সেদিন মা চেয়ারে বসে আমাকে ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাচ্ছিল।
মা বেহালাটা বাঁ কাঁধে তুলে থুতনির নিচে আলতো করে চেপে ধরল। বাঁ হাতের আঙুলগুলো তারের উপর নড়াচড়া করতে লাগল। আর ডান হাতে ধরা বো-টা ধীরে ধীরে তারের উপর দিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল।
মায়ের ময়ূরপুচ্ছের মতো চুলগুলো একপাশের গালটিকে আড়াল করে ঝুলে পড়ল । তারই সাথে একপাশের কেশগুচ্ছ দুলতে থাকল ভায়োলিনের বো-এর ছন্দে।
আমি মায়ের বাজানো ভায়োলিনটার করুণ শব্দটা কানে ভেসে আসতেই সঙ্গে সঙ্গে মাকে থেমে যেতে বললাম।
— “আচ্ছা, মা, তুমি ভায়োলিনের এই পরিচিত একই বিষণ্ণ সুরটা কেন বারবার বাজাও, বলো তো?”
একটা আশ্চর্য বিষয় আমি সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম।
আমি তো ঘুমের মধ্যে প্রায়ই সেই শান্ত নদীর ধারে একাকী সাদা পরীটাকে দেখি, যার চেহারাটা অনেকটা আমার মায়ের মতো। স্বপ্নে তার সঙ্গে প্রায় দিনই দেখা হয় আমার। কিন্তু কথা বলা আর হয় না।
সে আমাকে এক মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলে।
কিন্তু যেদিন , আমার মা ছুটিতে সবে এসেছিল আমার কাছে। আর আমি সেদিন রাতে ওই পরীটার স্বপ্নও দেখেছিলাম ওই দিনেই ।
কিন্তু তার ঠিক পরেই, আমি আরেকটাও স্বপ্ন দেখেছিলাম সেই দিন । মা গভীর রাতে বারান্দায় একাকী ভায়োলিনটা বাজাচ্ছিল আর কাঁদছিল ।
আর আমার ঘুমের গভীরে স্বপ্নে শুনতে পাওয়া ,মায়ের পরিচিত সেই ভায়োলিনের করুণ সুরটার সঙ্গে সেই দিনের মায়ের ভায়োলিনের সুর একদম এক।
কেন? মা একই করুণ সুর বারবার বাজাবে কেন?
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “আচ্ছা, মা, তোমার তো অনেক গানের সুর তোলা আছে এই ভায়োলিনের বো-এর টানে। এই একই করুণ সুরটাই বারবার বাজাও কেন তুমি?”
মা সেদিন আমাকে বলেছিল ,
— “ আমার মন যখন যেমন থাকে, আমার ভায়োলিনের বো-এর টানও সেই দিকেই সুর তোলে। এটা আমি কিছুই করতে পারি না। এটা আমার মন টাই আমাকে বলে দেয় !"
— “কিন্তু তার মানে মা , তোমার মন এখন খারাপ ,তাই তো !"
— " আচ্ছা বুবু ,তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি।
তুই কি এই করুণ সুরটা আগে, মানে কিছুদিন আগে আমাকে বাজাতে শুনে ছিলিস? "
আমি মাকে বললাম ,
— " হ্যা ,আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম ! তুমি মাঝরাত্তিরে স্বপ্নের মধ্যে এই ভায়োলিনের করুন সুরটাই বাজাচ্ছিলে আর কাঁদছিলে। !
যে স্বপ্নটা আমার একদম ভালো লাগেনি মা। বিশ্রী স্বপ্ন ছিল ওটা। একদম বাজে। "
— " কি আশ্চর্য জানিস তো বুবু ,আমিও জানিস ঠিক এই স্বপ্নটাই দেখেছিলাম। আমি ভায়োলিনের এই সুরটাই বাজাচ্ছি !বারান্দায় বসে। আর কাঁদছি !
তুইও এসে ছিলিস আমার স্বপ্নে ! আর আমাকে থামিয়ে দিয়ে ছিলিস তুই ! আমার এই ভায়োলিনের করুণ সুর, তুই আমাকে বাজাতে দিসনি। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম।"
— "তার মানে?"
আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— "এটা কী করে সম্ভব, মা? স্বপ্ন আবার এক হয় নাকি?"
মা আমাকে বলল,
— "আসলে আমি এই করুণ সুরটা তোকে আগে ছোট্ট বেলায় ,অনেকবার বাজিয়ে শুনিয়েছি তো, তাই তোর এটা পরিচিত সুর ছিল আগের থেকেই!"
— "তাই তোর আর আমার স্বপ্নটা বোধ হয় মিলে গেছে! তাই হয়তো হবে !"
— "রাতে যে স্বপ্ন দেখি, মানে কি কিছু আছে তার!"
কিন্তু আমি ভাবছিলাম, স্বপ্ন, আবার একই স্বপ্ন দুজনে এক সাথে দেখছি। ওই সেই বালিশের তলায় মায়ের প্যান্টি ঢুকে যাবার মতো রহস্যজনক ব্যাপারটা না খানিকটা!
ঠিক সেই সময়ে মনে মনে ভাবছিলাম, আমি একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও, মানুষের এই স্বপ্ন দেখার রহস্যটা আমার কাছে রহস্যের মতোই লাগে চিরকাল।
এর অনেকটাই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে যদিও, কিন্তু ঠিক কেন মানুষ স্বপ্ন দেখে, তার সম্পূর্ণ উত্তর এখনও বিজ্ঞানের কাছেও নেই।
মানুষ যে ঘুমের মধ্যে কী স্বপ্ন দেখে, আর কেনই বা দেখে, সে একমাত্র ঈশ্বরই জানে!
আর তাই আজ ও , এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনেক অনেক রহস্যের সমাধান, বিজ্ঞানের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।
আমি মায়ের সেই ভায়োলিনটা যত্ন করে জায়গামতো দেয়ালে টাঙিয়ে রেখে দিতে দিতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবছিলাম, এও আবার হয় নাকি রে বাবা!
তারপর মাকে বললাম ,
— " মা ,তুমি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও তো !"
আমি মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলাম। দুজনেই পাশ ফিরে, মুখোমুখি। আর মা নিঃশব্দ রাতে আমাকে মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে থাকল,
— " বুবু, তুই কাল আর কলেজের ক্লাসগুলো বন্ধ করবি না , কোচিং ক্লাস যেমন চলছে চলুক।
— "তোর বাবা যখন ডাকবে, তখন চলে যাবি। আমি তোকে আটকাবো না। কক্ষনো না !"
— "পরে তুই হয়তো কথা শোনাবি আমাকে, 'মা, তুমিই তো বাবার কাছে যেতে বারণ করেছিলে আমাকে!'"
— "আমি তোদের বাপ ব্যাটার মধ্যে নেই কিন্তু !"
মা আমাকে কথা গুলো বলছিল। আর আমি ভাবছিলাম,মা আমাকে নিজের থেকে দূরে বহুদূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। মায়ের মনে এতটুকুও কি মায়া ,মমতা নেই আমার জন্যে!
মা আমাকে নিজের কাছে রাখতে পারলো না তাহলে !
কিন্তু আমি মায়ের মায়ামাখা চোখের দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষন । মায়ের চোখের মনি আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতে পারছিল না সেদিন ।
আমি দেখেছিলাম , মায়ের চোখের মণি ছিল বড্ড অস্থির ,আর তারই সাথে মায়ের মনটাও! মায়ের স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ দৃষ্টির সাথেই কথা বলছিলাম এক,আর মায়ের মুখের কথা, কান দিয়ে শুনতে পাচ্ছি আরেক!
সেদিন মায়ের পাশে শুয়ে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, তা আমার মনে নেই। আর সেদিনই আমি সেই পরীটার স্বপ্নটাই দেখেছিলাম।
ধোঁয়াটে এক নির্জন, শান্ত জায়গা ,চারদিক পাহাড়ে ঘেরা। সেই নির্জনতার মাঝখানে কুলকুল শব্দে বয়ে চলা শান্ত নদীটির ধারে বসে আছে সেই সাদা পোশাকের পরীটি।
ঠিক যেন পরীর বেশ ধারণকারী আমার মাকেই আমি দেখছি।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে, সেদিন ওই সাদা পরীটা আমার সঙ্গে কোনো ছলনার মায়াজালে আমাকে আবদ্ধ করল না।
আমি ধীরে ধীরে, শান্ত পায়ে হেঁটে পরীটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমি পরীটার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে তাকিয়ে ওকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরীটা বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। বোধহয় লজ্জা পাচ্ছিল। আমি ওমন করে তাকিয়ে ছিলাম, তাই হবে বোধহয়।
আমি পরীটার পাশেই চুপ করে গিয়ে বসে রইলাম।
নিঃশব্দ, ঠান্ডা সেই জায়গাটিতে বসে কুলকুল ধারায় বয়ে চলা নদীটির জলতরঙ্গের শব্দে ,মন দিয়ে কান পাতলাম।
আমি ওই শান্ত নদীটার কাচের মতো স্বচ্ছ জলের ধারায় হাত ডুবিয়ে জল ছিটিয়ে খেলা করছিলাম একা একাই।
কী নরম, পাতলা আর ঠান্ডা সেই নদীর বয়ে চলা জলের ধারা ,যেন মনে হচ্ছিল, শিশিরভেজা কচি দূর্বা ঘাসের ডগা ছুঁয়ে আছি।
কিছুক্ষণ পর ওই পরীটাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— "ওই সাদা পরী, তুমি আমার মাকে আমার কাছে এনে দিতে পারো?
আমি তো মাকে বড় ভালোবাসি! মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে!"
পরীটা সেদিন আমার করুণ, বিষাদমাখা মুখটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
ঠিক আমার মায়ের মতোই তার চোখের চাহনি।
আমি সেদিন পরীটাকে একদম সামনে থেকেই দেখতেও পেয়েছিলাম। তার আগে পরীটা আমাকে কিছুতেই ধরা দিত না।
আমার মনে হয়েছিল সেদিন, এ তো হুবহু আমার মা! খালি পরীর বেশ ধারণ করে আছে।
পরীটা আমাকে দেখে হাসছিল । আমাকে দেখে পরীটা ছলনাময় হাসি হাসছিল বলে সেদিন আমার তখন পরীটার উপর ভারী রাগ হয়েছিল।
আর পরীটা আমাকে শুধু বলল,
— "তোমার মা তো তোমারই!"
আমি পরীটাকে বললাম,
— "কিন্তু মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর আমাকেও বহু দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।"
পরীটা খিলখিল করে হেসে বলল,
— "দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে থেকো তারই প্রতীক্ষায়।"
ঠিক তার পরেই আচমকা আমার ঘুমটা ভেঙে গেল অ্যালার্মের শব্দে।
আমি ঘুমের ঘোরে চমকে উঠলাম ।
তারপর জানালাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভোরের প্রভাতী আলো ফুটে উঠেছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ মায়ের ছুটির শেষে বিদায়ের পালা!
মা বোধহয় গতকাল রাতে আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে, আমার ঘরের টেবিল ক্লকের অ্যালার্মটা সেট করে রেখেই, দিদুনের ঘরে ঘুমোতে চলে গিয়েছিল।
আমি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই খাটে বসেছিলাম, দুই পা ঝুলিয়ে।
ভাবলাম, ইসসস! এত তাড়াতাড়ি ভোর হয়ে গেল কেন?
আমি তো পরীটার সাথে কথা বলছিলাম, কথাই শেষ হল না আমার!
মায়ের চলে যাবার সময় হয়ে এল !
তারপর ভাবলাম,
এরপর তো এই ঘর থেকে মিলিয়ে যাবে মায়ের সান্নিধ্যের সেই মলিন সুবাসটাও।
ঘরটাও আগের মত শান্ত হয়ে যাবে।
মা আমার ঘরে ঢুকল খুব ধীরে আর শান্ত পায়ে।
মা তখন পরিপাটি করে চুল বেঁধে, মেরুন রঙের চুড়িদার পরে, গায়ে ওড়না জড়িয়ে আমার ঘরে ঢুকে বলল,
—“ঘুম ভাঙলো তাহলে তোর !"
—“বুবু, চল, আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসবি!”
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মা আমার চোখের সামনে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মায়ের চোখের মণি দুটো সেদিন কেমন অস্থির মনে হচ্ছিল আমার। মায়ের চোখের মণিকে আমি চিনি।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ,কম্পিউটারের উপরে রাখা শোপিসটার দিকে আঙুল তুলে মাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম ,
— “মা, ওটা নিয়ে যাবে না তোমার সাথে !”
মা আমার শোপিসটার দিকে তাকাল। তারপর মা আমার কম্পিউটারের সামনে গিয়ে, আমার উপহার দেওয়া শোপিসটার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
— “আমার হার্টবিটস তোর সাথেই থাকুক।”
— “চল, চল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আমি মাকে আর কিছুই বলিনি ।
আমি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম ।
দিদুনও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল, মা চলে যাবে বলে। মা আর আমার জন্যে চা বানিয়ে এনে দিয়েছিল দিদুন ।
আমি প্লেট হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম।
মাও চা খাচ্ছিল, তবে মা আমার দিক থেকে পিছন ফিরে দিদুনের সাথেই গল্প করছিল, চায়ের প্লেট হাতেই।
আমি আড়চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি মায়ের চোখে চোখ রাখতেই মা ঘুরে যাচ্ছিল। তবে মা আর দিদুনের মধ্যে কথা চলছিল।
আমিও ঘুরে যাচ্ছিলাম মায়ের সাথেই। এইভাবে ঘুরে ঘুরে, লুকোচুরি খেলাটা মা আর আমার মধ্যে চলছিল নিঃশব্দে।
মা কিছুতেই আমার চোখের দিকে তাকাবে না। আর আমিও মায়ের চোখের পিছন ছাড়বো না।
মায়ের চায়ের কাপের শেষ চুমুক দিয়ে ,কাপটা টেবিলে নামিয়ে , মা দিদুনকে প্রণাম করল।
আমিও মাকে প্রণাম করতে গেলাম।
মা পা সরিয়ে নিল। তারপর আমাকে আঙুল তুলে বলল,
—“আগে তুই তোর দিদুনকে প্রণাম কর!”
আমি দিদুন, তারপর মা ,দুজনকেই প্রণাম করলাম।
ঘর থেকে বেরোনোর সময় দিদুনের চোখে জল।
দিদুন কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল,
—“ভালোভাবে থাকিস মা! আর পৌঁছে ফোন করিস!”
—“আর ছেলের সাথে ফোনে অশান্তি করবি না একদম!”
আমি গ্যারাজ থেকে বাইক বের করে, মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)