Yesterday, 03:49 PM
১১(খ)—স্বপ্নের ওপারে, শুধুই মায়া।
পরের দিন সকালে ঘুমটা নিজের থেকেই ভেঙে গিয়েছিল। চোখ মেলতেই দেখলাম, জানলা দিয়ে আসা সকালের রোদ ঠিকরে এসে পড়েছে চোখে-মুখে।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম, বারান্দায় দিদুনের পায়ের শব্দ। তার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে থালা-বাসনের টুংটাং আওয়াজ। সন্ধ্যা মাসি কাজে এসেছে। দিদুনের সাথে ওনার গলার শব্দ পাচ্ছিলাম।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই ভাবছিলাম,আর মাত্র একটা দিন। আগামীকালই তো মা মুম্বাই চলে যাবে। অফিস জয়েন করবে।
তাই আর মায়ের সঙ্গে কোনো ঝামেলা, কোনো অশান্তি করব না আর ।
মাকে এবার মায়ের মতোই একটু নিরিবিলি, শান্তিতে থাকতে দেওয়াটাই হয়তো ঠিক হবে।
কিন্তু তাই বলে… মায়ের মুখও কি আর দেখব না আমি?
ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে, খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে জানালাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। খুব অলস লাগছিল শরীরটা, আর মাথাটায় ছিল ভার একটা ভাব।
ঠিক এই ভাবেই কালকেও একটা ভোর হয়ে সকাল হবে। মা চলে যাবে!
ইসসস! মা যে কেন এলো! মা না এলেই পারতো! বেকার বেকার, ছিলাম ছিলাম, নিজের মতো ডাল-ভাত মার্কা ম্যাড়মেড়ে জীবন নিয়ে দিব্যি ছিলাম।
সাথে ছিল কলেজ, বন্ধু, আড্ডা, ইয়ার্কি, ক্লাব, ভলি ,হাসি-মজা ,এইসব নিয়ে নিজের মতো বেশই তো ছিলাম।
আর মাঝে মাঝে শর্মিষ্ঠার দিকে ক্যালাই কাত্তিকের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে রাতে একান্তে বাড়ি ফিরে কষ্ট পেতাম। ওইটাই অনেক ভালো ছিল।
মা যে আবার আমার মত ,বঞ্চিত ব্যর্থ প্রেমিকের মনের মধ্যে ঢুকে ,বাসা বেঁধে ফেলবে , সেটা তো আগে বুঝতেই পারিনি !
মা দুদিনের জন্য ছুটিতে এসেই মনটাতে কেমন যেন ঝড় বইয়ে দিয়ে চলে গেল। এতদিন মা ছিল মোবাইলের ভয়েস আর ভিডিও কলে। ওই খানেই বন্দি হয়েই , না হয় থাকতে পারতো। সামনে যে কেন আসতে গেল মা!
দিব্যি হ্যাঁ ,না, ভালো-মন্দ কিছু একটা বলে চালিয়ে দিতাম এতদিন। কে আর কার মনের খবর রাখতে গেছে! ধুর, যা চলছিল সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।
সকালে বারান্দার টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম ,মা কি চা খেতেও বারান্দায় আসবে না নাকি।
দিদুনের ঘরের আয়নার কাচ ভেঙে ফেলেছি, তাই পাড়ার এক ফার্নিচারের দোকানে কল করে ওদের ডেকে পাঠালাম। কাচ নিয়ে এসে বাড়িতেই ফিটিং করে দেবে , সেইরকম কথাই হয়েছিল আমার , ওদের সাথে ।
শেষ দুদিন কলেজে যাব না ভেবেছিলাম , মায়ের জন্যেই।
মায়ের সাথে সারাদিন হাসি-মজা করে শেষ দুটো দিন কাটাবো।
না!
সেইসব আমার কপালে নেই! অতো ভালো কপাল নিয়ে জন্মালে কি আর কপাল চাপড়াতে হয় নাকি কারও!
তারপর ভাবলাম,খারাপ যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মায়ের সামনে দাঁড়ানোর মুখ আমার নেই। আর কলেজে যখন যাবই না, তখন নিজের ঘরে বন্দি হয়েই পড়াশোনা করে দিনটা কাটিয়ে দিই।
বিকেলের দিকে বরঞ্চ কোচিং ক্লাসে চলে যাব।
নিজের ঘরে বন্দি হয়ে পড়াশোনা করছিলাম। তবুও মনটা পড়ে ছিল বারান্দার দিকে। পর্দাটা একটু ফাঁক করে, ঘরের দরজাটাও অল্প খুলে রেখেছিলাম , পড়ার ঘর থেকে বারান্দার দিকে মাকে উঁকি মেরে দেখব বলে।
পড়তে পড়তে বারান্দার দিক থেকে মা আর দিদুনের গুনগুন করে কথা বলার শব্দ কানে আসছিল। তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মায়ের গায়ের সেই পরিচিত সুবাসটাও।
মা এখনো এই ঘরেই রয়েছে! মা এখনো আমার আশেপাশেই আছে!
তার অস্তিত্বটুকুর অনুভূতি পাচ্ছিলাম ,মুখচোরা হয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে।
বেশ একটু বেলার দিকে ডাইনিং টেবিলে বসে সকালের টিফিন খাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর কলিং বেলের শব্দ কানে ভেসে এল।
দরজা খুলে দেখলাম , ওই ফার্নিচারের দোকানের লোকগুলো আয়নার কাচ নিয়ে এসেছে।
আমি ওদের সঙ্গে দিদুনের ঘরে ঢুকলাম। মা খাটে বসে ছিল, উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে। আমি দিদুনের ঘরে ফার্নিচারের লোকগুলোর কাজ দেখছিলাম।
মায়ের ভাঙা মোবাইলটা বিছানার ওপর পড়ে থাকতে দেখলাম। আর ভাবলাম, মায়ের একটা খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল কেনা প্রয়োজন। মায়ের দামি মোবাইলটা ভেঙে ফেলেছি।
এই মোবাইলটা রিপেয়ার করতে যে খরচ হবে, তাতে আরেকটা ভালো কোম্পানির মোবাইল হয়ে যাবে।
ফার্নিচারের লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিলাম। ঠিক সেই সময়েই আবার কলিং বেলের শব্দ পেলাম।
আমিই গিয়েছিলাম দরজা খুলতে। দিদুন তখন বাথরুমে ঢুকেছিল স্নান করতে।
দরজা খুলে দেখলাম, একজন ডেলিভারি বয় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চৌকো বাক্স। বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ওটিপি পিনটা লাগবে।
বাক্সটা হাতে নিয়ে ভাবলাম, এটা মায়ের নতুন মোবাইল। খুব সম্ভবত গতকাল রাতেই মা অর্ডার দিয়েছিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাবছিলাম আমার গতকালের কুকীর্তির কথাগুলো।
ঠিক তখনই মা আমার হাত থেকে বাক্সটা কেড়ে নিল। তারপর দিদুনের মোবাইলটা হাতে নিয়ে লোকটাকে ওটিপি পিন বলল।
আমি ওখান থেকে সরে চলে গেলাম।
মা ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার দিদুনের ঘরের খাটে এসে বসলো। আমিও তখন দিদুনের ঘরেই ছিলাম।
মা নতুন মোবাইলটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমিও চুপচাপ আয়নার কাচ লাগানোর কাজ দেখছিলাম।
ফার্নিচারের লোকগুলো দিদুনের ড্রেসিং টেবিলের কাচ লাগিয়ে চলে যাওয়ার পর, আমি আমার মতো স্নান করে পড়তে বসেছিলাম। মায়ের সঙ্গে না হচ্ছিল কথা, না হচ্ছিল চোখে চোখে কোনো আলাপের বিনিময়।
খাটের উপর বসে পড়াশোনা করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, আমার মোবাইলটা কেঁপে উঠল। হাতে নিয়ে দেখলাম, মা টেক্সট পাঠিয়েছে।
মা,
— ay tui ki korchis re
আমি,
— parasona korchi maa
মা,
— ki porchis sata send kor too?
আমি সেদিন মাকে কেমিস্ট্রির বইয়ের পাতার ছবিগুলো তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর মা আমাকে আর কিছুই বলেনি।
আর আমিও মাকে আমার কাছে ডাকিনি। এমনিতেই মা আসবে না আমার কাছে , তার উপর দুটো গালাগালি করে দেবে, জানোয়ার, গাধা, গরু,শুয়োর !
পুরো এনিম্যাল সাফারি বানিয়ে ছাড়বে আমাকে । দরকার নেই !
তাই মাকে মায়ের মতো থাকতে দিতেই চেয়েছিলাম আমি।
দুপুরের দিকে, লাঞ্চের সময় মা, আমি আর দিদুন একসাথেই খেতে বসেছিলাম।
মা আমার উল্টোদিকে নিজের পরিচিত খাবারের চেয়ারেই বসে ছিল। মা খাবার বেড়ে দিচ্ছিল।
মায়ের চোখের দিকে একবার তাকালাম, ওই ঝলসানো চোখের দিকে তাকানোর সাহসে কুলোয়নি সেদিন।
তাই মাথা নিচু করে খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে শুকনো ভাতগুলো নিয়ে আঙুলে নাড়াচাড়া করছিলাম। দেখলাম, ডালের গোল হাতাটা এগিয়ে এল খাবারের থালার উপরে।
ডালের হাতাটার সঙ্গে ডালটাও টলমল করে কাঁপছিল।
মাথাটা সামান্য তুলে বুঝতে পারলাম, মায়ের হাত।
সেদিন যেন বড্ড কাঁপছিল মায়ের হাতটা।
লাঞ্চ করে সেদিন দুপুরে একা একা কম্পিউটারে পড়াশোনার কাজই করছিলাম।
মা আর দিদুন ওরা একসঙ্গেই দুপুরবেলায় ওদের ঘরেই ছিল। আমি কোচিং ক্লাসের টাস্কগুলো কমপ্লিট করছিলাম।
তারপর বিকেলের দিকে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম, দিদুন বারান্দায় সোফায় বসে টিভি দেখছে। আমাকে দেখে দিদুন চা বানিয়ে এনে দিল।
আমি কোচিং ক্লাসে যাব বলে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে দিদুনের পাশেই সোফায় বসে চা খেতে খেতে দিদুনকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আচ্ছা দিদুন, আমি বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যাচ্ছি, তা তোমার মন খারাপ করছে না আমার জন্য?”
দিদুন আমাকে বিরক্তির সুরে বলেছিল ,
— " তুই একটা পাজি ছেলে কোথাকার। তা তোকে চোখের সামনে দেখতে না পেয়ে আমার কষ্ট লাগবে না। দুটো নয় ,পাঁচটা নয় ,তুই আমার এক মাত্র নাতি।"
— " আমি নিজের হাতে,সেই ছোট্ট বেলা থেকে , তোকে মানুষ করেছি যে !
— " কিন্তু কি করবো আর আমি , আমি তো তোর পড়াশোনা আটকে ,নিজের কাছে তোকে রেখেদিতে পারি না ! সে ক্ষমতা আমার নেই !"
আমি দিদুনকে জড়িয়ে ধরলাম, আর দিদুনের কপালে একটা ছোট্ট করে চুমু খেলাম।
আর দিদুন আমাকে আদর করে বলল,
— “দুদিনের জন্যে তোর মা, তোরই সাথে দেখা করতে এল। কালই আবার চলেও যাবে।”
— “মায়ের সাথে এইভাবে কেউ অশান্তি করে কোনো ছেলে!”
— “গতকাল সারারাত ঘুমোয়নি তোর মা। খালি আমার পাশে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছিল।”
আমি দিদুনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোচিংয়ে ঢুকতে হবে।
সেদিন কোচিং ক্লাস করছিলাম।
কী মনে হলো, একবার শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালাম। ও অবশ্য আমার দিকে তাকায়নি । নিজের মতো মন দিয়ে ক্লাস করছিল।
আর আমি ভাবছিলাম, মাকে নিজের মতো বাঁচতে দেওয়াই উচিত। সেটাই তো ঠিক।
আমি বরঞ্চ চলে যাব বিদেশে। তবে জীবনে আর কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব না, শালা! এ বিশাল ঝামেলার জিনিস ।
সামনে একটা বসে আছে , সে আমাকে বিশ্বাসই করতে পারল না । বাড়িতে যে আছে ,সেও আমাকে ভুল বুঝল।
তাই প্রেম করা তো দূরের কথা, বিয়েই করব না কোনোদিন কাউকে।
সে আবার আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে কি না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে নাকি!
এই বেশ ভালো আছি ।
বেকার বেকার জীবনে কাউকে মন দিয়ে, আবার সেই মন নিয়ে ছেলে খেলা করে, মনের অশান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই আর।
বিদেশে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করব। চাকরি করব। নিজের মতো ঘুরে বেড়াব একা একা। সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে আমার জন্যে।
কোচিং ক্লাস শেষ করে বাইক স্টার্ট দিতে যাব, ওমনি মোবাইলটা বেজে উঠল।মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম, স্ক্রিনে মায়ের ছবিটা ভেসে উঠেছে।
মোবাইলে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই ভাবলাম,মায়ের কী টাইমিং জ্ঞান! ঘড়ি ধরে বসে থাকে বোধহয় সারাক্ষণ আমার জন্য।
আর মা বোধহয় আমার কথাই চিন্তা করে। আর তা না হলে এ জিনিস হওয়ার নয়।
মা হয়তো আমাকে ঠিকই ভালোবাসে। আমিই বোধহয় মাকে মায়ের মতো করে ভালোবাসতে পারিনি।
সমস্যাটা তো আমিই তৈরী করেছি , মা তো করেনি!
মাকে সেদিন ফোনে বলেছিলাম,
— “আমি একটু ক্লাবে যাব, মা। আজ বনির জন্মদিন। তাই ওর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
সেদিন ক্লাবে ঢুকেই বনিকে দেখেই ,আমার সেই রবার্তো কার্লোসের ফ্রি-কিকটার কথাটা মনে পড়ে গেল।
চালিয়ে দিলাম বনির পশ্চাৎপ্রদেশ বরাবর। গদাম করে লাথিটা মেরেছিলাম ওকে। পাশে আদভিক আর আমির হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে বলল,
— “গোল!”
— “সলিড দিয়েছিস ভাই!"
আর আমি বনিকে বললাম,
— “হ্যাপি বার্থ ডে, কুতরিয়ান!”
বনি পাছায় হাত বোলাতে বোলাতে ,
—"ওফফ হারামি ,আস্তে মারবি তো !"
সেদিন আমরা সবাইমিলে বনির জন্যে কেনা গিফট বক্স টা ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম । উপহারের বাক্সটা হাতে নিয়ে বনির মুখটা সেদিন আনন্দে ভোরে উঠেছিল।
আর বনিকে আমি বলেছিলাম,
— “আজ তোর জন্মদিন, তাই বেঁচে গেলি শালা।”
— “বাইনচোদ! বারে বসে মাল খাওয়ার ছবিগুলো পোস্ট করেছিলিস, আর আমাকে ট্যাগ করতে গেলি কেন, শুয়ার !”
— “আমার বাপকে তোমরা চেনো না! কী জিনিস!”
— “এই তোদের জন্যেই আমি বাবার কাছে কেস খেয়ে গেলাম!”
সেদিন ওদের আমি আগেই বলে রেখেছিলাম, আগামীকাল মা চলে যাবে। তাই বনির জন্মদিনের পার্টিটা পরের উইকেই হবে।
সেদিন ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। আর বনি আমাদের বিয়ার খাইয়েছিল। ওতেই আমরা সেদিন সন্তুষ্ট ছিলাম অবশ্য।
বাইক চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মনটা বড্ড খারাপ লাগছিল।
মা আগামীকাল চলে যাবে। বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে যাবে। সেই ভাবনাটাই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী করে তুলছিল।
তাই তাড়াতাড়ি বাইক চালিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। মনে মনে শুধু একটা আশাই ছিল, মা চলে যাবে বলে যদি একটু দয়া-দাক্ষিণ্য করে আমার সঙ্গে কথা বলে! এইটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট। আর কিছু চাই না জীবনে।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন।
ফ্ল্যাটে ঢুকে উঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে। আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরেই ছিলাম।
দিদুন আমার জন্যে প্লেটে করে খাবার এনে টেবিলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ভাবলাম, মা আমাকে খাবার এনেও দেবে না। মায়ের কি দয়া, মায়া, মমতা বলে কিছুই নেই নাকি? সব উধাও হয়ে গেল।
রাত পোহালেই ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই চলে যাবে মা। আমার জন্যে একটু মন খারাপও করে না মায়ের! এ কেমন মা!
তবু মনটা সেদিন রাতে খুব উসখুস করছিল।
মা হৃদয়হীন হতেই পারে। আমার মা টা ওমনিই জিনিস !
আমি তো আর মায়ের মতন হৃদয়হারা হতে পারি না।
মা কি এখনোও আমার সঙ্গে কথা বলবে না? তাই ভাবলাম, দেখি তো মা দিদুনের ঘরে কী করছে।
আমি বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে দিদুনের সঙ্গেই কথা বলছে। আর মা আমার দিকে একবার তাকিয়েই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
ভাবলাম, না, মা তো সেই রেগেই আছে। আমি মায়ের চোখ দেখলেই সব বুঝতে পারি। তার সঙ্গে মায়ের নাকের ডগায় লেগে থাকা লালচে আভার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি।
তাই ভাবলাম, না ভাই ,দরকার নেই।
নিজের ঘরে ঢুকে কম্পিউটারের চেয়ারটাতে বসে ছিলাম।
আর আমার সি পি ইউ ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, মায়ের জন্মদিনে আমার দেওয়া সেই ছোট্ট শোপিসটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
শোপিসটার গায়ে লেখা—
“My Heart Beats Only For You.”
অনেকক্ষণ ধরে শুধু ওই লেখাটার দিকেই চোখ বোলাচ্ছিলাম।
আর মনে পড়ে যাচ্ছিল, মায়ের সঙ্গে কাটানো হাসি-মজার দিনগুলোর কথা।
আর ভাবছিলাম, মা বোধহয় এটাও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। সঙ্গে করে নিয়ে যাবে না।
মায়ের হার্ট আর আমার জন্য বিটস করবে না, তাই!
যা নচ্ছার ছেলের ভুল করে জন্ম দিয়ে ফেলেছে মা । সেটাই স্বাভাবিক!
দিদুনের ডাকে রাতের খাবার খেতে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলাম। আমি খাবার খেতে গিয়ে ,আমার উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়েছিলাম।
কিন্তু মা, আমার দিকে মুখ তুলে একটি বারের জন্যেও তাকাল-ই না।
আর ভাবছিলাম, ইসস, মায়ের ওই চেয়ারটা আবার সেই আগের মতোই ফাঁকা হয়ে যাবে । মায়ের চেয়ারটাতে আবার আগের মতোই ধুলো জমতে শুরু করবে।
কিছুদিন আগে মজা করে টেবিলের তলায় ঢুকে গিয়ে মায়ের সঙ্গে মজা করেছিলাম।
আর সেই মজা করার মানুষটাই আমার থেকে দূরে চলে যাবে । আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম।
আমি সেদিন খাটে বসেই পড়ছিলাম। আর মায়ের জন্য মন খারাপ করছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর, রাতের দিকে দরজার দিক থেকে আলতো একটা শব্দ হলো।
দরজার দিকে আমার তাকানোর প্রয়োজনই হলো না। মায়ের গায়ের পরিচিত সুবাসের অনুভূতিতেই টের পেয়েছিলাম,দরজার সামনে মা দাঁড়িয়ে আছে।
মা আমার ঘরে এসে, খুব ধীর শান্ত ভাবে ,খাটের কোনায় চুপ করেই বসেছিল,মাথা নিচু করে।মায়ের হাতে ছিল ল্যাপটপ আর মোবাইল।
মা আমার দিকে চোখে চোখ রেখে তাকাচ্ছিল না আর।
মা ল্যাপটপটা খাটের উপরে আস্তে করে রাখল। মা কেমন যেন নিজে নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গেছিল সেদিন।
হয়তো মা ও আমার মধ্যে, সেদিন দুপুর বেলায় ঘটে যাওয়া,আকস্মিক শারীরিক সম্পর্কটার ভয় ,লজ্জা আর পাপবোধের বিবেকের দংশন কাজ করছিল মায়ের মনের গভীরে।
তাই মা এতটা চুপ ছিল । তাই মা সেদিন ছিল শান্ত।
আমি শুধু কম্পিউটার ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, শোপিসটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে মাকে বলেছিলাম ,
—"ওটা নিয়ে যাবে না মা ?"
—"তোমার সঙ্গে করে!"
—"আমি যে তোমাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম ওটা। "
মা মাথা নিচু করেই খুব ধীরে মাথা দোলাল। অসম্মতি প্রকাশ করল শুধু। মুখে কিছুই বলল না।
আমিও মাথাটা নিচু করলাম। সেদিন আমার খুব খারাপ লাগছিল।
এটা ভেবেই মা চলে যাবে, সে নয় যাক! বুঝলাম। চলে যাক !
মা আমার দেওয়া জন্মদিনের উপহারটাও আমাকেই ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। বেশ ,ঠিক আছে ,সেটাও না হয় মেনে নিলাম।
আসলে , আমি কি আদৌ মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য সন্তান ? মানে, যোগ্য কাজ করেছি কি কিছু?
তারপর ভাবলাম, না! করিনি তো। একদমই করিনি।
তাই মাকে ছোঁয়ার অধিকারও আমার নেই। মাকে কিচ্ছু বলার অধিকার ও আমার নেই।
এটাই হয়তো আমার যোগ্য শাস্তি।
তাই মাথা নিচু করেই মাকে সেদিন একটাই কথা বলেছিলাম,
— “মা, পারলে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও!”
পরের দিন সকালে ঘুমটা নিজের থেকেই ভেঙে গিয়েছিল। চোখ মেলতেই দেখলাম, জানলা দিয়ে আসা সকালের রোদ ঠিকরে এসে পড়েছে চোখে-মুখে।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম, বারান্দায় দিদুনের পায়ের শব্দ। তার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে থালা-বাসনের টুংটাং আওয়াজ। সন্ধ্যা মাসি কাজে এসেছে। দিদুনের সাথে ওনার গলার শব্দ পাচ্ছিলাম।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই ভাবছিলাম,আর মাত্র একটা দিন। আগামীকালই তো মা মুম্বাই চলে যাবে। অফিস জয়েন করবে।
তাই আর মায়ের সঙ্গে কোনো ঝামেলা, কোনো অশান্তি করব না আর ।
মাকে এবার মায়ের মতোই একটু নিরিবিলি, শান্তিতে থাকতে দেওয়াটাই হয়তো ঠিক হবে।
কিন্তু তাই বলে… মায়ের মুখও কি আর দেখব না আমি?
ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে, খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে জানালাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। খুব অলস লাগছিল শরীরটা, আর মাথাটায় ছিল ভার একটা ভাব।
ঠিক এই ভাবেই কালকেও একটা ভোর হয়ে সকাল হবে। মা চলে যাবে!
ইসসস! মা যে কেন এলো! মা না এলেই পারতো! বেকার বেকার, ছিলাম ছিলাম, নিজের মতো ডাল-ভাত মার্কা ম্যাড়মেড়ে জীবন নিয়ে দিব্যি ছিলাম।
সাথে ছিল কলেজ, বন্ধু, আড্ডা, ইয়ার্কি, ক্লাব, ভলি ,হাসি-মজা ,এইসব নিয়ে নিজের মতো বেশই তো ছিলাম।
আর মাঝে মাঝে শর্মিষ্ঠার দিকে ক্যালাই কাত্তিকের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে রাতে একান্তে বাড়ি ফিরে কষ্ট পেতাম। ওইটাই অনেক ভালো ছিল।
মা যে আবার আমার মত ,বঞ্চিত ব্যর্থ প্রেমিকের মনের মধ্যে ঢুকে ,বাসা বেঁধে ফেলবে , সেটা তো আগে বুঝতেই পারিনি !
মা দুদিনের জন্য ছুটিতে এসেই মনটাতে কেমন যেন ঝড় বইয়ে দিয়ে চলে গেল। এতদিন মা ছিল মোবাইলের ভয়েস আর ভিডিও কলে। ওই খানেই বন্দি হয়েই , না হয় থাকতে পারতো। সামনে যে কেন আসতে গেল মা!
দিব্যি হ্যাঁ ,না, ভালো-মন্দ কিছু একটা বলে চালিয়ে দিতাম এতদিন। কে আর কার মনের খবর রাখতে গেছে! ধুর, যা চলছিল সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।
সকালে বারান্দার টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম ,মা কি চা খেতেও বারান্দায় আসবে না নাকি।
দিদুনের ঘরের আয়নার কাচ ভেঙে ফেলেছি, তাই পাড়ার এক ফার্নিচারের দোকানে কল করে ওদের ডেকে পাঠালাম। কাচ নিয়ে এসে বাড়িতেই ফিটিং করে দেবে , সেইরকম কথাই হয়েছিল আমার , ওদের সাথে ।
শেষ দুদিন কলেজে যাব না ভেবেছিলাম , মায়ের জন্যেই।
মায়ের সাথে সারাদিন হাসি-মজা করে শেষ দুটো দিন কাটাবো।
না!
সেইসব আমার কপালে নেই! অতো ভালো কপাল নিয়ে জন্মালে কি আর কপাল চাপড়াতে হয় নাকি কারও!
তারপর ভাবলাম,খারাপ যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মায়ের সামনে দাঁড়ানোর মুখ আমার নেই। আর কলেজে যখন যাবই না, তখন নিজের ঘরে বন্দি হয়েই পড়াশোনা করে দিনটা কাটিয়ে দিই।
বিকেলের দিকে বরঞ্চ কোচিং ক্লাসে চলে যাব।
নিজের ঘরে বন্দি হয়ে পড়াশোনা করছিলাম। তবুও মনটা পড়ে ছিল বারান্দার দিকে। পর্দাটা একটু ফাঁক করে, ঘরের দরজাটাও অল্প খুলে রেখেছিলাম , পড়ার ঘর থেকে বারান্দার দিকে মাকে উঁকি মেরে দেখব বলে।
পড়তে পড়তে বারান্দার দিক থেকে মা আর দিদুনের গুনগুন করে কথা বলার শব্দ কানে আসছিল। তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মায়ের গায়ের সেই পরিচিত সুবাসটাও।
মা এখনো এই ঘরেই রয়েছে! মা এখনো আমার আশেপাশেই আছে!
তার অস্তিত্বটুকুর অনুভূতি পাচ্ছিলাম ,মুখচোরা হয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে।
বেশ একটু বেলার দিকে ডাইনিং টেবিলে বসে সকালের টিফিন খাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর কলিং বেলের শব্দ কানে ভেসে এল।
দরজা খুলে দেখলাম , ওই ফার্নিচারের দোকানের লোকগুলো আয়নার কাচ নিয়ে এসেছে।
আমি ওদের সঙ্গে দিদুনের ঘরে ঢুকলাম। মা খাটে বসে ছিল, উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে। আমি দিদুনের ঘরে ফার্নিচারের লোকগুলোর কাজ দেখছিলাম।
মায়ের ভাঙা মোবাইলটা বিছানার ওপর পড়ে থাকতে দেখলাম। আর ভাবলাম, মায়ের একটা খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল কেনা প্রয়োজন। মায়ের দামি মোবাইলটা ভেঙে ফেলেছি।
এই মোবাইলটা রিপেয়ার করতে যে খরচ হবে, তাতে আরেকটা ভালো কোম্পানির মোবাইল হয়ে যাবে।
ফার্নিচারের লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিলাম। ঠিক সেই সময়েই আবার কলিং বেলের শব্দ পেলাম।
আমিই গিয়েছিলাম দরজা খুলতে। দিদুন তখন বাথরুমে ঢুকেছিল স্নান করতে।
দরজা খুলে দেখলাম, একজন ডেলিভারি বয় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চৌকো বাক্স। বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ওটিপি পিনটা লাগবে।
বাক্সটা হাতে নিয়ে ভাবলাম, এটা মায়ের নতুন মোবাইল। খুব সম্ভবত গতকাল রাতেই মা অর্ডার দিয়েছিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাবছিলাম আমার গতকালের কুকীর্তির কথাগুলো।
ঠিক তখনই মা আমার হাত থেকে বাক্সটা কেড়ে নিল। তারপর দিদুনের মোবাইলটা হাতে নিয়ে লোকটাকে ওটিপি পিন বলল।
আমি ওখান থেকে সরে চলে গেলাম।
মা ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার দিদুনের ঘরের খাটে এসে বসলো। আমিও তখন দিদুনের ঘরেই ছিলাম।
মা নতুন মোবাইলটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমিও চুপচাপ আয়নার কাচ লাগানোর কাজ দেখছিলাম।
ফার্নিচারের লোকগুলো দিদুনের ড্রেসিং টেবিলের কাচ লাগিয়ে চলে যাওয়ার পর, আমি আমার মতো স্নান করে পড়তে বসেছিলাম। মায়ের সঙ্গে না হচ্ছিল কথা, না হচ্ছিল চোখে চোখে কোনো আলাপের বিনিময়।
খাটের উপর বসে পড়াশোনা করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, আমার মোবাইলটা কেঁপে উঠল। হাতে নিয়ে দেখলাম, মা টেক্সট পাঠিয়েছে।
মা,
— ay tui ki korchis re
আমি,
— parasona korchi maa
মা,
— ki porchis sata send kor too?
আমি সেদিন মাকে কেমিস্ট্রির বইয়ের পাতার ছবিগুলো তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর মা আমাকে আর কিছুই বলেনি।
আর আমিও মাকে আমার কাছে ডাকিনি। এমনিতেই মা আসবে না আমার কাছে , তার উপর দুটো গালাগালি করে দেবে, জানোয়ার, গাধা, গরু,শুয়োর !
পুরো এনিম্যাল সাফারি বানিয়ে ছাড়বে আমাকে । দরকার নেই !
তাই মাকে মায়ের মতো থাকতে দিতেই চেয়েছিলাম আমি।
দুপুরের দিকে, লাঞ্চের সময় মা, আমি আর দিদুন একসাথেই খেতে বসেছিলাম।
মা আমার উল্টোদিকে নিজের পরিচিত খাবারের চেয়ারেই বসে ছিল। মা খাবার বেড়ে দিচ্ছিল।
মায়ের চোখের দিকে একবার তাকালাম, ওই ঝলসানো চোখের দিকে তাকানোর সাহসে কুলোয়নি সেদিন।
তাই মাথা নিচু করে খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে শুকনো ভাতগুলো নিয়ে আঙুলে নাড়াচাড়া করছিলাম। দেখলাম, ডালের গোল হাতাটা এগিয়ে এল খাবারের থালার উপরে।
ডালের হাতাটার সঙ্গে ডালটাও টলমল করে কাঁপছিল।
মাথাটা সামান্য তুলে বুঝতে পারলাম, মায়ের হাত।
সেদিন যেন বড্ড কাঁপছিল মায়ের হাতটা।
লাঞ্চ করে সেদিন দুপুরে একা একা কম্পিউটারে পড়াশোনার কাজই করছিলাম।
মা আর দিদুন ওরা একসঙ্গেই দুপুরবেলায় ওদের ঘরেই ছিল। আমি কোচিং ক্লাসের টাস্কগুলো কমপ্লিট করছিলাম।
তারপর বিকেলের দিকে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম, দিদুন বারান্দায় সোফায় বসে টিভি দেখছে। আমাকে দেখে দিদুন চা বানিয়ে এনে দিল।
আমি কোচিং ক্লাসে যাব বলে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে দিদুনের পাশেই সোফায় বসে চা খেতে খেতে দিদুনকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আচ্ছা দিদুন, আমি বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যাচ্ছি, তা তোমার মন খারাপ করছে না আমার জন্য?”
দিদুন আমাকে বিরক্তির সুরে বলেছিল ,
— " তুই একটা পাজি ছেলে কোথাকার। তা তোকে চোখের সামনে দেখতে না পেয়ে আমার কষ্ট লাগবে না। দুটো নয় ,পাঁচটা নয় ,তুই আমার এক মাত্র নাতি।"
— " আমি নিজের হাতে,সেই ছোট্ট বেলা থেকে , তোকে মানুষ করেছি যে !
— " কিন্তু কি করবো আর আমি , আমি তো তোর পড়াশোনা আটকে ,নিজের কাছে তোকে রেখেদিতে পারি না ! সে ক্ষমতা আমার নেই !"
আমি দিদুনকে জড়িয়ে ধরলাম, আর দিদুনের কপালে একটা ছোট্ট করে চুমু খেলাম।
আর দিদুন আমাকে আদর করে বলল,
— “দুদিনের জন্যে তোর মা, তোরই সাথে দেখা করতে এল। কালই আবার চলেও যাবে।”
— “মায়ের সাথে এইভাবে কেউ অশান্তি করে কোনো ছেলে!”
— “গতকাল সারারাত ঘুমোয়নি তোর মা। খালি আমার পাশে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছিল।”
আমি দিদুনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোচিংয়ে ঢুকতে হবে।
সেদিন কোচিং ক্লাস করছিলাম।
কী মনে হলো, একবার শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালাম। ও অবশ্য আমার দিকে তাকায়নি । নিজের মতো মন দিয়ে ক্লাস করছিল।
আর আমি ভাবছিলাম, মাকে নিজের মতো বাঁচতে দেওয়াই উচিত। সেটাই তো ঠিক।
আমি বরঞ্চ চলে যাব বিদেশে। তবে জীবনে আর কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব না, শালা! এ বিশাল ঝামেলার জিনিস ।
সামনে একটা বসে আছে , সে আমাকে বিশ্বাসই করতে পারল না । বাড়িতে যে আছে ,সেও আমাকে ভুল বুঝল।
তাই প্রেম করা তো দূরের কথা, বিয়েই করব না কোনোদিন কাউকে।
সে আবার আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে কি না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে নাকি!
এই বেশ ভালো আছি ।
বেকার বেকার জীবনে কাউকে মন দিয়ে, আবার সেই মন নিয়ে ছেলে খেলা করে, মনের অশান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই আর।
বিদেশে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করব। চাকরি করব। নিজের মতো ঘুরে বেড়াব একা একা। সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে আমার জন্যে।
কোচিং ক্লাস শেষ করে বাইক স্টার্ট দিতে যাব, ওমনি মোবাইলটা বেজে উঠল।মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম, স্ক্রিনে মায়ের ছবিটা ভেসে উঠেছে।
মোবাইলে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই ভাবলাম,মায়ের কী টাইমিং জ্ঞান! ঘড়ি ধরে বসে থাকে বোধহয় সারাক্ষণ আমার জন্য।
আর মা বোধহয় আমার কথাই চিন্তা করে। আর তা না হলে এ জিনিস হওয়ার নয়।
মা হয়তো আমাকে ঠিকই ভালোবাসে। আমিই বোধহয় মাকে মায়ের মতো করে ভালোবাসতে পারিনি।
সমস্যাটা তো আমিই তৈরী করেছি , মা তো করেনি!
মাকে সেদিন ফোনে বলেছিলাম,
— “আমি একটু ক্লাবে যাব, মা। আজ বনির জন্মদিন। তাই ওর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
সেদিন ক্লাবে ঢুকেই বনিকে দেখেই ,আমার সেই রবার্তো কার্লোসের ফ্রি-কিকটার কথাটা মনে পড়ে গেল।
চালিয়ে দিলাম বনির পশ্চাৎপ্রদেশ বরাবর। গদাম করে লাথিটা মেরেছিলাম ওকে। পাশে আদভিক আর আমির হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে বলল,
— “গোল!”
— “সলিড দিয়েছিস ভাই!"
আর আমি বনিকে বললাম,
— “হ্যাপি বার্থ ডে, কুতরিয়ান!”
বনি পাছায় হাত বোলাতে বোলাতে ,
—"ওফফ হারামি ,আস্তে মারবি তো !"
সেদিন আমরা সবাইমিলে বনির জন্যে কেনা গিফট বক্স টা ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম । উপহারের বাক্সটা হাতে নিয়ে বনির মুখটা সেদিন আনন্দে ভোরে উঠেছিল।
আর বনিকে আমি বলেছিলাম,
— “আজ তোর জন্মদিন, তাই বেঁচে গেলি শালা।”
— “বাইনচোদ! বারে বসে মাল খাওয়ার ছবিগুলো পোস্ট করেছিলিস, আর আমাকে ট্যাগ করতে গেলি কেন, শুয়ার !”
— “আমার বাপকে তোমরা চেনো না! কী জিনিস!”
— “এই তোদের জন্যেই আমি বাবার কাছে কেস খেয়ে গেলাম!”
সেদিন ওদের আমি আগেই বলে রেখেছিলাম, আগামীকাল মা চলে যাবে। তাই বনির জন্মদিনের পার্টিটা পরের উইকেই হবে।
সেদিন ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। আর বনি আমাদের বিয়ার খাইয়েছিল। ওতেই আমরা সেদিন সন্তুষ্ট ছিলাম অবশ্য।
বাইক চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মনটা বড্ড খারাপ লাগছিল।
মা আগামীকাল চলে যাবে। বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে যাবে। সেই ভাবনাটাই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী করে তুলছিল।
তাই তাড়াতাড়ি বাইক চালিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। মনে মনে শুধু একটা আশাই ছিল, মা চলে যাবে বলে যদি একটু দয়া-দাক্ষিণ্য করে আমার সঙ্গে কথা বলে! এইটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট। আর কিছু চাই না জীবনে।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন।
ফ্ল্যাটে ঢুকে উঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে। আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরেই ছিলাম।
দিদুন আমার জন্যে প্লেটে করে খাবার এনে টেবিলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ভাবলাম, মা আমাকে খাবার এনেও দেবে না। মায়ের কি দয়া, মায়া, মমতা বলে কিছুই নেই নাকি? সব উধাও হয়ে গেল।
রাত পোহালেই ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই চলে যাবে মা। আমার জন্যে একটু মন খারাপও করে না মায়ের! এ কেমন মা!
তবু মনটা সেদিন রাতে খুব উসখুস করছিল।
মা হৃদয়হীন হতেই পারে। আমার মা টা ওমনিই জিনিস !
আমি তো আর মায়ের মতন হৃদয়হারা হতে পারি না।
মা কি এখনোও আমার সঙ্গে কথা বলবে না? তাই ভাবলাম, দেখি তো মা দিদুনের ঘরে কী করছে।
আমি বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে দিদুনের সঙ্গেই কথা বলছে। আর মা আমার দিকে একবার তাকিয়েই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
ভাবলাম, না, মা তো সেই রেগেই আছে। আমি মায়ের চোখ দেখলেই সব বুঝতে পারি। তার সঙ্গে মায়ের নাকের ডগায় লেগে থাকা লালচে আভার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি।
তাই ভাবলাম, না ভাই ,দরকার নেই।
নিজের ঘরে ঢুকে কম্পিউটারের চেয়ারটাতে বসে ছিলাম।
আর আমার সি পি ইউ ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, মায়ের জন্মদিনে আমার দেওয়া সেই ছোট্ট শোপিসটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
শোপিসটার গায়ে লেখা—
“My Heart Beats Only For You.”
অনেকক্ষণ ধরে শুধু ওই লেখাটার দিকেই চোখ বোলাচ্ছিলাম।
আর মনে পড়ে যাচ্ছিল, মায়ের সঙ্গে কাটানো হাসি-মজার দিনগুলোর কথা।
আর ভাবছিলাম, মা বোধহয় এটাও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। সঙ্গে করে নিয়ে যাবে না।
মায়ের হার্ট আর আমার জন্য বিটস করবে না, তাই!
যা নচ্ছার ছেলের ভুল করে জন্ম দিয়ে ফেলেছে মা । সেটাই স্বাভাবিক!
দিদুনের ডাকে রাতের খাবার খেতে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলাম। আমি খাবার খেতে গিয়ে ,আমার উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়েছিলাম।
কিন্তু মা, আমার দিকে মুখ তুলে একটি বারের জন্যেও তাকাল-ই না।
আর ভাবছিলাম, ইসস, মায়ের ওই চেয়ারটা আবার সেই আগের মতোই ফাঁকা হয়ে যাবে । মায়ের চেয়ারটাতে আবার আগের মতোই ধুলো জমতে শুরু করবে।
কিছুদিন আগে মজা করে টেবিলের তলায় ঢুকে গিয়ে মায়ের সঙ্গে মজা করেছিলাম।
আর সেই মজা করার মানুষটাই আমার থেকে দূরে চলে যাবে । আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম।
আমি সেদিন খাটে বসেই পড়ছিলাম। আর মায়ের জন্য মন খারাপ করছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর, রাতের দিকে দরজার দিক থেকে আলতো একটা শব্দ হলো।
দরজার দিকে আমার তাকানোর প্রয়োজনই হলো না। মায়ের গায়ের পরিচিত সুবাসের অনুভূতিতেই টের পেয়েছিলাম,দরজার সামনে মা দাঁড়িয়ে আছে।
মা আমার ঘরে এসে, খুব ধীর শান্ত ভাবে ,খাটের কোনায় চুপ করেই বসেছিল,মাথা নিচু করে।মায়ের হাতে ছিল ল্যাপটপ আর মোবাইল।
মা আমার দিকে চোখে চোখ রেখে তাকাচ্ছিল না আর।
মা ল্যাপটপটা খাটের উপরে আস্তে করে রাখল। মা কেমন যেন নিজে নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গেছিল সেদিন।
হয়তো মা ও আমার মধ্যে, সেদিন দুপুর বেলায় ঘটে যাওয়া,আকস্মিক শারীরিক সম্পর্কটার ভয় ,লজ্জা আর পাপবোধের বিবেকের দংশন কাজ করছিল মায়ের মনের গভীরে।
তাই মা এতটা চুপ ছিল । তাই মা সেদিন ছিল শান্ত।
আমি শুধু কম্পিউটার ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, শোপিসটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে মাকে বলেছিলাম ,
—"ওটা নিয়ে যাবে না মা ?"
—"তোমার সঙ্গে করে!"
—"আমি যে তোমাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম ওটা। "
মা মাথা নিচু করেই খুব ধীরে মাথা দোলাল। অসম্মতি প্রকাশ করল শুধু। মুখে কিছুই বলল না।
আমিও মাথাটা নিচু করলাম। সেদিন আমার খুব খারাপ লাগছিল।
এটা ভেবেই মা চলে যাবে, সে নয় যাক! বুঝলাম। চলে যাক !
মা আমার দেওয়া জন্মদিনের উপহারটাও আমাকেই ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। বেশ ,ঠিক আছে ,সেটাও না হয় মেনে নিলাম।
আসলে , আমি কি আদৌ মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য সন্তান ? মানে, যোগ্য কাজ করেছি কি কিছু?
তারপর ভাবলাম, না! করিনি তো। একদমই করিনি।
তাই মাকে ছোঁয়ার অধিকারও আমার নেই। মাকে কিচ্ছু বলার অধিকার ও আমার নেই।
এটাই হয়তো আমার যোগ্য শাস্তি।
তাই মাথা নিচু করেই মাকে সেদিন একটাই কথা বলেছিলাম,
— “মা, পারলে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও!”


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)