Yesterday, 03:48 PM
১১(ক)— জানি এ ভুল !
সেদিন গোটা কতক সিগারেট টেনে, মনমরা হয়ে বাইকে করে রাস্তার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । কোথায় যাচ্ছি, কেনই বা যাচ্ছি, সেসবের কোনো হিসেব ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে কয়েক পেগ মদ যদি গলায় ঢালা যায়, তবে হয়তো বুকের ভেতর জমে থাকা অশান্তিটুকু কিছুটা সময়ের জন্যে ভুলে থাকা যাবে।
বাড়িতে অশান্তি, মা কে রাগের মাথায়, যা তা বলে ফেলেছি , মা আমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা , মা আমার সাথে আর কথাই বলবে না।
সে আমি খুব ভালো করেই মাকে চিনি । বেকার বেকার ভাল মা টাকে আবার রাগিয়ে দিলাম। মুখে যা নয় তাই বলে ফেললাম। ছি ছি !
এদিকে আবার কলেজের সেমিস্টার, তার সঙ্গে সামনে রয়েছে আবার কম্পিটিটিভ এক্সাম , আবার বিদেশে পড়তে যাওয়ার চিন্তা।
সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গিয়েছিল। তার ওপর মা-ও চলে যাবে আমাকে ছেড়ে। অশান্তি তো যা করার করেই ফেললাম আমি ।
মা, তুমিও আমাকে ভুল বুঝলে,তাই না !
আমি তো তোমাকেই কাছে পেতে চেয়েছিলাম !
আমি তো তোমাকেই সব চাইতে বেশি ভালোবাসি ,প্রেম করতে চেয়েছিলাম তোমারই সাথে ।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন। আমার ভেতরের অশান্তিটুকু কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। একরাশ অভিমান জমে ছিল মায়ের প্রতি।
বুকের ভেতরটা তখন কেমন হুহু করে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সত্যিই আমার কেউ নেই। যে আমাকে আপন করে, নিজের করে, নিঃশব্দে এসে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে,
'আমি তোর সাথে আছি।' এ দুনিয়ায় সবাই বড় স্বার্থপর। স্বার্থপরের দুনিয়া এটা। মা তুমিও স্বার্থপর! তুমি যে মা। আর আমার মা, আমারই কাছে কিভাবে স্বার্থপর হতে পারে?
তুমি চলে যাচ্ছ মা , আর আমার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে যে ।
অথচ, পৃথিবীতে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি,সেই মাকেই , আমি খারাপ কথা বলে ফেললাম!
আমি একটা অপদার্থ ছেলে। ছোটলোক ছেলে আমি একটা।
মা তো আমাকে ঠিক কথাই বলেছে, সভ্য, ভদ্র ছেলে আমি কিছুই হতে পারিনি।
আমার সেদিন নিজের মনের মধ্যে অনুশোচনা হচ্ছিল। আর ,আরেকটা জিনিস মাথায় ঘুরছিল। সেটা হল ভাস্কর আঙ্কেল।
শালা, যে লোকটার প্রতি আমার এতো রাগ ,ক্ষোভ ,প্রথমত সেই লোকটা সেটা জানেই না।
আর ,দ্বিতীয়ত ,আমি যে লোকটার সাথে নিজেকে তুলনা করছি ,ওই লোকটার আমি বালের যোগ্যও হতে পারবো না কোনোদিন। আর এটাই বাস্তব।
তাহলে মা আমাকে কেন ভালোবাসতে যাবে। ভাস্কর আঙ্কেলকে ছেড়ে। সিম্পল একদম সোজা ব্যাপার। আর মা ঠিক সির্দ্ধান্তই নিয়েছে।
আল বাল চিন্তা আমার মাথাতেই আসবে এই সব।
ভাবতে ভাবতেই কখন যে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল , টেরই পাইনি। বাইকটা ছুটে চলছিল নিজের গতিতে, আর চোখের জলে সামনের রাস্তাটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
হাতের মুঠোটা হ্যান্ডেলের ওপর আরও শক্ত হয়ে উঠছিল, অথচ বুকের ভেতরটা তখন কেবলই গুমরে গুমরে কাঁদছিল ।
আমার অশ্রুজলে বারবার ভেসে উঠছিল মায়ের মুখের প্রতিচ্ছবি।
মমতাময়ী সেই মায়ের স্নিগ্ধ, পবিত্র মুখটা যতবারই মনে পড়ছিল, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠছিল।
মনে হচ্ছিল, মাকে আমি কতটা কষ্ট দিয়েছি, আর সেই অপরাধবোধের ভারে আমার চোখের জল যেন কিছুতেই থামছিল না।
আর তাই সেদিন প্রতি মুহূর্তে ,কান্না ভেজা চোখে ,বুকে জমা একরাশ দুঃখ ,বেদনা নিয়ে সেই নির্মল,মায়ামাখা মায়ের মুখটাই ভেসে উঠছিল চোখের সামনে।
মা... তুমি আমাকে চড় মারলে! লাগেনি মা ,আমার লাগেনি। মা, তুমি কোনোদিন আমার গায়ে একটা আঁচড়ও কাটনি ছোট্ট বেলা থেকেই।
অথচ আজ ,আমি এতটাই ছোটোলোক ,এতটাই নিচ , ইতর হয়ে গেছি মা ,আমি তোমার কাছে। আমি তোমার সম্পর্কে নোংরা নোংরা কথাগুলো বলে ফেললাম।
তাই তুমি আমাকে চড় মারলে মা ! গায়ে হাত তুললে আমার তুমি ।
আমারই ভুল! আমি মায়ের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কখনোই না। কিন্তু কেন যে এই ভুল প্রশ্নগুলো আমি মাকেই করে ফেলি, সে ভগবানই জানে।
মাকে বোধহয় আমি অন্ধের মতোই বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। আর যে ভালোবাসার কোনো মানেই নেই। মাকে আমি মায়ের মতো ভালোবাসতে গিয়ে আরও কিছুটা অন্যরকম ভাবে ভালোবেসে ফেলেছি।
আর যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
নিজের প্রতি নিজেরই ,রাগ, অভিমান আর কষ্ট সব কিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথাটা এলোমেলো করে দিচ্ছিল আমার।
এইসব চিন্তাই করছিলাম সেদিন। রাস্তার ট্রাফিকের সামনে লাল আলোর সিগনাল টা জ্বলে উঠতেই বাইকটা থামিয়ে দিলাম। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইলাম বাইকে ।
মনে হলো, না... আগে একটা বারে যাই। বসে মদ গিলি ।মাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। মাকে আর আমি কষ্ট দেব না কোনোদিন।
এই অসহ্য যন্ত্রণা, এই অপরাধবোধ, এই নিজের কাছেই নিজের ছোট হয়ে যাওয়ার অনুভূতিকে পিছনে ফেলে , সবকিছু থেকে দূরে, বহু দূরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল আমার সেদিন।
বাইকটা ঘুরিয়ে নেব ভেবেছিলাম । ঠিক তখনই পকেটের ভেতর মোবাইলটা বেজে উঠল।
বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখি বাবার ফোন!
কয়েক সেকেন্ড যেন স্থির হয়ে গেলাম ।
বাবার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। কী সব প্রসেসিং-ট্রসেসিং নিয়ে কথা বলছিল কে জানে , আমিও তখন হুম-হাঁ করে সেসব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম।
সত্যি বলতে কি ,বাবা কড়া ভারী গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে কী বলছিল সেদিন আর আমি কী উত্তর দিচ্ছিলাম , কিছুই তখন মাথায় ঢুকছিল না আমার ।
বাবার সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় দেখলাম দিদুন ও ফোন করছে।
মনে মনে ভাবলাম ,মায়ের ফোনটা তো আমি ভেঙে ফেলেছি,তাই দিদুনের মোবাইল থেকে মা ফোনটা করছে।
বাবার ফোন কাটতে না কাটতেই, দিদুনের কলটা রিসিভড করতেই, মায়ের গম্ভীর নাকি নাকি গলার স্বরে, কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এল কানে,
— "এই মুহূর্তের মধ্যে যেখানে আছিস, যেভাবে আছিস, ঘরে আগে আসবি তুই। আমি বলে দিচ্ছি, ঘরে আসবি তুই কিন্তু এক্ষুনি ।
আমি চুপ করে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলাম রাস্তার ধারে । মা যাতে আমার কান্নার শব্দ শুনতে না পায়, তাই মোবাইলটা মিউট করে দিয়েছিলাম ।
— " বুবু, তুই কিন্তু বাড়িতে ঢোক, বলে দিচ্ছি কিন্তু আমি ।"
— " আচ্ছা , কথা বলবি না তো তুই, তাই তো।"
— " তাহলে দেখ এবার!"
— " আমি গায়ে আগুন লাগিয়ে নিচ্ছি এক্ষুনি, শান্তি পাবি তো তুই!"
আমি সাথে সাথেই মোবাইলটা আনমিউট করে রাস্তার মাঝে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললাম,
— "না মা, আমি আসছি, এক্ষুনি আসছি মা আমি তোমার কাছে। তুমি কিচ্ছু করোনা মা প্লিজ।"
— "সরি, মা সরি!"
আমি ফোনের ঐপাশ থেকে শুনতে পেলাম মায়ের কান্নার শব্দ। আমিও ফোন ধরে কাঁদছি মায়ের সাথেই । তারপর বেশ কিছুক্ষন মা আমি দুজনেই কাঁদছিলাম। কেউ কোনো কথা বলছিলাম না কারুর সাথেই ।
অবশ্য , কথা বলার মতো পরিস্থিতিতেও ছিলাম না আমরা কেউ তখন।
ফ্ল্যাটে ঢুকেই দিদুন দরজাটা খুলল, দিদুন আমার সাথে আর কোনো কথাই বলছিল না। ঘরের মধ্যে শান্ত শীতল থমথমে পরিবেশ।
মাকে খুঁজছিলাম তখন । বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দেখলাম ,মা দিদুনের ঘরের খাটে চুপ চাপ বসে আছে।
আমি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গেলাম দিদুনের ঘরের দিকে। মা গোমড়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
দেখলাম মায়ের চোখ-মুখ সব লাল হয়ে ফুলে উঠেছে কাঁদতে কাঁদতে । আর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে । আমি মায়ের পাশে আস্তে করে বসলাম। চুপটি করেই।
খাটের উপরে রাখা মায়ের মোবাইল টা হাতে তুলে দেখলাম , মোবাইল স্ক্রিন ড্যামেজ। মা ঝপ করে আমার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল।
মাথা নিচু করেই মায়ের হাতটা আস্তে করে চেপে ধরলাম খাটের উপরেই । মা আমার হাতটা সরিয়ে নিল।
আমি মাথা তুলে মায়ের অশ্রুসজল, মায়ামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলাম না। বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল সেদিন।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম ,কিন্তু মা আমাকে সেদিন বলেছিল ,
— “ছুঁবি না আমাকে তুই ! জানোয়ার! আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা তুই ! ”
আমি মায়ের সেই রক্ত জবার মতো লাল টকটকে বিস্ফরিত চোখের হুঙ্কারের গর্জনে ভয় পেয়ে খাট থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করে ফেললাম, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। মায়ের চোখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। আমারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছিল সেদিন।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করেই ,মৃদু স্বরে মাকে সেদিন বলেছিলাম,
— “ সরি মা !"
আর আমি এটাও জানতাম, মাকে যা যা বাজে বাজে কথা গুলো বলেছি ,যেটা আমার মা মোটেও নয়। আর মায়ের যে আমার এই সরি বলাতে, কোনো কাজই হবেনা ,সেটাও আমি খুব ভালো করেই জানতাম।
আর আমি এটাও ভাবলাম ,আমি মায়ের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে গিয়ে ,অনেক অনেক দূরে সরে গেছি !
নিজের ঘরের খাটে এসে, চুপ চাপ বসে ছিলাম। মাথা নিচু করেই !
সেদিন গোটা কতক সিগারেট টেনে, মনমরা হয়ে বাইকে করে রাস্তার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । কোথায় যাচ্ছি, কেনই বা যাচ্ছি, সেসবের কোনো হিসেব ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে কয়েক পেগ মদ যদি গলায় ঢালা যায়, তবে হয়তো বুকের ভেতর জমে থাকা অশান্তিটুকু কিছুটা সময়ের জন্যে ভুলে থাকা যাবে।
বাড়িতে অশান্তি, মা কে রাগের মাথায়, যা তা বলে ফেলেছি , মা আমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা , মা আমার সাথে আর কথাই বলবে না।
সে আমি খুব ভালো করেই মাকে চিনি । বেকার বেকার ভাল মা টাকে আবার রাগিয়ে দিলাম। মুখে যা নয় তাই বলে ফেললাম। ছি ছি !
এদিকে আবার কলেজের সেমিস্টার, তার সঙ্গে সামনে রয়েছে আবার কম্পিটিটিভ এক্সাম , আবার বিদেশে পড়তে যাওয়ার চিন্তা।
সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গিয়েছিল। তার ওপর মা-ও চলে যাবে আমাকে ছেড়ে। অশান্তি তো যা করার করেই ফেললাম আমি ।
মা, তুমিও আমাকে ভুল বুঝলে,তাই না !
আমি তো তোমাকেই কাছে পেতে চেয়েছিলাম !
আমি তো তোমাকেই সব চাইতে বেশি ভালোবাসি ,প্রেম করতে চেয়েছিলাম তোমারই সাথে ।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন। আমার ভেতরের অশান্তিটুকু কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। একরাশ অভিমান জমে ছিল মায়ের প্রতি।
বুকের ভেতরটা তখন কেমন হুহু করে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সত্যিই আমার কেউ নেই। যে আমাকে আপন করে, নিজের করে, নিঃশব্দে এসে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে,
'আমি তোর সাথে আছি।' এ দুনিয়ায় সবাই বড় স্বার্থপর। স্বার্থপরের দুনিয়া এটা। মা তুমিও স্বার্থপর! তুমি যে মা। আর আমার মা, আমারই কাছে কিভাবে স্বার্থপর হতে পারে?
তুমি চলে যাচ্ছ মা , আর আমার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে যে ।
অথচ, পৃথিবীতে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি,সেই মাকেই , আমি খারাপ কথা বলে ফেললাম!
আমি একটা অপদার্থ ছেলে। ছোটলোক ছেলে আমি একটা।
মা তো আমাকে ঠিক কথাই বলেছে, সভ্য, ভদ্র ছেলে আমি কিছুই হতে পারিনি।
আমার সেদিন নিজের মনের মধ্যে অনুশোচনা হচ্ছিল। আর ,আরেকটা জিনিস মাথায় ঘুরছিল। সেটা হল ভাস্কর আঙ্কেল।
শালা, যে লোকটার প্রতি আমার এতো রাগ ,ক্ষোভ ,প্রথমত সেই লোকটা সেটা জানেই না।
আর ,দ্বিতীয়ত ,আমি যে লোকটার সাথে নিজেকে তুলনা করছি ,ওই লোকটার আমি বালের যোগ্যও হতে পারবো না কোনোদিন। আর এটাই বাস্তব।
তাহলে মা আমাকে কেন ভালোবাসতে যাবে। ভাস্কর আঙ্কেলকে ছেড়ে। সিম্পল একদম সোজা ব্যাপার। আর মা ঠিক সির্দ্ধান্তই নিয়েছে।
আল বাল চিন্তা আমার মাথাতেই আসবে এই সব।
ভাবতে ভাবতেই কখন যে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল , টেরই পাইনি। বাইকটা ছুটে চলছিল নিজের গতিতে, আর চোখের জলে সামনের রাস্তাটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
হাতের মুঠোটা হ্যান্ডেলের ওপর আরও শক্ত হয়ে উঠছিল, অথচ বুকের ভেতরটা তখন কেবলই গুমরে গুমরে কাঁদছিল ।
আমার অশ্রুজলে বারবার ভেসে উঠছিল মায়ের মুখের প্রতিচ্ছবি।
মমতাময়ী সেই মায়ের স্নিগ্ধ, পবিত্র মুখটা যতবারই মনে পড়ছিল, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠছিল।
মনে হচ্ছিল, মাকে আমি কতটা কষ্ট দিয়েছি, আর সেই অপরাধবোধের ভারে আমার চোখের জল যেন কিছুতেই থামছিল না।
আর তাই সেদিন প্রতি মুহূর্তে ,কান্না ভেজা চোখে ,বুকে জমা একরাশ দুঃখ ,বেদনা নিয়ে সেই নির্মল,মায়ামাখা মায়ের মুখটাই ভেসে উঠছিল চোখের সামনে।
মা... তুমি আমাকে চড় মারলে! লাগেনি মা ,আমার লাগেনি। মা, তুমি কোনোদিন আমার গায়ে একটা আঁচড়ও কাটনি ছোট্ট বেলা থেকেই।
অথচ আজ ,আমি এতটাই ছোটোলোক ,এতটাই নিচ , ইতর হয়ে গেছি মা ,আমি তোমার কাছে। আমি তোমার সম্পর্কে নোংরা নোংরা কথাগুলো বলে ফেললাম।
তাই তুমি আমাকে চড় মারলে মা ! গায়ে হাত তুললে আমার তুমি ।
আমারই ভুল! আমি মায়ের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কখনোই না। কিন্তু কেন যে এই ভুল প্রশ্নগুলো আমি মাকেই করে ফেলি, সে ভগবানই জানে।
মাকে বোধহয় আমি অন্ধের মতোই বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। আর যে ভালোবাসার কোনো মানেই নেই। মাকে আমি মায়ের মতো ভালোবাসতে গিয়ে আরও কিছুটা অন্যরকম ভাবে ভালোবেসে ফেলেছি।
আর যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
নিজের প্রতি নিজেরই ,রাগ, অভিমান আর কষ্ট সব কিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথাটা এলোমেলো করে দিচ্ছিল আমার।
এইসব চিন্তাই করছিলাম সেদিন। রাস্তার ট্রাফিকের সামনে লাল আলোর সিগনাল টা জ্বলে উঠতেই বাইকটা থামিয়ে দিলাম। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইলাম বাইকে ।
মনে হলো, না... আগে একটা বারে যাই। বসে মদ গিলি ।মাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। মাকে আর আমি কষ্ট দেব না কোনোদিন।
এই অসহ্য যন্ত্রণা, এই অপরাধবোধ, এই নিজের কাছেই নিজের ছোট হয়ে যাওয়ার অনুভূতিকে পিছনে ফেলে , সবকিছু থেকে দূরে, বহু দূরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল আমার সেদিন।
বাইকটা ঘুরিয়ে নেব ভেবেছিলাম । ঠিক তখনই পকেটের ভেতর মোবাইলটা বেজে উঠল।
বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখি বাবার ফোন!
কয়েক সেকেন্ড যেন স্থির হয়ে গেলাম ।
বাবার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। কী সব প্রসেসিং-ট্রসেসিং নিয়ে কথা বলছিল কে জানে , আমিও তখন হুম-হাঁ করে সেসব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম।
সত্যি বলতে কি ,বাবা কড়া ভারী গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে কী বলছিল সেদিন আর আমি কী উত্তর দিচ্ছিলাম , কিছুই তখন মাথায় ঢুকছিল না আমার ।
বাবার সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় দেখলাম দিদুন ও ফোন করছে।
মনে মনে ভাবলাম ,মায়ের ফোনটা তো আমি ভেঙে ফেলেছি,তাই দিদুনের মোবাইল থেকে মা ফোনটা করছে।
বাবার ফোন কাটতে না কাটতেই, দিদুনের কলটা রিসিভড করতেই, মায়ের গম্ভীর নাকি নাকি গলার স্বরে, কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এল কানে,
— "এই মুহূর্তের মধ্যে যেখানে আছিস, যেভাবে আছিস, ঘরে আগে আসবি তুই। আমি বলে দিচ্ছি, ঘরে আসবি তুই কিন্তু এক্ষুনি ।
আমি চুপ করে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলাম রাস্তার ধারে । মা যাতে আমার কান্নার শব্দ শুনতে না পায়, তাই মোবাইলটা মিউট করে দিয়েছিলাম ।
— " বুবু, তুই কিন্তু বাড়িতে ঢোক, বলে দিচ্ছি কিন্তু আমি ।"
— " আচ্ছা , কথা বলবি না তো তুই, তাই তো।"
— " তাহলে দেখ এবার!"
— " আমি গায়ে আগুন লাগিয়ে নিচ্ছি এক্ষুনি, শান্তি পাবি তো তুই!"
আমি সাথে সাথেই মোবাইলটা আনমিউট করে রাস্তার মাঝে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললাম,
— "না মা, আমি আসছি, এক্ষুনি আসছি মা আমি তোমার কাছে। তুমি কিচ্ছু করোনা মা প্লিজ।"
— "সরি, মা সরি!"
আমি ফোনের ঐপাশ থেকে শুনতে পেলাম মায়ের কান্নার শব্দ। আমিও ফোন ধরে কাঁদছি মায়ের সাথেই । তারপর বেশ কিছুক্ষন মা আমি দুজনেই কাঁদছিলাম। কেউ কোনো কথা বলছিলাম না কারুর সাথেই ।
অবশ্য , কথা বলার মতো পরিস্থিতিতেও ছিলাম না আমরা কেউ তখন।
ফ্ল্যাটে ঢুকেই দিদুন দরজাটা খুলল, দিদুন আমার সাথে আর কোনো কথাই বলছিল না। ঘরের মধ্যে শান্ত শীতল থমথমে পরিবেশ।
মাকে খুঁজছিলাম তখন । বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দেখলাম ,মা দিদুনের ঘরের খাটে চুপ চাপ বসে আছে।
আমি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গেলাম দিদুনের ঘরের দিকে। মা গোমড়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
দেখলাম মায়ের চোখ-মুখ সব লাল হয়ে ফুলে উঠেছে কাঁদতে কাঁদতে । আর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে । আমি মায়ের পাশে আস্তে করে বসলাম। চুপটি করেই।
খাটের উপরে রাখা মায়ের মোবাইল টা হাতে তুলে দেখলাম , মোবাইল স্ক্রিন ড্যামেজ। মা ঝপ করে আমার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল।
মাথা নিচু করেই মায়ের হাতটা আস্তে করে চেপে ধরলাম খাটের উপরেই । মা আমার হাতটা সরিয়ে নিল।
আমি মাথা তুলে মায়ের অশ্রুসজল, মায়ামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলাম না। বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল সেদিন।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম ,কিন্তু মা আমাকে সেদিন বলেছিল ,
— “ছুঁবি না আমাকে তুই ! জানোয়ার! আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা তুই ! ”
আমি মায়ের সেই রক্ত জবার মতো লাল টকটকে বিস্ফরিত চোখের হুঙ্কারের গর্জনে ভয় পেয়ে খাট থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করে ফেললাম, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। মায়ের চোখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। আমারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছিল সেদিন।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করেই ,মৃদু স্বরে মাকে সেদিন বলেছিলাম,
— “ সরি মা !"
আর আমি এটাও জানতাম, মাকে যা যা বাজে বাজে কথা গুলো বলেছি ,যেটা আমার মা মোটেও নয়। আর মায়ের যে আমার এই সরি বলাতে, কোনো কাজই হবেনা ,সেটাও আমি খুব ভালো করেই জানতাম।
আর আমি এটাও ভাবলাম ,আমি মায়ের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে গিয়ে ,অনেক অনেক দূরে সরে গেছি !
নিজের ঘরের খাটে এসে, চুপ চাপ বসে ছিলাম। মাথা নিচু করেই !


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)