19-09-2026, 10:40 PM
৫৬।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনগুলো কেমন যেন নিঃশব্দে পিছলে যায়। বর্ষাকালের মেঘলা আকাশ যখন রাজধানীর মাথার ওপর ডানা মেলে ধরে, তখন সময়ের গতিবিধি নির্ধারণ করা বড্ড কঠিন হয়ে পড়ে। ধানমন্ডির সাত তলার প্রশস্ত ফ্ল্যাটের কাঁচের জানালায় বৃষ্টির জলের ফোঁটাগুলো অবিরাম আছড়ে পড়ছে। কাঁচের ওপারে ঝাপসা হয়ে যাওয়া শহরের রূপরেখা। এই চার দেয়ালের ভেতর জীবনের চাকা ঘুরছিল নির্দিষ্ট নিয়মে। সকালের নাশতা, ল্যাপটপের নীল আলোয় আন্তর্জাতিক খবরের তর্জমা, সন্ধ্যায় ফিরে আসা, ভালোবাসার বুনো উচ্ছ্বাস, অলস দ্বিপ্রহরের আলাপচারিতা। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে অন্ধকারে পাশাপাশি বসে থাকা।
বাইরে যখন আষাঢ়ের অবিরাম বর্ষণ, তখন এই বিলাসবহুল আবাসে কৃত্রিম উষ্ণতার ফুল ফুটছিল। দিনগুলো কাটছিল ঘোরলাগা অলীক স্বপ্নের মতো। শরীরের আদিম খিদে মেটানোর পর যে নির্লিপ্ত মায়া জন্ম নেয়, সেই মায়ায় আমরা দুজন জড়িয়ে পড়েছিলাম।
আজ মাসের শুরুর দিক। আমার মুঠোফোনে একটা মৃদু টুং শব্দ হলো। স্ক্রিন অন করতেই দেখলাম, বেতনের পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। টাকার অঙ্কটা খুব বড় কিছু নয়, তবে মধ্যবিত্তের মাসের প্রথম দিকের আনন্দটুকু নিখাদ। আনিকা তখন ডাইনিং টেবিলের মেহগনি কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলেন। পরনে ছিল ফিরোজা রঙের ঢিলেঢালা সুতির বাটিকের সালোয়ার-কামিজ। ওড়নাটা অবহেলায় পিঠের পেছনে ফেলা। চুলগুলো ভিজে ছিল, হয়তো কিছুক্ষণ পূর্বে স্নান সেরেছেন। উনার ফর্সা গলার কাছে জমে থাকা জলের ফোঁটাগুলো সিলিংয়ের স্পটলাইটের আলোয় মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করছিল। চোখে কোনো প্রসাধন নেই, অথচ সেই সাদামাটা চেহারার ধার যেন কোনো ধারালো ছুরির চেয়ে কম নয়।
আমি কফির টেবিলের ওপাশে কাঠের শক্ত চেয়ারটায় বসলাম। আমার গায়ে তখন ধূসর রঙের সুতির গোলগলার গেঞ্জি আর কালো সুতির প্যান্ট।
"আনিকা," আমি ডাকলাম।
উনি কফির মগ নামিয়ে রেখে বাদামি চোখের শান্ত দৃষ্টি তুলে তাকালেন। "বলো রাশেদ।"
"আজকের সান্ধ্যভোজ আমার দায়িত্বে। জুলাইয়ের বেতন পেয়েছি। আজ বাইরে কোথাও ভালো জায়গায় নিয়ে গিয়ে তোমাকে পেটপুরে খাওয়াব। বলো, কোথায় যেতে চাও?"
আনিকার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির ঝলক দেখা গেল। সেই পরিচিত রহস্যময় হাসি। উনি উনার দুই হাতের আঙুলগুলো চিবুকের নিচে জড়ো করলেন। "আমার অনুবাদক সাহেব আজ বেশ বড়লোক হয়ে গেছেন দেখছি! কোথায় খাওয়াবে? নীলক্ষেতের কাচ্চি নাকি কারওয়ান বাজারের তেহারি?"
"মধ্যবিত্তের আতিথেয়তাকে এত তাচ্ছিল্য করতে নেই," আমি কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বললাম। "তুমি যেখানে বলবে, সেখানেই যাব। ঢাকা শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জায়গার নাম বলো, আজ সেখানেই হাজির হব।"
আনিকা কিছুক্ষণ ভাবলেন। জানালার বাইরে জমে ওঠা মেঘের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, "গুলশান দুই নম্বরের দিকে নতুন লাউঞ্জ রেস্তোরাঁ খুলেছে। নাম 'দ্য ভেলভেট ড্রিম'। শুনেছি ছাদের ওপর কাঁচঘেরা খোলা জায়গা আছে, পরিবেশটা বেশ নির্জন। সেখানে যাবে?"
"তথাস্তু। তুমি প্রস্তুত হয়ে নাও। আজ রাতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।"
________________________________________
মাস্টার বেডরুমের ভেতরটা বেশ খোলামেলা। মেঝেজুড়ে হালকা বাদামি রঙের বিদেশি কার্পেট পাতা। দেওয়ালের রং চাপা সাদা। একপাশে বিশাল সেগুন কাঠের তৈরি ওয়্যারড্রব, অন্যপাশে মেহগনি ফ্রেমের পেল্লায় ড্রেসিং টেবিল। ড্রেসিং টেবিলের চারপাশে ছোট ছোট এলইডি বাতি বসানো, নাটকের গ্রিনরুমের মতো। ঘরের মাঝখানে সেই সুবিশাল রাজকীয় খাট, যার গদির নরম তুলতুলে ভাবটা সারা দিনের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে শুষে নিতে পারে। খাটের মাথার কাছে দেওয়ালে টাঙানো আধুনিক বিমূর্ত ধারার তৈলচিত্র।
আনিকা আলমারির পাল্লা খুলে দাঁড়ালেন। কাপড়ের হ্যাঙ্গারগুলো একে একে সরাতে লাগলেন। উনার নগ্ন পিঠের খাঁজ আর সুডৌল কাঁধের পেশিগুলো নড়াচড়ার সাথে সাথে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। আমি গেস্টরুমে গিয়ে নিজের প্রস্তুতি সারলাম। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা জলে শরীর ধুয়ে নিলাম। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ে পরলাম গাঢ় চারকোল রঙের ফুলহাতা ফর্মাল শার্ট। কলারটা শক্ত, কাপড়ের বুনন নিখুঁত। এর সাথে পরলাম ছাই রঙের গ্যাবার্ডিন ট্রাউজার। পায়ে চকচকে কালো চামড়ার ফিতে-বাঁধা জুতো। কবজিতে পরলাম বাবার দেওয়া সেই পুরোনো ঘড়িটা। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো, ছাপোষা অনুবাদক রাশেদ যেন কর্পোরেট দুনিয়ার কোনো সফল নির্বাহীর রূপ ধারণ করেছে।
আমি মাস্টার বেডরুমে ফিরে আসতেই থমকে দাঁড়ালাম। আনিকার রূপের পরিবর্তন দেখে আমার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। উনি পরেছেন গভীর মধ্যরাতের নীল রঙের সিল্কের স্লিভলেস গাউন। গাউনের কাপড়টা অত্যন্ত মসৃণ, পিচ্ছিল এবং চকচকে। গলার নকশাটা ভি-আকৃতির, যা উনার কলারবোনের ফর্সা সৌন্দর্য এবং বক্ষদেশের আকর্ষণীয় বিভাজিকা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। কোমর পর্যন্ত কাপড়টা শরীরের সাথে এমনভাবে সেঁটে আছে যে উনার ছত্রিশ-আটাশ-ছত্রিশ মাপের দৈহিক গঠনটা এক জ্যান্ত স্থাপত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোমর থেকে নিচের অংশটা ফ্লোর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো সিল্কের মতো নেমে গেছে।
উনার পিঠের প্রায় অর্ধেক অংশ উন্মুক্ত। ফর্সা ত্বকের ওপর আলো পড়ে যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল। চুলগুলো পরিপাটি করে খোঁপা করে বাঁধা, কাঁধের ওপর দু-গাছি অবাধ্য চুল ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া। গলায় সরু প্ল্যাটিনামের চেইন, যাতে লকেটের বদলে ঝুলছে ছোট্ট নীলকান্তমণি। ঠোঁটে গাঢ় মেরুন লিপস্টিক, চোখে নিখুঁত কাজলের রেখা।
উনার সারা শরীর থেকে ভেসে আসছে অত্যন্ত দামি ফরাসি সুবাস। এই সুবাসে কামনার চেয়ে আভিজাত্যের ভার অনেক বেশি। পায়ে উঁচুতলার সরু হিলের কালো জুতো। আনিকা ঘুরে দাঁড়ালেন। পার্সটা হাতে নিয়ে মুচকি হাসলেন। "কী দেখছ অমন হা করে?"
আমি গলা পরিষ্কার করলাম। "ভাবছি, গুলশানের ওই বিলাসী লাউঞ্জে তোমাকে নিয়ে ঢুকলে সেখানকার বাতিগুলোর ঔজ্জ্বল্য কমে যাবে। সব আলো তোমার রূপের কাছে ম্লান হয়ে যাবে।"
"চাটুকারিতা ভালোই রপ্ত করেছ অনুবাদক সাহেব," উনি হাসলেন। উনার মুক্তোর মতো দাঁতগুলো চিকচিক করে উঠল। "চলো, গাড়ি হয়তো নিচে এসে গেছে।"
________________________________________
আমরা নিচে নেমে উবারে উঠলাম। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। সোডিয়ামের আলোয় ভেজা পিচের রাস্তা চকচক করছে। ধানমন্ডি থেকে ফার্মগেট, জাহাঙ্গীর গেট হয়ে গাড়ি যখন গুলশানের দিকে ছুটছিল, জানালার কাঁচের গায়ে বৃষ্টির ধারা নকশা তৈরি করছিল। গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মৃদু ঠান্ডায় আনিকার শরীর থেকে ভেসে আসা সুবাস আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখছিল।
রাত পৌনে নটার দিকে গাড়ি থামল গুলশান দুইয়ের এক অভিজাত বাণিজ্যিক ভবনের নিচে। ভবনের লিফটে উঠে আমরা বারো তলায় পৌঁছালাম। লিফটের দরজা খুলতেই কানে ভেসে এল মৃদু স্যাক্সোফোনের জ্যাজ সুর।
লাউঞ্জটির নাম 'দ্য ভেলভেট ড্রিম'। ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো ঢাকার কোলাহল ছেড়ে অন্য কোনো দেশের বিলাসবহুল কোনো সরাইখানায় ঢুকে পড়েছি। পুরো রেস্তোরাঁটি সাজানো হয়েছে গাঢ় লাল এবং সোনালি থিমে। মেঝেজুড়ে ঘন কালো রঙের কাঠের পলিশ করা পাটাতন। সিলিং থেকে ঝুলছে আধুনিক জ্যামিতিক নকশার ঝাড়বাতি, যার থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে মৃদু সোনালি ও লালচে আলো।
বসার জায়গাগুলো অত্যন্ত রাজকীয়। পুরু ভেলভেটের কুশন দেওয়া সোফা, মেহগনি কাঠের ভারী টেবিল। টেবিলের ওপর ছোট কাঁচের পাত্রে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছে। রেস্তোরাঁর উত্তর পাশের পুরো দেওয়ালটাই মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত স্বচ্ছ কাঁচের। সেই কাঁচ দিয়ে দেখা যায় বৃষ্টির জলে ভেজা গুলশান লেক এবং বহুতল ভবনের আলোর খেলা। হালকা শীতল আবহাওয়ায় কফির রোস্ট করা সুবাস আর গ্রিলড মাংসের সুঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।
আমাদের জন্য পূর্বেই বুক করা ছিল কাঁচের দেওয়ালের ধারের শান্ত টেবিলখানা। ওয়েটার এসে বিনীতভাবে মেনু কার্ড এগিয়ে দিল। কালো চামড়ায় মোড়ানো মেনু। আনিকা কার্ডটা খুলে চোখ বোলালেন।
"তুমি কী খাবে রাশেদ?"
"তোমার পছন্দই আমার পছন্দ। অর্ডার তুমিই দাও।"
আনিকা ওয়েটারকে ডেকে ইংরেজিতে নিখুঁত উচ্চারণে অর্ডার করলেন— দুটো রোস্টেড ল্যাম্ব চপ, সাথে ম্যাশড পটেটো এবং সঁতে করা তাজা সবজি। স্টার্টার হিসেবে সিজার সালাদ আর পানীয় হিসেবে ক্র্যানবেরির স্পার্কলিং মকটেল।
ওয়েটার মাথা ঝুঁকিয়ে চলে গেল। টেবিলের মোমবাতির শিখাটা মৃদু বাতাসে দুলছিল। সেই আলোর ছায়া পড়ছিল আনিকার মুখের ওপর। উনার নীল সিল্কের গাউনের ওপর আলোর খেলা চলছিল।
আমি উনার চোখের দিকে তাকালাম। এত রূপ, এত মোহনীয়তা, কিন্তু সেই চোখের গভীরে কোথাও জমে আছে অদ্ভুত বিষাদ।
খাবার আসার পূর্বে আমাদের সামনে দুটি স্ফটিকের গ্লাসে লালচে রঙের পানীয় রাখা হলো। আনিকা গ্লাসটা হাতে তুলে নিলেন। বরফের টুকরোগুলো মৃদু ঠুনঠুন শব্দ তুলল। উনি সামান্য চুমুক দিয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। উনার দৃষ্টি জানালার ওপারে ছুটে চলা বৃষ্টির ধারায় আটকে রইল।
হঠাৎ উনি আমার দিকে মুখ ফেরালেন। চোখের দৃষ্টি খুব গভীর, তীক্ষ্ণ।
"আমায় নিয়ে কী ভাবছ রাশেদ?"
প্রশ্নটা খুব শান্তভাবে করা হলো, কিন্তু এর ওজন ছিল পাহাড়ের মতো ভারী। রেস্তোরাঁর মৃদু জ্যাজ সুর যেন নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি প্রস্তুত ছিলাম না এমন সরাসরি আক্রমণের জন্য। আমি কাঁধের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকলাম।
"কী ভাবব আনিকা? ভাবার তো অনেক কিছু আছে, আবার কিছুই নেই।"
"ধাঁধা তৈরি কোরো না," আনিকা উনার গলার স্বর নামিয়ে বললেন। উনার লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁট দুটোতে কাঁপন দেখা দিল। "গত কয়েকটা সপ্তাহ ধরে আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতো বাস করছি। তুমি অফিসে যাচ্ছ, ফিরে আসছ, আমার বিছানায় শুচ্ছ। আমাকে আদর করছ। কিন্তু আমরা দুজনই জানি, এই জীবনের মেয়াদ খুব সামান্য। আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎটা কী?"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার মুখ, মায়ের অসুস্থ শরীর, নওগাঁর জিলা কলেজের স্মৃতি, আর আমার পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার সীমিত বাস্তবতা। "আনিকা," আমি খুব মেপে মেপে শব্দ চয়ন করলাম, "আমরা যে পথে হাঁটছি, এই পথের কোনো অফিশিয়াল ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। আমরা তো সমাজের সমস্ত ছক ভেঙে ফেলেছি। তুমি লন্ডনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, রূপবতী, বুদ্ধিমতী। আর আমি ঢাকার মেসে বাস করা মামুলি কেরানি গোছের অনুবাদক। তুমি নিজেই জানো, আমাদের মিলনের শুরুটা হয়েছিল কেবল জৈবিক তাড়না আর প্রতিশোধের তৃষ্ণা থেকে। সেখানে ভালোবাসা ছিল কি না, তা আমার জানা নেই।"
"ভালোবাসা নেই?" আনিকা একটু ঝাঁঝালো গলায় বললেন। উনার হাতখানা টেবিলের ওপর আমার হাতের ওপর এসে বসল। রেশমের মতো মসৃণ, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শ। "তুমি কি মনে করো আমি কেবল শরীর পাওয়ার জন্য তোমার মতো সাধারণ ছেলেকে আমার ফ্ল্যাটে জায়গা দিয়েছি? আমি চাইলে লন্ডনের অভিজাত মহলে বা ঢাকার বড়লোক পাড়ায় শত শত পুরুষকে আঙুলের ডগায় নাচাতে পারতাম। কিন্তু আমি তোমার চোখে সততা দেখেছি রাশেদ। তোমার আদরে পুরুষালি দখলদারি থাকলেও কোনো নোংরামি ছিল না। তোমাকে বিবাহ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।"
বিবাহ!
শব্দটা আমার কানের পর্দায় শিসের মতো বিঁধল। আনিকা নাওহার আমাকে বিয়ে করতে চান! "তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
"হ্যাঁ, মানসিক দিক থেকে আমি রাজি," আনিকা চোখ নামিয়ে নিলেন। উনার গলার স্বরে একরাশ ক্লান্তি। "কিন্তু বাস্তব বড় নিষ্ঠুর রাশেদ। বেলালের সাথে আমার সংসার ভেঙে যাওয়ার পর, ওরকম একটা পৈশাচিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার পর, বিবাহ নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আমার সমস্ত বিশ্বাস সমূলে নষ্ট হয়ে গেছে। আই হেট দ্য ইনস্টিটিউশন অফ ম্যারেজ। আইন, সমাজ, কাজী অফিস, চারপাশের মানুষের চোখ— এই শৃঙ্খলে আমি আর নিজেকে জড়াতে চাই না। কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় গলায় ফাঁস লেগে যাচ্ছে।"
ওয়েটার খাবার নিয়ে এল। ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি ল্যাম্ব চপ, পরিপাটি করে সাজানো প্লেট। উনি খাবার রেখে সন্তর্পণে সরে গেলেন। আমরা কেউ খাবারের দিকে হাত বাড়ালাম না। প্লেটের উত্তাপ বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল।
আনিকা বলতে থাকলেন, "আমি স্বাধীন থাকতে চাই রাশেদ। কিন্তু একই সাথে আমি স্বার্থপরের মতো তোমাকে সারাজীবন এভাবে ঝুলিয়ে রাখতে পারি না। তুমি যুবাপুরুষ। তোমার পেছনে সমাজ আছে, পরিবার আছে। তুমি সারাজীবন আমার ছায়ায় এভাবে আইনি স্বীকৃতি ছাড়া পড়ে থাকবে, এটা দেখতেও আমার ভালো লাগবে না। লোকে তোমাকে আমার গৃহপালিত পুরুষ ভাববে। তোমার পুরুষালি আত্মমর্যাদা ধুলোয় মিশে যাবে।"
আমি কাঁটাচামচটা হাতে তুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। মধ্যবিত্তের বাস্তবতা যে কত বড় কারাগার, তা আনিকাকে বোঝানো মুশকিল। "তুমি একদম সঠিক কথা বলেছ আনিকা," আমি খুব শান্ত গলায় বললাম। "আমার সামাজিক বাস্তবতা খুব রূঢ়। আমাকে আজ হোক বা কাল, সামাজিক নিয়ম মেনে সংসার পাততেই হবে। গ্রামের বাড়িতে আমার বৃদ্ধ বাবা আছেন। তিনি মুদি দোকান চালিয়ে আমার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। মা প্রতিবার ফোনে কান্নাকাটি করেন আমার বিয়ের জন্য। তারা চান সাধারণ কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে এসে তাদের সেবা করুক, তাদের সংসারে আলো হয়ে উঠুক। আমি যদি তোমাকে তাদের সামনে নিয়ে যাই, প্রথমত তোমার মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের নারীকে তারা পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে ভয় পাবেন। দ্বিতীয়ত, বেলালের অতীত আর আমাদের সম্পর্কের এই অন্ধকার অধ্যায় যদি কোনোদিন ফাঁস হয়ে যায়, আমার পুরো পরিবার সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না।"
"সমাজ!" আনিকা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "যেই সমাজ মানুষের বিপদে এক ফোঁটা জল দেয় না, সেই সমাজের ভয়ে তোমরা সারাজীবন তটস্থ থাকো।"
"ভয়ে থাকি কারণ আমরা মধ্যবিত্ত," আমি দৃঢ় গলায় বললাম। "তোমাদের মতো কোটিপতিদের জন্য সমাজ কোনো নিয়ম তৈরি করতে পারে না। তোমরা আইন আর সমাজ দুটোকেই টাকা দিয়ে কিনতে পারো। কিন্তু আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য সমাজই আদালত, সমাজই জল্লাদ। আমি আমার পরিবারের সম্মান বিক্রি করতে পারব না আনিকা। তাছাড়া, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। কারও করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকা আমার পৌরুষের পক্ষে অসম্ভব।"
আনিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। উনি উনার কাঁটাচামচ দিয়ে সালাদের বাটি থেকে সামান্য লেটুস মুখে দিলেন। চিবানোর কোনো আগ্রহ নেই।
রেস্তোরাঁর জ্যাজ সঙ্গীত এখন কিছুটা দ্রুত লয়ে বাজছে। বাইরে বৃষ্টির বেগ কমে এসে কাঁচের ওপর বাষ্পের স্তর জমতে শুরু করেছে। আনিকা উনার ব্যাগ থেকে ছোট্ট সিল্কের রুমাল বের করে ঠোঁটের কোণ মুছলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে এখন সম্পূর্ণ এক ব্যবসায়ীর, এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নারীর দৃষ্টি।
"রাশেদ, আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলি।"
আমি সোজা হয়ে বসলাম। "বলো।"
"আমি এই মাসের শেষে লন্ডনে ফিরে যাব।"
খবরটা আমার জানা ছিল, তবুও সরাসরি শুনে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। ক্যালেন্ডারের দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে। আর মাত্র দুটো সপ্তাহ।
"লন্ডনে আমার কোম্পানি ধসে পড়ার মুখে," আনিকা বুঝিয়ে বলতে লাগলেন। "বেলালের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ পুলিশ ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট করেছে। আমাকে কোম্পানি ট্যাক্স, ব্যাংকের অডিট আর পার্টনারদের ঝামেলা মেটাতে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। ওখানে আমার দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য। আমি সব ফেলে এখানে বসে থাকতে পারি না।"
"আমি জানি," আমি ম্লান মুখে বললাম। "তোমার ফিরে যাওয়াই স্বাভাবিক।"
"কিন্তু আমি তোমাকে ফেলে যেতে চাই না," আনিকা টেবিলের ওপর ঝুঁকে এলেন। উনার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। "শোনো রাশেদ, তুমি আমার সাথে লন্ডনে চলো।"
আমি চমকে উঠলাম। "লন্ডন? কীভাবে?"
"আমি জানি, এখনই হুট করে তোমার পক্ষে ইংল্যান্ডের ভিসা পাওয়া অসম্ভব। কাগজপত্র, স্পন্সরশিপ অনেক ঝামেলার কাজ। কিন্তু আমি লন্ডনে গিয়েই প্রসেসিং শুরু করব। আমি আমার আইটি ফার্মের পক্ষ থেকে তোমাকে টেকনিক্যাল রাইটার বা ট্রান্সলেটর হিসেবে স্পনসরশিপ লেটার পাঠাব। তাছাড়া আমার চেনা বড় ইমিগ্রেশন লইয়ার আছেন। পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে তোমার ইউকে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা কমপ্লিট হয়ে যাবে।"
উনার পরিকল্পনার গতি দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই নারী মুহূর্তের মধ্যে গোটা পৃথিবী ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আনিকা থামলেন না, উনি স্বপ্ন বুনে যেতে লাগলেন। "তুমি লন্ডনে চলে আসবে। টেমস নদীর ধারে আমার ফ্ল্যাটে থাকবে। সকালে অফিসে যাবে, বিকেলে আমরা হাইড পার্কে হাঁটব। তোমাকে কোনো মেসের নোংরা পরিবেশে থাকতে হবে না। মিরপুরের বাসে ঝুলতে হবে না। তুমি স্বাধীনভাবে লেখালেখি করবে, সিনেমা দেখবে। তোমার সমস্ত দায়িত্ব, তোমার ক্যারিয়ার, তোমার ভবিষ্যৎ— সব আমি দেখব। তোমার পরিবারকে প্রতি মাসে যত টাকা পাঠানো দরকার, আমি আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পাঠাব। তোমার কোনো অভাব থাকবে না রাশেদ। জাস্ট কাম উইথ মি।"
প্রস্তাবটা কোনো রাজকীয় রূপকথার চেয়ে কম নয়। ঢাকা শহরের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক এই প্রস্তাব পাওয়ার জন্য নিজের সর্বস্ব বাজি রাখতে প্রস্তুত থাকবে। বিদেশের বিলাসী জীবন, রূপবতী ধনবতী নারী, অর্থবিত্তের প্রাচুর্য— সব কিছু আমার পায়ের নিচে থালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
কিন্তু আমার ভেতরের রাশেদ আহমেদ, সেই নওগাঁর মাটির গন্ধ গায়ে মাখা ছেলেটা, যে জিলা কলেজে পড়ার সময় শিখেছিল সততা আর আত্মমর্যাদার পাঠ— সে ভেতর থেকে সজোরে মাথা নাড়ল।
আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। প্লেটের ল্যাম্ব চপটা মুখে দিলাম। মাংসটা অত্যন্ত নরম, মসলাদার। কিন্তু গলার নিচে নামতে গিয়ে আটকে গেল। "না আনিকা," আমি খুব শান্ত কিন্তু পাহাড়ের মতো অবিচল গলায় বললাম। "এটা সম্ভব নয়।"
আনিকা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। উনার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "সম্ভব নয় মানে? তুমি কি বুঝতে পারছ আমি তোমাকে কী অফার করছি? তুমি এই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার কেরানিগিরি ছেড়ে লন্ডনে একটা বিশ্বমানের জীবন পেতে পারো!"
"সেটাই তো সমস্যা আনিকা," আমি মৃদু হাসলাম। একটা বিষাদমাখা হাসি। "তুমি আমাকে যা দিচ্ছ, সেটা একটা রাজকীয় জীবন হতে পারে, কিন্তু সেটা আমার জীবন নয়। সেটা হবে তোমার দয়ায় পাওয়া জীবন।"
"দয়া কেন বলছ? আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে দিচ্ছি!" আনিকার গলায় রাগ আর অভিমানের মিশ্রণ।
"ভালোবাসা আর আশ্রয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে আনিকা," আমি ব্যাখ্যা করতে লাগলাম। "তুমি লন্ডনের রানী। সেখানে তোমার প্রভাব, তোমার বাড়ি, তোমার গাড়ি। আমি সেখানে গিয়ে কী হব? তোমার আশ্রিত এক পরজীবী! তোমার খরচে আমি স্যুট পরব, তোমার দেওয়া অর্থে আমার বাবা-মা চিকিৎসা করাবেন। আমার দিন কাটবে তোমার অনুগ্রহের দিকে তাকিয়ে। তুমি যখন কোনো পার্টিতে তোমার শ্বেতাঙ্গ বা ব্রিটিশ বন্ধুদের সাথে কথা বলবে, আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে কীভাবে? 'এ হলো রাশেদ, বাংলাদেশ থেকে আনা আমার পোষা অনুবাদক'?"
"রাশেদ! হাউ ডেয়ার ইউ!" আনিকা টেবিলের ওপর হাত দিয়ে আঘাত করলেন। উনার প্ল্যাটিনামের চেইনটা নড়ে উঠল। উনার ফর্সা মুখটা রাগে রক্তিম হয়ে উঠল। "তুমি আমাকে এত নিচু ভাবলে কীভাবে? আমি কি তোমাকে অবহেলা করব?"
"তুমি হয়তো করবে না আনিকা," আমি উনার ক্ষোভের সামনে শান্ত রইলাম। "কিন্তু সমাজ করবে। তোমার সাবকনশাস মাইন্ড করবে। মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যেদিন আমাদের শরীরের এই বুনো আকর্ষণটা একটু কমে যাবে, যেদিন লন্ডনের ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভালোবাসার চাদরটা একটু পুরোনো হয়ে যাবে, সেদিন সামান্য ঝগড়া হলেই তোমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে— 'আমার টাকায় তো তুমি লন্ডনে এসেছ!' সেদিন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?"
আনিকা কোনো জবাব দিতে পারলেন না। উনি স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "আমি মধ্যবিত্ত হতে পারি," আমি বলে চললাম, "আমার পকেটে হয়তো দামি রেস্তোরাঁয় রোজ বিল দেওয়ার টাকা নেই। কিন্তু আমার একটা জিনিস খুব খাঁটি আছে, সেটা হলো আত্মসম্মান। আমি কোনো নারীর আঁচলের তলায় আশ্রয় নিয়ে পরবাসী হতে পারব না। এই ঢাকা শহর যত নোংরাই হোক, এই বিকল্প বাস যত যন্ত্রণাদায়কই হোক, এখানে আমি নিজের টাকায় চলি। রাতে ঘুমোনোর সময় আমার মনে হয় না যে আমি কারও কেনা দাস। তাছাড়া, আমার দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনো বাসনা নেই। আমার বাবা-মা এখানে আছেন। আমি তাদের চোখের আড়াল হতে পারব না।"
আনিকার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। উনার ঠোঁট কামড়ে উনি রাগ সামলানোর চেষ্টা করলেন।
"তাহলে আমাদের এই সম্পর্কের শেষ কোথায় রাশেদ?" উনার কণ্ঠস্বর ভেঙে এল। "আমরা কি শুধুই এই কয়েকটা দিনের জন্য শরীরে শরীর ঘষে শেষ হয়ে যাব?"
"আমি জানি না আনিকা," আমি সত্যি কথাই বললাম। "মানুষের সব গল্পের শেষ থাকে না। কিছু কিছু গল্প মাঝপথেই থমকে যায়। আমরা দুজন দুটো ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। মহাকর্ষের টানে কিছুক্ষণের জন্য পাশাপাশি এসেছি, কিন্তু আমাদের কক্ষপথ আলাদা। আমরা জোর করে এক হতে গেলে দুটো গ্রহই ধ্বংস হয়ে যাবে।"
কথাবার্তা আর এগোল না। আলোচনার টেবিলে যে যুক্তিগুলো সাজানো হলো, তার কোনো সমাধান আমাদের কারও কাছেই ছিল না। প্রেম আর বাস্তবতার এই দাবার বোর্ডে আমরা দুজনেই চেকমেট হয়ে বসে রইলাম।
আমি ওয়েটারকে ডেকে বিল আনতে বললাম। বিল এল প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকা। আমার পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার বেতনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। আমি কোনো দ্বিধা ছাড়া মানিব্যাগ থেকে কড়কড়ে নোটগুলো বের করে পে করে দিলাম। আনিকা কার্ড বের করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি উনার হাত আলতো করে চেপে ধরে মানা করলাম। আজ রাতে এই মধ্যবিত্ত অনুবাদক তার আত্মসম্মানের শেষ কানাকড়িটুকুও বজায় রাখতে চায়।
আমরা লিফটে করে নিচে নামলাম। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। ঠান্ডা বাতাসে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ। আমরা একটা উবার নিয়ে নিঃশব্দে ধানমন্ডির দিকে রওনা হলাম। পুরো পথটায় আমাদের মাঝখানে কোনো কথা হলো না। আনিকা আমার হাতটা ধরে নিজের কোলে চেপে রেখেছিলেন। উনার নরম হাতের স্পর্শে ছিল একরাশ হাহাকার। গাড়ির জানালার ওপারে সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো আমাদের মুখে এসে পড়ছিল আর নিভে যাচ্ছিল।
ফ্ল্যাটে ফিরে আমরা সোজা মাস্টার বেডরুমে গেলাম। আনিকা উনার সেই ভারী নীল সিল্কের গাউনটা শরীর থেকে খুলে ফেললেন। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উনি গলার চেইন আর কানের দুলগুলো নামিয়ে রাখলেন। আয়নায় উনার সম্পূর্ণ অনাবৃত, অপ্সরী রূপটা আবার ভেসে উঠল। কিন্তু সেই শরীরে আজ কোনো কামনার ডাক ছিল না। ছিল কেবল এক ক্লান্ত নারীর রিক্ততা। আমিও আমার ফর্মাল পোশাক ছেড়ে সাধারণ একটা সুতির ট্রাউজার পরে নিলাম।
আমরা দুজন পাশাপাশি সেই বিশাল বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আমাদের গায়ের ওপর বইছিল। পেটভরা খাবার, অথচ মনের ভেতর এক অতলান্ত ক্ষুধা। আনিকা উনার মাথাটা আমার বুকের ওপর রাখলেন। উনার খোলা চুলগুলো আমার বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। উনার একটা হাত আমার পেটের ওপর স্থির।
কিন্তু আজ কোনো চুম্বন হলো না। কোনো আদর, কোনো বুনো মিলন, কোনো উল্লাস— কিছুই ঘটল না।
আমরা দুজন নিশ্চল হয়ে সিলিংয়ের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আলাপটা অপূর্ণ রয়ে গেল। আমরা কেউই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলাম না। আনিকা লন্ডনে ফিরে যাবেন, আর আমি হয়তো ফিরে যাব আমার পুরোনো মিরপুরের মেসে। মাঝখানে ঝুলে রইল কেবল কিছু তীব্র শারীরিক স্মৃতি আর একটা অমিমাংসিত শূন্যতা।
রাত তখন দুটো। বাইরে ঢাকা শহর ঘুমিয়ে পড়েছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)