Thread Rating:
  • 63 Vote(s) - 2.24 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
WRITER'S SPECIAL রূপগড় কলেজের ইংরেজি শিক্ষিকা রূপসা চক্রবর্তী
#57
রাত তখন প্রায় সাড়ে ন’টা কিংবা দশটা বাজে। বাইরে ঝিঁঝি পোকার ডাক আর মাঝেমধ্যে দু একটা গাড়ির হর্ন ছাড়া চারপাশটা একদম নিঝুম। রূপগড় হাই কলেজের অনিন্দ্যসুন্দরী ইংরেজি শিক্ষিকা রূপসা চক্রবর্তী তখন রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের শোবার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে সারাদিনের ক্লান্তি, কলেজের বাচ্চাদের হৈচৈ আর শিক্ষকতার ধকল শরীর থেকে মুছে ফেলার জন্য তিনি তাঁর রূপচর্চার রুটিন মেনে চলছিলেন। গায়ে জড়িয়ে থাকা হালকা সুতির একটা ঢিলেঢালা, আরামদায়ক নাইটির আড়ালেও তাঁর ৩৬-৩০-৩৮ সাইজের সেই লাস্যময়ী ও নিখুঁত ফিগারের আকৃতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। পার্লারের নিয়মিত ফেসিয়াল, ওয়াক্সিং আর নিখুঁত যত্নের কারণে উনচল্লিশ বছর বয়সেও তাঁর দুধের মতো ধবধবে ফর্সা ত্বক মোমের মতো মসৃণ ও দ্যুতিময়। চুলগুলো চিরুনি দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়াতে আঁচড়াতে তিনি ডান হাতের ফর্সা আঙুলগুলোতে সামান্য সুগন্ধি লোশন নিয়ে নিজের সুগঠিত গলা ও বাহুতে মাখছিলেন। পার্লারের সেই সুবাসিত ল্যাভেন্ডার লোশনের গন্ধ পুরো ঘরটাকে এক মাদকী ও মোহময় আবহে ভরে তুলেছিল। বাইরে যতই রাতের অন্ধকার গাঢ় হোক না কেন, রূপসার এই নিজস্ব ভুবনে তখন এক অদ্ভুত স্থবিরতা বিরাজ করছিল। রাজ তখন তার নিজের ঘরে বসে বই খাতা খুলে টেবিলের সামনে উদাস হয়ে বসে ছিল। বিকেলে বাবলুর মাথা ফাটিয়ে আসার পর থেকে তার মনের ভেতর একটা অসম্ভব অশান্তি কাজ করছিল। সে বারবার ভাবছিল, এই বুঝি কোনো বিপদ বা ঝামেলা বাড়ি পর্যন্ত এসে পৌঁছায়।



ঠিক সেই মুহূর্তেই রূপসার ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে ওঠায় রূপসা একটু চমকে গেলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। একটা অচেনা নাম্বার। সাধারণত এই সময়ে কেউ তাঁকে কলেজের বা ব্যক্তিগত কাজে ফোন করে না। একটু ভ্রু কুঁচকে রূপসা ফোনটা রিসিভ কানের কাছে ধরলেন। “হ্যালো? বলছি... আমি রূপসা চক্রবর্তী বলছি। কে বলছেন?” রূপসা তাঁর স্বভাবসুলভ মার্জিত ও গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন।
ফোনের ওপার থেকে একটা ভারী, কর্কশ এবং চড়া গলার আওয়াজ ভেসে এল, যা শুনে রূপসার বুকের ভেতরটা ছাঁত করে উঠল।
“ম্যাডাম , রূপগড় থানা থেকে বলছি। কনস্টেবল নরেশ সিকদার এর নাম শুনেছেন তো? থানার ওসির গাড়ির ড্রাইভার ও ডিউটির লোক,তাঁর ছেলে বাবলুকে আপনার ছেলে রাজ আজ বিকেলে কলেজ ছুটির পর রাস্তায় ধরে বেধড়ক মেরেছে! বাবলুর মাথা একদম ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড, হাসপাতালে সেলাই পড়েছে। বুঝলেন?”
ফোনের এপারে দাঁড়িয়ে রূপসার পা যেন আর মাটিতে টিকছিল না। তাঁর সেই ধবধবে ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তিনি কী শুনছেন! তাঁর শান্ত, ভদ্র এবং সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে থাকা একমাত্র ছেলে রাজ কাউকে মেরেছে? তাও আবার থানায় নালিশ গেছে এবং কনস্টেবল কাসেমের ছেলে!
রূপসা কোনোমতে গলা কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলছেন আপনি! আমার রাজ... রাজ এমন কাজ করতেই পারে না! আপনি কি ভুল কিছু শুনছেন?”
ওপার থেকে পুলিশ অফিসার অত্যন্ত কঠোর ও গম্ভীর সুরে বললেন, “ভুল আমরা শুনিনি ম্যাডাম। আপনার ছেলের ঔদ্ধত্য তো কম নয়! আপনার ছেলে রাজ আর আপনার নামে আজই অফিশিয়ালি এফআইআর (FIR) ও কেস রেজিস্টার্ড হয়েছে। কাল সকাল ঠিক দশটার মধ্যে থানায় এসে হাজির হবেন বলছি। ছেলেটাকে সাথে নিয়ে আসবেন, নইলে পুলিশ গিয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসবে। বলে দিলাম!”
টিউব! বলে ওপার থেকে ফোনটা কেটে দেওয়া হলো।


রূপসার হাত থেকে ফোনটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তাঁর সারা শরীর তখন ভয়ে ও লজ্জায় থরথর করে কাঁপছে। একজন নামকরা শিক্ষিকা, সমাজের চোখে যার এত সম্মান, তাঁর নামে এবং তাঁর একমাত্র ছেলের নামে থানায় কেস হয়েছে! পুলিশ তাকে কাল সকালে থানায় ডেকে পাঠিয়েছে! এই অপমান এবং আকস্মিক বিপর্যয় রূপসাকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিল।
তিনি এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। তাঁর পা দুটো যেন ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে চলল রাজের ঘরের দিকে। তিনি রাজের ঘরের দরজায় গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারলেন এবং রাগে ও আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
রাজ তখন টেবিলের সামনে বসে ছিল। মায়ের এমন অস্বাভাবিক ও রাগী রূপ সে এর আগে কখনো দেখেনি। রূপসার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, তাঁর বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, আর তাঁর থমথমে মুখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।
“রাজ!” রূপসার গলাটা কেঁপে উঠল, কিন্তু সেই কান্নার চেয়ে আক্রোশ আর ধমকের সুরটাই বেশি ছিল। তিনি রাজের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর হাই হিলের খটখট শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।


রাজ ভয় পেয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল, “মা... মা কী হয়েছে? তুমি এভাবে কাঁপছ কেন?”
“কী হয়েছে তুই জিজ্ঞেস করছিস আমাকে?!” রূপসা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। তিনি রাজের কাঁধটা খপ করে চেপে ধরে এক প্রকার ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “এইমাত্র থানা থেকে ফোন এসেছিল আমার কাছে! রূপগড় থানা থেকে! কনস্টেবল নরেশ এর ছেলে বাবলুকে নাকি তুই আজ বিকেলে রাস্তায় মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়ে এসেছিস! হাসপাতালে তার সেলাই পড়েছে! আর থানা থেকে বলে গেছে, তোর নামে আর আমার নামে কেস হয়েছে, কাল সকালে আমাদের থানায় যেতে হবে! এসব কী শুনছি আমি রাজ? তুই... তুই একটা ছেলেকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়ে এসেছিস আর আমাকে একটা কথাও বলিসনি?”
রাজের মুখ দিয়ে তখন কোনো কথা বের হচ্ছিল না। সে বুঝতে পেরেছিল যে এই সত্যিটা একদিন না একদিন সামনে আসবেই, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পুলিশের ফোন চলে আসবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। সে ভয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।


রূপসা ছেলেকে ওইভাবে চুপ করে থাকতে দেখে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি রাজের হাত ধরে জোরে ঝাঁকিয়ে বললেন, “কথা বলছিস না কেন? মুখ দিয়ে কি ভাষা বেরোচ্ছে না? কোন সাহসে তুই এই কাজ করলি? তুই কাকে মেরেছিস জানিস? থানা্র কনস্টেবল নরেশ এর ছেলে! এলাকার বখাটে হলেও ওদের ব্যাকগ্রাউন্ড কী তুই জানিস না? আর তুই একটা ছেলেকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিবি? কলেজ থেকে ফিরে এসেছিস, অথচ মুখে টু শব্দটিও করিসনি! তুই আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিস লাইব্রেরির অছিলায়! কেন করলি এটা? কী এমন অপরাধ করেছিল ওই ছেলেটা যে তোকে এমন একটা জঘন্য অপরাধ করতে হলো?”


মায়ের এই তীব্র ধমক আর চোখের জল মেশানো ক্ষোভ দেখে রাজের বুকটাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “মা... আমি কি এমনি এমনি মেরেছি ওকে? তুমি কিচ্ছু জানো না... কিচ্ছু জানো না মা!”
রূপসা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী জানি না আমি? কী এমন ঘটেছিল যে তুই পুলিশের খাতায় নাম লিখিয়ে এলি? খুলে বল আমাকে সব!”
রাজ তখন তার চোখের জল মুছে রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুরু করল, “মা... সেদিন কলেজে যখন বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছিল, তখন ওই বাবলু ... ওই শুয়োরের বাচ্চাটা... ও আমাদের সবার সামনে তোমায় নিয়ে...” রাজের গলাটা আটকে গেল। সে আর সামনে এগোতে পারছিল না। লজ্জা ও ঘেন্নায় তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।
রূপসা আরও উদগ্রীব হয়ে চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমাকে নিয়ে কী বলেছিল ও? বল বলছি রাজ! লুকাবি না আমার কাছ থেকে একটাও কথা!”
রাজ তখন চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে এক নিঃশ্বাসে সবটা উগরে দিল। সে কেঁদে কেঁদে বলল, “ও বলেছিল... ও বলেছিল যে, ম্যাম যখন ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে ইংলিশ পোয়েম লিখছিলেন পিছন ফিরে, তখন নাকি তোমার ওই কটন শাড়ির ব্লাউজ ও আঁচলের মাঝে ফাঁকা জায়গা দিয়ে তোমার ফর্সা পেট, ব্লাউজে ঢাকা ফোলা স্তন ... তোমার ফর্সা পিঠ আর শরীরের কার্ভ দেখে নাকি ওর সেক্স উঠে গেছিল! ও নাকি বাড়ি গিয়ে তোমার শরীরের কথা ভাবতে ভাবতে... কতবার হ্যান্ডেল মেরেছে !”
এই কথাগুলো যখন রাজের মুখ থেকে একে একে বেরিয়ে এল, তখন রূপসা চক্রবর্তীর ঘরের ভেতরের বাতাস যেন একমুহূর্তের জন্য থমে গেল।
রূপসার মুখের সেই রাগের অভিব্যক্তিটা পলকের মধ্যে বরফের মতো জমে গেল। তাঁর ধবধবে ফর্সা মুখটা প্রথমে লাল, তারপর একেবারে সাদা হয়ে গেল। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে একটা ক্লাস নাইনের বখাটে ছাত্র তাঁর মতো একজন সম্মানিত শিক্ষিকাকে নিয়ে এত বড়, এত নোংরা এবং এত কুরুচিকর একটা মন্তব্য করার সাহস পায়! সমাজের চোখে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষিকা, একজন মা, একজন ধনী উচ্চবৃত্ত ঘরের বধূ—কিন্তু আড়ালে তাঁকে নিয়ে এলাকার যুবকেরা এই ধরনের অশ্লীল ও পৈশাচিক কল্পনা করে?
রূপসার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। তিনি লজ্জায়, অপমানে এবং প্রচণ্ড আক্রোশে সোফার হাতলটা খপ করে ধরে ফেললেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন ধক ধক করছে।


রাজ ফুঁপাতে ফুঁপাতে হাত দিয়ে নিজের চোখ মুছতে মুছতে বলল, “তুমি বলো মা... তুমিই বলো, আমার সামনে দাঁড়িয়ে যখন একটা ছেলে আমার নিজের মাকে নিয়ে এমন নোংরা, অসভ্য কথা বলবে, তখন কি আমি হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম? আমার রক্ত কি গরম হতো না? আমি তো সহ্য করতে পারিনি মা! আমার মনে হয়েছিল ওর জিবটা টেনে ছিঁড়ে ফেলি। তাই আমি কলেজ থেকে তোমাকে পাঠিয়ে দিয়ে সোজা ওর কাছে গেছি, আর ওর ওই নোংরা মুখটাই ভেঙে দিয়েছি! আমার কোনো আফসোস নেই মা, জেলে যেতে হলেও আমার কোনো দুঃখ নেই, কিন্তু কেউ আমার মাকে নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবে আর আমি সহ্য করব—তা হতে পারে না!”
বাবার স্নেহবঞ্চিত, মায়ের এই নিখুঁত রূপ ও নিঃসঙ্গতার মাঝে বড় হওয়া কিশোর রাজের এই কথাগুলো ঘরের সমস্ত দেওয়াল ভেদ করে যেন রূপসার কানে গিয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। রূপসা দেখলেন, তাঁর ছেলে আজ কেবল একজন অবাধ্য কিশোর নয়, সে আজ তাঁর ইজ্জত বাঁচানোর জন্য একজন পুরুষ হয়ে উঠেছে, যে নিজের মায়ের গায়ে লাগা কালিমার বদলা নিতে পুলিশের চোখ রাঙানিকেও পরোয়া করেনি।


রূপসার চোখের কোণ দিয়েও তখন দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আর রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে এসে রাজকে নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। রাজের মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রূপসা কেঁদে ফেললেন।
মায়ের সেই পরিচিত, পার্লারের সুগন্ধী মেশানো দুধসাদা শরীরের উষ্ণতা আর বুকজুড়ে কান্নার কম্পন রাজের গায়ে এসে লাগল। রূপসা রাজের চুলে হাত বুলিয়ে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “পাগল ছেলে আমার... এত বড় একটা কাণ্ড তুই একা একা ঘটিয়ে দিলি? কার বা কার সাথে লড়তে গেলি তুই? পুলিশ তোর আর আমার নামে কেইস দিয়েছে... কাল সকালে আমাদের থানায় যেতে হবে রে...”
রাজ মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে ফ্যাকাশে চোখে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে এখন কী হবে মা? আমাদের কি পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে?”
রূপসা নিজের চোখের জল মুছে নিলেন। তাঁর ভেতরের সেই ভীরু ও অবহেলিত স্ত্রী রূপসা আর রইল না; সেখানে জেগে উঠল এক বিপদগ্রস্ত বাঘিনীর মতো তেজস্বী মা। তাঁর সুগঠিত শরীরটা একটা জেদি দৃঢ়তায় টানটান হয়ে উঠল। তিনি রাজের হাত শক্ত করে ধরে শক্ত গলায় বললেন, “পুলিশ আমাদের কিছু করতে পারবে না রাজ। কাল সকালে আমি তোমার সাথে থানায় যাব। দেখি কার কত বড় ক্ষমতা আছে যে আমার ছেলেকে ছোঁয়া তো দূরের কথা, একটা আঙুলও তোলে! কিন্তু একটা কথা মনে রাখবি রাজ... আজকের পর থেকে সংযত হতে হবে। এই সমাজটা খুব খারাপ, এরা বাইরে থেকে রূপ দেখে, কিন্তু ভেতরে সবার চোখ নোংরা। সাবধানে থাকতে হবে, বুঝলি?”
মা ও ছেলে সেদিন রাতে সেই ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে রইলেন। বাইরের দুনিয়ায় তখন একটা বড় ঝড় আসার প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে সেই ঝড় যেন মা-ছেলের সম্পর্কের বাঁধনকে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি গভীর, রহস্যময় এবং অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছিল।


গতকাল রাতের সেই ভয়াল ফোন কল আর ঝড়ের মতো কেটে যাওয়া সময়টার পর রূপসা চক্রবর্তীর চোখের নিচে সামান্য কালচে ছোপ পড়েছিল, যা তাঁর ধবধবে ফর্সা মুখের লাবণ্যে একটা ক্লান্তির ছাপ ফেলেছিল। কিন্তু একজন আত্মসম্মানবতী নারী এবং শিক্ষিকা হিসেবে তিনি নিজেকে ভেঙে পড়তে দেননি। পার্লারের নিখুঁত পরিচর্যায় সাজানো তাঁর সেই অনিন্দ্যসুন্দরী রূপ, গায়ে কটন সিল্কের মার্জিত শাড়ি আর পায়ে হাই হিল—সব মিলিয়ে রূপসা যখন রূপগড় থানার বড় গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, তখন থানার ডিউটি অফিসার থেকে শুরু করে উপস্থিত কনস্টেবলদের চোখ একমুহূর্তের জন্য তাঁর দিকে আটকে গেল। রাজকে একটা নিরাপদ দূরত্বে গাড়ির বা বারান্দার কোণে দাঁড় করিয়ে রেখে রূপসা সোজা হেঁটে গেলেন থানার ইনচার্জ বা সাব-ইন্সপেক্টরের (SI) রুমের দিকে।
এসআই-এর রুমে পা রাখতেই এসআই সাহেব রূপসাকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন। রূপসার ব্যক্তিত্ব, তাঁর গ্ল্যামার এবং তাঁর গাম্ভীর্য থানার সাধারণ অপরাধ জগতের সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছিল না। এসআই সাহেব সম্মান দেখিয়ে বসার ইশারা করলেন এবং ফাইলপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে গম্ভীর গলায় বললেন, “বসুন ম্যাডাম চক্রবর্তী। আপনার নামটাই তো গতকাল রাতে এন্ট্রি হয়েছে। আপনার ছেলে রাজ কনস্টেবল নরেশের ছেলেকে প্রায় মেরে ফেলার জোগাড় করেছিল, মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। এফআইআর (FIR) অলরেডি ড্রাফট হয়ে গেছে।“


রূপসা অত্যন্ত বিনম্র অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, “স্যার, দয়া করে একটু বুঝুন। আমার ছেলে তো এমনি এমনি কারও গায়ে হাত দেয় না। ওই বখাটে ছেলেটা আমার সম্পর্কে... মানে আমাদের পারিবারিক সম্মান নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিকর ও অশ্লীল মন্তব্য করেছিল, যা একটা কিশোরের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব ছিল। আমি একজন শিক্ষিকা, আপনি একটু বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখুন না।“
এসআই সাহেব একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন। তিনি চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “দেখুন ম্যাডাম, আপনার আবেগকে আমি সম্মান করি। একজন মা হিসেবে আপনার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু সমস্যাটা হলো, যার গায়ে হাত পড়েছে সে ভালো কোনো লোকের ছেলে নয়; সে এই থানারই অত্যন্ত প্রভাবশালী ও পুরনো কনস্টেবল নরেশ সিকদার এর একমাত্র ছেলে। নরেশ ওসির ডানহাত। তিনি এই ঘটনায় ভীষণ চটে আছেন এবং থানা থেকে সরাসরি এফআইআর করে কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। আমার হাতে খুব বেশি কিছু নেই।“


রূপসার বুকটা ছাঁত করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “তাহলে কি এর কোনো সমাধান নেই স্যার? আমার ছেলের ভবিষ্যৎ... ওর পড়াশোনা... সব কি নষ্ট হয়ে যাবে?”
এসআই সাহেব একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন, “দেখুন ম্যাডাম, আপনি যদি আপনার ছেলেকে এবং নিজেকে এই আইনি ঝামেলা ও জেলের হাত থেকে বাঁচাতে চান, তবে সোজা গিয়ে কনস্টেবল নরেশের সাথে কথা বলুন। ওনি যদি নিজে থেকে কেস তুলে নেন বা ডায়েরি থেকে এফআইআর না করার সিদ্ধান্ত নেন, একমাত্র তবেই কাজ হতে পারে। নরেশ রাজি হলে ওসির কাছে আমি রিপোর্ট পজিটিভ করে দেব। আমাকে বা থানাকে বলে কোনো লাভ নেই, চাবিকাঠি এখন নরেশের হাতেই আছে। থানার বাইরে গেটের কাছে যে চায়ের দোকানটা আছে, ওখানেই ওকে পাবেন।“
Like Reply


Messages In This Thread
RE: রূপগড় কলেজের ইংরেজি শিক্ষিকা রূপসা চক্রবর্তী - by Coolraj1000 - 15-09-2026, 12:58 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)