14-09-2026, 10:57 PM
৫৫।
জুন মাস। ঢাকা শহরের জুন মাস মানে কোনো ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটা আক্ষরিক অর্থেই একটা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। রাস্তার পিচ গলে যাওয়ার উপক্রম হয়। আকাশে মেঘের কোনো দেখা নেই, সূর্যটা যেন মানুষের মাথার ঠিক এক হাত ওপরে নেমে এসে তার সমস্ত রাগ উগরে দেয়। বাসে, রিকশায়, ফুটপাতে মানুষের গা থেকে বের হওয়া ঘামের বুনো গন্ধ আর ধুলোবালি মিলেমিশে ঢাকা শহরকে একটা বাষ্পীয় নরকে পরিণত করে। লোকাল ভাষায় যাকে বলে ‘কুত্তামারা গরম’, এটা ঠিক তাই।
কিন্তু মানুষের মন আর বাইরের প্রকৃতি সবসময় এক তালে চলে না। বাইরে যখন প্রলয়ঙ্করী দাবদাহ, আমার ব্যক্তিগত জীবনে তখন বইছে এক অনন্ত, স্নিগ্ধ এবং পাগল-করা বসন্ত। ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটটা আমার কাছে এখন আর শুধু একটা আশ্রয় নয়, এটা একটা মায়াবী দ্বীপ।
সেই যে সেদিন আমরা সিনেমা দেখা মাঝপথে রেখে, উবারের গাড়িতে ছটফট করতে করতে বাসায় ফিরে এক উদ্দাম, বন্য এবং প্রলয়ঙ্করী শারীরিক মিলনে মেতে উঠেছিলাম— তারপর চোখের পলকে কেটে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহে আমার জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে রুটিন, ঘড়ির কাঁটা আর হিসেব-নিকেশ সব মুছে গেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মনের সবচেয়ে বড় দুইটা তাড়না হলো 'ইরোস' (Eros) বা জীবন প্রবৃত্তি, আর 'থানাটোস' (Thanatos) বা মৃত্যু প্রবৃত্তি। আনিকা নাওহার গত এক মাস ধরে সেই মৃত্যু বা ধ্বংসের প্রবৃত্তির অতল গহ্বরে ডুবে ছিলেন। বেলালের সেই বীভৎস মৃত্যু, পুলিশের জেরা, আর নিজের ভেতরের অপরাধবোধ উনাকে একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করেছিল।
কিন্তু ওই একটা বিকেল! ওই সিনেমা হলের অন্ধকার আর তারপর ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার ওপাশে আমাদের সেই আদিম, বাঁধভাঙা মিলন যেন জাদুর মতো কাজ করল। যৌনতা বা সেক্স নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক রাখঢাক আছে। আমরা একে পাপ বলি, নিষিদ্ধ বলি, আড়ালে রাখি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সেক্স হলো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় হিলিং পাওয়ার বা নিরাময় শক্তি। যখন দুটো শরীর চরম কামনায়, কোনো সামাজিক বা মানসিক বাধা ছাড়া একে অপরের সাথে মিশে যায়, তখন মস্তিষ্কে যে পরিমাণ ডোপামিন আর অক্সিটোসিন রিলিজ হয়, তা পৃথিবীর যেকোনো শক্তিশালী অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা বিষণ্ণতা-নাশক ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।
আনিকার ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছিল। আমাদের সেই মিলনের পরদিন সকাল থেকেই আমি দেখলাম, ফ্ল্যাটের আবহাওয়া পুরোপুরি বদলে গেছে। বারান্দার সেই ইজিচেয়ারে বসা, শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর ছাইদানিতে সিগারেটের পাহাড় জমানো সেই বিষণ্ণ নারীটি যেন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে গেছেন।
তার বদলে সেখানে ফিরে এসেছেন আমার সেই চেনা, লাস্যময়ী, অহংকারী এবং চরম আবেদনময়ী আনিকা নাওহার। উনার চোখের নিচের ওই কালচে দাগগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ফ্যাকাশে ঠোঁটে আবার ফিরে এল সেই চেরি-কালারের ময়েশ্চারাইজারের আভা। উনার হাঁটাচলায় ফিরে এল সেই পরিচিত, রাজকীয় ‘ক্যাট-ওয়াক’ বা ছুঁই মাছের ঢেউ।
আর এর সাথে শুরু হলো আমাদের এক অন্তহীন, বন্য এবং শারীরিক উদ্যাপন। গত দুই সপ্তাহে কতবার যে আনিকার সেই রহস্যময় গোলাপের পাতা ছিঁড়ে আমার কামনার ময়াল সাপ উনার সেই উষ্ণ গহ্বরে প্রবেশ করেছে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব আমার কাছে নেই। আমরা যেন সময়ের হিসাব রাখতেই ভুলে গিয়েছিলাম।
আমাদের মিলনের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না, আর কোনো নির্দিষ্ট পোশাকও ছিল না।
আমি হয়তো অফিস থেকে ফিরেছি। টাইট গ্যাবার্ডিন প্যান্ট আর ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই হয়তো দেখলাম আনিকা সোফায় বসে আছেন। উনার পরনে শুধু একটা ওভারসাইজড সাদা শার্ট, যার বোতামগুলো অর্ধেক খোলা। ভেতরে কোনো অন্তর্বাস নেই। আমাকে দেখেই উনি মুচকি হেসে উনার ফর্সা, মসৃণ পা দুটো একটু ফাঁক করে দিলেন। আমার সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি, বসের বকাঝকা, ঢাকা শহরের জ্যাম— সবকিছু এক সেকেন্ডে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। আমি হয়তো ব্যাগটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলেই উনার ওপর হামলে পড়লাম। ড্রয়িংরুমের সোফাতেই আমাদের কাপড়গুলো এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল, আর আমরা মেতে উঠলাম এক বন্য আক্রোশে।
আবার হয়তো ছুটির দিনে, আলসে দুপুরবেলা। বাইরে কাঠফাটা রোদ। ফ্ল্যাটের এসি চলছে কনকনে ঠান্ডায়। আনিকা হয়তো শখ করে একটা শিফনের শাড়ি পরেছেন। কোনো ব্লাউজ ছাড়া, শুধু শাড়ির প্যাঁচে উনার সেই ভরাট বক্ষদেশ আর ছিপছিপে কোমর ঢাকা। আমি হয়তো কিচেনে কফি বানাচ্ছি। উনি পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। উনার নগ্ন পেটের সাথে আমার পিঠের ঘর্ষণ লাগল। কিচেনের ঠান্ডা মার্বেল টপের ওপর উনাকে বসিয়ে দিয়ে, ওই শাড়ির কুঁচি তুলেই হয়তো আমরা হারিয়ে গেলাম এক তীব্র, ঘর্ষণময় সুখে।
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যেত। আমি দেখতাম আনিকা আমার বুকের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন। উনার রেশমি চুলগুলো আমার মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। উনি হয়তো ঘুমন্ত অবস্থাতেই উনার শরীরটাকে আমার শরীরের সাথে ঘষতে শুরু করলেন। আমার অর্ধজাগ্রত, অর্ধঘুমন্ত পৌরুষটা উনার সেই উষ্ণতায় পুরোপুরি জেগে উঠল। কোনো কথা ছাড়াই, অন্ধকারের মধ্যেই হয়তো শুরু হয়ে গেল আমাদের আরেকটা দীর্ঘ, শান্ত এবং গভীর ভালোবাসার প্রহর।
এই যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন পোশাকে এবং বিভিন্ন মানসিক অবস্থায় আমাদের মিলনগুলো হচ্ছিল— এগুলোর প্রত্যেকটার স্বাদ ছিল আলাদা। কখনো সেটা ছিল শুধুই একটা পশুসুলভ, আদিম ক্ষুধা মেটানোর লড়াই। আবার কখনো সেটা ছিল একে অপরের আত্মাকে ছুঁয়ে দেখার এক অদ্ভুত, মায়াবী চেষ্টা।
আনিকা যেন নতুন করে জীবনটাকে উপভোগ করতে শুরু করেছিলেন। উনি হাসতেন, আমার সাথে খুনসুটি করতেন, আমার চুলের মুঠি ধরে টানতেন। উনার এই উচ্ছলতা, উনার এই সেক্সি এবং বন্য রূপ আমাকে আক্ষরিক অর্থেই একটা নেশাগ্রস্ত মাতাল বানিয়ে ফেলেছিল। আমি অফিসের ডেস্কে বসেও শুধু ঘড়ির দিকে তাকাতাম— কখন ছয়টা বাজবে, আর কখন আমি ওই ফ্ল্যাটের দরজার লক খুলে উনার শরীরের সেই ঘ্রাণটা পাব।
কিন্তু...
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে, ঠিক তখনই তার অবচেতন মন তাকে মনে করিয়ে দেয় যে— এই সুখ চিরস্থায়ী নয়। জুন মাসের মাঝামাঝি এসে আমি একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট পরিবর্তন খেয়াল করতে শুরু করলাম।
আনিকা হঠাৎ করেই আবার উনার ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত হতে শুরু করলেন। উনি দেশে এসেছিলেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। বইমেলার সময়। সাধারণত উনি দেশে আসেন এক মাসের জন্য। কিন্তু এবার বেলালের সেই ঘটনা, পুলিশের তদন্ত, আর তারপর আমাদের এই বন্য প্রেমের কারণে উনার দেশে থাকার মেয়াদ চার মাস পার হয়ে গেছে।
চার মাস একজন প্রবাসীর জন্য অনেক দীর্ঘ সময়। বিশেষ করে উনার মতো একজন নারী, যিনি লন্ডনে একটা আইটি ফার্মের সিইও। আমি রাতে বিছানায় শুয়ে দেখতাম, আনিকা উনার ম্যাকবুকটা কোলের ওপর নিয়ে একদৃষ্টে স্প্রেডশিট দেখছেন, বা কোনো বিজনেস প্রপোজাল তৈরি করছেন। উনার কানে এয়ারপড। উনি জুম মিটিংয়ে কথা বলছেন উনার ব্রিটিশ ক্লায়েন্টদের সাথে। উনার মুখে তখন সেই নিখুঁত, প্রফেশনাল ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট। এই সময়গুলোতে উনাকে আমার কাছে ভীষণ অচেনা মনে হতো।
মনে হতো, উনি আমার এই পৃথিবীর কেউ নন। উনি অন্য কোনো গ্রহের এক রানী, যিনি ভুল করে বা শখের বশে কিছুদিন আমার এই গরিব, ছাপোষা পৃথিবীতে এসে কাটিয়ে গেলেন। উনার বিজনেস মিটিংগুলো শেষ হলে উনি ল্যাপটপ বন্ধ করে আমার বুকে মাথা রাখতেন। আমাকে আদর করতেন। কিন্তু আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত, ঠান্ডা ভয় জমতে শুরু করেছিল।
আমি গন্ধ পাচ্ছিলাম।
মানুষ যেমন বৃষ্টির আগে বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ পায়, তেমনি আমি আনিকার শরীরের ঘ্রাণের সাথে সাথে একটা বিদায়ের গন্ধ পাচ্ছিলাম। চলে যাওয়ার গন্ধ। আমি খুব ভালো করেই জানি, আনিকা এখানে চিরকাল থাকবেন না।
এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, এই সেন্ট্রাল এসি, এই ঢাকা শহর— এগুলো উনার আসল জীবন নয়। উনার আসল জীবন ওই টেমস নদীর পাড়ে, ওই ঠান্ডা, কুয়াশাচ্ছন্ন শহরে, যেখানে উনার ফার্ম আছে, স্ট্যাটাস আছে, ব্যাংক ব্যালেন্স আছে।
আর আমি?
আমি রাশেদ আহমেদ। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক। আমি বড়জোর মিরপুরের মেস থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত আসতে পারি। কিন্তু আমার ডানা এত বড় নয় যে আমি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উনার আকাশে গিয়ে উড়ব।
আমি তো উনার জীবনের একটা 'ভ্যাকেশন' বা ছুটি কাটানোর উপকরণ মাত্র। মানুষ যখন পাহাড়ে বা সমুদ্রে বেড়াতে যায়, তখন সে সেখানকার কোনো একটা সুন্দর জিনিস দেখে মুগ্ধ হয়, কয়েকদিন সেটা নিয়ে মেতে থাকে। কিন্তু ছুটি শেষে যখন সে নিজের যান্ত্রিক জীবনে ফিরে যায়, তখন ওই পাহাড় বা সমুদ্রকে সে তার সুটকেসে ভরে নিয়ে যেতে পারে না। তাকে ওই স্মৃতিগুলো ওখানেই ফেলে রেখে যেতে হয়।
আনিকার জীবনে আমিও ঠিক সেই পাহাড় বা সমুদ্রের মতো একটা সাময়িক স্মৃতি। উনি উনার ট্রমা, উনার একাকিত্ব কাটানোর জন্য আমাকে ব্যবহার করেছেন। আমিও হাসিমুখে ব্যবহৃত হয়েছি। কিন্তু ছুটি তো ফুরিয়ে আসছে।
মাঝে মাঝে রাতে যখন আনিকা আমার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতেন, আমি উনার চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে ভাবতাম— আমি কি উনাকে একবার বলব থেকে যেতে? আমি কি উনাকে বলব— "আনিকা, ওই লন্ডন, ওই আইটি ফার্ম সব ছেড়ে দাও। আমার পঁচিশ হাজার টাকার জীবনে তুমি হয়তো এই এসি বা এই লেদার সোফা পাবে না, কিন্তু আমার যে বিশাল একটা বুক আছে, সেখানে তুমি সারাজীবন রানীর মতো থাকতে পারবে।" কিন্তু পরক্ষণেই আমার নিজের ওপর ভীষণ হাসি পেত।
এসব তো বাংলা সিনেমার সস্তা ডায়ালগ! বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আনিকা নাওহারের মতো একজন বিলিয়নিয়ার নারী আমার পঁচিশ হাজার টাকার ভালোবাসায় এক সপ্তাহও টিকতে পারবেন না। উনার শ্যানেল পারফিউমের একটা বোতলের দামই হয়তো আমার দুই মাসের বেতনের সমান।
আমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ। আমি বাস্তবতা বুঝি।
তাই আমি আনিকাকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি, "তুমি কবে যাবে?" আমি জানি, এই প্রশ্নটা করলেই আমাদের মাঝখানের এই সুন্দর, মায়াবী বিভ্রমটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। লজিক আর বাস্তবতা এসে আমাদের এই প্রেমের বেডরুমে ঢুকে পড়বে।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব না। যেদিন উনার ফ্লাইট থাকবে, সেদিন উনি আমাকে বলবেন। উনি উনার সুটকেস প্যাক করবেন। আমি হয়তো উনাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসব। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে, একটা উবার ডেকে সোজা মিরপুরের সেই স্যাঁতস্যাঁতে মেসে ফিরে যাব। রাজু আর তুহিন হয়তো আমাকে দেখে অবাক হবে। আমি হয়তো বাথরুমে ঢুকে কলের পানি ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদব। তারপর আবার পরের দিন সকালে বিকল্প বাসে ঝুলে কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে পুতিন আর বাইডেনের খবর অনুবাদ করব।
জীবন তো এভাবেই চলে। জীবন তো আর থেমে থাকে না।
কিন্তু যদ্দিন উনি আছেন! যদ্দিন এই অপ্সরী নারী আমার বিছানায় আছেন, যদ্দিন উনার এই ফর্সা, মসৃণ, ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত শরীরটা আমার হাতের মুঠোয় আছে— আমি তীব্রভাবে, বন্যভাবে এবং আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এই সুখ ভোগ করতে চাই।
আমি চাই, উনার শরীরের এমন কোনো কোষ বাকি না থাকুক, যেটা আমার স্পর্শের স্মৃতি মনে রাখবে না। উনি যখন লন্ডনের ওই ঠান্ডা বিছানায় একা শুয়ে থাকবেন, তখন যেন উনার চামড়ার নিচে আমার দেওয়া চুমুগুলোর উষ্ণতা উনাকে পাগল করে দেয়। আমি উনার শরীরে আমার ভালোবাসার, আমার কামনার এমন একটা অদৃশ্য সিলমোহর মেরে দিতে চাই, যা পৃথিবীর অন্য কোনো পুরুষ কোনোদিন মুছতে পারবে না।
জুন মাসের ২৪ তারিখ। শুক্রবার।
আজ আমার অফিস নেই। আনিকারও কোনো ল্যাপটপের কাজ নেই। দুপুরবেলা। বাইরে কড়া রোদ। ফ্ল্যাটের পর্দাগুলো সব টানা। আনিকা গোসল করে এসে মাত্র একটা সাদা রঙের তোয়ালে শরীরে জড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। আমি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। উনার সেই ফর্সা কাঁধ, তোয়ালের ওপর দিয়ে উঁকি দেওয়া উনার স্তনের স্ফীতি, আর উনার সেই সুডৌল, মসৃণ পা।
আমার বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত, আদিম ড্রামটা বাজতে শুরু করল। চলে যাওয়ার গন্ধটা আজ বাতাসে একটু বেশিই প্রকট। আর সেই গন্ধটাই আমার কামনার আগুনে ঘি ঢেলে দিল। আমি বিছানা থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। আমি আনিকার পেছনে গিয়ে উনার ফর্সা, খালি কাঁধে আমার মুখটা রাখলাম। আয়নায় আমাদের দুজনের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
আনিকা চিরুনি চালানো থামিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। উনার চোখে একটা প্রশান্তির আভা।
"কী হলো মিস্টার অনুবাদক?" আনিকা উনার মাথাটা একটু পেছনের দিকে, আমার বুকের ওপর হেলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন। "আবার ইচ্ছা করছে?"
আমি কোনো কথা বললাম না। আমি আমার দুই হাত উনার পেটের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে, তোয়ালের সেই গিঁটটার ওপর রাখলাম।
তারপর এক টানে তোয়ালেটা খুলে ফ্লোরে ফেলে দিলাম। আয়নায় উনার সেই সম্পূর্ণ নগ্ন, ঐশ্বরিক শরীরটা প্রতিফলিত হলো। আমি উনার ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে উনার সেই শ্যাম্পু আর পারফিউম মেশানো ঘ্রাণটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফুসফুসে ভরে নিলাম।
"আমি তোমাকে পুরোটা চাই আনিকা," আমি উনার কানের লতিটা হালকা কামড়ে ধরে ফিসফিস করে বললাম। "আজ, এই মুহূর্তে। এমনভাবে চাই, যেন কাল সকালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমার কোনো আক্ষেপ না থাকে।"
কিন্তু মানুষের মন আর বাইরের প্রকৃতি সবসময় এক তালে চলে না। বাইরে যখন প্রলয়ঙ্করী দাবদাহ, আমার ব্যক্তিগত জীবনে তখন বইছে এক অনন্ত, স্নিগ্ধ এবং পাগল-করা বসন্ত। ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটটা আমার কাছে এখন আর শুধু একটা আশ্রয় নয়, এটা একটা মায়াবী দ্বীপ।
সেই যে সেদিন আমরা সিনেমা দেখা মাঝপথে রেখে, উবারের গাড়িতে ছটফট করতে করতে বাসায় ফিরে এক উদ্দাম, বন্য এবং প্রলয়ঙ্করী শারীরিক মিলনে মেতে উঠেছিলাম— তারপর চোখের পলকে কেটে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহে আমার জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে রুটিন, ঘড়ির কাঁটা আর হিসেব-নিকেশ সব মুছে গেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মনের সবচেয়ে বড় দুইটা তাড়না হলো 'ইরোস' (Eros) বা জীবন প্রবৃত্তি, আর 'থানাটোস' (Thanatos) বা মৃত্যু প্রবৃত্তি। আনিকা নাওহার গত এক মাস ধরে সেই মৃত্যু বা ধ্বংসের প্রবৃত্তির অতল গহ্বরে ডুবে ছিলেন। বেলালের সেই বীভৎস মৃত্যু, পুলিশের জেরা, আর নিজের ভেতরের অপরাধবোধ উনাকে একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করেছিল।
কিন্তু ওই একটা বিকেল! ওই সিনেমা হলের অন্ধকার আর তারপর ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার ওপাশে আমাদের সেই আদিম, বাঁধভাঙা মিলন যেন জাদুর মতো কাজ করল। যৌনতা বা সেক্স নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক রাখঢাক আছে। আমরা একে পাপ বলি, নিষিদ্ধ বলি, আড়ালে রাখি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সেক্স হলো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় হিলিং পাওয়ার বা নিরাময় শক্তি। যখন দুটো শরীর চরম কামনায়, কোনো সামাজিক বা মানসিক বাধা ছাড়া একে অপরের সাথে মিশে যায়, তখন মস্তিষ্কে যে পরিমাণ ডোপামিন আর অক্সিটোসিন রিলিজ হয়, তা পৃথিবীর যেকোনো শক্তিশালী অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা বিষণ্ণতা-নাশক ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।
আনিকার ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছিল। আমাদের সেই মিলনের পরদিন সকাল থেকেই আমি দেখলাম, ফ্ল্যাটের আবহাওয়া পুরোপুরি বদলে গেছে। বারান্দার সেই ইজিচেয়ারে বসা, শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর ছাইদানিতে সিগারেটের পাহাড় জমানো সেই বিষণ্ণ নারীটি যেন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে গেছেন।
তার বদলে সেখানে ফিরে এসেছেন আমার সেই চেনা, লাস্যময়ী, অহংকারী এবং চরম আবেদনময়ী আনিকা নাওহার। উনার চোখের নিচের ওই কালচে দাগগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ফ্যাকাশে ঠোঁটে আবার ফিরে এল সেই চেরি-কালারের ময়েশ্চারাইজারের আভা। উনার হাঁটাচলায় ফিরে এল সেই পরিচিত, রাজকীয় ‘ক্যাট-ওয়াক’ বা ছুঁই মাছের ঢেউ।
আর এর সাথে শুরু হলো আমাদের এক অন্তহীন, বন্য এবং শারীরিক উদ্যাপন। গত দুই সপ্তাহে কতবার যে আনিকার সেই রহস্যময় গোলাপের পাতা ছিঁড়ে আমার কামনার ময়াল সাপ উনার সেই উষ্ণ গহ্বরে প্রবেশ করেছে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব আমার কাছে নেই। আমরা যেন সময়ের হিসাব রাখতেই ভুলে গিয়েছিলাম।
আমাদের মিলনের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না, আর কোনো নির্দিষ্ট পোশাকও ছিল না।
আমি হয়তো অফিস থেকে ফিরেছি। টাইট গ্যাবার্ডিন প্যান্ট আর ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই হয়তো দেখলাম আনিকা সোফায় বসে আছেন। উনার পরনে শুধু একটা ওভারসাইজড সাদা শার্ট, যার বোতামগুলো অর্ধেক খোলা। ভেতরে কোনো অন্তর্বাস নেই। আমাকে দেখেই উনি মুচকি হেসে উনার ফর্সা, মসৃণ পা দুটো একটু ফাঁক করে দিলেন। আমার সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি, বসের বকাঝকা, ঢাকা শহরের জ্যাম— সবকিছু এক সেকেন্ডে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। আমি হয়তো ব্যাগটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলেই উনার ওপর হামলে পড়লাম। ড্রয়িংরুমের সোফাতেই আমাদের কাপড়গুলো এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল, আর আমরা মেতে উঠলাম এক বন্য আক্রোশে।
আবার হয়তো ছুটির দিনে, আলসে দুপুরবেলা। বাইরে কাঠফাটা রোদ। ফ্ল্যাটের এসি চলছে কনকনে ঠান্ডায়। আনিকা হয়তো শখ করে একটা শিফনের শাড়ি পরেছেন। কোনো ব্লাউজ ছাড়া, শুধু শাড়ির প্যাঁচে উনার সেই ভরাট বক্ষদেশ আর ছিপছিপে কোমর ঢাকা। আমি হয়তো কিচেনে কফি বানাচ্ছি। উনি পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। উনার নগ্ন পেটের সাথে আমার পিঠের ঘর্ষণ লাগল। কিচেনের ঠান্ডা মার্বেল টপের ওপর উনাকে বসিয়ে দিয়ে, ওই শাড়ির কুঁচি তুলেই হয়তো আমরা হারিয়ে গেলাম এক তীব্র, ঘর্ষণময় সুখে।
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যেত। আমি দেখতাম আনিকা আমার বুকের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন। উনার রেশমি চুলগুলো আমার মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। উনি হয়তো ঘুমন্ত অবস্থাতেই উনার শরীরটাকে আমার শরীরের সাথে ঘষতে শুরু করলেন। আমার অর্ধজাগ্রত, অর্ধঘুমন্ত পৌরুষটা উনার সেই উষ্ণতায় পুরোপুরি জেগে উঠল। কোনো কথা ছাড়াই, অন্ধকারের মধ্যেই হয়তো শুরু হয়ে গেল আমাদের আরেকটা দীর্ঘ, শান্ত এবং গভীর ভালোবাসার প্রহর।
এই যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন পোশাকে এবং বিভিন্ন মানসিক অবস্থায় আমাদের মিলনগুলো হচ্ছিল— এগুলোর প্রত্যেকটার স্বাদ ছিল আলাদা। কখনো সেটা ছিল শুধুই একটা পশুসুলভ, আদিম ক্ষুধা মেটানোর লড়াই। আবার কখনো সেটা ছিল একে অপরের আত্মাকে ছুঁয়ে দেখার এক অদ্ভুত, মায়াবী চেষ্টা।
আনিকা যেন নতুন করে জীবনটাকে উপভোগ করতে শুরু করেছিলেন। উনি হাসতেন, আমার সাথে খুনসুটি করতেন, আমার চুলের মুঠি ধরে টানতেন। উনার এই উচ্ছলতা, উনার এই সেক্সি এবং বন্য রূপ আমাকে আক্ষরিক অর্থেই একটা নেশাগ্রস্ত মাতাল বানিয়ে ফেলেছিল। আমি অফিসের ডেস্কে বসেও শুধু ঘড়ির দিকে তাকাতাম— কখন ছয়টা বাজবে, আর কখন আমি ওই ফ্ল্যাটের দরজার লক খুলে উনার শরীরের সেই ঘ্রাণটা পাব।
কিন্তু...
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে, ঠিক তখনই তার অবচেতন মন তাকে মনে করিয়ে দেয় যে— এই সুখ চিরস্থায়ী নয়। জুন মাসের মাঝামাঝি এসে আমি একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট পরিবর্তন খেয়াল করতে শুরু করলাম।
আনিকা হঠাৎ করেই আবার উনার ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত হতে শুরু করলেন। উনি দেশে এসেছিলেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। বইমেলার সময়। সাধারণত উনি দেশে আসেন এক মাসের জন্য। কিন্তু এবার বেলালের সেই ঘটনা, পুলিশের তদন্ত, আর তারপর আমাদের এই বন্য প্রেমের কারণে উনার দেশে থাকার মেয়াদ চার মাস পার হয়ে গেছে।
চার মাস একজন প্রবাসীর জন্য অনেক দীর্ঘ সময়। বিশেষ করে উনার মতো একজন নারী, যিনি লন্ডনে একটা আইটি ফার্মের সিইও। আমি রাতে বিছানায় শুয়ে দেখতাম, আনিকা উনার ম্যাকবুকটা কোলের ওপর নিয়ে একদৃষ্টে স্প্রেডশিট দেখছেন, বা কোনো বিজনেস প্রপোজাল তৈরি করছেন। উনার কানে এয়ারপড। উনি জুম মিটিংয়ে কথা বলছেন উনার ব্রিটিশ ক্লায়েন্টদের সাথে। উনার মুখে তখন সেই নিখুঁত, প্রফেশনাল ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট। এই সময়গুলোতে উনাকে আমার কাছে ভীষণ অচেনা মনে হতো।
মনে হতো, উনি আমার এই পৃথিবীর কেউ নন। উনি অন্য কোনো গ্রহের এক রানী, যিনি ভুল করে বা শখের বশে কিছুদিন আমার এই গরিব, ছাপোষা পৃথিবীতে এসে কাটিয়ে গেলেন। উনার বিজনেস মিটিংগুলো শেষ হলে উনি ল্যাপটপ বন্ধ করে আমার বুকে মাথা রাখতেন। আমাকে আদর করতেন। কিন্তু আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত, ঠান্ডা ভয় জমতে শুরু করেছিল।
আমি গন্ধ পাচ্ছিলাম।
মানুষ যেমন বৃষ্টির আগে বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ পায়, তেমনি আমি আনিকার শরীরের ঘ্রাণের সাথে সাথে একটা বিদায়ের গন্ধ পাচ্ছিলাম। চলে যাওয়ার গন্ধ। আমি খুব ভালো করেই জানি, আনিকা এখানে চিরকাল থাকবেন না।
এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, এই সেন্ট্রাল এসি, এই ঢাকা শহর— এগুলো উনার আসল জীবন নয়। উনার আসল জীবন ওই টেমস নদীর পাড়ে, ওই ঠান্ডা, কুয়াশাচ্ছন্ন শহরে, যেখানে উনার ফার্ম আছে, স্ট্যাটাস আছে, ব্যাংক ব্যালেন্স আছে।
আর আমি?
আমি রাশেদ আহমেদ। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক। আমি বড়জোর মিরপুরের মেস থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত আসতে পারি। কিন্তু আমার ডানা এত বড় নয় যে আমি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উনার আকাশে গিয়ে উড়ব।
আমি তো উনার জীবনের একটা 'ভ্যাকেশন' বা ছুটি কাটানোর উপকরণ মাত্র। মানুষ যখন পাহাড়ে বা সমুদ্রে বেড়াতে যায়, তখন সে সেখানকার কোনো একটা সুন্দর জিনিস দেখে মুগ্ধ হয়, কয়েকদিন সেটা নিয়ে মেতে থাকে। কিন্তু ছুটি শেষে যখন সে নিজের যান্ত্রিক জীবনে ফিরে যায়, তখন ওই পাহাড় বা সমুদ্রকে সে তার সুটকেসে ভরে নিয়ে যেতে পারে না। তাকে ওই স্মৃতিগুলো ওখানেই ফেলে রেখে যেতে হয়।
আনিকার জীবনে আমিও ঠিক সেই পাহাড় বা সমুদ্রের মতো একটা সাময়িক স্মৃতি। উনি উনার ট্রমা, উনার একাকিত্ব কাটানোর জন্য আমাকে ব্যবহার করেছেন। আমিও হাসিমুখে ব্যবহৃত হয়েছি। কিন্তু ছুটি তো ফুরিয়ে আসছে।
মাঝে মাঝে রাতে যখন আনিকা আমার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতেন, আমি উনার চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে ভাবতাম— আমি কি উনাকে একবার বলব থেকে যেতে? আমি কি উনাকে বলব— "আনিকা, ওই লন্ডন, ওই আইটি ফার্ম সব ছেড়ে দাও। আমার পঁচিশ হাজার টাকার জীবনে তুমি হয়তো এই এসি বা এই লেদার সোফা পাবে না, কিন্তু আমার যে বিশাল একটা বুক আছে, সেখানে তুমি সারাজীবন রানীর মতো থাকতে পারবে।" কিন্তু পরক্ষণেই আমার নিজের ওপর ভীষণ হাসি পেত।
এসব তো বাংলা সিনেমার সস্তা ডায়ালগ! বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আনিকা নাওহারের মতো একজন বিলিয়নিয়ার নারী আমার পঁচিশ হাজার টাকার ভালোবাসায় এক সপ্তাহও টিকতে পারবেন না। উনার শ্যানেল পারফিউমের একটা বোতলের দামই হয়তো আমার দুই মাসের বেতনের সমান।
আমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ। আমি বাস্তবতা বুঝি।
তাই আমি আনিকাকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি, "তুমি কবে যাবে?" আমি জানি, এই প্রশ্নটা করলেই আমাদের মাঝখানের এই সুন্দর, মায়াবী বিভ্রমটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। লজিক আর বাস্তবতা এসে আমাদের এই প্রেমের বেডরুমে ঢুকে পড়বে।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব না। যেদিন উনার ফ্লাইট থাকবে, সেদিন উনি আমাকে বলবেন। উনি উনার সুটকেস প্যাক করবেন। আমি হয়তো উনাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসব। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে, একটা উবার ডেকে সোজা মিরপুরের সেই স্যাঁতস্যাঁতে মেসে ফিরে যাব। রাজু আর তুহিন হয়তো আমাকে দেখে অবাক হবে। আমি হয়তো বাথরুমে ঢুকে কলের পানি ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদব। তারপর আবার পরের দিন সকালে বিকল্প বাসে ঝুলে কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে পুতিন আর বাইডেনের খবর অনুবাদ করব।
জীবন তো এভাবেই চলে। জীবন তো আর থেমে থাকে না।
কিন্তু যদ্দিন উনি আছেন! যদ্দিন এই অপ্সরী নারী আমার বিছানায় আছেন, যদ্দিন উনার এই ফর্সা, মসৃণ, ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত শরীরটা আমার হাতের মুঠোয় আছে— আমি তীব্রভাবে, বন্যভাবে এবং আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এই সুখ ভোগ করতে চাই।
আমি চাই, উনার শরীরের এমন কোনো কোষ বাকি না থাকুক, যেটা আমার স্পর্শের স্মৃতি মনে রাখবে না। উনি যখন লন্ডনের ওই ঠান্ডা বিছানায় একা শুয়ে থাকবেন, তখন যেন উনার চামড়ার নিচে আমার দেওয়া চুমুগুলোর উষ্ণতা উনাকে পাগল করে দেয়। আমি উনার শরীরে আমার ভালোবাসার, আমার কামনার এমন একটা অদৃশ্য সিলমোহর মেরে দিতে চাই, যা পৃথিবীর অন্য কোনো পুরুষ কোনোদিন মুছতে পারবে না।
জুন মাসের ২৪ তারিখ। শুক্রবার।
আজ আমার অফিস নেই। আনিকারও কোনো ল্যাপটপের কাজ নেই। দুপুরবেলা। বাইরে কড়া রোদ। ফ্ল্যাটের পর্দাগুলো সব টানা। আনিকা গোসল করে এসে মাত্র একটা সাদা রঙের তোয়ালে শরীরে জড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। আমি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। উনার সেই ফর্সা কাঁধ, তোয়ালের ওপর দিয়ে উঁকি দেওয়া উনার স্তনের স্ফীতি, আর উনার সেই সুডৌল, মসৃণ পা।
আমার বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত, আদিম ড্রামটা বাজতে শুরু করল। চলে যাওয়ার গন্ধটা আজ বাতাসে একটু বেশিই প্রকট। আর সেই গন্ধটাই আমার কামনার আগুনে ঘি ঢেলে দিল। আমি বিছানা থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। আমি আনিকার পেছনে গিয়ে উনার ফর্সা, খালি কাঁধে আমার মুখটা রাখলাম। আয়নায় আমাদের দুজনের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
আনিকা চিরুনি চালানো থামিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। উনার চোখে একটা প্রশান্তির আভা।
"কী হলো মিস্টার অনুবাদক?" আনিকা উনার মাথাটা একটু পেছনের দিকে, আমার বুকের ওপর হেলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন। "আবার ইচ্ছা করছে?"
আমি কোনো কথা বললাম না। আমি আমার দুই হাত উনার পেটের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে, তোয়ালের সেই গিঁটটার ওপর রাখলাম।
তারপর এক টানে তোয়ালেটা খুলে ফ্লোরে ফেলে দিলাম। আয়নায় উনার সেই সম্পূর্ণ নগ্ন, ঐশ্বরিক শরীরটা প্রতিফলিত হলো। আমি উনার ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে উনার সেই শ্যাম্পু আর পারফিউম মেশানো ঘ্রাণটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফুসফুসে ভরে নিলাম।
"আমি তোমাকে পুরোটা চাই আনিকা," আমি উনার কানের লতিটা হালকা কামড়ে ধরে ফিসফিস করে বললাম। "আজ, এই মুহূর্তে। এমনভাবে চাই, যেন কাল সকালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমার কোনো আক্ষেপ না থাকে।"
আনিকা উনার চোখ দুটো বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। উনি উনার শরীরটাকে পুরোপুরি আমার হাতের ওপর ছেড়ে দিলেন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)