13-09-2026, 09:51 PM
১৩
রাত তখন পৌনে দুটো।
"হ্যান্ডস আপ! যে যেখানে আছিস একদম সেভাবে দাঁড়িয়ে থাক্ ! কেউ নড়বে না!"
বাইপাসের ধারে অবস্থিত নির্জন প্রাইভেট ক্লাবে পার্টির উন্মাদনা হঠাৎ করে চোখের পলকে বিশৃঙ্খলায় বদলে গেল।
নিষিদ্ধ প্রমোদকাননের মোহময়ী ভাবটা কেটে গিয়ে একটা কুৎসিত রূপ নিল।
সোফায় বসে থাকা নামীদামী ঘরের ছেলেরা যাদের কারোর হাতে মদের গ্লাস, কারোর কোলে মেয়ে, আবার কেউ টেবিল রাখা থালা থেকে ড্রাগস টানছিল, তারা হঠাৎ চোখের সামনে পুলিশের টিমকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ল। অনেকেই ভয়ে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
কোন অভিজাত ক্লাবে পুলিশ সচরাচর এভাবে পা ফেলে না। বিশেষ করে যেসব জায়গায় শহর কলকাতার ডাকসাইটে ব্যবসায়ী, রিয়েল এস্টেট প্রমোটার আর আমলাদের বখে যাওয়া বাছাধনরা প্রাইভেট পার্টি করে।
কিন্তু, আজ রাতে তার ব্যতিক্রম ঘটল।
এর মধ্যেই মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় সোফা থেকে তেড়ে উঠতে গিয়ে সপাসপ দুটো লাঠির বাড়ি খেয়ে একজন সোজা মেঝেতে বসে পড়ল।
বিপদ দেখে রকি ততক্ষণে পেছনের ইমার্জেন্সি দরজার দিকে দৌড় লাগিয়েছে। বিক্রম অবশ্য এখানে উপস্থিত ছিল না তাই তার জানা ছিল না যে কী ঘটছে। সে জাস্ট একটু আগে মেধাকে চুল ধরে টানতে টানতে ভিআইপি স্যুটের দিকে নিয়ে গেছে।
সেটা দেখে তখন যারা হাসাহাসি করছিল, শিস দিচ্ছিল তারাই এখন পুলিশের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।
১৪
বিছানার সিল্কের চাদরটা মেধার থাইয়ের কাছে দলা পাকিয়ে আছে। তার গায়ের ব্যাকলেস ড্রেসের ওপরের অংশটা ছিঁড়ে ঝুলছে, উন্মুক্ত বুকের ওপর লালা জমেছে। বিক্রম ওর একটা স্তনের বোঁটা মুখে নিয়ে চুষছিল তখন ওর মুখ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়েছে।
বাইরে থেকে হট্টগোলের আওয়াজ আসতেই মেধার ওপর ঝুঁকে থাকা বিক্রমের শরীরটা শক্ত হয়ে গেল।
বিক্রম মালহোত্রা মাথা তুলল। ফর্সা মুখটা মদের নেশায় লাল, শার্টের বোতামগুলো ছেঁড়া, নিঃশ্বাসে মদের গন্ধ
"হোয়াট দ্য ফাক...?" সে বিড়বিড় করে উঠল।
বিক্রমের লাল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য দরজার দিকে ঘুরে গেল, কিন্তু তার চোখে-মুখে ভয়ের কোন চিহ্ন ফুটে উঠল না। বরং সে জায়গায় ফুটে উঠল আক্রোশ।
"হোয়াট দ্য ফাক ইজ দিস?"
বিক্রমের কন্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে, কিন্তু হিংস্র ভাবটা স্পষ্ট। সে তখনও মেধার ডান হাতের কবজিটা চিমটের মতো চেপে ধরেছিল।
মেধা ভীতু চোখে বিক্রমের মুখের দিকে তাকাল।
সে কোনোক্রমে গলা থেকে আওয়াজ বের করল,
"বিক্রম... ছ-ছাড়ো... পুলিশ এসেছে... প্লিজ আমায় ছেড়ে দাও..."
"চুপ কর, ছেনাল!"
বিক্রম একটা হুংকার ছেড়ে মেধার গালে সপাটে এক চড় বসাল।
ঠাস!
মেধার মাথাটা বালিশের ওপর ঘুরে গেল। শক্ত হাতের থাপ্পড়ের চোটে তার নরম ঠোঁটটা কেটে গিয়ে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
"কী হচ্ছেটা কী এসব? কার পারমিশনে ঢুকেছে ওরা এখানে? ডোন্ট দে নো হু দ্য হেল আই অ্যাম?"
ওর চোয়াল পাথরের মতো শক্ত , চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো লাল।
এমন সময় বাইরে থেকে ভারী কিছু ছিটকে পড়ার আওয়াজ এল। দরজার ওপাশে হুলস্থুলটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। মেঝের ওপর বুটের শব্দটা খুব স্পষ্ট, বাইরে করিডর থেকে আসছে। তার সাথে একতলা থেকে
নানা কণ্ঠের চিৎকার।
বিক্রম নিঃশ্বাস ফেলার সময় নিল না। মেধার শরীরটাকে একটা আবর্জনার মতো এক ধাক্কায় বিছানার উল্টোদিকে ফেলে দিল সে। মেধার মাথাটা গিয়ে লাগল কাঠের সাইড-টেবিলের কোণায়। একটা অস্ফুট কুঁকড়ে যাওয়া শব্দ ছাড়া সে আর কিছু করে উঠতে পারল না। শুধু অসাড় আঙুল দিয়ে ভাঙা জামার অংশটা বুকের ওপর টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল।
বিক্রমের মদের নেশাটা কিন্তু ততক্ষণে হঠাৎ করে এক ঝটকায় বেশ খানিকটা পাতলা হয়ে এসেছে। তবে ভয় নয়, তার মাথার ভেতর তখন কাজ করছে এক ধরনের জেদ।
কলকাতার কোন থানার ওসির ঘাড়ের ক-টা মাথা যে তার পার্টিতে রেড চালায় ?
ওর বাবা চাইলে কাল সকাল ন-টার মধ্যে এই রেডের দায়িত্বে থাকা পুরো ব্যাচটার ইউনিফর্ম থেকে ব্যাজ খুলে নিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে... এই মুহূর্তে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বোকামি।
মিডিয়া যদি ক্লাবের বাইরে উপস্থিত থাকে, তবে স্ক্যান্ডালটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি হলে বিশ মিনিট সময় নেবে।
"হারামজাদা রকিটা পালাল নাকি?"
বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনে বিড়বিড় করল।
কামরার সিলিংয়ে ছোট ছোট ট্র্যাক-লাইট জ্বলছিল। মেঝের কার্পেটের ওপর নিজের বহুমূল্য রোলেক্স ঘড়িটা পড়ে থাকতে দেখেও সেদিকে নজর দিল না বিক্রম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা গাড়ির চাবি আর নিজের পার্সোনাল সেটের আইফোনটা পকেটে গলিয়ে নিল সে। তার হাতদুটো হালকা কাঁপছিল বটে তবে সে নিজেকে সামলে নিল।
এমন সময়...
"তিন নম্বর রুমটা চেক করো! জলদি!"
ওপাশের গলার আওয়াজটা খুব বেশি দূরে নয়। অনেকগুলো বুটের আওয়াজ আসছে। কমসে কম তিন-চারজন এই স্যুইটের দিকে এগোচ্ছে।
বিক্রম মেধার দিকে একবার শেষ নজর বুলাল। মালটা খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে আছে। চোখ দুটো ফোলা, ঠোঁটের পাশ দিয়ে সরু সুতোর রক্ত গড়িয়ে নামছে চোয়াল পর্যন্ত।
"একদম মুখ খুলবি না,"
বিক্রম ওর দিকে ঝুঁকে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল,
"একটা কথা যদি মিডিয়া বা পুলিশের কাছে বের করেছিস, তোর বাপকে কালকে দুনিয়া থেকে গায়ের করে দেব। মনে থাকে যেন।"
উত্তরে মেধা কিছু বলল না। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে কাঠের মেঝের ওপর কপাল ঠেকিয়ে পড়ে রইল।
বিক্রম আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।
১৪
ঘরটার উত্তর-পশ্চিম কোণে, ভারী ভেলভেটের পর্দার আড়ালে একটা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আছে। ফ্রেমটা কাঠের, লকটা পুরোনো, অনেকদিন তেল পড়েনি। বিক্রম হাতলটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারতেই কিঁচকিঁচ শব্দ করে পাল্লাটা খুলে গেল, বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা ওর মুখের ওপর আছড়ে পড়ল।
বাথরুমে বা বাইরের বারান্দায় লুকোনোর জায়গা নেই সেটা ও ভালো করেই জানে। ক্লাবের এই ভিআইপি উইংটার নকশা ওর নখদর্পণে। সে বহুবার এখানে সারা রাত কোন মেয়ের শরীর নিয়ে খেলেছে।
"দেরি করছ কেন? লকটা ভাঙো!"
বাইরে থেকে একজন চড়া গলার অফিসারের হাঁক ভেসে এল।
বিক্রম এক সেকেন্ডের জন্য থমকাল। নিচে তাকাল সে।
দোতলা থেকে সোজা নিচে নামার কোনো ফায়ার এস্কেপ নেই এখানে।
ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর বাইরে দেওয়াল ঘেঁষে নেমে গেছে চার ইঞ্চির মোটা একটা পিভিসি পাইপ আর তার পাশে ক্লাবের ডেকোরেশনের জন্য লাগানো বেশ কিছু লতা-ঝোপের ঝালর। পাইপটা সোজা গিয়ে নেমেছে ক্লাবের পেছনের সার্ভিস প্রাঙ্গণ আর সীমানা প্রাচীরের মাঝামাঝি একটা নিচু, অন্ধকার ঝোপের মধ্যে।
মেঝের ওপর পড়ে থাকা মেধার দিকে আর একবারও ফিরে তাকাল না সে। পকেটে আইফোন আর চাবিটা ভালোভাবে চেপে ধরে সে জানলার কার্নিশে পা দিল।
মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য চক্কর দিয়ে উঠল। মদ একটু বেশি টানা হয়ে গেছে। ইএম বাইপাসে দ্রুতগামী লরির হেডলাইটের আলো এক চিলতে আলোর রেখা ফেলে চলে যাচ্ছে।
"শিট..."
দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল বিক্রম। দরজায় তখন প্রথম কোপের আওয়াজ পাওয়া গেল।
আর ভাবার সময় ছিল না। বিক্রম ঝাঁপ দিল না, বরং জানলার বাইরের সরু কার্নিশটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে দেওয়াল ঘেঁষে নিজেকে ঝুলিয়ে দিল। হাত দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। কার্নিশের ধারালো প্লাস্টার ওর হাতের তালুর চামড়া চেঁচে বের করে নিল। রোলেক্স ঘড়িটা বেডরুমে ফেলে আসার আফসোসটা চামড়া-ছাড়ানো যন্ত্রণায় মিলিয়ে গেল।
পাইপটা ধরল সে। ভেজা, শেওলা ধরা পাইপ। বিক্রমের পা দুটো শূন্যে দু-একবার হাতড়ে পেল দেয়ালের খাঁজ। নামতে শুরু করল সে। তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে ওর ডান পা-টা পিছলে যাচ্ছিল।
"উফ!"
হাত থেকে পাইপের গ্রিপ প্রায় পিছলে যাচ্ছিল। কনুইয়ের চামড়া ঘষে গিয়ে জামার হাতা ছিঁড়ে গেল। হাড়ের ভেতর পর্যন্ত একটা তীব্র কনকনানি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু, বিক্রম সেসব অনুভব করছিলাম না। ভয়ের ধাক্কায় ওর পেটের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আসছিল। পুলিশ যদি উপরে ঘরে ঢুকে পড়ে আর জানলা দিয়ে আলো ফেলে, তবে সব শেষ।
নিজের পুরো শরীরের ওজনটা কায়দা করে ডান কনুই আর বাঁ হাতের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে তরতর করে নিচের দিকে নামতে থাকল। নিচে যখন পৌঁছাল, তখন ওর দু-হাতের চেটো কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, দামি শার্টের অর্ধেক অংশ ছিঁড়ে ঝুলছে আর জুতো জোড়া কাদা-জলে প্যাচপ্যাচ করছে।
ক্লাবের পেছনের দিকটা ভীষণ অন্ধকার। ঘন ঝোপ। পাশে বড় বড় দুটো ড্রাবের নীল জঞ্জাল ফেলার ড্রাম রাখা। বাইপাসের মূল রাস্তা থেকে জমি অনেকটা নিচু।
বিক্রম সোজা গিয়ে পড়ল সেই জঞ্জালের স্তূপের পাশটিতে। ঝোপের কাঁটা ওর গালে আঁচড় কেটে দিল। কাদার ভেতর শুয়ে পড়ে সে হাঁপাতে লাগল। বুকের ছাতিটা ফুঁসফুঁস করে উঠছে, রক্তের মধ্যে ড্রাগস আর অ্যাড্রেনালিনের তীব্র লড়াই চলছে।
"ওপরটা সব ক্লিয়ার করো! ব্যাটা কোনদিক দিয়ে পালাল দেখ!"
উপর থেকে, অর্থাৎ তিনতলার জানলা দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়ল নিচের ঝোপের কিছু অংশে।
বিক্রম সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের একদম গভীরে, কাদা আর পচা পাতার স্তূপের মধ্যে নিজেকে সিঁটিয়ে নিল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখল সে। টর্চের সাদা আলোটা ওর মাথার মাত্র ফুটচারেক ওপর দিয়ে বারকয়েক ঘুরে গিয়ে আবার ওপরে উঠে গেল।
'বেঁচে গেছি...' ভাবল বিক্রম।
ওর মাথায় তখন একটাই ছক কাজ করছে। এই ঝোপের ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। পুলিশ যখন মেইন গেট আর ভেতরটা সার্চ করতে ব্যস্ত থাকবে, তখন আস্তে আস্তে দেওয়াল টপকে সোজা বাইপাসের উল্টো দিকের সার্ভিস রোডে উঠতে হবে। সেখান থেকে কোনো অ্যাপ-ক্যাব কিংবা লিফট নিয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে চলে যাওয়া যাবে। কাল সকালে বাবা যখন জানতে পারবে, ততক্ষণে সব আইনি ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কিন্তু বিক্রম হিসেব করতে ভুল করেছিল।
সে ভেবেছিল পুলিশ টিমটা শুধু সামনের গেট দিয়ে রেড করতে এসেছে। সে জানত না, পুলিশ এই ক্লাবের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে।
ঝোপের ভেজা মাটিতে পেট ঠেকিয়ে বিক্রম যখন ইঞ্চি ইঞ্চি করে পেছনের সীমানা দেওয়ালের দিকে সরছিল, ঠিক তখনই ওর খুব কাছে, মাত্র কয়েক গজ দূরে শুকনো পাতার ওপর ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল।
"এদিকটা সার্ভিস এরিয়া। পেছনের জানলা দিয়ে কেউ স্লাইড করে নামতে পারে। লাইটটা নিয়ে এসো তো।"
কথাটা শুনেই বিক্রমের হৃদপিণ্ডের গতি যেন থমকে গেল।
সে আরও চেপে বসল ঝোপের কাদায়। প্যান্টের ভেতর আইফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল, কিন্তু সে হাত বাড়াতে পারল না।
কাদাজলে ওর ব্র্যান্ডেড ট্রাউজার ভিজে ঢোল হয়ে গেছে। গালে যেখানটায় কাঁটার আঁচড় লেগেছিল সে জায়গাটা কেটে গিয়ে জ্বালা করছে। কিন্তু এখন ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ভয়ের অনুভূতিটা।
দু-জন পুলিশ কনস্টেবল টর্চের চওড়া আলো ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছে ঝোপের দিকে। আলোর বৃত্তটা এদিক-ওদিক ঘুরছে।
একটা সাদা আলো সোজা এসে পড়ল বিক্রমের মাথার ওপরের বোগেনভিলিয়া ডালটায়।
"ওদিকে কিছু আছে নাকি?"
"না স্যর, জঞ্জাল আর কাদা... দাঁড়া, ওই ড্রামটার পেছনটা একবার দেখি।"
বিক্রম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। নেশার চোটে এমনিতেই স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে এসেছিল, তার ওপর পুলিশের গলার আওয়াজ এত কাছে শুনে ওর ভেতরের প্যানিকটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে যদি চুপচাপ শুয়ে থাকত, হয়তো অন্ধকারের সুবাদে ছাড় পেয়েও যেতে পারত। কিন্তু ভয়ের চোটে সে ভুলটা করে বসল।
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য সে যেই না কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠতে গেল, অমনি পাশে থাকা এক গাদা শুকনো মরা ডাল মটমট করে ভেঙে গেল।
"কোথাও কেউ একটা আছে! এই যে! কে ওখানে? বেরোও!"
টর্চের আলোটা এক মুহূর্তের মধ্যে এসে স্থির হলো বিক্রমের ভেজা, কাদা-মাখা মুখের ওপর।
আলোর তীব্রতায় বিক্রম চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল। হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল সে।
"হ্যান্ডস আপ! নড়বে না একদম!"
কাদা থেকে ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই বিক্রমের পা পিছলে গেল।
ততক্ষণে ঝোপের আড়াল ঠেলে দু-জন রিভলভার উঁচানো সার্জেন্ট আর চারজন লাঠিধারী কনস্টেবল বেরিয়ে এসেছে।
"ওরে বাবা! এ তো সেই স্যুটের মালটা রে! ঝোপের ভেতর লুকিয়ে আছে!"
একজন সার্জেন্ট চেঁচিয়ে উঠল।
"নো! ডোন্ট টাচ মি! ইউ নো হু আই অ্যাম? তোদের সাহস কী করে হয়?"
বিক্রম একজন সার্জেন্টের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। তার গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে।
"তোরা জানিস আমি কে? আমি বিক্রম মালহোত্রা! রজনীশ মালহোত্রার ছেলে! এক মিনিটে তোদের সবার ইউনিফর্ম খুলিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেব! ড্যাম ইট!"
"শাট আপ বাস্টার্ড! তোর বাপের নাম ভাঙানো আজ রাতে বের করে দিচ্ছি!"
উত্তরে বিক্রম এক কনস্টেবলের জামার কলার আঁকড়ে ধরে তাকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু এটা ওর বাবার চাটুকারদের জায়গা নয়।
পরের মুহূর্তেই একটা মোটা কাঠের লাঠি সোজা এসে পড়ল বিক্রমের উরুর পেশিতে।
"আআআহ্!"
একটা আর্তনাদ করে হাঁটু মুড়ে কাদাতেই বসে পড়ল সে।
"বাপের নাম ভাঙাচ্ছিস? অনেক ক্ষ্যামতা না? চল, থানায় চল, তোর বাপের নামটাও ডায়েরিতে তুলছি!"
দ্বিতীয় লাঠির বাড়িটা পড়ল ওর পিঠের ওপর।
বিক্রমের দামি শার্টের বাঁ দিকটা ছিঁড়ে কাদার সাথে এক হয়ে গেল। একজন কনস্টেবল বিক্রমের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে কাদা থেকে তুলে দাঁড় করাল।
বিক্রমের মাথার ভেতরটা তখন যন্ত্রণায় ভোঁ-ভোঁ করছে। গালে লাগা রক্ত আর কাদা মিশে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। যে আক্রোশ এতক্ষণ ওর রগে রগে ছুটছিল, লাঠির মারের চোটে বেলুনের মতো ফুটো হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ওর হাত দুটোকে জোর করে পেছনের দিকে টেনে এনে কষে চেপে বসল ইস্পাতের ঠাণ্ডা হাতকড়াটা।
'ক্লিক।'
শব্দটা বিক্রমের কানের কাছে খুব স্পষ্ট শোনাল।
"হাঁটো! সোজা হাঁট!"
পেছন থেকে কলার আর চুল ধরে একটা বিশ্রী ধাক্কা দেওয়া হলো। বাইপাসের ধার ঘেঁষে দাঁড় করানো লাল-নীল আলো জ্বলা পুলিশের ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল বিক্রমকে।
যে বিক্রম মালহোত্রা আধ ঘণ্টা আগেও একটা মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল, শহরের একটা দামি ক্লাবে বসে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছিল, সে এখন কাদা মাখা জামাকাপড়ে, হাঁটুতে রক্ত নিয়ে, কলার ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া একটা অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিক্রম মাথা নিচু করার চেষ্টা করল, কিন্তু সার্জেন্টের কড়া হাতের মুঠো ওর ঘাড়টা শক্ত করে সোজা সামনের দিকে ধরে রাখল।
গাড়ির পেছনের খাঁচার মতো দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। আর বিক্রমকে ভেতরে ছুঁড়ে ফেলার মতো করে ধাক্কা মেরে তুলে দেওয়া হলো।
ভেতরের লোহা র মেঝেয় কপাল ঠুকে যেতেই বিক্রম এক পলকের জন্য মেধার চোখের সেই আতঙ্কিত রূপটা মনে করতে পারল, যা সে একটু আগেও ওই তিনতলার ভিআইপি স্যুটে রেখে এসেছে। পার্থক্য শুধু একটাই, তখন মেধা কাদায় পড়েছিল, আর এখন কাদা বিক্রমের নিজের মুখে।
রাত তখন পৌনে দুটো।
"হ্যান্ডস আপ! যে যেখানে আছিস একদম সেভাবে দাঁড়িয়ে থাক্ ! কেউ নড়বে না!"
বাইপাসের ধারে অবস্থিত নির্জন প্রাইভেট ক্লাবে পার্টির উন্মাদনা হঠাৎ করে চোখের পলকে বিশৃঙ্খলায় বদলে গেল।
নিষিদ্ধ প্রমোদকাননের মোহময়ী ভাবটা কেটে গিয়ে একটা কুৎসিত রূপ নিল।
সোফায় বসে থাকা নামীদামী ঘরের ছেলেরা যাদের কারোর হাতে মদের গ্লাস, কারোর কোলে মেয়ে, আবার কেউ টেবিল রাখা থালা থেকে ড্রাগস টানছিল, তারা হঠাৎ চোখের সামনে পুলিশের টিমকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ল। অনেকেই ভয়ে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
কোন অভিজাত ক্লাবে পুলিশ সচরাচর এভাবে পা ফেলে না। বিশেষ করে যেসব জায়গায় শহর কলকাতার ডাকসাইটে ব্যবসায়ী, রিয়েল এস্টেট প্রমোটার আর আমলাদের বখে যাওয়া বাছাধনরা প্রাইভেট পার্টি করে।
কিন্তু, আজ রাতে তার ব্যতিক্রম ঘটল।
এর মধ্যেই মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় সোফা থেকে তেড়ে উঠতে গিয়ে সপাসপ দুটো লাঠির বাড়ি খেয়ে একজন সোজা মেঝেতে বসে পড়ল।
বিপদ দেখে রকি ততক্ষণে পেছনের ইমার্জেন্সি দরজার দিকে দৌড় লাগিয়েছে। বিক্রম অবশ্য এখানে উপস্থিত ছিল না তাই তার জানা ছিল না যে কী ঘটছে। সে জাস্ট একটু আগে মেধাকে চুল ধরে টানতে টানতে ভিআইপি স্যুটের দিকে নিয়ে গেছে।
সেটা দেখে তখন যারা হাসাহাসি করছিল, শিস দিচ্ছিল তারাই এখন পুলিশের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।
১৪
বিছানার সিল্কের চাদরটা মেধার থাইয়ের কাছে দলা পাকিয়ে আছে। তার গায়ের ব্যাকলেস ড্রেসের ওপরের অংশটা ছিঁড়ে ঝুলছে, উন্মুক্ত বুকের ওপর লালা জমেছে। বিক্রম ওর একটা স্তনের বোঁটা মুখে নিয়ে চুষছিল তখন ওর মুখ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়েছে।
বাইরে থেকে হট্টগোলের আওয়াজ আসতেই মেধার ওপর ঝুঁকে থাকা বিক্রমের শরীরটা শক্ত হয়ে গেল।
বিক্রম মালহোত্রা মাথা তুলল। ফর্সা মুখটা মদের নেশায় লাল, শার্টের বোতামগুলো ছেঁড়া, নিঃশ্বাসে মদের গন্ধ
"হোয়াট দ্য ফাক...?" সে বিড়বিড় করে উঠল।
বিক্রমের লাল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য দরজার দিকে ঘুরে গেল, কিন্তু তার চোখে-মুখে ভয়ের কোন চিহ্ন ফুটে উঠল না। বরং সে জায়গায় ফুটে উঠল আক্রোশ।
"হোয়াট দ্য ফাক ইজ দিস?"
বিক্রমের কন্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে, কিন্তু হিংস্র ভাবটা স্পষ্ট। সে তখনও মেধার ডান হাতের কবজিটা চিমটের মতো চেপে ধরেছিল।
মেধা ভীতু চোখে বিক্রমের মুখের দিকে তাকাল।
সে কোনোক্রমে গলা থেকে আওয়াজ বের করল,
"বিক্রম... ছ-ছাড়ো... পুলিশ এসেছে... প্লিজ আমায় ছেড়ে দাও..."
"চুপ কর, ছেনাল!"
বিক্রম একটা হুংকার ছেড়ে মেধার গালে সপাটে এক চড় বসাল।
ঠাস!
মেধার মাথাটা বালিশের ওপর ঘুরে গেল। শক্ত হাতের থাপ্পড়ের চোটে তার নরম ঠোঁটটা কেটে গিয়ে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
"কী হচ্ছেটা কী এসব? কার পারমিশনে ঢুকেছে ওরা এখানে? ডোন্ট দে নো হু দ্য হেল আই অ্যাম?"
ওর চোয়াল পাথরের মতো শক্ত , চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো লাল।
এমন সময় বাইরে থেকে ভারী কিছু ছিটকে পড়ার আওয়াজ এল। দরজার ওপাশে হুলস্থুলটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। মেঝের ওপর বুটের শব্দটা খুব স্পষ্ট, বাইরে করিডর থেকে আসছে। তার সাথে একতলা থেকে
নানা কণ্ঠের চিৎকার।
বিক্রম নিঃশ্বাস ফেলার সময় নিল না। মেধার শরীরটাকে একটা আবর্জনার মতো এক ধাক্কায় বিছানার উল্টোদিকে ফেলে দিল সে। মেধার মাথাটা গিয়ে লাগল কাঠের সাইড-টেবিলের কোণায়। একটা অস্ফুট কুঁকড়ে যাওয়া শব্দ ছাড়া সে আর কিছু করে উঠতে পারল না। শুধু অসাড় আঙুল দিয়ে ভাঙা জামার অংশটা বুকের ওপর টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল।
বিক্রমের মদের নেশাটা কিন্তু ততক্ষণে হঠাৎ করে এক ঝটকায় বেশ খানিকটা পাতলা হয়ে এসেছে। তবে ভয় নয়, তার মাথার ভেতর তখন কাজ করছে এক ধরনের জেদ।
কলকাতার কোন থানার ওসির ঘাড়ের ক-টা মাথা যে তার পার্টিতে রেড চালায় ?
ওর বাবা চাইলে কাল সকাল ন-টার মধ্যে এই রেডের দায়িত্বে থাকা পুরো ব্যাচটার ইউনিফর্ম থেকে ব্যাজ খুলে নিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে... এই মুহূর্তে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বোকামি।
মিডিয়া যদি ক্লাবের বাইরে উপস্থিত থাকে, তবে স্ক্যান্ডালটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি হলে বিশ মিনিট সময় নেবে।
"হারামজাদা রকিটা পালাল নাকি?"
বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনে বিড়বিড় করল।
কামরার সিলিংয়ে ছোট ছোট ট্র্যাক-লাইট জ্বলছিল। মেঝের কার্পেটের ওপর নিজের বহুমূল্য রোলেক্স ঘড়িটা পড়ে থাকতে দেখেও সেদিকে নজর দিল না বিক্রম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা গাড়ির চাবি আর নিজের পার্সোনাল সেটের আইফোনটা পকেটে গলিয়ে নিল সে। তার হাতদুটো হালকা কাঁপছিল বটে তবে সে নিজেকে সামলে নিল।
এমন সময়...
"তিন নম্বর রুমটা চেক করো! জলদি!"
ওপাশের গলার আওয়াজটা খুব বেশি দূরে নয়। অনেকগুলো বুটের আওয়াজ আসছে। কমসে কম তিন-চারজন এই স্যুইটের দিকে এগোচ্ছে।
বিক্রম মেধার দিকে একবার শেষ নজর বুলাল। মালটা খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে আছে। চোখ দুটো ফোলা, ঠোঁটের পাশ দিয়ে সরু সুতোর রক্ত গড়িয়ে নামছে চোয়াল পর্যন্ত।
"একদম মুখ খুলবি না,"
বিক্রম ওর দিকে ঝুঁকে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল,
"একটা কথা যদি মিডিয়া বা পুলিশের কাছে বের করেছিস, তোর বাপকে কালকে দুনিয়া থেকে গায়ের করে দেব। মনে থাকে যেন।"
উত্তরে মেধা কিছু বলল না। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে কাঠের মেঝের ওপর কপাল ঠেকিয়ে পড়ে রইল।
বিক্রম আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।
১৪
ঘরটার উত্তর-পশ্চিম কোণে, ভারী ভেলভেটের পর্দার আড়ালে একটা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আছে। ফ্রেমটা কাঠের, লকটা পুরোনো, অনেকদিন তেল পড়েনি। বিক্রম হাতলটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারতেই কিঁচকিঁচ শব্দ করে পাল্লাটা খুলে গেল, বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা ওর মুখের ওপর আছড়ে পড়ল।
বাথরুমে বা বাইরের বারান্দায় লুকোনোর জায়গা নেই সেটা ও ভালো করেই জানে। ক্লাবের এই ভিআইপি উইংটার নকশা ওর নখদর্পণে। সে বহুবার এখানে সারা রাত কোন মেয়ের শরীর নিয়ে খেলেছে।
"দেরি করছ কেন? লকটা ভাঙো!"
বাইরে থেকে একজন চড়া গলার অফিসারের হাঁক ভেসে এল।
বিক্রম এক সেকেন্ডের জন্য থমকাল। নিচে তাকাল সে।
দোতলা থেকে সোজা নিচে নামার কোনো ফায়ার এস্কেপ নেই এখানে।
ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর বাইরে দেওয়াল ঘেঁষে নেমে গেছে চার ইঞ্চির মোটা একটা পিভিসি পাইপ আর তার পাশে ক্লাবের ডেকোরেশনের জন্য লাগানো বেশ কিছু লতা-ঝোপের ঝালর। পাইপটা সোজা গিয়ে নেমেছে ক্লাবের পেছনের সার্ভিস প্রাঙ্গণ আর সীমানা প্রাচীরের মাঝামাঝি একটা নিচু, অন্ধকার ঝোপের মধ্যে।
মেঝের ওপর পড়ে থাকা মেধার দিকে আর একবারও ফিরে তাকাল না সে। পকেটে আইফোন আর চাবিটা ভালোভাবে চেপে ধরে সে জানলার কার্নিশে পা দিল।
মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য চক্কর দিয়ে উঠল। মদ একটু বেশি টানা হয়ে গেছে। ইএম বাইপাসে দ্রুতগামী লরির হেডলাইটের আলো এক চিলতে আলোর রেখা ফেলে চলে যাচ্ছে।
"শিট..."
দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল বিক্রম। দরজায় তখন প্রথম কোপের আওয়াজ পাওয়া গেল।
আর ভাবার সময় ছিল না। বিক্রম ঝাঁপ দিল না, বরং জানলার বাইরের সরু কার্নিশটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে দেওয়াল ঘেঁষে নিজেকে ঝুলিয়ে দিল। হাত দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। কার্নিশের ধারালো প্লাস্টার ওর হাতের তালুর চামড়া চেঁচে বের করে নিল। রোলেক্স ঘড়িটা বেডরুমে ফেলে আসার আফসোসটা চামড়া-ছাড়ানো যন্ত্রণায় মিলিয়ে গেল।
পাইপটা ধরল সে। ভেজা, শেওলা ধরা পাইপ। বিক্রমের পা দুটো শূন্যে দু-একবার হাতড়ে পেল দেয়ালের খাঁজ। নামতে শুরু করল সে। তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে ওর ডান পা-টা পিছলে যাচ্ছিল।
"উফ!"
হাত থেকে পাইপের গ্রিপ প্রায় পিছলে যাচ্ছিল। কনুইয়ের চামড়া ঘষে গিয়ে জামার হাতা ছিঁড়ে গেল। হাড়ের ভেতর পর্যন্ত একটা তীব্র কনকনানি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু, বিক্রম সেসব অনুভব করছিলাম না। ভয়ের ধাক্কায় ওর পেটের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আসছিল। পুলিশ যদি উপরে ঘরে ঢুকে পড়ে আর জানলা দিয়ে আলো ফেলে, তবে সব শেষ।
নিজের পুরো শরীরের ওজনটা কায়দা করে ডান কনুই আর বাঁ হাতের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে তরতর করে নিচের দিকে নামতে থাকল। নিচে যখন পৌঁছাল, তখন ওর দু-হাতের চেটো কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, দামি শার্টের অর্ধেক অংশ ছিঁড়ে ঝুলছে আর জুতো জোড়া কাদা-জলে প্যাচপ্যাচ করছে।
ক্লাবের পেছনের দিকটা ভীষণ অন্ধকার। ঘন ঝোপ। পাশে বড় বড় দুটো ড্রাবের নীল জঞ্জাল ফেলার ড্রাম রাখা। বাইপাসের মূল রাস্তা থেকে জমি অনেকটা নিচু।
বিক্রম সোজা গিয়ে পড়ল সেই জঞ্জালের স্তূপের পাশটিতে। ঝোপের কাঁটা ওর গালে আঁচড় কেটে দিল। কাদার ভেতর শুয়ে পড়ে সে হাঁপাতে লাগল। বুকের ছাতিটা ফুঁসফুঁস করে উঠছে, রক্তের মধ্যে ড্রাগস আর অ্যাড্রেনালিনের তীব্র লড়াই চলছে।
"ওপরটা সব ক্লিয়ার করো! ব্যাটা কোনদিক দিয়ে পালাল দেখ!"
উপর থেকে, অর্থাৎ তিনতলার জানলা দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়ল নিচের ঝোপের কিছু অংশে।
বিক্রম সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের একদম গভীরে, কাদা আর পচা পাতার স্তূপের মধ্যে নিজেকে সিঁটিয়ে নিল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখল সে। টর্চের সাদা আলোটা ওর মাথার মাত্র ফুটচারেক ওপর দিয়ে বারকয়েক ঘুরে গিয়ে আবার ওপরে উঠে গেল।
'বেঁচে গেছি...' ভাবল বিক্রম।
ওর মাথায় তখন একটাই ছক কাজ করছে। এই ঝোপের ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। পুলিশ যখন মেইন গেট আর ভেতরটা সার্চ করতে ব্যস্ত থাকবে, তখন আস্তে আস্তে দেওয়াল টপকে সোজা বাইপাসের উল্টো দিকের সার্ভিস রোডে উঠতে হবে। সেখান থেকে কোনো অ্যাপ-ক্যাব কিংবা লিফট নিয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে চলে যাওয়া যাবে। কাল সকালে বাবা যখন জানতে পারবে, ততক্ষণে সব আইনি ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কিন্তু বিক্রম হিসেব করতে ভুল করেছিল।
সে ভেবেছিল পুলিশ টিমটা শুধু সামনের গেট দিয়ে রেড করতে এসেছে। সে জানত না, পুলিশ এই ক্লাবের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে।
ঝোপের ভেজা মাটিতে পেট ঠেকিয়ে বিক্রম যখন ইঞ্চি ইঞ্চি করে পেছনের সীমানা দেওয়ালের দিকে সরছিল, ঠিক তখনই ওর খুব কাছে, মাত্র কয়েক গজ দূরে শুকনো পাতার ওপর ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল।
"এদিকটা সার্ভিস এরিয়া। পেছনের জানলা দিয়ে কেউ স্লাইড করে নামতে পারে। লাইটটা নিয়ে এসো তো।"
কথাটা শুনেই বিক্রমের হৃদপিণ্ডের গতি যেন থমকে গেল।
সে আরও চেপে বসল ঝোপের কাদায়। প্যান্টের ভেতর আইফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল, কিন্তু সে হাত বাড়াতে পারল না।
কাদাজলে ওর ব্র্যান্ডেড ট্রাউজার ভিজে ঢোল হয়ে গেছে। গালে যেখানটায় কাঁটার আঁচড় লেগেছিল সে জায়গাটা কেটে গিয়ে জ্বালা করছে। কিন্তু এখন ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ভয়ের অনুভূতিটা।
দু-জন পুলিশ কনস্টেবল টর্চের চওড়া আলো ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছে ঝোপের দিকে। আলোর বৃত্তটা এদিক-ওদিক ঘুরছে।
একটা সাদা আলো সোজা এসে পড়ল বিক্রমের মাথার ওপরের বোগেনভিলিয়া ডালটায়।
"ওদিকে কিছু আছে নাকি?"
"না স্যর, জঞ্জাল আর কাদা... দাঁড়া, ওই ড্রামটার পেছনটা একবার দেখি।"
বিক্রম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। নেশার চোটে এমনিতেই স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে এসেছিল, তার ওপর পুলিশের গলার আওয়াজ এত কাছে শুনে ওর ভেতরের প্যানিকটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে যদি চুপচাপ শুয়ে থাকত, হয়তো অন্ধকারের সুবাদে ছাড় পেয়েও যেতে পারত। কিন্তু ভয়ের চোটে সে ভুলটা করে বসল।
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য সে যেই না কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠতে গেল, অমনি পাশে থাকা এক গাদা শুকনো মরা ডাল মটমট করে ভেঙে গেল।
"কোথাও কেউ একটা আছে! এই যে! কে ওখানে? বেরোও!"
টর্চের আলোটা এক মুহূর্তের মধ্যে এসে স্থির হলো বিক্রমের ভেজা, কাদা-মাখা মুখের ওপর।
আলোর তীব্রতায় বিক্রম চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল। হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল সে।
"হ্যান্ডস আপ! নড়বে না একদম!"
কাদা থেকে ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই বিক্রমের পা পিছলে গেল।
ততক্ষণে ঝোপের আড়াল ঠেলে দু-জন রিভলভার উঁচানো সার্জেন্ট আর চারজন লাঠিধারী কনস্টেবল বেরিয়ে এসেছে।
"ওরে বাবা! এ তো সেই স্যুটের মালটা রে! ঝোপের ভেতর লুকিয়ে আছে!"
একজন সার্জেন্ট চেঁচিয়ে উঠল।
"নো! ডোন্ট টাচ মি! ইউ নো হু আই অ্যাম? তোদের সাহস কী করে হয়?"
বিক্রম একজন সার্জেন্টের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। তার গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে।
"তোরা জানিস আমি কে? আমি বিক্রম মালহোত্রা! রজনীশ মালহোত্রার ছেলে! এক মিনিটে তোদের সবার ইউনিফর্ম খুলিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেব! ড্যাম ইট!"
"শাট আপ বাস্টার্ড! তোর বাপের নাম ভাঙানো আজ রাতে বের করে দিচ্ছি!"
উত্তরে বিক্রম এক কনস্টেবলের জামার কলার আঁকড়ে ধরে তাকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু এটা ওর বাবার চাটুকারদের জায়গা নয়।
পরের মুহূর্তেই একটা মোটা কাঠের লাঠি সোজা এসে পড়ল বিক্রমের উরুর পেশিতে।
"আআআহ্!"
একটা আর্তনাদ করে হাঁটু মুড়ে কাদাতেই বসে পড়ল সে।
"বাপের নাম ভাঙাচ্ছিস? অনেক ক্ষ্যামতা না? চল, থানায় চল, তোর বাপের নামটাও ডায়েরিতে তুলছি!"
দ্বিতীয় লাঠির বাড়িটা পড়ল ওর পিঠের ওপর।
বিক্রমের দামি শার্টের বাঁ দিকটা ছিঁড়ে কাদার সাথে এক হয়ে গেল। একজন কনস্টেবল বিক্রমের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে কাদা থেকে তুলে দাঁড় করাল।
বিক্রমের মাথার ভেতরটা তখন যন্ত্রণায় ভোঁ-ভোঁ করছে। গালে লাগা রক্ত আর কাদা মিশে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। যে আক্রোশ এতক্ষণ ওর রগে রগে ছুটছিল, লাঠির মারের চোটে বেলুনের মতো ফুটো হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ওর হাত দুটোকে জোর করে পেছনের দিকে টেনে এনে কষে চেপে বসল ইস্পাতের ঠাণ্ডা হাতকড়াটা।
'ক্লিক।'
শব্দটা বিক্রমের কানের কাছে খুব স্পষ্ট শোনাল।
"হাঁটো! সোজা হাঁট!"
পেছন থেকে কলার আর চুল ধরে একটা বিশ্রী ধাক্কা দেওয়া হলো। বাইপাসের ধার ঘেঁষে দাঁড় করানো লাল-নীল আলো জ্বলা পুলিশের ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল বিক্রমকে।
যে বিক্রম মালহোত্রা আধ ঘণ্টা আগেও একটা মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল, শহরের একটা দামি ক্লাবে বসে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছিল, সে এখন কাদা মাখা জামাকাপড়ে, হাঁটুতে রক্ত নিয়ে, কলার ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া একটা অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিক্রম মাথা নিচু করার চেষ্টা করল, কিন্তু সার্জেন্টের কড়া হাতের মুঠো ওর ঘাড়টা শক্ত করে সোজা সামনের দিকে ধরে রাখল।
গাড়ির পেছনের খাঁচার মতো দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। আর বিক্রমকে ভেতরে ছুঁড়ে ফেলার মতো করে ধাক্কা মেরে তুলে দেওয়া হলো।
ভেতরের লোহা র মেঝেয় কপাল ঠুকে যেতেই বিক্রম এক পলকের জন্য মেধার চোখের সেই আতঙ্কিত রূপটা মনে করতে পারল, যা সে একটু আগেও ওই তিনতলার ভিআইপি স্যুটে রেখে এসেছে। পার্থক্য শুধু একটাই, তখন মেধা কাদায় পড়েছিল, আর এখন কাদা বিক্রমের নিজের মুখে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)