Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
৯

একতলা থেকে উঠে আসা ইডিএম-এর ভারী বেস লাইনটা তিনতলার এই ঘরে এসে একটা চাপা কম্পনে পরিণত হয়েছে। ঘরটা অন্ধকার, তবে ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়। বরং, অন্ধকারের ছায়াকে আরও বেশি ভয়ংকর করে তোলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আলো আসে।

দক্ষিণের ভেন্টিলেটর চুঁইয়ে বাইরের একফালি ধূসর আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘরটা যে খালি নয়, সেটা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।

বিশাল জানলার সামনে, বাইরের নিয়ন আলোর ঠিক উল্টোদিকে মুখ করে রাখা আছে একটা ভারী, চামড়ায় মোড়া উইংব্যাক চেয়ার। এই
অন্ধকারের মধ্যে ওটাকে একটা সিংহাসনের মতো লাগছে। 

চেয়ারের ওপর বসে থাকা মানুষটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। আঁধার তাকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যেন সে অন্ধকারেরই একটা অংশ। 

শুধু ডান হাতটা হাতলের ওপর স্থির হয়ে আছে আর দুটো আঙুলের ফাঁকে ধরা দামি সিগারের ডগাটা অন্ধকারের বুক চিরে লাল হয়ে জ্বলছে। দামি কার্পেটের ওপর ছাই ঝরে পড়ছে। কিন্তু, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। 

তার বয়স হয়তো একুশ কি বাইশ, কিন্তু এই মুহূর্তে ঘরের জমাট নিস্তব্ধতা আর তার শরীরের শিথিল অথচ রাজকয় ভঙ্গিটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এই ছেলেটা কলেজের নিয়ন্ত্রকদের একজন।

হঠাৎ ভারী দরজাটা নিঃশব্দে সামান্য ফাঁক হলো। করিডোরের হলদেটে আলো এক ফালি ছুরির মতো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল। সেই সুযোগে ভেতরে একটা ছায়া প্রবেশ করল। তার জুতোর তলায় একটা চাপা খসখস শব্দ হলো, তারপর ঘরে ঢুকতেই সব আবার আগের মতো স্তব্ধ।

ঘরে ঢুকে সে সন্তর্পণে দরজাটা বন্ধ করে দিল। করিডরের আলোটা আবার হারিয়ে গেল।

সে কয়েক পা এগিয়ে সে চেয়ারটার কয়েক ফুট দূরে এসে দাঁড়াল। 

"বল।" 

অন্ধকার ভেদ করে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল। 

আগন্তুক গলাটা একবার খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিল। তারপর একটা ঢোঁক গিলে বলল,

"সুরঙ্গনা ব্যানার্জী আসেনি। রয়্যাল ক্লাবের গেটে আমাদের লোক আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। আমি মেইন গেটে লোক রেখেছিলাম।"

ছেলেটা যেন নিজের হয়ে সাফাই গাইল, ওর গলার স্বরটা সামান্য কাঁপছে,

"সুরঙ্গনা ওর ফ্ল্যাট থেকেও বেরোয়নি। ইনভিটেশন কার্ডটা দরজার নিচ দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, ও ওটা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।"

চেয়ারে বসে থাকা অবয়বটা একচুলও নড়ল না। সিগারের ধোঁয়াটা শুধু একটা পাতলা কুণ্ডলী পাকিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

অন্ধকার থেকে একটা ভারী শ্বাস ছাড়ার শব্দ এল। 

"ওই মাগিটা আমাদের ইনভিটেশন ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিল ?"

আগন্তুক ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।

"আমরা সবরকম চেষ্টা করেছিরাম ... কিন্তু সুরঙ্গনা বলল যে এই সব প্রাইভেট পার্টিতে সে আসবে না।"

"ফিজিক্সের এইচওডি-র আশকারা পেয়ে কুত্তিটার একটু বেশি অহংকার হয়ে গেছে। শালি নিজেকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরের জিনিস ভাবে, তাই না?

ভাবছে বুড়োটা ওকে বাঁচিয়ে দেবে। ও জানে না কলেজের সুতো কাদের হাতে বাঁধা থাকে। 
এর শাস্তি ওকে পেতে হবে।" 

আগন্তুক চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। এখানে কিছু বলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।

স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মাথার মুখের ওপর একটা সাধারণ প্রফেসর 'না' বলার স্পর্ধা দেখিয়ে বেঁচে যাবে, এমনটা হতেই পারে না। এর শাস্তিটা যে কী বীভৎস হতে পারে, তা ভেবে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটারই একবার বুক কেঁপে উঠল।

সুরঙ্গনা তো অনেক লাকি যে কাউন্সিলের একজন লিডারের চোখে পড়েছিল সে। ওকে আজকের এই পার্টিতে অকশনে তোলার জন্য ডাকা হয়নি। কিন্তু, এখন ওর কী হবে কে জানে ?

"রুডি পৌঁছেছে?"

আবার অন্ধকার থেকে প্রশ্ন ভেসে এল।

"হ্যাঁ... মানে... ওর আসার কথা তো ছিল। আমি নিচে গিয়ে চেক করছি।"

আগন্তুক দ্রুত উত্তর দিল, যেন সে এখান থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজছিল।

"চেক করতে হবে না। উইন্ডো ব্লাইন্ডসটা সরা।"

ছেলেটা দ্রুত গিয়ে জানলার ভারী পর্দা আর ব্লাইন্ডসটা এক টানে সরিয়ে দিল। চারতলার এই প্যানোরামিক কাঁচের জানলা দিয়ে পুরো ড্রাইভওয়ে আর নিচের ভিআইপি ড্রপ-অফ জোনটা পরিষ্কার দেখা যায়। 

নিউ ইয়ার্সের রাত। 

গেস্টহাউসটার বাইরে দামি গাড়ির সারি আর রংবেরঙের আলো।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রাইভওয়েতে চাকার ঘর্ষণ তুলে একটা চকচকে কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল।

"ওই তো, আমাদের সুপারস্টার চলে এসেছে।"

গাড়ির সামনের দরজাটা খুলল। প্রথমে একটা চকচকে অক্সফোর্ড শু পরা পা মাটিতে নামল। 

তারপর বেরিয়ে এল রুডি।

রুডি নামার পর গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে গেল। প্রথমে যে নামল, তাকে দেখে ওপর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার চোখ আটকে গেল।
অঙ্কিতা মজুমদার। কলেজের ডিপার্টমেন্ট অফ ইংলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। বয়স ছাব্বিশ। 

সে এখন একটা ডিপ-কাট, ব্যাকলেস মেরুন ড্রেস পরে আছে। এই শীতে এত ছোট ড্রেস পড়ে ঠাণ্ডা আর অস্বস্তিতে তার শরীরটা কাঁপছে। রুডি একটা হাত অবলীলায় অঙ্কিতার খোলা পিঠের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল। অঙ্কিতা বাধা দিল না, বরং বাধ্য মেয়ের মতো রুডির কাঁধের কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। রুডির কঠোর ট্রেনিংয়ের ফল।

এরপর গাড়ির অন্য দিক থেকে আরেকজন নামল। অদ্রিজা গুহ। কেমিস্ট্রির প্রফেসর, সাতাশ বছর বয়স। তার পরনে একটা টাইট ব্ল্যাক ড্রেস, যেটা তার হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছায়নি। তার সুগঠিত, ফর্সা পা দুটো চকচক করলেও হাই হিলে অনভ্যস্ত পা টলছে। 

গলায় স্রেফ একছড়া পাতলা প্ল্যাটিনামের চেন, চুলে মার্জিত খোঁপা করা, কিন্তু তার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা অবাধ্য কোঁকড়ানো চুল তার ঘাড়ের কাছে সেঁটে রয়েছে।

অদ্রিজার কোমর পেঁচিয়ে, রুডির বাঁ হাতটা নেমে এল। তার কালো ড্রেসের ওপর দিয়ে ওর কড়া আঙুলগুলো সরাসরি তার গোল নিতম্বের ওপর চেপে বসল।

অদ্রিজা টুঁ শব্দটিও করল না।

দু'জন শিক্ষিকা রুডির দুই পাশে দুটো ট্রফির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রুডির দুই 'কুত্তি'। 

রুডি একবার ওপরে চারতলার জানলার দিকে তাকাল। তারপর সে অঙ্কিতা আর অনন্যাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে গেস্টহাউসের এন্ট্রান্সের দিকে এগিয়ে গেল।

ওপরে, সেই অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার ঘোর কাটল ছায়ার লিডারের কথায়।

"দেখলি?"

"হ্যাঁ..."

"আর ফিজিক্সের মালটা ভাবছে, একটা ইনভিটেশন ছুড়ে ফেলে দিয়ে খুব বড় কিছু করে ফেলেছে।

এদিকের ঝামেলা মিটে যাক। তারপর ওই রসে ভরা কুত্তিকে আমি নিজের হাতে সাইজ করব। অদ্রিজার চেয়েও খারাপ অবস্থা করব। এমন চাবকাব যে কুত্তির মতো চার পায়ে সবসময় আমার পায়ের তলায় বসে থাকবে।"

কথা বলতে বলতে ছেলেটা হাতটা সামনে আনল। তার জ্যাকেটের স্লিভ সরে গিয়ে উঁকি দিল একটা মোটা ভারী সোনার ব্রেসলেট।

১০

রাত এগারোটা বত্রিশ।

১৪০ বিপিএম এর হাই-ভোল্টেজ ইডিএম ট্র্যাকের বেসটা ফ্লোরের কাঠের পাটাতন ভেদ করে সরাসরি অর্জুনের জুতোর তলা দিয়ে উঠে বুকের পাঁজরে হাতুড়ির মতো ধাক্কা মারছে। 

ওর মনে হচ্ছে স্ট্রাব লাইটের নীল আর লাল লেজারের ব্লেডগুলো মাতাল হয়ে ডান্স ফ্লোরে নাচানাচি করতে থাকা শরীরগুলোকে যেন টুকরো টুকরো করে কাটছে। 

বাতাসে হাজারো শরীরের গন্ধের সাথে মিশে আছে শ্যানেল নম্বর ফাইভের উগ্র সুবাস, দামী কিউবান সিগারের ভারী ধোঁয়া ও স্পিলড অ্যালকোহলের গন্ধ।

অর্জুনের দুহাতের তালুতে ধরা ভারী মেটালিক ট্রে-টায় রাখা তিনটে ব্লু-লেবেল স্কচের বোতল আর এক বালতি বরফ। 

তার পরনে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্রু-দের ইউনিফর্ম, গায়ের সাথে সেঁটে থাকা কুচকুচে কালো পোলো টি-শার্ট, কালো কার্গো প্যান্ট, গলায় নীল ফিতের শেষে ঝোলা 'স্টাফ অ্যাক্সেস' লেখা ল্যামিনেটেড আইডি কার্ড। 

ডান কানে গোঁজা ব্লুটুথ ইয়ারপিসের কয়েল করা তারটা শার্টের কলারের ভেতর দিয়ে হারিয়ে গেছে। চোখের চাউনিতে সেই চেনা তীক্ষ্ণ সাংবাদিকের খোলসটা এখন আর নেই; তার বদলে সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা একজন ক্লান্ত, বাধ্য ওয়েটারের নির্লিপ্ত দৃষ্টি।

"এই যে! সুমিত! ট্রে-টা কি ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গলাবি নাকি?"

কানের ইয়ারপিসে ইভেন্ট সুপারভাইজারের কর্কশ, রাগী গলাটা খড়খড় করে উঠতেই অর্জুন মাথা নিচু করে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে শুরু করল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। একজন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হিসেবে সে অভ্যস্ত প্রশ্ন করতে, মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সত্যটা খুঁড়ে বের করতে। 

কিন্তু আজ তাকে মাথা নিচু করে এই মাতাল, উচ্ছৃঙ্খল বড়লোকদের রূঢ় ব্যবহার হজম করতে হচ্ছে। একটু আগে ভিড়ের মধ্যে একজন মাতাল তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে হাতের ড্রিঙ্ক ছলকে দিয়েছিল, অর্জুনকে নিচু হয়ে "সরি স্যার" বলতে হয়েছে। 

এই নৈকট্য, এই দমবন্ধ করা বাধ্যবাধকতা তার স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু, সে জানে, এই কালো ইউনিফর্মটাই আজ তার সবচেয়ে বড় বর্ম। স্যুট পরে বারে বসে থাকলে ভিআইপি লাউঞ্জের ভারী কাঁচের ওপারে কী হচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গও জানা যেত না।

ওর প্রাথমিক লক্ষ্য একদম স্থির। লাউঞ্জের বাঁ-দিকের অন্ধকার শেষ মাথায় থাকা 'ভিআইপি জোন'-এর তিন নম্বর কেবিন। প্যারাডিকের দেওয়া ইনফরমেশন যদি ঠিক হয়, তবে আজ রাতের ডিলটা ওই কেবিনের ভেতরেই হবে।

অর্ডার সার্ভ করে এসে ঘড়ির দিকে আড়চোখে তাকাল অর্জুন। দশটা চল্লিশ, আরো এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট।

পুরো ক্লাব যখন রাত বারোটার কাউন্টডাউন আর নিউ ইয়ারের আতশবাজির শব্দে পাগল হয়ে উঠবে, তখন ওই তিন নম্বর ভিআইপি রুমের ভেতর কী হবে জানার জন্য অর্জুনকে বারোটা বাজার ঠিক আগে ওই ঘরে ঢুকতেই হবে।

কেবিনের আশেপাশে হালচাল দেখার উদ্দেশ্যে ভিড় ঠেলে ভিআইপি সেকশনের করিডোরের দিকে এগোতেই অর্জুনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল।

পাগলের মতো নাচতে থাকা ভিড়ের ঠিক পেছনে, বারের কর্নারে যেখানে আলো প্রায় পৌঁছায় না বললেই চলে, সেখানে স্ট্রাব লাইটের একটা লাল ঝলক মুহূর্তের জন্য গিয়ে পড়ল একটা চওড়া কাঁধের ওপর। কালো লেদার জ্যাকেট। লোকটার মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল না। কিন্তু, বারের কাউন্টারের ওপর রাখা আছে একটা কালো রঙের ফুল-ফেস ভাইজার ওয়ালা হেলমেট।

অর্জুনের পা দুটো মেঝের সাথে যেন আঠার মতো আটকে গেল। ওর বুকের ধুকপুকানির স্পিড এবার ইডিএম ট্র্যাকের বেস-কেও ছাপিয়ে গেল। 

লেক গার্ডেনসের সেই বাইকার না ? 

লোকটা এক হাতে মদের গ্লাস ধরে খুব শান্তভাবে নাচের ফ্লোরটা স্ক্যান করছে। তার ঘাড়টা ধীরে ধীরে অর্জুনের দিকটায় ঘুরে আসছে। অর্জুন আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। হাতের স্টিলের ট্রে-টা সামান্য ওপরে তুলে নিজের মুখের একটা পাশ আড়াল করে সে বিদ্যুৎগতিতে ভিআইপি করিডোরের দিকে বাঁক নিল।

এটা কি ওর অবচেতন মনের প্যারানয়া, নাকি সত্যি ওরা ওকে ট্র্যাক করে এই ক্লাবের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে? 

শিকারী নিজে কখন যে শিকারে পরিণত হয়ে যায়, তা বোঝার উপায় থাকে না। ঘাড়ের পেছনের রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে আছে অর্জুনের। যেন এক্ষুনি কেউ পেছন থেকে ওর কাঁধে একটা বরফশীতল হাত রাখবে।

ভিআইপি করিডোরের মুখে দাঁড়ানো দুজন পেল্লায় সাইজের বাউন্সার অর্জুনের আইডি কার্ডটার দিকে একবার তাকিয়ে নীরবে সরে দাঁড়াল।

করিডোরের ভেতরটা বাইরের তুলনায় অনেক শান্ত। বাইরের ক্লাবের কান ফাটানো আওয়াজটা এখানে একটা ভারী, চাপা গুমগুম শব্দে পরিণত হয়েছে। এখানকার কার্পেটটা এতটাই পুরু যে জুতোর কোনো শব্দ হয় না। 

অর্জুন সরাসরি তিন নম্বর রুমের দিকে না গিয়ে সার্ভিস প্যান্ট্রির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। প্যান্ট্রিটা ছোট, স্টিলের কাউন্টার আর বরফের মেশিনে ঠাসা। সেখানে কেউ নেই। অর্জুন ট্রে-টা কাউন্টারের ওপর নামিয়ে রেখে একটা গভীর শ্বাস নিল। কপালে জমে ওঠা ঠান্ডা ঘামটা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছে ফেলল।

পকেট থেকে অত্যন্ত সাবধানে বের করল একটা ম্যাট-ব্ল্যাক রঙের মাইক্রো-অডিও ট্রান্সমিটার। জিনিসটা একটা ছোট বোতামের চেয়েও আকারে ছোট, পেছনের দিকে একটা স্ট্রং অ্যাডেসিভ স্টিকার লাগানো। সেটার সাথে পেয়ার করা আছে ওর পকেটে থাকা ফোনটা।

সময় এগারোটা পঞ্চাশ। আর মাত্র দশ মিনিট।

অর্জুন ট্রান্সমিটারটা নিজের ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার খাঁজে এমনভাবে লুকিয়ে রাখল যাতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে হাতটা খালি। ট্রে-টা আবার দুহাতে তুলে নিয়ে সে প্যান্ট্রি থেকে বেরিয়ে তিন নম্বর ভিআইপি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজার পাশে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ডটা ওর ট্রে-র দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করতেই ভারী, সাউন্ডপ্রুফ মেহগনি কাঠের দরজাটা ভেতর থেকে খুলে গেল।

অর্জুন মাথা নিচু করে ভেতরে পা রাখল।

ঘরের ভেতরের আবহাওয়া বাইরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবছা মায়াবী আলো, চামড়ার সোফা, আর এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতা। বাইরের মিউজিক এখানে প্রায় শোনাই যায় না। ঘরের ভেতর তিনজন মানুষ বসে আছে। বাতাসে দামী মদের আর তীব্র কিউবান সিগারের কটু ধোঁয়া।

অর্জুন কারোর মুখের দিকে তাকাল না। সে জানে, এই মুহূর্তে চোখের দিকে তাকানো মানেই সন্দেহ তৈরি করা। সে সোজা ঘরের মাঝখানে রাখা ভারী মেহগনি কাঠের টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল।

"আপনারা যে ব্র্যান্ডটা অর্ডার করেছিলেন, স্যার।"

অর্জুনের গলাটা নিখুঁত ওয়েটারের মতো বিনীত, কাঁপা কাঁপা।

টেবিলের উল্টোদিকে বসা লোকটার মুখটা অন্ধকারের জন্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার ডান হাতের আঙুলে একটা বড় সোনার আংটি আলোয় চিকচিক করছে।

"বরফের বালতিটা বদলাও" 

একটা খসখসে ভারী গলা নির্দেশ দিল।

"ইয়েস স্যার।"

অর্জুন ট্রে থেকে নতুন বরফের বালতিটা নামানোর জন্য সামান্য ঝুঁকল। ওর পেশিগুলো তখন ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে আছে। চোখের কোণ দিয়ে সে খেয়াল করল, সোফায় বসা অন্য দুজন লোক ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে। তাদের সামনে রাখা একটা লেদার পোর্টফোলিও ব্যাগ।

টেবিলের ওপর থেকে পুরনো বালতিটা তোলার সময় অর্জুন ডান হাতের দুটো আঙুল টেবিলের ভেতরের দিকের খাঁজে সামান্য স্লাইড করে দিল। মাত্র এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। আঠালো মাইক্রো-ট্রান্সমিটারটা মেহগনি কাঠের নিচটায় নিখুঁতভাবে সেঁটে গেল। কোনো শব্দ হলো না, কেউ কিছু টেরও পেল না।

"হয়ে গেলে বেরিয়ে যাও। আর কেউ ডাকলে তবেই আসবে।" সোনার আংটি পরা লোকটার বিরক্তিভরা গলা।

"অফকোর্স স্যার।"

অর্জুন পুরনো বালতি আর খালি গ্লাসগুলো ট্রে-তে তুলে নিয়ে পিছন ফিরে দরজার দিকে হাঁটা দিল। দরজা দিয়ে বেরোনোর ঠিক আগের মুহূর্তে সে নিজের ইয়ারপিসে শুনতে পেল, ক্লাবের ডিজে মাইকে চিৎকার করে উঠেছে।

"লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! উই আর জাস্ট ফাইভ মিনিটস অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য নিউ ইয়ার! লেটস মেক সাম নয়েজ!"

বাইরের ভিড়টা বুনো জন্তুর মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল।

অর্জুন সার্ভিস প্যান্ট্রিতে ফিরে এসে দরজাটা লক করে দিল। হাত-পা কাঁপছে তার। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে রেকর্ডিং অ্যাপটা অন করল। মাইক্রো-ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল একদম ক্লিয়ার। ইয়ারপিসে এখন ভিআইপি রুমের ভেতরের ফিসফিসানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

"...শিশির রায় মরে গিয়ে আমাদের একটা বড় ফেভার করেছে।"

ইয়ারপিসে সোনার আংটি পরা লোকটার ভারী গলাটা ভেসে এল।

"কিন্তু অমৃতা যে ডেটাগুলো লিক করেছিল, সেগুলোর কী হবে?" 

দ্বিতীয় জনের গলা।

"আমাদের আজকের কাজটা হলো 'মাস্টার কী' টার পজেশন চেঞ্জ করা। ঠিক রাত বারোটায়, যখন বাইরে কাউন্টডাউন শুরু হবে, ব্যাকডোর এক্সেসটা ফায়ারওয়াল থেকে শিফট হয়ে আমাদের অফশোর সার্ভারে চলে যাবে। কেউ টেরও পাবে না।"

অর্জুনের কানের পর্দায় শব্দগুলো আছড়ে পড়তেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে বরফের স্রোত নেমে গেল। 'মাস্টার কী' কোনো ফিজিক্যাল চাবি নয়; ওটা কোনরকম অ্যাক্সেস কোড! আর সেটা আজ রাত বারোটায় হাতবদল হচ্ছে!

বাইরে ডিজের গলা ফেটে পড়ছে স্পিকারে।

"টেন! নাইন! এইট!"

"ল্যাপটপটা খোলো," 

ইয়ারপিসে ভেসে এল নির্দেশ। 

"ট্রান্সফার ইনিশিয়েট করো।"

"সেভেন! সিক্স! ফাইভ!"

পুরো ক্লাব এখন এক স্বরে কাউন্টডাউন করছে। ফ্লোরের কম্পনে প্যান্ট্রির স্টিলের কাউন্টার থরথর করে কাঁপছে।

"ফোর! থ্রি!"

অর্জুন ফোনের স্ক্রিনে রেকর্ডিংয়ের ওয়েভলেংথগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রমাণটা এখন ডিজিটালি রেকর্ড হচ্ছে।

"টু! ওয়ান!"

"হ্যাপি নিউ ইয়ার!"

ভিড়ের গর্জনের সাথে সাথে ক্লাবের ভেতরে কনফেটি আর ফ্লেয়ার গান ফেটে উঠল। বাইরের ওই কান ফাটানো উৎসবের শব্দের ঠিক আড়ালে, ইয়ারপিসের ভেতর অর্জুন স্পষ্ট শুনতে পেল একটা ছোট্ট কি-বোর্ডের এন্টার বোতাম টেপার 'ক্লিক' শব্দ।

"ট্রান্সফার কমপ্লিট। মাস্টার কী এখন আমাদের কন্ট্রোলে।"

অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেকর্ডিংটা সেভ করল। কাজ শেষ। এবার এখান থেকে বেরোতে হবে।

সে প্যান্ট্রির দরজাটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার কানের ইয়ারপিসে সুপারভাইজারের গলাটা হিসহিস করে উঠল।

"সুমিত! তুই কি ভেতরে ঘুমোচ্ছিস? ভিআইপি রুমের বাইরে বাউন্সাররা একটা লোককে খুঁজছে... কালো জ্যাকেট পরা একটা লোক নাকি সার্ভিস করিডোরে ঢুকে পড়েছে! তুই কি কাউকে দেখেছিস?"

অর্জুনের রক্ত জল হয়ে গেল।

কালো জ্যাকেট। বাইকারটা।

সে প্যান্ট্রির দরজার নবটা ঘোরাতে গিয়ে থেমে গেল। দরজার উল্টোদিকের ফ্লোর থেকে ভারী বুটের শব্দ আস্তে আস্তে প্যান্ট্রির দিকেই এগিয়ে আসছে। ভিআইপি করিডোরের নিস্তব্ধতায় সেই পায়ের আওয়াজটা অর্জুনের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে শুরু করল। শিকারী এখন তার দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মরীচিকা ও মোহময়ী - by RockyKabir - 13-09-2026, 09:42 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)