13-09-2026, 09:37 PM
(This post was last modified: 18-09-2026, 10:41 PM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
৮
হলঘরের দরজাটা বন্ধ হতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো এক ধাক্কায় হালকা হয়ে এল।
রাত নটা বেজে যাবার পরে বিদিশা আর দেরি করা উচিত বলে মনে করেননি। রাত বারোটা পর্যন্ত তার এখানে থাকার কোন ইচ্ছা নেই। তাকে অনেকটা দূরে সেই গড়িয়াতে বাড়ি ফিরতে হবে।
"একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না, মিস গাঙ্গুলি? বর্ষবরণের কাউন্টডাউন হতে কিন্তু এখনো বেশ খানিকটা দেরি আছে।"
পেছন থেকে রাহুল বোসের চেনা গলা ভেসে এলেও বিদিশা হাঁটা থামালেন না। তিনিও বিদিশার সাথেই পার্টি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
"বর্ষবরণের কাউন্টডাউন ইয়ং স্টুডেন্টদের জন্য। আমাদের মতো প্রফেসরদের জন্য নয়। তাছাড়া,
আমার আর রাত জাগার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নেই, মিস্টার বোস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছলে বাঁচি।"
রাহুল বিদিশার জবাবের কোন উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে লিফটের স্টেইনলেস স্টিলের বাটনটা চাপলেন। একটা ছোট 'ডিং' শব্দ হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধাতব দরজা সরে গিয়ে নির্জন সার্ভিস লিফটের ফাঁকা স্পেসটা উন্মুক্ত করে দিল।
ভেতরের দেওয়াল জুড়ে মসৃণ কাঁচ আর অ্যানোডাইজড অ্যালুমিনিয়ামের ফিনিশিং। মেঝে মোড়া ডার্ক গ্রে রাবারাইজড ম্যাট দিয়ে। ছাদে চারটে স্পটলাইটের নরম হলুদ আলোয় ভেতরটা স্নিগ্ধভাবে আলোকিত।
বিদিশা ভেতরে পা রাখলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলের রূপোলি সুতোর ঘর্ষণ হলো লিফটের ধাতব দরজার সাথে। রাহুল ঠিক তাঁর পেছনে ভেতরে ঢুকলেন।
রাহুল বাটন প্যানেলে গিয়ে গ্রাউন্ডফ্লোরের কি-তে প্রেস করলেন। 'G' নম্বর বোতামটা নীল আলোয় জ্বলে উঠল। মেটালিক স্লাইডিং ডোর দুটো সশব্দে একে অপরের সাথে মিশে গেল।
প্যাসেঞ্জারের খালি স্থানটুকুতে এখন কেবল বিদিশা আর রাহুল। আর মাঝখানে আটকে থাকা দেড় ঘনমিটারের বদ্ধ বাতাস।
উপরিভাগের এই শান্ত নিঃশব্দতার নিচে লিফটটা নীচের দিকে নামতে শুরু করল। হাইড্রোলিক পাম্পের একটা মৃদু, একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজ আর পায়ের তলায় একটা হালকা অভিকর্ষের চাপ।
"আজকের পার্টির আয়োজনটা সত্যিই দারুণ ছিল। কী বলেন, মিস গাঙ্গুলি ?"
রাহুল বিদিশার থেকে মাত্র দেড় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন।
বিদিশা হালকা হেসে মাথা নাড়লেন, চোখ দুটো হালকা বুজে আবার খুললেন।
"জাঁকজমক হয়তো ছিল। কিন্তু, আমার জন্য বড্ড বেশি কোলাহলপূর্ণ।"
রাহুল মৃদু হাসলেন।
"ঠিক বলেছেন। কৃত্রিম হাসি আর অহেতুক আড্ডা দেবার ডিউটি থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন বলুন?"
"আপনি কি সব জায়গাতেই এত সূক্ষ্ম নজর রাখেন, প্রফেসর বোস?"
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে বিদিশা শাড়ির আঁচলটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে দরজার কাঁচের প্রতিফলনে রাহুলের দিকে তাকালেন।
রাহুল হালকা হাসলেন। চশমার ফ্রেমটা আঙুলের ডগায় সামান্য ওপরে তুলে বিদিশার চোখে চোখ রাখলেন।
"সব জায়গায় নয়, মিস গাঙ্গুলি। তবে কিছু মানুষের চোখের ভেতরের ক্লান্তি টের পেতে খুব বেশি নজরদারির প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে..."
রাহুল কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন।
লঘু কথা চালাচালি থেকে কথোপকথনটা হঠাৎই ভারী দিকে ঘুরে গেল দেখে বিদিশা ঘাড় তুলে রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন।
"সবচেয়ে বড় কথা কী?"
"কিছু না।"
রাহুল একটু ইতস্তত করে নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিলেন।
"কিছু মানুষের ইগো এত বিশ্রী যে, আপনার আত্মসম্মানটা বজায় রেখে চলাফেরা করাটাই তাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। কিন্তু আপনি যে রুখে দাঁড়িয়েছেন, সেটাই অদ্ভুত সুন্দর।"
কথাটা শোনামাত্রই বিদিশার বুকের ভেতর একটা হালকা শিরশিরে অনুভূতি খেলে গেল। সিম্পোজিয়ামের সময় সুব্রত সেন আর ডঃ বাগচীর কীর্তিকলাপের কথা যে রাহুল আংশিক ভাবে হলেও টের পেয়েছেন, সেটা তিনি বুঝলেন।
আজকে পার্টিতে একা একা বসে তিনি তো কলেজের এই বিষাক্ত পরিমণ্ডলের কথাই চিন্তা করছিলেন।
কিন্তু রাহুলের এই প্রশংসায় কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আরেকজন নারীর প্রতি খাঁটি সম্মানের সুরটা বুঝতে বিদিশার অসুবিধা হল না।
তার ঠোঁটের কোণে একটা নরম হাসি ফুটে উঠল।
"ধন্যবাদ, রাহুল। আপনার এই সাপোর্টটুকু আমার দরকার ছিল।"
এই প্রথম বিদিশা নিজের মুখে রাহুলকে 'মিস্টার বোস'-এর বদলে শুধুই 'রাহুল' বলে ডাকলেন।
রাহুলের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওনার ঠোঁটের কোণের হাসিটা চওড়া হলো। উনি বিদিশার আরও একটু কাছে ঘেষে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়,
ক্যাঁচচ্যাঁচচচ... বিকট শব্দ!
হঠাৎ পুরো লিফটটা বাতাসে এক ভয়াবহ ধাক্কা খেল! একটা বিশ্রী, কানফাটানো ধাতব ঘর্ষণের আওয়াজ গোটা কেবিনটাকে কাঁপিয়ে দিল!
"আহ!"
বিদিশা নিজের দেহের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা পেছনের দিকে হেলে পড়লেন।
"বিদিশা!"
রাহুল চটজলদি রিফ্লেক্স অ্যাকশনে নিজের ডান হাতটা বিদিশার কোমর আর পিঠের মাঝখানটায় গলিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। বিদিশার সুডৌল শরীরটা সজোরে রাহুলের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
পরমুহূর্তেই লিফটটা ফ্রি-ফল দেওয়ার মতো কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে আচমকা একটা ভীষণ ঝটকা দিয়ে একদম থেমে গেল!
ধাতব কেবলগুলোর বিকট টানাটানির শব্দ হলো ওপরের ট্রাস থেকে। তারপর ... সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা।
ছাদের চারটে আলোর দুটো স্পটলাইট দপ করে নিভে গিয়ে একটা ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল। এসির সেই একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল ভেতরের বায়ু চলাচল।
লিফটের কাঁচ আর অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটা মেঝের থেকে তিনতলা আর চারতলার ঠিক মাঝামাঝি কোনো এক অন্ধকার ফাঁকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে ঝুলে রইল।
ভেতরের বাতাস শান্ত হতে অন্তত দশ সেকেন্ড সময় লাগল।
তারপর, শুধুই দুজনের দ্রুত, হাপরের মতো ওঠানামা করা শ্বাসের শব্দ।
বিদিশার বুকটা রাহুলের কাস্টম-ফিট করা ব্লেজারের ওপর লেপ্টে ছিল। তাঁর শাড়ির আঁচলটা ধাক্কায় সামান্য সরে গিয়ে গলার নিচের ফর্সা খাঁজটা রাহুলের শার্টের কলারকে স্পর্শ করছিল। বিদিশার চুল থেকে ভেসে আসা সুবাস সরাসরি রাহুলের নাকে গিয়ে ধাক্কা মারছিল।
আর রাহুলের শক্ত, পুরুষালি ডান হাতটা তখনো বিদিশার সরু কোমরের ওপর অত্যন্ত শক্ত করে চেপে বসা। বিদিশার লিনেন শাড়ির ওপর দিয়েই রাহুল বিদিশার কোমরের প্রতিটি খাঁজ, তার উত্তাপ অনুভব করছিলেন।
"আ-আপনি ঠিক আছেন?"
রাহুলের ফিসফিসানি গলাটা বিদিশার কানের কাছে এসে লাগল।
বিদিশার বুকের ধুকপুকুনি এত দ্রুত চলছিল যে তিনি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি রাহুলের শরীরের ওপর একদম সেঁটে আছেন।
বিদিশা চট করে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
"হ্যাঁ... হ্যাঁ, আই অ্যাম ওকে। থ্যাংক ইউ, রাহুল। আপনি না ধরলে আমি পড়ে যেতাম।"
রাহুলও সাথে সাথে সচেতন হয়ে নিজের হাতটা বিদিশার কোমর থেকে সরিয়ে নিলেন।
কিন্তু, অনেক দূরে সরে গেলেন না। কারণ এই লিফটে সরার মতো জায়গা খুব একটা ছিল না।
"লিফটটা আটকে গেছে।"
রাহুল ধাতব দেওয়ালে হাত রেখে সোজা হলেন।
তাড়াতাড়ি বাটন প্যানেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাহূল 'অ্যালার্ম' আর 'ইমার্জেন্সি কল' বাটনগুলো বারবার চাপতে লাগলেন। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। সাউন্ড প্যানেল থেকে শুধু একটা বিশ্রী কর্কশ স্ট্যাটিক আওয়াজ এল, তারপর সেটাও নিভে গেল।
"ড্যাম ইট! পাওয়ার ব্যাকআপ সুইচ ওভারহিটেড বা কেবল ট্র্যাপে আটকে গেছে।"
হতাশ রাহুল বাটন প্যানেলে একটা হালকা চাপড় মেরে বললেন।
বিদিশা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করলেন।
"নেটওয়ার্ক চেক করুন। আমার ফোনে সার্ভিস দেখাচ্ছে না।"
রাহুলও নিজের ফোন বের করলেন।
"নো সিগন্যাল। এই সার্ভিস শ্যাফটের চারপাশটা ঘন কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে ঘেরা। সিগন্যাল পাওয়া মুশকিল।"
দুজন মানুষের চোখই এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের ওপর গিয়ে স্থির হলো।
বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাতাস বন্ধ। ঘরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
"আমাদের প্যানিক করলে চলবে না,"
বিদিশা নিজের গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু, হঠাৎ এই খাঁচার মধ্যে আটকা পড়ে যাওয়া তাঁর মানসিক স্থিরতাকে নাড়া দিয়েছিল।
"টেকনিশিয়ানরা নিশ্চয়ই নজর রাখবে। অন্য কেউ লিফটে না চড়লেও ওরা অন্তত বিশ-ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তো খেয়াল করবেই।"
রাহুল নিজের ব্লেজারটা খুলে ফেললেন। ওনার কপালে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।
"বিশ-ত্রিশ মিনিট?"
বিদিশার গলায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
রাহুল হালকা একটু হাসার চেষ্টা করলেন, যদিও হাসিতে উদ্বেগের ছাপ ছিল।
"এই ছোট জায়গায় এসি ছাড়া বিশ মিনিট মানে কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা অন্তত চার ডিগ্রি বেড়ে যাওয়া। অ্যান্ড উই হ্যাভ ভেরি লিটল অক্সিজেন।"
তিনি তাঁর ব্লেজারটা ভাঁজ করে লিফটের এক কোণে রাখলেন। তারপর বিদিশার দিকে তাকালেন।
বিদিশা দাঁড়িয়ে ছিলেন দেওয়ালের কাঁচের হেলান দিয়ে। ওনার ফর্সা গাল দুটো ইতিমধ্যেই হালকা গোলাপি ছোপ নিতে শুরু করেছে। এসির বাতাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কেবিনের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা আর উষ্ণতা হু-হু করে বাড়ছে।
তার পেস্তা-সবুজ শাড়ির ব্লাউজের কলারের কাছে, ঘাড়ের খাঁজে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।
"বিদিশা, আপনি বসুন। দাঁড়িয়ে থাকলে হার্ট রেট বাড়বে, অক্সিজেনের অপচয় বেশি হবে।"
রাহুল অত্যন্ত শান্তভাবে বিদিশার হাতটা হালকা ছুঁয়ে বললেন।
রাহুলের হাতের স্পর্শে বিদিশা এক মুহূর্তের জন্য শিহরিত হলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আপত্তি করাটা বোকামি। তিনি ধীরে ধীরে লিফটের রাবারাইজড মেঝের ওপর হাঁটু ভাঁজ করে বসলেন। ওনার শাড়ির বহর মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
রাহুলও ওনার ঠিক উল্টোদিকে, মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে মেঝের ওপর বসলেন।
দুজনের হাঁটু প্রায় একে অপরকে স্পর্শ করে আছে।
কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু ওদের দুজনের দীর্ঘায়িত শ্বাসের শব্দ আর মাঝেমধ্যে ওপরের কেবল থেকে ভেসে আসা ধাতব 'টিক-টিক' আওয়াজ।
দশ মিনিট কেটে গেল।
বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। বদ্ধ কেবিনের ভেতর বাতাস যেন ভারী হয়ে ঝুলে রয়েছে।
বিদিশা অনুভব করছিলেন, ওনার কাপড়ের নিচ থেকে চামড়া ভিজে উঠছে। ওনার কপালে, ঠোঁটের ওপরে আর ঘাড়ের পেছনের অবাধ্য চুলগুলোর গোড়ায় সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো জমাট বেঁধে ফোঁটায় পরিণত হচ্ছে।
রাহুল ওনার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিয়েছেন। ওনার সুগঠিত, চওড়া বুকে আর গলার খাঁজে ঘাম চকচক করছে।
"আপনি... খুব কষ্ট পাচ্ছেন, তাই না?"
রাহুল বিদিশার মুখের দিকে তাকিয়ে শোধালেন।
বিদিশার চোখদুটো বোজা ছিল। তিনি চোখ খুলে রাহুলের দিকে তাকালেন। ওনার লিপস্টিক মাখা ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক হয়ে আছে, প্রতিটা শ্বাসে ওনার উন্মুক্ত বুকের ওপরের খাঁজটা তীব্রভাবে ওঠানামা করছে।
"একটু... দমবন্ধ লাগছে।"
বিদিশা খুব নিচু গলায় বললেন।
"ছোটবেলা থেকেই আমার বদ্ধ জায়গায় একটু ফোবিয়া আছে।"
"ক্লস্ট্রোফোবিয়া?"
রাহুলের গলায় গভীর উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
বিদিশা মৃদু মাথা নাড়লেন।
"পুরোপুরি নয়। তবে... এই আর্দ্রতাটা সহ্য হচ্ছে না।"
বিদিশা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজের ডান হাতটা গলার কাছে নিয়ে গেলেন। ওনার নেভি-ব্লু শাড়ির আঁচলটা পিন করা ছিল বাঁ কাঁধে। ওনার মনে হচ্ছিল শাড়ির আঁচলটা ওনার বুকের ওপর এক অতিরিক্ত ভারী পাথর হয়ে চেপে বসে আছে।
তিনি পিনটা খোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওনার হাত কাঁপছিল। পিনটা আটকে যাচ্ছিল কাপড়ের খাঁজে।
"আমাকে দেখতে দিন।"
রাহুল চট করে বিদিশার হাতটার ওপর নিজের হাত রাখলেন।
বিদিশা থামলেন। ওনার চোখদুটো রাহুলের সামনাসামনি।
রাহুলের স্পর্শটা কিন্তু সেদিনের বিক্রমের সেই লোলুপ ছোঁয়ার মতো ছিল না। তিনি খুব সাবধানে, বিদিশার মসৃণ ফর্সা কাঁধের কাছে পিনটা আলগা করলেন। পিন খোলার সময় রাহুলের হাতের উল্টো পিঠ বিদিশার গলার উন্মুক্ত মসৃণ চামড়া আর কলারবোন স্পর্শ করে গেল।
বিদিশার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র, বিদ্যুতায়িত অনুভূতি খেলে গেল। ওনার শ্বাস আটকে এল।
পিনটা খুলে আসতেই বিদিশা হালকা একটা হাঁফ ছাড়লেন। তিনি শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে নিজের কোলের ওপর সরিয়ে নিলেন।
আঁচলটা সরতেই ওনার শাড়ির ডিপ-নেক ব্লাউজের ওপরের উন্মুক্ত ফর্সা অংশটা সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে পড়ল।
ব্লাউজের সরু নেকলাইনের ওপর দিয়ে ওনার সুডৌল, মোলায়েম স্তনযুগলের ওপরের অংশ আর গলার গভীর খাঁজে জমা হয়ে থাকা ঘামের স্বচ্ছ বিন্দুগুলো লিফটের মৃদু আলোয় হীরার ফোঁটার মতো ঝলমল করে উঠল।
রাহুল নিজের অজান্তেই এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারলেন না। ওনার শ্বাসের গতি আটকে গেল।
একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর পক্ষে এই দৃষ্টি টের পাওয়া খুব কঠিন নয়। বিদিশাও খুব সহজেই রাহুলের মুগ্ধ দৃষ্টি টের পেলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন না।
"আই অ্যাম সরি... আমি ওভাবে তাকাতে চাইনি।"
রাহুল চট করে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন। ওনার গলায় নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা।
বিদিশা নিজের কোলের শাড়ির কাপড়টা একটু মুঠো করে ধরলেন।
"ইটস ওকে, রাহুল। আই নো... ইউ আর নট লাইক দেম।"
রাহুল বিদিশার দিকে আবার তাকালেন।
"দেম? দেম মানে?"
বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার পিঠের দিকে ব্লাউজটা ঘামে ভিজে চামড়ার সাথে সেঁটে গেছে।
"আপনার কি মনে হয়, আমি কী পুরুষদের দৃষ্টি বুঝতে পারি না ?"
বিদিশা এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে বনগানির ছবিটা ভেসে উঠল।
"সবাই ভাবে আমি শুধু একটা সুন্দর ট্রফি। একটা দেমাগী মহিলা যাকে জয় করতে পারলে তাদের ইগো শান্ত হয়।"
ইঙ্গিতটা বুঝতে রাহুলের অসুবিধা হল না। তিনিই এ ব্যাপারে বিদিশাকে সবার আগে সাবধান করেছিলেন।
তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল।
"বিক্রম? ওই ছেলেটা আপনার সাথে অসভ্যতা করেছে?"
বিদিশা স্থির চোখে রাহুলের দিকে তাকালেন।
"ফেস্টের রাতে অডিটোরিয়ামের ব্যাকস্টেজে... অয়ন হঠাৎ এসে না পড়লে ওই ছেলেটা আমার শরীরে হাত দিয়ে নিজের সীমা পার করে ফেলেছিল।"
রাহুল স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার চোখের মণি রাগে ছোট হয়ে এল।
"মাই গড! অ্যান্ড অয়ন... ও সেটা দেখেছিল?"
"হ্যাঁ।"
বিদিশার গলার স্বর হঠাৎ একদম নিচু হয়ে গেল। ওনার চোখের কোণে এক চিলতে বিষাদের ছায়া।
"হ্যাঁ, অয়ন ওটা দেখে ফেলেছিল। সেইজন্য ও নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তারপরই ও বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।"
"তাহলে আপনি অয়নকে অত বড় শাস্তি দিলেন কেন? সবার সামনে ওকে চড় মারলেন, গুণ্ডা বললেন?"
রাহুলের গলায় চরম বিস্ময়।
বিদিশা নিজের দুই হাঁটু আরও একটু বুকের কাছে টেনে নিলেন। ওনার গলার কাছে জমা ঘামের ফোঁটাটা গড়িয়ে ওনার ব্লাউজের নেকলাইনের গভীরে মিলিয়ে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তাহলে অয়ন আর তার আসল সম্পর্ক রাহুলের কাছে ফাঁস করতে হয়।
"অয়ন নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিল। ও বিক্রমকে যেভাবে মারছিল, সাহিলরা ছুটে না এলে যেকোন সময় একটা বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।"
কথাগুলো শুনে রাহুল থমকে গেলেন। সত্যিই তো, বিক্রমের মুখ সেদিন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
বিদিশা রাহুলকে বলতে পারলেন না যে শিক্ষিকা হিসেবে সেই গুণ্ডামি যেমন তিনি মেনে নিতে পারেননি, তেমনই মা হিসেবে... তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, অয়ন যদি এই হিংস্রতার পথে চলতে থাকে, তবে সে একদিন নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাই তিনি শুরুতেই ওকে আটকাতে চেয়েছিলেন।
না বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিদিশার চোখদুটো জলে ভরে এল।
ফেস্টের পর থেকে যে মানসিক অনুভূতিগুলোকে তিনি বারবার কঠোর শিক্ষিকাসত্ত্বার বর্ম দিয়ে ঢেকে দিতেন, আজকের এই দুর্বল মুহূর্তে সেটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু, সত্যিটা না জানায় রাহুল বুঝলেন উল্টো।
তিনি ভাবলেন বিদিশা বিক্রমের অসভ্যতার ট্রমা, অয়নের কাণ্ডকারখানার অভিঘাত, সহকর্মীদের পলিটিক্স, সবকিছুর চাপ নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। আজ সহ্য করতে না পেরে তার সামনে কেঁদে ফেললেন। তার বুকটা সহানুভূতিতে মুচড়ে উঠল।
তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। হাঁটু গেড়ে বসে বিদিশার আরও কাছে এগিয়ে এলেন। ওনার শক্ত, পুরুষালি হাত দুটো দিয়ে উনি বিদিশার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিলেন।
"বিদিশা..."
রাহুলের গলাটা গভীর আবেগে কঁপে উঠল।
"ইউ হ্যাভ বিন ক্যারিইং টু মাচ পেইন। আপনি নিজেকে বড্ড বেশি শক্ত করে রাখেন। কিন্তু আপনারও তো শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।"
রাহুলের হাতের উত্তাপ, ওনার আন্তরিক কণ্ঠস্বর বিদিশার ভেতরের সমস্ত মানসিক বাঁধ ভেঙে দিল।
তার গাল বেয়ে এক ফোঁটা তাজা জল নেমে এল।
রাহুল নিজের ডান হাতটা তুলে আলতো করে ওনার বুড়ো আঙুল দিয়ে বিদিশার গালের জলটুকু মুছে দিলেন। ওনার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে বিদিশা চোখ বুজে ফেললেন।
তিনি রাহুলের হাতের স্পর্শের দিকে নিজের মুখটা একটু কাত করলেন।
"রাহুল..."
বিদিশা ফিসফিস করে উঠলেন। ওনার শ্বাসের গতি অতি দ্রুত, বুকের তীব্র ওঠানামায় ওনার সুডৌল স্তনের খাঁজ রাহুলের হাতের একদম ইঞ্চি খানেক দূরে কাঁপছে।
রাহুল বিদিশার মসৃণ চিবুকটা নিজের আঙুল দিয়ে ধরে ধীরে ধীরে ওনার মুখটা নিজের দিকে তুললেন।
দুজনের মুখ এখন মাত্র দুই ইঞ্চির দূরত্বে।
রাহুল বিদিশার কপালে নেমে আসা ভিজে চুলের গোছাটা হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে দিলেন। ওনার চোখ আটকে গেল বিদিশার মেরুন লিপস্টিক মাখা, হালকা হাঁ হয়ে থাকা ঠোঁট দুটোর ওপর।
"বিদিশা... আই হ্যাভ ওয়ান্টেড দিস ফর সো লং..."
রাহুল তীব্র আবেগে ফিসফিস করে বললেন।
বিদিশা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে রাহুলের দিকে নিজের মুখটা সামান্য এগিয়ে দিলেন। ওনার মধ্যে আর কোনো প্রতিরোধ রইল না। এই মুহূর্তে তিনি কোনো অধ্যাপিকা নন, কারো মা নন, কারো স্ত্রী নন। তিনি একজন একাকীত্বে ভোগা নারী, যিনি একটু ভালোবাসা, মমতা, সহানুভূতির খোঁজ করছেন।
এমনই সময়, হঠাৎ !
ক্ল্যাঙ্ক! ঘড়ড়ড়ড়!
হঠাৎ শ্যাফ্টের ওপর থেকে ইলেকট্রিক মোটরটা বিকট শব্দে গর্জে উঠল!
সোডিয়াম আলোর দুটো মেইন টিউবলাইটের তীব্র সাদা আলো হঠাৎ লিফটের কেবিনে ফিরে এল! এসি-র ঠান্ডা ফ্যানের ভেন্টিলেটরটা শব্দ করে চালু হয়ে গিয়ে হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস কেবিনের ভেতরে পাঠাতে শুরু করল!
ডিং!
লিফটের ভেতরে ডিসপ্লে বোর্ডে নীল আলোয় নম্বর ফুটে উঠল - 'G'।
বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে! লিফট সার্ভিস শুরু হয়ে গেছে !
আর সাথে সাথেই ওই স্বপ্নের মতো মুহূর্তটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যেন মাথার ওপর কেউ এক বালতি বরফজল ঢেলে দিল।
বিদিশা মুহূর্তের মধ্যে চোখ খুললেন।
রাহুলও এক লহমায় নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেন।
তিনি দ্রুত এক পা পিছিয়ে এলেন।
"হায় ভগবান..." বিদিশার ফর্সা মুখটা রাগে, লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
"আই... আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, বিদিশা।"
রাহুলের গলায় চরম অপরাধবোধ আর বিহ্বলতা।
"আমি... আমি নিজের ওপর থেকে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিলাম। আই ডিড নট মিন টু..."
"চুপ করুন! প্লিজ!"
বিদিশা কাঁপা কাঁপা হাতে কোলের ওপর পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা, যেটার পিন খুলতে রাহুল সাহায্য করেছিলেন, সেটা তুলে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন।
তিনি একবার দ্রুত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। সেই আয়নায় বিদিশা এক রতিক্লান্ত নারীকে দেখতে পেলেন। বিদ্যুত আসতে আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে এই প্রতিবিম্বে নিজের ওই রূপটাই হয়তো তাঁকে দেখতে হত।
তিনি চটজলদি শাড়ির পিনটা কোনোমতে কাঁধে আটকে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
লিফটটা ততক্ষণে একতলার ফ্লোরে এসে স্থির হয়েছে।
ডিং!
মেটালিক দরজা দুটো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
বাইরে থেকে আলো আর দুএকজন মানুষের অস্পষ্ট আওয়াজ ভেতরে আসতে শুরু করেছে।
বিদিশার কপালে ঘামের ফোঁটাগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।
কিন্তু উনি কঠিন প্রফেসরের বর্মটা জোর করে ফিরিয়ে আনলেন।
রাহুলও ওনার ব্লেজারটা দ্রুত গায়ে চাপিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
লিফটের দরজা পুরোপুরি খুলে যেতেই সামনে দেখা গেল সাহিল আর দুজন লিফট মেকানিক দাঁড়িয়ে আছে। সাহিলের মুখে চরম উৎকণ্ঠা।
"ম্যাম! স্যার ! থ্যাংক গড আপনারা ঠিক আছেন!"
সাহিল এগিয়ে এল।
"লিফটটা ১৫ মিনিট ধরে আটকে ছিল। আমরা মেইন পাওয়ার লাইন রিসেট করে চালনা করলাম। আপনারা ঠিক আছেন তো?"
বিদিশা এক সেকেন্ড সময় নিলেন নিজের গলার স্বর ঠিক করতে।
তারপর তিনি অত্যন্ত শান্ত, বরফশীতল গলায় বললেন,
"আই অ্যাম ফাইন, সাহিল। শুধু একটু এসি বন্ধ ছিল। দ্যাটস অল।"
তিনি একবারের জন্যও রাহুলের দিকে ফিরে তাকালেন না।
স্টিলেটোর খটখট শব্দ তুলে বিদিশা লিফট থেকে বেরিয়ে সোজা মেইন গেটের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। ওনার হাটার ভঙ্গি একদম সোজা, কিন্তু ওনার বুকের ভেতরটা তখনো তোলপাড় করছে।
রাহুল লিফটের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার হাতের তালুতে এখনো বিদিশার কোমরের স্পর্শের উষ্ণতা আর নাকে ওনার পারফিউমের গন্ধ লেগে আছে।
তিনি বিদিশার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যে ভয়টা তিনি পেয়েছিলেন সেটাই ঘটল। বিদিশা এবার ভাববে যে তিনি ওর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওকে exploite করতে চাইছিলেন।
হলঘরের দরজাটা বন্ধ হতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো এক ধাক্কায় হালকা হয়ে এল।
রাত নটা বেজে যাবার পরে বিদিশা আর দেরি করা উচিত বলে মনে করেননি। রাত বারোটা পর্যন্ত তার এখানে থাকার কোন ইচ্ছা নেই। তাকে অনেকটা দূরে সেই গড়িয়াতে বাড়ি ফিরতে হবে।
"একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না, মিস গাঙ্গুলি? বর্ষবরণের কাউন্টডাউন হতে কিন্তু এখনো বেশ খানিকটা দেরি আছে।"
পেছন থেকে রাহুল বোসের চেনা গলা ভেসে এলেও বিদিশা হাঁটা থামালেন না। তিনিও বিদিশার সাথেই পার্টি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
"বর্ষবরণের কাউন্টডাউন ইয়ং স্টুডেন্টদের জন্য। আমাদের মতো প্রফেসরদের জন্য নয়। তাছাড়া,
আমার আর রাত জাগার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নেই, মিস্টার বোস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছলে বাঁচি।"
রাহুল বিদিশার জবাবের কোন উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে লিফটের স্টেইনলেস স্টিলের বাটনটা চাপলেন। একটা ছোট 'ডিং' শব্দ হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধাতব দরজা সরে গিয়ে নির্জন সার্ভিস লিফটের ফাঁকা স্পেসটা উন্মুক্ত করে দিল।
ভেতরের দেওয়াল জুড়ে মসৃণ কাঁচ আর অ্যানোডাইজড অ্যালুমিনিয়ামের ফিনিশিং। মেঝে মোড়া ডার্ক গ্রে রাবারাইজড ম্যাট দিয়ে। ছাদে চারটে স্পটলাইটের নরম হলুদ আলোয় ভেতরটা স্নিগ্ধভাবে আলোকিত।
বিদিশা ভেতরে পা রাখলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলের রূপোলি সুতোর ঘর্ষণ হলো লিফটের ধাতব দরজার সাথে। রাহুল ঠিক তাঁর পেছনে ভেতরে ঢুকলেন।
রাহুল বাটন প্যানেলে গিয়ে গ্রাউন্ডফ্লোরের কি-তে প্রেস করলেন। 'G' নম্বর বোতামটা নীল আলোয় জ্বলে উঠল। মেটালিক স্লাইডিং ডোর দুটো সশব্দে একে অপরের সাথে মিশে গেল।
প্যাসেঞ্জারের খালি স্থানটুকুতে এখন কেবল বিদিশা আর রাহুল। আর মাঝখানে আটকে থাকা দেড় ঘনমিটারের বদ্ধ বাতাস।
উপরিভাগের এই শান্ত নিঃশব্দতার নিচে লিফটটা নীচের দিকে নামতে শুরু করল। হাইড্রোলিক পাম্পের একটা মৃদু, একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজ আর পায়ের তলায় একটা হালকা অভিকর্ষের চাপ।
"আজকের পার্টির আয়োজনটা সত্যিই দারুণ ছিল। কী বলেন, মিস গাঙ্গুলি ?"
রাহুল বিদিশার থেকে মাত্র দেড় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন।
বিদিশা হালকা হেসে মাথা নাড়লেন, চোখ দুটো হালকা বুজে আবার খুললেন।
"জাঁকজমক হয়তো ছিল। কিন্তু, আমার জন্য বড্ড বেশি কোলাহলপূর্ণ।"
রাহুল মৃদু হাসলেন।
"ঠিক বলেছেন। কৃত্রিম হাসি আর অহেতুক আড্ডা দেবার ডিউটি থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন বলুন?"
"আপনি কি সব জায়গাতেই এত সূক্ষ্ম নজর রাখেন, প্রফেসর বোস?"
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে বিদিশা শাড়ির আঁচলটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে দরজার কাঁচের প্রতিফলনে রাহুলের দিকে তাকালেন।
রাহুল হালকা হাসলেন। চশমার ফ্রেমটা আঙুলের ডগায় সামান্য ওপরে তুলে বিদিশার চোখে চোখ রাখলেন।
"সব জায়গায় নয়, মিস গাঙ্গুলি। তবে কিছু মানুষের চোখের ভেতরের ক্লান্তি টের পেতে খুব বেশি নজরদারির প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে..."
রাহুল কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন।
লঘু কথা চালাচালি থেকে কথোপকথনটা হঠাৎই ভারী দিকে ঘুরে গেল দেখে বিদিশা ঘাড় তুলে রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন।
"সবচেয়ে বড় কথা কী?"
"কিছু না।"
রাহুল একটু ইতস্তত করে নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিলেন।
"কিছু মানুষের ইগো এত বিশ্রী যে, আপনার আত্মসম্মানটা বজায় রেখে চলাফেরা করাটাই তাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। কিন্তু আপনি যে রুখে দাঁড়িয়েছেন, সেটাই অদ্ভুত সুন্দর।"
কথাটা শোনামাত্রই বিদিশার বুকের ভেতর একটা হালকা শিরশিরে অনুভূতি খেলে গেল। সিম্পোজিয়ামের সময় সুব্রত সেন আর ডঃ বাগচীর কীর্তিকলাপের কথা যে রাহুল আংশিক ভাবে হলেও টের পেয়েছেন, সেটা তিনি বুঝলেন।
আজকে পার্টিতে একা একা বসে তিনি তো কলেজের এই বিষাক্ত পরিমণ্ডলের কথাই চিন্তা করছিলেন।
কিন্তু রাহুলের এই প্রশংসায় কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আরেকজন নারীর প্রতি খাঁটি সম্মানের সুরটা বুঝতে বিদিশার অসুবিধা হল না।
তার ঠোঁটের কোণে একটা নরম হাসি ফুটে উঠল।
"ধন্যবাদ, রাহুল। আপনার এই সাপোর্টটুকু আমার দরকার ছিল।"
এই প্রথম বিদিশা নিজের মুখে রাহুলকে 'মিস্টার বোস'-এর বদলে শুধুই 'রাহুল' বলে ডাকলেন।
রাহুলের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওনার ঠোঁটের কোণের হাসিটা চওড়া হলো। উনি বিদিশার আরও একটু কাছে ঘেষে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়,
ক্যাঁচচ্যাঁচচচ... বিকট শব্দ!
হঠাৎ পুরো লিফটটা বাতাসে এক ভয়াবহ ধাক্কা খেল! একটা বিশ্রী, কানফাটানো ধাতব ঘর্ষণের আওয়াজ গোটা কেবিনটাকে কাঁপিয়ে দিল!
"আহ!"
বিদিশা নিজের দেহের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা পেছনের দিকে হেলে পড়লেন।
"বিদিশা!"
রাহুল চটজলদি রিফ্লেক্স অ্যাকশনে নিজের ডান হাতটা বিদিশার কোমর আর পিঠের মাঝখানটায় গলিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। বিদিশার সুডৌল শরীরটা সজোরে রাহুলের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
পরমুহূর্তেই লিফটটা ফ্রি-ফল দেওয়ার মতো কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে আচমকা একটা ভীষণ ঝটকা দিয়ে একদম থেমে গেল!
ধাতব কেবলগুলোর বিকট টানাটানির শব্দ হলো ওপরের ট্রাস থেকে। তারপর ... সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা।
ছাদের চারটে আলোর দুটো স্পটলাইট দপ করে নিভে গিয়ে একটা ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল। এসির সেই একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল ভেতরের বায়ু চলাচল।
লিফটের কাঁচ আর অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটা মেঝের থেকে তিনতলা আর চারতলার ঠিক মাঝামাঝি কোনো এক অন্ধকার ফাঁকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে ঝুলে রইল।
ভেতরের বাতাস শান্ত হতে অন্তত দশ সেকেন্ড সময় লাগল।
তারপর, শুধুই দুজনের দ্রুত, হাপরের মতো ওঠানামা করা শ্বাসের শব্দ।
বিদিশার বুকটা রাহুলের কাস্টম-ফিট করা ব্লেজারের ওপর লেপ্টে ছিল। তাঁর শাড়ির আঁচলটা ধাক্কায় সামান্য সরে গিয়ে গলার নিচের ফর্সা খাঁজটা রাহুলের শার্টের কলারকে স্পর্শ করছিল। বিদিশার চুল থেকে ভেসে আসা সুবাস সরাসরি রাহুলের নাকে গিয়ে ধাক্কা মারছিল।
আর রাহুলের শক্ত, পুরুষালি ডান হাতটা তখনো বিদিশার সরু কোমরের ওপর অত্যন্ত শক্ত করে চেপে বসা। বিদিশার লিনেন শাড়ির ওপর দিয়েই রাহুল বিদিশার কোমরের প্রতিটি খাঁজ, তার উত্তাপ অনুভব করছিলেন।
"আ-আপনি ঠিক আছেন?"
রাহুলের ফিসফিসানি গলাটা বিদিশার কানের কাছে এসে লাগল।
বিদিশার বুকের ধুকপুকুনি এত দ্রুত চলছিল যে তিনি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি রাহুলের শরীরের ওপর একদম সেঁটে আছেন।
বিদিশা চট করে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
"হ্যাঁ... হ্যাঁ, আই অ্যাম ওকে। থ্যাংক ইউ, রাহুল। আপনি না ধরলে আমি পড়ে যেতাম।"
রাহুলও সাথে সাথে সচেতন হয়ে নিজের হাতটা বিদিশার কোমর থেকে সরিয়ে নিলেন।
কিন্তু, অনেক দূরে সরে গেলেন না। কারণ এই লিফটে সরার মতো জায়গা খুব একটা ছিল না।
"লিফটটা আটকে গেছে।"
রাহুল ধাতব দেওয়ালে হাত রেখে সোজা হলেন।
তাড়াতাড়ি বাটন প্যানেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাহূল 'অ্যালার্ম' আর 'ইমার্জেন্সি কল' বাটনগুলো বারবার চাপতে লাগলেন। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। সাউন্ড প্যানেল থেকে শুধু একটা বিশ্রী কর্কশ স্ট্যাটিক আওয়াজ এল, তারপর সেটাও নিভে গেল।
"ড্যাম ইট! পাওয়ার ব্যাকআপ সুইচ ওভারহিটেড বা কেবল ট্র্যাপে আটকে গেছে।"
হতাশ রাহুল বাটন প্যানেলে একটা হালকা চাপড় মেরে বললেন।
বিদিশা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করলেন।
"নেটওয়ার্ক চেক করুন। আমার ফোনে সার্ভিস দেখাচ্ছে না।"
রাহুলও নিজের ফোন বের করলেন।
"নো সিগন্যাল। এই সার্ভিস শ্যাফটের চারপাশটা ঘন কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে ঘেরা। সিগন্যাল পাওয়া মুশকিল।"
দুজন মানুষের চোখই এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের ওপর গিয়ে স্থির হলো।
বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাতাস বন্ধ। ঘরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
"আমাদের প্যানিক করলে চলবে না,"
বিদিশা নিজের গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু, হঠাৎ এই খাঁচার মধ্যে আটকা পড়ে যাওয়া তাঁর মানসিক স্থিরতাকে নাড়া দিয়েছিল।
"টেকনিশিয়ানরা নিশ্চয়ই নজর রাখবে। অন্য কেউ লিফটে না চড়লেও ওরা অন্তত বিশ-ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তো খেয়াল করবেই।"
রাহুল নিজের ব্লেজারটা খুলে ফেললেন। ওনার কপালে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।
"বিশ-ত্রিশ মিনিট?"
বিদিশার গলায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
রাহুল হালকা একটু হাসার চেষ্টা করলেন, যদিও হাসিতে উদ্বেগের ছাপ ছিল।
"এই ছোট জায়গায় এসি ছাড়া বিশ মিনিট মানে কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা অন্তত চার ডিগ্রি বেড়ে যাওয়া। অ্যান্ড উই হ্যাভ ভেরি লিটল অক্সিজেন।"
তিনি তাঁর ব্লেজারটা ভাঁজ করে লিফটের এক কোণে রাখলেন। তারপর বিদিশার দিকে তাকালেন।
বিদিশা দাঁড়িয়ে ছিলেন দেওয়ালের কাঁচের হেলান দিয়ে। ওনার ফর্সা গাল দুটো ইতিমধ্যেই হালকা গোলাপি ছোপ নিতে শুরু করেছে। এসির বাতাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কেবিনের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা আর উষ্ণতা হু-হু করে বাড়ছে।
তার পেস্তা-সবুজ শাড়ির ব্লাউজের কলারের কাছে, ঘাড়ের খাঁজে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।
"বিদিশা, আপনি বসুন। দাঁড়িয়ে থাকলে হার্ট রেট বাড়বে, অক্সিজেনের অপচয় বেশি হবে।"
রাহুল অত্যন্ত শান্তভাবে বিদিশার হাতটা হালকা ছুঁয়ে বললেন।
রাহুলের হাতের স্পর্শে বিদিশা এক মুহূর্তের জন্য শিহরিত হলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আপত্তি করাটা বোকামি। তিনি ধীরে ধীরে লিফটের রাবারাইজড মেঝের ওপর হাঁটু ভাঁজ করে বসলেন। ওনার শাড়ির বহর মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
রাহুলও ওনার ঠিক উল্টোদিকে, মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে মেঝের ওপর বসলেন।
দুজনের হাঁটু প্রায় একে অপরকে স্পর্শ করে আছে।
কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু ওদের দুজনের দীর্ঘায়িত শ্বাসের শব্দ আর মাঝেমধ্যে ওপরের কেবল থেকে ভেসে আসা ধাতব 'টিক-টিক' আওয়াজ।
দশ মিনিট কেটে গেল।
বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। বদ্ধ কেবিনের ভেতর বাতাস যেন ভারী হয়ে ঝুলে রয়েছে।
বিদিশা অনুভব করছিলেন, ওনার কাপড়ের নিচ থেকে চামড়া ভিজে উঠছে। ওনার কপালে, ঠোঁটের ওপরে আর ঘাড়ের পেছনের অবাধ্য চুলগুলোর গোড়ায় সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো জমাট বেঁধে ফোঁটায় পরিণত হচ্ছে।
রাহুল ওনার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিয়েছেন। ওনার সুগঠিত, চওড়া বুকে আর গলার খাঁজে ঘাম চকচক করছে।
"আপনি... খুব কষ্ট পাচ্ছেন, তাই না?"
রাহুল বিদিশার মুখের দিকে তাকিয়ে শোধালেন।
বিদিশার চোখদুটো বোজা ছিল। তিনি চোখ খুলে রাহুলের দিকে তাকালেন। ওনার লিপস্টিক মাখা ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক হয়ে আছে, প্রতিটা শ্বাসে ওনার উন্মুক্ত বুকের ওপরের খাঁজটা তীব্রভাবে ওঠানামা করছে।
"একটু... দমবন্ধ লাগছে।"
বিদিশা খুব নিচু গলায় বললেন।
"ছোটবেলা থেকেই আমার বদ্ধ জায়গায় একটু ফোবিয়া আছে।"
"ক্লস্ট্রোফোবিয়া?"
রাহুলের গলায় গভীর উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
বিদিশা মৃদু মাথা নাড়লেন।
"পুরোপুরি নয়। তবে... এই আর্দ্রতাটা সহ্য হচ্ছে না।"
বিদিশা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজের ডান হাতটা গলার কাছে নিয়ে গেলেন। ওনার নেভি-ব্লু শাড়ির আঁচলটা পিন করা ছিল বাঁ কাঁধে। ওনার মনে হচ্ছিল শাড়ির আঁচলটা ওনার বুকের ওপর এক অতিরিক্ত ভারী পাথর হয়ে চেপে বসে আছে।
তিনি পিনটা খোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওনার হাত কাঁপছিল। পিনটা আটকে যাচ্ছিল কাপড়ের খাঁজে।
"আমাকে দেখতে দিন।"
রাহুল চট করে বিদিশার হাতটার ওপর নিজের হাত রাখলেন।
বিদিশা থামলেন। ওনার চোখদুটো রাহুলের সামনাসামনি।
রাহুলের স্পর্শটা কিন্তু সেদিনের বিক্রমের সেই লোলুপ ছোঁয়ার মতো ছিল না। তিনি খুব সাবধানে, বিদিশার মসৃণ ফর্সা কাঁধের কাছে পিনটা আলগা করলেন। পিন খোলার সময় রাহুলের হাতের উল্টো পিঠ বিদিশার গলার উন্মুক্ত মসৃণ চামড়া আর কলারবোন স্পর্শ করে গেল।
বিদিশার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র, বিদ্যুতায়িত অনুভূতি খেলে গেল। ওনার শ্বাস আটকে এল।
পিনটা খুলে আসতেই বিদিশা হালকা একটা হাঁফ ছাড়লেন। তিনি শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে নিজের কোলের ওপর সরিয়ে নিলেন।
আঁচলটা সরতেই ওনার শাড়ির ডিপ-নেক ব্লাউজের ওপরের উন্মুক্ত ফর্সা অংশটা সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে পড়ল।
ব্লাউজের সরু নেকলাইনের ওপর দিয়ে ওনার সুডৌল, মোলায়েম স্তনযুগলের ওপরের অংশ আর গলার গভীর খাঁজে জমা হয়ে থাকা ঘামের স্বচ্ছ বিন্দুগুলো লিফটের মৃদু আলোয় হীরার ফোঁটার মতো ঝলমল করে উঠল।
রাহুল নিজের অজান্তেই এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারলেন না। ওনার শ্বাসের গতি আটকে গেল।
একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর পক্ষে এই দৃষ্টি টের পাওয়া খুব কঠিন নয়। বিদিশাও খুব সহজেই রাহুলের মুগ্ধ দৃষ্টি টের পেলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন না।
"আই অ্যাম সরি... আমি ওভাবে তাকাতে চাইনি।"
রাহুল চট করে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন। ওনার গলায় নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা।
বিদিশা নিজের কোলের শাড়ির কাপড়টা একটু মুঠো করে ধরলেন।
"ইটস ওকে, রাহুল। আই নো... ইউ আর নট লাইক দেম।"
রাহুল বিদিশার দিকে আবার তাকালেন।
"দেম? দেম মানে?"
বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার পিঠের দিকে ব্লাউজটা ঘামে ভিজে চামড়ার সাথে সেঁটে গেছে।
"আপনার কি মনে হয়, আমি কী পুরুষদের দৃষ্টি বুঝতে পারি না ?"
বিদিশা এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে বনগানির ছবিটা ভেসে উঠল।
"সবাই ভাবে আমি শুধু একটা সুন্দর ট্রফি। একটা দেমাগী মহিলা যাকে জয় করতে পারলে তাদের ইগো শান্ত হয়।"
ইঙ্গিতটা বুঝতে রাহুলের অসুবিধা হল না। তিনিই এ ব্যাপারে বিদিশাকে সবার আগে সাবধান করেছিলেন।
তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল।
"বিক্রম? ওই ছেলেটা আপনার সাথে অসভ্যতা করেছে?"
বিদিশা স্থির চোখে রাহুলের দিকে তাকালেন।
"ফেস্টের রাতে অডিটোরিয়ামের ব্যাকস্টেজে... অয়ন হঠাৎ এসে না পড়লে ওই ছেলেটা আমার শরীরে হাত দিয়ে নিজের সীমা পার করে ফেলেছিল।"
রাহুল স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার চোখের মণি রাগে ছোট হয়ে এল।
"মাই গড! অ্যান্ড অয়ন... ও সেটা দেখেছিল?"
"হ্যাঁ।"
বিদিশার গলার স্বর হঠাৎ একদম নিচু হয়ে গেল। ওনার চোখের কোণে এক চিলতে বিষাদের ছায়া।
"হ্যাঁ, অয়ন ওটা দেখে ফেলেছিল। সেইজন্য ও নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তারপরই ও বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।"
"তাহলে আপনি অয়নকে অত বড় শাস্তি দিলেন কেন? সবার সামনে ওকে চড় মারলেন, গুণ্ডা বললেন?"
রাহুলের গলায় চরম বিস্ময়।
বিদিশা নিজের দুই হাঁটু আরও একটু বুকের কাছে টেনে নিলেন। ওনার গলার কাছে জমা ঘামের ফোঁটাটা গড়িয়ে ওনার ব্লাউজের নেকলাইনের গভীরে মিলিয়ে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তাহলে অয়ন আর তার আসল সম্পর্ক রাহুলের কাছে ফাঁস করতে হয়।
"অয়ন নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিল। ও বিক্রমকে যেভাবে মারছিল, সাহিলরা ছুটে না এলে যেকোন সময় একটা বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।"
কথাগুলো শুনে রাহুল থমকে গেলেন। সত্যিই তো, বিক্রমের মুখ সেদিন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
বিদিশা রাহুলকে বলতে পারলেন না যে শিক্ষিকা হিসেবে সেই গুণ্ডামি যেমন তিনি মেনে নিতে পারেননি, তেমনই মা হিসেবে... তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, অয়ন যদি এই হিংস্রতার পথে চলতে থাকে, তবে সে একদিন নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাই তিনি শুরুতেই ওকে আটকাতে চেয়েছিলেন।
না বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিদিশার চোখদুটো জলে ভরে এল।
ফেস্টের পর থেকে যে মানসিক অনুভূতিগুলোকে তিনি বারবার কঠোর শিক্ষিকাসত্ত্বার বর্ম দিয়ে ঢেকে দিতেন, আজকের এই দুর্বল মুহূর্তে সেটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু, সত্যিটা না জানায় রাহুল বুঝলেন উল্টো।
তিনি ভাবলেন বিদিশা বিক্রমের অসভ্যতার ট্রমা, অয়নের কাণ্ডকারখানার অভিঘাত, সহকর্মীদের পলিটিক্স, সবকিছুর চাপ নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। আজ সহ্য করতে না পেরে তার সামনে কেঁদে ফেললেন। তার বুকটা সহানুভূতিতে মুচড়ে উঠল।
তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। হাঁটু গেড়ে বসে বিদিশার আরও কাছে এগিয়ে এলেন। ওনার শক্ত, পুরুষালি হাত দুটো দিয়ে উনি বিদিশার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিলেন।
"বিদিশা..."
রাহুলের গলাটা গভীর আবেগে কঁপে উঠল।
"ইউ হ্যাভ বিন ক্যারিইং টু মাচ পেইন। আপনি নিজেকে বড্ড বেশি শক্ত করে রাখেন। কিন্তু আপনারও তো শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।"
রাহুলের হাতের উত্তাপ, ওনার আন্তরিক কণ্ঠস্বর বিদিশার ভেতরের সমস্ত মানসিক বাঁধ ভেঙে দিল।
তার গাল বেয়ে এক ফোঁটা তাজা জল নেমে এল।
রাহুল নিজের ডান হাতটা তুলে আলতো করে ওনার বুড়ো আঙুল দিয়ে বিদিশার গালের জলটুকু মুছে দিলেন। ওনার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে বিদিশা চোখ বুজে ফেললেন।
তিনি রাহুলের হাতের স্পর্শের দিকে নিজের মুখটা একটু কাত করলেন।
"রাহুল..."
বিদিশা ফিসফিস করে উঠলেন। ওনার শ্বাসের গতি অতি দ্রুত, বুকের তীব্র ওঠানামায় ওনার সুডৌল স্তনের খাঁজ রাহুলের হাতের একদম ইঞ্চি খানেক দূরে কাঁপছে।
রাহুল বিদিশার মসৃণ চিবুকটা নিজের আঙুল দিয়ে ধরে ধীরে ধীরে ওনার মুখটা নিজের দিকে তুললেন।
দুজনের মুখ এখন মাত্র দুই ইঞ্চির দূরত্বে।
রাহুল বিদিশার কপালে নেমে আসা ভিজে চুলের গোছাটা হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে দিলেন। ওনার চোখ আটকে গেল বিদিশার মেরুন লিপস্টিক মাখা, হালকা হাঁ হয়ে থাকা ঠোঁট দুটোর ওপর।
"বিদিশা... আই হ্যাভ ওয়ান্টেড দিস ফর সো লং..."
রাহুল তীব্র আবেগে ফিসফিস করে বললেন।
বিদিশা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে রাহুলের দিকে নিজের মুখটা সামান্য এগিয়ে দিলেন। ওনার মধ্যে আর কোনো প্রতিরোধ রইল না। এই মুহূর্তে তিনি কোনো অধ্যাপিকা নন, কারো মা নন, কারো স্ত্রী নন। তিনি একজন একাকীত্বে ভোগা নারী, যিনি একটু ভালোবাসা, মমতা, সহানুভূতির খোঁজ করছেন।
এমনই সময়, হঠাৎ !
ক্ল্যাঙ্ক! ঘড়ড়ড়ড়!
হঠাৎ শ্যাফ্টের ওপর থেকে ইলেকট্রিক মোটরটা বিকট শব্দে গর্জে উঠল!
সোডিয়াম আলোর দুটো মেইন টিউবলাইটের তীব্র সাদা আলো হঠাৎ লিফটের কেবিনে ফিরে এল! এসি-র ঠান্ডা ফ্যানের ভেন্টিলেটরটা শব্দ করে চালু হয়ে গিয়ে হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস কেবিনের ভেতরে পাঠাতে শুরু করল!
ডিং!
লিফটের ভেতরে ডিসপ্লে বোর্ডে নীল আলোয় নম্বর ফুটে উঠল - 'G'।
বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে! লিফট সার্ভিস শুরু হয়ে গেছে !
আর সাথে সাথেই ওই স্বপ্নের মতো মুহূর্তটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যেন মাথার ওপর কেউ এক বালতি বরফজল ঢেলে দিল।
বিদিশা মুহূর্তের মধ্যে চোখ খুললেন।
রাহুলও এক লহমায় নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেন।
তিনি দ্রুত এক পা পিছিয়ে এলেন।
"হায় ভগবান..." বিদিশার ফর্সা মুখটা রাগে, লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
"আই... আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, বিদিশা।"
রাহুলের গলায় চরম অপরাধবোধ আর বিহ্বলতা।
"আমি... আমি নিজের ওপর থেকে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিলাম। আই ডিড নট মিন টু..."
"চুপ করুন! প্লিজ!"
বিদিশা কাঁপা কাঁপা হাতে কোলের ওপর পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা, যেটার পিন খুলতে রাহুল সাহায্য করেছিলেন, সেটা তুলে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন।
তিনি একবার দ্রুত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। সেই আয়নায় বিদিশা এক রতিক্লান্ত নারীকে দেখতে পেলেন। বিদ্যুত আসতে আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে এই প্রতিবিম্বে নিজের ওই রূপটাই হয়তো তাঁকে দেখতে হত।
তিনি চটজলদি শাড়ির পিনটা কোনোমতে কাঁধে আটকে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
লিফটটা ততক্ষণে একতলার ফ্লোরে এসে স্থির হয়েছে।
ডিং!
মেটালিক দরজা দুটো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
বাইরে থেকে আলো আর দুএকজন মানুষের অস্পষ্ট আওয়াজ ভেতরে আসতে শুরু করেছে।
বিদিশার কপালে ঘামের ফোঁটাগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।
কিন্তু উনি কঠিন প্রফেসরের বর্মটা জোর করে ফিরিয়ে আনলেন।
রাহুলও ওনার ব্লেজারটা দ্রুত গায়ে চাপিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
লিফটের দরজা পুরোপুরি খুলে যেতেই সামনে দেখা গেল সাহিল আর দুজন লিফট মেকানিক দাঁড়িয়ে আছে। সাহিলের মুখে চরম উৎকণ্ঠা।
"ম্যাম! স্যার ! থ্যাংক গড আপনারা ঠিক আছেন!"
সাহিল এগিয়ে এল।
"লিফটটা ১৫ মিনিট ধরে আটকে ছিল। আমরা মেইন পাওয়ার লাইন রিসেট করে চালনা করলাম। আপনারা ঠিক আছেন তো?"
বিদিশা এক সেকেন্ড সময় নিলেন নিজের গলার স্বর ঠিক করতে।
তারপর তিনি অত্যন্ত শান্ত, বরফশীতল গলায় বললেন,
"আই অ্যাম ফাইন, সাহিল। শুধু একটু এসি বন্ধ ছিল। দ্যাটস অল।"
তিনি একবারের জন্যও রাহুলের দিকে ফিরে তাকালেন না।
স্টিলেটোর খটখট শব্দ তুলে বিদিশা লিফট থেকে বেরিয়ে সোজা মেইন গেটের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। ওনার হাটার ভঙ্গি একদম সোজা, কিন্তু ওনার বুকের ভেতরটা তখনো তোলপাড় করছে।
রাহুল লিফটের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার হাতের তালুতে এখনো বিদিশার কোমরের স্পর্শের উষ্ণতা আর নাকে ওনার পারফিউমের গন্ধ লেগে আছে।
তিনি বিদিশার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যে ভয়টা তিনি পেয়েছিলেন সেটাই ঘটল। বিদিশা এবার ভাববে যে তিনি ওর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওকে exploite করতে চাইছিলেন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)