13-09-2026, 09:18 PM
(This post was last modified: 13-09-2026, 09:21 PM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
৫
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নটা বেজে পনেরো।
অয়ন ক্লাবের মূল কাঁচের দরজার বাইরে আইডি ভেরিফিকেশনের জন্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়াল। ওর পরনে একটা কুচকুচে কালো টার্টলনেক সোয়েটার আর ডার্ক জিন্স, তার ওপর চাপানো একটা সাধারণ কালো লেদার জ্যাকেট। পোশাকটা এমনভাবে বেছে নেওয়া যাতে ভিড়ের মধ্যে খুব সহজেই মিশে যাওয়া যায়, আলাদা করে কারও চোখে না পড়ে।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাউন্সারকে নিজের ফোনে থাকা কিউ-আর (QR) কোডটা স্ক্যান করাল অয়ন। বাউন্সার মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াতেই অয়ন ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখল।
ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো সে যেন সোজা নরককুণ্ডে এসে পড়েছে।
বিশাল হলঘরটার তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে অন্তত দশ ডিগ্রি বেশি।
বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া, পোড়া গাঁজা আর অ্যালকোহলের বমি-উদ্রেককারী গন্ধ পাক খাচ্ছে। সিলিং থেকে নেমে আসা লেজার লাইটগুলো লাল, নীল আর বেগুনি রঙে পুরো হলঘরটাকে চিরে ফেলছে। স্মোক মেশিন থেকে বেরোনো ঘন ধোঁয়ার চাদরে ফ্লোরের ওপর নাচতে থাকা শ-দুয়েক ছেলেমেয়ের শরীরগুলো কখনো স্পষ্ট হচ্ছে, কখনো আবার অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
অয়ন ধীর পায়ে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাড়াহুড়ো না করে ভিড়ের পাশ কাটিয়ে এগোতে শুরু করল। ও আন্দাজ করেছিল যে 'পার্টি' মানে এরকমই কিছু একটা হতে চলেছে সেজন্যই জিনিয়াকে ঘুরিয়ে 'না' বলে দিয়েছিল। কিন্তু, আজ বাধ্য হয়ে আসতে হল। স্রেফ বিক্রমের জন্য।
হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই অয়ন চারপাশটা স্ক্যান করে নিতে লাগল। সিধুর কথা অনুযায়ী আজ বিক্রমের এই পার্টিতে আসার চান্স আছে।
কিন্তু, ওর মতো ছেলে এত তাড়াতাড়ি পার্টিতে ঢুকবে বলে মনে হয় না।
অয়ন মনে মনে হিসাব কষতে লাগল। বিক্রম যদি বারোটার পর আসে, তাহলে ওকে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা এই বদ্ধ, দমবন্ধ করা পরিবেশে টিকে থাকতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, ওকে এমন একটা জায়গা বেছে নিতে হবে যেখান থেকে পুরো ডান্স ফ্লোর, মূল প্রবেশদ্বার আর ভিআইপি লাউঞ্জটা পরিষ্কার দেখা যায়, অথচ কেউ ওকে দেখতে পাবে না। একদম ছায়ার মতো।
সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে বৈশালীর থেকে।
সে যদি একবার ওকে এখানে দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাৎ একটা বড়সড় সিন ক্রিয়েট করবে।বিক্রমকে ধরার জন্য বৈশালীর পার্টিতে আসতে হবে জানলে সেদিন কন্ট্রোল হারিয়ে অমন কাজ অয়ন কখনো করতো না।
আজ কোনভাবেই স্পটলাইটে আসা যাবে না। স্পটলাইটে এলে বিক্রমের ওপর নজর রাখার প্ল্যানটা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।
হলঘরের ডানদিকের বার কাউন্টারটা এড়িয়ে অয়ন বাঁ দিকের একটা আধো-অন্ধকার করিডোরের দিকে এগোল। করিডোরটা গিয়ে মিশেছে একটা চওড়া ব্যালকনিতে, যার একপাশে একটা বিশাল মেকি রোমান পিলার। পিলারের পেছনের জায়গাটা প্রায় অন্ধকার, লেজার লাইটের রশ্মি ওখানে পৌঁছচ্ছে না।
অয়ন নিঃশব্দে পিলারের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। জায়গাটা পারফেক্ট। এখান থেকে পুরো পার্টির প্যানোরামিক ভিউ ওর চোখের সামনে।
সে পিলারের ঠান্ডা পাথরে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে একবার গভীর শ্বাস নিল।
তারপর চোখ মেলে ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকাল। স্টুডেন্টদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই আউট অফ কন্ট্রোল। ফ্লোরের এক কোণে একটা সোফার উপর একটা ছেলে একটা মেয়ের গলার কাছে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। মেয়েটা বাধাও দিচ্ছে না, আটকাচ্ছেও না; তার হাতের গ্লাস থেকে ছিটকে পড়া রাম কার্পেটের ওপর গড়িয়ে পড়ছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। আশেপাশের কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।
স্পিকারের একদম সামনে তিন-চারটে মেয়ে বেসামাল হয়ে নাচছে, হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে, কে দেখছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।
বার কাউন্টারের পাশে একটা ছেলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গ্লাসের পর গ্লাস খালি করে যাচ্ছে, তার চোখ দুটো লাল, ফোকাসে নেই।
জানলার ধারের কার্পেটে একটা ছেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে, জুতো পায়েই। পাশ দিয়ে সবাই হেঁটে যাচ্ছে, কেউ তাকে তোলার চেষ্টাও করছে না। এক কোণে দুজন চিৎকার করে ঝগড়া করছে, কী নিয়ে ঝগড়া নিজেরাও জানে না, ঝগড়ার মাঝেই আবার হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে।
এসব দেখে অয়নের মনে হল এই পার্টিগুলো শুধু নাচগানের জায়গা নয়। এখানে আউট অফ কন্ট্রোল হওয়াটা অ্যালাউড। কেউ কিছু বলবে না জেনেই মানুষ নিজের ভেতরের সংস্কারগুলোকে একরাতের জন্য ছুটি দিয়ে দেয়।
হঠাৎ লেজারের একটা তীব্র সাদা আলো ফ্লোরের মাঝখানে পড়তেই অয়নের চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
বৈশালী।
ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে, ভিআইপি সোফার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে একটা রক্তবর্ণের বডিকন ড্রেস। শরীরের প্রতিটি বাঁক নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। পিঠের দিকটা প্রায় পুরোটাই অনাবৃত। চুলগুলো নিপুণভাবে সেট করা, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। লেজারের আলোয় সুন্দরী বৈশালীকে দেখে মনে হচ্ছে লালরঙা আগুনের শিখা।
ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেবমাল্য। দেবমাল্যর হাতে একটা গ্লাস, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। হাসিটা দেখে অয়নের ভীষণ মেকি মনে হল।
ছেলেটা প্রাণপণে বৈশালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। সে বারবার ঝুঁকে বৈশালীর কানের কাছে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
বৈশালীর হাতেও একটা গ্লাস, তাতে তরল পানীয়।
দেবমাল্যর কথায় ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওর চোখের দৃষ্টি অস্থির। ভিড়ের মধ্যে ক্রমাগত কাউকে খুঁজছে। একটা তীব্র অতৃপ্তি আর বিরক্তি ভাব ওর মুখে স্পষ্ট।
কে জানে হয়তো ওকেই খুঁজছে। সিধু আবার বৈশালীকে কিছু বলে-টলে দিল নাকি ?
অয়ন নিজের অজান্তেই পিলারের আরও একটু আড়ালে সরে গেল।
বৈশালী ওকে এখানে দেখতে পেলেই অকারণে ঝামেলা পাকাবে আর তাতে ওর মূল লক্ষ্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আজকে ওর মূল লক্ষ্য বিক্রমকে স্টাডি করা।
৬
সময় গড়াচ্ছে।
ডিজে মিউজিকের টেম্পো আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসে কামনার গন্ধটা এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
অয়ন পিলারের আড়ালে একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাস একদম স্বাভাবিক, চোখের পলক পড়ছে মেপে মেপে। ওর চারপাশে এতগুলো মানুষ উদ্দামভাবে নড়াচড়া করছে, নাচছে, গাইছে, চিৎকার করছে। কিন্তু, অয়ন একদম স্থির। এই ঘরে থেকেও সে এই ঘরে উপস্থিত নেই। ওর এই স্থিরতা ওকে বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে।
কিন্তু অয়ন জানত না, এটাই ওকে একজনের চোখে ইতিমধ্যেই ধরিয়ে দিয়েছে।
হলঘরের উল্টোদিকে, ভিআইপি লাউঞ্জের একটু ওপরের দিকে একটা ছোট মেজানাইন ফ্লোর রয়েছে। সেখান থেকে পুরো পার্টির উপর নজর রাখা যায়।
সেই মেজানাইন ফ্লোরের রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জিনিয়া।
ওর পরনে একটা কালো রঙের স্লিট ড্রেস, হাতে মার্টিনির গ্লাস। জিনিয়া মাতাল হয়নি।
ওর চোখ প্রথমে ছিল বৈশালীর ওপর। দেবমাল্যর মতো একটা জোকারকে নিয়ে বৈশালী কতক্ষণ থাকতে পারে, সেটাই জিনিয়া দেখছিল।
কিন্তু হঠাৎ জিনিয়ার দৃষ্টি হঠাৎ ডান্স ফ্লোর পেরিয়ে বাঁ দিকের অন্ধকার করিডোরের দিকে চলে গেল।
ভিড়ের মধ্যে একটা নিয়ম আছে। সবাই যখন নড়চড়া করে, তখন যে একদম নড়ে না, তাকে সবার আগে চোখে পড়ে।
রোমান পিলারটার পেছনে কালোরঙের গাঢ় ছায়া।
প্রথমে তার মনে হয়েছিল হয়তো কোন কাপল অন্ধকার খুঁজছে। কিন্তু তারপর লেজারের একটা নীল আলো এক সেকেন্ডের জন্য ওই করিডোরের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল।
সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে জিনিয়া ছায়াটার আসল অবয়বটা দেখতে পেল।
অয়ন চ্যাটার্জী।
কালো লেদার জ্যাকেট আর ডার্ক জিন্স পড়ে এসেছে যাতে অন্ধকারে মিশে যেতে সুবিধা হয়।
জিনিয়ার চোখ সরু হয়ে এল। ওর হাতটা মার্টিনির গ্লাসের ওপর শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত উত্তেজনায় ধক করে উঠল।
অয়ন এখানে!
সেদিন মাঠে ক্যাজুয়ালি ইনভিটেশনটা রিফিউজ করার পরে আজ চুপিচুপি, অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে এই পার্টিতে চলে এসেছে!
কিন্তু কেন ?
'ও কি বৈশালীর জন্য এসেছে?'
জিনিয়া মনে মনে ভাবল।
জিনিয়া একভাবে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সেলিব্রেশনের কোন ছাপ নেই।
ও বারে যাচ্ছে না, কোন মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে না।
শুধু ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ফুটে উঠল।
"প্লেয়িং হাইড অ্যান্ড সিক, মিস্টার চ্যাটার্জী?"
জিনিয়া নিজের মনে ফিসফিস করে উঠল।
ও গ্লাসের শেষ পানীয়টুকু এক ঢোঁকে শেষ করে গ্লাসটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রাখল।
খেলাটা এবার জমবে।
বৈশালী যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায় যে অয়ন এই পার্টিতে আছে আর লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে দেখছে, তাহলে আজকের পার্টি একটা কুরুক্ষেত্রে পরিণত হবে।
জিনিয়া রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল।
৭
ব্যালকনি থেকে নিচে নেমে এসে জিনিয়া ভিড় ঠেলে সে সোজা ভিআইপি বুথের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে মখমলের কাউচের ওপর বসে আছে বৈশালী। ওর ঠিক পাশেই বসে আছে দেবমাল্য। সে বৈশালীর হাতে ওয়াইনের গ্লাস তুলে দিচ্ছে, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু একটা ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করছে আর বৈশালী সেটা সহ্য করছে। ওর চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায় সে অত্যন্ত বিরক্ত।
জিনিয়া গিয়ে সোজা বৈশালীর হাত ধরে টান দিল।
"এক্সকিউজ মি দেব, ওকে আমার দু-মিনিটের জন্য একটু দরকার।"
দেবমাল্য কিছু বলার আগেই জিনিয়া বৈশালীকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে লাউঞ্জের একপাশে লেডিজ ওয়াশরুমের পেছনের তুলনামূলক শান্ত একটা করিডোরে নিয়ে এল। মিউজিকের আওয়াজটা এখানে বেশ কিছুটা কম।
"হোয়াট দ্য হেল জিনিয়া! কী করছিস তুই? আমার ড্রেসটা ছিঁড়ে যেত তো!"
বৈশালী নিজের সিল্কের ড্রেসটা ঠিক করতে করতে খেঁকিয়ে উঠল।
জিনিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
"তোর বর এসেছে।"
জিনিয়া খুব ক্যাজুয়াল গলায়, প্রতিটা শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করল।
কথাটা শোনামাত্রই বৈশালীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা কেঁপে যাওয়ায় কয়েক ফোঁটা লাল তরল মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
কিন্তু, মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ওপর একটা বিরক্তির মুখোশ টেনে নিল।
"হোয়াট রাবিশ! কিসের বর? কে এসেছে?"
ওর গলাটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই চড়া শোনাল।
জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে হাতের ইশারায় লাউঞ্জের সেই অন্ধকার কর্নারটার দিকে ইঙ্গিত করল।
"ওই দ্যাখ। তোর অ্যাংরি ম্যান। অন্ধকার কোণায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমি সিওর, ও তোকে ফলো করেই আজ এখানে এসেছে। নাহলে অয়ন চ্যাটার্জীর মতো একটা অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলে কোনদিন এসব ক্লাবে পা রাখে?"
বৈশালী করিডোরের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে তাকাল।
অন্ধকারের মধ্যেও ওই চওড়া কাঁধ, হুডের নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা ধারালো চোয়াল আর ওই স্থির, শীতল ভঙ্গিটা চিনতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
অয়ন!
বৈশালীর চোখের তারা দুটো এক লহমায় প্রসারিত হয়ে গেল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
কদিন আগের স্মৃতিগুলো একটা দমকা হাওয়ার মতো ওর মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। গ্যালারির ঠান্ডা মেটাল নেটিং, ওর শর্টসের ওপর দিয়ে অয়নের পুরুষাঙ্গের ঘর্ষণ আর ওর নিতম্বে আছড়ে পড়া জ্বলন্ত থাপ্পড়গুলো...
বৈশালীর মনে হলো, ওর ড্রেসের নিচে এতদিনে মিলিয়ে যাওয়া নিতম্বের সেই লাল দাগগুলো যেন এই মুহূর্তে আবার দপদপ করে জ্বলতে শুরু করেছে। ওর তলপেটের পেশিগুলো একটা অদ্ভুত কামনায় অবশ হয়ে আসতে চাইল। ওর ইচ্ছে হলো এখনই ছুটে গিয়ে ওই অন্ধকার কোণায় অয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু ওর ইগো, ওর আকাশছোঁয়া অহংকার ওর কামনার টুঁটি চেপে ধরল।
"ও এখানে আমাকে ফলো করে এসেছে, তাই না ?"
বৈশালী দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল। ওর চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলজ্বল করছে।
"দারুণ হয়েছে। আমি তো এটাই চাইছিলাম। ও আমার সাথে যে ব্যবহারটা করেছে, আজ আমি ওকে দেখিয়ে দেব যে বৈশালী কে! আজ আমি ওকে এখানে সবার সামনে পিষে মারব।"
জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ দুটো ওপরের দিকে ঘোরাল।
"তুই একটা বদ্ধ পাগল, বৈশালী। তোকে আমি বারবার ওয়ার্ন করছি, অয়নকে এড়িয়ে চল।
ওর সাথে আবার ইনভলভড হওয়া মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।
কিন্তু, তুই কোন কথাই কানে নিস না। তোর প্রবলেমটা কী ?"
"শাট আপ জিনিয়া!"
বৈশালী ফুঁসে উঠল।
"ও ভেবেছে ও আমাকে যা খুশি তাই করবে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব? আজকে রাতের পর ও বুঝতে পারবে..."
"কী বুঝতে পারবে?"
জিনিয়া বৈশালীর কথার মাঝখানেই ওকে থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত নিচু, কিন্তু ধারালো।
"তুই ওকে শিক্ষা দিবি? তুই নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখদুটো দেখেছিস ? তোর
চোখ-মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তুই মনে মনে কী চাস!
তুই একা যাবি ওর সাথে ডিল করতে? যা না! খুব তো বড় বড় কথা বলছিস। আমার তো মনে হচ্ছে তুই আজ রাতে ওর বিছানা গরম করার জন্য পাগল হয়ে আছিস!"
"জিনিয়া!"
বৈশালী রাগে কাঁপতে কাঁপতে হাত তুলল, কিন্তু জিনিয়া এক চুলও নড়ল না।
"থাপ্পড় মারবি? মার। কিন্তু সত্যিটা তুইও জানিস।"
জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি ধরে রেখেই বলল।
"তুই যা খুশি কর। ওর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে থাক, ওর হাতে আবার মার খা। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস... তুই যদি আজ সিন ক্রিয়েট করিস আর তোর দেবমাল্য যদি হিরো সাজতে মাঝখানে নাক গলায়, তুই কিন্তু ওকে বাঁচাতে পারবি না।"
বৈশালী ইগোতে আঘাত পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,
"দেবমাল্যর মতো প্রভাবশালী ফ্যামিলির ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস অয়নের নেই। দেবমাল্যর বডিগার্ডরা বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।"
জিনিয়া একটা অদ্ভুত, করুণার হাসি হাসল। আই রোল করে সে দেওয়াল থেকে পিঠ সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"বডিগার্ড? দেবমাল্য? তুই কি সত্যিই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার অ্যাক্টিং করছিস?"
জিনিয়া বৈশালীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"অয়ন চ্যাটার্জী তোর বড়লোক বয়ফ্রেন্ডটাকে আইসিইউ-তে পাঠাতে ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক দু-মিনিট সময় নেবে। যতক্ষণে ওর বডিগার্ডরা যখন ভেতরে ঢুকবে, ততক্ষণে তোর দেবমাল্যর দাঁতগুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাবে। তুই যদি আজ ওই কোণায় যাস, তবে পুরো রেসপন্সিবিলিটি তোর। আমি তোকে বাঁচাতে আসব না।"
কথাটা বলে জিনিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। বৈশালীকে ওই অন্ধকার করিডোরে একা দাঁড় করিয়ে রেখে সে আবার মিউজিক আর আলোর ভিড়ে হারিয়ে গেল।
বৈশালী একা দাঁড়িয়ে রইল। ও একবার তাকাল ওই অন্ধকার কোনাটার দিকে আর একবার ফিরে তাকাল ভিআইপি বুথে বসে থাকা দেবমাল্যর দিকে।
ওর শরীরের প্রতিটা রোমকূপ অয়নের স্পর্শের জন্য আর্তনাদ করছে আর ওর ইগো ওকে বলছে প্রতিশোধ নিতে। আগুনের নেশা যে বড় মারাত্মক, সেটা ও বুঝতে পারছে, কিন্তু সেই আগুন থেকে চোখ ফেরানোর ক্ষমতা ওর নেই।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নটা বেজে পনেরো।
অয়ন ক্লাবের মূল কাঁচের দরজার বাইরে আইডি ভেরিফিকেশনের জন্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়াল। ওর পরনে একটা কুচকুচে কালো টার্টলনেক সোয়েটার আর ডার্ক জিন্স, তার ওপর চাপানো একটা সাধারণ কালো লেদার জ্যাকেট। পোশাকটা এমনভাবে বেছে নেওয়া যাতে ভিড়ের মধ্যে খুব সহজেই মিশে যাওয়া যায়, আলাদা করে কারও চোখে না পড়ে।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাউন্সারকে নিজের ফোনে থাকা কিউ-আর (QR) কোডটা স্ক্যান করাল অয়ন। বাউন্সার মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াতেই অয়ন ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখল।
ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো সে যেন সোজা নরককুণ্ডে এসে পড়েছে।
বিশাল হলঘরটার তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে অন্তত দশ ডিগ্রি বেশি।
বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া, পোড়া গাঁজা আর অ্যালকোহলের বমি-উদ্রেককারী গন্ধ পাক খাচ্ছে। সিলিং থেকে নেমে আসা লেজার লাইটগুলো লাল, নীল আর বেগুনি রঙে পুরো হলঘরটাকে চিরে ফেলছে। স্মোক মেশিন থেকে বেরোনো ঘন ধোঁয়ার চাদরে ফ্লোরের ওপর নাচতে থাকা শ-দুয়েক ছেলেমেয়ের শরীরগুলো কখনো স্পষ্ট হচ্ছে, কখনো আবার অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
অয়ন ধীর পায়ে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাড়াহুড়ো না করে ভিড়ের পাশ কাটিয়ে এগোতে শুরু করল। ও আন্দাজ করেছিল যে 'পার্টি' মানে এরকমই কিছু একটা হতে চলেছে সেজন্যই জিনিয়াকে ঘুরিয়ে 'না' বলে দিয়েছিল। কিন্তু, আজ বাধ্য হয়ে আসতে হল। স্রেফ বিক্রমের জন্য।
হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই অয়ন চারপাশটা স্ক্যান করে নিতে লাগল। সিধুর কথা অনুযায়ী আজ বিক্রমের এই পার্টিতে আসার চান্স আছে।
কিন্তু, ওর মতো ছেলে এত তাড়াতাড়ি পার্টিতে ঢুকবে বলে মনে হয় না।
অয়ন মনে মনে হিসাব কষতে লাগল। বিক্রম যদি বারোটার পর আসে, তাহলে ওকে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা এই বদ্ধ, দমবন্ধ করা পরিবেশে টিকে থাকতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, ওকে এমন একটা জায়গা বেছে নিতে হবে যেখান থেকে পুরো ডান্স ফ্লোর, মূল প্রবেশদ্বার আর ভিআইপি লাউঞ্জটা পরিষ্কার দেখা যায়, অথচ কেউ ওকে দেখতে পাবে না। একদম ছায়ার মতো।
সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে বৈশালীর থেকে।
সে যদি একবার ওকে এখানে দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাৎ একটা বড়সড় সিন ক্রিয়েট করবে।বিক্রমকে ধরার জন্য বৈশালীর পার্টিতে আসতে হবে জানলে সেদিন কন্ট্রোল হারিয়ে অমন কাজ অয়ন কখনো করতো না।
আজ কোনভাবেই স্পটলাইটে আসা যাবে না। স্পটলাইটে এলে বিক্রমের ওপর নজর রাখার প্ল্যানটা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।
হলঘরের ডানদিকের বার কাউন্টারটা এড়িয়ে অয়ন বাঁ দিকের একটা আধো-অন্ধকার করিডোরের দিকে এগোল। করিডোরটা গিয়ে মিশেছে একটা চওড়া ব্যালকনিতে, যার একপাশে একটা বিশাল মেকি রোমান পিলার। পিলারের পেছনের জায়গাটা প্রায় অন্ধকার, লেজার লাইটের রশ্মি ওখানে পৌঁছচ্ছে না।
অয়ন নিঃশব্দে পিলারের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। জায়গাটা পারফেক্ট। এখান থেকে পুরো পার্টির প্যানোরামিক ভিউ ওর চোখের সামনে।
সে পিলারের ঠান্ডা পাথরে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে একবার গভীর শ্বাস নিল।
তারপর চোখ মেলে ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকাল। স্টুডেন্টদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই আউট অফ কন্ট্রোল। ফ্লোরের এক কোণে একটা সোফার উপর একটা ছেলে একটা মেয়ের গলার কাছে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। মেয়েটা বাধাও দিচ্ছে না, আটকাচ্ছেও না; তার হাতের গ্লাস থেকে ছিটকে পড়া রাম কার্পেটের ওপর গড়িয়ে পড়ছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। আশেপাশের কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।
স্পিকারের একদম সামনে তিন-চারটে মেয়ে বেসামাল হয়ে নাচছে, হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে, কে দেখছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।
বার কাউন্টারের পাশে একটা ছেলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গ্লাসের পর গ্লাস খালি করে যাচ্ছে, তার চোখ দুটো লাল, ফোকাসে নেই।
জানলার ধারের কার্পেটে একটা ছেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে, জুতো পায়েই। পাশ দিয়ে সবাই হেঁটে যাচ্ছে, কেউ তাকে তোলার চেষ্টাও করছে না। এক কোণে দুজন চিৎকার করে ঝগড়া করছে, কী নিয়ে ঝগড়া নিজেরাও জানে না, ঝগড়ার মাঝেই আবার হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে।
এসব দেখে অয়নের মনে হল এই পার্টিগুলো শুধু নাচগানের জায়গা নয়। এখানে আউট অফ কন্ট্রোল হওয়াটা অ্যালাউড। কেউ কিছু বলবে না জেনেই মানুষ নিজের ভেতরের সংস্কারগুলোকে একরাতের জন্য ছুটি দিয়ে দেয়।
হঠাৎ লেজারের একটা তীব্র সাদা আলো ফ্লোরের মাঝখানে পড়তেই অয়নের চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
বৈশালী।
ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে, ভিআইপি সোফার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে একটা রক্তবর্ণের বডিকন ড্রেস। শরীরের প্রতিটি বাঁক নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। পিঠের দিকটা প্রায় পুরোটাই অনাবৃত। চুলগুলো নিপুণভাবে সেট করা, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। লেজারের আলোয় সুন্দরী বৈশালীকে দেখে মনে হচ্ছে লালরঙা আগুনের শিখা।
ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেবমাল্য। দেবমাল্যর হাতে একটা গ্লাস, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। হাসিটা দেখে অয়নের ভীষণ মেকি মনে হল।
ছেলেটা প্রাণপণে বৈশালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। সে বারবার ঝুঁকে বৈশালীর কানের কাছে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
বৈশালীর হাতেও একটা গ্লাস, তাতে তরল পানীয়।
দেবমাল্যর কথায় ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওর চোখের দৃষ্টি অস্থির। ভিড়ের মধ্যে ক্রমাগত কাউকে খুঁজছে। একটা তীব্র অতৃপ্তি আর বিরক্তি ভাব ওর মুখে স্পষ্ট।
কে জানে হয়তো ওকেই খুঁজছে। সিধু আবার বৈশালীকে কিছু বলে-টলে দিল নাকি ?
অয়ন নিজের অজান্তেই পিলারের আরও একটু আড়ালে সরে গেল।
বৈশালী ওকে এখানে দেখতে পেলেই অকারণে ঝামেলা পাকাবে আর তাতে ওর মূল লক্ষ্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আজকে ওর মূল লক্ষ্য বিক্রমকে স্টাডি করা।
৬
সময় গড়াচ্ছে।
ডিজে মিউজিকের টেম্পো আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসে কামনার গন্ধটা এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
অয়ন পিলারের আড়ালে একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাস একদম স্বাভাবিক, চোখের পলক পড়ছে মেপে মেপে। ওর চারপাশে এতগুলো মানুষ উদ্দামভাবে নড়াচড়া করছে, নাচছে, গাইছে, চিৎকার করছে। কিন্তু, অয়ন একদম স্থির। এই ঘরে থেকেও সে এই ঘরে উপস্থিত নেই। ওর এই স্থিরতা ওকে বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে।
কিন্তু অয়ন জানত না, এটাই ওকে একজনের চোখে ইতিমধ্যেই ধরিয়ে দিয়েছে।
হলঘরের উল্টোদিকে, ভিআইপি লাউঞ্জের একটু ওপরের দিকে একটা ছোট মেজানাইন ফ্লোর রয়েছে। সেখান থেকে পুরো পার্টির উপর নজর রাখা যায়।
সেই মেজানাইন ফ্লোরের রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জিনিয়া।
ওর পরনে একটা কালো রঙের স্লিট ড্রেস, হাতে মার্টিনির গ্লাস। জিনিয়া মাতাল হয়নি।
ওর চোখ প্রথমে ছিল বৈশালীর ওপর। দেবমাল্যর মতো একটা জোকারকে নিয়ে বৈশালী কতক্ষণ থাকতে পারে, সেটাই জিনিয়া দেখছিল।
কিন্তু হঠাৎ জিনিয়ার দৃষ্টি হঠাৎ ডান্স ফ্লোর পেরিয়ে বাঁ দিকের অন্ধকার করিডোরের দিকে চলে গেল।
ভিড়ের মধ্যে একটা নিয়ম আছে। সবাই যখন নড়চড়া করে, তখন যে একদম নড়ে না, তাকে সবার আগে চোখে পড়ে।
রোমান পিলারটার পেছনে কালোরঙের গাঢ় ছায়া।
প্রথমে তার মনে হয়েছিল হয়তো কোন কাপল অন্ধকার খুঁজছে। কিন্তু তারপর লেজারের একটা নীল আলো এক সেকেন্ডের জন্য ওই করিডোরের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল।
সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে জিনিয়া ছায়াটার আসল অবয়বটা দেখতে পেল।
অয়ন চ্যাটার্জী।
কালো লেদার জ্যাকেট আর ডার্ক জিন্স পড়ে এসেছে যাতে অন্ধকারে মিশে যেতে সুবিধা হয়।
জিনিয়ার চোখ সরু হয়ে এল। ওর হাতটা মার্টিনির গ্লাসের ওপর শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত উত্তেজনায় ধক করে উঠল।
অয়ন এখানে!
সেদিন মাঠে ক্যাজুয়ালি ইনভিটেশনটা রিফিউজ করার পরে আজ চুপিচুপি, অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে এই পার্টিতে চলে এসেছে!
কিন্তু কেন ?
'ও কি বৈশালীর জন্য এসেছে?'
জিনিয়া মনে মনে ভাবল।
জিনিয়া একভাবে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সেলিব্রেশনের কোন ছাপ নেই।
ও বারে যাচ্ছে না, কোন মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে না।
শুধু ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ফুটে উঠল।
"প্লেয়িং হাইড অ্যান্ড সিক, মিস্টার চ্যাটার্জী?"
জিনিয়া নিজের মনে ফিসফিস করে উঠল।
ও গ্লাসের শেষ পানীয়টুকু এক ঢোঁকে শেষ করে গ্লাসটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রাখল।
খেলাটা এবার জমবে।
বৈশালী যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায় যে অয়ন এই পার্টিতে আছে আর লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে দেখছে, তাহলে আজকের পার্টি একটা কুরুক্ষেত্রে পরিণত হবে।
জিনিয়া রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল।
৭
ব্যালকনি থেকে নিচে নেমে এসে জিনিয়া ভিড় ঠেলে সে সোজা ভিআইপি বুথের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে মখমলের কাউচের ওপর বসে আছে বৈশালী। ওর ঠিক পাশেই বসে আছে দেবমাল্য। সে বৈশালীর হাতে ওয়াইনের গ্লাস তুলে দিচ্ছে, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু একটা ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করছে আর বৈশালী সেটা সহ্য করছে। ওর চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায় সে অত্যন্ত বিরক্ত।
জিনিয়া গিয়ে সোজা বৈশালীর হাত ধরে টান দিল।
"এক্সকিউজ মি দেব, ওকে আমার দু-মিনিটের জন্য একটু দরকার।"
দেবমাল্য কিছু বলার আগেই জিনিয়া বৈশালীকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে লাউঞ্জের একপাশে লেডিজ ওয়াশরুমের পেছনের তুলনামূলক শান্ত একটা করিডোরে নিয়ে এল। মিউজিকের আওয়াজটা এখানে বেশ কিছুটা কম।
"হোয়াট দ্য হেল জিনিয়া! কী করছিস তুই? আমার ড্রেসটা ছিঁড়ে যেত তো!"
বৈশালী নিজের সিল্কের ড্রেসটা ঠিক করতে করতে খেঁকিয়ে উঠল।
জিনিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
"তোর বর এসেছে।"
জিনিয়া খুব ক্যাজুয়াল গলায়, প্রতিটা শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করল।
কথাটা শোনামাত্রই বৈশালীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা কেঁপে যাওয়ায় কয়েক ফোঁটা লাল তরল মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
কিন্তু, মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ওপর একটা বিরক্তির মুখোশ টেনে নিল।
"হোয়াট রাবিশ! কিসের বর? কে এসেছে?"
ওর গলাটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই চড়া শোনাল।
জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে হাতের ইশারায় লাউঞ্জের সেই অন্ধকার কর্নারটার দিকে ইঙ্গিত করল।
"ওই দ্যাখ। তোর অ্যাংরি ম্যান। অন্ধকার কোণায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমি সিওর, ও তোকে ফলো করেই আজ এখানে এসেছে। নাহলে অয়ন চ্যাটার্জীর মতো একটা অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলে কোনদিন এসব ক্লাবে পা রাখে?"
বৈশালী করিডোরের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে তাকাল।
অন্ধকারের মধ্যেও ওই চওড়া কাঁধ, হুডের নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা ধারালো চোয়াল আর ওই স্থির, শীতল ভঙ্গিটা চিনতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
অয়ন!
বৈশালীর চোখের তারা দুটো এক লহমায় প্রসারিত হয়ে গেল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
কদিন আগের স্মৃতিগুলো একটা দমকা হাওয়ার মতো ওর মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। গ্যালারির ঠান্ডা মেটাল নেটিং, ওর শর্টসের ওপর দিয়ে অয়নের পুরুষাঙ্গের ঘর্ষণ আর ওর নিতম্বে আছড়ে পড়া জ্বলন্ত থাপ্পড়গুলো...
বৈশালীর মনে হলো, ওর ড্রেসের নিচে এতদিনে মিলিয়ে যাওয়া নিতম্বের সেই লাল দাগগুলো যেন এই মুহূর্তে আবার দপদপ করে জ্বলতে শুরু করেছে। ওর তলপেটের পেশিগুলো একটা অদ্ভুত কামনায় অবশ হয়ে আসতে চাইল। ওর ইচ্ছে হলো এখনই ছুটে গিয়ে ওই অন্ধকার কোণায় অয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু ওর ইগো, ওর আকাশছোঁয়া অহংকার ওর কামনার টুঁটি চেপে ধরল।
"ও এখানে আমাকে ফলো করে এসেছে, তাই না ?"
বৈশালী দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল। ওর চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলজ্বল করছে।
"দারুণ হয়েছে। আমি তো এটাই চাইছিলাম। ও আমার সাথে যে ব্যবহারটা করেছে, আজ আমি ওকে দেখিয়ে দেব যে বৈশালী কে! আজ আমি ওকে এখানে সবার সামনে পিষে মারব।"
জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ দুটো ওপরের দিকে ঘোরাল।
"তুই একটা বদ্ধ পাগল, বৈশালী। তোকে আমি বারবার ওয়ার্ন করছি, অয়নকে এড়িয়ে চল।
ওর সাথে আবার ইনভলভড হওয়া মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।
কিন্তু, তুই কোন কথাই কানে নিস না। তোর প্রবলেমটা কী ?"
"শাট আপ জিনিয়া!"
বৈশালী ফুঁসে উঠল।
"ও ভেবেছে ও আমাকে যা খুশি তাই করবে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব? আজকে রাতের পর ও বুঝতে পারবে..."
"কী বুঝতে পারবে?"
জিনিয়া বৈশালীর কথার মাঝখানেই ওকে থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত নিচু, কিন্তু ধারালো।
"তুই ওকে শিক্ষা দিবি? তুই নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখদুটো দেখেছিস ? তোর
চোখ-মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তুই মনে মনে কী চাস!
তুই একা যাবি ওর সাথে ডিল করতে? যা না! খুব তো বড় বড় কথা বলছিস। আমার তো মনে হচ্ছে তুই আজ রাতে ওর বিছানা গরম করার জন্য পাগল হয়ে আছিস!"
"জিনিয়া!"
বৈশালী রাগে কাঁপতে কাঁপতে হাত তুলল, কিন্তু জিনিয়া এক চুলও নড়ল না।
"থাপ্পড় মারবি? মার। কিন্তু সত্যিটা তুইও জানিস।"
জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি ধরে রেখেই বলল।
"তুই যা খুশি কর। ওর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে থাক, ওর হাতে আবার মার খা। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস... তুই যদি আজ সিন ক্রিয়েট করিস আর তোর দেবমাল্য যদি হিরো সাজতে মাঝখানে নাক গলায়, তুই কিন্তু ওকে বাঁচাতে পারবি না।"
বৈশালী ইগোতে আঘাত পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,
"দেবমাল্যর মতো প্রভাবশালী ফ্যামিলির ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস অয়নের নেই। দেবমাল্যর বডিগার্ডরা বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।"
জিনিয়া একটা অদ্ভুত, করুণার হাসি হাসল। আই রোল করে সে দেওয়াল থেকে পিঠ সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"বডিগার্ড? দেবমাল্য? তুই কি সত্যিই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার অ্যাক্টিং করছিস?"
জিনিয়া বৈশালীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"অয়ন চ্যাটার্জী তোর বড়লোক বয়ফ্রেন্ডটাকে আইসিইউ-তে পাঠাতে ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক দু-মিনিট সময় নেবে। যতক্ষণে ওর বডিগার্ডরা যখন ভেতরে ঢুকবে, ততক্ষণে তোর দেবমাল্যর দাঁতগুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাবে। তুই যদি আজ ওই কোণায় যাস, তবে পুরো রেসপন্সিবিলিটি তোর। আমি তোকে বাঁচাতে আসব না।"
কথাটা বলে জিনিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। বৈশালীকে ওই অন্ধকার করিডোরে একা দাঁড় করিয়ে রেখে সে আবার মিউজিক আর আলোর ভিড়ে হারিয়ে গেল।
বৈশালী একা দাঁড়িয়ে রইল। ও একবার তাকাল ওই অন্ধকার কোনাটার দিকে আর একবার ফিরে তাকাল ভিআইপি বুথে বসে থাকা দেবমাল্যর দিকে।
ওর শরীরের প্রতিটা রোমকূপ অয়নের স্পর্শের জন্য আর্তনাদ করছে আর ওর ইগো ওকে বলছে প্রতিশোধ নিতে। আগুনের নেশা যে বড় মারাত্মক, সেটা ও বুঝতে পারছে, কিন্তু সেই আগুন থেকে চোখ ফেরানোর ক্ষমতা ওর নেই।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)