12-09-2026, 10:51 AM
মিতুর জগৎ ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল।
সকাল হলেই সে জানালার পাশে বসে থাকে। বাইরের রাস্তা দেখে। কখনো কোনো বাস যায়, কখনো রিকশা। মনে মনে গণনা করে—কত দূর কিষাণগঞ্জ, কত দূর কলকাতা। কিন্তু পা বাড়ানোর সাহস হয় না। গতবার পালানোর চেষ্টায় ধরা পড়ার পর থেকে বাড়ির পেছনের দরজাও প্রায় বন্ধ রাখা হয়। সরস্বতী বলেছেন, “মেয়েটাকে চোখের সামনে রাখতে হবে।”
সুরজ এখন প্রতিদিন আসে। কখনো খালি হাতে, কখনো হাতে একটা কাগজের ব্যাগ। একদিন এনেছিল নতুন জামা। সাদা সালোয়ার-কামিজ। মিতুর সামনে রেখে বলল, “পরো। ভালো লাগবে।”
মিতু স্পর্শও করল না। “আমার দরকার নেই।”
সুরজ বলল, “রাগ করো না। আমি তোমাকে খুশি রাখতে চাই। তুমি কষ্ট পাচ্ছো দেখে আমারও খারাপ লাগে।”
মিতু তার দিকে তাকাল। “তাহলে আমাকে যেতে দিন। আমার পড়াশোনা বাকি। আমার জীবন বাকি।”
সুরজ মাথা নাড়ল। “পারি না। বাবা রাজি নন। গ্রামের লোকজনও জেনে গেছে। এখন তুমি চলে গেলে সবাই বলবে সুরজ মেয়ে পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি। সেই অপমান আমি সইব না।”
মিতু আর উত্তর দিল না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
বিকেলে গ্রামের কয়েকজন মহিলা এসেছিলেন সরস্বতীর সাথে গল্প করতে। কথায় কথায় মিতুর প্রসঙ্গ উঠল। একজন বললেন, “মেয়েটা বেশ সুন্দর। সুরজের সাথে মানানসই হবে। আর পড়াশোনা করেছে বলে সংসারও ভালো চালাবে।”
আরেকজন বললেন, “শহরের মেয়েরা একটু সময় নেয়। অভ্যস্ত হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতু ভেতর থেকে সব শুনছিল। কান লাল হয়ে গিয়েছিল। তার পুরো জীবন যেন অন্যদের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ তার ইচ্ছে আছে কি নেই তা জিজ্ঞেস করে না।
সন্ধ্যায় প্রধানের লোক এসে খবর দিল—মামাদের সাথে আবার কথা হয়েছে। মামারা বলেছেন, “মেয়ে যদি সেখানেই থাকে এবং রাজি হয়, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। আমরা দূরে, সব বুঝতে পারি না।”
মিতু শুনে হায় হায় করে উঠল। মামারাও সরে দাঁড়িয়েছেন। এখন সে সম্পূর্ণ একা।
রাত্রি নেমে এল। বাড়ি শান্ত। মিতু বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, “আমি হার মানব না। কোনোভাবে বেরোব।” কিন্তু উপায় কী? টাকা নেই। পরিচিত কেউ নেই আশেপাশে। ফোনের নেটওয়ার্ক কখনো থাকে কখনো থাকে না। আর বাড়ির সবাই যেন তাকে পাহারা দিচ্ছে।
পরের দিন সকালে সুরজ এল আবার। এবার সাথে তার মাও এসেছেন। বয়স্কা মহিলা। মিতুর দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললেন, “বাছা, ভয় পেয়ো না। আমাদের ঘরে এলে তোমাকে মায়ের মতো যত্ন নেব। পড়াশোনা করতে চাইলে করতে পারবে। কিন্তু সংসারের কাজও শিখতে হবে।”
মিতু চুপ করে রইল। সরস্বতী বললেন, “মেয়েটা একটু জেদি। শহরের পরিবেশে বড়ো হয়েছে। অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।”
সুরজের মা বললেন, “সময় দেব। কিন্তু বিয়ের কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি চাই শীতের আগেই কাজ শেষ হোক।”
মিতুর বুক ভারী হয়ে গেল। শীতের আগে। অর্থাৎ আর কয়েক মাস। তার পুরো ভবিষ্যৎ যেন চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
দুপুরে অনু এসে তার পাশে বসল। পেটের দিকে হাত দিয়ে। “মিতু, একটু খেয়ে নে। শরীর নষ্ট করে ফেলবি।”
মিতু মুখ ঘোরাল। “দিদি, তুমি কেমন করে সহ্য করো এসব? আমি পারছি না।”
অনু চুপ করে রইল। তার চোখে একটা ক্লান্তি। “অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়। অন্য কোনো উপায় থাকে না।”
মিতু সেই কথা শুনে আরও বেশি ভয় পেল। দিদিও তো একদিন তার মতোই ছিল। এখন দিদি অন্য মানুষ। সে কি সেই পথেই যাচ্ছে?
বিকেলের দিকে সুরজ আবার এল। একা। মিতু উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতেই সে কাছে এসে বলল, “চলো একটু হাঁটি। বাড়ির সামনের রাস্তায়। কেউ কিছু বলবে না।”
মিতু যেতে চাইল না। কিন্তু সরস্বতী ইশারা করলেন। বাধ্য হয়ে বেরোল। সুরজ পাশে পাশে হেঁটে বলল, “আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না এখনও। কিন্তু সময় দিলে হয়তো পছন্দ করবে। আমি খারাপ স্বামী হব না। তোমাকে কষ্ট দেব না।”
মিতু থেমে দাঁড়াল। “আপনি যদি সত্যিই আমার কষ্ট না চান, তাহলে আমাকে আমার ইচ্ছায় যেতে দিন। আমি কলেজে ফিরে যেতে চাই। আমার বন্ধুরা আছে, পড়াশোনা আছে।”
সুরজ তার দিকে তাকাল। চোখে একটা শক্ত ভাব। “সেই ইচ্ছা এখানে এসে মরে গেছে। এখন নতুন ইচ্ছা তৈরি করো। আমার সাথে থাকার ইচ্ছা।”
মিতু আর কথা বাড়াল না। ফিরে এল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদল। এবার আর চোখের জল শুকোচ্ছে না। মনে হচ্ছে দেয়ালগুলো সত্যি সত্যি তার দিকে এগিয়ে আসছে।
সন্ধ্যায় প্রধানের কাছ থেকে খবর এল—পরের সপ্তাহে বাড়িতে বৈঠক হবে। বিয়ের তারিখ নিয়ে কথা হবে। মিতুকেও বসতে হবে।
মিতু সেই খবর শুনে দেয়ালে মাথা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। এবার যেন শেষ বিকেল ঘনিয়ে এল। পালানোর আর কোনো ফাঁক নেই। গ্রামের নিয়ম, পরিবারের চাপ, সুরজের জিদ—সব মিলে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
রাত গভীর হলো। মিতু জানালার পাশে বসে রইল। বাইরে অন্ধকার। দূরে কুকুর ডাকছে। সে মনে মনে বলল, “আমি এখনও হার মানিনি। কোনো একদিন বেরোব। কোনোভাবে।” কিন্তু কণ্ঠস্বরটা নিজেই বিশ্বাস করছে না।
এই বাড়িতে আটকে থাকা মেয়েটার স্বপ্নগুলো এখন ধীরে ধীরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আর কেউ তা আটকানোর জন্য এগিয়ে আসছে না।
মিতুর জন্য শেষ দিনগুলো ঘনিয়ে এল।
পরের সপ্তাহে বৈঠকের কথা ছিল। সেই দিন সকাল থেকেই বাড়িতে চাপচাপ ভাব। সরস্বতী উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন। হরিপদ গামছা কাঁধে নিয়ে বারান্দায় বসলেন। মিতুকে বলা হলো পরিষ্কার শাড়ি পরতে। অনু নিজে এসে একটা সাদা শাড়ি এগিয়ে দিল। মিতু পরতে চাইল না। কিন্তু সরস্বতীর চাপে পরতে বাধ্য হলো। চুল আলতো করে বেঁধে দিল অনু। সিঁদুর দেয়নি কেউ। এখনও বিয়ে হয়নি।
দুপুরের পর লোকজন আসতে শুরু করল। পঞ্চায়েত প্রধান নিজে। সাথে সুরজ, সুরজের মা, আর গ্রামের কয়েকজন বয়স্ক লোক। সবাই বারান্দায় বসল। মিতুকেও ডাকা হলো। সে কোণে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ নামিয়ে।
প্রধান সোজাসুজি বললেন, “আর দেরি নয়। মেয়েটা এখানেই আছে। মামারাও আপত্তি করেননি। এবার তারিখ ঠিক করে ফেলি।”
হরিপদ মাথা নাড়লেন। “আপনি যা বলবেন।”
সুরজের মা বললেন, “আগামী মাসের শেষের দিকে হলে ভালো হয়। শীত পড়বে। ভালো সময়।”
প্রধান হিসেব করে বললেন, “তাহলে আর তিন সপ্তাহ পর। শুক্রবার। ছোটখাটো করেই হবে। গ্রামের মন্দিরে। তারপর সংসার।”
মিতু যেন শুনল না। হঠাৎ গলা খুলল। “আমি রাজি নই। আমি বিয়ে করব না। আমাকে যেতে দিন।”
সবাই চুপ করে তাকাল। প্রধানের মুখ কালো হয়ে গেল। “মেয়ে, তোমার রাজি-অরাজির সময় পার হয়ে গেছে। কথা উঠে গেছে গ্রামে। এখন আর পিছু হটার উপায় নেই। তুমি বিয়ে করবে। সুরজের সাথে।”
মিতু কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি পড়াশোনা করতে চাই। চাকরি করতে চাই। আমি এখানে থাকব না।”
সুরজ উঠে দাঁড়াল। গলা শক্ত করে বলল, “তুমি থাকবে। বিয়ে হবে। পড়াশোনা পরে করা যাবে। এখন আর না।”
সরস্বতী মিতুর হাত ধরে বললেন, “বাছা, এখন চুপ করো। লোকজনের সামনে এসব কথা ভালো লাগে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতু হাত ছাড়িয়ে নিল। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। “কেউ আমার কথা শুনছে না। কেউ আমার ইচ্ছে বুঝছে না।”
প্রধান উঠে দাঁড়ালেন। “ইচ্ছে অনেকেরই থাকে। কিন্তু সংসার অন্য জিনিস। তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। আর তিন সপ্তাহ। ততদিন তুমি এখানেই থাকবে। সুরজ রোজ আসবে। অভ্যস্ত হয়ে যাবে।”
লোকজন উঠে পড়ল। কেউ আর মিতুর দিকে তাকাল না। যেন তার প্রতিবাদ শোনাই হয়নি। সুরজ যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাল। মিতুর চোখের জল দেখেও কিছু বলল না। চলে গেল।
বৈঠক ভাঙল। বাড়িতে নীরবতা। মিতু ঘরে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদল। এবার আর আগের মতো চোখের জল নয়। গভীর, নিঃশব্দ কান্না। তার পুরো ভবিষ্যৎ তিন সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কলেজ, বন্ধু, স্বপ্ন—সব দূরে সরে যাচ্ছে।
অনু এসে পাশে বসল। পেটের ওপর হাত। কিছু বলতে পারল না। শুধু মিতুর চুল চাপড়ে দিল। মিতু হঠাৎ উঠে বসল। চোখ লাল। “দিদি, তুমি কেমন করে মেনে নিয়েছো এসব? আমি পারব না। আমি মরে যাব তবু বিয়ে করব না।”
অনু আস্তে বলল, “মরলেও কিছুই বদলাবে না। এখানে এলে মেনে নিতে হয়। আমিও একদিন মেনে নিয়েছি।”
মিতু তার দিকে তাকাল। দিদির চোখে আর কোনো আগুন নেই। শুধু ক্লান্তি। সে ভয় পেল। এই কি তারও ভবিষ্যৎ?
পরের দিন থেকে বাড়িতে বিয়ের আমেজ শুরু হয়ে গেল। সরস্বতী মিতুর জন্য কয়েকটা শাড়ি দেখতে লাগলেন। সুরজের মা এসে মাপ নিলেন। মিতু দাঁড়িয়ে থাকল পাথরের মতো। কেউ তার মুখের দিকে তাকাল না।
সুরজ এখন দুবার করে আসে। সকালে একবার, বিকেলে একবার। মিতুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। মিতু জবাব দেয় না। সুরজ বলে, “রাগ করো না। সময় পেলে তুমিও বদলে যাবে। আমি ভালো রাখব তোমাকে।”
মিতু একদিন হঠাৎ বলে উঠল, “আপনি আমাকে ভালো রাখবেন না। আপনি আমাকে আটকে রাখছেন। এটা ভালোবাসা নয়।”
সুরজ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “যাই বলো, বিয়ে হবে। আর তিন সপ্তাহ। তুমি তৈরি হও।”
মিতু রাতে আর ঘুোতে পারে না। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে পালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। কিন্তু সব পথ বন্ধ। গ্রামের লোকজন জানে। বাড়ির লোকজন পাহারা দেয়। মামারা সরে দাঁড়িয়েছেন। দিদি অসহায়।
এক সন্ধ্যায় সুরজ এসে মিতুর হাতে একটা ছোট বাক্স দিল। খুলে দেখল একজোড়া রুপোর চুড়ি। “পরো। বিয়ের আগে থেকেই অভ্যস্ত হও।”
মিতু বাক্সটা রেখে দিল। “পরব না।”
সুরজ তার হাত ধরল। জোরে নয়, কিন্তু ছাড়ল না। “পরতে হবে। এখানে এসে তোমার পুরনো ইচ্ছেগুলো ফেলে দিতে হবে। নতুন করে শুরু করতে হবে।”
মিতু হাত ছাড়িয়ে নিল। ঘরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করে দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে বসে রইল। তিন সপ্তাহ। মাত্র তিন সপ্তাহ। তার পর আর পিছনে ফিরে তাকানোর উপায় থাকবে না।
বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। গ্রামের নিয়ম জয়ী হয়েছে। মিতুর প্রতিবাদ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। আর সে নিজেও বুঝতে পারছে—এখান থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই আর।
সকাল হলেই সে জানালার পাশে বসে থাকে। বাইরের রাস্তা দেখে। কখনো কোনো বাস যায়, কখনো রিকশা। মনে মনে গণনা করে—কত দূর কিষাণগঞ্জ, কত দূর কলকাতা। কিন্তু পা বাড়ানোর সাহস হয় না। গতবার পালানোর চেষ্টায় ধরা পড়ার পর থেকে বাড়ির পেছনের দরজাও প্রায় বন্ধ রাখা হয়। সরস্বতী বলেছেন, “মেয়েটাকে চোখের সামনে রাখতে হবে।”
সুরজ এখন প্রতিদিন আসে। কখনো খালি হাতে, কখনো হাতে একটা কাগজের ব্যাগ। একদিন এনেছিল নতুন জামা। সাদা সালোয়ার-কামিজ। মিতুর সামনে রেখে বলল, “পরো। ভালো লাগবে।”
মিতু স্পর্শও করল না। “আমার দরকার নেই।”
সুরজ বলল, “রাগ করো না। আমি তোমাকে খুশি রাখতে চাই। তুমি কষ্ট পাচ্ছো দেখে আমারও খারাপ লাগে।”
মিতু তার দিকে তাকাল। “তাহলে আমাকে যেতে দিন। আমার পড়াশোনা বাকি। আমার জীবন বাকি।”
সুরজ মাথা নাড়ল। “পারি না। বাবা রাজি নন। গ্রামের লোকজনও জেনে গেছে। এখন তুমি চলে গেলে সবাই বলবে সুরজ মেয়ে পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি। সেই অপমান আমি সইব না।”
মিতু আর উত্তর দিল না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
বিকেলে গ্রামের কয়েকজন মহিলা এসেছিলেন সরস্বতীর সাথে গল্প করতে। কথায় কথায় মিতুর প্রসঙ্গ উঠল। একজন বললেন, “মেয়েটা বেশ সুন্দর। সুরজের সাথে মানানসই হবে। আর পড়াশোনা করেছে বলে সংসারও ভালো চালাবে।”
আরেকজন বললেন, “শহরের মেয়েরা একটু সময় নেয়। অভ্যস্ত হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতু ভেতর থেকে সব শুনছিল। কান লাল হয়ে গিয়েছিল। তার পুরো জীবন যেন অন্যদের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ তার ইচ্ছে আছে কি নেই তা জিজ্ঞেস করে না।
সন্ধ্যায় প্রধানের লোক এসে খবর দিল—মামাদের সাথে আবার কথা হয়েছে। মামারা বলেছেন, “মেয়ে যদি সেখানেই থাকে এবং রাজি হয়, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। আমরা দূরে, সব বুঝতে পারি না।”
মিতু শুনে হায় হায় করে উঠল। মামারাও সরে দাঁড়িয়েছেন। এখন সে সম্পূর্ণ একা।
রাত্রি নেমে এল। বাড়ি শান্ত। মিতু বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, “আমি হার মানব না। কোনোভাবে বেরোব।” কিন্তু উপায় কী? টাকা নেই। পরিচিত কেউ নেই আশেপাশে। ফোনের নেটওয়ার্ক কখনো থাকে কখনো থাকে না। আর বাড়ির সবাই যেন তাকে পাহারা দিচ্ছে।
পরের দিন সকালে সুরজ এল আবার। এবার সাথে তার মাও এসেছেন। বয়স্কা মহিলা। মিতুর দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললেন, “বাছা, ভয় পেয়ো না। আমাদের ঘরে এলে তোমাকে মায়ের মতো যত্ন নেব। পড়াশোনা করতে চাইলে করতে পারবে। কিন্তু সংসারের কাজও শিখতে হবে।”
মিতু চুপ করে রইল। সরস্বতী বললেন, “মেয়েটা একটু জেদি। শহরের পরিবেশে বড়ো হয়েছে। অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।”
সুরজের মা বললেন, “সময় দেব। কিন্তু বিয়ের কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি চাই শীতের আগেই কাজ শেষ হোক।”
মিতুর বুক ভারী হয়ে গেল। শীতের আগে। অর্থাৎ আর কয়েক মাস। তার পুরো ভবিষ্যৎ যেন চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
দুপুরে অনু এসে তার পাশে বসল। পেটের দিকে হাত দিয়ে। “মিতু, একটু খেয়ে নে। শরীর নষ্ট করে ফেলবি।”
মিতু মুখ ঘোরাল। “দিদি, তুমি কেমন করে সহ্য করো এসব? আমি পারছি না।”
অনু চুপ করে রইল। তার চোখে একটা ক্লান্তি। “অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়। অন্য কোনো উপায় থাকে না।”
মিতু সেই কথা শুনে আরও বেশি ভয় পেল। দিদিও তো একদিন তার মতোই ছিল। এখন দিদি অন্য মানুষ। সে কি সেই পথেই যাচ্ছে?
বিকেলের দিকে সুরজ আবার এল। একা। মিতু উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতেই সে কাছে এসে বলল, “চলো একটু হাঁটি। বাড়ির সামনের রাস্তায়। কেউ কিছু বলবে না।”
মিতু যেতে চাইল না। কিন্তু সরস্বতী ইশারা করলেন। বাধ্য হয়ে বেরোল। সুরজ পাশে পাশে হেঁটে বলল, “আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না এখনও। কিন্তু সময় দিলে হয়তো পছন্দ করবে। আমি খারাপ স্বামী হব না। তোমাকে কষ্ট দেব না।”
মিতু থেমে দাঁড়াল। “আপনি যদি সত্যিই আমার কষ্ট না চান, তাহলে আমাকে আমার ইচ্ছায় যেতে দিন। আমি কলেজে ফিরে যেতে চাই। আমার বন্ধুরা আছে, পড়াশোনা আছে।”
সুরজ তার দিকে তাকাল। চোখে একটা শক্ত ভাব। “সেই ইচ্ছা এখানে এসে মরে গেছে। এখন নতুন ইচ্ছা তৈরি করো। আমার সাথে থাকার ইচ্ছা।”
মিতু আর কথা বাড়াল না। ফিরে এল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদল। এবার আর চোখের জল শুকোচ্ছে না। মনে হচ্ছে দেয়ালগুলো সত্যি সত্যি তার দিকে এগিয়ে আসছে।
সন্ধ্যায় প্রধানের কাছ থেকে খবর এল—পরের সপ্তাহে বাড়িতে বৈঠক হবে। বিয়ের তারিখ নিয়ে কথা হবে। মিতুকেও বসতে হবে।
মিতু সেই খবর শুনে দেয়ালে মাথা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। এবার যেন শেষ বিকেল ঘনিয়ে এল। পালানোর আর কোনো ফাঁক নেই। গ্রামের নিয়ম, পরিবারের চাপ, সুরজের জিদ—সব মিলে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
রাত গভীর হলো। মিতু জানালার পাশে বসে রইল। বাইরে অন্ধকার। দূরে কুকুর ডাকছে। সে মনে মনে বলল, “আমি এখনও হার মানিনি। কোনো একদিন বেরোব। কোনোভাবে।” কিন্তু কণ্ঠস্বরটা নিজেই বিশ্বাস করছে না।
এই বাড়িতে আটকে থাকা মেয়েটার স্বপ্নগুলো এখন ধীরে ধীরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আর কেউ তা আটকানোর জন্য এগিয়ে আসছে না।
মিতুর জন্য শেষ দিনগুলো ঘনিয়ে এল।
পরের সপ্তাহে বৈঠকের কথা ছিল। সেই দিন সকাল থেকেই বাড়িতে চাপচাপ ভাব। সরস্বতী উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন। হরিপদ গামছা কাঁধে নিয়ে বারান্দায় বসলেন। মিতুকে বলা হলো পরিষ্কার শাড়ি পরতে। অনু নিজে এসে একটা সাদা শাড়ি এগিয়ে দিল। মিতু পরতে চাইল না। কিন্তু সরস্বতীর চাপে পরতে বাধ্য হলো। চুল আলতো করে বেঁধে দিল অনু। সিঁদুর দেয়নি কেউ। এখনও বিয়ে হয়নি।
দুপুরের পর লোকজন আসতে শুরু করল। পঞ্চায়েত প্রধান নিজে। সাথে সুরজ, সুরজের মা, আর গ্রামের কয়েকজন বয়স্ক লোক। সবাই বারান্দায় বসল। মিতুকেও ডাকা হলো। সে কোণে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ নামিয়ে।
প্রধান সোজাসুজি বললেন, “আর দেরি নয়। মেয়েটা এখানেই আছে। মামারাও আপত্তি করেননি। এবার তারিখ ঠিক করে ফেলি।”
হরিপদ মাথা নাড়লেন। “আপনি যা বলবেন।”
সুরজের মা বললেন, “আগামী মাসের শেষের দিকে হলে ভালো হয়। শীত পড়বে। ভালো সময়।”
প্রধান হিসেব করে বললেন, “তাহলে আর তিন সপ্তাহ পর। শুক্রবার। ছোটখাটো করেই হবে। গ্রামের মন্দিরে। তারপর সংসার।”
মিতু যেন শুনল না। হঠাৎ গলা খুলল। “আমি রাজি নই। আমি বিয়ে করব না। আমাকে যেতে দিন।”
সবাই চুপ করে তাকাল। প্রধানের মুখ কালো হয়ে গেল। “মেয়ে, তোমার রাজি-অরাজির সময় পার হয়ে গেছে। কথা উঠে গেছে গ্রামে। এখন আর পিছু হটার উপায় নেই। তুমি বিয়ে করবে। সুরজের সাথে।”
মিতু কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি পড়াশোনা করতে চাই। চাকরি করতে চাই। আমি এখানে থাকব না।”
সুরজ উঠে দাঁড়াল। গলা শক্ত করে বলল, “তুমি থাকবে। বিয়ে হবে। পড়াশোনা পরে করা যাবে। এখন আর না।”
সরস্বতী মিতুর হাত ধরে বললেন, “বাছা, এখন চুপ করো। লোকজনের সামনে এসব কথা ভালো লাগে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতু হাত ছাড়িয়ে নিল। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। “কেউ আমার কথা শুনছে না। কেউ আমার ইচ্ছে বুঝছে না।”
প্রধান উঠে দাঁড়ালেন। “ইচ্ছে অনেকেরই থাকে। কিন্তু সংসার অন্য জিনিস। তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। আর তিন সপ্তাহ। ততদিন তুমি এখানেই থাকবে। সুরজ রোজ আসবে। অভ্যস্ত হয়ে যাবে।”
লোকজন উঠে পড়ল। কেউ আর মিতুর দিকে তাকাল না। যেন তার প্রতিবাদ শোনাই হয়নি। সুরজ যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাল। মিতুর চোখের জল দেখেও কিছু বলল না। চলে গেল।
বৈঠক ভাঙল। বাড়িতে নীরবতা। মিতু ঘরে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদল। এবার আর আগের মতো চোখের জল নয়। গভীর, নিঃশব্দ কান্না। তার পুরো ভবিষ্যৎ তিন সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কলেজ, বন্ধু, স্বপ্ন—সব দূরে সরে যাচ্ছে।
অনু এসে পাশে বসল। পেটের ওপর হাত। কিছু বলতে পারল না। শুধু মিতুর চুল চাপড়ে দিল। মিতু হঠাৎ উঠে বসল। চোখ লাল। “দিদি, তুমি কেমন করে মেনে নিয়েছো এসব? আমি পারব না। আমি মরে যাব তবু বিয়ে করব না।”
অনু আস্তে বলল, “মরলেও কিছুই বদলাবে না। এখানে এলে মেনে নিতে হয়। আমিও একদিন মেনে নিয়েছি।”
মিতু তার দিকে তাকাল। দিদির চোখে আর কোনো আগুন নেই। শুধু ক্লান্তি। সে ভয় পেল। এই কি তারও ভবিষ্যৎ?
পরের দিন থেকে বাড়িতে বিয়ের আমেজ শুরু হয়ে গেল। সরস্বতী মিতুর জন্য কয়েকটা শাড়ি দেখতে লাগলেন। সুরজের মা এসে মাপ নিলেন। মিতু দাঁড়িয়ে থাকল পাথরের মতো। কেউ তার মুখের দিকে তাকাল না।
সুরজ এখন দুবার করে আসে। সকালে একবার, বিকেলে একবার। মিতুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। মিতু জবাব দেয় না। সুরজ বলে, “রাগ করো না। সময় পেলে তুমিও বদলে যাবে। আমি ভালো রাখব তোমাকে।”
মিতু একদিন হঠাৎ বলে উঠল, “আপনি আমাকে ভালো রাখবেন না। আপনি আমাকে আটকে রাখছেন। এটা ভালোবাসা নয়।”
সুরজ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “যাই বলো, বিয়ে হবে। আর তিন সপ্তাহ। তুমি তৈরি হও।”
মিতু রাতে আর ঘুোতে পারে না। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে পালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। কিন্তু সব পথ বন্ধ। গ্রামের লোকজন জানে। বাড়ির লোকজন পাহারা দেয়। মামারা সরে দাঁড়িয়েছেন। দিদি অসহায়।
এক সন্ধ্যায় সুরজ এসে মিতুর হাতে একটা ছোট বাক্স দিল। খুলে দেখল একজোড়া রুপোর চুড়ি। “পরো। বিয়ের আগে থেকেই অভ্যস্ত হও।”
মিতু বাক্সটা রেখে দিল। “পরব না।”
সুরজ তার হাত ধরল। জোরে নয়, কিন্তু ছাড়ল না। “পরতে হবে। এখানে এসে তোমার পুরনো ইচ্ছেগুলো ফেলে দিতে হবে। নতুন করে শুরু করতে হবে।”
মিতু হাত ছাড়িয়ে নিল। ঘরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করে দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে বসে রইল। তিন সপ্তাহ। মাত্র তিন সপ্তাহ। তার পর আর পিছনে ফিরে তাকানোর উপায় থাকবে না।
বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। গ্রামের নিয়ম জয়ী হয়েছে। মিতুর প্রতিবাদ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। আর সে নিজেও বুঝতে পারছে—এখান থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই আর।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)