Thread Rating:
  • 32 Vote(s) - 2.25 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance কিছু সম্পর্ক
কিছু সম্পর্ক ঃ ৯ (ছ) এর শেষ অংশ


রাজীব রহিমের দিকে এগিয়ে যেতেই রহিম বলল, “রিলিজ হয়ে গেছে।”
বলার ভঙ্গিতে একটা স্বস্তি আছে। যেন এতক্ষণ ওকে হসপিটালে আটকে রাখা হয়েছিল, আর এখন অবশেষে ছাড়া পেয়েছে। গলার স্বর এখনো দুর্বল, কিন্তু কথার ভেতর পুরনো রহিমের হালকা হাসি ফিরে এসেছে।
“হুম, কিন্তু কোচিং নিয়ে কী বলেছে সেটা তো বললা না আব্বু।” রানী সাথে সাথেই রহিমের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল। তারপর নিজেই যোগ করলো, “ডাক্তার বলেছে আগামী পনেরো দিন কোনো ক্লাস নয়। তারপরও ক্লাস কমাতে হবে।”
রহিম হাতে থাকা কমলার রসের গ্লাসে চুমুক দিলো। একটু খেয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আচ্ছা বুঝেছি রে মা। এইবার একটু শান্তি দে। এই কথা এইবার নিয়ে কতবার বললি?”
“একশ বার বলবে। তুই চুপ কর।” পাশ থেকে জয়নাল রানীকে সাপোর্ট দিলো।
জয়নালের গলার জোর এমন, যেন ডাক্তার, নার্স, হসপিটালকেও হার মানায়। রহিম অসুস্থ, তাই এখন রহিমের নিজের কথারও খুব বেশি দাম নেই জয়নালের কাছে। বন্ধুর উপর এমন নির্দয় অধিকারই জয়নালের ভালোবাসার ভাষা।
রাজীব দৃশ্যটা দেখে সামান্য হাসলো।
“ঠিক আছে, আমি বিল দিয়ে আসি।”
“তার আর দরকার নেই।” জয়নাল হাতে থাকা বিলের ফাইলটা সামান্য তুলে দেখালো। “বিল হয়ে গেছে।”
তারপর ফাইলটা রাজীবের দিকে বাড়িয়ে দিলো। “যা, নার্সদের কাছ থেকে ফাইল বুঝে নিয়ে আয়। আমরা বের হই।”
রাজীব ফাইলটা নিলো। নেওয়ার ফাঁকেই একবার রহিমের দিকে তাকালো।
রহিম কিছু বললো না। শুধু চোখে একবার ইশারা করলো। খুব ছোট ইশারা। অন্য কারো চোখে হয়তো পড়ার কথাও নয়। কিন্তু রাজীব বুঝে গেলো।
এখানে আর কোনো কথা নেই।
জয়নাল কেন বিল দিল, এই প্রশ্ন রাজীব করতেও যেতো না। সে অধিকার বা সাহস, কোনোটাই নিজেকে দেয় না। তবুও একবার রহিমের কাছ থেকে আশ্বস্ত হয়ে নিলো। কারণ জয়নালের সঙ্গে সম্পর্ক একরকম, আর রহিমের নীরব সম্মতি আরেকরকম। দুটো আলাদা সুতোয় বাঁধা, কিন্তু একই গিঁটে এসে মিশে যায়।
“ঠিক আছে।” রাজীব ফাইলটা হাতে নিয়ে বললো, “আমি অ্যাম্বুলেন্স করছি।”
“আরে না, অ্যাম্বুলেন্স লাগবে না।” রহিম সাথে সাথে বাধা দিলো। “এমনি গাড়ি কর। আমি কি শুয়ে শুয়ে যাবো নাকি?”
কথাটা পুরোপুরি রহিম-সুলভ। তাই রাজীব আর কোনো তর্ক করলো না। ও জানে, ওর বাবা কিছুতেই অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে সাইরেন বাজিয়ে এলাকায় ঢুকবে না। পারলে হেঁটে যাবে, যেন কিছুই হয়নি।
“আচ্ছা ঠিক আছে, তবে আমি হুইলচেয়ার নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাই না।” রাজীব সচরাচর বাবার সাথে এমন সরাসরি অথরিটি নিয়ে কথা বলে না। আজকে কথাটা ওর নিজের কাছেই নতুন কিছু মনে হলো।
রহিম মুখ বাঁকালো। “এইটা আবার নতুন ঝামেলা দেখি, তুইও যোগ হলি।”
রানী সাথে সাথে বললো, “ঝামেলা না। নিয়ম।”
জয় পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বললো, “ছোট আব্বু, আজকে সংসদে বিরোধী দল একাই। সবাই সরকার পক্ষ।”
রহিম এবার সত্যি হেসে ফেললো। হাসিটা খুব জোরালো নয়, তবু ঘরের ভেতরের হাওয়া আরও কিছুটা হালকা হলো।
জয়নাল দ্বিতীয় বেড থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, “সরকার পক্ষ না, জরুরি অবস্থা জারি হইছে। তুই চুপচাপ হুইলচেয়ারে বসবি। আমার গাড়ি নিচেই আছে। ধীরে সুস্থে নিয়ে যাবো। লোকজন ভাববে প্রধানমন্ত্রী হসপিটাল থেকে রিলিজ পাইছে।”
পাশ থেকে আয়শা বলল, “তুমি সব সময়েই অতিরিক্ত কর।”
“হুম করি। কোনো সমস্যা আছে কারো?” প্রশ্নটা করে জয়নাল সবার দিকে তাকালো, যেন চ্যালেঞ্জ করছে, কারো কিছু বলার আছে কিনা।
কেউ কোনো উত্তর দিলো না সেই চ্যালেঞ্জের। শুধু আয়শা ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলেন, আর রহিম কমলার রসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুখ লুকিয়ে হাসলো।
রাজীব ফাইলটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো। যাওয়ার আগে একবার রানীর দিকে তাকালো। খুব অল্প সময়ের জন্য।
“আমি ফাইল নিয়ে আসি। ওষুধের নিয়মকানুনও বুঝে আসছি।”
কথাটা বলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজীবের চোখ একবার জান্নাতের দিকে গেল। ততক্ষণে জান্নাত আর রাজীবের দিকে তাকিয়ে নেই। সে নিজের মোবাইলে কিছু একটা স্ক্রল করছে।
তারপর দরজা খুলে রাজীব বেরিয়ে গেলো।
আয়শা শেষবারের মতো দেখে নিলেন সব ঠিক আছে কিনা। জয়নাল জয়কে বললো ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে রাখতে।
জয় বিড়বিড় করতে করতে ব্যাগ নিলো, “শালা শেষ পর্যন্ত ব্যাগ আমার কাঁধে।”
 
*****


ব্যাগপত্র যা ছিল, সব গাড়ির ডিকিতে তোলা হয়েছে।
রাজীব হুইলচেয়ার ঠেলে রহিমকে নিয়ে আসছে গাড়ির সামনে। পাশেই রানী হাঁটছে। রহিমের বারবার আপত্তি সামলাচ্ছে সে। রানী না থাকলে মনে হয় রহিমকে এতক্ষণ হুইলচেয়ারে বসিয়ে রাখা যেত না।
রহিম যতবার বলছে, “আমি হেঁটে যেতে পারবো,” রানী ততবারই হুমকি দিচ্ছে, “এক পা নামালে কিন্তু আমি আব্বু বলে ডাকবো না।”
রহিম প্রতিবারই মুখ বাঁকাচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুপচাপ বসে থাকছে।
জয় গাড়ির সামনেই ছিল। নিজের মোবাইল বের করে ছবি তুলে বলল, “এটা বাঁধাই হবে। ছোট আব্বু অন হুইলস।”
জান্নাত ওর পাশেই ছিল। সাথে সাথে ওর বাহুতে একটা চাপড় মেরে বলল, “তোর জোক দিন দিন গার্বেজ হচ্ছে, সেটা কি জানিস?”
এদিকে রাজীব আর রানী, দুজনের মুখ থেকেই প্রায় কিছু একটা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সাথে সাথে দুজনেই সেটা থামিয়ে দিলো।
রানী চোখ পাকিয়ে জয়কে শাসাতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর আড়চোখে একবার রাজীবের দিকে তাকালো।
আর রাজীব নিজের কথাটা গলার ভেতরেই আটকে ফেললো। কয়েক মাস আগেও হলে সে নির্দ্বিধায় বলে দিতো। জয়কে এমন ফালতু জোকের জন্য এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিতো। কিন্তু এখন কথাটা মুখ পর্যন্ত এসে আর বের হলো না।
তবে রানীর মতো রাজীবের চোখে-মুখে সেটা ফুটে উঠলো না। বাইরে থেকে ওকে একই রকম শান্ত দেখাচ্ছিল। শুধু হুইলচেয়ারের হাতলে ওর আঙুলের চাপটা সামান্য শক্ত হয়ে গেল।
 
রহিম রাজীবের কাঁধে ভর করে গাড়িতে উঠে গেলো।
জয় ড্রাইভিং সিটে। জয়নাল তার পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে। পেছনে রহিমের এক পাশে আয়শা, অন্য পাশে রানী।
রানী বসার পর ওর ওড়নার এক কোণা দরজার বাইরে বেরিয়ে ছিল। রাজীব সেটা দেখে নিচু হয়ে তুলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। তারপর দরজা লাগিয়ে বলল, “আমি আসছি বাইকে।”
গাড়ি স্টার্ট হলো।
জয়নাল শেষবারের মতো জয়কে বলে দিলো, গাড়ি যেন দেখে চালায়।
পেছন থেকে রহিম বলল, “আমার শরীর কাঁচের না যে ভেঙে যাবে। জয়, তুই ঠিকমতো চালা তো।”
কিন্তু জয়নালের মুখ দেখেই জয় বুঝে গেলো, আসলে কীভাবে চালাতে হবে। তবু পেছনে ঘুরে রহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি চিন্তা করো না ছোট আব্বু, আমি উড়াইয়া নিয়া যাবো।”
কথাটা বলার ফাঁকে একবার রানীর দিকেও তাকিয়ে নিলো। দুজনের চোখ মিললো সবার অলক্ষ্যে।
তবে রানীর চোখে হাসি ছিল না, শাসন ছিল। যেন বলছে, দাঁড়াও, তোমাকে পেয়ে নেই। অন হুইলস বুঝাবো।
 
গাড়ি রাজীবের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেলো।
রাজীব দাঁড়িয়ে একটা ছোট শ্বাস ফেললো। দীর্ঘশ্বাস নয়। যেন একটা কাজ শেষ হয়েছে, তাই শরীরের ভেতর আটকে থাকা শ্বাসটা নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো।
তারপরই খেয়াল করলো, জান্নাতও পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজীব এতক্ষণ এটা ভাবেনি। নার্স স্টেশনে যাওয়ার আগে একবার চোখ পড়েছিল, তারপর আর জান্নাতের অবস্থান ওর খেয়াল ছিল না। ও ভেবেছিল, একাই বাইকে যাবে। হঠাৎ দেখে একটু অবাকই হলো।
“তুই আছিস? গাড়িতে যাস নাই?”
জান্নাতের ঠোঁট দুটো একটু শক্ত হলো রাজীবের কথা শুনে। অবশ্য সাথে সাথেই সেটা আবার চলে গেল। তার বদলে একবার আই রোল করে বলল, “আমি যে কবে থেকে অদৃশ্য হওয়ার পাওয়ার পেলাম, সেটাই তো জানতে পারলাম না।”
কথাটা মজা করে বলা হলেও এর অর্থ রাজীব বুঝতে পারলো। মজার আড়ালে ছোট একটা খোঁচা আছে। তবে এই কথার বিপরীতে বলার মতো কিছু ওর কাছে এখন নেই।
তাই বলল, “তোর অদৃশ্য হওয়ার না, অন্য সুপার পাওয়ার আছে। এখন চল যাই, আগে যেতে পারলে ভালো হবে।”
এই বলে রাজীব বাইকের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
জান্নাত ফলো করলো না। উল্টো রাজীবকে থামিয়ে দিলো।
“এই, দাঁড়া। দুপুরে কিছু খেয়েছিস তুই?”
না, রাজীব দুপুরে কিছু খায়নি। সকালে হসপিটাল থেকে নাস্তা করে গিয়ে গোসল করে যে ঘুম দিয়েছিল, সেটা ভাঙতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। উঠেই সরাসরি হসপিটাল চলে এসেছে। খাওয়ার কথা মাথায় আসেনি। হসপিটালে এসেও সময় হয়ে ওঠেনি। রিলিজ, নার্স স্টেশন, বাবাকে গাড়িতে তোলা, এইসবেই সময় পেরিয়ে গেছে।
জান্নাত কথাটা তুলতেই ওর নিজের খাবারের প্রয়োজন মনে এলো।
“বাসায় গিয়ে খেয়ে নেবো। এখন সময় নাই।”
“তোরে কি আমি ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছি?” জান্নাত রাস্তার পাশের ফুড ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই দেখ, স্যান্ডউইচ বিক্রি করতেছে। ওইখান থেকে দুইটা খেয়ে নে।”
কথাটা বলে জান্নাত রাজীবের বাহু ধরে প্রায় টেনেই নিয়ে যেতে চাইলো।
রাজীবের মনে গতকালের কথা ভেসে উঠলো। রাজীব খাচ্ছে, আর জান্নাত তাকিয়ে দেখছে। ওই তাকানো নিজের উপর আরেকবার অনুভব করতে রাজীবের খারাপ লাগবে না। কিন্তু কিছু একটা ওকে বাধাও দিচ্ছে।
তাই বলল, “আরে সময় নেই। এখন চল, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। গিয়ে খেয়ে নেবো।”
জান্নাত এবার থেমে গেল। কোমরে দুই হাত রেখে রাগী স্বরে জিজ্ঞাসা করলো, “ক্যান? তুই কি ব্রিটিশ?”
“মানে?”
“মানে দুইটা স্যান্ডউইচ খেতে তোর দুই ঘণ্টা লাগবে? প্রথমে চোয়ালের এক পাশে নিয়ে ষোলো বার, তারপর অন্য পাশে নিয়ে ষোলো বার চাবানোর পর গিলবি?”
জান্নাতের এই কথা শোনার পর রাজীব আর কিছু বলতে পারলো না। হেসেই ফেললো।
গতকালের পর থেকে এই প্রথম মন খুলে হাসা।
তারপর জান্নাতের পেছনে পেছনে সেই ফুড ভ্যানের সামনে গিয়ে দুটো স্যান্ডউইচ খেলো। স্বাদ যাচ্ছেতাই। কিন্তু সঙ্গটা এই যাচ্ছেতাই স্যান্ডউইচকেও অন্য অর্থ দিচ্ছে।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 3 users Like gungchill's post
Like Reply


Messages In This Thread
কিছু সম্পর্ক - by gungchill - 29-07-2025, 04:17 PM
RE: কিছু সম্পর্ক - by gungchill - 01-09-2026, 09:34 PM
RE: কিছু সম্পর্ক - by KK001 - 03-09-2026, 06:40 PM



Users browsing this thread: