Thread Rating:
  • 15 Vote(s) - 2.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা
#21
অধ্যায় ৩: নিষিদ্ধ ডিজিটাল দেওয়াল ও ইতালিয়ান দুপুর
এক
পার্টির সেই অবিস্মরণীয় রাতের পর গড়িয়ে গেছে দুটি দিন ও দুটো দীর্ঘ নিঝুম রাত। কিন্তু মৌসুমীর মনের ভেতর থেকে সেই চার সেকেন্ডের অদ্ভুত বিদ্যুৎচমকের দাহ্য রেশ বিন্দুমাত্র মেলেনি। বরং তা আরও গভীরভাবে তাঁর মনোজগতে শিকড় গেড়ে বসেছে।
গুলশানের এই সুবিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ির সুউচ্চ সিলিংওয়ালা মাস্টার বেডরুমে তিনি এখন একদম একা। স্বামী ওমর সানি রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার কাজে ঢাকার বাইরে, ফিরতে আরও দিন দুয়েক দেরি হবে। ছেলে-মেয়ে নিজেদের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর বন্ধু-বান্ধবদের নিজস্ব ভুবনে ব্যস্ত। বাড়িতে সার্বক্ষণিক কাজের লোকের অভাব নেই, কিন্তু এত বড় বাড়িতে মৌসুমীর মনে হচ্ছিল এক অসীম, হাঁ-করা শূন্যতা তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।

বিকেলের হালকা রোদ যখন গুলশানের মেহগনি গাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে বারান্দায় এসে পড়েছে, তখন মৌসুমী এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি হাতে নিয়ে বারান্দার রকিং চেয়ারে এসে বসেছিলেন। হাতে তাঁর আইফোন। স্ক্রিনের আলো জ্বলছে আর নিভছে। তিনি মনের অজান্তেই হোয়াটসঅ্যাপের বিশাল কন্টাক্ট লিস্ট বারবার উপর-নিচে স্ক্রল করছেন। আর তাঁর ডান হাতের তর্জনীটা বারবার গিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে একটা নির্দিষ্ট নামের ওপর—‘Ihan (Actor)’!

নামটা সেভ করার সময় ব্র্যাকেটে তিনি নিজেই ‘Actor’ শব্দটি লিখেছিলেন, যাতে সহকর্মীদের বিশাল ভিড়ে নতুন এই ছেলের নাম আলাদা করা যায়। কিন্তু এখন, এই অলস বিকেলে মনে হচ্ছে—এই কেজো পরিচয়টুকুর আর কোনো দরকার নেই। ইহানের মুখটা, তার ঘন চশমার আড়ালের প্রখর দৃষ্টি, আর তার শরীর থেকে আসা সেই চন্দনের মিষ্টি কোলনের ঘ্রাণ যেন স্পষ্ট ভাসছে মৌসুমীর নাকের ডগায়।

মৌসুমীর ৫২ বছরের দীর্ঘ, পরিপক্ক জীবনে এমন মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধায় তিনি খুব কমই পড়েছেন। তিনি ঢালিউডের তিন দশকের সম্রাজ্ঞী, কত শত প্রভাবশালী পুরুষ, সুপারস্টার আর পরিচালক তাঁর একটা মাত্র ফোন বা সম্মতির জন্য চাতক পাখির মতো মাসের পর মাস বসে থাকে। আর আজ, তিনি বায়ান্ন বছর বয়সে এসে একুশ বছরের এক সম্পূর্ণ নবীন ছেলের ফোন নাম্বারের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—একটা সাধারণ হাই বা মেসেজ পাঠাবেন কি পাঠাবেন না!

“ছিঃ মৌসুমী! কী করছ তুমি?”—মায়ের মতো শাসন করে উঠল তাঁর মনের ভেতরের নীতিবান সত্তা। “ও তোমার পেটের সন্তানের বয়সী। ওর সাথে এভাবে গায়ে পড়ে যাচেছ পড়ে যোগাযোগ করা কি তোমার মতো একজন ব্যক্তিত্বময়ী নারীর শোভা পায়? সমাজ জানলে কী বলবে?” কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর ভেতরের অবদমিত, সুপ্ত নারীসত্তা গর্জে উঠল— “আরে, ও তো আমার সহকর্মী! আমরা একসাথে একটা অসাধারণ সিনেমা বানিয়েছি, যা সমালোচকদের মন জয় করেছে। একটা সফল কাজ শেষ হওয়ার পর একজন সহকর্মীর ভালো-মন্দের খোঁজ নেওয়া তো একদম সাধারণ সৌজন্য। এতে অন্যায় বা অনৈতিকতার কী আছে? কেন নিজেকে এত খাঁচায় বন্দি করে রাখবে?”

দ্বিতীয় সত্তাটিরই শেষ পর্যন্ত জয় হলো।

মৌসুমী সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলেন। রেশমি কাফতানের শাটিন কাপড়টা তাঁর ভরাট উরুর ওপর ছড়িয়ে পড়ল। তিনি কাঁপাকাঁপা আঙুলে দ্রুত টাইপ করলেন। খুব সাধারণ, প্রথাগত আর পেশাদার একটা মেসেজ—যাতে কোনো বাড়তি আবেগ বা ইঙ্গিত না থাকে: “হাই ইহান, কেমন আছো? অনেক দিন কোনো খোঁজ নেই। পড়াশোনা কেমন চলছে?”

মেসেজটা সেন্ড বাটন চেপে পাঠাতেই মৌসুমী তড়িঘড়ি করে ফোনটা উল্টো করে টিপয়ের ওপর রেখে দিলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অজানা ভয়ে ‘ধক’ করে উঠল। পর্দায় চোখ না রেখেও তিনি বুঝতে পারলেন অনলাইনে ‘ডাবল টিক’ পড়েছে। তার মানে মেসেজটা সফলভাবে ডেলিভারড হয়েছে। দশ মিনিট পার হলো। পনেরো মিনিট। আধঘণ্টা... এক ঘণ্টা!

ইহানের কোনো রিপ্লাই নেই। মৌসুমী চরম অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি বারবার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন, কিন্তু কফি ততক্ষণে ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে। তিনি ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন—ইহানের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেখাচ্ছে ‘অফলাইন’। ‘লাস্ট সিন’ দেখাচ্ছে তিন ঘণ্টা আগে।

তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, “হয়তো ভার্সিটিতে ক্লাসে আছে, বা বন্ধুদের সাথে ব্যস্ত। ও তো আর আমার মতো একাকী অবসর বসে নেই। এত অস্থির হওয়ার কী আছে?” কিন্তু মন তো আর যুক্তি মানে না! মনের এক গোপন কোণে এক তীক্ষ্ণ অপরাধবোধ ও ভয় খচখচ করতে লাগল। ছেলেটা কি ইচ্ছা করেই তাকে এড়িয়ে চলছে? নাকি সেদিনের সেই চার সেকেন্ডের তীব্র আলিঙ্গনের মুহূর্তে মৌসুমীর বুকের কাঁপন ইহানও টের পেয়েছিল? সে কি মৌসুমীকে কোনো ‘কামতৃষ্ণার্ত বয়স্ক নারী’ ভেবে দূরে সরে যাচ্ছে?


এই লজ্জাকর ভাবনায় মৌসুমীর গাল ও কান অনুশোচনায় গরম হয়ে উঠল। অবশেষে সন্ধ্যা সাতটা বাজতে দশ মিনিটে ফোনের বিশেষ নোটিফিকেশন টোনটি বেজে উঠল—‘টুং’! মৌসুমী সোফা থেকে প্রায় ছোঁ মেরে ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ইহানের নাম। সে রিপ্লাই দিয়েছে। “আসসালামু আলাইকুম ম্যাম। আমি ভালো আছি। আসলে আজ সারাদিন ভার্সিটিতে সেমিস্টার প্রেজেন্টেশনের মারাত্মক চাপ ছিল, তাই ফোন চেক করার একদম সময় পাইনি। সরি ফর দ্য লেট রিপ্লাই ম্যাম। আপনি কেমন আছেন?”

মৌসুমী বুক ভরে এক দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। যাক, বাঁচা গেল! খুবই শান্ত, মার্জিত আর বিনীত উত্তর। কোনো বাড়তি আদিখ্যেতা বা ফাজিলমি নেই। মেসেজের সেই ‘ম্যাম’ সম্বোধনটা দেখে মৌসুমীর মনের এক কোণে সামান্য যেন অভিমানের সূক্ষ্ম কাঁটা বিধল, আবার অন্য কোণে এক বিরাট স্বস্তিও পেলেন। অন্তত সীমানাটা ঠিক আছে।

তিনি দ্রুত লিখলেন, “ইটস ওকে। পড়াশোনাটাই আসল। আমি ভালো আছি। নিজের শরীরের যত্ন নিও।”
ইহান উত্তর দিল, “ধন্যবাদ ম্যাম। আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।”

কথোপকথনটা হয়তো সেখানেই চিরতরে শেষ হতে পারত। নিয়ম অনুযায়ী হওয়া উচিতও ছিল তা-ই। কিন্তু বাস্তব আর হৃদয়ের গতিপথ সবসময় নিয়মের রেখা ধরে হাঁটে না। এখান থেকেই অলক্ষ্যে শুরু হলো এক অদৃশ্য, আবেশময় ডিজিটাল সুতোর টান।


দুই
পরের একটা মাস ধরে মৌসুমী আর ইহানের মধ্যে চলল এক ধীরলয়ের, গভীর আর তীব্র ডিজিটাল সম্পর্ক। খুব ঘনঘন তারা মেসেজ করত না—হয়তো দিনে একবার, বা সপ্তাহে তিন-চারবার। কখনো মৌসুমী নিজে থেকে কোনো সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতেন, কখনো ইহান হঠাৎ কোনো ইন্টারেস্টিং মিম, বইয়ের রিভিউ বা চলচ্চিত্রের সুন্দর দৃশ্য শেয়ার করত। বাইরে থেকে দেখলে কথাগুলো ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক আর নির্দোষ:

“আজ ক্যাম্পাসে খুব বৃষ্টি নামল, ম্যাম। ছাতা আনিনি, একবারে ভিজে একাকার।”
“সাবধানে থেকো ইহান, ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলো না যেন। গরম চা বা কফি খেয়ে নাও।”

অথবা,

“ম্যাম, আজ বিকেলে টিভিতে আপনার ‘মেঘলা আকাশ’ দেখাচ্ছিল। শুটিংয়ের চাপের মধ্যেও পুরোটা আবার দেখলাম। বিশেষ করে আপনার ওই বৃষ্টির দৃশ্যের এক্সপ্রেশন... জাস্ট আনপ্যারালাল!”
“থ্যাঙ্ক ইউ ইহান। ওটা আমার নিজেরও খুব হৃদয়ের কাছের একটা কাজ।”

কিন্তু এই ছোট ছোট, সুতি কাপড়ের মতো সাদা টেক্সটগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক মারাত্মক ডিজিটাল রাসায়নিক বিক্রিয়া!

এই মেসেজগুলো মৌসুমীর স্থবির, একঘেয়ে আর বিষাদময় জীবনে অক্সিজেনের মতো কাজ করতে শুরু করল। তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক নতুন রুপে। সারাদিন তিনি ঘরের কাজ করেন, জিম করেন, বিকেলের আলোয় হাঁটেন, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে টেবিলের ওপর রাখা সেই কালো আয়তক্ষেত্রাকার আইফোনটার দিকে। কখন ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠবে? কখন সেই কাঙ্ক্ষিত বার্তাটি আসবে?

ওমর সানি চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি ফিরেছেন। সংসার তার স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মে চলছে—খাবার টেবিলে গল্প, ব্যবসায়ের হিসাব, আত্মীয়দের খোঁজখবর। কিন্তু মৌসুমী যেন এক সুদূরের সমান্তরাল ভুবনে বসবাস করতে শুরু করেছেন। যে ভুবনে তিনি ৫২ বছর বয়সী কোনো দায়িত্বশীল মা বা প্রবীণ স্ত্রী নন; যে ভুবনে তিনি কেবলই এক পরম আকর্ষনীয় নারী—যার অস্তিত্বের তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় একুশ বছরের এক সুগঠিত তরুণের গোপন বার্তার আহ্বানে।

একদিন তপ্ত দুপুরে মৌসুমী ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ল্যাপটপে নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইম স্ক্রল করছিলেন।
কোনো সিনেমা বা সিরিজই তাঁর মন টানছিল না। গতানুগতিক হলিউড থ্রিলার, সস্তা কোরিয়ান রোমান্স—সব যেন চরম পানসে আর মেকি লাগছে। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, ইহানকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? আজকের এই আধুনিক প্রজন্মের তরুণরা তো বিশ্ব চলচ্চিত্রের খুব ভালো খবর রাখে।

তিনি ড্রয়ার থেকে ফোনটা হাতে নিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে টাইপ করলেন: “ইহান, ফ্রি আছো?”

ঠিক দুই মিনিট পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল: “জি ম্যাম, বলুন। ক্লাসের গ্যাপ চলছে।”

মৌসুমী সোফায় পজিশন বদলে নিয়ে লিখলেন, “একটা ভালো মুভি সাজেস্ট করতে পারো? একটু অন্যরকম কন্টেন্ট। এই গতানুগতিক মারামারি বা সস্তা রোমান্স দেখতে একদম ইচ্ছে করছে না। ভালো কোনো ক্লাসিক বা আন্তর্জাতিক আর্ট ফিল্ম হলে ভালো হয়।”

ইহান টাইপ করছে... ‘typing...’ লেখাটা ভেসে উঠছে আর নিভছে। মৌসুমী কৌতূহলী হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইহান লিখল, “ম্যাম, আপনি কি ইতালিয়ানসিনেমা দেখেন?”


মৌসুমী উত্তর দিলেন, “খুব একটা দেখা হয়নি। তবে সাবটাইটেল থাকলে কোনো সমস্যা নেই। ভাষা তো শিল্পের বাধা নয়।”

ইহান লিখল, “তাহলে আপনি আজই ‘Malèna’ (2000) দেখতে পারেন। বিখ্যাত ডিরেক্টর জুসেপ্পে তোর্নাতোরে-র মাস্টারপিস। আমার মনে হয় সিনেমাটার নান্দনিকতা আর আবেগ আপনার খুব ভালো লাগবে। তবে...”


ইহান থেমে গেল।


মৌসুমী দ্রুত লিখলেন, “তবে কী?”

ইহান লিখল, “না কিছু না ম্যাম... সিনেমাটা একটু বোল্ড আর সেন্সুয়াল, কিন্তু প্রচণ্ড পাওয়ারফুল। মনিকা বেলুচ্চি আছেন মূল চরিত্রে।”

মনিকা বেলুচ্চি!


নামটা মৌসুমীর সুপরিচিত। বিশ্বসিনেমার অন্যতম আবেদনময়ী দেবী এবং সৌন্দর্য ও কামনার প্রতীক হিসেবে তাঁর খ্যাতি। মৌসুমীর ভেতরে এক সুপ্ত কৌতূহল জেগে উঠল। “আচ্ছা, ধন্যবাদ। আমি আজ বিকেলেই দেখব,” মৌসুমী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে চ্যাট বন্ধ করলেন।

তিন

সেদিন বৃষ্টিভেজা বিকেলেই মৌসুমী নিজের মাস্টার বেডরুমের দরজায় খিল তুলে দিলেন। ঘরের ভারী পর্দাগুলো টেনে দিয়ে আবোছায়া এক পরিবেশ তৈরি করলেন। এসিটা ১৬ ডিগ্রিতে সেট করে, বিছানার ওপর ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন। এইচডি কোয়ালিটিতে ইতালিয়ান মাস্টারপিস ‘Malèna’ স্ট্রিম হতে শুরু করল। প্রথম দৃশ্য থেকেই মৌসুমী যেন এক মায়াবী সম্মোহনের ভেতর তলিয়ে যেতে লাগলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সিচিলির (Sicily) এক ছোট্ট, রক্ষণশীল সুন্দর তটরেখাঘেরা শহর। আর সেই শহরের ধুলোবালি ও সোডিয়াম আলোমাখা রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক অনন্যা রূপসী নারী—মেলেনা স্করডিয়া (মনিকা বেলুচ্চি)। মৌসুমী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ল্যাপটপের আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মনিকা বেলুচ্চি যখন পর্দায় প্রথম আবির্ভূত হন, তখন তাঁর গায়ের সুগঠিত ভরাট শাড়ি-পোশাক, কোমর দোলে হেঁটে যাওয়ার রাজকীয় ভঙ্গি, আর তাঁর চোখে জমে থাকা এক পরম একাকীত্ব ও বিষাদ পুরো সিচিলি শহরকে স্তব্ধ করে দেয়। মৌসুমী সিনেমাটি দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই মেলেনার সাথে নিজের জীবনের এক অদ্ভুত, ভয়ংকর ও নিখুঁত মিল খুঁজে পেতে শুরু করলেন!

মেলেনা একা। তার স্বামী যুদ্ধে গেছে, যার কোনো খোঁজ নেই (মৌসুমীর ক্ষেত্রে স্বামী সানি তাঁর ব্যবসা ও নিজস্ব জগতে ব্যস্ত)। পুরো সিচিলি শহরের পুরুষরা মেলেনাকে নিয়ে কামনার ফ্যান্টাসি বুনে, তার রূপ ও ভরাট শরীর নিয়ে রসালে চর্চা করে, রাস্তায় হেঁটে গেলে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কেউ তার ভেতরের নিঃসঙ্গ হৃদয়ের খবর রাখে না!

মেলেনা যখন রেশমি পোশাক পরে সিচিলির স্কয়ার দিয়ে হেঁটে যায়, তখন শহরের ছোট ছোট কিশোর ও তরুণ ছেলেরা সাইকেল চালিয়ে তাকে দূর থেকে অনুসরণ করে। তাদের চোখে কামাকুল বিস্ময়, ভয় আর পরম আরাধনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আর ঠিক সেখানেই আবির্ভাব ঘটে গল্পের প্রধান অনুঘটক—রেনাতো নামের এক ১৩-১৪ বছরের তরুণ কিশোরের।

রেনাতো দূর থেকে মেলেনাকে ভালোবাসে। সে মেলেনাকে ছুঁতে পারে না, মেলেনার সাথে কথা বলার সাহস তার নেই। কিন্তু সে গোপনে মেলেনার বাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে দেখে, মেলেনার ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে এনে বুকে ধরে রাখে। রেনাতোর এই যে দূর থেকে দেখা, এই যে এক বয়স্ক, সুগঠিত পরম রূপসী নারীর প্রতি এক কিশোরের পবিত্র অথচ তীব্র শরীরী আরাধনা—তার সেই ব্যাকুল চোখের দৃষ্টির ভেতরে মৌসুমী যেন পরিষ্কার দেখতে পেলেন ২১ বছরের ইহানের মুখটি!

সিনেমাটি যত সামনের দিকে এগোতে লাগল, মৌসুমীর শরীর তত বেশি গরম ও ঘামে আর্দ্র হতে লাগল। মনিকা বেলুচ্চির সেই voluptuous, সুগঠিত, ভরাট বক্ষ ও নিতম্বের ক্যানভাস, তাঁর শরীরের প্রতিটি মাংসল বাঁক, আর তাঁর প্রতি সেই কিশোর রেনাতোর অনিয়ন্ত্রণযোগ্য কামনার আরতি—সব যেন মৌসুমীর বর্তমান জীবনের এক নিখুঁত দর্পণ হয়ে উঠল! বিশেষ করে, মৌসুমীর নিজের বর্তমান যে শারীরিক গঠন—৩৬-৩৭ বছর বয়সে অর্জিত সেই ‘Regal Fuller Frame’ (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি, ৭৭ কেজি)—তা মনিকা বেলুচ্চির সেই কালজয়ী শরীরের সাথে একদম হুবহু মিলে যায়! কোনো ছিপছিপে জিরো ফিগার নয়, বরং মাংসল, ভরাট, মাতৃত্বপূর্ণ অথচ ভয়াবহ রকমের প্রলুব্ধকর নারীত্ব।

সিনেমা শেষ হলো। এননিও মোররিকোনের (Ennio Morricone) হৃদয়বিদারক সুর বাজতে বাজতে এন্ড ক্রেডিট ভেসে উঠল।

মৌসুমী ল্যাপটপের পর্দাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন। অন্ধকার ঘরে তিনি চিত হয়ে শুয়ে রইলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা দ্রুত ওঠানামা করছে। গালে আর ঘাড়ে হালকা ঘামের ফোঁটা। এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ ঘোরের মধ্যে তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর মনে এক প্রশ্ন বিদ্যুৎবেগে আঘাত হানল—

“এই সিনেমাটা ইহান আমাকে কেন সাজেস্ট করল? এটা কি শুধুই একটা ভালো আর্ট ফিল্মের সুপারিশ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইহানের কোনো গোপন রূপক বার্তা? ইহান কি নিজেকে সেই কিশোর ‘রেনাতো’ আর আমাকে সেই কামনাময়ী রূপসী ‘মেলেনা’ হিসেবে কল্পনা করে?”

রেনাতো যেমন বয়সের বাধার কারণে মেলেনাকে প্রকাশ্যে নিজের করতে পারে না, শুধু দূর থেকে আরাধনা করে আর ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকে—ইহানও কি মৌসুমীর ‘Regal Fuller Frame’-এর দিকে তাকিয়ে ঠিক একই অনল অনুভব করে?

মাথার ভেতর উত্তাল প্রশ্নের ঝড়। মৌসুমী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কামনার ঘোর, কৌতূহল আর অবদমিত আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি নাইট স্ট্যান্ড থেকে ফোনটা হাতে নিলেন। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট।

চার

তিনি হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করলেন। ইহানের নামের পাশে সবুজ ডট জ্বলছে—সে ‘Online’। মৌসুমী কাঁপা হাতে লিখলেন, “ইহান, মুভিটা দেখা শেষ করলাম মাত্র।”

সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এল, “কেমন লাগল ম্যাম?”
মৌসুমী লিখলেন, “অসাধারণ! মনিকা বেলুচ্চি অনবদ্য। আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।”

ইহান উত্তর দিল, “আমি জানতাম আপনার ভালো লাগবে ম্যাম। এই সিনেমার নান্দনিকতা আর গভীরতা আপনার টেস্টের সাথে খুব যায়।”

কথাটা সেখানেই থামতে পারত। কিন্তু মৌসুমীর ভেতরের সেই নিষিদ্ধ, দাহ্য কৌতূহল আর সামলানো গেল না। তাঁর আঙুলগুলো যেন এক অদৃশ্য শয়তানের বশবর্তী হয়ে টাইপ করতে শুরু করল। মনের সবচেয়ে গোপন, বিপজ্জনক কোণ থেকে বেরিয়ে এল সেই প্রশ্নটা—যা তিনি গত এক মাস ধরে নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন:


“আচ্ছা ইহান, একটা সত্যি কথা বলবে? তুমি আমাকে ‘Malèna’ সাজেস্ট করলে কেন? সিনেমার গল্পের সাথে কি আমাদের কোনো... মানে, তুমি কি এই সিনেমার মাধ্যমে আমাকে বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করলে?” মেসেজটা সেন্ড বাটন চাপার সাথে সাথে... মৌসুমীর হৃদপিণ্ড যেন স্তব্ধ হয়ে গেল!

“হে ঈশ্বর! এ আমি কী করলাম!”—মৌসুমীর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল!

তিনি নিজের কপাল চেপে ধরলেন। এই মেসেজটার মানে কী দাঁড়ায়? তিনি কি নিজেই নিজের গোপন দুর্বলতা ইহানের কাছে প্রকাশ করে দিলেন? তিনি কি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি ইহানের সেই গোপন ফ্যান্টাসি আর কামনার দৃষ্টি সম্পর্কে শতভাগ সচেতন?
একজন বায়ান্ন বছর বয়সী জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত, সম্মানী মহাতারকা হয়ে তিনি একুশ বছরের এক তরুণের কাছে এমন লজ্জাকর, খোলামেলা প্রশ্ন কীভাবে করতে পারলেন?

যদি ইহান এটাকে সস্তা বয়স্ক নারীর ‘ভীমরতি’ বা বাজে আচরণ ভেবে খারাপ মনে করে? যদি সে এই মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে কাউকে দেখিয়ে দেয়? যদি তাঁর তিন দশকের ভাবমূর্তি এক লহমায় ধুলোয় মিশে যায়? আতঙ্কে ও লজ্জায় মৌসুমীর হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।

“না, না! এই মেসেজ রাখা যাবে না! এখনই মুছে ফেলতে হবে!”

তিনি দ্রুত মেসেজটা সিলেক্ট করলেন। তাঁর আঙুল থরথর করে কাঁপছিল। তিনি ‘Delete for Everyone’ অপশনে সজোরে চাপ দিলেন। মেসেজটা মুছে গেল। চ্যাটবক্সে এখন স্রেফ লেখা উঠছে: “You deleted this message.”

মৌসুমী বুকের ওপর হাত রেখে হাপরের মতো শ্বাস নিতে লাগলেন। যাক, বাঁচা গেছে! নিশ্চয়ই দেখেনি। এত কম সময়ের মধ্যে তো দেখার কথা নয়! কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর চোখ চলে গেল চ্যাটবক্সের ওপরের দিকে। সেখানে ইহান অনলাইন আছে, কিন্তু ‘typing...’ দেখাচ্ছে না।

মৌসুমীর মাথার ভেতর রিমঝিম শব্দ হতে লাগল। সে কি ফোন লক থাকা অবস্থায় লক-স্ক্রিনের নোটিফিকেশন ব্যানার থেকে পুরো মেসেজটা পড়ে ফেলেছে? নাকি চ্যাটবক্স খোলাই ছিল? এক মিনিট... দুই মিনিট... পাঁচ মিনিট। ইহান কোনো কিছু লিখল না। সে কোনো প্রশ্ন করল না—“ম্যাম, কী ডিলিট করলেন?”

এমনকি সে কোনো ডাবল টিকের উত্তর না দিয়ে নীরব থেকে ধীরপায়ে অফলাইন হয়ে গেল। সেই নীরবতা মৌসুমীকে বিষাক্ত ছুরির মতো বিঁধতে লাগল। যদি সে না দেখত, তবে একজন সাধারণ ছেলে হিসেবে নিশ্চিতভাবেই জিজ্ঞেস করত, “ম্যাম, আপনি কী মেসেজ পাঠিয়ে আবার ডিলিট করলেন?”

যেহেতু সে একদম চুপ করে অফলাইন হয়ে গেল, তার মানে—সে দেখেছে! সে মেসেজের প্রতিটি শব্দ পড়েছে! লজ্জায়, অপমানে আর আত্মগ্লানিতে মৌসুমী বিছানার ওপর কুঁকড়ে গেলেন। এখন তিনি কী মুখ নিয়ে শুটিং ফ্লোরে বা বাইরে ইহানের সামনে দাঁড়াবেন? ছেলেটা নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছে—এই বয়সে এসে মৌসুমী ম্যাডামের মাথা খারাপ হয়ে গেছে!

পাঁচ

একটি দিন গেল। দুটি দিন কেটে গেল। মৌসুমী তাঁর আইফোনটা ড্রয়ারের একদম গভীরে লুকিয়ে রেখেছেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না। এক চরম অপমান আর আতঙ্কের প্রহর গুনছেন তিনি। দ্বিতীয় দিন রাত যখন পৌনে বারোটা, মৌসুমী যখন নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন যে এই বয়সে এসে তিনি যা করেছেন তা চরম পাপ, আর তিনি কোনোদিনও ইহানের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না—ঠিক তখনই বন্ধ ড্রয়ারের ভেতর থেকে ফোনটা কেঁপে উঠল।

‘টুং’!

মৌসুমী চমকে উঠলেন। তিনি ধীরে ধীরে ড্রয়ার খুলে ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ইহানের নাম। তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে লক খুললেন। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজটা ওপেন করলেন। ইহান লিখেছে: “ম্যাম, গত দুটো দিন আমি নিজের সাথে অনেক লড়াই করেছি। আপনি মেসেজটা পাঠানোর পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ডিলিট করে দিয়েছিলেন, তাই প্রফেশনাল ভদ্রতার খাতিরে হয়তো আমার চুপ থাকাই উচিত ছিল। কিন্তু অনেক সময় নীরবতা দুটো মানুষের মধ্যে অসীম ভুল বোঝাবুঝি আর দূরত্ব তৈরি করে। আমি আপনাকে সত্যিটা বলতে চাই—আমি মেসেজটা আমার ফোনের নোটিফিকেশন বার থেকেই পড়ে ফেলেছিলাম ডিলিট হওয়ার আগেই।”

মৌসুমীর মাথার ভেতর পুরো পৃথিবীটা ঘুরতে লাগল! সে দেখেছে! সে স্পষ্ট পড়ে ফেলেছে! ঠিক এক মিনিট পর ইহানের দ্বিতীয় মেসেজটি এল। বিশাল এক দীর্ঘ বার্তা: “আমি জানি না আমার এই কথাগুলো বলা কোনো ধৃষ্টতা বা অপরাধ কি না। কিন্তু আপনার মতো একজন সত্যি কারের শিল্পীর সামনে মিথ্যা বলাটা হবে আমার অভিনয়ের প্রতি অকৃজ্ঞতা। ম্যাম, আমি আপনাকে ‘Malèna’ সিনেমাটি একদম ইচ্ছা করেই সাজেস্ট করেছিলাম।”

মৌসুমীর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। তিনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়তে লাগলেন: “কারণ ওই সিনেমায় যখনই মনিকা বেলুচ্চি স্ক্রিনে আসতেন, তাঁর সেই আভিজাত্য, তাঁর সেই ভরাট সৌন্দর্য, তাঁর বিষাদময় একাকীত্ব—আমার বারবার কেবলই আপনার কথা মনে করাচ্ছিল। সিনেমার সেই কিশোর রেনাতো যেমন দূর থেকে মেলেনার সেই রাজকীয় সৌন্দর্য দেখে কামনায় আর ভক্তিতে নিঃশ্বাসের গতি হারিয়ে ফেলত... আমি সত্যি বলছি ম্যাম, উত্তরার শুটিং ফ্লোরে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করার সময়, কিংবা সেদিনের পার্টিতে আপনার ওই অফ-হোয়াইট শিফন আর মুক্তার হার পরা রূপ দেখে—আমিও নিজের ভেতর ঠিক একই 'রেনাতো'কে খুঁজে পেয়েছি। আমার চোখে আপনিই আমার বাস্তব জীবনের ‘মেলেনা’।”

মেসেজের শেষ অনুচ্ছেদটি পড়ে মৌসুমীর হাতের ফোন প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো: “ম্যাম, আমি যদি ‘Malèna’ আপনাকে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে সাজেস্ট করে থাকি, যদি এর মাধ্যমে আমি আপনার প্রতি আমার ভেতরের সুপ্ত, অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণের কোনো ইঙ্গিত দিয়ে থাকি—তবে কি আপনি আমার ওপর ভীষণ রাগ করেছেন?”


ঘরজুড়ে থমথমে নীরবতা। এসি চলার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। মৌসুমী সোফায় নিথর হয়ে বসে রইলেন। সময় যেন অনন্তকালের জন্য থমকে গেছে। ইহান স্বীকার করেছে! সে সম্পূর্ণ সততার সাথে, কোনো মেকি লুকোচুরি না করে স্বীকার করে নিয়েছে যে সে ইচ্ছাকৃতভাবেই সিনেমাটি দিয়েছিল! সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে সে মৌসুমীর সেই ৭৭ কেজি ওজনের ‘Regal Fuller Frame’-এর ভেতরে কেবল একজন প্রবীণ অভিনেত্রীকে নয়, বরং মনিকা বেলুচ্চির মতো এক কামনাময়ী, অপার্থিব দেবী ‘মেলেনা’কে দেখতে পায়! আর সে নিজে মৌসুমীর সামনে দাঁড়িয়ে এক কামনাকুল, ব্যাকুল ‘রেনাতো’!

সবচেয়ে বড় কথা, সে মৌসুমীর কাছে অনুমতি চেয়েছে—“আপনি কি রাগ করেছেন?”

স্রেফ  সাধারণ প্রশ্ন নয়। বিপজ্জনক, নিষিদ্ধ প্রেমের প্রস্তাব! এটা এমন এক অদৃশ্য চাবি, যা একাধারে মৌসুমীর সাজানো সংসার আর তিন দশকের অর্জনকে ধ্বংস করতে পারে, আবার অন্যদিকে এক সুপ্ত, দাহ্য ও তীব্র নারীত্বের দুয়ার খুলে দিতে পারে!

যদি মৌসুমী উত্তর দেন: “হ্যাঁ, আমি রাগ করেছি। তোমার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক!”—তবে খেলা এখানেই শেষ। ইহান অপরাধীর মতো ক্ষমা চাইবে, চিরতরে সরে যাবে। মৌসুমীর সামাজিক সম্মান ও নীতি বজায় থাকবে। আর যদি তিনি উত্তর দেন: “না”...

তবে তিনি এক বাক্যে সম্মতি জানিয়ে দেবেন! তিনি স্বীকার করে নেবেন যে বায়ান্ন বছর বয়সে এসেও এই একুশ বছরের তরুণের কামনার আরতিতে তিনি তৃপ্ত! তিনি পা দেবেন এক অসম, নিষিদ্ধ, পাপবিদ্ধ কিন্তু প্রলুব্ধকর আকর্ষণের অতল গহ্বরে! মৌসুমীর চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, স্বামী ওমর সানি, সন্তান, সমাজ, এফডিসি আর হাজার হাজার ভক্তের দৃষ্টিভঙ্গি।

আর অন্যদিকে ভেসে উঠল ইহানের সেই প্রখর, গভীর চোখ, তার শরীরের চন্দনের সুবাস, সেদিনের সেই চার সেকেন্ডের বুকে জমে থাকা উত্তাপ, আর এই স্বীকারোক্তির সততা। বায়ান্ন বছর বয়সে এসে মৌসুমী অনুভবে টের পেলেন, তাঁর শরীরের প্রতিটা কোষ, প্রতিটা রক্তকণিকা এক নতুন অনল নিয়ে জেগে উঠছে।

তিনি কি স্রেফ সমাজের দেওয়া এক 'আইকন' বা ‘বয়স্ক দেবী’র খাঁচায় বন্দি হয়ে জীবন কাটাবেন? নাকি একজন রক্তমাংসের তৃষ্ণার্ত মানবী হয়ে এই তরুণের ব্যাকুল আহ্বানে সাড়া দেবেন? মৌসুমী অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। তাঁর কাঁপাকাঁপা আঙুল দুটো আইফোনের জ্বলজ্বলে স্ক্রিনের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে।


তিনি জানেন, এই একটিমাত্র শব্দের ওপর নির্ভর করছে তাঁর জীবনের মোড় কোন দিকে ঘুরবে। মৌসুমী এক গভীর, দীর্ঘ শ্বাস নিলেন। শরীরের সমস্ত দ্বিধা আর নীতিবোধকে এক পাশে সরিয়ে রেখে, তিনি ধীরপায়ে টাইপ করলেন একটি মাত্র শব্দ— 

“না।” 


তিনি সেন্ড বাটন চাপলেন। মেসেজটি চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নীল রঙের দুটি টিক চিহ্ন ভেসে উঠল। মৌসুমী ফোনটি নিজের বুকের একদম মাঝে, স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের ওপর চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন। তিনি জানেন না সামনে কী কালবৈশাখী ঝড় অপেক্ষা করছে, কিন্তু তিনি এটুকু নিশ্চিতভাবে জানেন—আজ রাতে মেলেনা তার রেনাতোকে ফিরিয়ে দেয়নি।

[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.


Messages In This Thread
RE: মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা - by Orbachin - 31-08-2026, 10:19 PM



Users browsing this thread: