30-08-2026, 11:19 PM
দুই
অবশেষে সমস্ত অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল মৌসুমী অভিনীত ‘অসম সমীকরণ’। বড় বাজেটের সস্তা কমার্শিয়াল ধামাকা বলতে ঢালিউডে সাধারণত যা বোঝানো হয়—এই সিনেমা মোটেও তা ছিল না। এতে কোনো আইটেম সং ছিল না, কোনো উরু উরু টাইপের রোমান্টিক ডুয়েট গান ছিল না, না ছিল ভিলেনের সাথে নায়কের গাড়ি ওড়ানোর সাউথ ইন্ডিয়ান মারামারি, আর না ছিল ব্যাংকক বা তুরস্কে গিয়ে কালারফুল গানের শুটিং।
কিন্তু মুক্তির প্রথম দিন থেকেই সিনেমাটি নিয়ে সচেতন, শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রুচিশীল দর্শকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ও শিল্প সংস্কৃতির পাতায় বড় বড় অক্ষরে রিভিউ ছাপা হলো: “মৌসুমীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও পরিপক্ক প্রত্যাবর্তন—'অসম সমীকরণ'”
“নবীন তরুণ ইহানের চোখধাঁধানো অভিনয়ের সাথে কিংবদন্তি মৌসুমীর অভিনয় শৈলী বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন দিগণ্তের সূচনা করল।”
ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের সবকটি শাখা, যমুনা ব্লকবাস্টার এবং চট্টগ্রামের মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে উপচে পড়া ভিড় না থাকলেও, প্রতিটি প্রাইম শোতে প্রযোজকের হিসেবের চেয়ে অনেক বেশিই দর্শক হল। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক দম্পতিরা সিনেমাটি দেখতে হলে ভিড় জমালেন।
ব্যবসা দিয়ে বলতে গেলে এটি কোনো তথাকথিত ‘স্প্ল্যাশ ব্লকবাস্টার’ ছিল না, কিন্তু প্রযোজক আজিম চৌধুরীর দ্বিগুণ টাকা উঠে এসে সিনেমাটি ‘মডারেট হিট’করল।
মৌসুমীর জন্য এই সাফল্য বিশাল নৈতিক বিজয়। গত এক দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রি আর এফডিসির কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার লোক প্রচার করে আসছিল যে—৫০ পেরিয়ে যাওয়া কোনো নারী অভিনেত্রীর আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার যোগ্যতা থাকে না; তাঁদের নাকি স্রেফ নায়ক-নায়িকার কান্নাকাটি করা মা বা শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করে বিদায় নেওয়া উচিত।
মৌসুমী ‘অসম সমীকরণ’ দিয়ে সোজা ব্যাটে ছক্কা হাঁকালেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বায়ান্ন বছর বয়সেও নিজের ফিগার নিয়ে কোনো লজ্জা না পেয়ে, কোনো ২০ বছরের নায়কের বাহুলগ্না না হয়েও, স্রেফ নিজের মেধা, উপস্থিতি আর আভিজাত্য দিয়ে একটা পুরো ব্যবসাসফল সিনেমা একাই কাঁধে টেনে নেওয়া যায়।
অবশেষে সমস্ত অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল মৌসুমী অভিনীত ‘অসম সমীকরণ’। বড় বাজেটের সস্তা কমার্শিয়াল ধামাকা বলতে ঢালিউডে সাধারণত যা বোঝানো হয়—এই সিনেমা মোটেও তা ছিল না। এতে কোনো আইটেম সং ছিল না, কোনো উরু উরু টাইপের রোমান্টিক ডুয়েট গান ছিল না, না ছিল ভিলেনের সাথে নায়কের গাড়ি ওড়ানোর সাউথ ইন্ডিয়ান মারামারি, আর না ছিল ব্যাংকক বা তুরস্কে গিয়ে কালারফুল গানের শুটিং।
কিন্তু মুক্তির প্রথম দিন থেকেই সিনেমাটি নিয়ে সচেতন, শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রুচিশীল দর্শকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ও শিল্প সংস্কৃতির পাতায় বড় বড় অক্ষরে রিভিউ ছাপা হলো: “মৌসুমীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও পরিপক্ক প্রত্যাবর্তন—'অসম সমীকরণ'”
“নবীন তরুণ ইহানের চোখধাঁধানো অভিনয়ের সাথে কিংবদন্তি মৌসুমীর অভিনয় শৈলী বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন দিগণ্তের সূচনা করল।”
ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের সবকটি শাখা, যমুনা ব্লকবাস্টার এবং চট্টগ্রামের মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে উপচে পড়া ভিড় না থাকলেও, প্রতিটি প্রাইম শোতে প্রযোজকের হিসেবের চেয়ে অনেক বেশিই দর্শক হল। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক দম্পতিরা সিনেমাটি দেখতে হলে ভিড় জমালেন।
ব্যবসা দিয়ে বলতে গেলে এটি কোনো তথাকথিত ‘স্প্ল্যাশ ব্লকবাস্টার’ ছিল না, কিন্তু প্রযোজক আজিম চৌধুরীর দ্বিগুণ টাকা উঠে এসে সিনেমাটি ‘মডারেট হিট’করল।
মৌসুমীর জন্য এই সাফল্য বিশাল নৈতিক বিজয়। গত এক দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রি আর এফডিসির কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার লোক প্রচার করে আসছিল যে—৫০ পেরিয়ে যাওয়া কোনো নারী অভিনেত্রীর আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার যোগ্যতা থাকে না; তাঁদের নাকি স্রেফ নায়ক-নায়িকার কান্নাকাটি করা মা বা শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করে বিদায় নেওয়া উচিত।
মৌসুমী ‘অসম সমীকরণ’ দিয়ে সোজা ব্যাটে ছক্কা হাঁকালেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বায়ান্ন বছর বয়সেও নিজের ফিগার নিয়ে কোনো লজ্জা না পেয়ে, কোনো ২০ বছরের নায়কের বাহুলগ্না না হয়েও, স্রেফ নিজের মেধা, উপস্থিতি আর আভিজাত্য দিয়ে একটা পুরো ব্যবসাসফল সিনেমা একাই কাঁধে টেনে নেওয়া যায়।
তিন
‘অসম সমীকরণ’-এর এই অভাবনীয় সম্মানজনক সাফল্য উদযাপন করতে মৌসুমী নিজের গুলশানের বাসভবনে এক ঘরোয়া গেট-টুগেদার পার্টির আয়োজন করলেন। তিনি চাননি কোনো বড় ফাইভ স্টার হোটেলে জাকজমকপূর্ণ কমার্শিয়াল পার্টি করতে, যেখানে ক্যামেরার ঝলকানি আর অচেনা মানুষের ভিড়ে কাজের মূল নির্যাস হারিয়ে যায়। তিনি শুধু সিনেমার কাস্ট, ক্রু এবং তাঁর জীবনের খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রিয় মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ মৌসুমীর গুলশানের সুবিশাল ফ্ল্যাটটি এক অপূর্ব আলোয় সজ্জিত হয়ে উঠল। ড্রয়িংরুমে মেহগনি কাঠের আসবাবপত্রের ওপর থেকে ওয়ার্ম হোয়াইট আলোর রোশনাই ঠিকরে পড়ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা ভলিউমে বাজছিল ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদের এক মিষ্টি সুর। বাতাসে ছড়ানো দামী রজনীগন্ধা ফুল আর চন্দনের হালকা সুবাস।
মৌসুমী আজ নিজেকে সাজিয়েছেন একদম অন্যরকম আভিজাত্যে।
তিনি পরেছেন একটি খাঁটি অফ-হোয়াইট রঙের শিফন শাড়ি। শাড়ির গায়ে খুব সূক্ষ্ম মুক্তার মতো সুতোর কাজ। গলায় পেঁচানো দু-লহরের আসলি সাউথ-সি মুক্তার নেকলেস, আর কানে মানানসই মুক্তার দুল। চুলগুলো একদম কড়াকড়ি করে বাঁধা নয়, বরং আলগা করে ছেড়ে দেওয়া পেছনে—যাতে দু-একটি রূপালি চুলের রেশ স্পষ্ট বোঝা যায়।
বায়ান্ন বছর বয়সে তাঁর ৭৭ কেজি ওজনের শরীরে এই অফ-হোয়াইট শিফন আর মুক্তার সংমিশ্রণ তাঁকে এক অপার্থিব, স্নিগ্ধ রূপ দিয়েছিল—ঠিক যেন শরতের কোনো প্রশান্ত শুভ্র সকাল।
তিনি মুখে নির্মল হাসি নিয়ে নিজেই অতিথিদের ট্রে থেকে জুস ও স্ন্যাকস তুলে দিয়ে আপ্যায়ন করছিলেন। তাঁর স্বামী অভিনেতা ওমর সানি এই মুহূর্তে তাঁর নতুন রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এক সপ্তাহের সফরে আছেন; ফলে এই বিশাল সন্ধ্যার একক আয়োজক ও ‘হোস্ট’ হিসেবে মৌসুমীকেই পুরো ঘর সামলাতে হচ্ছিল।
পার্টির এক কোণায়, বারান্দার কাঁচের দরজার ঠিক পাশে একটা ছোটখাটো জটলা জমেছিল। আর সেই জটলার ঠিক কেন্দ্রবিন্দু বা মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইহান। ইহানের দিকে নজর পড়তেই মৌসুমীর চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
আজ বাস্তবের ইহানকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন কোনো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে নেমে আসা এক মডেল! তার পরনে একদম বডি-ফিটেড কুচকুচে কালো রঙের প্রিমিয়াম সুতি শার্ট, সাথে ডার্ক গ্রে বা ছাই রঙের ট্রাউজার্স। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত খুব নিখুঁতভাবে ফোল্ড করা, যার ফলে তার হাত দুটোর শক্ত পেশি ফুটে উঠেছে। ডান হাতে একটি দামী মেটালিক অ্যানালগ রিস্টওয়াচ। চুলগুলো খুব সুন্দর করে স্পাইক না করে ক্লাসিক্যাল কায়দায় পেছনের দিকে আঁচড়ানো।
শুটিংয়ের সময় গত এক মাস ধরে মৌসুমী তাকে দেখেছেন ‘আয়ান’ চরিত্রের চশমা পরা, এলোমেলো চুল আর ঢোলা টি-শার্টের এক বাউণ্ডুলে তরুণ লুকে। কিন্তু আজ, সান্ধ্যকালীন আলোয়, পরিপূর্ণ আধুনিক পোশাকে বাস্তবের এই ২১ বছরের তরুণ ইহানকে দেখে যে কারো চোখ আটকে যেতে বাধ্য।
মৌসুমী ঘরের এক কোণায় জুসের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ইহানকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ইহান অত্যন্ত মার্জিত আর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে আজিম চৌধুরী আর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছিল। তার কথা বলার স্টাইল, ডিপ কন্ঠস্বর আর ভুবনভোলানো সরল হাসি পুরো ঘরের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। তার দৈহিক গঠনে আর উপস্থিতিতে এমন এক ধরনের আধুনিক স্মার্টনেস আর পুরুষালী আভিজাত্য ছিল, যা সচরাচর ২১ বছরের তরুণের মধ্যে দেখা যায় না।
মৌসুমী আরও খেয়াল করলেন, ইউনিটের যে তরুণী জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আর কাস্টিং টিমের দুটি মেয়ে ছিল—তারা রীতিমতো মুগ্ধ আর অপলক দৃষ্টিতে ইহানের দিকে তাকিয়ে আছে। ইহান সবার সাথেই হেসে কথা বলছে, কিন্তু তার আচরণের মধ্যে কোনো সস্তা চপলতা বা অহেতুক ফ্লার্ট করার মানসিকতা নেই। সে যে কতটা সুশিক্ষিত আর সামাজিকভাবে দক্ষ, তা আজকের সন্ধ্যায় তার প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট।
হঠাৎ মৌসুমীর মনের গভীরের কোনো এক গোপন অলিন্দে এক নিষিদ্ধ ও তীব্র ভাবনা বিজলীর মতো উঁকি দিয়ে গেল— “ছেলেটা তো ভয়াবহ সুন্দর আর আকর্ষণীয়! স্ক্রিনে বা ক্যামেরার লেন্সের ভেতর ওকে যতটা ভালো লাগে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে তো ওর ব্যক্তিত্ব আরও দশগুণ বেশি শক্তিশালী মনে হয়!”
ভাবনাটা মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই মৌসুমী ভেতরে ভেতরে চরম চমকে উঠলেন! এক ধরনের অপরাধবোধ তাঁর স্নায়ুকে কাঁপিয়ে দিল। তিনি হাতের জুসের গ্লাসটা টিপয়ের ওপর ঠক করে রাখলেন। নিজের অজান্তেই নিজেকে মনে মনে প্রচণ্ড ধমক দিলেন:
“ছিঃ মৌসুমী! তোমার মাথায় এসব কী নোংরা আর আবর্জনা ভাবনা আসছে? ও তোমার ছেলের বয়সী! ও তোমার সন্তানের মতো এক তরুণ অভিনেতার সাথে কাজ করেছে মাত্র। তুমি বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের রাজরাণী, এত ব্যক্তিত্বহীন চিন্তা তুমি কীভাবে করতে পারছ?”
তিনি মাথাটা জোরে একপাশে ঝাঁকালেন, যেন নিজের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবনাগুলোকে জোর করে ঝেড়ে ফেলে দিতে চান। তারপর নিজের স্বাভাবিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনে দ্রুত অন্য বয়স্ক অতিথিদের সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলেন।
চার
রাত ক্রমশ গভীর হতে লাগল। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সান্ধ্যকালীন ভোজ পর্ব শেষ হলো। সুস্বাদু খাবার আর আড্ডার পর অতিথিরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করলেন। আজিম চৌধুরী সালাম জানিয়ে চলে গেলেন। পরিচালক ইফতি মৌসুমীর কাছাকাছি এসে পরম শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করে পা ছুঁয়ে সালাম করল।
“ম্যাম, আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব আমি জানি না। আপনার সেই প্রথম দিনের সাপোর্ট আর মিস রেহানা চরিত্রটাকে নিজের ভাবার মানসিকতা না থাকলে 'অসম সমীকরণ' কোনোদিনও সিনেমা হলে আলো দেখতে পেত না।”
মৌসুমী ইফতির মাথায় হাত রেখে উষ্ণ গলায় বললেন, “ধন্যবাদ তোমার পাওয়ার কথা ইফতি। তুমি আমাকে এমন একটা চরিত্র উপহার দিয়েছ, যেখানে আমার বয়স বা চেহারাকে লুকিয়ে কৃত্রিম হতে হয়নি। ভালো থেকো, নতুন কাজ শুরু করলে আবার জানাবে।”
সবাই চলে যাওয়ার পর, হলরুমের বিশাল ফয়ার বা প্রবেশদ্বারের কাছে দরজার কাছে বিদায় নিতে এল শেষ অতিথি—ইহান। তখন ড্রয়িংরুম প্রায় ফাঁকা। প্রোডাকশনের দুজন লোক দূরের টেবিলে ডিনার ট্রাঙ্কগুলো গোছাচ্ছে। আলোর তীক্ষ্ণতা অনেক কমে এসেছে।
ইহান ধীরপায়ে মৌসুমীর সামনে এসে দাঁড়াল। কালো শার্টের বোতামের ফাঁক দিয়ে তার চওড়া বুকের ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে। সে সামান্য ঝুঁকে বিনীত কণ্ঠে বলল: “ম্যাম, আজ আমি আসি। আজকের সন্ধ্যাটা সত্যি আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আর আপনার বাসার এই ডিনার... বিশেষ করে খাসির মাংসের রেজালাটা—অসাধারণ! আমি মনে হয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি।”
মৌসুমী তাঁর ঠোঁটে সেই চিরচেনা স্নিগ্ধ, রাজকীয় হাসি ফুটিয়ে রাখলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের মনটা অজানা কোনো এক কারণে সামান্য অস্থির হয়ে উঠছিল। “ভালো থেকো ইহান,” মৌসুমী মিষ্টি গলায় বললেন। “পড়াশোনাটা একদম অবহেলা করবে না। সামনে তোমার ভালো ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। কোনো নতুন ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে অবশ্যই আমাকে জানিও।”
বিদায় নেওয়ার এই অন্তিম মুহূর্তে, আজকালকার জেন-জি জেনারেশনের সামাজিক সৌজন্যের স্বাভাবিক অভ্যাসবশত, ইহান এক পা এগিয়ে এল। সে সাধারণ প্রথাগত হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল না। পরিবর্তে, শোবিজ জগতের আধুনিক কায়দায় সে একটা ‘সেমি-হাগ’ (Semi-hug) বা হালকা একহাতে সৌজন্যমূলক আলিঙ্গন করে বিদায় জানাতে চাইল।
শোবিজ বা সামাজিক অঙ্গনে একজন সহকর্মীকে বিদায় জানানোর সময় এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক, অনাকর্ষক এবং নিরপেক্ষ একটা সৌজন্য আচরণ। মৌসুমীও তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে হাজার হাজারবার এমন হ্যান্ডশেক বা সৌজন্য আলিঙ্গনে অভ্যস্ত। তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই শরীরটা সামান্য এগিয়ে দিলেন।
কিন্তু ঠিক তখনই... কালান্তক বিপত্তিটা ঘটে গেল। ইহান যখন তার ডান হাতটি মৌসুমীর শিফন শাড়িতে ঢাকা ডান কাঁধের ওপর রাখল, এবং তার চওড়া বুকের ডান পাশটা মৌসুমীর ভরাট স্তন ও বুকের পাঁজরের সাথে মাত্র দুই সেকেন্ডের জন্য স্পর্শ করল—ঠিক সেই মুহূর্তে মৌসুমীর পুরো শারীরিক ও স্নায়বিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেন এক কোটি ভোল্টের তীব্র এক বৈদ্যুতিক প্রবাহ ধেয়ে গেল!
মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন ঘূর্ণায়মান অক্ষ থেকে থমকে গেল! ঘরের সরোদের সুর, ঘড়ির কাঁটার শব্দ, দূরের গাড়ির হর্ন—সবকিছু এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। মৌসুমীর নাকের ছিদ্রে এসে আঘাত করল ইহানের শরীর থেকে আসা এক তীব্র, মাদকতাময় পুরুষালী সুবাস—যেটা দামী চন্দনের কোলন, হালকা ঘাম আর তরতাজা যৌবনের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ইহানের হাতের আঙুলগুলোর শক্ত ও উষ্ণ স্পর্শ তাঁর পাতলা শিফন শাড়ি ভেদ করে সোজা গিয়ে পৌঁছাল মৌসুমীর ত্বকের গভীরে। ২১ বছরের রক্তে উছলে ওঠা সেই তরুণ শরীরের অনাবিল তাপমাত্রা মৌসুমীর ৫২ বছর বয়সী ভরাট, সুগঠিত দেহের প্রতিটা কোষে এক নিষিদ্ধ, অচেনা আর প্রচণ্ড দাহ্য আলোড়ন সৃষ্টি করল!
ঘটনাটা ঘটল মাত্র তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যে। ইহান সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই, বিন্দুমাত্র অনভিপ্রেত কিছু না ভেবে, নিজেকে আলতো করে সরিয়ে নিল। সে তাঁর মুখাবয়বে সেই নির্ভেজাল, নিষ্পাপ সুন্দর হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “গুড নাইট, ম্যাম! ভালো থাকবেন।”
তারপর সে ঘুরে লিফটের দিকে হেঁটে গেল। লিফটের স্টিলের দরজায় তার ছায়া মিলিয়ে গেল।
কিন্তু মৌসুমী?
তিনি ড্রয়িংরুমের বিশাল সেগুন কাঠের ভারী দরজাটার সামনে এক নিরেট পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন! তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মকভাবে দ্রুত হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের ধক-ধক শব্দটা তিনি স্পষ্ট নিজের কানে শুনতে পাচ্ছেন, যেন ভেতরের কোনো বাঁধ ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তাঁর দুই হাতের তালু ঘেমে উঠছে, আর হাঁটু দুটো সামান্য কাঁপছে।
তিনি তড়িঘড়ি করে ভারী দরজাকপোট বন্ধ করে দিলেন। বাইরে লক করার ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে, দরজার কাঠের পিঠ ঠেকিয়ে তিনি অন্ধকারের মধ্যে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বুকটা ওঠানামা করছে।
“এটা কী হলো? খোদা! এটা আমার সাথে কী হলো? কেন এমন হলো??” তিনি নিজের ভেতরের তোলপাড়কে প্রশ্ন করলেন।
গত ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে কত শত সুদর্শন নায়ক, কত শত সহশিল্পী, প্রেমিক, স্বামী তাঁকে চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে কিংবা সৌজন্যের খাতিরে প্রকাশ্যে এবং গোপনে জড়িয়ে ধরেছেন! রাজ্জাক, আলমগীর, জসিম থেকে শুরু করে সালমান শাহ, ওমর সানি, ফেরদৌস—কারো স্পর্শেই তো কোনোদিন এমন নিয়ন্ত্রণহীন, রক্ত হিম করা বিদ্যুৎ চমকায়নি!
এমনকি তাঁর স্বামী ওমর সানির শারীরিক স্পর্শের সাথেও তো আজকের এই অনুভূতির কোনো বিন্দুমাত্র মিল নেই! তবে কেন? কেন এই একুশ বছরের এক সম্পূর্ণ নতুন ছোকরার সামান্য চার সেকেন্ডের একটা সৌজন্য স্পর্শে তাঁর বায়ান্ন বছরের পরিপক্ক, অভিজ্ঞ এবং সসংযত শরীরে এমন এক নারকীয় আলোড়ন আর কামনার আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল?
এটা কি মাতৃস্নেহ বা বাৎসল্য?
মৌসুমী মনের ভেতর এক নির্মম সত্য অনুভব করলেন। না! বাৎসল্য বা মাতৃস্নেহে কখনো রক্তে এমন আগুনের উত্তাপ লাগে না! মাতৃস্নেহে কখনো নারীর সুপ্ত কামনার স্নায়ুগুলো এভাবে জাগ্রত হয়ে চিৎকার করে ওঠে না!
তবে কি... এটা সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ?
পাঁচ
মৌসুমী দ্রুত পা চালিয়ে ড্রয়িংরুম পার হয়ে নিজের মাস্টার বেডরুমে ঢুকে দরজায় খিল তুলে দিলেন। ঘরের এসি জ্বলছে, অথচ তাঁর কপালে আর ঘাড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তিনি ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
হাতের কাঁপন সামলে তিনি এক লহমায় গলার দু-লহরের মুক্তার নেকলেসটা খুলে মেঝের উডেন ফ্লোরে ছুড়ে ফেললেন। কানের দুল দুটো খুলতে গিয়ে তাঁর আঙুল কাঁপছিল। তিনি আয়নার দিকে তাকালেন।
আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে এক বায়ান্ন বছর বয়সী পরিপূর্ণ নারীর অবয়ব। তাঁর গাঢ় নীল শিফনের ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা গলা ও বুকের অংশে এক অস্বাভাবিক রক্তিম বা গোলাপী আভা ফুটে উঠেছে। চোখের মনি দুটি অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত, আর ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে।
তিনি জোরে বিড়বিড় করে উঠলেন, “এটা স্রেফ একটা বিভ্রান্তি! আমি ক্লান্ত... আমি মানসিকভাবে অনেক দিন পর একটা বড় কাজ শেষ করেছি, তাই হয়তো আমার স্নায়ুগুলো এভাবে ভুল সিগন্যাল দিচ্ছে। আমি ওমর সানির স্ত্রী, আমি এক তরুণ ছেলের মা! আমি কীভাবে একুশ বছরের একটা ছেলের স্পর্শ নিয়ে এভাবে ভাবতে পারি?”
তিনি দ্রুত বেডরুমের মেইন লাইটগুলো বন্ধ করে দিলেন। ঘরে শুধু বেডসাইড ল্যাম্পের একটা হালকা লালচে আভা জ্বলতে লাগল। তিনি নাইটি পরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু এসি চলার পরও তাঁর পুরো শরীরে এক অদ্ভুত উত্তাপ আর ব্যাকুলতা ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রেশমের চাদরটা বুকের ওপর টেনে নিলেন, কিন্তু সেই চাদরের স্পর্শেও যেন তিনি ইহানের হাতের সেই উষ্ণ চাপ অনুভব করতে লাগলেন!
চোখ বন্ধ করলেন।
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই অন্ধকারের ক্যানভাসে ভেসে উঠছে ইহানের সেই কুচকুচে কালো শার্ট পরা সুঠাম শরীর, তার হাতের ফোল্ড করা স্লিভ, তার মিষ্টি সেই ভুবনভোলানো হাসি, আর কানের কাছে তার সেই ফিসফিস করে বলা কথা—“গুড নাইট, ম্যাম!”
মৌসুমী বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। একদিকে তাঁর দীর্ঘ ত্রিশ বছরের অর্জিত সামাজিক সম্মান, সুচিত্রা সেন-সম ভাবমূর্তি, দাম্পত্য নীতি আর বয়সের গাম্ভীর্য—অন্যদিকের তাঁর রক্তের ভেতরে জাগ্রত হওয়া এক অচেনা, নিষিদ্ধ, সংবেদনশীল এবং তীব্র শারীরিক শিহরণ।
তাঁর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। হৃদস্পন্দনের প্রতিটি বিট যেন ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে একুশ আর বায়ান্নর এক অসম অংকের হিসাব কষছিল। একুশ বছর বয়স—যৌবনের প্রারম্ভ, আগুনের প্রখরতা, নাছোড়বান্দা আকর্ষন। বায়ান্ন বছর বয়স—শরীরের পূর্ণতা, অভিজ্ঞতার দাহ, আর নিভে আসার আগের শেষ তীব্র শিখা।
এই দুটি পৃথিবীর মোড় যখন চার সেকেন্ডের এক আলিঙ্গনে এসে একসাথে ধাক্কা খেল, তখন মৌসুমীর রাজকীয় অস্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর নাড়িয়ে দিল।
ঘরের চালে তখন বাইরের টিপ টিপ বৃষ্টির শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বারান্দার টবে ভেজা পাতার গন্ধ ভেসে আসছে। মৌসুমী বালিশে মুখ গুজে রেশমি চাদরটা দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে তখন কোনো ঘুম নেই, আছে এক তীব্র অস্থিরতা আর নিষিদ্ধ অনুভূতির সাথে একাকী এক যুদ্ধের ক্লান্তি।
একুশ আর বায়ান্নর এই অদ্ভুত অংকের হিসাব মেলাতে মেলাতে, ছটফট করতে করতেই একসময় ভোরের দিকে ক্লান্ত ঘুমে ঢলে পড়লেন মৌসুমী।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)