Thread Rating:
  • 49 Vote(s) - 3.18 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
৫০।
মানুষের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বড়ই অদ্ভুত এবং ভয়ংকর।

মানুষ এমন এক অদ্ভুত জীব, যাকে আপনি নরকের সবচেয়ে উত্তপ্ত কুঠুরিতে ফেলে দিলেও সে সপ্তাহখানেক ছটফট করার পর একটা সময় সেই আগুনের উত্তাপের সাথেই মানিয়ে নিতে শুরু করবে। সে তখন ভাববে— ‘আগুন তো জ্বলছেই, অন্তত শীতের ভয় নেই!’ মানুষের এই অদ্ভুত অ্যাডাপটেশনের কোনো তুলনা নেই।

দেখতে দেখতে এভাবে আরও প্রায় একটা মাস কেটে গেল।

আমি ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের এই অদ্ভুত, থমথমে এবং বিষাদময় জীবনের সাথে একপ্রকার অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। জীবনটা এখন আর কোনো থ্রিলার বা রোমাঞ্চকর সিনেমা নয়, এটা এখন একটা ঘড়ির কাঁটার মতো একঘেয়ে যান্ত্রিক ছন্দে ঘুরছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠি। মেস ছেড়ে আসার পর এই ফ্ল্যাটের গেস্টরুমটাই এখন আমার স্থায়ী আস্তানা। ফ্রেশ হয়ে, কিচেনে গিয়ে নিজের জন্য একটা চা বানিয়ে চটজলদি অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। আর ঠিক তখনই, ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বারান্দার দিকে চোখ পড়লেই বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা চিনচিনে টান লাগে।

বারান্দায় রাখা সেই বেতের ইজিচেয়ারটায় মূর্তির মতো বসে আছেন আনিকা নাওহার। সকালের মিষ্টি রোদ তখনো ঢাকার ধুলোমাখা আকাশে পুরোপুরি ছড়ায়নি, কিন্তু উনি তখন সেই চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। উনার এক হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট।

আমি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হয়তো একটু দ্বিধা করি। উনার দিকে তাকাই। উনি আমার দিকে একবারও চোখ ফেরান না। আমি এলাম নাকি গেলাম, বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি— এই জাগতিক কোনো বিষয়েই উনার যেন কোনো আগ্রহ নেই।

আবার সারাদিন কারওয়ান বাজারের অফিসে বিশ্বরাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আর আমেরিকার নির্বাচনের খবরের অনুবাদ শেষ করে যখন সন্ধ্যা সাতটা বা সাড়ে সাতটায় ফ্ল্যাটে ফিরে আসি— দৃশ্যটা থাকে হুবহু এক।

সেই একই বারান্দা, সেই একই বেতের চেয়ার, আর সেই একই আনিকা নাওহার। উনার হাতে তখন হয়তো দিনের পঞ্চাশতম সিগারেটটা জ্বলছে।

এই সকাল থেকে সন্ধ্যার দীর্ঘ আট-নয়টা ঘণ্টা উনি কী করলেন? উনি কি দুপুরে কিছু খেয়েছিলেন? উনি কি এক ফোঁটা পানি মুখে দিয়েছিলেন? উনি কি গোসল করেছিলেন নাকি সারাদিন ওই নির্জীব কাঠপুতুলের মতো একই ভঙ্গিতে বসে ছিলেন— আমি কিচ্ছু জানি না। আমার এখন আর মুখ ফুটে উনাকে জিজ্ঞেস করারও সাহস হয় না।

কারণ এই ফ্ল্যাটের দরজায় চাবি ঘোরানোর মুহূর্তটাই এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন বিকেলে যখন আমি সিএনজি বা উবার থেকে নেমে এই বিল্ডিংয়ের লিফটে ওপরে উঠি, আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হতে শুরু করে। সাত তলায় লিফটের দরজা খোলার পর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যখন আমি পকেট থেকে চাবিটা বের করি, তখন আমার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হয়ে যায় যে মনে হয় এখুনি হার্টফেল করব।

প্রতিটা দিন আমার মনে হয়— হয়তো আজ লক খুলে ভেতরে ঢুকে আমি উনাকে বারান্দায় দেখব না। হয়তো আজ দেখব মাস্টার বেডরুমের নরম গদির ওপর উনি ঘুমের ওষুধের বিশ-তিরিশটা ফাঁকা স্ট্রিপ পাশে ফেলে রেখে, মুখে সাদা ফেনা তুলে নিথর হয়ে পড়ে আছেন। কিংবা হয়তো দেখব, সিলিং ফ্যানের সাথে উনার সেই দামি নীল শাড়িটা পেঁচিয়ে উনি শূন্যে ঝুলে আছেন, আর উনার সেই নিখুঁত পা দুটো বাতাসে দুলছে।

এই ভয়টা যে কী পরিমাণ বিষাক্ত, তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। আমি দরজার লক খুলে খুব সাবধানে, জুতোজোড়া নিঃশব্দে ফ্লোরে রেখে পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকি। চোরের মতো ভয়ে ভয়ে মাস্টার বেডরুমের দরজায় উঁকি দিই। ফাঁকা বিছানাটা দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। তারপর দ্রুত ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বারান্দার দিকে তাকাই।

এবং দেখতে পাই সেই নীল ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

উনি বারান্দায় বসে আছেন। ঠিক আগের মতোই। আমি একটা গভীর শ্বাস ফেলে দেয়ালে পিঠ ঠেকাই। ফুসফুসে বাতাস ফিরে আসে। যাক, আজকেও কোনো অঘটন ঘটেনি। মানুষটা অন্তত বেঁচে আছে। কিন্তু বেঁচে থাকার এই রূপটা যে মৃত্যুর চেয়ে কতটা বেশি যন্ত্রণাদায়ক, তা আমি চোখের সামনে প্রতিদিন দেখছি।

উনি আমার দিকে ফিরেও তাকান না। উনার চশমার কাঁচের আড়ালে থাকা সেই বাদামি চোখ দুটো এখন আর আলো প্রতিফলিত করে না। সেখানে শুধু একটা অনন্ত, অতলস্পর্শী শূন্যতা। উনার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কোনো রাগ নেই, কোনো বিরক্তি নেই। যেন আমি এই ঘরে থাকা একখণ্ড বাতাস ছাড়া আর কিছুই নই।

একদম যে কথা হয় না, তা নয়। মাঝে মাঝে রাতে আমি বাইরে থেকে পার্সেল করে আনা কাচ্চি বিরিয়ানি বা স্যুপের বাটি ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে উনাকে খুব সাবধানে ডাক দিই, "আনিকা, একটু খেয়ে নাও।"

উনি রোবটের মতো উঠে আসেন। চেয়ার টেনে বসেন। চামচ দিয়ে দুই-এক লোকমা মুখে তোলেন। আমি হয়তো উনাকে স্বাভাবিক করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে বলি, "আজকে অফিসে এহসান ভাই একটা অদ্ভুত কথা বলেছেন..." কিংবা "বাইরে আজ খুব জ্যাম ছিল।"

উনার কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না। উনি শুধু একটা নিচু, প্রাণহীন "হুম" বা "হ্যাঁ" বলে যান। উনার চোখ প্লেটের দিকেও থাকে না, আমার দিকেও থাকে না। থাকে দূর আকাশের কোনো অদৃশ্য বিন্দুর দিকে।

শুরু শুরুতে আমি অনেক চেষ্টা করেছি। উনার পাশে বসে উনার হাত ধরেছি, উনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, ফিলোসফি কপচে বুঝিয়েছি যে অতীতকে বদলানো যায় না। কিন্তু আজকাল আমি আর কিছুই বলি না।

কারণ আমি বুঝতে পেরেছি, কিছু কিছু মানুষের শোক এত গভীর আর জটিল হয় যে, সেখানে সান্ত্বনার কোনো শব্দ প্রবেশ করতে পারে না। সান্ত্বনা দিতে যাওয়াটা তখন উল্টো উপহাসের মতো শোনায়। আমি চোখের সামনে একজন পূর্ণাঙ্গ, বিদুষী এবং অহংকারী নারীকে দিনে দিনে তিল তিল করে হতাশার গভীরে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখছি।

আমি কিচ্ছু করতে পারছি না। কী অধিকারে কী করব, সেটাও আমার জানা নেই। আমি তো উনার স্বামী নই, কোনো সামাজিক স্বীকৃত অভিভাবকও নই। আমি শুধুই এক উটকো সঙ্গী, যে এক অদ্ভুত নিয়তির ফেরে উনার এই ধ্বংসযজ্ঞের একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অথচ, এই চরম বিষাদ আর অন্ধকারের মধ্যেও এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ বৈপরীত্য আমার রক্তে প্রতিনিয়ত আগুন ধরিয়ে দেয়। মানুষ কি শোকের মধ্যেও এত বেশি আবেদনময়ী হতে পারে?

আনিকা নাওহারের এই ধ্বংসের রূপ, এই চরম হতাশায় ডুবে থাকার দৃশ্যটা উনাকে যেন কোনো এক অচেনা, তীব্র সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসির মূর্ত প্রতীক বানিয়ে তুলেছে।

যে নারী এককালে পরিপাটি সালোয়ার কামিজ বা সিল্কের শাড়িতে আভিজাত্যের চরম শিখরে থাকতেন, তিনি এখন সারাদিন গায়ে জড়িয়ে রাখেন খুব পাতলা, ঢিলেঢালা একটা সাটিনের স্লিপিং গাউন কিংবা একটা ওভারসাইজড সুতির শার্ট। কাপড়গুলোর কোনো যত্ন নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই।

উনি যখন বারান্দার বেতের চেয়ারে এক পা তুলে অন্য পা নিচে ঝুলিয়ে আয়েশ করে বসেন, উনার গাউনের নিচের অংশটা আলগা হয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ এবং ভরাট উরুর অনেকটা অংশ অনাবৃত করে দেয়। গোধূলির নরম লালচে আলো কিংবা রাতের সোডিয়াম বাতির হলুদ আভা যখন উনার সেই উন্মুক্ত উরুর চামড়ায় এসে পড়ে, তখন উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির প্রতিটি রেখা যেন এক জীবন্ত কবিতার মতো চিৎকার করে ওঠে।

উনার শার্টের ওপরের দিকের দুই-তিনটা বোতাম সবসময় খোলা থাকে। উনি কোনো অন্তর্বাস পরেন না। উনি যখন সিগারেটে গভীর টান দিয়ে বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ছাড়েন, তখন সেই পাতলা কাপড়ের নিচে উনার সেই ভারী, সুডৌল স্তনযুগল এক বুনো ছন্দে ওপর-নিচে ওঠে আর নামে। উনার কাঁধের দিক থেকে শার্টটা বারবার পিছলে পড়ে যায়, উন্মুক্ত হয়ে পড়ে উনার ফর্সা কলারবোন আর মসৃণ ঘাড়ের খাঁজ। উনার উসকোখুস্কো, জট-পাকানো চুলগুলো পিঠের ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে, যেন কোনো বনদেবী সদ্য ঘুম থেকে উঠে বিষাদের নদীতে স্নান সেরে এসেছে।

উনার চোখের নিচের ওই কালচে দাগ, ঠোঁটের ওই শুকনো ফ্যাকাশে ভাব উনার মুখে এক অদ্ভুত, রহস্যময় মাদকতা এনে দিয়েছে। উনাকে দেখলে মনে হয় উনি কোনো জীবন্ত লাস্যময়ী নরকের রানী, যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে ধ্বংসের হাতছানি।

আমি ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে যখন উনার এই রূপ দেখি, আমার বুকের ভেতরের আদিম পুরুষটা আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে ওঠে। আমার পুরো শরীর উনার একটুখানি স্পর্শের জন্য, উনার ওই ফর্সা উরুতে একটু হাত রাখার জন্য, উনার ওই ভারী স্তনের মাঝে মুখ গুঁজে পাগল হয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। আমার মনে হয়, আমি ছুটে গিয়ে উনাকে ওই বেতের চেয়ার থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিই। উনাকে টেনে এনে বিছানার ওপর আছড়ে ফেলি। উনার ওই পাতলা গাউনটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলে, উনার ওই বিষাদমাখা, ঠান্ডা শরীরের প্রতিটি কোষে আমার জ্বলন্ত পৌরুষ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিই। আমি চাই উনার এই জমাট বাঁধা শোককে আমার বুনো, হিংস্র মিলনের উত্তাপে গলিয়ে জল করে দিতে!

কিন্তু আমি পারি না।

আমি এক পা এগিয়ে গিয়েও থেমে যাই। কারণ উনার চোখের ওই অতলস্পর্শী শূন্যতা আমার সমস্ত কামনার সামনে এক বিশাল অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। একটা শোকাহত, ধ্বংসপ্রাপ্ত নারীর ওপর জোর খাটানো আর একটা মৃতদেহের ওপর অত্যাচার করার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। আমি আমার এই জ্বলন্ত, উন্মত্ত কামনাকে বুকের ভেতর চেপে ধরে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকি। এই না-পাওয়ার যন্ত্রণা, এই হাতের নাগালে থেকেও ছুঁতে না পারার আক্ষেপ আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।

কিন্তু এসব শারীরিক আকর্ষণের বাইরে, আমার অনুবাদক এবং যুক্তিবাদী মস্তিষ্কটা এক চরম বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় পাক খেতে থাকে।

আমি কিছুতেই আনিকার এই বিষণ্ণতার তল খুঁজে পাই না। কার জন্য এই নারী এত গভীর দুঃখে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছেন? বেলাল সাহেবের জন্য?
কিন্তু কেন?

বেলাল সাহেবের সাথে তো উনার বৈবাহিক সম্পর্কটা বহু আগেই মরে গিয়েছিল! গত দুই-আড়াই বছর ধরে তারা তো কার্যত আলাদা। বেলাল সাহেব তো উনাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতেন না। বেলাল সাহেব নিজে উনার সাদা চামড়ার সহকর্মী, বন্ধুর স্ত্রী, এমনকি এই ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে ময়না এবং রহিমার সাথে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন। সেই বেলাল সাহেব তো আনিকাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন— "তুমি চাইলে অন্য পুরুষের সাথে শোও, আমার কোনো আপত্তি নেই।"

আনিকা তো আমার সাথে সম্পর্ক করে বেলাল সাহেবের সাথে কোনো অন্যায় করেননি! বেলাল সাহেব নিজে এই পথ উনাকে দেখিয়েছিলেন।

সমাজের চোখে হয়তো তারা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন, হয়তো পাসপোর্টে আর কাবিননামায় তাদের নাম একসাথে লেখা ছিল, কিন্তু তাদের বাস্তবের সংসারে তো ভালোবাসা, সম্মান বা আস্থার কোনো কঙ্কালও অবশিষ্ট ছিল না!

আর বেলাল সাহেবের মৃত্যু?

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কি আনিকার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হাত ছিল? কোনো হাত ছিল না! আনিকা কি কোনো মাফিয়াকে ভাড়া করেছিলেন উনার স্বামীকে খুন করার জন্য? না! উনি তো বেলালকে কোনো অভিশাপও দেননি, কোনো ষড়যন্ত্রের জালও বোনেননি।

বেলাল সাহেবের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, তা তো উনার নিজের কামানো পাপের ফসল! একজন মানুষ যখন অর্থের অহংকারে অন্ধ হয়ে গরিব, অসহায় মেয়েদের শোষণ করে, তাদের সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, এবং স্থানীয় গুন্ডা-মাফিয়াদের তাচ্ছিল্য করে ক্ষমতার দম্ভ দেখায়— তখন প্রকৃতির নিয়মেই তাকে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। বেলাল সাহেব সেই আদিম, পাশবিক ভুলের মাশুল দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। কালা রনির দড়ির ফাঁসে উনার মৃত্যু হয়েছে উনার নিজের ডেকে আনা অন্ধকারের কারণে।

তাহলে আনিকার এত কিসের কষ্ট? কেন এই নারী নিজেকে একটা অন্ধকার গুহার ভেতর বন্দি করে রেখে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন?
এটা কি শুধুই সামাজিক ট্রমা? নাকি মানুষের মন এমন এক অপরাধবোধের কারখানায় কাজ করে, যার কোনো যুক্তি নেই?

হয়তো আনিকার অবচেতন মন ভাবছে— উনি যদি সেদিন দেশে না আসতেন, উনি যদি ওই কাজের মেয়ে ময়নাকে জেরা করে বেলালের অতীত না খুঁড়তেন, উনি যদি রাশেদ নামের এক যুবকের সাথে লঞ্চের কেবিনে উদ্দাম মিলনে মেতে না উঠতেন— তবে হয়তো ঘটনাটা অন্যরকম হতে পারত! মানুষ যখন কোনো বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়, তখন সে ঘটনার সমস্ত অনাকাঙ্ক্ষিত দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে নিজেকে শাস্তি দিতে ভালোবাসে।

মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে হয়তো বলে 'সারভাইভার্স গিল্ট' (Survivor's Guilt)— অন্যজন মরে গেছে, কিন্তু আমি কেন বেঁচে আছি এবং কেন আমি সুখ খুঁজেছিলাম, সেই তীব্র আত্মগ্লানি।

কিন্তু এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আমার বোঝার বাইরে। আমি শুধু দেখছি, আমার চোখের সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটা নারীদেহ দিনে দিনে একটা জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে।

আমি কিচ্ছু করতে পারছি না। রাত তখন এগারোটা বাজে।

ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের লাইট নিভিয়ে আমি গেস্টরুমের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। 
বারান্দার অন্ধকারে তখনো একটা লালচে ফুলকির মতো টিমটিম করে সিগারেট জ্বলছে। ধোঁয়ার গন্ধটা এসির ঠান্ডার সাথে মিশে এই নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে একটা প্রেতাত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমি আমার অন্ধকার বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু জানি আজ রাতেও ঘুম আসবে না। কারণ ওপাশের বারান্দায় একটা আস্ত আগ্নেয়গিরি নিঃশব্দে ছাই হয়ে যাচ্ছে, আর আমি কেবল সেই ছাইয়ের গন্ধ শুঁকে শুঁকে এক অনন্ত ব্যর্থতার প্রহর গুনছি।
Like Reply


Messages In This Thread
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 30-08-2026, 06:49 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)