(১)
পানকড় উচ্চ বিদ্যালয়ে আজ এক কেলেঙ্কারির দিন। শিক্ষককক্ষে আমরা তেরো জন শিক্ষক বসে আছি। সবার চোখে-মুখে টানটান উত্তেজনা। অধীর আগ্রহে বসে আছে, কখন আমি মুখ খুলব। দুই ঘণ্টা ধরে বিচারকাজ চলছে। মেয়ের মা এলাকার প্রভাবশালীর স্ত্রী। ভদ্রলোক আসেননি, স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। উনার একটাই কথা—“আমি থানায় যাব। এই নোংরা লোককে জেলের ভাত খাওয়াব। মেয়ের বয়সী বাচ্চার দিকে কীভাবে নোংরা হাত বাড়াতে পারে? এর শিক্ষা আমি দিয়েই ছাড়ব।”
ভদ্রমহিলা ভালোই চেঁচাচ্ছেন। চেঁচানোটা স্বাভাবিক। এইটুকুন এক বাচ্চা মেয়ে। বাচ্চা মেয়েই তো। অথচ এই বাচ্চা মেয়ের দিকে কলেজের একজন পিয়ন হাত বাড়িয়েছে। এই নোংরা হাত যে-কেউ ভেঙে দিতে চাইবে। এতক্ষণ যে ভাঙেনি, সেটা ওর ভাগ্য ভালো। ভাগ্য তো নয়, আমার জন্যই বেঁচে গেছে। আমিই ভদ্রমহিলাকে আটকে রেখেছি। আশ্বাস দিয়েছি, “আমি ব্যাপারটা দেখছি, আমার হাতে ছেড়ে দিন।”
হেডমাস্টার হয়ে আসা বেশি দিন হয়নি আমার এই কলেজে। তাতেই যত ঘটনা আমার চোখের সামনে দেখেছি, কোনো এক পতিতালয়ে যে এসে পড়লাম, আল্লাহ মালুম। কিন্তু শেষে এসে এমন এক ঘটনার সাক্ষী হব ভাবিনি।
“স্যার, আপনি কিছু বলছেন না কেন? নাকি আমি স্বামীকে ডাকব? থানায় যাব?” ভদ্রমহিলা আর তার মেয়ে তানিয়াকে আমার পাশেই বসিয়েছি। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। আমি উনার দিকে ভালো করে তাকাতেও পারছি না। মহিলা বুকের উপর ওড়না লম্বা করে ফেলে রেখেছেন। দুধের সাইজ সম্পূর্ণরূপে বোঝা যাচ্ছে। উনার দিকে তাকালেই উনার দুধের দিকে অটোমেটিক নজর চলে যায়। মেয়েও হয়েছে একই স্বভাবের। আর এই ধামড়ি মেয়ে, দুধ তো কাকে দিয়ে যেন বড় করে ফেলেছে, অথচ কলেজ ড্রেসেই চলে আসে। কোনো * পরে না।
“ভাবি, একটু শান্ত হোন। ভরসা রাখুন।” আমি আস্তে করে তানিয়ার মাকে বললাম।
ঘটনা এখন সবার জানা। সবাই আমার উপর বিচার ছেড়ে দিয়েছে। আমি যা করব, সেটাই। কারণ আমি প্রধান এখানকার। বয়সে আমার থেকে প্রায় সবারই বেশি। একমাত্র আমিই যে কম বয়সী, অথচ সবার প্রধান। সামনে মুরাব্বি টাইপের সব শিক্ষক বসে আছেন। উনারা উনাদের জীবনে সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ লোক। সেখানে আমি কীভাবেই বা এমন একটা কাজে রায় দেব? বিচার করব? এই বিচার মানবে তো সবাই?
মনে সাহস সঞ্চয় করে মুজাহিদকে ডাকলাম আমার পাশে। তাকে দেখেও মায়া লাগছে। এমন মায়াবী চেহারার লোকের ভেতর এমন চরিত্র ঢুকে আছে, অবিশ্বাস্য।
মুজাহিদ এল। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কী করতে যাচ্ছি, সবাই তা দেখার জন্যই বসে আছে। আমি মুজাহিদকে পাশে ডেকে বললাম, “শোনো মুজাহিদ, তুমি যে ভুলটা করেছ, স্বীকার করছ তো?”
“জ্বি স্যার।” মুজাহিদ মুখ নিচু করে উত্তর দিল।
“এখন তাহলে তোমার কী করা উচিত?”
“স্যার, আমাকে যে শাস্তি দেবেন, আমি মেনে নেব। আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি অন্যায় করেছি।” মুজাহিদ অকপটে উত্তর দিল। যেন নেই কোনো ভয়।
“তোমার হাতে দুটো অপশন—এক, তুমি আপার সামনে কান ধরে দশবার উঠবস করবে, আর বলবে তুমি যা করেছ ভুল করেছ, আর জীবনে এই ভুল হবে না। দুই, আপা তোমার গালে দুটো চড় মারবে। কোনটায় তুমি রাজি, বলো?”
মুজাহিদ তড়িৎ আমার দিকে তাকাল। সে ভাবতেই পারেনি হয়তো, এমন বিচার আমি করব। আর না করলেও উপায় নেই। ভদ্রমহিলার রক্তের ও টাকার গরম আছে। এরা যা খুশিই করতে পারে।
মুজাহিদের চোখে পানি ছলছল করছে। জানি না কেন, বারবার মনে হচ্ছে মুজাহিদ নির্দোষ।
“স্যার, আপনারা যেটা করবেন, আমি সেটাই মেনে নেব।”
আমি তানিয়ার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপা, কোনটা করলে এর সঠিক বিচার হবে, বলেন তো?”
“আপনিই করেন, আমি জানি না।” তানিয়ার মা কথাটা এমনভাবে বলল যেন এই বিচার তার পছন্দই না।
“আপা, আপনি ওকে দুটো চড় দিন। উচিত শিক্ষা হোক।”
“না না স্যার, আমি এই নোংরার গায়ে হাত দেব না।”
“তাহলে কী, কান ধরে উঠবস করাব?”
“করান।”
“মুজাহিদ, সামনে যাও, সবার সামনে দশবার কান ধরে উঠবস করো। আর বলো যে তুমি যেই ভুল করেছ, আর করবে না।”
মুজাহিদ বিনাবাক্যে তাই করল।
“আচ্ছা, এবার যাও। এরপর যেন এমন ভুল না দেখি। নয়তো তোমার চাকরি শেষ।”
“জ্বি স্যার।”
মুজাহিদ চলে গেল। তানিয়ার মাও উঠতে যাচ্ছিল, আমি বললাম, “আপা, আমার অফিসকক্ষে আসুন, হালকা নাস্তা করে যান।”
“না স্যার, তানিয়ার আব্বু চিন্তা করবে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওকে আমি জানাইনি এসব ঘটনা। উনি জানলে সব তছনছ করে ফেলবে।”
“আপনাকে ধন্যবাদ আপা, আপনি বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। ভাইয়াকে জানাননি। আপা আসুন, অন্তত এক কাপ চা খাবেন।”
আমি সব শিক্ষককে যে যার ক্লাসে যেতে বললাম। আমি নিজেও আমার অফিসরুমে চললাম। তানিয়াকে বললাম, “তোমার আম্মুকে নিয়ে আসো অফিসে, তানিয়া।”
আমার অফিসে এসে মুজাহিদকে মেসেজ দিলাম, “ম্যাডাম আর আমার জন্য বাইরে থেকে সিঙ্গাড়া আর চায়ের ব্যবস্থা করো জলদি। আর তুমি নিয়ে এসো না। কাউকে দিয়ে পাঠিও।”
আমি আমার চেয়ারে বসলাম। আমার পাশের সোফায় তানিয়া আর ওর মাকে বসতে বললাম।
“তা আপা, বলেন, ভাইয়া কেমন আছে? ভাইয়া এখন বাসায়ই আছে নাকি?”
“জ্বি স্যার, কাল বাসায় এসেছে। তিন দিনের ছুটি। কাল চলে যাবে।”
তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তানিয়া, তোমার আর কমাস পরেই তো ফাইনাল এক্সাম। পড়ছ কেমন?”
“জ্বি স্যার, ভালো।”
“তোমার কোনো কিছু ক্লাসে বুঝতে সমস্যা হলে আমাকে বলবা, আমি উক্ত ক্লাসের শিক্ষক চেঞ্জ করে দেব। আমি চাই তোমাদের এই ব্যাচটা ভালো রেজাল্ট করুক। তোমাদের উপর অনেক আশা আমাদের। বুঝেছ?”
“জ্বি স্যার।”
তানিয়া ভদ্র মেয়ের মতো জ্বি স্যার জ্বি স্যার করছে। পড়ায় যে মাথামোটা, সেটা কলেজের সব স্যার জানে। বড়লোক বাপের বেটি, তাই কেউ কিছুই বলে না। গ্রামের কলেজ। বাপ প্রভাবশালী। কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে ওর বাপের নাম আছে। এদের সন্তানেরা পড়া পারুক বা না পারুক, সবার নজরে ভালো।
একটু পর এক ছেলের হাতে মুজাহিদ নাস্তা পাঠাল।
আমরা তিনজনে নাস্তা-চা খেলাম। অনেক গল্পই হলো। তানিয়ার মায়ের মনটা হালকা করার চেষ্টা করলাম। এদের যত পাম্পাট্রি দেওয়া যাবে, এরা তত খুশি।
বিদায় মুহূর্তে তানিয়ার মায়ের বাকা ঠোঁটের মুচকি হাসিটা বেশ ছিল। আমিও বলেছিলাম, “আপা, আসবেন মাঝে মাঝে কলেজে।”
তানিয়ার মা চলে গেলে মুজাহিদকে ফোন করে অফিসে ডাকলাম।
“রাগ করেছ?”
মুজাহিদ সরাসরি বলল, “তুমি জানো না ভাই, এই মেয়ে খুব খারাপ। আমার সাথেই কথা বলার জন্য লটরপটর করে। আমিই পাত্তা দিতাম না। পাত্তা না পেয়ে এই কাণ্ড করল।”
“বড়লোক বাপের মেয়ে ভাই। কিচ্ছুই করার নেই। অন্তত সাবধানে চলো। এদের থেকে পারলে দশ হাত দূরেই থাকো।”
“বাল পাকনা মেয়ে, কলেজে আসলেই আমাকে টাকা দিয়ে এটা-সেটা আনতে পাঠাবে। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেবে, আর নেবে না। আরও ম্যালা কিছু। ভাগ্যিস করি পিয়নের চাকরি। তাই মুখ বন্ধ।”
“ভাই, এদিকে তাকাও। যে যেমন, আল্লাহ তার বিচার করবে। বাদ দাও এসব। যাও, ব্যাগে টিফিন আছে, খেয়ে নাও।”
“আমার আর ক্ষুধা নেই ভাই।”
“বোকামি কোরো না। বরং শোকর আদায় করো, ও মহিলা থানায় যায়নি।”
“গেলে যেত। বালের এসব ভয় পাই না।”
“মুজাহিদ, এটা বাসা নয়। অফিস।” আমি রাগ দেখিয়ে বললাম।
“সরি। আমি খাব না ভাই। তুমি খেয়ে নাও।”
“তোমার বউকে ফোন দেব? তুমি মন খারাপ করে আছ, খাচ্ছ না?” মুচকি হেসে বললাম।
“কী দরকার ভাই, এসবে নারীদের টানা। একেতো নারীর কেলেঙ্কারিতে মান-সম্মান সব গেছে।”
“আচ্ছা, বলব না। যাও, খেয়ে নাও।”
“তুমি খাবে না?”
“তুমি খাও, আমার একটু কাজ আছে। পরে খাচ্ছি।”
মুজাহিদ খেতে লাগল। বেচারাকে দেখে সত্যিই মায়া লাগছে।
সোনিয়া কল করেছে। কী হলো আবার তার? মুজাহিদ বাসায় বলে দিয়েছে নাকি?
ফোন ধরলাম, “হ্যাঁ, বল।”
“ভাই, তোর দুলাভাই কই?”
“খাচ্ছে, কেন?”
“বদমাশটা আরাম করে খাচ্ছে, আর আমি দুই ঘণ্টা ধরে ফোন দিচ্ছি, ফোন ধরে না। আসুক সে আজ বাসায়।”
“ব্যস্ত ছিল হয়তো। খেয়েই ফোন দেবে।”
“ফোন দিক, ফোন আর ধরব না। থাক। তুই খেয়েছিস?”
“না রে। খাব। তোরা খেয়েছিস?”
“আমি আগেই খেয়েছি। মা আর ভাবি খাচ্ছে এখন।”
“মার শরীর এখন কেমন?”
“জ্বর আর নেই। তবে বলছে শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে।”
“ফলগুলো কেটে দিস।”
“আচ্ছা।”
“নে, থাক। বিকালে দেখা হবে।”
“আচ্ছা। আর বান্দরটাকে বলিস না যে আমি তোকে ফোন দিয়েছিলাম।”
“আচ্ছা, বাই।”
সোনিয়া আমার বোন। যমজ ভাই-বোন আমরা। দেখতে নব্বই ভাগ একই আমরা। মুজাহিদ আমার বোনজামাই। বয়সে আমার থেকে তিন-চার বছর বড় হবে খুবজোর। এই কলেজে বহুদিন পিয়নের কাজ করে মুজাহিদ। আমার বাড়ির পাশেই কলেজ, তাই এদেরকে আমাদের বাসায়ই রেখে দিয়েছি। বোন আর বোনজামাই আমাদের সাথেই থাকে।
আমার পরিবারে পুরুষ বলতে আমরা এই দুজনই। আমি আর মুজাহিদ। আব্বা পাঁচ বছর হলো দুনিয়ায় নেই। মা আর বউ নিয়েই চলছে আমাদের সংসার। সোনিয়া আর মুজাহিদ পরিবারের এখন পার্মানেন্ট সদস্য। এই পাঁচজনের মিনি পরিবার আমাদের।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)