14-08-2026, 12:19 AM
অষ্টাদশ পর্ব
মতিঝিলের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিন। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ কাঁচের জানলা ভেদ করে এসির ঠান্ডা বাতাসেও যেন এক অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরম তৈরি করেছে। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের চারপাশে তখন বড় বড় কর্পোরেট ডিরেক্টর ও কোম্পানির তিন উর্ধতন কর্মকর্তা বসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল মিটিংয়ে ব্যস্ত।
টেবিলের ওপর ছড়ানো নানা রকমের ব্যালেন্স শিট, প্রফিট-লস স্টেটমেন্ট আর প্রজেক্টের ফাইল। কিন্তু কোম্পানির এই সর্বেসর্বা মালিক, ষাটোর্ধ আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মন আজকের এই কোটি টাকার মিটিংয়ে বিন্দুমাত্র নেই। তাঁর সমস্ত চেতনা আর মনোযোগ আটকে রয়েছে অন্য কোথাও। গত রাতের সেই অদ্ভুত নাটক, রান্নাঘরে ইতির ভেষজ ক্বাথ তৈরি, মালেকের সেই সন্দেহপ্রবণ চাহনি—সবকিছু তাঁর মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি কেবল ভাবছেন, মালেকের মনের মধ্যে কোথাও কি কোনো গভীর সন্দেহ ঢুকে গেল? সে কি সত্যিই কিছু টের পেয়েছে?
এদিকে কেবিনের বাইরে করিডোরের ঠিক কোণটায় দাঁড়িয়ে ছটফট করছে আবদুল মালেক। তার গায়ে সেই পরিচিত সিকিউরিটি গার্ডের মেরুন রঙের ইউনিফর্ম। আজ সকাল থেকে তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। গত রাতের সেই রান্নাঘরের ঘটনার পরও তার অবচেতন মন বারবার তাকে বলছিল—এই চাকরি ছেড়ে গ্রাম বা নিজের এলাকায় ফিরে যাওয়াই এই মুহূর্তে তার পরিবারের সম্মান বাঁচানোর একমাত্র উপায়। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সে আর এই নরককুণ্ডে থাকবে না। সে সরাসরি চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করে তার চাকরি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।
মালেক করিডোরে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। সে কেবিনের দরজায় দায়িত্বরত পিএকে একাধিকবার অনুরোধ করেছে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে একবার দেখা করার জন্য। কিন্তু পিএ কড়া গলায় জানিয়ে দিয়েছে—এখন বড় মিটিং চলছে, চেয়ারম্যান সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত, এখনই ভেতরে যাওয়া যাবে না।
প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে মিটিং শেষ হলো। ডিরেক্টর ও কর্মকর্তারা একে একে গম্ভীর মুখে ফাইলপত্র গুটিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
-----
কক্ষ ফাঁকা হতেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসেছিলেন। ঠিক তখনই বাইরে থেকে অনুমতি নিয়ে অত্যন্ত মলিন ও বিধ্বস্ত মুখে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল আবদুল মালেক।
মালেক সোজা এসে আলতাফ সাহেবের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। সে দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত থরথর ও গম্ভীর গলায় বলল, "স্যার... আসসালামু আলাইকুম।"
আলতাফ সাহেব চশমাটা একটু নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে মালেকের দিকে তাকালেন। তিনি একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "কী ব্যাপার, মালেক? গেটে ডিউটি না করে এভাবে কেবিনে চলে এলে কেন? আবার কোনো সমস্যা হয়েছে?"
মালেক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত শক্ত ও দ্ব্যর্থহীন গলায় বলল, "স্যার, আমি আজ এখানে ডিউটি করার জন্য বা অন্য কোনো কাজের জন্য আসেনি। আমি এসেছি আপনার কাছে একটা জরুরি কথা বলতে। আমি এই চাকরিটা আর করব না, স্যার। আমি আজকেই আমার পদত্যাগপত্র জমা দিতে চাই। আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।"
কথাটা শোনার পর আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ছাঁৎ করে উঠল! তিনি চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মালেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী বললে? চাকরি ছাড়বে মানে কী? মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে তোমার, মালেক? হঠাৎ করে তোমার কী হলো যে এমন একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে?"
মালেক মাথা নিচু করে রইল। তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে। সে খুব ঠান্ডা অথচ থমথমে গলায় বলল, "না স্যার, আমার মাথা ঠিক আছে। আমি অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই কোম্পানিতে আর এক দিনও কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"
আলতাফ সাহেব একটু সামলে নিয়ে নিজের কর্পোরেট কণ্ঠস্বরটাকে আরও গম্ভীর করে বললেন, "কারণটা কী, মালেক? হঠাৎ করে এভাবে চাকরি ছাড়ার পেছনে তো একটা যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। কোম্পানির কি বেতনে কোনো সমস্যা হচ্ছে? নাকি কেউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? খুলে বলো আমাকে।"
মালেক মুখ তুলে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর হতাশা পরিষ্কার ফুটে উঠছিল। সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলল, "স্যারের কাছে আমার কোনো লুকোচুরি নেই। কেন চাকরি ছাড়ছি, সেই কারণটা আমি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারব না, স্যার। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার ঘরের ভেতরে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমার স্ত্রীর নৈতিক স্খলন ঘটেছে বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে বা এমন কিছু ঘটে চলেছে যা একজন স্বামীর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। আমি আমার বউকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চিরদিনের জন্য গ্রামে চলে যাচ্ছি। এই শহরে আর এক মুহূর্তও আমি থাকতে চাই না।"
------
‘নৈতিক স্খলন’ আর ‘গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার’ কথাটা যখন মালেকের মুখ থেকে বের হলো, তখন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথার ভেতর যেন একটা বিশাল বোমা ফেটে গেল! তিনি তো খুব ভালো করেই জানেন যে সেই নৈতিক স্খলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুটি আর কেউ নয়, খোদ তিনি নিজে!
আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এল। তিনি উপলব্ধি করলেন, মালেক যদি ইতিকে নিয়ে গ্রামে চলে যায়, তবে তিনি তাঁর জীবনের এই একমাত্র নেশা, একমাত্র আসক্তি—ইতিকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলবেন! ইতির সেই খোলামেলা শরীর, তার মায়াবী হাসি, তার ছোঁয়া—সবকিছু এক নিমিষে তাঁর জীবন থেকে মুছে যাবে। এই চিন্তাটাই তাঁর ষাট বছরের জীবনে কখনো না আসা এক অচেনা আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি করল।
আলতাফ সাহেব নিজের ভেতরের সেই প্যানিক বা ভয়টাকে কোনোমতে লুকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের সামনে এলেন এবং খুব স্নেহের ও ভনিতার সুরে মালেকের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "আরে মালেক! মাথা এত গরম করছ কেন বাবা? একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবো।"
মালেক একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, "না স্যার, ভেবেই বলছি। আমার আর এই শহরে থাকার ইচ্ছে নেই।"
আলতাফ সাহেব মরিয়া হয়ে মালেককে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, "শোনো, শোনো! একটা মানুষের জীবনে পারিবারিক ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা টেনশন থাকতেই পারে। তাই বলে একটা ভালো চাকরি এভাবে হুট করে ছেড়ে দিতে হয় নাকি? তুমি আমাদের পুরোনো ও বিশ্বস্ত কর্মী। তোমার কাজের প্রতি আমার অনেক ভরসা আছে। এক কাজ করো—তোমার বর্তমান বেতন তো অনেক কম, আজ থেকে তোমার বেতন বাড়িয়ে একদম পনেরো হাজার (১৫০০০) টাকা করে দিচ্ছি! বল্টু বা অ্যাকাউন্টসকে আমি এখনই বলে দিচ্ছি। আর কোনো সমস্যা থাকবে?"
কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজের মুখে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের বেতন এক লাফে এত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন—এটা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু মালেকের কাছে টাকা বা বেতনের চেয়ে তার নিজের সম্মান এবং মনের ভেতর জমে থাকা সন্দেহটা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মালেক মাথা নেড়ে শক্ত গলায় বলল, "টাকার জন্য আমি চাকরি ছাড়ছি না, স্যার। আমার বেতনের বা টাকার কোনো লোভ নেই। আমার ঘরের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সেখানে টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, স্যার। আমি আজকেই আমার শেষ দিন হিসেবে ধরে নিচ্ছি।"
আলতাফ সাহেব দেখলেন টাকা দিয়েও এই বোকা গার্ডটাকে আটকানো যাচ্ছে না। তখন তিনি একটু সুর নরম করে নরম গলায় বললেন, "মালেক, এভাবে রাগ করে হঠকারী সিদ্ধান্ত কোরো না। তুমি একটু বাড়ি যাও, ঠান্ডা মাথায় দুদিন ভেবে দেখো। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত এক রাতে নিতে হয় না। তুমি যাও, গিয়ে ভালো করে চিন্তা করো, তারপর আমাকে জানিও।"
মালেক দেখল চেয়ারম্যান সাহেব যখন বারবার অনুরোধ করছেন, তখন সে আর মুখের ওপর না বলতে পারল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল, "আচ্ছা স্যার... আপনি যখন বলছেন, তখন আমি বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভেবে দেখব। তবে আমার মনের অবস্থা আপনি বুঝছেন না।"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি ভেবে দেখো। যাও এখন নিজের ডিউটিতে ফেরো," আলতাফ সাহেব কোনোমতে তাকে রুম থেকে বিদায় করলেন।
-----
মালেক কেবিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর হাত কাঁপতে শুরু করল। তিনি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। নিজের টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটা তুলে সাথে সাথে ইতির নাম্বারে ডায়াল করলেন।
রিং হওয়ার দুই সেকেন্ডের মাথায় ওপাশ থেকে অত্যন্ত দ্রুত ও ছটফটে গলায় ইতির মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"হ্যালো! স্যার! এত তাড়াতাড়ি ফোন করলেন যে? আজ মিটিং ছিল না?"
আলতাফ সাহেবের গলা কাঁপছিল। তিনি কোনো রাখঢাক না করে একেবারে হাপাতে হাপাতে বললেন, "মিটিংয়ের কথা বাদ দাও, ইতি! আজ এক অদ্ভুত মারাত্মক বিপদ চলে এসেছে মাথা ওপর দিয়ে!"
ওপাশে ইতি একটু অবাক হয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "বিপদ? আবার কী বিপদ হলো, স্যার?"
আলতাফ সাহেব রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "তোমার ওই স্বামী—মালেক একটু আগে আমার কেবিনে এসে হাজির হয়েছিল। সে সরাসরি আমার মুখের ওপর বলে গেছে যে সে এই চাকরি ছেড়ে দেবে এবং তোমাকে নিয়ে সোজা গ্রামে চলে যাবে! সে নাকি সন্দেহ করছে যে তোমার নৈতিক স্খলন ঘটেছে!"
কথাটা শোনার পর ইতি কিন্তু বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং তার মুখের ভেতর এক চিলতে রহস্যময় ও ধূর্ত হাসি খেলে গেল। সে খুব শান্ত ও আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল, "ওমা! তাই নাকি? আমার স্বামী বুঝি এত বড় বাহাদুর হয়ে গেছে যে চাকরি ছেড়ে আমাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে?"
আলতাফ সাহেব ব্যাকুল হয়ে বললেন, "এতে তোমার হাসি পাচ্ছে, ইতি? ও যদি তোমাকে গ্রামে নিয়ে চলে যায়, আমি তো তোমাকে আর দেখতে পাব না! আমি তোমায় ছাড়া বাঁচব না, ইতি! আমি মরে যাব! আমি তো একটু আগে ওকে আটকে রাখার জন্য বেতন বাড়িয়ে পনেরো হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছি, কিন্তু ও বলল ভেবে দেখবে। তুমি যেকোনো মূল্যে এই গ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনা বন্ধ করো, ইতি!"
ইতি তখন আরও একটু উস্কানিমূলক ও নাটকীয় সুরে বলল, "আহা রে! আমার জন্য আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেবের কলিজা এত কাঁপছে দেখে আমার তো বুক জুড়িয়ে যাচ্ছে! কিন্তু আপনি কি ভুলে গেছেন, স্যার? মালেক তো আইনগতভাবে আমার স্বামী। সে যা বলবে, সমাজের নিয়মে আমাকে তো তার সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে। সে যদি জোর করে আমাকে টেম্পোতে তুলে গ্রামে নিয়ে যায়, আমি তো অসহায়, তাই না?"
-----
আলতাফ সাহেব তখন পুরোপুরি দিশেহারা। তাঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত কর্পোরেট ক্ষমতা যেন এই একটিমাত্র নারীর কাছে এসে ধুলায় মিশে গেছে। তিনি প্রায় আর্তনাদ করার মতো গলায় বললেন, "না, ইতি! আমি তোমাকে কোনোভাবেই ওই মালেকের কাছে হারিয়ে যেতে দিতে পারব না। তুমি আমার! শুধু আমার! বলো, আমি কী করলে তুমি এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবে না? আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?"
ইতি তখন আলতাফ সাহেবের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে আরও বেশি করে নিজের জালে জড়িয়ে ফেলার জন্য এক মারাত্মক চাল চালল। সে ফোনের ওপাশ থেকে নিজের গলায় এক মাদক ও উস্কানিমূলক সুর এনে ফিসফিস করে বলল, "কী করতে পারেন, সেটা কি আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে, স্যার? আপনি তো নিজেকে খুব ক্ষমতাধর পুরুষ বলে মনে করেন, কোটি কোটি টাকার মালিক বলেন। অথচ সামান্য একজন সিকিউরিটি গার্ডের হাত থেকে তার স্ত্রীকে নিজের করে নেওয়ার সাহস আপনার নেই?"
আলতাফ সাহেব চমকে গিয়ে বললেন, "এর মানে কী, ইতি?"
ইতি একটু পৈশাচিক ও মিষ্টি হেসে অত্যন্ত প্রলুব্ধকারী গলায় বলল, "এর মানে হলো—আপনি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকেন, যদি আমাকে ছাড়া আপনার এক মুহূর্তও না চলে, তবে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসার কথা বললে চলবে না, স্যার। আপনাকে আপনার ভালোবাসার চরম প্রমাণ দিতে হবে।'
আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ইতির এই কথা শোনার পর এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী তাঁকে দিয়ে এমন এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইন্ধন জোগাচ্ছে, যা থেকে আর ফিরে আসার কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু ইতির প্রতি তাঁর সেই অন্ধ ও সর্বগ্রাসী লালসা তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় প্রতিজ্ঞা করার সুরে বললেন, "ঠিক আছে, ইতি... তুমি যখন চাচ্ছ, তখন আমি তাই করব। তোমার প্রতি আমার আসক্তি প্রমাণ করে দেখাবো। তুমি একটুও চিন্তা কোরো না, তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো।"
ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে ইতি তখন এক চিলতে বিজয়ী ও পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। সে খুব ভালো করেই জানল যে সে তার চতুর বুদ্ধিমত্তায় দুই পুরুষকে কীভাবে নিজের হাতের পুতুলের মতো নাচিয়ে চলেছে। (চলবে)
মতিঝিলের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিন। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ কাঁচের জানলা ভেদ করে এসির ঠান্ডা বাতাসেও যেন এক অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরম তৈরি করেছে। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের চারপাশে তখন বড় বড় কর্পোরেট ডিরেক্টর ও কোম্পানির তিন উর্ধতন কর্মকর্তা বসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল মিটিংয়ে ব্যস্ত।
টেবিলের ওপর ছড়ানো নানা রকমের ব্যালেন্স শিট, প্রফিট-লস স্টেটমেন্ট আর প্রজেক্টের ফাইল। কিন্তু কোম্পানির এই সর্বেসর্বা মালিক, ষাটোর্ধ আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মন আজকের এই কোটি টাকার মিটিংয়ে বিন্দুমাত্র নেই। তাঁর সমস্ত চেতনা আর মনোযোগ আটকে রয়েছে অন্য কোথাও। গত রাতের সেই অদ্ভুত নাটক, রান্নাঘরে ইতির ভেষজ ক্বাথ তৈরি, মালেকের সেই সন্দেহপ্রবণ চাহনি—সবকিছু তাঁর মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি কেবল ভাবছেন, মালেকের মনের মধ্যে কোথাও কি কোনো গভীর সন্দেহ ঢুকে গেল? সে কি সত্যিই কিছু টের পেয়েছে?
এদিকে কেবিনের বাইরে করিডোরের ঠিক কোণটায় দাঁড়িয়ে ছটফট করছে আবদুল মালেক। তার গায়ে সেই পরিচিত সিকিউরিটি গার্ডের মেরুন রঙের ইউনিফর্ম। আজ সকাল থেকে তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। গত রাতের সেই রান্নাঘরের ঘটনার পরও তার অবচেতন মন বারবার তাকে বলছিল—এই চাকরি ছেড়ে গ্রাম বা নিজের এলাকায় ফিরে যাওয়াই এই মুহূর্তে তার পরিবারের সম্মান বাঁচানোর একমাত্র উপায়। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সে আর এই নরককুণ্ডে থাকবে না। সে সরাসরি চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করে তার চাকরি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।
মালেক করিডোরে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। সে কেবিনের দরজায় দায়িত্বরত পিএকে একাধিকবার অনুরোধ করেছে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে একবার দেখা করার জন্য। কিন্তু পিএ কড়া গলায় জানিয়ে দিয়েছে—এখন বড় মিটিং চলছে, চেয়ারম্যান সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত, এখনই ভেতরে যাওয়া যাবে না।
প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে মিটিং শেষ হলো। ডিরেক্টর ও কর্মকর্তারা একে একে গম্ভীর মুখে ফাইলপত্র গুটিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
-----
কক্ষ ফাঁকা হতেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসেছিলেন। ঠিক তখনই বাইরে থেকে অনুমতি নিয়ে অত্যন্ত মলিন ও বিধ্বস্ত মুখে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল আবদুল মালেক।
মালেক সোজা এসে আলতাফ সাহেবের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। সে দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত থরথর ও গম্ভীর গলায় বলল, "স্যার... আসসালামু আলাইকুম।"
আলতাফ সাহেব চশমাটা একটু নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে মালেকের দিকে তাকালেন। তিনি একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "কী ব্যাপার, মালেক? গেটে ডিউটি না করে এভাবে কেবিনে চলে এলে কেন? আবার কোনো সমস্যা হয়েছে?"
মালেক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত শক্ত ও দ্ব্যর্থহীন গলায় বলল, "স্যার, আমি আজ এখানে ডিউটি করার জন্য বা অন্য কোনো কাজের জন্য আসেনি। আমি এসেছি আপনার কাছে একটা জরুরি কথা বলতে। আমি এই চাকরিটা আর করব না, স্যার। আমি আজকেই আমার পদত্যাগপত্র জমা দিতে চাই। আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।"
কথাটা শোনার পর আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ছাঁৎ করে উঠল! তিনি চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মালেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী বললে? চাকরি ছাড়বে মানে কী? মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে তোমার, মালেক? হঠাৎ করে তোমার কী হলো যে এমন একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে?"
মালেক মাথা নিচু করে রইল। তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে। সে খুব ঠান্ডা অথচ থমথমে গলায় বলল, "না স্যার, আমার মাথা ঠিক আছে। আমি অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই কোম্পানিতে আর এক দিনও কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"
আলতাফ সাহেব একটু সামলে নিয়ে নিজের কর্পোরেট কণ্ঠস্বরটাকে আরও গম্ভীর করে বললেন, "কারণটা কী, মালেক? হঠাৎ করে এভাবে চাকরি ছাড়ার পেছনে তো একটা যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। কোম্পানির কি বেতনে কোনো সমস্যা হচ্ছে? নাকি কেউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? খুলে বলো আমাকে।"
মালেক মুখ তুলে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর হতাশা পরিষ্কার ফুটে উঠছিল। সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলল, "স্যারের কাছে আমার কোনো লুকোচুরি নেই। কেন চাকরি ছাড়ছি, সেই কারণটা আমি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারব না, স্যার। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার ঘরের ভেতরে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমার স্ত্রীর নৈতিক স্খলন ঘটেছে বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে বা এমন কিছু ঘটে চলেছে যা একজন স্বামীর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। আমি আমার বউকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চিরদিনের জন্য গ্রামে চলে যাচ্ছি। এই শহরে আর এক মুহূর্তও আমি থাকতে চাই না।"
------
‘নৈতিক স্খলন’ আর ‘গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার’ কথাটা যখন মালেকের মুখ থেকে বের হলো, তখন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথার ভেতর যেন একটা বিশাল বোমা ফেটে গেল! তিনি তো খুব ভালো করেই জানেন যে সেই নৈতিক স্খলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুটি আর কেউ নয়, খোদ তিনি নিজে!
আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এল। তিনি উপলব্ধি করলেন, মালেক যদি ইতিকে নিয়ে গ্রামে চলে যায়, তবে তিনি তাঁর জীবনের এই একমাত্র নেশা, একমাত্র আসক্তি—ইতিকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলবেন! ইতির সেই খোলামেলা শরীর, তার মায়াবী হাসি, তার ছোঁয়া—সবকিছু এক নিমিষে তাঁর জীবন থেকে মুছে যাবে। এই চিন্তাটাই তাঁর ষাট বছরের জীবনে কখনো না আসা এক অচেনা আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি করল।
আলতাফ সাহেব নিজের ভেতরের সেই প্যানিক বা ভয়টাকে কোনোমতে লুকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের সামনে এলেন এবং খুব স্নেহের ও ভনিতার সুরে মালেকের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "আরে মালেক! মাথা এত গরম করছ কেন বাবা? একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবো।"
মালেক একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, "না স্যার, ভেবেই বলছি। আমার আর এই শহরে থাকার ইচ্ছে নেই।"
আলতাফ সাহেব মরিয়া হয়ে মালেককে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, "শোনো, শোনো! একটা মানুষের জীবনে পারিবারিক ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা টেনশন থাকতেই পারে। তাই বলে একটা ভালো চাকরি এভাবে হুট করে ছেড়ে দিতে হয় নাকি? তুমি আমাদের পুরোনো ও বিশ্বস্ত কর্মী। তোমার কাজের প্রতি আমার অনেক ভরসা আছে। এক কাজ করো—তোমার বর্তমান বেতন তো অনেক কম, আজ থেকে তোমার বেতন বাড়িয়ে একদম পনেরো হাজার (১৫০০০) টাকা করে দিচ্ছি! বল্টু বা অ্যাকাউন্টসকে আমি এখনই বলে দিচ্ছি। আর কোনো সমস্যা থাকবে?"
কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজের মুখে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের বেতন এক লাফে এত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন—এটা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু মালেকের কাছে টাকা বা বেতনের চেয়ে তার নিজের সম্মান এবং মনের ভেতর জমে থাকা সন্দেহটা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মালেক মাথা নেড়ে শক্ত গলায় বলল, "টাকার জন্য আমি চাকরি ছাড়ছি না, স্যার। আমার বেতনের বা টাকার কোনো লোভ নেই। আমার ঘরের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সেখানে টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, স্যার। আমি আজকেই আমার শেষ দিন হিসেবে ধরে নিচ্ছি।"
আলতাফ সাহেব দেখলেন টাকা দিয়েও এই বোকা গার্ডটাকে আটকানো যাচ্ছে না। তখন তিনি একটু সুর নরম করে নরম গলায় বললেন, "মালেক, এভাবে রাগ করে হঠকারী সিদ্ধান্ত কোরো না। তুমি একটু বাড়ি যাও, ঠান্ডা মাথায় দুদিন ভেবে দেখো। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত এক রাতে নিতে হয় না। তুমি যাও, গিয়ে ভালো করে চিন্তা করো, তারপর আমাকে জানিও।"
মালেক দেখল চেয়ারম্যান সাহেব যখন বারবার অনুরোধ করছেন, তখন সে আর মুখের ওপর না বলতে পারল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল, "আচ্ছা স্যার... আপনি যখন বলছেন, তখন আমি বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভেবে দেখব। তবে আমার মনের অবস্থা আপনি বুঝছেন না।"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি ভেবে দেখো। যাও এখন নিজের ডিউটিতে ফেরো," আলতাফ সাহেব কোনোমতে তাকে রুম থেকে বিদায় করলেন।
-----
মালেক কেবিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর হাত কাঁপতে শুরু করল। তিনি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। নিজের টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটা তুলে সাথে সাথে ইতির নাম্বারে ডায়াল করলেন।
রিং হওয়ার দুই সেকেন্ডের মাথায় ওপাশ থেকে অত্যন্ত দ্রুত ও ছটফটে গলায় ইতির মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"হ্যালো! স্যার! এত তাড়াতাড়ি ফোন করলেন যে? আজ মিটিং ছিল না?"
আলতাফ সাহেবের গলা কাঁপছিল। তিনি কোনো রাখঢাক না করে একেবারে হাপাতে হাপাতে বললেন, "মিটিংয়ের কথা বাদ দাও, ইতি! আজ এক অদ্ভুত মারাত্মক বিপদ চলে এসেছে মাথা ওপর দিয়ে!"
ওপাশে ইতি একটু অবাক হয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "বিপদ? আবার কী বিপদ হলো, স্যার?"
আলতাফ সাহেব রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "তোমার ওই স্বামী—মালেক একটু আগে আমার কেবিনে এসে হাজির হয়েছিল। সে সরাসরি আমার মুখের ওপর বলে গেছে যে সে এই চাকরি ছেড়ে দেবে এবং তোমাকে নিয়ে সোজা গ্রামে চলে যাবে! সে নাকি সন্দেহ করছে যে তোমার নৈতিক স্খলন ঘটেছে!"
কথাটা শোনার পর ইতি কিন্তু বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং তার মুখের ভেতর এক চিলতে রহস্যময় ও ধূর্ত হাসি খেলে গেল। সে খুব শান্ত ও আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল, "ওমা! তাই নাকি? আমার স্বামী বুঝি এত বড় বাহাদুর হয়ে গেছে যে চাকরি ছেড়ে আমাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে?"
আলতাফ সাহেব ব্যাকুল হয়ে বললেন, "এতে তোমার হাসি পাচ্ছে, ইতি? ও যদি তোমাকে গ্রামে নিয়ে চলে যায়, আমি তো তোমাকে আর দেখতে পাব না! আমি তোমায় ছাড়া বাঁচব না, ইতি! আমি মরে যাব! আমি তো একটু আগে ওকে আটকে রাখার জন্য বেতন বাড়িয়ে পনেরো হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছি, কিন্তু ও বলল ভেবে দেখবে। তুমি যেকোনো মূল্যে এই গ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনা বন্ধ করো, ইতি!"
ইতি তখন আরও একটু উস্কানিমূলক ও নাটকীয় সুরে বলল, "আহা রে! আমার জন্য আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেবের কলিজা এত কাঁপছে দেখে আমার তো বুক জুড়িয়ে যাচ্ছে! কিন্তু আপনি কি ভুলে গেছেন, স্যার? মালেক তো আইনগতভাবে আমার স্বামী। সে যা বলবে, সমাজের নিয়মে আমাকে তো তার সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে। সে যদি জোর করে আমাকে টেম্পোতে তুলে গ্রামে নিয়ে যায়, আমি তো অসহায়, তাই না?"
-----
আলতাফ সাহেব তখন পুরোপুরি দিশেহারা। তাঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত কর্পোরেট ক্ষমতা যেন এই একটিমাত্র নারীর কাছে এসে ধুলায় মিশে গেছে। তিনি প্রায় আর্তনাদ করার মতো গলায় বললেন, "না, ইতি! আমি তোমাকে কোনোভাবেই ওই মালেকের কাছে হারিয়ে যেতে দিতে পারব না। তুমি আমার! শুধু আমার! বলো, আমি কী করলে তুমি এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবে না? আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?"
ইতি তখন আলতাফ সাহেবের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে আরও বেশি করে নিজের জালে জড়িয়ে ফেলার জন্য এক মারাত্মক চাল চালল। সে ফোনের ওপাশ থেকে নিজের গলায় এক মাদক ও উস্কানিমূলক সুর এনে ফিসফিস করে বলল, "কী করতে পারেন, সেটা কি আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে, স্যার? আপনি তো নিজেকে খুব ক্ষমতাধর পুরুষ বলে মনে করেন, কোটি কোটি টাকার মালিক বলেন। অথচ সামান্য একজন সিকিউরিটি গার্ডের হাত থেকে তার স্ত্রীকে নিজের করে নেওয়ার সাহস আপনার নেই?"
আলতাফ সাহেব চমকে গিয়ে বললেন, "এর মানে কী, ইতি?"
ইতি একটু পৈশাচিক ও মিষ্টি হেসে অত্যন্ত প্রলুব্ধকারী গলায় বলল, "এর মানে হলো—আপনি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকেন, যদি আমাকে ছাড়া আপনার এক মুহূর্তও না চলে, তবে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসার কথা বললে চলবে না, স্যার। আপনাকে আপনার ভালোবাসার চরম প্রমাণ দিতে হবে।'
আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ইতির এই কথা শোনার পর এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী তাঁকে দিয়ে এমন এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইন্ধন জোগাচ্ছে, যা থেকে আর ফিরে আসার কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু ইতির প্রতি তাঁর সেই অন্ধ ও সর্বগ্রাসী লালসা তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় প্রতিজ্ঞা করার সুরে বললেন, "ঠিক আছে, ইতি... তুমি যখন চাচ্ছ, তখন আমি তাই করব। তোমার প্রতি আমার আসক্তি প্রমাণ করে দেখাবো। তুমি একটুও চিন্তা কোরো না, তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো।"
ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে ইতি তখন এক চিলতে বিজয়ী ও পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। সে খুব ভালো করেই জানল যে সে তার চতুর বুদ্ধিমত্তায় দুই পুরুষকে কীভাবে নিজের হাতের পুতুলের মতো নাচিয়ে চলেছে। (চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)