13-08-2026, 07:03 AM
## পঞ্চদশ পর্ব
পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি ও সংকীর্ণ গলির ল্যাম্পপোস্টের ঝাপসা আলোর নিচে তখন এক চরম থমথমে ও বরফশীতল পরিবেশ বিরাজ করছে। বাতাসে যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাস্তার পাশে পার্ক করা সিলভার সেডান গাড়িটার ঠিক পাশেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যটি আবদুল মালেকের চোখের সামনে এমন এক ধাক্কা দিয়েছে যে তার ভেতরের সমস্ত পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে।
ক্লান্ত শরীর আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে বাড়ি ফেরা একজন স্বামী তার নিজের বাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে দেখল যে, তার কোম্পানির চেয়ারম্যান—যাকে সে দেবতার মতো ভক্তি করে, আর তার নববিবাহিতা স্ত্রী—যাকে সে নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে—তারা দুজন গভীর রাতে এমন এক অন্তরঙ্গ ও খোলামেলা চুম্বনে মগ্ন!
মালেকের মুখ দিয়ে কেবল অবিশ্বাসের সুরে বেরিয়ে এসেছিল—*"ইতি!"*
সেই একটিমাত্র শব্দে রাতের বাতাস যেন কেঁপে উঠেছিল। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী এবং ইতি—দুজনেই এমনভাবে থতমত খেয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল, যেন তারা হাতেনাতে কোনো অপরাধের দায়ে ধরা পড়ে গেছে। আলতাফ সাহেবের ফর্সা ও শক্তপোক্ত মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি তো এত বড় একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান, কর্পোরেট দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি—আজ একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের সামনে এমন অপ্রস্তুত ও অপরাধী অবস্থায় পড়তে হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।
আর ইতির কথা তো বলাই বাহুল্য। তার ভেতরকার ধূর্ত ও প্রখর বুদ্ধি তখন ১০০ মাইলের গতিতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে এই মুহূর্তে যদি সে কোনো ভুল করে বা সত্য স্বীকার করে, তবে শুধু তার সংসারটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে না, বরং মালেকের অন্ধ বিশ্বাস চিরতরে শেষ হয়ে যাবে এবং একটা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যাবে। তাই এক সেকেন্ডের জন্যও সময় নষ্ট না করে ইতি তার মনের ভেতরকার সমস্ত অভিনয় দক্ষতা ও চতুরতাকে এক জায়গায় এনে এক মাস্টারপিস মিথ্যাচারের জাল বুনতে শুরু করল।
-----
মালেক যখন বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ দুটো বড় বড় করে পা কাঁপাতে কাঁপাতে সামনে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ইতি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে দৌড়ে স্বামীর কাছে গিয়ে পৌঁছাল। সে মালেকের হাত দুটো এক মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল।
ইতির মুখে তখন কোনো ভয়ের ছাপ নেই, বরং তার চোখে মুখে ছিল এক কৃত্রিম উদ্বেগ ও ভয়ের দারুণ এক অভিব্যক্তি। সে এমনভাবে হাঁপাতে শুরু করল, যেন সে নিজে কোনো মারাত্মক বিপদের মধ্য দিয়ে গেছে।
ইতি একটু উচুঁ গলায়, কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয় ও উদ্বেগের সুরে বলে উঠল, "মালেক! তুমি এতক্ষণে এলে? আল্লাহর দোহাই লাগে, তাড়াতাড়ি করো! এসো, তাড়াতাড়ি ধরো স্যারকে!"
মালেক থমকে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে ইতির দিকে তাকিয়ে খাবি খাওয়া গলায় বলল, "ইতি... এ... এগুলো কী হচ্ছিল এখানে? আমি নিজের চোখে দেখলাম..."
"কীসব আজেবাজে বকছ!" ইতি মালেককে কথা শেষ করতে দিল না। সে কৃত্রিম রাগের সুরে ও অত্যন্ত চতুরতার সাথে বানিয়ে বানিয়ে বলতে শুরু করল, "মালেক, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে নাকি! আসার পথে একটু ভালো করে দেখতে পারো না? একটু আগে হঠাৎ করে স্যারের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল! উনার বুকটা কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম যে মানুষটা বুঝি এই পথেই মারা যান! উনি তখন কথাই বলতে পারছিলেন না, তাই আমি জল মুখে দিয়ে স্যারের মুখে মুখ লাগিয়ে একটু কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, যাতে উনার বুকটা একটু হালকা হয়! আর তুমি এসে উল্টাপাল্টা ভাবছ?"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি কর্পোরেট দুনিয়ায় এত বছর ধরে হাজারো কঠিন পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলিয়েছেন—তিনি ইতির এই বুদ্ধিমত্তা ও চতুর অভিনয় দেখে মনে মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি পেলেন। তিনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ ইতির সাথে সুর মেলালেন।
আলতাফ সাহেব নিজের বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে এমনভাবে জাঁকিয়ে একটা কাসুনি দিলেন—*মালেক! খিক-খিক!*—যেন তাঁর সত্যিই দম আটকে আসছে এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। তিনি কাঁপাকাঁপা ও রূঢ় গলায় বললেন, "মালেক... বাছা রে... আমার বুকটা... উফ! মনে হচ্ছে এখুনি আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে! একটু বাতাসে দম আটকে আসছিল... তোমার বউ তোমায় দেখে ভালোই হয়েছে, জলদি আমাকে একটু ঘরের ভেতরে নিয়ে চলো, বাবা! আমার বড় কষ্ট হচ্ছে!"
-----
মালেক হলো এমন একজন মানুষ, যার অন্তরে আলতাফ সাহেবের প্রতি অন্ধ ভক্তি ও বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে। সে এত বছর ধরে দেখে এসেছে এই মানুষটিই তাদের অন্নদাতা। তাই ইতি যখন এত জোড় দিয়ে শ্বাসকষ্টের কথা বলল, আর খোদ চেয়ারম্যান সাহেব যখন নিজে বুকে হাত দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই কথা সমর্থন করলেন, তখন মালেকের সরল ও অবুঝ মনে সামান্যতম সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না।
সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে একটু আগে নিজের চোখে কী দেখেছে। তার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ ও অভিমান এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে তার জায়গায় জমা হলো এক গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
মালেক দ্রুত এগিয়ে এসে আলতাফ সাহেবের অন্য হাতটি নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠল, "ওহ্ খোদা! স্যারের আবার এমন অ্যাটাক হলো কেন? দাঁড়ান স্যার, আমি ধরে নিয়ে যাচ্ছি। ইতি, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো!"
ইতি তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে চাবি বের করে ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে দিল। তারা দুজনে মিলে আলতাফ সাহেবকে ধরে সোজা ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। ড্রয়িংরুমের সেই পুরোনো, জীর্ণ সোফাটায় আলতাফ সাহেবকে অত্যন্ত সাবধানে বসিয়ে দেওয়া হলো।
আলতাফ সাহেব সোফায় বসে নিজের কপাল ও গলার ঘাম মুছতে মুছতে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে দেখলে যে কেউ সত্যি সত্যি বিশ্বাস করবে তিনি কোনো মারাত্মক শারীরিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
মালেক খুব বিচলিত হয়ে সোফার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে কচলাতে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, "স্যার, আপনার শরীরটা এখন কেমন লাগছে বলুন তো? আমি কি ডাক্তার ডাকব? কিংবা কোনো ইনহেলার বা ওষুধ আনব?"
আলতাফ সাহেব বুকে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ গলায় বললেন, "না... ডাক্তার এখনই লাগবে না, মালেক। একটু... একটু জল দাও তো বাবা। বুকে বড় চাপ লাগছে।"
ইতি সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে দ্রুত এক গ্লাস ঠান্ডা জল এনে আলতাফ সাহেবের হাতে দিল। আলতাফ সাহেব সেই গ্লাসের জল এক চুমুকে শেষ করে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
------
জল খাওয়ার পর আলতাফ সাহেবের মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা কিছুটা কাটল বটে, তবে তিনি অভিনয় বজায় রেখে আগের মতোই দুর্বলভাবে সোফায় এলিয়ে বসে রইলেন।
ইতি তখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। সে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে খুব উদ্বেগের সুরে বলল, "মালেক, শুধু জল খেলে তো হবে না। স্যারের বুকে যে টান ধরা ভাবটা দেখছি, উনার এখনো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমাদের গলি থেকে মোড়ের ওই বড় ফার্মেসিটা তো এখনো খোলা আছে। তুমি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ফার্মেসি থেকে স্যারের জন্য শ্বাসকষ্টের একটা ভালো কিছু ওষুধ নিয়ে এসো তো!"
মালেক একটুও দেরি করল না। সে মনিবের এই চরম অসুস্থতার খবর শুনে পুরোপুরি বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সে তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখুনি যাচ্ছি ইতি! এক মিনিটও দেরি করব না।"
বলেই মালেক আর এক মুহূর্ত কেবিনের ভেতরে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে দরজাটা একটু টেনে দিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল—ফার্মেসি থেকে ওষুধ আনার জন্য সে তখন পুরোপুরি অন্ধের মতো ছুটে চলেছে।
----
মালেকের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে নিচে মিলিয়ে যাওয়ার শব্দটুকু পেতেই—*কটকট* করে সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের বাতাসটা হঠাৎ করেই পুরো বদলে গেল।
সোফায় বসা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর অসুস্থতার সেই ভান করা দুর্বলতা মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল। তাঁর চোখের ভেতর তখন ফুটে উঠল এক তীব্র, আদিম ও সর্বগ্রাসী কামনার আগুন। তিনি এক ঝটকায় সোজা হয়ে সোফায় বসে পড়লেন।
আর ইতি? সে দরজার ছিটকানিটা ভালোভাবে আটকে দিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন তার মুখের সেই উদ্বেগের নাটকীয় ভান পুরোপুরি উধাও। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক বিজয়ী, ধূর্ত ও দুষ্টুমিভরা হাসি।
ইতি আলতাফ সাহেবের খুব কাছে এগিয়ে এল। সে খিলখিল করে হেসে ফিসফিস করে বলল, "কী দারুণ অভিনয়টাই না করলাম, স্যার! দেখলেন তো? আস্ত একটা বাঘের মুখ থেকে কীভাবে শিকার ছিনিয়ে আনলাম বলুন তো?"
আলতাফ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোফা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের দুই শক্তিশালী হাত দিয়ে ইতিকে সোজা নিজের কোলে তুলে নিলেন!
ইতি মৃদু একটা চকিত শব্দ করে আলতাফ সাহেবের গলায় নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে আলতাফ সাহেবের কোলের ওপর একপাশে বসে ফিসফিস করে বলল, "ওরে বাবা! এত শক্তি আপনার কোথায় লুকিয়ে থাকে, স্যার? একটু আগে তো মনে হচ্ছিল আপনি সত্যিই মারা যাচ্ছেন!"
আলতাফ সাহেব ইতির নরম চিবুকটা নিজের এক হাতে শক্ত করে ধরে অত্যন্ত উত্তাল ও পাগলপারা গলায় বললেন, "তুমি যা বুদ্ধি খাটিয়েছ, ইতি—তাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ এক মুহূর্তে টেকে গেছে! তুমি আস্ত একটা জাদুকরী মেয়ে! এখন বলো, ওই বোকা গার্ডটাকে তো বাইরে পাঠিয়ে দিলে, আর কতক্ষণ সময় আছে আমাদের হাতে?"
ইতি তার চোখের চাউনি আরও একটু মাদক করে, ব্লাউজের ভাঁজে হাত রেখে আলতাফ সাহেবের বুকের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "সময় বেশিক্ষণ নেই, মালেক ওষুধ নিয়ে ফিরে আসতে বড় জোর দশ মিনিট লাগবে। দেখি আপনি কিভাবে কাজে লাগান, স্যার!"
-----
আর কোনো কথা নয়। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী আর ইতি—দুজনেই যেন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে রাজি ছিল না। একটু আগে গলির মোড়ে যে অসম্পূর্ণ চুম্বনটুকু মালেকের উপস্থিতির কারণে থমকে গেছিল, সেই ক্ষোভ, সেই ভয় আর সেই লুকিয়ে থাকা উত্তেজনার সমস্ত বহিঃপ্রকাশ যেন এই দশ মিনিটের ছোট্ট পরিসরে ঘটে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।
আলতাফ সাহেব নিজের মুখটা একেবারে নামিয়ে এনে ইতির সেই লালচে ও আকর্ষণীয় ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরলেন।
সে এক অত্যন্ত পাগলাটে, হিংস্র ও ব্যাকুল চুম্বন। ইতিও বিন্দুমাত্র পিছু হটল না; সেও আলতাফ সাহেবের শার্টের কলার খামচে ধরে, নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সেই চুম্বনের চরম প্রতিদান দিতে শুরু করল। তাদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের ঘর্ষণে রুমের ভেতরে এক অদ্ভুত কামোদ্দীপক শব্দের সৃষ্টি হলো। দুজন মানুষ যেন এই দুনিয়ার সমস্ত নিয়ম, সমস্ত পাপ-পুণ্য এবং সমস্ত ভয়ের সীমানা ছাড়িয়ে একে অপরের ঠোঁটের ভেতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেল।
বাইরে তখন গভীর রাতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়ে আসছে, গলির মোড় দিয়ে মালেকের ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে তখন বইছে এক নিষিদ্ধ ও সর্বনাশা উন্মাদনার ঝড়—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা বাকি নেই। (চলবে)
পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি ও সংকীর্ণ গলির ল্যাম্পপোস্টের ঝাপসা আলোর নিচে তখন এক চরম থমথমে ও বরফশীতল পরিবেশ বিরাজ করছে। বাতাসে যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাস্তার পাশে পার্ক করা সিলভার সেডান গাড়িটার ঠিক পাশেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যটি আবদুল মালেকের চোখের সামনে এমন এক ধাক্কা দিয়েছে যে তার ভেতরের সমস্ত পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে।
ক্লান্ত শরীর আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে বাড়ি ফেরা একজন স্বামী তার নিজের বাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে দেখল যে, তার কোম্পানির চেয়ারম্যান—যাকে সে দেবতার মতো ভক্তি করে, আর তার নববিবাহিতা স্ত্রী—যাকে সে নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে—তারা দুজন গভীর রাতে এমন এক অন্তরঙ্গ ও খোলামেলা চুম্বনে মগ্ন!
মালেকের মুখ দিয়ে কেবল অবিশ্বাসের সুরে বেরিয়ে এসেছিল—*"ইতি!"*
সেই একটিমাত্র শব্দে রাতের বাতাস যেন কেঁপে উঠেছিল। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী এবং ইতি—দুজনেই এমনভাবে থতমত খেয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল, যেন তারা হাতেনাতে কোনো অপরাধের দায়ে ধরা পড়ে গেছে। আলতাফ সাহেবের ফর্সা ও শক্তপোক্ত মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি তো এত বড় একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান, কর্পোরেট দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি—আজ একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের সামনে এমন অপ্রস্তুত ও অপরাধী অবস্থায় পড়তে হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।
আর ইতির কথা তো বলাই বাহুল্য। তার ভেতরকার ধূর্ত ও প্রখর বুদ্ধি তখন ১০০ মাইলের গতিতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে এই মুহূর্তে যদি সে কোনো ভুল করে বা সত্য স্বীকার করে, তবে শুধু তার সংসারটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে না, বরং মালেকের অন্ধ বিশ্বাস চিরতরে শেষ হয়ে যাবে এবং একটা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যাবে। তাই এক সেকেন্ডের জন্যও সময় নষ্ট না করে ইতি তার মনের ভেতরকার সমস্ত অভিনয় দক্ষতা ও চতুরতাকে এক জায়গায় এনে এক মাস্টারপিস মিথ্যাচারের জাল বুনতে শুরু করল।
-----
মালেক যখন বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ দুটো বড় বড় করে পা কাঁপাতে কাঁপাতে সামনে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ইতি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে দৌড়ে স্বামীর কাছে গিয়ে পৌঁছাল। সে মালেকের হাত দুটো এক মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল।
ইতির মুখে তখন কোনো ভয়ের ছাপ নেই, বরং তার চোখে মুখে ছিল এক কৃত্রিম উদ্বেগ ও ভয়ের দারুণ এক অভিব্যক্তি। সে এমনভাবে হাঁপাতে শুরু করল, যেন সে নিজে কোনো মারাত্মক বিপদের মধ্য দিয়ে গেছে।
ইতি একটু উচুঁ গলায়, কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয় ও উদ্বেগের সুরে বলে উঠল, "মালেক! তুমি এতক্ষণে এলে? আল্লাহর দোহাই লাগে, তাড়াতাড়ি করো! এসো, তাড়াতাড়ি ধরো স্যারকে!"
মালেক থমকে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে ইতির দিকে তাকিয়ে খাবি খাওয়া গলায় বলল, "ইতি... এ... এগুলো কী হচ্ছিল এখানে? আমি নিজের চোখে দেখলাম..."
"কীসব আজেবাজে বকছ!" ইতি মালেককে কথা শেষ করতে দিল না। সে কৃত্রিম রাগের সুরে ও অত্যন্ত চতুরতার সাথে বানিয়ে বানিয়ে বলতে শুরু করল, "মালেক, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে নাকি! আসার পথে একটু ভালো করে দেখতে পারো না? একটু আগে হঠাৎ করে স্যারের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল! উনার বুকটা কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম যে মানুষটা বুঝি এই পথেই মারা যান! উনি তখন কথাই বলতে পারছিলেন না, তাই আমি জল মুখে দিয়ে স্যারের মুখে মুখ লাগিয়ে একটু কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, যাতে উনার বুকটা একটু হালকা হয়! আর তুমি এসে উল্টাপাল্টা ভাবছ?"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি কর্পোরেট দুনিয়ায় এত বছর ধরে হাজারো কঠিন পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলিয়েছেন—তিনি ইতির এই বুদ্ধিমত্তা ও চতুর অভিনয় দেখে মনে মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি পেলেন। তিনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ ইতির সাথে সুর মেলালেন।
আলতাফ সাহেব নিজের বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে এমনভাবে জাঁকিয়ে একটা কাসুনি দিলেন—*মালেক! খিক-খিক!*—যেন তাঁর সত্যিই দম আটকে আসছে এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। তিনি কাঁপাকাঁপা ও রূঢ় গলায় বললেন, "মালেক... বাছা রে... আমার বুকটা... উফ! মনে হচ্ছে এখুনি আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে! একটু বাতাসে দম আটকে আসছিল... তোমার বউ তোমায় দেখে ভালোই হয়েছে, জলদি আমাকে একটু ঘরের ভেতরে নিয়ে চলো, বাবা! আমার বড় কষ্ট হচ্ছে!"
-----
মালেক হলো এমন একজন মানুষ, যার অন্তরে আলতাফ সাহেবের প্রতি অন্ধ ভক্তি ও বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে। সে এত বছর ধরে দেখে এসেছে এই মানুষটিই তাদের অন্নদাতা। তাই ইতি যখন এত জোড় দিয়ে শ্বাসকষ্টের কথা বলল, আর খোদ চেয়ারম্যান সাহেব যখন নিজে বুকে হাত দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই কথা সমর্থন করলেন, তখন মালেকের সরল ও অবুঝ মনে সামান্যতম সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না।
সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে একটু আগে নিজের চোখে কী দেখেছে। তার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ ও অভিমান এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে তার জায়গায় জমা হলো এক গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
মালেক দ্রুত এগিয়ে এসে আলতাফ সাহেবের অন্য হাতটি নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠল, "ওহ্ খোদা! স্যারের আবার এমন অ্যাটাক হলো কেন? দাঁড়ান স্যার, আমি ধরে নিয়ে যাচ্ছি। ইতি, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো!"
ইতি তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে চাবি বের করে ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে দিল। তারা দুজনে মিলে আলতাফ সাহেবকে ধরে সোজা ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। ড্রয়িংরুমের সেই পুরোনো, জীর্ণ সোফাটায় আলতাফ সাহেবকে অত্যন্ত সাবধানে বসিয়ে দেওয়া হলো।
আলতাফ সাহেব সোফায় বসে নিজের কপাল ও গলার ঘাম মুছতে মুছতে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে দেখলে যে কেউ সত্যি সত্যি বিশ্বাস করবে তিনি কোনো মারাত্মক শারীরিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
মালেক খুব বিচলিত হয়ে সোফার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে কচলাতে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, "স্যার, আপনার শরীরটা এখন কেমন লাগছে বলুন তো? আমি কি ডাক্তার ডাকব? কিংবা কোনো ইনহেলার বা ওষুধ আনব?"
আলতাফ সাহেব বুকে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ গলায় বললেন, "না... ডাক্তার এখনই লাগবে না, মালেক। একটু... একটু জল দাও তো বাবা। বুকে বড় চাপ লাগছে।"
ইতি সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে দ্রুত এক গ্লাস ঠান্ডা জল এনে আলতাফ সাহেবের হাতে দিল। আলতাফ সাহেব সেই গ্লাসের জল এক চুমুকে শেষ করে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
------
জল খাওয়ার পর আলতাফ সাহেবের মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা কিছুটা কাটল বটে, তবে তিনি অভিনয় বজায় রেখে আগের মতোই দুর্বলভাবে সোফায় এলিয়ে বসে রইলেন।
ইতি তখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। সে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে খুব উদ্বেগের সুরে বলল, "মালেক, শুধু জল খেলে তো হবে না। স্যারের বুকে যে টান ধরা ভাবটা দেখছি, উনার এখনো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমাদের গলি থেকে মোড়ের ওই বড় ফার্মেসিটা তো এখনো খোলা আছে। তুমি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ফার্মেসি থেকে স্যারের জন্য শ্বাসকষ্টের একটা ভালো কিছু ওষুধ নিয়ে এসো তো!"
মালেক একটুও দেরি করল না। সে মনিবের এই চরম অসুস্থতার খবর শুনে পুরোপুরি বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সে তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখুনি যাচ্ছি ইতি! এক মিনিটও দেরি করব না।"
বলেই মালেক আর এক মুহূর্ত কেবিনের ভেতরে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে দরজাটা একটু টেনে দিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল—ফার্মেসি থেকে ওষুধ আনার জন্য সে তখন পুরোপুরি অন্ধের মতো ছুটে চলেছে।
----
মালেকের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে নিচে মিলিয়ে যাওয়ার শব্দটুকু পেতেই—*কটকট* করে সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের বাতাসটা হঠাৎ করেই পুরো বদলে গেল।
সোফায় বসা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর অসুস্থতার সেই ভান করা দুর্বলতা মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল। তাঁর চোখের ভেতর তখন ফুটে উঠল এক তীব্র, আদিম ও সর্বগ্রাসী কামনার আগুন। তিনি এক ঝটকায় সোজা হয়ে সোফায় বসে পড়লেন।
আর ইতি? সে দরজার ছিটকানিটা ভালোভাবে আটকে দিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন তার মুখের সেই উদ্বেগের নাটকীয় ভান পুরোপুরি উধাও। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক বিজয়ী, ধূর্ত ও দুষ্টুমিভরা হাসি।
ইতি আলতাফ সাহেবের খুব কাছে এগিয়ে এল। সে খিলখিল করে হেসে ফিসফিস করে বলল, "কী দারুণ অভিনয়টাই না করলাম, স্যার! দেখলেন তো? আস্ত একটা বাঘের মুখ থেকে কীভাবে শিকার ছিনিয়ে আনলাম বলুন তো?"
আলতাফ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোফা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের দুই শক্তিশালী হাত দিয়ে ইতিকে সোজা নিজের কোলে তুলে নিলেন!
ইতি মৃদু একটা চকিত শব্দ করে আলতাফ সাহেবের গলায় নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে আলতাফ সাহেবের কোলের ওপর একপাশে বসে ফিসফিস করে বলল, "ওরে বাবা! এত শক্তি আপনার কোথায় লুকিয়ে থাকে, স্যার? একটু আগে তো মনে হচ্ছিল আপনি সত্যিই মারা যাচ্ছেন!"
আলতাফ সাহেব ইতির নরম চিবুকটা নিজের এক হাতে শক্ত করে ধরে অত্যন্ত উত্তাল ও পাগলপারা গলায় বললেন, "তুমি যা বুদ্ধি খাটিয়েছ, ইতি—তাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ এক মুহূর্তে টেকে গেছে! তুমি আস্ত একটা জাদুকরী মেয়ে! এখন বলো, ওই বোকা গার্ডটাকে তো বাইরে পাঠিয়ে দিলে, আর কতক্ষণ সময় আছে আমাদের হাতে?"
ইতি তার চোখের চাউনি আরও একটু মাদক করে, ব্লাউজের ভাঁজে হাত রেখে আলতাফ সাহেবের বুকের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "সময় বেশিক্ষণ নেই, মালেক ওষুধ নিয়ে ফিরে আসতে বড় জোর দশ মিনিট লাগবে। দেখি আপনি কিভাবে কাজে লাগান, স্যার!"
-----
আর কোনো কথা নয়। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী আর ইতি—দুজনেই যেন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে রাজি ছিল না। একটু আগে গলির মোড়ে যে অসম্পূর্ণ চুম্বনটুকু মালেকের উপস্থিতির কারণে থমকে গেছিল, সেই ক্ষোভ, সেই ভয় আর সেই লুকিয়ে থাকা উত্তেজনার সমস্ত বহিঃপ্রকাশ যেন এই দশ মিনিটের ছোট্ট পরিসরে ঘটে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।
আলতাফ সাহেব নিজের মুখটা একেবারে নামিয়ে এনে ইতির সেই লালচে ও আকর্ষণীয় ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরলেন।
সে এক অত্যন্ত পাগলাটে, হিংস্র ও ব্যাকুল চুম্বন। ইতিও বিন্দুমাত্র পিছু হটল না; সেও আলতাফ সাহেবের শার্টের কলার খামচে ধরে, নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সেই চুম্বনের চরম প্রতিদান দিতে শুরু করল। তাদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের ঘর্ষণে রুমের ভেতরে এক অদ্ভুত কামোদ্দীপক শব্দের সৃষ্টি হলো। দুজন মানুষ যেন এই দুনিয়ার সমস্ত নিয়ম, সমস্ত পাপ-পুণ্য এবং সমস্ত ভয়ের সীমানা ছাড়িয়ে একে অপরের ঠোঁটের ভেতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেল।
বাইরে তখন গভীর রাতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়ে আসছে, গলির মোড় দিয়ে মালেকের ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে তখন বইছে এক নিষিদ্ধ ও সর্বনাশা উন্মাদনার ঝড়—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা বাকি নেই। (চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)