10-08-2026, 12:57 PM
নবম পর্ব
পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি গলির সংকীর্ণ রাস্তা ছেড়ে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর প্রিমিয়াম সিলভার সেডান গাড়িটা যখন মেইন রোডের প্রশস্ত পিচঢালা রাস্তায় এসে উঠল, তখন বাইরের কোলাহল যেন এক নিমেষে অনেক দূরে মিলিয়ে গেল। গাড়ির ভেতরটা এসি-র ঠান্ডা বাতাসে হিমশীতল হয়ে আছে। ফ্রেস লেভেন্ডার এয়ার ফ্রেশনারের একটা মিষ্টি সুবাস পুরো কেবিনটাকে মোহময় করে তুলেছে।
ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন আলতাফ সিরাজ চৌধুরী। তাঁর চেহারায় এমন এক আত্মতুষ্টির অভিব্যক্তি—যেন তিনি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো ট্রফি জয় করেছেন। তাঁর বাঁ হাতের আঙুলগুলো স্টিয়ারিং হুইল শক্ত করে ধরে আছে, আর ডান হাতটা আলতো করে রাখা রয়েছে গিয়ার লিভারের ঠিক ওপরে।
গাড়ির ঠিক পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছেন ইতি। তার পরনে সেই হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা স্লিভলেস ব্লাউজ। তার চুলে করা সেই পরিপাটি খোপাটা সামান্য বাতাসে যেন একটু এদিক-ওদিক দুলছে। জানলার কাঁচ দিয়ে বাইরের বিকেলের পড়ন্ত সোনালী রোদ এসে পড়ছে ইতির ফর্সা গালের ওপর, যার ফলে তার প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর মুখাবয়বটা আরও বেশি উজ্জ্বল ও মায়াবী দেখাচ্ছে।
ইতি মুগ্ধ চোখে একবার বাইরের ব্যস্ত ঢাকা শহর দেখছে, আর একবার আড়চোখে দেখছে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা এই প্রতাপশালী মানুষটিকে। সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি যে তার মতো একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী একদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পপতির বিলাসবহুল গাড়ির সামনের সিটে বসে এভাবে শহরের অভিজাত রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে।
-----
গাড়িটা যখন সিগনালে এসে সামান্য থামল, তখন ইতি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের সিটবেল্টটা একটু ঠিক করে আলতাফ সাহেবের দিকে ঝুঁকে এল। তার চোখের মণি দুটো কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময়ে চকচক করে উঠল।
ইতি অত্যন্ত নরম, মিষ্টি ও কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, "স্যার... আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। সারাজীবন তো এই বড় বড় গাড়িগুলো শুধু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখেছি, আর আজ আমি আপনার গাড়িতে আপনার পাশে বসে আছি! সত্যি বলছি, আমার আজ মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি।"
আলতাফ সাহেব ট্রাফিকের লাল আলোর দিকে তাকিয়ে এক পশলা মৃদু হাসলেন। তারপর তিনি বাঁ হাতটা স্টিয়ারিং থেকে সরিয়ে সরাসরি ইতির ডান হাতের ওপর এনে রাখলেন। তাঁর উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই ইতির হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল।
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর অথচ স্নেহার্ত ও গভীর গলায় বললেন, "স্বপ্ন নয়, ইতি। এটা একদম সত্যি। তোমার জীবনের এই যে প্রাপ্তি, এটা তোমার প্রাপ্য ছিল। যে রূপ, যে সরলতা আর যে মন তোমার আছে, তা কোনো সাধারণ কুটিরে পচে মরার জন্য নয়। আজ থেকে তোমার জীবনের সব অন্ধকার আমি দূর করে দেব।"
ইতি লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো নিচু করে ফেলল। সে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে না নিয়ে আলতাফ সাহেবের হাতের মুঠোর ভেতরেই রেখে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিগনাল সবুজ হয়ে গেল। আলতাফ সাহেব গাড়িটা আবার সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ডান হাত দিয়ে গিয়ার শিফট করতে গেলেন। আর তখনই তিনি ইতির হাতটা নিজের হাতের সাথে রেখেই সোজা গিয়ার লিভারের ওপর রেখে দিলেন! অর্থাৎ, ইতির নরম হাতটি তখন আলতাফ সাহেবের হাতের নিচে চাপা পড়ে রইন। গাড়িটা যখন গিয়ার বদল করে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন গিয়ারের মৃদু কম্পনটুকু সরাসরি তাদের ছোঁয়া হাতের তালুর মাধ্যমে দুজনের শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলল। ইতি আবেশের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার বুকের ভেতরটা দ্রুত স্পন্দিত হতে লাগল।
-----
শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সুরক্ষিত একটি অভিজাত গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড জুয়েলারি শোরুমের সামনে এসে গাড়িটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পার্ক করলেন আলতাফ সাহেব। কাঁচের বিশাল দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই শো-রুমের উজ্জ্বল হলুদ ও সাদা আলোর রোশনাই বাইরে থেকে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল।
দরজায় দাঁড়ানো সুবেশী সিকিউরিটি গার্ড অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সাথে দরজা খুলে দিল। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে শোরুমের ম্যানেজার নিজে দৌড়ে এগিয়ে এলেন। কর্পোরেট দুনিয়ায় আলতাফ সাহেবকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে।
ম্যানেজার অত্যন্ত বিনীতভাবে হাত জোড় করে বলে উঠলেন, "স্যার! আসসালামু আলাইকুম! অনেক দিন পর আমাদের শোরুমে আপনার পা পড়েছে। আজ কী ধরনের কালেকশন দেখাব বলুন? কোনো ডায়মন্ড নেকলেস নাকি এক্সক্লুসিভ গোল্ড সেট?"
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত ভাবলেশহীন ও কর্কশ গলায় ইতির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আমার জন্য নয়। আমার এই বিশেষ অতিথির জন্য কিছু দেখান। শোরুমের সেরা এবং সবচেয়ে ইউনিক কালেকশনগুলো সামনে আনুন।"
ম্যানেজার সাথে সাথে ইতিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে সোফায় বসানোর ব্যবস্থা করলেন এবং গ্লাস কেস থেকে একে একে বিভিন্ন ডিজাইনের সোনার ও পাথরের গহনার ট্রে টেবিল ওপর সাজিয়ে দিলেন।
ইতি তো এমন চোখ ধাঁধানো পরিবেশ জীবনে কখনো দেখেনি! চারপাশে সোনা ও হিরের আলোয় তার চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে এক একটা ট্রে খুলে কখনো আংটি, কখনো কানের দুল, আবার কখনো গলার হার হাতে নিয়ে দেখছিল। তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। সে একটি রুপালি পাথরের মুক্তোবসানো চমৎকার গলার হার হাতে নিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যার, দেখুন তো এটা কেমন লাগছে?"
আলতাফ সাহেব গভীর দৃষ্টিতে ইতির দিকে তাকিয়ে বললেন, "সবই সুন্দর, ইতি। কিন্তু তোমার গলায় মানাবে কি না, সেটাই আসল কথা। তুমি তোমার পছন্দমতো যেকোনোটা ট্রাই করে দেখতে পারো। কোনো কার্পণ্য করবে না, যা ভালো লাগে সেটাই বেছে নাও।"
-----
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে শোরুমের নানামুখী গহনা দেখার পর ইতির নজর কাড়ল একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও এক্সক্লুসিভ গহনা। একটি পাতলা সোনার চেইনের সাথে ঝুলে থাকা চমৎকার একটি হার্ট আকৃতির ডায়মন্ড ও রুবি খচিত লকেট। লকেটটার ডিজাইন এতটাই নিখুঁত এবং রোমান্টিক ছিল যে প্রথম দেখাতেই যে কারো মন কেড়ে নেবে।
ইতি লকেটটা হাতে তুলে নিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে সলাজ হাসিতে বলল, "স্যার, এই লকেটটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে... এটা দেখতে কী মিষ্টি না?"
আলতাফ সাহেব লকেটের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ইতির ফর্সা গলায় তা কল্পনা করলেন। তারপর তিনি ম্যানেজারকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, "এই লকেটটাই প্যাক করতে বলুন। আর এটাই আমার পছন্দ হয়েছে।"
ম্যানেজার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি সুন্দর ভেলভেটের লাল বক্সের ভেতর সেই হার্ট আকৃতির লকেটটা সাজিয়ে সামনে এনে রাখলেন।
আলতাফ সাহেব বক্স থেকে লকেটটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি ইতির পেছনে একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত আলতো করে ইতির কাঁধের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরিয়ে দিলেন। তাঁর হাতের আঙুলগুলো যখন ইতির ফর্সা গলার পেছনের অংশে স্পর্শ করল, তখন ইতি মৃদু শিউরে উঠল।
আলতাফ সাহেব খুব সাবধানে সেই হার্ট আকৃতির লকেটটা ইতির গলায় পরিয়ে দিয়ে চেইনের হুকটা আটকে দিলেন। ইতির ঠিক বুকের ওপর, সেই খোলামেলা ব্লাউজের ঠিক ওপরে লকেটটা যখন জিলিক দিয়ে ঝুলে পড়ল, তখন তার সৌন্দর্য যেন হাজার গুণে বেড়ে গেল।
আলতাফ সাহেব ইতির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "এবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো, ইতি। মনে হচ্ছে এই লকেটটা তৈরিই হয়েছিল শুধু তোমার জন্যই।"
ইতি দ্রুত কাউন্টারের সামনের বিশাল আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের গলায় ওই চমৎকার লকেটটি দেখে তার চোখ আনন্দে ভিজে এল। সে মুগ্ধ হয়ে নিজের রূপ দেখতে লাগল।
-----
ম্যানেজার ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে বিল তৈরি করে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটা প্রিন্টেড স্লিপ আলতাফ সাহেবের হাতে দিলেন। তিনি স্লিপে চোখ বুলিয়ে দেখলেন—সেই হার্ট আকৃতির লকেট এবং চেইনের মোট মূল্য এসেছে ৭৫,০০০ টাকা (পঁচাত্তর হাজার টাকা)!
আলতাফ সাহেব বিন্দুমাত্র পলক না ফেলে নিজের পকেট থেকে প্রিমিয়াম ব্ল্যাক আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডটা বের করে ম্যানেজারের হাতে তুলে দিলেন। ম্যানেজার দ্রুত সোয়াইপ মেশিন এনে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেন।
ইতি যখন শুনল এই ছোট্ট একটা লকেটের দাম পঁচাত্তর হাজার টাকা—যা তাদের মতো গরিব মানুষের কয়েক মাসের সংসার খরচের সমান—তখন সে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল! সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে একটা মানুষ কেবল তার একটু খুশির জন্য এক পলকে এতগুলো টাকা খরচ করে ফেলল!
পেমেন্ট স্লিপ পকেটে রেখে আলতাফ সাহেব যখন কাউন্টার থেকে ফিরে এলেন, তখন ইতি শোরুমের সব কর্মচারীদের সামনেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কৃতজ্ঞতায় ও আবেগ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঠিক কাউন্টারের সামনেই আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল!
সে আলতাফ সাহেবের জুতোর সামনে হাত রেখে তাঁকে ভক্তিভরে পা ছুঁয়ে সালাম করার চেষ্টা করল।
"এ কী করছ, ইতি! ওঠো... সবাই দেখছে!" আলতাফ সাহেব সামান্য চমকে গিয়ে দ্রুত দুই হাত বাড়িয়ে ইতির নরম কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিলেন।
ইতি যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন তার চোখ দুটো জলে ভেজা। সে অত্যন্ত শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় গদগদ হয়ে ফিসফিস করে বলল, "আপনি আমার জন্য এত করলেন, স্যার... আমি আজীবন আপনার এই উপকারের কথা ভুলব না।"
আলতাফ সাহেব ইতির কাঁধ থেকে হাত সরালেন না। তিনি সামনে একটু ঝুঁকে এলেন এবং সবার সামনেই ইতির ওই ফর্সা, উজ্জ্বল কপালে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে একটি গাঢ়, উষ্ণ ও স্নেহমাখা চুমু খেলেন!
শোরুমের ম্যানেজার এবং অন্যান্য কর্মীরা এই দৃশ্য দেখে কিছুটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল, কিন্তু আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর প্রতাপের ভয়ে কেউ রা কাড়ার সাহস পেল না। সবাই মাথা নিচু করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
ইতি এই প্রকাশ্যে চুম্বনে লজ্জায় পুরো লাল হয়ে গেল। সে নিজের গাল দুটো হাত দিয়ে ঢেকে ফিক করে একটা মিষ্টি ও লাজুক হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "চলুন না স্যার, এবার এখান থেকে বের হই... সবাই কেমন যেন তাকিয়ে আছে।"
আলতাফ সাহেব বিজয়ী বীরের মতো মৃদু হাসলেন। তারপর ইতির হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে শোরুমের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে পার্ক করা সিলভার সেডান গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। শহরের গোধূলির আলোয় তাদের এই নিষিদ্ধ গল্পের নতুন অধ্যায় তখন আরও বেশি রঙিন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। (চলবে)
পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি গলির সংকীর্ণ রাস্তা ছেড়ে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর প্রিমিয়াম সিলভার সেডান গাড়িটা যখন মেইন রোডের প্রশস্ত পিচঢালা রাস্তায় এসে উঠল, তখন বাইরের কোলাহল যেন এক নিমেষে অনেক দূরে মিলিয়ে গেল। গাড়ির ভেতরটা এসি-র ঠান্ডা বাতাসে হিমশীতল হয়ে আছে। ফ্রেস লেভেন্ডার এয়ার ফ্রেশনারের একটা মিষ্টি সুবাস পুরো কেবিনটাকে মোহময় করে তুলেছে।
ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন আলতাফ সিরাজ চৌধুরী। তাঁর চেহারায় এমন এক আত্মতুষ্টির অভিব্যক্তি—যেন তিনি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো ট্রফি জয় করেছেন। তাঁর বাঁ হাতের আঙুলগুলো স্টিয়ারিং হুইল শক্ত করে ধরে আছে, আর ডান হাতটা আলতো করে রাখা রয়েছে গিয়ার লিভারের ঠিক ওপরে।
গাড়ির ঠিক পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছেন ইতি। তার পরনে সেই হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা স্লিভলেস ব্লাউজ। তার চুলে করা সেই পরিপাটি খোপাটা সামান্য বাতাসে যেন একটু এদিক-ওদিক দুলছে। জানলার কাঁচ দিয়ে বাইরের বিকেলের পড়ন্ত সোনালী রোদ এসে পড়ছে ইতির ফর্সা গালের ওপর, যার ফলে তার প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর মুখাবয়বটা আরও বেশি উজ্জ্বল ও মায়াবী দেখাচ্ছে।
ইতি মুগ্ধ চোখে একবার বাইরের ব্যস্ত ঢাকা শহর দেখছে, আর একবার আড়চোখে দেখছে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা এই প্রতাপশালী মানুষটিকে। সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি যে তার মতো একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী একদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পপতির বিলাসবহুল গাড়ির সামনের সিটে বসে এভাবে শহরের অভিজাত রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে।
-----
গাড়িটা যখন সিগনালে এসে সামান্য থামল, তখন ইতি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের সিটবেল্টটা একটু ঠিক করে আলতাফ সাহেবের দিকে ঝুঁকে এল। তার চোখের মণি দুটো কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময়ে চকচক করে উঠল।
ইতি অত্যন্ত নরম, মিষ্টি ও কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, "স্যার... আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। সারাজীবন তো এই বড় বড় গাড়িগুলো শুধু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখেছি, আর আজ আমি আপনার গাড়িতে আপনার পাশে বসে আছি! সত্যি বলছি, আমার আজ মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি।"
আলতাফ সাহেব ট্রাফিকের লাল আলোর দিকে তাকিয়ে এক পশলা মৃদু হাসলেন। তারপর তিনি বাঁ হাতটা স্টিয়ারিং থেকে সরিয়ে সরাসরি ইতির ডান হাতের ওপর এনে রাখলেন। তাঁর উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই ইতির হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল।
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর অথচ স্নেহার্ত ও গভীর গলায় বললেন, "স্বপ্ন নয়, ইতি। এটা একদম সত্যি। তোমার জীবনের এই যে প্রাপ্তি, এটা তোমার প্রাপ্য ছিল। যে রূপ, যে সরলতা আর যে মন তোমার আছে, তা কোনো সাধারণ কুটিরে পচে মরার জন্য নয়। আজ থেকে তোমার জীবনের সব অন্ধকার আমি দূর করে দেব।"
ইতি লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো নিচু করে ফেলল। সে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে না নিয়ে আলতাফ সাহেবের হাতের মুঠোর ভেতরেই রেখে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিগনাল সবুজ হয়ে গেল। আলতাফ সাহেব গাড়িটা আবার সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ডান হাত দিয়ে গিয়ার শিফট করতে গেলেন। আর তখনই তিনি ইতির হাতটা নিজের হাতের সাথে রেখেই সোজা গিয়ার লিভারের ওপর রেখে দিলেন! অর্থাৎ, ইতির নরম হাতটি তখন আলতাফ সাহেবের হাতের নিচে চাপা পড়ে রইন। গাড়িটা যখন গিয়ার বদল করে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন গিয়ারের মৃদু কম্পনটুকু সরাসরি তাদের ছোঁয়া হাতের তালুর মাধ্যমে দুজনের শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলল। ইতি আবেশের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার বুকের ভেতরটা দ্রুত স্পন্দিত হতে লাগল।
-----
শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সুরক্ষিত একটি অভিজাত গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড জুয়েলারি শোরুমের সামনে এসে গাড়িটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পার্ক করলেন আলতাফ সাহেব। কাঁচের বিশাল দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই শো-রুমের উজ্জ্বল হলুদ ও সাদা আলোর রোশনাই বাইরে থেকে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল।
দরজায় দাঁড়ানো সুবেশী সিকিউরিটি গার্ড অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সাথে দরজা খুলে দিল। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে শোরুমের ম্যানেজার নিজে দৌড়ে এগিয়ে এলেন। কর্পোরেট দুনিয়ায় আলতাফ সাহেবকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে।
ম্যানেজার অত্যন্ত বিনীতভাবে হাত জোড় করে বলে উঠলেন, "স্যার! আসসালামু আলাইকুম! অনেক দিন পর আমাদের শোরুমে আপনার পা পড়েছে। আজ কী ধরনের কালেকশন দেখাব বলুন? কোনো ডায়মন্ড নেকলেস নাকি এক্সক্লুসিভ গোল্ড সেট?"
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত ভাবলেশহীন ও কর্কশ গলায় ইতির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আমার জন্য নয়। আমার এই বিশেষ অতিথির জন্য কিছু দেখান। শোরুমের সেরা এবং সবচেয়ে ইউনিক কালেকশনগুলো সামনে আনুন।"
ম্যানেজার সাথে সাথে ইতিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে সোফায় বসানোর ব্যবস্থা করলেন এবং গ্লাস কেস থেকে একে একে বিভিন্ন ডিজাইনের সোনার ও পাথরের গহনার ট্রে টেবিল ওপর সাজিয়ে দিলেন।
ইতি তো এমন চোখ ধাঁধানো পরিবেশ জীবনে কখনো দেখেনি! চারপাশে সোনা ও হিরের আলোয় তার চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে এক একটা ট্রে খুলে কখনো আংটি, কখনো কানের দুল, আবার কখনো গলার হার হাতে নিয়ে দেখছিল। তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। সে একটি রুপালি পাথরের মুক্তোবসানো চমৎকার গলার হার হাতে নিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যার, দেখুন তো এটা কেমন লাগছে?"
আলতাফ সাহেব গভীর দৃষ্টিতে ইতির দিকে তাকিয়ে বললেন, "সবই সুন্দর, ইতি। কিন্তু তোমার গলায় মানাবে কি না, সেটাই আসল কথা। তুমি তোমার পছন্দমতো যেকোনোটা ট্রাই করে দেখতে পারো। কোনো কার্পণ্য করবে না, যা ভালো লাগে সেটাই বেছে নাও।"
-----
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে শোরুমের নানামুখী গহনা দেখার পর ইতির নজর কাড়ল একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও এক্সক্লুসিভ গহনা। একটি পাতলা সোনার চেইনের সাথে ঝুলে থাকা চমৎকার একটি হার্ট আকৃতির ডায়মন্ড ও রুবি খচিত লকেট। লকেটটার ডিজাইন এতটাই নিখুঁত এবং রোমান্টিক ছিল যে প্রথম দেখাতেই যে কারো মন কেড়ে নেবে।
ইতি লকেটটা হাতে তুলে নিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে সলাজ হাসিতে বলল, "স্যার, এই লকেটটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে... এটা দেখতে কী মিষ্টি না?"
আলতাফ সাহেব লকেটের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ইতির ফর্সা গলায় তা কল্পনা করলেন। তারপর তিনি ম্যানেজারকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, "এই লকেটটাই প্যাক করতে বলুন। আর এটাই আমার পছন্দ হয়েছে।"
ম্যানেজার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি সুন্দর ভেলভেটের লাল বক্সের ভেতর সেই হার্ট আকৃতির লকেটটা সাজিয়ে সামনে এনে রাখলেন।
আলতাফ সাহেব বক্স থেকে লকেটটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি ইতির পেছনে একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত আলতো করে ইতির কাঁধের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরিয়ে দিলেন। তাঁর হাতের আঙুলগুলো যখন ইতির ফর্সা গলার পেছনের অংশে স্পর্শ করল, তখন ইতি মৃদু শিউরে উঠল।
আলতাফ সাহেব খুব সাবধানে সেই হার্ট আকৃতির লকেটটা ইতির গলায় পরিয়ে দিয়ে চেইনের হুকটা আটকে দিলেন। ইতির ঠিক বুকের ওপর, সেই খোলামেলা ব্লাউজের ঠিক ওপরে লকেটটা যখন জিলিক দিয়ে ঝুলে পড়ল, তখন তার সৌন্দর্য যেন হাজার গুণে বেড়ে গেল।
আলতাফ সাহেব ইতির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "এবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো, ইতি। মনে হচ্ছে এই লকেটটা তৈরিই হয়েছিল শুধু তোমার জন্যই।"
ইতি দ্রুত কাউন্টারের সামনের বিশাল আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের গলায় ওই চমৎকার লকেটটি দেখে তার চোখ আনন্দে ভিজে এল। সে মুগ্ধ হয়ে নিজের রূপ দেখতে লাগল।
-----
ম্যানেজার ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে বিল তৈরি করে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটা প্রিন্টেড স্লিপ আলতাফ সাহেবের হাতে দিলেন। তিনি স্লিপে চোখ বুলিয়ে দেখলেন—সেই হার্ট আকৃতির লকেট এবং চেইনের মোট মূল্য এসেছে ৭৫,০০০ টাকা (পঁচাত্তর হাজার টাকা)!
আলতাফ সাহেব বিন্দুমাত্র পলক না ফেলে নিজের পকেট থেকে প্রিমিয়াম ব্ল্যাক আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডটা বের করে ম্যানেজারের হাতে তুলে দিলেন। ম্যানেজার দ্রুত সোয়াইপ মেশিন এনে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেন।
ইতি যখন শুনল এই ছোট্ট একটা লকেটের দাম পঁচাত্তর হাজার টাকা—যা তাদের মতো গরিব মানুষের কয়েক মাসের সংসার খরচের সমান—তখন সে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল! সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে একটা মানুষ কেবল তার একটু খুশির জন্য এক পলকে এতগুলো টাকা খরচ করে ফেলল!
পেমেন্ট স্লিপ পকেটে রেখে আলতাফ সাহেব যখন কাউন্টার থেকে ফিরে এলেন, তখন ইতি শোরুমের সব কর্মচারীদের সামনেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কৃতজ্ঞতায় ও আবেগ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঠিক কাউন্টারের সামনেই আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল!
সে আলতাফ সাহেবের জুতোর সামনে হাত রেখে তাঁকে ভক্তিভরে পা ছুঁয়ে সালাম করার চেষ্টা করল।
"এ কী করছ, ইতি! ওঠো... সবাই দেখছে!" আলতাফ সাহেব সামান্য চমকে গিয়ে দ্রুত দুই হাত বাড়িয়ে ইতির নরম কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিলেন।
ইতি যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন তার চোখ দুটো জলে ভেজা। সে অত্যন্ত শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় গদগদ হয়ে ফিসফিস করে বলল, "আপনি আমার জন্য এত করলেন, স্যার... আমি আজীবন আপনার এই উপকারের কথা ভুলব না।"
আলতাফ সাহেব ইতির কাঁধ থেকে হাত সরালেন না। তিনি সামনে একটু ঝুঁকে এলেন এবং সবার সামনেই ইতির ওই ফর্সা, উজ্জ্বল কপালে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে একটি গাঢ়, উষ্ণ ও স্নেহমাখা চুমু খেলেন!
শোরুমের ম্যানেজার এবং অন্যান্য কর্মীরা এই দৃশ্য দেখে কিছুটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল, কিন্তু আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর প্রতাপের ভয়ে কেউ রা কাড়ার সাহস পেল না। সবাই মাথা নিচু করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
ইতি এই প্রকাশ্যে চুম্বনে লজ্জায় পুরো লাল হয়ে গেল। সে নিজের গাল দুটো হাত দিয়ে ঢেকে ফিক করে একটা মিষ্টি ও লাজুক হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "চলুন না স্যার, এবার এখান থেকে বের হই... সবাই কেমন যেন তাকিয়ে আছে।"
আলতাফ সাহেব বিজয়ী বীরের মতো মৃদু হাসলেন। তারপর ইতির হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে শোরুমের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে পার্ক করা সিলভার সেডান গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। শহরের গোধূলির আলোয় তাদের এই নিষিদ্ধ গল্পের নতুন অধ্যায় তখন আরও বেশি রঙিন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। (চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)