09-08-2026, 08:56 AM
দ্বিতীয় পর্ব:
পরের দিন সকাল থেকেই অফিসের বাতাসটা কেমন যেন থমথমে ছিল। আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কেবিনের চারপাশের গ্লাস ওয়ালের বাইরে কর্মচারীরা আসা-যওয়া করছে অত্যন্ত সন্তর্পণে, যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা বজায় থাকে। কিন্তু খোদ আলতাফ সাহেবের নিজের মনের ভেতর কী যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না। গত ত্রিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে এমন কোনো দিন আসেনি যেদিন তিনি কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে এত দীর্ঘ সময় ভেবেছেন।
দুপুর তখন প্রায় বারোটা বাজে। ইন্টারকমের লাল বাতিটা জ্বলতেই আলতাফ সাহেব রিসিভার তুলে নিলেন। ওপাশ থেকে এইচআর ম্যানেজারের গলা ভেসে এল, "স্যার, দুপুরের মিটিংয়ের ফাইলগুলো কি...?"
"আজকের সমস্ত মিটিং ক্যানসেল করে দাও," আলতাফ সাহেবের ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
ম্যানেজার সামান্য থমকে গিয়ে বললেন, "ক্যানসেল, স্যার? কিন্তু ওই বিদেশি ডেলিগেটসদের সাথে..."
"আমি যা বলেছি তাই করো। আর কোনো কথা শুনতে চাই না," রিসিভারটা রেখে দিলেন তিনি।
আলতাফ সাহেব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার পরনে আয়রন করা গাঢ় নীল রঙের স্যুট। তিনি তার এক্সিকিউটিভ টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিলেন। সবসময় তার নিজস্ব ড্রাইভার থাকে, যে তাকে অফিসে আনা-নেওয়া করে। কিন্তু আজ তিনি কাউকে কিছু না বলেই নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মনের গভীরে কে যেন ফিসফিস করে বলছিল—আজকের যাত্রাটা কোনো ব্যবসায়িক মিটিংয়ের নয়, এটি এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত কৌতূহল ও অবচেতনের টানে গড়া এক রহস্যময় পথচলা।
অফিসের বেসমেন্টে নেমে নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন তিনি। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথে এসি-র ঠান্ডা হাওয়া তাকে ঘিরে ধরল। তিনি স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে রাস্তার দিকে ছুটিয়ে দিলেন।
মালেকের দেওয়া ঠিকানাটা তার পকেটের নোটপ্যাডে লেখা ছিল। পুরান ঢাকার এক সংলগ্ন গলি, যেখানে রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের কোলাহল সবসময় লেগেই থাকে। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে আলতাফ সাহেব ভাবছিলেন, তার মতো একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, যিনি প্রতিদিন কোটি টাকার ডিল সই করেন, তিনি কেন আজ স্বেচ্ছায় এমন একটা নিম্নবিত্ত এলাকায় সিকিউরিটি গার্ডের বাসায় লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন? এর উত্তর তার নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল না।
....
ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার দুপুরের খাবারের কথা চূড়ান্ত করার সময় আলতাফ সাহেব মালেককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তার কেবিনে।
মালেক তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রুমে ঢুকেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো চেয়ারম্যান সাহেব রেগে গিয়ে তার আগের কথা ফিরিয়ে নেবেন বা বকাঝকা করবেন। কিন্তু আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর গলায় যে কথাটি বলেছিলেন, তাতে মালেক অবাক হয়েছিল বৈকি, তবে তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত হয়েছিল।
আলতাফ সাহেব ফাইলপত্র থেকে চোখ তুলে মালেকের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "মালেক, তোমার স্ত্রীর রান্নার কথা তো বল্লে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"
মালেক হাত জোড় করে আমতা আমতা করে বলেছিল, "শর্ত, স্যার? কী শর্ত? আপনার যেকোনো হুকুম মাথা পেতে নেব স্যার।"
"শোনো," আলতাফ সাহেব তার চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে একটু ঝুঁকে বসেছিলেন। "আমি যখন তোমাদের বাসায় খেতে যাব, তখন তোমার স্ত্রী যেন কোনো ধরনের পর্দা, * বা * পরে আমার সামনে না আসে। আমি এসব ভনিতা বা মুখ ঢাকাঢাকি পছন্দ করি না। আমি দেখতে চাই যাকে সে রান্না করাচ্ছে, তার মুখের অভিব্যক্তি কেমন। পরিষ্কার কথা, সে উন্মুক্ত মুখে আমার সামনে আসবে। পারবে তো এটা নিশ্চিত করতে?"
কথাটা শুনে মালেক একটু থমকে গিয়েছিল। তাদের পরিবার বা সামাজিক মফস্বলে ঘরের বউরা সাধারণত একটু রাখঢাক করে চলে। কিন্তু আলতাফ সাহেবের মতো এমন একজন প্রতাপশালী ও প্রভাবশালী মানুষের মুখের ওপর 'না' বলার সাহস বা ধৃষ্টতা মালেকের ছিল না। তাছাড়া, চেয়ারম্যান সাহেব তার ত্রাতা, তার অন্নদাতা। তিনি যা বলবেন, সেটাই তার কাছে আইন।
মালেক দ্রুত মাথা নিচু করে সায় দিয়ে বলেছিল, "জি আচ্ছা স্যার! আপনার কোনো অসুবিধা হবে না স্যার। ও কোনো পর্দা করবে না আপনার সামনে। আপনি যে সময় বলবেন, আমি সব ঠিক করে রাখব।"
"বেশ। আমি নিজেই আসছি পরশু দিন দুপুরে। ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যাও," আলতাফ সাহেব অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন।
.....
বুধবার দুপুর। ঘড়িতে তখন ঠিক একটা বেজে দশ মিনিট। মালেকের বাসার সামনে এসে আলতাফ সাহেব তার গাড়িটা পার্ক করলেন। চারপাশের ঘিঞ্জি পরিবেশ, গলির সরু রাস্তা আর রিকশার জট—সব মিলিয়ে এই জায়গার সাথে আলতাফ সাহেবের অভিজাত গুলশানের ফ্ল্যাট বা আলিশান অফিসের আকাশ-পাতাল তফাত।
তিনি গাড়ি থেকে নামলেন। গায়ে আজও সেই পরিপাটি স্যুট, যদিও এই পরিবেশের সাথে তা বেমানান। তার হাতে একটা সুন্দর গিফট র্যাপ করা মাঝারি আকারের উপহারের ব্যাগ। তিনি গলির ভেতরে একটু হেঁটে নির্দিষ্ট বিল্ডিংটার সামনে এসে পৌঁছালেন। তিন তলার ছোট ফ্ল্যাট। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখলেন দরজাটা সামান্য খোসা মেলা, আর বাইরে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মালেক।
মালেক চেয়ারম্যান সাহেবকে নিজের চোখের সামনে ওই গলি দিয়ে উঠতে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে একটা কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তার মতো একজন সাধারণ গার্ডের নুন-ভাত খাওয়ার ছোট্ট বাসায় চলে এসেছেন!
"স্যার! আপনি... আপনি নিজে ড্রাইভ করে চলে এসেছেন? আমাকে তো বললেই আমি গাড়ি রিসিভ করতাম বা আপনাকে নিয়ে আসতাম!" মালেক প্রায় দৌড়ে এসে দুই হাত জোড় করে ফেলল, তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত গলায় বললেন, "দরকার নেই। তোমার ঠিকানাটা আমার জিপিএসে ছিল, চলে এসেছি। দরজা খোলো।"
মালেক তাড়াতাড়ি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ধরে বলল, "আসুন স্যার, ভেতরে আসুন। আমাদের এই গরিবখানায় আপনাকে স্বাগতম।"
আলতাফ সাহেব জুতো খুলে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। এটি একটি ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাট। ড্রয়িং কাম ডাইনিং স্পেসটা বেশ ছোট, একটা পুরোনো প্লাস্টিকের টেবিল আর দুটো চেয়ার পাতা। এক কোণে একটা ছোট খাট আর সামান্য কিছু আসবাবপত্র। ঘরের ভেতর থেকে রান্নার দারুণ একটা সুবাস ভেসে আসছিল—দেশি মুরগির মাংস আর গরম মশলার সুবাস। পুরো বাড়িটা ছিমছাম পরিষ্কার, যদিও জায়গার অভাব স্পষ্ট।
মালেক অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, "স্যার, দয়া করে এখানে বসুন। আমি একটু হাত-মুখ ধোয়ার পানি নিয়ে আসছি। আর... ইতি! ওগো শুনেছ? স্যার চলে এসেছেন!"
...
মালেকের ডাক শুনে ভেতরের রুমের পর্দাটা একটু সরে গেল। তারপর পর্দা সরিয়ে যে নারীটি বাইরে বেরিয়ে এল, তাকে দেখে আলতাফ সাহেবের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তিনি টেবিলে রাখা গিফট ব্যাগটা হাত থেকে নামাতে ভুলে গেলেন। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল সামনের মানুষটির ওপর।
ইতি—মালেকের নববিবাহিতা স্ত্রী। তার বয়স কুড়ির কোঠায় হবে। তার গায়ের রঙ দুধের মতো ফর্সা, মুখাবয়ব অত্যন্ত কোমল ও নিখুঁত। চুলগুলো অত্যন্ত যত্নে পেছনের দিকে টেনে শক্ত করে খোপা করা, যার কারণে কপালটা আরও উজ্জ্বল ও প্রশস্ত দেখাচ্ছে। তার চোখের মণি দুটো বড় বড়, গভীর ও মায়াবী। ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি ও সহজ হাসি লেগে আছে, যা ঘরের অন্ধকার কোণটাকেও আলোকিত করে তুলেছে।
তার পরনে ছিল একটা ঘিয়ে বা হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটা অত্যন্ত পরিপাটি করে কাঁধের ওপর গোঁজা। আর তার ব্লাউজটা ছিল বেশ আধুনিক ও খোলামেলা কাটের—পাতলা ফিতার স্লিভলেস স্টাইলের হোয়াইট ইনার বা ব্লাউজের ওপর শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে ঝুলে ছিল, যা তার শরীরের লাবণ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। আলতাফ সাহেব জীবনে বহু রূপসী মডেল বা উচ্চবিত্ত নারী দেখেছেন, কিন্তু এমন নিখুঁত, মেকআপহীন অথচ তীব্র আকর্ষণীয় গ্রামীণ সৌন্দর্য তিনি এর আগে কখনো দেখেননি।
ইতি আলতাফ সাহেবের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সামান্য ভয় ও প্রচুর শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক অদ্ভুত আলো। সে বিন্দুমাত্র পর্দা না করে সরাসরি আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাল।
মালেক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "স্যার, এ হলো ইতি... আমার বউ। ইতি, ইনিই হলেন সিরাজ সাহেব, আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান স্যার, যার দয়ায়..."
ইতি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ল। সে আলতাফ সাহেবের জুতোর সামনে হাত রেখে তাকে ভক্তিভরে পা ছুঁয়ে সালাম করার চেষ্টা করল।
আলতাফ সাহেব যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি এক মুহূর্তে নিজের চেয়ার ছেড়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে ইতির কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে ফেললেন।
"এ কী করছ! ওঠো... ওঠো বলছি!" আলতাফ সাহেবের গলার স্বরটা সামান্য কেঁপে উঠল।
তিনি যখন ইতির দুটো নরম কাঁধ ধরে তাকে ওপরের দিকে তুললেন, তখন তাদের দুজনের শারীরিক দূরত্ব অত্যন্ত কমে এল। ইতি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। তার বুক তখনো মৃদু হাপাতে শুরু করেছে। আলতাফ সাহেব তার কাঁধ থেকে হাত সরালেন না—তিনি আধা সেকেন্ড বা এক সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে একেবারে একদৃষ্টিতে ইতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চোখের ভেতর কোনো কর্পোরেট কঠোরতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিমোহিত মোহগ্রস্ত দৃষ্টি।
ইতি লজ্জা পেয়ে তার মাথা নিচু করে ফেলল। সে আলতাফ সাহেবের ওই গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে একটু আষ্টেপৃষ্ঠে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে ফিসফিস করে বলল, "স্যার... আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? প্লিজ... বসুন না।"
......
আলতাফ সাহেব যান্ত্রিকভাবে একটা চেয়ারে এসে বসলেন। কিন্তু তার মনের ভেতর তখন প্রবল ঝড় বইছে। তার কানের ভেতরে হাতুড়ি পেটানোর মতো শব্দ হচ্ছিল।
সামনে বসা ইতি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল মেহমানকে আপ্যায়ন করার জন্য। সে বলল, "স্যার, আপনি একটু বসুন। আমি হাত ধোয়ার পানি আর আপনাদের জন্য জুস নিয়ে আসছি। রান্না প্রায় হয়ে গেছে।"
বলে সে দ্রুত আবার ভেতরের রুমে চলে গেল। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পরও তার সুতির শাড়ির সুবাস আর তার সেই মায়াবী মুখের অবয়ব আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
চেয়ারে বসে থাকা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথাটা কেমন যেন ঘুরছিল। তিনি নিজের দুহাতে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার জীবনের গত ত্রিশ বছরের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, সমস্ত নিয়ম ও শৃঙ্খলা এই মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তার মনের অতল গভীরে এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত তীব্র একটা ভাবনা জন্ম নিল—যা শোনার বা ভাবার কোনো অধিকার তার নেই।
তার মস্তিষ্কের কোণ থেকে কে যেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে উঠল:
এই মেয়েটি... এই ইতি কি আদৌ কোনো সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী হওয়ার যোগ্য? এই রূপ, এই কোমলতা, এই মায়াবী দৃষ্টি—এ কি কোনো গরিবের কুটিরে মানায়? এ তো কোনো রাজপ্রাসাদের রানি হওয়ার কথা ছিল!
তার মনের অবচেতন মন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তিনি নিজের অজান্তেই ভাবতে শুরু করলেন—মালেক তো নিতান্তই একজন সাধারণ গার্ড, অভাবের তাড়নায় দিন কাটানো মানুষ। সে কীভাবে এই তরুণী ও রূপসী মেয়ের স্বামী হতে পারে? এটা তো একটা মারাত্মক অসঙ্গতি!
আর তখনই আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতর একটা তীব্র বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। তার সমস্ত রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। তার মনের গভীরে এক অবাস্তব, ঘোরলাগা অনুভূতি তাকে গ্রাস করে ফেলল—
ইতির কি ওই গার্ডটার স্ত্রী হিসেবে থাকা উচিত? নাকি... নাকি ওর প্রকৃত জায়গা হওয়া উচিত আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল শূন্য ফ্ল্যাটে, যেখানে সে কেবল কোনো পুত্রবধূ নয়... বরং এই বয়সে এসেও এক নিঃসঙ্গ পুরুষের একমাত্র জীবনসঙ্গী, তাঁর নিজের স্ত্রী হিসেবে থাকবে?
চিন্তাটা মাথায় আসতেই আলতাফ সাহেব শিউরে উঠলেন। তিনি নিজেই নিজের এই ধারণায় আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি কে? তিনি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী! দেশের অন্যতম শীর্ষ কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব! তাঁর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, আর এই মেয়েটি কুড়ির কোঠার তরুণী! তিনি একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীর দিকে এমন কুৎসিত, অবাস্তব এবং লোভী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন? এ কোন পাপে তিনি জড়িয়ে পড়ছেন?
ঠিক সেই মুহূর্তে ইতি ট্রে হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখে সেই সরল হাসি, হাতে গ্লাসের ট্রে। সে এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে আলতাফ সাহেবের সামনে গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
"স্যার, ঠাণ্ডা পানিটা খান। গরমের মধ্যে কষ্ট করে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।"
ইতি যখন গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছে, তখন তার খোলামেলা ব্লাউজের মধ্য দিয়ে তার সুগঠিত গলার হাড় আর কাঁধের নিখুঁত চামড়া আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে আরও স্পষ্টভাবে ভেসে উঠল। আলতাফ সাহেব আবেশের মতো তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপল। তিনি গ্লাসটা নেওয়ার সময় ইতির আঙুলের সাথে নিজের আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বাইরে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার উপক্রম, কিন্তু আলতাফ সাহেবের ভেতরের দুনিয়াটায় এক প্রলয় শুরু হয়ে গেছে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা নেই। (চলবে)
পরের দিন সকাল থেকেই অফিসের বাতাসটা কেমন যেন থমথমে ছিল। আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কেবিনের চারপাশের গ্লাস ওয়ালের বাইরে কর্মচারীরা আসা-যওয়া করছে অত্যন্ত সন্তর্পণে, যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা বজায় থাকে। কিন্তু খোদ আলতাফ সাহেবের নিজের মনের ভেতর কী যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না। গত ত্রিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে এমন কোনো দিন আসেনি যেদিন তিনি কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে এত দীর্ঘ সময় ভেবেছেন।
দুপুর তখন প্রায় বারোটা বাজে। ইন্টারকমের লাল বাতিটা জ্বলতেই আলতাফ সাহেব রিসিভার তুলে নিলেন। ওপাশ থেকে এইচআর ম্যানেজারের গলা ভেসে এল, "স্যার, দুপুরের মিটিংয়ের ফাইলগুলো কি...?"
"আজকের সমস্ত মিটিং ক্যানসেল করে দাও," আলতাফ সাহেবের ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
ম্যানেজার সামান্য থমকে গিয়ে বললেন, "ক্যানসেল, স্যার? কিন্তু ওই বিদেশি ডেলিগেটসদের সাথে..."
"আমি যা বলেছি তাই করো। আর কোনো কথা শুনতে চাই না," রিসিভারটা রেখে দিলেন তিনি।
আলতাফ সাহেব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার পরনে আয়রন করা গাঢ় নীল রঙের স্যুট। তিনি তার এক্সিকিউটিভ টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিলেন। সবসময় তার নিজস্ব ড্রাইভার থাকে, যে তাকে অফিসে আনা-নেওয়া করে। কিন্তু আজ তিনি কাউকে কিছু না বলেই নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মনের গভীরে কে যেন ফিসফিস করে বলছিল—আজকের যাত্রাটা কোনো ব্যবসায়িক মিটিংয়ের নয়, এটি এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত কৌতূহল ও অবচেতনের টানে গড়া এক রহস্যময় পথচলা।
অফিসের বেসমেন্টে নেমে নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন তিনি। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথে এসি-র ঠান্ডা হাওয়া তাকে ঘিরে ধরল। তিনি স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে রাস্তার দিকে ছুটিয়ে দিলেন।
মালেকের দেওয়া ঠিকানাটা তার পকেটের নোটপ্যাডে লেখা ছিল। পুরান ঢাকার এক সংলগ্ন গলি, যেখানে রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের কোলাহল সবসময় লেগেই থাকে। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে আলতাফ সাহেব ভাবছিলেন, তার মতো একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, যিনি প্রতিদিন কোটি টাকার ডিল সই করেন, তিনি কেন আজ স্বেচ্ছায় এমন একটা নিম্নবিত্ত এলাকায় সিকিউরিটি গার্ডের বাসায় লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন? এর উত্তর তার নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল না।
....
ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার দুপুরের খাবারের কথা চূড়ান্ত করার সময় আলতাফ সাহেব মালেককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তার কেবিনে।
মালেক তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রুমে ঢুকেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো চেয়ারম্যান সাহেব রেগে গিয়ে তার আগের কথা ফিরিয়ে নেবেন বা বকাঝকা করবেন। কিন্তু আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর গলায় যে কথাটি বলেছিলেন, তাতে মালেক অবাক হয়েছিল বৈকি, তবে তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত হয়েছিল।
আলতাফ সাহেব ফাইলপত্র থেকে চোখ তুলে মালেকের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "মালেক, তোমার স্ত্রীর রান্নার কথা তো বল্লে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"
মালেক হাত জোড় করে আমতা আমতা করে বলেছিল, "শর্ত, স্যার? কী শর্ত? আপনার যেকোনো হুকুম মাথা পেতে নেব স্যার।"
"শোনো," আলতাফ সাহেব তার চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে একটু ঝুঁকে বসেছিলেন। "আমি যখন তোমাদের বাসায় খেতে যাব, তখন তোমার স্ত্রী যেন কোনো ধরনের পর্দা, * বা * পরে আমার সামনে না আসে। আমি এসব ভনিতা বা মুখ ঢাকাঢাকি পছন্দ করি না। আমি দেখতে চাই যাকে সে রান্না করাচ্ছে, তার মুখের অভিব্যক্তি কেমন। পরিষ্কার কথা, সে উন্মুক্ত মুখে আমার সামনে আসবে। পারবে তো এটা নিশ্চিত করতে?"
কথাটা শুনে মালেক একটু থমকে গিয়েছিল। তাদের পরিবার বা সামাজিক মফস্বলে ঘরের বউরা সাধারণত একটু রাখঢাক করে চলে। কিন্তু আলতাফ সাহেবের মতো এমন একজন প্রতাপশালী ও প্রভাবশালী মানুষের মুখের ওপর 'না' বলার সাহস বা ধৃষ্টতা মালেকের ছিল না। তাছাড়া, চেয়ারম্যান সাহেব তার ত্রাতা, তার অন্নদাতা। তিনি যা বলবেন, সেটাই তার কাছে আইন।
মালেক দ্রুত মাথা নিচু করে সায় দিয়ে বলেছিল, "জি আচ্ছা স্যার! আপনার কোনো অসুবিধা হবে না স্যার। ও কোনো পর্দা করবে না আপনার সামনে। আপনি যে সময় বলবেন, আমি সব ঠিক করে রাখব।"
"বেশ। আমি নিজেই আসছি পরশু দিন দুপুরে। ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যাও," আলতাফ সাহেব অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন।
.....
বুধবার দুপুর। ঘড়িতে তখন ঠিক একটা বেজে দশ মিনিট। মালেকের বাসার সামনে এসে আলতাফ সাহেব তার গাড়িটা পার্ক করলেন। চারপাশের ঘিঞ্জি পরিবেশ, গলির সরু রাস্তা আর রিকশার জট—সব মিলিয়ে এই জায়গার সাথে আলতাফ সাহেবের অভিজাত গুলশানের ফ্ল্যাট বা আলিশান অফিসের আকাশ-পাতাল তফাত।
তিনি গাড়ি থেকে নামলেন। গায়ে আজও সেই পরিপাটি স্যুট, যদিও এই পরিবেশের সাথে তা বেমানান। তার হাতে একটা সুন্দর গিফট র্যাপ করা মাঝারি আকারের উপহারের ব্যাগ। তিনি গলির ভেতরে একটু হেঁটে নির্দিষ্ট বিল্ডিংটার সামনে এসে পৌঁছালেন। তিন তলার ছোট ফ্ল্যাট। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখলেন দরজাটা সামান্য খোসা মেলা, আর বাইরে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মালেক।
মালেক চেয়ারম্যান সাহেবকে নিজের চোখের সামনে ওই গলি দিয়ে উঠতে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে একটা কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তার মতো একজন সাধারণ গার্ডের নুন-ভাত খাওয়ার ছোট্ট বাসায় চলে এসেছেন!
"স্যার! আপনি... আপনি নিজে ড্রাইভ করে চলে এসেছেন? আমাকে তো বললেই আমি গাড়ি রিসিভ করতাম বা আপনাকে নিয়ে আসতাম!" মালেক প্রায় দৌড়ে এসে দুই হাত জোড় করে ফেলল, তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত গলায় বললেন, "দরকার নেই। তোমার ঠিকানাটা আমার জিপিএসে ছিল, চলে এসেছি। দরজা খোলো।"
মালেক তাড়াতাড়ি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ধরে বলল, "আসুন স্যার, ভেতরে আসুন। আমাদের এই গরিবখানায় আপনাকে স্বাগতম।"
আলতাফ সাহেব জুতো খুলে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। এটি একটি ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাট। ড্রয়িং কাম ডাইনিং স্পেসটা বেশ ছোট, একটা পুরোনো প্লাস্টিকের টেবিল আর দুটো চেয়ার পাতা। এক কোণে একটা ছোট খাট আর সামান্য কিছু আসবাবপত্র। ঘরের ভেতর থেকে রান্নার দারুণ একটা সুবাস ভেসে আসছিল—দেশি মুরগির মাংস আর গরম মশলার সুবাস। পুরো বাড়িটা ছিমছাম পরিষ্কার, যদিও জায়গার অভাব স্পষ্ট।
মালেক অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, "স্যার, দয়া করে এখানে বসুন। আমি একটু হাত-মুখ ধোয়ার পানি নিয়ে আসছি। আর... ইতি! ওগো শুনেছ? স্যার চলে এসেছেন!"
...
মালেকের ডাক শুনে ভেতরের রুমের পর্দাটা একটু সরে গেল। তারপর পর্দা সরিয়ে যে নারীটি বাইরে বেরিয়ে এল, তাকে দেখে আলতাফ সাহেবের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তিনি টেবিলে রাখা গিফট ব্যাগটা হাত থেকে নামাতে ভুলে গেলেন। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল সামনের মানুষটির ওপর।
ইতি—মালেকের নববিবাহিতা স্ত্রী। তার বয়স কুড়ির কোঠায় হবে। তার গায়ের রঙ দুধের মতো ফর্সা, মুখাবয়ব অত্যন্ত কোমল ও নিখুঁত। চুলগুলো অত্যন্ত যত্নে পেছনের দিকে টেনে শক্ত করে খোপা করা, যার কারণে কপালটা আরও উজ্জ্বল ও প্রশস্ত দেখাচ্ছে। তার চোখের মণি দুটো বড় বড়, গভীর ও মায়াবী। ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি ও সহজ হাসি লেগে আছে, যা ঘরের অন্ধকার কোণটাকেও আলোকিত করে তুলেছে।
তার পরনে ছিল একটা ঘিয়ে বা হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটা অত্যন্ত পরিপাটি করে কাঁধের ওপর গোঁজা। আর তার ব্লাউজটা ছিল বেশ আধুনিক ও খোলামেলা কাটের—পাতলা ফিতার স্লিভলেস স্টাইলের হোয়াইট ইনার বা ব্লাউজের ওপর শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে ঝুলে ছিল, যা তার শরীরের লাবণ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। আলতাফ সাহেব জীবনে বহু রূপসী মডেল বা উচ্চবিত্ত নারী দেখেছেন, কিন্তু এমন নিখুঁত, মেকআপহীন অথচ তীব্র আকর্ষণীয় গ্রামীণ সৌন্দর্য তিনি এর আগে কখনো দেখেননি।
ইতি আলতাফ সাহেবের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সামান্য ভয় ও প্রচুর শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক অদ্ভুত আলো। সে বিন্দুমাত্র পর্দা না করে সরাসরি আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাল।
মালেক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "স্যার, এ হলো ইতি... আমার বউ। ইতি, ইনিই হলেন সিরাজ সাহেব, আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান স্যার, যার দয়ায়..."
ইতি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ল। সে আলতাফ সাহেবের জুতোর সামনে হাত রেখে তাকে ভক্তিভরে পা ছুঁয়ে সালাম করার চেষ্টা করল।
আলতাফ সাহেব যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি এক মুহূর্তে নিজের চেয়ার ছেড়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে ইতির কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে ফেললেন।
"এ কী করছ! ওঠো... ওঠো বলছি!" আলতাফ সাহেবের গলার স্বরটা সামান্য কেঁপে উঠল।
তিনি যখন ইতির দুটো নরম কাঁধ ধরে তাকে ওপরের দিকে তুললেন, তখন তাদের দুজনের শারীরিক দূরত্ব অত্যন্ত কমে এল। ইতি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। তার বুক তখনো মৃদু হাপাতে শুরু করেছে। আলতাফ সাহেব তার কাঁধ থেকে হাত সরালেন না—তিনি আধা সেকেন্ড বা এক সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে একেবারে একদৃষ্টিতে ইতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চোখের ভেতর কোনো কর্পোরেট কঠোরতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিমোহিত মোহগ্রস্ত দৃষ্টি।
ইতি লজ্জা পেয়ে তার মাথা নিচু করে ফেলল। সে আলতাফ সাহেবের ওই গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে একটু আষ্টেপৃষ্ঠে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে ফিসফিস করে বলল, "স্যার... আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? প্লিজ... বসুন না।"
......
আলতাফ সাহেব যান্ত্রিকভাবে একটা চেয়ারে এসে বসলেন। কিন্তু তার মনের ভেতর তখন প্রবল ঝড় বইছে। তার কানের ভেতরে হাতুড়ি পেটানোর মতো শব্দ হচ্ছিল।
সামনে বসা ইতি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল মেহমানকে আপ্যায়ন করার জন্য। সে বলল, "স্যার, আপনি একটু বসুন। আমি হাত ধোয়ার পানি আর আপনাদের জন্য জুস নিয়ে আসছি। রান্না প্রায় হয়ে গেছে।"
বলে সে দ্রুত আবার ভেতরের রুমে চলে গেল। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পরও তার সুতির শাড়ির সুবাস আর তার সেই মায়াবী মুখের অবয়ব আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
চেয়ারে বসে থাকা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথাটা কেমন যেন ঘুরছিল। তিনি নিজের দুহাতে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার জীবনের গত ত্রিশ বছরের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, সমস্ত নিয়ম ও শৃঙ্খলা এই মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তার মনের অতল গভীরে এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত তীব্র একটা ভাবনা জন্ম নিল—যা শোনার বা ভাবার কোনো অধিকার তার নেই।
তার মস্তিষ্কের কোণ থেকে কে যেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে উঠল:
এই মেয়েটি... এই ইতি কি আদৌ কোনো সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী হওয়ার যোগ্য? এই রূপ, এই কোমলতা, এই মায়াবী দৃষ্টি—এ কি কোনো গরিবের কুটিরে মানায়? এ তো কোনো রাজপ্রাসাদের রানি হওয়ার কথা ছিল!
তার মনের অবচেতন মন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তিনি নিজের অজান্তেই ভাবতে শুরু করলেন—মালেক তো নিতান্তই একজন সাধারণ গার্ড, অভাবের তাড়নায় দিন কাটানো মানুষ। সে কীভাবে এই তরুণী ও রূপসী মেয়ের স্বামী হতে পারে? এটা তো একটা মারাত্মক অসঙ্গতি!
আর তখনই আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতর একটা তীব্র বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। তার সমস্ত রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। তার মনের গভীরে এক অবাস্তব, ঘোরলাগা অনুভূতি তাকে গ্রাস করে ফেলল—
ইতির কি ওই গার্ডটার স্ত্রী হিসেবে থাকা উচিত? নাকি... নাকি ওর প্রকৃত জায়গা হওয়া উচিত আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল শূন্য ফ্ল্যাটে, যেখানে সে কেবল কোনো পুত্রবধূ নয়... বরং এই বয়সে এসেও এক নিঃসঙ্গ পুরুষের একমাত্র জীবনসঙ্গী, তাঁর নিজের স্ত্রী হিসেবে থাকবে?
চিন্তাটা মাথায় আসতেই আলতাফ সাহেব শিউরে উঠলেন। তিনি নিজেই নিজের এই ধারণায় আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি কে? তিনি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী! দেশের অন্যতম শীর্ষ কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব! তাঁর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, আর এই মেয়েটি কুড়ির কোঠার তরুণী! তিনি একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীর দিকে এমন কুৎসিত, অবাস্তব এবং লোভী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন? এ কোন পাপে তিনি জড়িয়ে পড়ছেন?
ঠিক সেই মুহূর্তে ইতি ট্রে হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখে সেই সরল হাসি, হাতে গ্লাসের ট্রে। সে এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে আলতাফ সাহেবের সামনে গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
"স্যার, ঠাণ্ডা পানিটা খান। গরমের মধ্যে কষ্ট করে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।"
ইতি যখন গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছে, তখন তার খোলামেলা ব্লাউজের মধ্য দিয়ে তার সুগঠিত গলার হাড় আর কাঁধের নিখুঁত চামড়া আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে আরও স্পষ্টভাবে ভেসে উঠল। আলতাফ সাহেব আবেশের মতো তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপল। তিনি গ্লাসটা নেওয়ার সময় ইতির আঙুলের সাথে নিজের আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বাইরে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার উপক্রম, কিন্তু আলতাফ সাহেবের ভেতরের দুনিয়াটায় এক প্রলয় শুরু হয়ে গেছে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা নেই। (চলবে)


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)