Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
৯

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের রাস্তার মোড়ে এসে থামতেই একটা হালকা হলুদ রঙের শেয়ার অটো এসে দাঁড়াল সামনে। 

বাগবাজারগামী অটোটাতে পেছনের আসনে দুটো সিট খালি। বিদিশা শালটা আরও একটু আঁটসাঁট করে চেপে ধরে নিঃশব্দে উঠে বসলেন।

ব্যস্ত ট্রাফিকের গর্জনের মাঝে অটোটি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে দ্রুত গতিতে এগোতে লাগল। কিন্তু অটোর ঝাঁকুনি আর অটোর ইঞ্জিনের চেনা ঘড়ঘড় শব্দের সাথে সাথে বিদিশার মনের চাকাটা ঘুরে পেছনে চলে যেতে লাগল। 

বাইরের চলমান শহরের দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে এল, আর বিদিশার ভাবনার জগৎটা গিয়ে পৌঁছল গতকালে,

[ফ্ল্যাশব্যাক]

সাতদিনের দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে গতকালই তিনি কলেজে যোগ দিয়েছেন। পরের দিন পঁচিশে ডিসেম্বর হওয়ায়, ক্লাসে চাপ তেমন ছিল না। অনেকদিন পরে পড়াতে ফিরে বিদিশারও ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগছিল।


কিন্তু বেলা বারোটা বাজতে না বাজতেই মেসেঞ্জার পিয়ন এসে খবর দিল, (গণিত বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট) ডঃ সিদ্ধার্থ বাগচী তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন।

বিদিশা যখন দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে ডক্টর বাগচীর কেবিনের ভারী সেগুন কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তখন তার বুকের ভেতরটা সতর্কতায় একরকম টানটান হয়ে ছিল। ফান্ড আটকে দেওয়ার যে নোংরা খেলাটা সুব্রত সেন খেলেছিল, তার মাস্টারমাইন্ড যে এই ডক্টর বাগচীই, সে বিষয়ে তিনি প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। 

অথচ এই মানুষটাই সিম্পোজিয়ামের প্রথম দিন যখন তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, সেই সময় ওনার মুখে কোনোরকম রাগ বা ভয়ের চিহ্ন দেখতে পাননি বিদিশা। সেদিক দিয়ে সুব্রত সেনের আচরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিতও বটে। ড. বাগচী যে খুব ভালো অভিনেতা একথা স্বীকার করতেই হবে।

বিদিশা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফাইলটা বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে ডান হাত দিয়ে দরজায় দুটো মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট টোকা দিলেন।

"কাম ইন", ভেতর থেকে ডক্টর বাগচীর রাশভারী গলা ভেসে এল।

বিদিশা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ডক্টর বাগচীর কেবিনটা বিদিশার কেবিনের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। ঘরটা বেশ বড়, মেঝেতে দেয়াল থেকে দেয়াল পর্যন্ত ছাই-রঙা কার্পেটে মোড়া, যা হাঁটার সব শব্দ শুষে নেয়। ঘরের একদিকের পুরো দেয়াল জুড়ে কাঁচের জানলা, যার ব্লাইন্ডসগুলো অর্ধেক নামানো।

জানলার ফাঁক দিয়ে আসা দুপুরের রোদ ডক্টর বাগচীর বিশাল মেহগনি কাঠের ডেস্কের একপাশে এসে পড়েছে। ঘরের সেন্ট্রাল এসির হাওয়াটা এখানে একটু বেশিই শীতল। বাতাসে বই, দামি এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ ভাসছে। 

এই ঘরের পরিবেশে এমন একটা আভিজাত্য এবং ক্ষমতার আস্ফালন আছে, যা যেকোনো জুনিয়র ফ্যাকাল্টিকে প্রথমেই মানসিকভাবে ছোট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ডক্টর বাগচী নিজের ডেস্কের ওপাশে একটা হাই-ব্যাক লেদার চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিলেন। বিদিশাকে ঢুকতে দেখে তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য নামিয়ে রাখলেন। তার চোখেমুখে আজ বিদিশা কোনো বিরক্তির চিহ্ন দেখতে পেলেন না। বরং, বিদিশাকে দেখে তার মুখে একটা অত্যন্ত মার্জিত হাসি ফুটে উঠল।

"আসুন মিস গাঙ্গুলি। প্লিজ টেক এ সিট।"

কিন্তু বিদিশার তার শান্ত মুখোশে কোনো ফাটল ধরতে দিলেন না। তার চোখের দৃষ্টি স্থির, মুখের পেশিগুলো একদম রিল্যাক্সড। তিনি ডক্টর বাগচীর এই আপাত-নির্দোষ হাসির পেছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী, সেটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন।

"আপনি যেভাবে পুরো ইভেন্টটা হ্যান্ডেল করেছেন, তার কোনো তুলনাই হয় না।"

ডক্টর বাগচী একটু থামলেন। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত মোলায়েম গলায় বললেন, 

"প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে সব বলেছেন।"

বিদিশার চোখের পলক এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। 

'সব বলেছেন? কতটা?'

"ফান্ডিং আটকে যাওয়া সত্ত্বেও আপনি যেভাবে নিজের পকেট থেকে আড়াই লাখ টাকা বের করে ইভেন্টটা উতরে দিয়েছেন, সেটার জন্য প্রিন্সিপাল স্যার আপনার অনেক প্রশংসা করেছেন," ডক্টর বাগচী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলে চললেন। 

"অ্যাকাউন্টসের ওই টেকনিক্যাল এররটার জন্য শেষ মুহূর্তে একটা বড় ডিজাস্টার হতে পারত। কিন্তু আপনার প্রেজেন্স অফ মাইন্ড আর ডেডিকেশন আমাদের কলেজের সম্মান বাঁচিয়ে দিয়েছে। আই মাস্ট সে, আপনার এই ডেডিকেশন সত্যিই প্রশংসনীয়।"

বিদিশা চুপচাপ বসে রইলেন। ডক্টর বাগচীর গলার স্বরে এক ফোঁটাও মেকি ভাব নেই। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সত্যিই বিদিশার এই কাজে অত্যন্ত গর্বিত।

কিন্তু বিদিশার মন অন্য কথা বলছে। 

'অ্যাকাউন্টসের টেকনিক্যাল এরর?'

বিদিশার মনের ভেতর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল। সুব্রত সেনের ওই জালিয়াতির ফাইল আটকানোর ব্যাপারটা ডক্টর বাগচীর মতো একজন ধূর্ত এইচওডি জানবেন না, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এই পুরো ফান্ডিং ক্রাইসিসটা যে তাকে তাড়ানোর একটা সাজানো নাটক ছিল, সেটা বিদিশা জানেন। আর এখন, যখন বিদিশা সেই ফাঁদটা কেটে বেরিয়ে এসেছেন, তখন ডক্টর বাগচী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে 'টেকনিক্যাল এরর'-এর দোহাই দিয়ে সুব্রত সেনকে বাঁচাচ্ছেন এবং নিজেকে পুরো ব্যাপারটার থেকে আলাদা করে নিচ্ছেন।

সত্যিই, কী অসামান্য অভিনয়! প্রথমে ভাড়াটে খুনিকে সুপারি দিয়ে খুনের চেষ্টা। তারপর ব্যর্থ হলে ক্ষতর জায়গায় ব্যান্ডেজের প্রলেপ লাগানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া। বিদিশার ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তেই ওই লোকটার এই মেকি ভদ্রতার মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু এটা আবেগ দেখানোর জায়গা নয়। এখানে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে।

"থ্যাংক ইউ, স্যার।" বিদিশা অত্যন্ত মাপা গলায় উত্তর দিলেন। "কলেজের সম্মান বাঁচানোটা আমার দায়িত্ব ছিল। ফান্ড কোত্থেকে এল, সেটা বড় কথা নয়; ইভেন্টটা সাকসেসফুল হওয়াটাই আসল কথা।"

"অ্যাবসোলিউটলি!" 

ডক্টর বাগচী হাসিমুখে সায় দিলেন।

তারপর তিনি একটু সোজা হয়ে বসলেন। তার মুখের হাসিটা সামান্য ছোট হয়ে এল, চোখের দৃষ্টিতে একটা গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। ঘরের আবহাওয়ার মধ্যে হঠাৎ করেই একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল।

"মিস গাঙ্গুলি, আপনাকে ডেকে পাঠানোর কারণটা বেশ জরুরি।" 

ডক্টর বাগচী গলার স্বরটা সামান্য নামিয়ে বললেন।

বিদিশার পেশিগুলো আবার টানটান হয়ে উঠল। 

"বলুন, স্যার।"

ডক্টর বাগচী অভ্যাসবশত ডেস্কের ওপর রাখা একটা পেপারওয়েট ঘোরানো শুরু করলেন।

"আমাদের কলেজের 'স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটি'-তে একটা জায়গা খালি হয়েছে। আপনি হয়তো জানেন, এই কমিটি কলেজের একটা গুরুত্বপূর্ণ বডি। স্টুডেন্টদের আর্থিক সহায়তা, স্কলারশিপ, কাউন্সেলিং, ক্যাম্পাসে তাদের সেফটি মেনটেইন করা, স্টুডেন্টরা ফেসিলিটিজ ঠিকঠাক পাচ্ছে কি না সেটা দেখা; এগুলো স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটির কাজের মধ্যে পড়ে।"

বিদিশা চুপ করে শুনছেন।

"পজিশনটা আমরা প্রথমে নন্দিতা দাশগুপ্তকে অফার করেছিলাম।" 

ডক্টর বাগচী পেপারওয়েট থেকে চোখ তুলে বিদিশার দিকে তাকালেন। 

"উনি আমাদের একজন পুরোনো এবং সিনিয়র ফ্যাকাল্টি। কিন্তু নন্দিতা ম্যাডাম কিছু ব্যক্তিগত কারণে এই দায়িত্বটা নিতে চাইছেন না।"

ডক্টর বাগচী একটু থামলেন, যেন বিদিশাকে এই ভাবার সময় দিচ্ছেন। তারপর তিনি সরাসরি বিদিশার চোখে চোখ রেখে বললেন, 

"তাই, আমি আর প্রিন্সিপাল স্যার এই পজিশনটার জন্য আপনাকে কনসিডার করছি।"

বিদিশার চোখের তারা একবার প্রসারিত হয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি প্রবলভাবে চমকে গেলেও সেটা প্রাণপণে সামলে নিলেন।
ডক্টর বাগচীর সামনে তিনি কোনভাবেই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দিতে চান না।

চকিতে তার মনে পড়ে গেছিল অনামিকা রায়ের সেদিনের হেঁয়ালি ভরা কথাগুলো,

এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি... ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়...'
এই কলেজে তিনি জয়েন করেছেন মেরেকেটে চার মাস। তিনি এখনো একজন প্রবেশনারি পিরিয়ডে আছেন; তার পার্মানেন্ট হতে এখনো অনেক দেরি। এই কলেজের নিয়মকানুন সম্পর্কে তিনি এখনো পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। 

কোনভাবেই তিনি এই ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পাবার যোগ্য নন। অন্তত, দশ পনের বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষর কোনভাবেই বিবেচনা করার কথা নয়।

বিদিশা বুঝতে পারলেন এটা ডক্টর বাগচীর পাতা নতুন একটা ফাঁদ। এর সাথে যোগ্যতার কোন সম্পর্ক নেই।

কিন্তু, নন্দিতাদি 'না' করে দিলেন কেন ?

বিদিশা ঠিক করে নিলেন মুখের উপর না বলে একটু ঘুরিয়ে উত্তর দেবেন।

"ইটস এ হিউজ রেসপন্সিবিলিটি, স্যার। স্পেশালি আমার মতো নতুন একজন ফ্যাকাল্টির জন্য।" 
বিদিশা কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা ভেঙে ধীর গলায় বললেন। তার শান্ত গলার স্বরে একটা দ্বিধা মেশানো। 

"আমি কলেজে জয়েন করেছি খুব বেশিদিন হয়নি। আমার প্রবেশনারি পিরিয়ডও শেষ হয়নি। এত বড় একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটিতে আমার মতো একজন জুনিয়রকে... আর তাছাড়া, ম্যাথ ডিপার্টমেন্টে আরো অনেক সিনিয়র ফ্যাকাল্টি আছেন..."

ডক্টর বাগচী হাত তুলে বিদিশাকে থামিয়ে দিলেন। তার মুখে চওড়া, আত্মবিশ্বাসী হাসি।

"এক্সপেরিয়েন্স ইজ নট এভরিথিং, মিস গাঙ্গুলি। আপনার ম্যানেজমেন্ট স্কিল, আপনার ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং আর সবচেয়ে বড় কথা স্টুডেন্টদের প্রতি আপনার অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ। এগুলোই এই কমিটির জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার। প্রিন্সিপাল স্যারও আপনার ব্যাপারে অত্যন্ত পজিটিভ।"

বিদিশা সোজা হয়ে বসলেন। ডক্টর বাগচী হয় ইঙ্গিতটা বুঝতে পারছেন না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন।

"আমি প্রিন্সিপাল স্যার এবং আপনার কনফিডেন্সের জন্য গ্রেটফুল, স্যার। আপনারা আমার ওপর এত বড় ভরসা রাখছেন, এটা আমার কাছে বড় পাওনা।" 

বিদিশা মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন। তাকেও তো অভিনয়টা চালিয়ে যেতে হবে।

"কিন্তু, কমিটিটার কাজের পরিধি সম্পর্কে আমার কোনো আইডিয়া নেই। হঠাৎ করে এত বড় একটা দায়িত্ব নিলে যদি আমি জাস্টিফাই করতে না পারি, তবে কলেজেরই ক্ষতি। আমাকে ডিসিশন নেওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হবে।"

ডক্টর বাগচীর মুখের হাসিতে এক চুলও পরিবর্তন হলো না। তিনি যেন জানতেন বিদিশা একটু সময় চাইবেন।

"অফকোর্স, টেক ইওর টাইম।" 

ডক্টর বাগচী অত্যন্ত রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বললেন।

 "তবে এই সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের কমিটিটা রিকনস্টিটিউট করতে হবে। আপনি কালকের মধ্যে আপনার ডিসিশনটা আমাকে জানালে ভালো হয়।"

"শিওর, স্যার। আমি কাল সকালের মধ্যেই আপনাকে কনফার্ম করে দেব।" 

বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

"গ্রেট। হ্যাভ আ গুড ডে, মিস গাঙ্গুলি।" 

ডক্টর বাগচী আবার নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ ফেরালেন।

"গুড ডে, স্যার।" 
বিদিশা ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। কেবিন থেকে বেরিয়ে দরজাটা পেছনে বন্ধ করার সাথে সাথে বিদিশার মুখের সেই হাসিটা উবে গিয়ে সেখানে একটা গম্ভীর ভাব ফুটে উঠল।করিডোরের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি একটা গভীর শ্বাস নিলেন। 

[বর্তমান]

বিদিশার ভাবনাতে হঠাৎ ছেদ পড়ল। অটোর ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষে চেঁচিয়ে উঠল, 

"বাগবাজার মোড়! বাগবাজার মোড় এসে গেছে!"

অটোর ঝাঁকুনিতে বিদিশা আবার বাস্তবে ফিরে এলেন। কলেজ, ডক্টর বাগচীর অফিসঘর, তার কুটিল প্রস্তাব। সব এক মুহূর্তের জন্য বাগবাজার মোড়ের চেনা কোলাহলে তলিয়ে গেল। 

চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বিদিশা মোড়ের ফুটপাতে এসে দাঁড়ালেন।

ঘড়িতে চারটে।

গঙ্গার কোল ঘেঁষা এই পুরনো অঞ্চলে শীতের বিকেল ক্রমে ঘন হয়ে আসছে। সূর্য ততক্ষণে অনেকটা পশ্চিমের দিকে হেলে পড়েছে।

গঙ্গার পার থেকে আসা কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটা এসে গায়ে লাগতেই বিদিশা শালটা গালে ও ঘাড়ে আরও চেপে জড়ালেন।

একটু এগোতেই বিদিশা দেখলেন মোড়ের মাথায় ছাতার নিচে বসে এক বয়স্ক ট্রাফিক পুলিশ ট্রাফিক সামলাচ্ছেন। তিনি পা চালিয়ে ওনার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

"নমস্কার। একটু শুনবেন?" 

বিদিশা বিনীত সুরেই শুরু করলেন। ট্রাফিক পুলিশটি বিদিশার দিকে তাকিয়ে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, 

"হ্যাঁ বলুন, কোথায় যাবেন?"

"এখানে দুটো রাস্তা আছে শুনলাম, একটা দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট, আর একটা দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট। মুখার্জীবাড়িটা ঠিক কোন রাস্তায় পড়বে বলতে পারেন? পুরনো বেশ নামকরা ভিটে... শুনেছিলাম এককালে সেখানে দুর্গাপুজোও হতো।"

ট্রাফিক পুলিশটি কপালে হাত দিয়ে টুপিটা সামান্য একটু ঠেলে ওপরের দিকে তুলে একটু চিন্তা করলেন। তারপর দূর থেকে গঙ্গার দিকে যাওয়ার রাস্তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, 

"মুখার্জীবাড়ির পুজো বলতে আপনি লাহা বা বোসদের মতো বিখ্যাত পুজো খুঁজছেন কি না জানি না, তবে মুখার্জিদের ভিটে কিন্তু দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটেই। 

ওই রাস্তাটা ধরে সোজা গঙ্গার ঘাটের দিকে খানিকটা এগিয়ে যান। গলিটা বেশ পেঁচানো আর শান্ত। 

দুটো রাস্তা কিন্তু খুব বেশি দূরে নয়, একটায় না পেলে কাছেই ব্যানার্জী স্ট্রিট।"

"ধন্যবাদ।" 

বিদিশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মোড় থেকে ডানদিকের গলিটায় পা বাড়ালেন।

রাস্তার নামফলকটা দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে, ‘দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট’।

গলির ভেতর ঢুকতেই বাইরের ব্যস্ত রাস্তার শোরগোল যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। এখানে সময় যেন কয়েক দশক আগে থমকে গেছে। 

দু'পাশে প্রকাণ্ড সব বনেদি বাড়ি। কোনোটার অবস্থা শোচনীয়। চুনকাম খসে লোনাধরা ইট বেরিয়ে পড়েছে। আবার, কোনোটার ঝুলন্ত কাঠের জাফরি দেওয়া বারান্দায় এখনো সেকালের রাজকীয় ছোঁয়া। প্রাচীন লাল মেঝের দালান আর খড়খড়িওয়ালা জানালাগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে বিদিশার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল।

তিনি পার্স খুলে মায়ালু হাতে মায়ের সেই পুরনো সাদা-কালো ছবিটা বের করলেন।

ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বিশাল লম্বা একটা বারান্দা, আর তার ওপর সূক্ষ্ম নক্সা করা ঢালাই লোহার রেলিং। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এক তার মা।

এক পা এক পা করে এগোতে লাগলেন বিদিশা। প্রতিটা বাড়ির বারান্দার দিকে তীব্র কৌতূহল ও আশায় তাকিয়ে দেখছেন তিনি।

একটা জায়গায় এসে বিদিশা থমকে দাঁড়ালেন।

রাস্তার ঠিক শেষ মাথায়, গঙ্গার একবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল, গম্ভীর চেহারার দোতলা প্রাক-স্বাধীনতা যুগের প্রাসাদোপম বাড়ি। বাড়ির মূল ফটকের ওপর খোদাই করা নক্সা, আর দোতলার পুরোটা জুড়ে মেহগনি রঙের বিশাল বারান্দা। যার লোহার রেলিংয়ের নক্সাটা হুবহু ছবির নক্সাটার সাথে মিলে যাচ্ছে!

বিদিশার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

বাড়ির সদর দরজার কাঠ বেশ পুরনো, মোটা পেতলের খিল দেওয়া। দরজার একপাশে পেতলের একটা বেশ মলিন ফলকে নাম খোদাই করা রয়েছে। বিদিশা শালটা সামলে কাছে এগিয়ে গিয়ে ফলকের ধুলোটুকু হাত দিয়ে মোছালেন।

স্পষ্ট হরফে লেখা- মুখার্জী হাউস।

বাড়িটার সিংহদুয়ার আধখোলা। ভেতরে এক বিশাল ঠাকুরদালান দেখা যাচ্ছে।

বিদিশা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে বুকভরে একটা শ্বাস নিলেন। দীর্ঘ বিশ-পঁচিশ বছর আগে বাবার মুখে আবছা শোনা রাস্তার নাম, মায়ের কয়েকটা পুরনো ছবি আর এক কঠিন ধাঁধার সমাধান আজ যেন এই বাড়ির দরজায় এসে ধাক্কা খেল।

তিনি ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াতেই ঠাকুরদালানের এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা এক প্রবীণ লোক লাঠি ঠুকে দাঁড়িয়ে উঠলেন।

"কাকে চাই মা? এটা তো ব্যক্তিগত ভিটে, ভেতরে যাওয়া মানা আছে।" 

প্রবীণ লোকটির গম্ভীর গলায় কিছুটা সতর্কতার সুর।

বিদিশা থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলেন। তারপর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পরম যত্নে মায়ের ছবিটা বের করে লোকটির দিকে এগিয়ে দিয়ে ধীর, কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন, "আমি সুমিত্রা গাঙ্গুলি।"

লোকটি চশমাটা নাকের ওপর ভালো করে আটকে নিয়ে ছবিটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর বিদিশার দিকে চোখ তুলে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করলেন, 

"তা মা, আপনি কে? হঠাৎ এই ছবি নিয়ে এখানে কি মনে করে?"

বিদিশা একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মার্জিত অথচ স্পষ্ট গলায় বললেন, 

"আমি একজন গবেষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সাথে যুক্ত। মূলত বিশ শতকের শুরুর দিকে উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর অন্দরমহল আর মহিলাদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে কাজ করছি। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই আমার এই বাড়িতে আসা। আমার যত দূর ধারণা, এই ছবিটা আপনাদের এই ভিটেরই কোনো বারান্দায় তোলা।"

বৃদ্ধ এবার মৃদু একটু হেসে মাথা নাড়লেন। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বিদিশার একটু কাছে এগিয়ে এসে বললেন, 

" আপনি ভুল কিছু বলেননি, এটা মুখার্জীদেরই ভিটে। এই যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট; এই রাস্তাটা কিন্তু আমাদের পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায়ের নামেই। তবে..."

বৃদ্ধ একটু থামলেন। তারপর ছবিটার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, 

"আপনি যে বাড়িটা খুঁজছেন, সেটা এই বাড়ি নয় মা।"

কথাটা শোনামাত্র বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে বসে গেল। এতক্ষণ ধরে বুকে পুষে রাখা সবটুকু আশা যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে এল। তিনি চকিতে নিজের হাতের ছবিটার দিকে আরেকবার তাকালেন, তারপর প্রবীণ লোকটার মুখের দিকে চেয়ে হতাশ গলায় বললেন, 

"এই বাড়ি নয়? কিন্তু... এই যে বারান্দার লোহার নক্সা, আর ওই ঢালাই কাজের মোটিফগুলো... এগুলো তো হুবহু এক! আমি তো নিজের চোখে মিলিয়ে দেখলাম।"

"আপনার চোখে ভুল নেই মা," 

প্রবীণ লোকটি সহানুভূতির সুরে বললেন। 

"নক্সা এক হবে না-ই বা কেন? ঢালাই লোহার এই কাজগুলো তো একই মিস্ত্রি দিয়ে একই সময়ে করানো। কিন্তু ভালো করে খেয়াল করে দেখুন, ছবিতে রেলিংয়ের পেছনে কাঠের যে খড়খড়ি দেওয়া দরজাগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর মাথায় গোল আর্চ করা। আর আমাদের এই চণ্ডীমণ্ডপের ওপরের বারান্দার দরজায় কোনো আর্চ নেই, ওগুলো একদম সোজা চৌকাঠ। আপনি যেটা ছবিতে দেখছেন, ওটা আসলে ‘দেবাশ্রয়’-এর ছবি।"

"দেবাশ্রয়?" 

বিদিশা ভ্রূ কুঁচকে শব্দটা উচ্চারণ করলেন।

"সেটা আবার কোথায়?"

"সেটাও মুখার্জীবাড়িই মা," 

বৃদ্ধ একটু হেসে বুঝিয়ে বললেন, 

"এই তল্লাটে মুখার্জী বংশের একাধিক শাখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যে বাড়িটার নাম 'দেবাশ্রয়', সেটা হলো আমাদের মেজো শরিকের বাড়ি। সেখান থেকে আমাদের এই বাড়ি আর ঠাকুরদালান হাঁটাপথে সাত-আট মিনিট।"

বিদিশার চোখে আবার আলোর ঝিলিক খেলে গেল। বুক ধড়ফড়ানি সামলে নিয়ে তিনি অধীর হয়ে শুধোলেন,
 
"সেখানে যাওয়ার রাস্তাটা একটু বলে দেবেন, প্লিজ? আমি ঠিক কীভাবে যাব?"

"একদম সহজ পথ।" 

বৃদ্ধ হাতের লাঠিটা তুলে গঙ্গার উল্টোদিকে ইশারা করে বললেন, 

"আপনি এই রাস্তাটা দিয়ে যেদিক থেকে এলেন, সেদিকেই একটু পিছিয়ে যান। ডানহাতে একটা ছোট বাঁক পাবেন, ওটাই দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট। সেখানে ঢুকে হাতদশেক এগোলেই বাঁহাতে প্রকাণ্ড একটা সিংহদুয়ার দেখতে পাবেন। দরজার ওপর পেতলের ফলকে লেখা আছে ‘দেবাশ্রয়’। ওটাই মেজো শরিকদের আসল বাড়ি।"

বিদিশার হাত থেকে পার্সের হাতলটা এক মুহূর্তের জন্য যেন ফসকে যেতে চাইল। 'দেবাশ্রয়'... এই শব্দটা ওনার বাবার কাছে বা মায়ের কাছে কোনোদিন শোনেননি, অথচ শব্দটার মধ্যে কেমন যেন এক অদ্ভুত শ্যাওলা-ধরা প্রাচীন দীর্ঘশ্বাসের সুর জড়িয়ে আছে।

"ধন্যবাদ, জ্যাঠাবাবু।"

বিদিশা কোনোক্রমে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে মাথা নোয়ালেন। প্রবীণ লোকটি লাঠিতে ভর দিয়ে আবার ঠাকুরদালানের দিকে ফিরে গেলেন।

বিদিশা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হনহন করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন। বিকেলের রোদ ততক্ষণে একদম রক্তাভ লাল হয়ে গঙ্গার ওপর ঢলে পড়েছে। উত্তর কলকাতার অলিগলিতে হালকা ছাইরঙা শীতের কুয়াশা আর কয়লার উনুনের ধোঁয়া জমতে শুরু করেছে। গলির ভেতরের প্রাচীন বাড়িগুলোর বারান্দায় একের পর এক হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলে উঠছে।

পাঁচ মিনিটের মাথায় তিনি দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিটে এসে ঢুকলেন। রাস্তাটা মুখার্জি স্ট্রিটের চেয়ে সরু এবং বেশি নির্জন। দু-পাশে বিশালাকার পুরনো অট্টালিকাগুলো যেন একে অপরের দিকে ঝুঁকে এক রহস্যময় ছায়াঘেরা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।
দশ-বারো পা এগোতেই বিদিশার চোখে পড়ল সেই সিংহদুয়ার।

রাস্তার বাঁ পাশে, সুবিশাল এক জোড়া কালো লোহার গেট। জং ধরা পেতলের ফলকে খোদাই করা রয়েছে দুটো শব্দ— ‘দেবাশ্রয়’।

গেটের একপাশের খড়খড়ি দেওয়া একটা ছোট কাঠের পকেট-ডোর আধখোলা ছিল। বিদিশার হৃদস্পন্দন এখন কানের পর্দায় সশব্দে হাতুড়ি পিটছে। তিনি পার্সটা আঁকড়ে ধরে শালটা গায়ে চড়িয়ে আলতো পায়ে সেই ছোট দরজাটা গলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।

ভেতরে ঢুকতেই এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল। একসময় নিশ্চয়ই এই চত্বর গমগম করত, কিন্তু এখন সেখানে শুধুই এক পরিত্যক্ত রাজকীয় ধ্বংসাবশেষের গন্ধ। সুবিশাল উঠোনজুড়ে বালি আর চুনকামের গুঁড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঠিক সামনেই বিশাল ঠাকুরদালান, তার ওপরেই সেই দোতলার প্রকাণ্ড মেহগনি রঙের বারান্দা। যা ছবির সেই খড়খড়ি দেওয়া গোল আর্চের দরজাগুলোর সাথে একশো শতাংশ মিলে যায়।

"কে ওখানে? অতো আড়ালে দাঁড়িয়ে কাকে খুঁজছেন?"

দালানের অন্ধকারের ভেতর থেকে এক প্রৌঢ়া মহিলার কড়া, সতর্ক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

বিদিশা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দালানের সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছেন এক ষাটোর্ধ্ব প্রৌঢ়া। পরনে সাধারণ একটা সুতির থান, গায়ে খয়েরি রঙের চাদর জড়ানো; কিন্তু চেহারায় এক ধরনের ক্ষুরধার আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

বিদিশা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু চেপে নিলেন। গবেষক আর রিফাইনড ভদ্রমহিলার সেই নিখুঁত মুখোশটা আবার মুখে পরে নিলেন তিনি।


"নমস্কার।" বিদিশা অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেলেন। 

"আমি সুমিত্রা গাঙ্গুলি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সাথে যুক্ত। উত্তর কলকাতার আদি বনেদি পরিবারগুলোর অন্দরমহলের সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ও আর্টিকেলের কাজ করছি। দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের মূল ভিটে থেকে আমাকে এখানকার খোঁজ দেওয়া হলো।"

প্রৌঢ়া থামলেন। বিদিশার আপাদমস্তক তীব্র তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন, 

বিদিশার পেস্তারঙা সিল্কের শাড়ি, কালো শাল, রুচিশীল কথা বলার ধরন আর স্বভাব আভিজাত্য ধরন দেখে মহিলার চোখের কড়া ভাবটা কিছুটা হলেও আলগা হলো।

"বিশ্ববিদ্যালয়? গবেষণা?" 

প্রৌঢ়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যাতে স্পষ্ট জমে থাকা একরাশ তিক্ততা। 

"এখানে আর কীসের গবেষণা করবেন বাপু? যা দেখার, তা তো বহুকাল আগেই হারিয়ে গিয়েছে। প্রমোটাররা দিনরাত চক্কর কাটছে। তাও বলুন, কী জানতে চান?"

বিদিশা পার্স থেকে মায়ের সেই পুরনো সাদা-কালো ছবিটা বের করে এগিয়ে দিলেন।

"আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে আসিনি, ম্যাম। আসলে এই ছবিটা একটা পুরোনো আর্কাইভে পেয়েছিলাম। বিশ শতকের চারের বা পাঁচের দশকের একটা ছবি। আমার মনে হলো, এই ছবিটা এই 'দেবাশ্রয়'-এর বারান্দাতেই তোলা।"

প্রৌঢ়া ছবিটা হাতে নিলেন। চাদরের ভেতর থেকে একজোড়া পুরনো চশমা বের করে চোখে লাগালেন।

প্রথম কয়েক সেকেন্ড তিনি ছবিটার বারান্দা আর রেলিংয়ের দিকে তাকালেন। তারপর, হঠাৎ করেই ওনার হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। ওনার দৃষ্টি আটকে গেল ছবিতে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদিশার মায়ের মুখটার ওপর।

প্রৌঢ়ার মুখের সমস্ত কড়া ভাব যেন এক লহমায় উবে গিয়ে এক অদ্ভুত, আতঙ্কে পরিণত হলো। ওনার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল।

"এ... এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?" প্রৌঢ়ার গলার দাপুটে স্বর বদলে গিয়ে এক ভাঙা, খসখসে আওয়াজে পরিণত হলো।

বিদিশা প্রৌঢ়ার এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে মনে মনে চমকে উঠলেন, কিন্তু বাইরে একদম স্বাভাবিক থেকে বললেন, 

"বললাম তো, কলকাতা ইউনিভার্সিটির ফটোগ্রাফিক আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত। কেন বলুন তো? ওনাকে কি আপনি চেনেন?"

প্রৌঢ়া বিদিশার চোখের দিকে তাকালেন। সেই চাহনিতে এক অসীম সন্দেহ আর প্রচ্ছন্ন ভয়।

"এই মেয়েটির নাম সুচরিতা ?" 

প্রৌঢ়া খুব নিচু, থমথমে গলায় শুধোলেন। 

"সুচরিতা মুখোপাধ্যায়। এই বাড়ির ছোট মেয়ে।"

বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন একটা বিশাল ধাক্কা খেল।

 'সুচরিতা'... ওনার মায়ের নাম! এত বছর পর এই অচেনা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে নিজের মায়ের নাম আর পরিচয় আবার এভাবে কোন আত্মীয়ের মুখে শুনবেন, তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

বিদিশা নিজের আবেগ চরম কষ্টে চেপে রেখে বললেন, 

"হ্যাঁ... নথিতে ওনার নাম সুচরিতাই লেখা ছিল। আপনি কি ওনার সম্পর্কে কিছু জানেন?"

প্রৌঢ়া ছবিটা প্রায় বিদিশার হাতে ঠেলে ফেরত দিলেন। আগের ভীত ভাবটা কেটে গিয়ে ওনার চেহারায় হঠাৎ করেই এক চরম বিরক্তি আর অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।

"যে নাম এই বাড়ি থেকে আশির দশকেই মুছে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে আর কোনো কথা আমি বলতে চাই না।" 

প্রৌঢ়া গায়ের চাদরটা শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। 

"উনি পরিবারের অমতে এক সাধারণ কুলীন পরিবারের ছেলেকে পালিয়ে বিয়ে করে বংশের নাম ডুবিয়েছিলেন। এই বাড়ির বড় কর্তা ওনাকে ত্যাজ্য করেছিলেন। ওনার কোনো অস্তিত্ব এই বাড়িতে নেই। আপনি ভুল জায়গায় এসেছেন, দয়া করে এখন আসুন।"

কথাটা শেষ করে প্রৌঢ়া ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে হনহন করে ওপরে উঠতে লাগলেন।

"এক মিনিট শুনুন!" 

বিদিশা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডাকার চেষ্টা করলেন। 

"উনি তো আর বেঁচে নেই... ওনার কোনো ডায়েরি বা কোনো স্মৃতি কি এই বাড়িতে নেই?"

প্রৌঢ়া সিঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে থামলেন। কিন্তু পেছনে ফিরলেন না। কিছুটা উত্তেজিত গলায় বললেন, 

"ওনার কোনো স্মৃতি এ বাড়িতে রাখা হয়নি। সে মেয়ে এই ভিটে থেকে কী নিয়ে পালিয়েছিল, সেই সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে কী ! পুলিশের ঝামেলা করার আগে আপনি দয়া করে এখান থেকে চলে যান।"

প্রৌঢ়া দ্রুত পায়ে দোতলার অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

উঠোনে বিদিশা একা নির্বাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বিকেলের শেষ আলোটুকু ধুয়ে গিয়ে পুরো 'দেবাশ্রয়'-এর ওপর ততক্ষণে থমথমে অন্ধকার নেমে এসেছে।

তার মা রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন ? নিজের সঙ্গে করে পরিবারের কোনো দূমূর্ল্য সম্পদ নিয়ে পালিয়েছিলেন তার মা ? এইজন্যই কী তারা মায়ের সব চিহ্ন মুছে ফেলেছিল ?

কই, তার বাবা তো কখনও এবিষয়ে মুখ খোলেননি। 

বিদিশার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমে উঠেছিল। সেটা টের পাওয়ামাত্র তিনি সঙ্গে সঙ্গে জলটা মুছে ফেললেন। 

অভিমান? নাকি আবিষ্কারের উত্তেজনা?

তিনি জেনে গেছেন, তার মায়ের স্মৃতি এই দেবাশ্রয়েই কোথাও লুকিয়ে আছে। আর বিদিশা গাঙ্গুলি কোনোদিন অর্ধেক রাস্তায় কাজ ফেলে পিছু হটেন না।

আজ তিনি ফিরে যাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু, খুব শিগগিরই, যেভাবে হোক, কোন উপায়ে বা কোন কৌশলে, এই ভিটেতে তিনি ফিরবেনই। তাকে ফিরতেই হবে।
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মরীচিকা ও মোহময়ী - by RockyKabir - 09-08-2026, 05:24 AM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)