Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
৬

দুপুর ১২টা 


তারাতলা ফ্লাইওভারের উপর সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডাম্পার, কন্টেনার ট্রেইলার আর গুটিকয়েক প্রাইভেট কার। 

২৫শে ডিসেম্বর মানে কলকাতা শহরের অর্ধেক লোক যখন ভিক্টোরিয়া আর পার্ক স্ট্রিটে টুপি মাথায় দিয়ে ঘুরছে, তখন তারাতলা ক্রসিংয়ে বাতাসে শুধু পোড়া ডিজেল আর ডাম্পারের কালচে ধোঁয়ার চেনা গন্ধ।

পেছনের সিটে বসে কাচটা ইঞ্চিখানেক নামালেন অরুণ চ্যাটার্জী।

হর্নের যন্ত্রণায় কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। তারাতলা মোড়ের ঠিক মুখে ট্রাফিক পুলিশ ভারী লোহার ব্যারিকেড টেনে পথ আটকে দিয়েছে। ওপরে নীল-সাদা লাইটগুলো একটানা ফ্ল্যাশ করে যাচ্ছে, যদিও দুপুরবেলা সেগুলোর আলো প্রায় চোখেই পড়ে না।

"স্যাল, আগে তো গাড়ি একদম নড়ছে না।"

ড্রাইভার শিবু বারবার স্টিয়ারিংয়ে হাত চাপড়াচ্ছিল। তার কপালে ঘাম। ডিসেম্বরের শীতের মধ্যে গাড়ির এসি চালিয়েও তার অস্বস্তি কমছে না।

অরুণ ঘড়ি দেখলেন। বারোটা বেজে পাঁচ। তার গাড়ি আধঘন্টার উপর জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। হাতঘড়ির ডায়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মেজাজটা আরও খিঁচড়ে গেল। ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোনের হেড হিসেবে কাজ করার একটা মস্ত বড় সমস্যা হলো, সময় জিনিসটাকে সেকেন্ডে মাপার অভ্যাস হয়ে যায়। সিঙ্গাপুর বা রটারড্যামে জাহাজের বার্থিং টাইম যদি চার মিনিট এদিক-ওদিক হয়, তবে লক্ষ ডলারের ডেমারেজ গুনতে হয়। 

আর এখানে, কলকাতায়, চার কিলোমিটারের দূরত্ব পার করতে ঘন্টার পর ঘণ্টা স্রেফ ট্রাফিকের গাড্ডায় হাওয়া হয়ে যায়।

ডিসগাস্টিং !

"গাড়ি ডানদিকে কাটাও তো, শিবু। পুলিশটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো ঝামেলাটা কীসের।" 

অরুণ ধমকের সুরে বললেন।

শিবু ডাবল ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে গাড়িটা ফুটপাতের দিকে চাপাতে চাপাতে গলা বাড়াল। ঠিক তখনই ব্যাজ পরা এক প্রবীণ পুলিশ, হাতে ওয়্যারলেস সেট নিয়ে, গাড়ির কাচে টোকা দিলেন। পুলিশের মুখটা চেনা চেনা লাগল অরুণের।

জানালার কাচ পুরোটাই নামিয়ে দিলেন তিনি।

তারাতলা থানার সাব-ইনস্পেক্টর সুশীল পাত্র। 

 "সুশীলবাবু ? কী ব্যাপার বলুন তো ? দুপুরবেলা পুরো রোড ব্লক করে ব্যারিকেড কেন ?"

সুশীল পাত্র মুখ থেকে খৈনির লাল রসটা পাশে থুতু ফেলে তোয়ালে দিয়ে গাল মুছলেন। এই পুরনো অভ্যাসটা এত বছরেও বদলালো না।

সুশীল পাত্র চালকের পাশের কাচ দিয়ে ঝুঁকে অরুণের চেহারাটা দেখে চিনতে পারলেন। দরজার ধাতব ফ্রমে কনুই ঠেকিয়ে নিচু গলায় বললেন,

"ওহ, অরুণবাবু! আপনি এই লাইনে ? গার্ডেনরিচের দিকে যাচ্ছেন নাকি?"

"হ্যাঁ, সুভাষ ভবনের দিকে যাওয়ার কথা। হাইড রোড দিয়ে তো গাড়ি এগোচ্ছেই না। সমস্যাটা কী ?"

সুশীলবাবু চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে অরুণের গাড়ির দরজার ওপর কনুই ঠেকিয়ে নিচু গলায় বললেন, 

"কাল রাত সাড়ে এগারোটা থেকে ছোটা আকবর আর সানোয়ারের গ্যাং এর মধ্যে ধুন্ধুমার শুরু হয়েছে। এখন র‍্যাফ নেমেছে। চারদিক পুলিশে ছয়লাপ। ক্যানাল রোড থেকে হাইড রোড পর্যন্ত পুরো রাস্তা বন্ধ।"

অরুণের ভুরু কুঁচকে গেল। 

ছোট আকবর আর সানোয়ার ?

"কী নিয়ে গন্ডগোল হয়েছে ?"

"সিন্ডিকেটের পুরনো ক্যাঁচাল বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু এবারের জল অনেক দূর অবধি গড়িয়েছে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পর্যন্ত পড়েছে। একটু পরে ডিসি সাউথের স্পটে আসবার কথা। আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা টালিগঞ্জের দিকে বেরিয়ে যান। আজ ওদিকে যাওয়া যাবে না।"

এমন সময় ওয়্যারলেসে কোনো একটা জরুরি কল সুশীলবাবু পেয়ে পিছু হটলেন।

অরুণ সিটে পিঠ ঠেকিয়ে দিলেন। ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোন হেড হিসেবে এই ডক এরিয়ার ঘাঁতঘোঁত আর তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সব তার নখদর্পণে। 

ছোট আকবর আর সানোয়ার, দুটোই রাজ্যের মন্ত্রী ববি হাসানের আশ্রিত গুন্ডা। একই পার্টির প্রোটেকশনে থাকায় দুজনের মধ্যে ঝামেলা এক প্রকার বন্ধই ছিল।

হঠাৎ কী হল ?

ঠিক তখনই পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল।

অরুণ ফোনটা বের করে স্ক্রিনে নামটা দেখলেন,

ডেপুটি চেয়ারম্যান, পিপিটি। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের ডেপুটি চেয়ারম্যান অমিতাভ সেনগুপ্ত।

আজকের মিটিংটা তার সাথেই হওয়ার কথা ছিল।

অরুণ ফোনটা কানে তুললেন। 

"হ্যাঁ, অমিতাভবাবু। আমি তারাতলার মোড়ে আটকে আছি। শুনলাম গার্ডেনরিচে প্রবলেম হয়েছে ?

ওপাশ থেকে অমিতাভ সেনগুপ্তের শান্ত, কিন্তু কিছুটা চাপাস্বরে কথা ভেসে এল, 

"ঠিকই শুনেছেন অরুণবাবু। আমি আজকে সুভাষ ভবনে যাইনি। আজকের মিটিংটা ওখানে হচ্ছে না।"

"তা হলে? প্রেজেন্টেশনের জন্য যে প্রিলিমিনারি রিপোর্টটা রেডি করার কথা ছিল, সেটার কী হবে? মুম্বইয়ের অফিস কিন্তু আজ সন্ধের মধ্যে আপডেট চেয়েছে।" 

অরুণের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।

"হবে। মিটিং আজই হবে। তবে অফিসে নয়।" 

অমিতাভবাবু অল্প সময় নীরব থেকে বললেন, 

"আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। সোজা স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে আসুন।"

"স্ট্র্যান্ড রোড? হেড অফিসে?"

"না, হেড অফিস নয়।" 

অমিতাভ সেনগুপ্ত গলা আরও নামালেন, 

"ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের কাছে 'ময়ূরাক্ষী' নামে পোর্টের একটা রিভার ভেসেল নোঙর করা আছে। আপনি সোজাসুজি লঞ্চের ওপর উঠে আসুন।"

অরুণ একটু অবাক হলেন। 

"লঞ্চে? হঠাৎ নদীর ওপর মিটিং কেন?"

ওপাশ থেকে একটা ভারী নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। 

"অরুণবাবু, আজ আপনার সাথে একজনের কথা বলিয়ে দেব। উনি মিডিয়ার নজর এড়িয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চান। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে চলে আসুন।"

ফোনটা কেটে গেল।

অরুণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ফোনের কালো স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিলেন,

"শিবু, গাড়ি ঘোরাও। চেতলা হয়ে আলিপুর রোড ধরো। তারপর রেড রোড হয়ে সোজা ফেয়ারলি প্লেস।"

শিবু দক্ষ হাতে স্টিয়ারিংটা ঘুরিয়ে কায়দা করে গাড়িটা বাঁকিয়ে নিয়ে জ্যাম থেকে বেরিয়ে এসে সোজা ডায়মন্ড হারবার রোড দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। 

সিটে গা এলিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অরুণ তখন কদিনে যা যা ঘটে গেছে সেগুলো পরপর সাজাতে চেষ্টা করছিলেন।

কলকাতায় ফিরে অমৃতার মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকে অরুণের সব চিন্তাভাবনা ওলটপালট হয়ে গেছে। ওর কোন সন্দেহ নেই যে অমৃতার দুর্ঘটনা আসলে একটা সুপরিকল্পিত মার্ডার।

তার আগে অবধি তিনি বিদিশাকে 'J' বলে সন্দেহ করছিলেন। কিন্তু, এখন অনন্যা ছাড়া আর কারোর কথা তিনি ভাবতেই পারছেন না। 

একজন আউটসাইডার এত সেনসেটিভ ইনফরমেশন পায় কোথা থেকে ?

মুম্বইয়ে "আবার দেখা হবে" বলে অনন্যা চলে যাবার পরেই তিনি 'J' এর থেকে মেসেজটা পেয়েছিলেন। 

অরুণ শিওর যে অমৃতার মার্ডার, অনন্যার সাথে ওর দেখা এবং 'J'-এর মেসেজ সবকটাই এক সুতোয় বাঁধা।

কিন্তু, মুশকিল হল তিনি পুলিশের কাছে দৌড়তে পারবেন না। তাহলে, পুলিশের কাছে ওর সঙ্গে অমৃতার কী সম্পর্ক ছিল সেটা ফাঁস করতে হয়।

তবে তিনি বসে নেই। ইতিমধ্যেই তিনি তার মুম্বইয়ের নেটওয়ার্ককে অনন্যার পেছনে লাগিয়ে দিয়েছেন। তারা অনন্যাকে ট্র্যাক করছে আর অরুণকে খবর পাঠিয়ে যাচ্ছে। 

অনন্যা রজনীশ মালহোত্রার বড় মেয়ে জেনে অরুণ চমকে উঠেছিলেন। এত বড় শিল্পপতির মেয়ে অনন্যা অথচ পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। অন্য একটা কোম্পানিতে কাজ করে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। এদিকে অরুণের অফিসে কী হচ্ছে তার খোঁজ রাখছে।

কেন ? 

অরুণের কাছে অনন্যার রহস্য আরো বেড়েছে। 

আর একটা মাথাব্যথার বিষয় হল, রাজীব মাথুরের সঙ্গে অনন্যার যোগাযোগের মাধ্যমটা কী সেটা অরুণ এখনও বুঝে উঠতে পারে নি। সিংহানিয়াদের কাছে রাজীব আরো কী কী খবর লিক করেছে কে জানে ?

অরুণ তার হাত দুটো মুখের সামনে জড়ো করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার সামনে, একঝাঁক ওভারল্যাপিং ক্রাইসিস। কিন্তু ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গেলে চলবে না। লড়তে হবে।

চেতলা অবধি আসতে সমস্যা না হলেও আলিপুর রোডে ঢুকেই জ্যামের মুখে পড়তে হল।চিড়িয়াখানার গেটের আগেই স্পিড কমতে কমতে বিশে নেমে এল, তারপর একেবারে থমকে গেল। 

অরুণের গাড়ির ঠিক সামনেই একটা লাল রঙের মারুতি সুজুকি। 

তার পেছনের কাচে বড় বড় হরফে লেখা, 'সান্টা কামস টু টাউন'। 

গাড়ির ভেতর থেকে চার-পাঁচটা বাচ্চার চেঁচামেচি আর প্লাস্টিকের বাশির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ একটানা ভেসে আসছে। 

বাঁপাশের ফুটপাত ধরে অজস্র মানুষ হেঁটে চলেছে। অনেকের মাথায় সস্তা ক্রিসমাস হ্যাট, বাচ্চাদের হাতে বেলুন। একটা শহরের মধ্যে যেন দুটো আলাদা আলাদা জীবন, একসাথে আড়াআড়ি ভাবে হেঁটে চলেছে।

অরুণ আবার ঘড়ি দেখলেন। 

বারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ।

শিবু নিজের মনে বিড়বিড় করে একটা গালাগাল দিল।

"স্যার, ভিক্টোরিয়ার মোড় না পেরোলে শান্তি নেই। পাবলিক এমন ভাবে মাঝ রাস্তায় নেমে হাঁটছে যেন রাস্তাটা ওদের বাপের।"

অরুণ কোন উত্তর দিলেন না।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.


Messages In This Thread
RE: মরীচিকা ও মোহময়ী - by RockyKabir - 09-08-2026, 04:19 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)