20-07-2026, 07:01 PM
রাতের খাবারের আয়োজনটা ছিল একেবারেই সাধারণ, কিন্তু আন্তরিক। কাঠের পিঁড়িতে মুখোমুখি খেতে বসে অয়ন দেখল—কাঁসার থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ঘন মুসুর ডাল আর টাটকা মাছ ভাজা। এই দুর্যোগের রাতে, প্রত্যন্ত এক গাঁয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাটাই অন্যায়। অয়ন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবেশেই বড় হয়েছে, তাই সে বেশ আরাম করেই তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শুরু করল।
চন্দ্রাণী অবশ্য কোনো মন্তব্য করল না। থালার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশব্দ নিশ্বাস ফেলে সেও খাওয়া শুরু করল। কিন্তু খেতে বসেই শহরের অভিজাত পরিবেশের অভ্যস্ত চন্দ্রাণীর কান দুটো খাড়া হয়ে গেল। মুখোমুখি বসা শ্বশুর মনসুর গ্রামীণ স্বভাবসুলভ কায়দায় প্রচণ্ড ‘চুকুম-চাকুম’ শব্দ করে ডাল-ভাত মুখে তুলছেন। প্রথম প্রথম চন্দ্রাণীর এই শব্দে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন কোনো অসভ্যতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু খিদে আর ক্লান্তির কাছে শেষ পর্যন্ত সে নিজের বিরক্তিটুকু চেপে রেখে কোনোমতে খাওয়া শেষ করে নিল।
খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে অয়ন আর চন্দ্রাণী আবার নিজেদের জন্য বরাদ্দ ঘরটিতে ফিরে এলো।
কিছুক্ষণ পর রাবেয়া ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটা জলের জগ। টেবিলে ওটা রাখতে রাখতে সে মৃদু হেসে বলল, "বলছি দিদিমণি, আপনারা এবার শুয়ে পড়েন। বেশ রাত হয়েছে। ভেতর থেকে দরজার খিলটা ভালো করে লাগিয়ে দেবেন। আর কিছু লাগলে ডাকবেন, কেমন?" বলেই সে লণ্ঠনের আলোটা একটু কমিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাবেয়া চলে যেতেই অয়ন আর দেরি না করে দরজার কাঠের ভারী খিলটা আটকে দিল। এতক্ষণের মানসিক আর শারীরিক ধকলের পর তার শরীর আর চলছিল না। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই যেন ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে লাগল।
এদিকে চন্দ্রাণী বিছানার একপাশে বসে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে আলতো করে খুলল। ব্যাগ থেকে একটা চিরুনি বের করে চুলটা ভালো করে আঁচড়ে নেওয়ার পর, সে ব্যাগ থেকে নিজের পছন্দের একটা পাতলা সুতির নাইটড্রেস বের করে পরে নিল। সেই দুপুর থেকে বৃষ্টির ছাঁটে ভেজা অন্তর্বাস আর টাইট জিন্সটা পরে থাকতে থাকতে তার ফর্সা শরীরটা যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। এতক্ষণে হালকা পোশাকটা গায়ে জড়িয়ে সে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।
অয়ন ততক্ষণে ঘরের একমাত্র আলোটা নিভিয়ে দিয়েছে। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেতেই ঘরের ভেতরের পরিবেশটা যেন বদলে গেল। শহরের কৃত্রিম আওয়াজ যেখানে স্তব্ধ, সেখানে রাজত্ব শুরু করেছে আদিম গ্রামীণ প্রকৃতি। জানলার ওপার থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, ডোবা থেকে ব্যাঙের ডাক আর টিনের চালের ওপর বৃষ্টির সেই চিরাচরিত ঝিরি ঝিরি’ শব্দ।
চন্দ্রাণী বিছানায় উঠে অয়নের পাশে এসে শুয়ে পড়ল। পাশ ফিরতেই সে দেখল, অয়ন ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং মৃদু স্বরে নাক ডাকছে। চন্দ্রাণীর অবশ্য চট করে ঘুম আসছিল না। সে চোখ বুজে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল। টিনের চালে বৃষ্টির সেই একঘেয়ে শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে তার চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে এসেছিল, তা সে নিজেও টের পায়নি।
কিন্তু প্রকৃতির খেলা তখনো শেষ হয়নি।
ঠিক মাঝরাতে, চারপাশের সেই নিঝুম নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ এক প্রলয়ংকরী শব্দ হলো। ঘরের ঠিক চালের ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! এত তীব্র এবং বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ল যে, পুরো মাটির ঘরটা আর কাঠের খাটটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল।
সেই ভয়ঙ্কর আর কানফাটানো আওয়াজে চন্দ্রাণীর ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। সে আতঙ্কে ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল, তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
সে এক আতঙ্কের মুহূর্ত! বাজ পড়ার সেই বিকট শব্দে চন্দ্রাণীর সারা শরীর শিউরে উঠল। সে পাশে শোয়া অয়নকে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে একটা ঠেলা দিল, "অয়ন! ওহ গড, অয়ন ওঠো! শুনলে কী ভয়ানক শব্দ হলো!"
কিন্তু অয়নের কোনো হুঁশ নেই। সারা দিনের ড্রাইভিং আর হাসপাতালের ধকলের পর সে যেন একেবারে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। চন্দ্রাণীর ধাক্কা খেয়ে সে শুধু একটা ওলটপালট খেয়ে পাশ ফিরে শুলো, কিন্তু ঘুম ভাঙল না। অগত্যা চন্দ্রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারের মধ্যেই খাটের পাশে রাখা টেবিলটার দিকে হাত বাড়াল। ভয়ে আর আতঙ্কে তার গলাটা একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
টেবিল থেকে জলের জগটা তুলে নিয়ে সে টের পেল, ওটা বড্ড হালকা। একটু ঝাঁকাতেই বুঝল—তলে সামান্য একটু জল পড়ে আছে মাত্র। হয়তো চন্দ্রাণী ঘুমানোর মাঝেই অয়ন তৃষ্ণা পেয়ে জলটুকু খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। নিরুপায় হয়ে চন্দ্রাণী জগের মুখে মুখ ঠেকিয়ে সেই অবশিষ্ট আধ কাপের মতো জলটুকু নিজের গলায় ঢেলে দিল। কিন্তু তাতে তৃষ্ণা মেটা তো দূর, উল্টে গলার শুকনো ভাবটা আরও বেড়ে গেল।
খাটের ওপর বসে বসে সে অন্ধকারে কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবল। ঘড়িতে তখন কটা বাজে কে জানে, তবে চারপাশ নিঝুম। হঠাৎ করেই তার তলপেটে একটা চাপ অনুভব হলো। এই মাঝরাতে ওই নোংরা, শ্যাওলা ধরা বাথরুমে যেতে তার মন বিন্দুমাত্র সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির ডাক তো আর উপেক্ষা করা যায় না!
বাধ্য হয়ে সে খাট থেকে নামল। পা ফেলে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সাবধানে কাঠের ভারী খিলটা খুলল। দরজাটা ফাঁক করতেই বাইরের ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে হাওয়া তার পাতলা সুতির নাইটগাউনের ওপর এসে লাগল। সে আর দেরি না করে ডানদিকের সেই দরমা দেওয়া সিমেন্টের বাথরুমটার দিকে প্রায় নিঃশব্দে হেঁটে গেল।
ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিয়ে সে অন্ধকারের মধ্যেই গ্রামীণ কায়দার সেই পটির জায়গায় বসল। নিজের সুতির নাইটগাউনের নিচের পার্টটা হাঁটু পর্যন্ত টেনে সে কোনোমতে নিজের কাজটি সারল। শহরের বিলাসবহুল অভ্যাসের বাইরে এসে এই অভিজ্ঞতা তার জন্য চরম অস্বস্তিকর হলেও, এই মুহূর্তে শরীরকে আরাম দেওয়াটাই ছিল আসল। কাজ শেষ করে পাশের কলের জল দিয়ে হাত-পা ধুয়ে সে তড়িঘড়ি করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো।
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি তার চোখে পড়ল। ভালো করে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই চন্দ্রাণী বুঝতে পারল—ওটা আর কেউ নয়, রাবেয়া। সে কুপি বা হালকা কোনো আলোর আভাস ছাড়াই অন্ধকারের মধ্যে চেনা পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাবেয়াকে দেখামাত্রই চন্দ্রাণীর মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলল। ঘরে তো জল এক ফোঁটাও নেই, আর তার গলা এখনো শুকিয়ে আছে। এই সুযোগে রাবেয়াকে বলে জলটা চেয়ে নেওয়া যাবে। সে চট করে নিজের ঘরে ঢুকল, টেবিল থেকে খালি জলের জগটা হাতে তুলে নিল।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁ দিক ধরে, ভেজা পাকা দালান বরাবর এগোতে লাগল। উঠোনের এক কোণে, যেখানে বৃষ্টির জল থৈ থৈ করছে, ঠিক তার উল্টোদিকে থাকা অন্ধকার রান্নাঘরটার সামনে গিয়ে পৌঁছাল চন্দ্রাণী।
কিন্তু সে জানত না, এই গভীর রাতে জল খুঁজতে এসে সে এমন কিছু একটা দেখতে করতে চলেছে, যা এই নিঝুম রাতের চেয়েও বেশি রহস্যময় বা ভয়ঙ্কর!
রান্নাঘরের দরজার ঠিক কয়েক কদম দূরেই থমকে দাঁড়াল চন্দ্রাণী। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টির একটানা ‘ঝিরঝির’ শব্দের আড়াল চিরে একটা অদ্ভুত ফিসফিসানি আওয়াজ তার কানে এলো। একটা চেনা নারী কণ্ঠের সাথে এক পুরুষের চাপা স্বর।
মহিলার গলাটা নিঃসন্দেহে রাবেয়ার। কিন্তু পুরুষটা কে? দুপুর থেকে এই বাড়িতে বুড়ো মনসুর ছাড়া আর কোনো পুরুষের তো চিহ্নও দেখেনি সে। রাবেয়ার স্বামী তো দুবাইয়ে থাকে! তবে এই মাঝরাতে রান্নাঘরের অন্ধকারে রাবেয়া কার সাথে?
এমনিতে চন্দ্রাণী মার্জিত, উচ্চশিক্ষিত শহুরে নারী; অন্যের ব্যক্তিগত কথা আড়ি পেতে শোনা তার স্বভাবের বাইরে। কিন্তু এই গভীর রাতে, এই আদিম গ্রামীণ পরিবেশের গা ছমছমে ভাব আর কৌতূহল তাকে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল। সে নিজের অজান্তেই দেওয়ালের আড়ালে কান পাতল।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ থাকলেও, রান্নাঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক গলে কথাগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছিল।
রাবেয়া আধা-রাগ আধা-আহ্লাদের সুরে ফিসফিস করে বলছে, "আপনার কি একটুও তর সয় না? পোলা দুটো জেগে যায় যদি!"
পাল্টা একটা খসখসে, কামুক পুরুষালী গলা ভেসে এলো, "মেলা বকিস নি... আজ মেশিনটা একদম সন্ধে থেকে লাফাইতাছে!"
সেই কথা শুনে রাবেয়া খিলখিল করে দুবার হেসে উঠল। তারপর চাপা মায়াবী গলায় বলল, "বলি, কেন? ওই মেমসাহেবরে দেইখা নাকি? এই বুড়ো বয়সেও এত... উফফ, আস্তে!"
পরমুহূর্তেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কাপড়ের খসখস আর একটা ধস্তাধস্তির শব্দ ভেসে এলো। চন্দ্রাণীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সেই পুরুষ গলাটা আবার আদেশ দিল, "কামিজটা খোল...... আরও নাম!"
কয়েক সেকেন্ডের এক রুদ্ধশ্বাস স্তব্ধতা। শুধু ভারী কিছু নিঃশ্বাসের শব্দ। আর তারপরেই রাবেয়ার গলা থেকে যে শব্দটা ছিটকে বেরোলো, তা শুনে চন্দ্রাণীর পায়ের তলা থেকে যেন আক্ষরিক অর্থেই মাটির পৃথিবীটা সরে গেল!
রাবেয়া গোঙানির সুরে বলছে, "আহহহ আব্বা... ... আস্তে, আস্তে দেন না একটু!"
এতক্ষণে চন্দ্রাণীর বুঝতে আর বাকি রইল না যে ওই পুরুষ কণ্ঠটি কার! ওটা আর কেউ নয়—খোদ মনসুর ! নিজের আপন পুত্রবধূর সাথে এই গভীর রাতে...!
চন্দ্রাণীর সারা শরীর রি রি করে উঠল, মাথায় রক্ত চড়ে গেল। আতঙ্কে, বিস্ময়ে তার হাতের জলের জগটা কেঁপে উঠল, মনে হলো ওটা এই বুঝি হাত থেকে খসে মাটির মেঝেতে পড়ে যাবে। সে নিজের এক হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল, পাছে তার নিজের চিৎকারের শব্দ বাইরে বেরিয়ে আসে।
ঠিক তখনই রান্নাঘরের ভেতর থেকে চামড়ায় চামড়ায় আঘাতের সেই আদিম, নগ্ন শব্দ ভেসে আসতে লাগল—'থাপ... আহহহ... থাপ... আহহহ... থাপ!'
মনসুর বুড়োর লোলুপ, হিংস্র গলার আওয়াজ ঘরের অন্ধকারকে আরও ভারী করে তুলল, "শালী... এগিয়ে আয়! গাড়টা উঁচু করে ধর্ না...!"
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চন্দ্রাণীর ফর্সা কপাল বেয়ে তখন ঘাম ঝরছে। এই প্রত্যন্ত গ্রামের এক সাধারণ মাটির বাড়ির ভেতরে যে এমন এক ভয়ঙ্কর, নিষিদ্ধ আর কদর্য অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তার শরীর কাঁপতে লাগল, এখন আর জল তৃষ্ণা নয়—তার মনে হতে লাগল, এই মুহূর্তেই যদি সে এখান থেকে পালাতে না পারে, তবে হয়তো এক চরম বিপদের মুখোমুখি হতে হবে তাকে!
চন্দ্রাণী অবশ্য কোনো মন্তব্য করল না। থালার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশব্দ নিশ্বাস ফেলে সেও খাওয়া শুরু করল। কিন্তু খেতে বসেই শহরের অভিজাত পরিবেশের অভ্যস্ত চন্দ্রাণীর কান দুটো খাড়া হয়ে গেল। মুখোমুখি বসা শ্বশুর মনসুর গ্রামীণ স্বভাবসুলভ কায়দায় প্রচণ্ড ‘চুকুম-চাকুম’ শব্দ করে ডাল-ভাত মুখে তুলছেন। প্রথম প্রথম চন্দ্রাণীর এই শব্দে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন কোনো অসভ্যতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু খিদে আর ক্লান্তির কাছে শেষ পর্যন্ত সে নিজের বিরক্তিটুকু চেপে রেখে কোনোমতে খাওয়া শেষ করে নিল।
খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে অয়ন আর চন্দ্রাণী আবার নিজেদের জন্য বরাদ্দ ঘরটিতে ফিরে এলো।
কিছুক্ষণ পর রাবেয়া ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটা জলের জগ। টেবিলে ওটা রাখতে রাখতে সে মৃদু হেসে বলল, "বলছি দিদিমণি, আপনারা এবার শুয়ে পড়েন। বেশ রাত হয়েছে। ভেতর থেকে দরজার খিলটা ভালো করে লাগিয়ে দেবেন। আর কিছু লাগলে ডাকবেন, কেমন?" বলেই সে লণ্ঠনের আলোটা একটু কমিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাবেয়া চলে যেতেই অয়ন আর দেরি না করে দরজার কাঠের ভারী খিলটা আটকে দিল। এতক্ষণের মানসিক আর শারীরিক ধকলের পর তার শরীর আর চলছিল না। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই যেন ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে লাগল।
এদিকে চন্দ্রাণী বিছানার একপাশে বসে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে আলতো করে খুলল। ব্যাগ থেকে একটা চিরুনি বের করে চুলটা ভালো করে আঁচড়ে নেওয়ার পর, সে ব্যাগ থেকে নিজের পছন্দের একটা পাতলা সুতির নাইটড্রেস বের করে পরে নিল। সেই দুপুর থেকে বৃষ্টির ছাঁটে ভেজা অন্তর্বাস আর টাইট জিন্সটা পরে থাকতে থাকতে তার ফর্সা শরীরটা যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। এতক্ষণে হালকা পোশাকটা গায়ে জড়িয়ে সে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।
অয়ন ততক্ষণে ঘরের একমাত্র আলোটা নিভিয়ে দিয়েছে। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেতেই ঘরের ভেতরের পরিবেশটা যেন বদলে গেল। শহরের কৃত্রিম আওয়াজ যেখানে স্তব্ধ, সেখানে রাজত্ব শুরু করেছে আদিম গ্রামীণ প্রকৃতি। জানলার ওপার থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, ডোবা থেকে ব্যাঙের ডাক আর টিনের চালের ওপর বৃষ্টির সেই চিরাচরিত ঝিরি ঝিরি’ শব্দ।
চন্দ্রাণী বিছানায় উঠে অয়নের পাশে এসে শুয়ে পড়ল। পাশ ফিরতেই সে দেখল, অয়ন ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং মৃদু স্বরে নাক ডাকছে। চন্দ্রাণীর অবশ্য চট করে ঘুম আসছিল না। সে চোখ বুজে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল। টিনের চালে বৃষ্টির সেই একঘেয়ে শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে তার চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে এসেছিল, তা সে নিজেও টের পায়নি।
কিন্তু প্রকৃতির খেলা তখনো শেষ হয়নি।
ঠিক মাঝরাতে, চারপাশের সেই নিঝুম নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ এক প্রলয়ংকরী শব্দ হলো। ঘরের ঠিক চালের ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! এত তীব্র এবং বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ল যে, পুরো মাটির ঘরটা আর কাঠের খাটটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল।
সেই ভয়ঙ্কর আর কানফাটানো আওয়াজে চন্দ্রাণীর ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। সে আতঙ্কে ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল, তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
সে এক আতঙ্কের মুহূর্ত! বাজ পড়ার সেই বিকট শব্দে চন্দ্রাণীর সারা শরীর শিউরে উঠল। সে পাশে শোয়া অয়নকে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে একটা ঠেলা দিল, "অয়ন! ওহ গড, অয়ন ওঠো! শুনলে কী ভয়ানক শব্দ হলো!"
কিন্তু অয়নের কোনো হুঁশ নেই। সারা দিনের ড্রাইভিং আর হাসপাতালের ধকলের পর সে যেন একেবারে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। চন্দ্রাণীর ধাক্কা খেয়ে সে শুধু একটা ওলটপালট খেয়ে পাশ ফিরে শুলো, কিন্তু ঘুম ভাঙল না। অগত্যা চন্দ্রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারের মধ্যেই খাটের পাশে রাখা টেবিলটার দিকে হাত বাড়াল। ভয়ে আর আতঙ্কে তার গলাটা একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
টেবিল থেকে জলের জগটা তুলে নিয়ে সে টের পেল, ওটা বড্ড হালকা। একটু ঝাঁকাতেই বুঝল—তলে সামান্য একটু জল পড়ে আছে মাত্র। হয়তো চন্দ্রাণী ঘুমানোর মাঝেই অয়ন তৃষ্ণা পেয়ে জলটুকু খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। নিরুপায় হয়ে চন্দ্রাণী জগের মুখে মুখ ঠেকিয়ে সেই অবশিষ্ট আধ কাপের মতো জলটুকু নিজের গলায় ঢেলে দিল। কিন্তু তাতে তৃষ্ণা মেটা তো দূর, উল্টে গলার শুকনো ভাবটা আরও বেড়ে গেল।
খাটের ওপর বসে বসে সে অন্ধকারে কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবল। ঘড়িতে তখন কটা বাজে কে জানে, তবে চারপাশ নিঝুম। হঠাৎ করেই তার তলপেটে একটা চাপ অনুভব হলো। এই মাঝরাতে ওই নোংরা, শ্যাওলা ধরা বাথরুমে যেতে তার মন বিন্দুমাত্র সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির ডাক তো আর উপেক্ষা করা যায় না!
বাধ্য হয়ে সে খাট থেকে নামল। পা ফেলে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সাবধানে কাঠের ভারী খিলটা খুলল। দরজাটা ফাঁক করতেই বাইরের ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে হাওয়া তার পাতলা সুতির নাইটগাউনের ওপর এসে লাগল। সে আর দেরি না করে ডানদিকের সেই দরমা দেওয়া সিমেন্টের বাথরুমটার দিকে প্রায় নিঃশব্দে হেঁটে গেল।
ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিয়ে সে অন্ধকারের মধ্যেই গ্রামীণ কায়দার সেই পটির জায়গায় বসল। নিজের সুতির নাইটগাউনের নিচের পার্টটা হাঁটু পর্যন্ত টেনে সে কোনোমতে নিজের কাজটি সারল। শহরের বিলাসবহুল অভ্যাসের বাইরে এসে এই অভিজ্ঞতা তার জন্য চরম অস্বস্তিকর হলেও, এই মুহূর্তে শরীরকে আরাম দেওয়াটাই ছিল আসল। কাজ শেষ করে পাশের কলের জল দিয়ে হাত-পা ধুয়ে সে তড়িঘড়ি করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো।
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি তার চোখে পড়ল। ভালো করে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই চন্দ্রাণী বুঝতে পারল—ওটা আর কেউ নয়, রাবেয়া। সে কুপি বা হালকা কোনো আলোর আভাস ছাড়াই অন্ধকারের মধ্যে চেনা পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাবেয়াকে দেখামাত্রই চন্দ্রাণীর মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলল। ঘরে তো জল এক ফোঁটাও নেই, আর তার গলা এখনো শুকিয়ে আছে। এই সুযোগে রাবেয়াকে বলে জলটা চেয়ে নেওয়া যাবে। সে চট করে নিজের ঘরে ঢুকল, টেবিল থেকে খালি জলের জগটা হাতে তুলে নিল।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁ দিক ধরে, ভেজা পাকা দালান বরাবর এগোতে লাগল। উঠোনের এক কোণে, যেখানে বৃষ্টির জল থৈ থৈ করছে, ঠিক তার উল্টোদিকে থাকা অন্ধকার রান্নাঘরটার সামনে গিয়ে পৌঁছাল চন্দ্রাণী।
কিন্তু সে জানত না, এই গভীর রাতে জল খুঁজতে এসে সে এমন কিছু একটা দেখতে করতে চলেছে, যা এই নিঝুম রাতের চেয়েও বেশি রহস্যময় বা ভয়ঙ্কর!
রান্নাঘরের দরজার ঠিক কয়েক কদম দূরেই থমকে দাঁড়াল চন্দ্রাণী। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টির একটানা ‘ঝিরঝির’ শব্দের আড়াল চিরে একটা অদ্ভুত ফিসফিসানি আওয়াজ তার কানে এলো। একটা চেনা নারী কণ্ঠের সাথে এক পুরুষের চাপা স্বর।
মহিলার গলাটা নিঃসন্দেহে রাবেয়ার। কিন্তু পুরুষটা কে? দুপুর থেকে এই বাড়িতে বুড়ো মনসুর ছাড়া আর কোনো পুরুষের তো চিহ্নও দেখেনি সে। রাবেয়ার স্বামী তো দুবাইয়ে থাকে! তবে এই মাঝরাতে রান্নাঘরের অন্ধকারে রাবেয়া কার সাথে?
এমনিতে চন্দ্রাণী মার্জিত, উচ্চশিক্ষিত শহুরে নারী; অন্যের ব্যক্তিগত কথা আড়ি পেতে শোনা তার স্বভাবের বাইরে। কিন্তু এই গভীর রাতে, এই আদিম গ্রামীণ পরিবেশের গা ছমছমে ভাব আর কৌতূহল তাকে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল। সে নিজের অজান্তেই দেওয়ালের আড়ালে কান পাতল।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ থাকলেও, রান্নাঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক গলে কথাগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছিল।
রাবেয়া আধা-রাগ আধা-আহ্লাদের সুরে ফিসফিস করে বলছে, "আপনার কি একটুও তর সয় না? পোলা দুটো জেগে যায় যদি!"
পাল্টা একটা খসখসে, কামুক পুরুষালী গলা ভেসে এলো, "মেলা বকিস নি... আজ মেশিনটা একদম সন্ধে থেকে লাফাইতাছে!"
সেই কথা শুনে রাবেয়া খিলখিল করে দুবার হেসে উঠল। তারপর চাপা মায়াবী গলায় বলল, "বলি, কেন? ওই মেমসাহেবরে দেইখা নাকি? এই বুড়ো বয়সেও এত... উফফ, আস্তে!"
পরমুহূর্তেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কাপড়ের খসখস আর একটা ধস্তাধস্তির শব্দ ভেসে এলো। চন্দ্রাণীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সেই পুরুষ গলাটা আবার আদেশ দিল, "কামিজটা খোল...... আরও নাম!"
কয়েক সেকেন্ডের এক রুদ্ধশ্বাস স্তব্ধতা। শুধু ভারী কিছু নিঃশ্বাসের শব্দ। আর তারপরেই রাবেয়ার গলা থেকে যে শব্দটা ছিটকে বেরোলো, তা শুনে চন্দ্রাণীর পায়ের তলা থেকে যেন আক্ষরিক অর্থেই মাটির পৃথিবীটা সরে গেল!
রাবেয়া গোঙানির সুরে বলছে, "আহহহ আব্বা... ... আস্তে, আস্তে দেন না একটু!"
এতক্ষণে চন্দ্রাণীর বুঝতে আর বাকি রইল না যে ওই পুরুষ কণ্ঠটি কার! ওটা আর কেউ নয়—খোদ মনসুর ! নিজের আপন পুত্রবধূর সাথে এই গভীর রাতে...!
চন্দ্রাণীর সারা শরীর রি রি করে উঠল, মাথায় রক্ত চড়ে গেল। আতঙ্কে, বিস্ময়ে তার হাতের জলের জগটা কেঁপে উঠল, মনে হলো ওটা এই বুঝি হাত থেকে খসে মাটির মেঝেতে পড়ে যাবে। সে নিজের এক হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল, পাছে তার নিজের চিৎকারের শব্দ বাইরে বেরিয়ে আসে।
ঠিক তখনই রান্নাঘরের ভেতর থেকে চামড়ায় চামড়ায় আঘাতের সেই আদিম, নগ্ন শব্দ ভেসে আসতে লাগল—'থাপ... আহহহ... থাপ... আহহহ... থাপ!'
মনসুর বুড়োর লোলুপ, হিংস্র গলার আওয়াজ ঘরের অন্ধকারকে আরও ভারী করে তুলল, "শালী... এগিয়ে আয়! গাড়টা উঁচু করে ধর্ না...!"
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চন্দ্রাণীর ফর্সা কপাল বেয়ে তখন ঘাম ঝরছে। এই প্রত্যন্ত গ্রামের এক সাধারণ মাটির বাড়ির ভেতরে যে এমন এক ভয়ঙ্কর, নিষিদ্ধ আর কদর্য অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তার শরীর কাঁপতে লাগল, এখন আর জল তৃষ্ণা নয়—তার মনে হতে লাগল, এই মুহূর্তেই যদি সে এখান থেকে পালাতে না পারে, তবে হয়তো এক চরম বিপদের মুখোমুখি হতে হবে তাকে!


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)