20-07-2026, 07:00 PM
রাবেয়া ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর পিরিচ ট্রেতে করে নিয়ে ঘরে ঢুকল। অয়ন দুটো কাপ হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। একটা কাপ নিজে রেখে অন্যটা চন্দ্রাণীর দিকে বাড়িয়ে দিল। রাবেয়া অবশ্য মনসুর সাহেবের জন্যও আর একটা কাপ এনেছিল, সেটা সে শ্বশুরের হাতে দিল।
এই মড়মড়ে ঠাণ্ডা আর একটানা বৃষ্টিতে এমন ধোঁয়া ওঠা গরম চা সত্যিই মন্দ নয়। চায়ের কাপটা হাতে পেয়েই অয়ন যেন প্রাণ ফিরে পেল। সে আর তর সইল না, সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় চুমুক দিল। আহ, আদা আর এলাচের কড়া গন্ধ!
চন্দ্রাণী অবশ্য কাপটা হাতে নিয়ে প্রথমে একটু খুঁটিয়ে দেখল। শহরের সিরামিক বা বোন-চায়নার কাপে অভ্যস্ত তার চোখ এই সস্তার কাঁচের কাপ দেখে খুব একটা পছন্দ করল না। তবুও সৌজন্যতাবশত কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়াতেই তার ভুরু জোড়া কুঁচকে গেল। চা-টা চড়া লিকারের হলেও, তাতে যেন চিনির বস্তা উপুড় করে দেওয়া হয়েছে! চন্দ্রাণী এমনিতেই অসম্ভব শরীর-সচেতন, ডায়েট মেইনটেইন করে চলে। এত চিনি দিয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস তার নেই। কিন্তু এই পরিবেশে নাক উঁচু স্বভাব দেখালে অভদ্রতা হবে ভেবে সে কোনোমতে কষ্ট করে ধীরে ধীরে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে হইহই শব্দ শোনা গেল। রাবেয়ার সেই ফাজিল ছেলে দুটো ধপধপিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। যদিও একটু আগে গলির মুখে কাগজের নৌকা ভাসানোর সময় এরা অয়ন আর চন্দ্রাণীকে দেখেছিল, কিন্তু এখন ঘরের ভেতর রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে তাদের চোখে একরাশ কৌতূহল। বড় ছেলেটা মায়ের আঁচল টেনে জিজ্ঞাসু চোখে বলল, "মা, এরা কারা?"
রাবেয়া ছেলেদের মাথায় আলতো চাঁটি মেরে হেসে বলল, "এনারা শহরের বড় ডাক্তার। ‘আঙ্কেল’ আর ‘আন্টি’। সালাম করো।"
এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে এক সাধারণ গৃহবধূর মুখে ‘আঙ্কেল-আন্টি’র মতো ইংরেজি শব্দ শুনবে, সেটা চন্দ্রাণী অন্তত আশা করেনি। সে কিছুটা অবাক হয়ে বাচ্চা দুটোর দিকে তাকাল।
মনসুর সাহেব এবার চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "বউমা, তুমি ওদের নিয়ে ওঘরে যাও। গিয়ে পড়তে বসাও। সারা দুপুরটা তো খেলাধুলো করেই কাটিয়ে দিল! যাও।"
"আচ্ছা আব্বা," বলে রাবেয়া ছেলে দুটোকে ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে পাশের ঘরের দিকে চলে গেল।
চা শেষ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে ফেলল বিকেল পাঁচটা। কিন্তু বৃষ্টির বেগ কমার তো দূর, আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন মাঝরাত নেমে এসেছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আজ রাতে ফেরা তো দূরের কথা, গাড়ি নিয়ে এই কাদার রাস্তা থেকে বের হওয়াই অসম্ভব হয়ে যাবে। অয়ন কিছুটা চিন্তিত হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেন।
মনসুর সাহেব অয়নের মনের অবস্থাটা টের পেলেন। তিনি হাতের খালি কাপটা পাশে রেখে খাঁটি গ্রামীণ অভিভাবকের মতো সুর করে বললেন, "ডাক্তার সাব, আজ তো মনে হচ্ছে না এই বৃষ্টি সহজে থামবে। আপনারা চাইলে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই পারেন। আর যদি দরকার মনে করেন, তবে আজকের রাতটা আমাদের এই গরিবের ঘরেই কাটিয়ে দিতে পারেন। আমাদের কোনো সমস্যা নাই, একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"
মনসুরের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই চন্দ্রাণীর বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। সে অস্বস্তিতে ভেতরে ভেতরে একেবারে আঁতকে উঠল! কী! এই অজপাড়াগাঁয়ে, এই মাটির দেওয়াল আর টিনের চালের ঘরে তাকে আস্ত একটা রাত কাটাতে হবে? যেখানে একটা ভালো বাথরুম আছে কি না সন্দেহ!
ভাবতেই চন্দ্রাণীর ফর্সা গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে অয়নের দিকে তাকাল, তার চাউনি স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল—‘যেভাবেই হোক, এখান থেকে আমাকে বের করো!’
কিন্তু চাইলেই কি আর মনের মতো সব হয়! মানুষের ভাগ্য যখন চাকা ঘোরে, তখন প্রকৃতির খেয়ালের কাছে মাথা নোয়াতেই হয়।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামল, আর সেই সন্ধ্যে পার হয়ে রাতের কাঁটা তখন ছুঁয়ে ফেলেছে ৯টা। এতক্ষণ মনসুর সাহেব বোধহয় অন্য ঘরে নাতিদের সাথে গল্পগুজব করছিলেন । এদিকে খাটের ওপর দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা অয়নের চোখে কখন যেন একটা হালকা তন্দ্রা বা ঘুমের ঘোর এসে গিয়েছিল। আর চন্দ্রাণী? সে তখন থেকে খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে বসে নিজের আইফোনে একনাগাড়ে রিলস স্ক্রল করে যাচ্ছে। নেটওয়ার্কের অবস্থা খুব একটা সুবিধার না হলেও, এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মনটাকে সরিয়ে রাখার জন্য ওটাই তার একমাত্র আশ্রয়।
ঠিক এমন সময় ঘরের দরজায় একটা ভারী পায়ের শব্দ হলো। ঘরে ঢুকলেন মনসুর ।
তিনি অয়নকে ওমন আধো-ঘুমে দেখে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "বলি ডাক্তার সাব, আজ তো আপনাদের মহা মুশকিল লাইগা গেল। শুনলাম ওদিকের পুলটাও নাকি একদম ভাইঙা তলিয়ে গেছে। তা এই রাতে গাড়ি নিয়া ক্যামনে যাবেন? তার চেয়ে বরং আজকের রাতটা এখানেই কাটিয়ে নেন। কী বলেন?"
আচমকা আওয়াজে অয়নের তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। তিনি ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসলেন। পাশে বসা বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যে একটু পারমিশন নেবে, সেই সুযোগটাই হলো না। মনসুর সাহেবের মুখের ওপর সরাসরি ‘না’ বলার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। অয়ন নিজেকে সামলে নিয়ে সজাগ হয়ে বললেন, "হাঁ... তা যা বলেছেন । কী আর করা যাবে! আমার নিজেরও মনে হচ্ছে এই দুর্যোগে এখন আর গাড়ি নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না।"
কথাটা বলেই অয়ন আড়চোখে চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণীর মুখের হাবভাব মোটেও ভালো না। তার কপাল কুঁচকে গেছে, ঠোঁট দুটো রাগে আর বিরক্তিতে চেপে বসেছে। অয়ন পরিস্থিতি হালকা করতে দ্রুত মনসুরের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বললেন, "আপনাকে অনেক ধন্যবাদ চাচা। আমরা একদম অচেনা লোক, তাও আপনি এই রাতে আমাদের আশ্রয় দিচ্ছেন।"
মনসুর সাহেব হাত নেড়ে একগাল হেসে বললেন, "আরে এই কথা বইলা শরম দেবেন না ডাক্তার সাব। আপনারা শহরের বড় মানুষ, আমাদের ঘরে পায়ের ধুলো দিছেন। এই বিপদের সময় আপনাদের একটু সাহায্য করতে পারলাম, এটাই আমাদের সৌভাগ্য।" একটু থেমে তিনি আবার বললেন, "বলি, আপনারা এবার হাত-মুখ ধুয়ে নেন। বউমা রাতের খাবার বানাইয়া ফেলছে। আসেন, খেয়ে নেবেন।"
মনসুর সাহেব ঘর থেকে চলে যেতেই অয়ন একটু অপরাধী মুখে চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণীর খুব কাছাকাছি সরে এসে নরম গলায় বললেন, "কী করব বলো সোনা? আমি জানি তোমার এই পরিবেশে একটুও ভালো লাগছে না, খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, এই মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই তো!"
চন্দ্রাণী অয়নের কথার কোনো উত্তর দিল না। পাত্তাই না দেওয়ার মতো করে একটা তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার ফোনের স্ক্রিনে মনযোগ দিল। তার এই নীরব অভিমান অয়নকে আরও একটু গুটিয়ে দিল।
অয়ন খাট থেকে নেমে বললেন, "আমি বরং গাড়ি থেকে আমাদের এক্সট্রা জামাকাপড়গুলো নিয়ে আসি। তুমি বোসো।"
অয়নের একটা ভালো অভ্যাস আছে, গাড়িতে সবসময়ই তাদের দু-সেট করে এক্সট্রা জামাকাপড় আর প্রসাধন থাকে, যাতে হুটহাট কোথাও আটকে গেলে সুবিধা হয়। অয়ন ছাতা মাথায় দিয়ে জল-কাদা ভেঙে গাড়ি থেকে ব্যাগটা নিয়ে এলেন। ঘরে ব্যাগটা রেখে শুধু নিজের তোয়ালেটা কাঁধে নিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন।
খানিকক্ষণ পর হাত-পা-মুখ ধুয়ে বেশ ফ্রেস হয়ে ঘরে ফিরে এলেন অয়ন। ঘরে ঢুকেই দেখলেন চন্দ্রাণী আগের মতোই মুঠোফোন হাতড়ে বসে আছে। অয়ন বললেন, "কই গো, তুমি এখনো ওভাবেই বসে আছ? যাও, ওয়াশরুম থেকে একটু সেরে এসো। কখন থেকে যাবে বলছিলে না?"
চন্দ্রাণী আর কী করবে! বেগ চেপে রাখা তো আর সম্ভব নয়। অগত্যা সে মুখটা ভার করে বিছানা থেকে নামল। অয়ন তোয়ালেটা চন্দ্রাণীর হাতে দিয়ে বাইরে যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দিলেন, "বেরিয়ে ডানদিকের দিয়ে গেলেই বাথরুম।"
বাইরে তখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। পাকা দালান আর মাটির উঠোন সব জলে ভিজে সপসপ আর প্যাচপ্যাচ করছে। সেই কাদার ছাঁট বাঁচিয়ে চন্দ্রাণী অতি সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল। সামনেই একটা টিনের দরমা দেওয়া, মেঝে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বাথরুম। এটাকে আদেও শহরের ভাষায় ‘বাথরুম’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে চন্দ্রাণীর মনে ঘোর সন্দেহ জাগল!
ভেতরে ঢুকে চন্দ্রাণী দেখল—একপাশে গ্রামীণ কায়দায় পটি করার ব্যবস্থা, আর অন্যপাশে দুটো প্লাস্টিকের বালতি আর কল। দেওয়ালের চারদিকটা স্যাঁতসেঁতে এবং হালকা শ্যাওলা ধরা। বৃষ্টির কারণে মেঝেটাও কেমন যেন হড়হড় করছে। জায়গাটা আকারে বেশ বড় হলেও, চন্দ্রাণীর শহরের সেই ৩-বিএইচকে ফ্ল্যাটের অ্যাটাচড ফ্যান্সি ফিটিংসের বাথরুমের ধারেকাছেও এটি নয়।
চন্দ্রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেসিনের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাল, কিন্তু বেসিন তো দূর অস্ত! সে বাধ্য হয়ে প্লাস্টিকের কলটা ঘুরিয়ে জল ছাড়ল। পা দুটো সামান্য ধুয়ে, আঁজলা করে জল নিয়ে মুখটা ধুয়ে নিতেই সে বুঝল—জলটা কেমন যেন নোনতা স্বাদের। উপকূলবর্তী অঞ্চলের চেনা নোনা জল।
কোনোমতে মুখ-হাত ধুয়ে চন্দ্রাণী তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছল। ভেজা জিন্স আর গায়ের কাপড়টা সামলাতে সামলাতে সে যখন আবার ঘরে ফিরে এলো, দেখল অয়ন ততক্ষণে খাটের ওপর চুপচাপ বসে তার জন্যই অপেক্ষা করছে।
এই মড়মড়ে ঠাণ্ডা আর একটানা বৃষ্টিতে এমন ধোঁয়া ওঠা গরম চা সত্যিই মন্দ নয়। চায়ের কাপটা হাতে পেয়েই অয়ন যেন প্রাণ ফিরে পেল। সে আর তর সইল না, সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় চুমুক দিল। আহ, আদা আর এলাচের কড়া গন্ধ!
চন্দ্রাণী অবশ্য কাপটা হাতে নিয়ে প্রথমে একটু খুঁটিয়ে দেখল। শহরের সিরামিক বা বোন-চায়নার কাপে অভ্যস্ত তার চোখ এই সস্তার কাঁচের কাপ দেখে খুব একটা পছন্দ করল না। তবুও সৌজন্যতাবশত কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়াতেই তার ভুরু জোড়া কুঁচকে গেল। চা-টা চড়া লিকারের হলেও, তাতে যেন চিনির বস্তা উপুড় করে দেওয়া হয়েছে! চন্দ্রাণী এমনিতেই অসম্ভব শরীর-সচেতন, ডায়েট মেইনটেইন করে চলে। এত চিনি দিয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস তার নেই। কিন্তু এই পরিবেশে নাক উঁচু স্বভাব দেখালে অভদ্রতা হবে ভেবে সে কোনোমতে কষ্ট করে ধীরে ধীরে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে হইহই শব্দ শোনা গেল। রাবেয়ার সেই ফাজিল ছেলে দুটো ধপধপিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। যদিও একটু আগে গলির মুখে কাগজের নৌকা ভাসানোর সময় এরা অয়ন আর চন্দ্রাণীকে দেখেছিল, কিন্তু এখন ঘরের ভেতর রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে তাদের চোখে একরাশ কৌতূহল। বড় ছেলেটা মায়ের আঁচল টেনে জিজ্ঞাসু চোখে বলল, "মা, এরা কারা?"
রাবেয়া ছেলেদের মাথায় আলতো চাঁটি মেরে হেসে বলল, "এনারা শহরের বড় ডাক্তার। ‘আঙ্কেল’ আর ‘আন্টি’। সালাম করো।"
এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে এক সাধারণ গৃহবধূর মুখে ‘আঙ্কেল-আন্টি’র মতো ইংরেজি শব্দ শুনবে, সেটা চন্দ্রাণী অন্তত আশা করেনি। সে কিছুটা অবাক হয়ে বাচ্চা দুটোর দিকে তাকাল।
মনসুর সাহেব এবার চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "বউমা, তুমি ওদের নিয়ে ওঘরে যাও। গিয়ে পড়তে বসাও। সারা দুপুরটা তো খেলাধুলো করেই কাটিয়ে দিল! যাও।"
"আচ্ছা আব্বা," বলে রাবেয়া ছেলে দুটোকে ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে পাশের ঘরের দিকে চলে গেল।
চা শেষ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে ফেলল বিকেল পাঁচটা। কিন্তু বৃষ্টির বেগ কমার তো দূর, আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন মাঝরাত নেমে এসেছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আজ রাতে ফেরা তো দূরের কথা, গাড়ি নিয়ে এই কাদার রাস্তা থেকে বের হওয়াই অসম্ভব হয়ে যাবে। অয়ন কিছুটা চিন্তিত হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেন।
মনসুর সাহেব অয়নের মনের অবস্থাটা টের পেলেন। তিনি হাতের খালি কাপটা পাশে রেখে খাঁটি গ্রামীণ অভিভাবকের মতো সুর করে বললেন, "ডাক্তার সাব, আজ তো মনে হচ্ছে না এই বৃষ্টি সহজে থামবে। আপনারা চাইলে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই পারেন। আর যদি দরকার মনে করেন, তবে আজকের রাতটা আমাদের এই গরিবের ঘরেই কাটিয়ে দিতে পারেন। আমাদের কোনো সমস্যা নাই, একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"
মনসুরের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই চন্দ্রাণীর বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। সে অস্বস্তিতে ভেতরে ভেতরে একেবারে আঁতকে উঠল! কী! এই অজপাড়াগাঁয়ে, এই মাটির দেওয়াল আর টিনের চালের ঘরে তাকে আস্ত একটা রাত কাটাতে হবে? যেখানে একটা ভালো বাথরুম আছে কি না সন্দেহ!
ভাবতেই চন্দ্রাণীর ফর্সা গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে অয়নের দিকে তাকাল, তার চাউনি স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল—‘যেভাবেই হোক, এখান থেকে আমাকে বের করো!’
কিন্তু চাইলেই কি আর মনের মতো সব হয়! মানুষের ভাগ্য যখন চাকা ঘোরে, তখন প্রকৃতির খেয়ালের কাছে মাথা নোয়াতেই হয়।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামল, আর সেই সন্ধ্যে পার হয়ে রাতের কাঁটা তখন ছুঁয়ে ফেলেছে ৯টা। এতক্ষণ মনসুর সাহেব বোধহয় অন্য ঘরে নাতিদের সাথে গল্পগুজব করছিলেন । এদিকে খাটের ওপর দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা অয়নের চোখে কখন যেন একটা হালকা তন্দ্রা বা ঘুমের ঘোর এসে গিয়েছিল। আর চন্দ্রাণী? সে তখন থেকে খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে বসে নিজের আইফোনে একনাগাড়ে রিলস স্ক্রল করে যাচ্ছে। নেটওয়ার্কের অবস্থা খুব একটা সুবিধার না হলেও, এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মনটাকে সরিয়ে রাখার জন্য ওটাই তার একমাত্র আশ্রয়।
ঠিক এমন সময় ঘরের দরজায় একটা ভারী পায়ের শব্দ হলো। ঘরে ঢুকলেন মনসুর ।
তিনি অয়নকে ওমন আধো-ঘুমে দেখে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "বলি ডাক্তার সাব, আজ তো আপনাদের মহা মুশকিল লাইগা গেল। শুনলাম ওদিকের পুলটাও নাকি একদম ভাইঙা তলিয়ে গেছে। তা এই রাতে গাড়ি নিয়া ক্যামনে যাবেন? তার চেয়ে বরং আজকের রাতটা এখানেই কাটিয়ে নেন। কী বলেন?"
আচমকা আওয়াজে অয়নের তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। তিনি ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসলেন। পাশে বসা বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যে একটু পারমিশন নেবে, সেই সুযোগটাই হলো না। মনসুর সাহেবের মুখের ওপর সরাসরি ‘না’ বলার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। অয়ন নিজেকে সামলে নিয়ে সজাগ হয়ে বললেন, "হাঁ... তা যা বলেছেন । কী আর করা যাবে! আমার নিজেরও মনে হচ্ছে এই দুর্যোগে এখন আর গাড়ি নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না।"
কথাটা বলেই অয়ন আড়চোখে চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণীর মুখের হাবভাব মোটেও ভালো না। তার কপাল কুঁচকে গেছে, ঠোঁট দুটো রাগে আর বিরক্তিতে চেপে বসেছে। অয়ন পরিস্থিতি হালকা করতে দ্রুত মনসুরের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বললেন, "আপনাকে অনেক ধন্যবাদ চাচা। আমরা একদম অচেনা লোক, তাও আপনি এই রাতে আমাদের আশ্রয় দিচ্ছেন।"
মনসুর সাহেব হাত নেড়ে একগাল হেসে বললেন, "আরে এই কথা বইলা শরম দেবেন না ডাক্তার সাব। আপনারা শহরের বড় মানুষ, আমাদের ঘরে পায়ের ধুলো দিছেন। এই বিপদের সময় আপনাদের একটু সাহায্য করতে পারলাম, এটাই আমাদের সৌভাগ্য।" একটু থেমে তিনি আবার বললেন, "বলি, আপনারা এবার হাত-মুখ ধুয়ে নেন। বউমা রাতের খাবার বানাইয়া ফেলছে। আসেন, খেয়ে নেবেন।"
মনসুর সাহেব ঘর থেকে চলে যেতেই অয়ন একটু অপরাধী মুখে চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণীর খুব কাছাকাছি সরে এসে নরম গলায় বললেন, "কী করব বলো সোনা? আমি জানি তোমার এই পরিবেশে একটুও ভালো লাগছে না, খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, এই মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই তো!"
চন্দ্রাণী অয়নের কথার কোনো উত্তর দিল না। পাত্তাই না দেওয়ার মতো করে একটা তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার ফোনের স্ক্রিনে মনযোগ দিল। তার এই নীরব অভিমান অয়নকে আরও একটু গুটিয়ে দিল।
অয়ন খাট থেকে নেমে বললেন, "আমি বরং গাড়ি থেকে আমাদের এক্সট্রা জামাকাপড়গুলো নিয়ে আসি। তুমি বোসো।"
অয়নের একটা ভালো অভ্যাস আছে, গাড়িতে সবসময়ই তাদের দু-সেট করে এক্সট্রা জামাকাপড় আর প্রসাধন থাকে, যাতে হুটহাট কোথাও আটকে গেলে সুবিধা হয়। অয়ন ছাতা মাথায় দিয়ে জল-কাদা ভেঙে গাড়ি থেকে ব্যাগটা নিয়ে এলেন। ঘরে ব্যাগটা রেখে শুধু নিজের তোয়ালেটা কাঁধে নিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন।
খানিকক্ষণ পর হাত-পা-মুখ ধুয়ে বেশ ফ্রেস হয়ে ঘরে ফিরে এলেন অয়ন। ঘরে ঢুকেই দেখলেন চন্দ্রাণী আগের মতোই মুঠোফোন হাতড়ে বসে আছে। অয়ন বললেন, "কই গো, তুমি এখনো ওভাবেই বসে আছ? যাও, ওয়াশরুম থেকে একটু সেরে এসো। কখন থেকে যাবে বলছিলে না?"
চন্দ্রাণী আর কী করবে! বেগ চেপে রাখা তো আর সম্ভব নয়। অগত্যা সে মুখটা ভার করে বিছানা থেকে নামল। অয়ন তোয়ালেটা চন্দ্রাণীর হাতে দিয়ে বাইরে যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দিলেন, "বেরিয়ে ডানদিকের দিয়ে গেলেই বাথরুম।"
বাইরে তখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। পাকা দালান আর মাটির উঠোন সব জলে ভিজে সপসপ আর প্যাচপ্যাচ করছে। সেই কাদার ছাঁট বাঁচিয়ে চন্দ্রাণী অতি সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল। সামনেই একটা টিনের দরমা দেওয়া, মেঝে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বাথরুম। এটাকে আদেও শহরের ভাষায় ‘বাথরুম’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে চন্দ্রাণীর মনে ঘোর সন্দেহ জাগল!
ভেতরে ঢুকে চন্দ্রাণী দেখল—একপাশে গ্রামীণ কায়দায় পটি করার ব্যবস্থা, আর অন্যপাশে দুটো প্লাস্টিকের বালতি আর কল। দেওয়ালের চারদিকটা স্যাঁতসেঁতে এবং হালকা শ্যাওলা ধরা। বৃষ্টির কারণে মেঝেটাও কেমন যেন হড়হড় করছে। জায়গাটা আকারে বেশ বড় হলেও, চন্দ্রাণীর শহরের সেই ৩-বিএইচকে ফ্ল্যাটের অ্যাটাচড ফ্যান্সি ফিটিংসের বাথরুমের ধারেকাছেও এটি নয়।
চন্দ্রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেসিনের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাল, কিন্তু বেসিন তো দূর অস্ত! সে বাধ্য হয়ে প্লাস্টিকের কলটা ঘুরিয়ে জল ছাড়ল। পা দুটো সামান্য ধুয়ে, আঁজলা করে জল নিয়ে মুখটা ধুয়ে নিতেই সে বুঝল—জলটা কেমন যেন নোনতা স্বাদের। উপকূলবর্তী অঞ্চলের চেনা নোনা জল।
কোনোমতে মুখ-হাত ধুয়ে চন্দ্রাণী তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছল। ভেজা জিন্স আর গায়ের কাপড়টা সামলাতে সামলাতে সে যখন আবার ঘরে ফিরে এলো, দেখল অয়ন ততক্ষণে খাটের ওপর চুপচাপ বসে তার জন্যই অপেক্ষা করছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)