20-07-2026, 06:55 PM
গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে ঠিক যেন ছোট ছোট পাথরের টুকরো। বৃষ্টির বেগ এত বেশি যে ভ্যাকুয়াম স্পীডে চলা ওয়াইপার দুটোও সামনের রাস্তা পরিষ্কার করতে হিমশিম খাচ্ছে। কাঁচের ওপারে সবকিছু ঝাপসা, ধোঁয়াটে।
গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে বসে আছেন আটত্রিশ বছর বয়সী ডক্টর অয়ন চ্যাটার্জি। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, আর বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি। ঠিক ভরদুপুরে তারা এসে ফেঁসে গেছেন এই প্রত্যন্ত গ্রামের এক্কেবারে শেষ সীমানায়। সামনেই একটা খাল, যার ওপর কংক্রিটের ছোট পুলটা এতক্ষণ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢল আর জলের তোড়ে পুলটার মাঝখান থেকে বেশ বড় একটা অংশ ভেঙে তলিয়ে গেছে। ঘোলাটে, ফুঁসে ওঠা জল ফেনা তুলে বয়ে যাচ্ছে সেই ভাঙা অংশ দিয়ে। এপারে দাঁড়িয়ে ছাই রঙের ফোর-হুইলার গাড়ির ভেতর বসে থাকা ছাড়া অয়নের আর কোনো উপায় নেই।
বাঁ দিকের কো-ড্রাইভার সিটে বসা চন্দ্রাণী। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কিছুক্ষণ পরপরই সে জানলার বাইরে তাকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু জলের ঝাপটায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন, প্ল্যানটা কত নিখুঁত ছিল! সরকারি উদ্যোগে স্পেশালিস্ট ডাক্তার হিসেবে আজ সকালে এই প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। কয়েক মাস ধরে অয়নের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড কাজের চাপ গেছে। পড়াশোনা শেষ করতেই জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেধাবী ছেলেটার। দু-বছর আগে যখন চন্দ্রাণীর সাথে বিয়ে হলো, তারপর থেকেও প্র্যাকটিস আর হাসপাতালের ডিউটি সামলাতে সামলাতে তাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সময় পাননি। তাই এবার যখন এই গ্রামের ভিজিটের ডাক এলো, অয়ন ভাবলেন—এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাক।
চন্দ্রাণী অবশ্য আসতে চায়নি। এই অজপাড়াগাঁয়ে আসার ব্যাপারে তার ঘোর আপত্তি ছিল। অয়নই একপ্রকার জোর করে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে সাথে এনেছেন। প্ল্যান ছিল, সকাল সকাল গ্রামের হাসপাতালে গিয়ে জনাকয়েক রোগীকে ফ্রি-তে প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়া আর সরকারি তদারকির কাজটা সেরে নেবেন। দুপুরের মধ্যে কাজ শেষ করে সোজা গাড়ি ছুটিয়ে দেবেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। রাতের মধ্যে সেখানে পৌঁছে কোনো ভালো হোটেলে একটা বা দুটো দিন নির্ভেজাল ছুটি কাটানো যাবে। তারপরের দিন চট্টগ্রাম ব্যাক করবেন।
কিন্তু প্রকৃতির ইচ্ছে বোধহয় অন্যরকম ছিল। সকাল থেকে গ্রামের মানুষের সাথে কথাবার্তা বলা, রোগীদের ভিড় সামলানো—সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই আকাশ কালো করে এমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল, যা রূপ নিল অকাল দুর্যোগে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অয়ন একটু আড়চোখে চন্দ্রাণীকে দেখলেন। পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই চন্দ্রাণীর রূপ এখনো আগের মতোই মায়াবী। নিয়মিত যোগব্যায়াম করার কারণে শরীরটা বেশ টানটান, অয়নের মতোই লম্বা আর ছিপছিপে। আজ থেকে তিন বছর আগে একটা এনজিওর ইভেন্টে চন্দ্রাণীর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল অয়নের। চন্দ্রাণী তখন একটা নামী কলেজে ইংরেজি পড়াতো, এখনো সেই শিক্ষকতা সে ছাড়েনি। অয়নের জীবনে চন্দ্রাণীই প্রথম নারী। পড়াশোনার চাপে অয়নের কখনো প্রেম করার ফুরসত হয়নি। অন্যদিকে চন্দ্রাণীর কলেজ লাইফে দু-একটা রিলেশনশিপ থাকলেও সেগুলো অতটা সিরিয়াস ছিল না। অয়নকেই সে নিজের জীবনে প্রথম এবং শেষ পুরুষ হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছে। এক বছরের জমজমাট প্রেমের পর তাদের চার হাত এক হয়েছিল।
হঠাৎ করেই চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। একটা বিকট শব্দে গাড়ির ঠিক একশো মিটারের মধ্যে একটা মস্ত বড় বাজ পড়ল। তীব্র আলোয় চারপাশটা এক পলকের জন্য সাদা হয়ে গেল, আর সেই সাথে গাড়িটা যেন কেঁপে উঠল।
"ওহ গড! প্লিয অয়ন, কোথাও একটা চলো! এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা নির্ঘাত মরব!" চন্দ্রাণী দুই কানের ওপর হাত চেপে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। তার ফর্সা মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
অয়নের নিজের বুকেও তখন ধক করে উঠেছে। পরিস্থিতি সত্যিই সুবিধার নয়। এই জনমানবহীন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে আর যাই হোক, কোনো সমাধান হবে না। পেছনের দিকে তাকালে ঝাপসা কুয়াশা আর বৃষ্টির পর্দার আড়ালে দু-চারটে টিনের চাল আর মাটির ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে—যা একটু আগেই তারা পার করে এসেছেন। অয়নের মন সায় দিচ্ছিল না অপরিচিত কোনো গ্রামবাসীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে, কিন্তু এই মুহূর্তে অহংকার বা দ্বিধা করার বিলাসিতা দেখানোর সময় নয়।
"ঠিক আছে, শান্ত হও। আমি গাড়ি ঘোরাচ্ছি," অয়ন নিজের গলাকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললেন।
তিনি গিয়ার শিফট করে গাড়িটা ব্যাক করলেন। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অত্যন্ত সাবধানে গাড়িটাকে আবার সেই কাদা-প্যাচপ্যাচে কাঁচা রাস্তায় ঢোকালেন, যেখান থেকে একটু আগেই তারা এসেছিলেন। চাকাগুলো কাদায় সামান্য স্কিড করল, কিন্তু অয়ন দক্ষতার সাথে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। সামনের ওই আদিম, অচেনা বসতিটুকুর দিকেই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।
কাদা আর জলের চাদরে ঢাকা সরু রাস্তা ধরে গাড়িটা আরও কিছুটা এগোতেই অয়নের চোখে পড়ল গ্রামের চেনা এক চিলতে শৈশব। একটা গলির মুখে থৈ থৈ করছে জমে থাকা জল। আর সেই জলের মধ্যেই পরম আনন্দে মগ্ন দুটো পুঁচকে বাচ্চা, বয়স বড়জোর পাঁচ থেকে সাত বছর হবে। পরনে শুধু হাফ প্যান্ট, খালি গা। তীব্র বৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা পরম উৎসাহে কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসানোর প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গাড়িটা তাদের একদম কাছাকাছি আসতেই অয়ন ড্রাইভিং সিটের জানলার কাঁচটা সামান্য নামালেন। বৃষ্টির ছাঁট এসে অয়নের ডান গাল আর চশমায় এসে লাগল। ঠিক তখনই দেখা গেল এক মাঝবয়সী গৃহবধূকে। গায়ে একটা সাধারণ কামিজ, বুকে ওড়না জড়ানোর ফুরসত মেলেনি। দূর থেকে বৃষ্টির মধ্যে প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছেন তিনি।
বাচ্চা দুটোর সামনে এসেই রাগে আর উদ্বেগে ফেটে পড়লেন মহিলা— "কই রে তোরা? চল বাসায় চল! এত জল-ঝড় হচ্ছে, তাও এদের দুষ্টুমি বন্ধ হয় না!" বলতে বলতেই বড় ছেলেটার পিঠে ‘ঠাস’ করে একটা চড় কষিয়ে দিলেন।
মেজো ছেলেটা ততক্ষণে খিলখিল করে হেসে উঠেছে। অয়ন দেখেই বুঝলেন, এই মহিলাই এদের জননী। শাসন করার পর মহিলাটি এবার দুই হাতে দুই ছেলের হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে গলির ভেতরের বাসার দিকে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু ছেলে দুটোও মহা ফাজিল! শরীর ভারী করে মাটিতে পা ঘষতে ঘষতে দাঁড়িয়ে রইল, কিছুতেই যাবে না।
সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না অয়ন। জানলার ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে একটু চড়া সুরে ডাকলেন, "শুনছেন ভাবি? এদিকে... একটু এদিকে শুনবেন?"
ঝড়ের শব্দের মধ্যে আচমকা এক শহুরে পুরুষের গলার আওয়াজ পেয়ে মহিলাটি একটু থতমত খেয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপর দেখতে পেলেন রাস্তার ওপর কালো কাঁচ ঢাকা একটা মস্ত বড় ফোর-উইলার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরটা অন্ধকার, চট করে বোঝা যাচ্ছে না কারা বসে আছে।
অয়ন আর দেরি না করে গাড়িটা গিয়ারে ফেলে টুক করে একটু এগিয়ে নিয়ে মহিলাটির একদম সামনে দাঁড় করালেন। কাঁচটা আরেকটু নামিয়ে বিনীতভাবে বললেন, "বলছি ভাবি, এখানে আশেপাশে কোথাও একটু অপেক্ষা করার মতো জায়গা আছে? এত ঝড়-বৃষ্টি, দেখতেই তো পারছেন—পুলটাও ভেঙে গেছে। গাড়ি নিয়ে একদম ফেঁসে গেছি।"
মহিলাটি প্রথমে শহরের এমন বাবুদের গাড়ি দেখে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অবাক হয়ে বললেন, "আপনারা শহরে ফিরে যাচ্ছিলেন বুঝি?"
"হ্যাঁ," অয়ন কপালে হাত দিয়ে অসহায়ভাবে বললেন, "দেখুন না, একদম ফেঁসে গেলাম। কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা পাচ্ছি না।"
মহিলার চোখে-মুখে গ্রামীণ সহজ সরল আতিথেয়তা ফুটে উঠল। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, "আসেন আসেন, আমাদের বাসা এই দুটো বাড়ি পরেই। আপনারা চাইলে খানিকক্ষণ সেখানে বসে জিরিয়ে নিতে পারেন। বৃষ্টিটা কমলে তারপর যাবেন।"
অয়ন মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। এই দুর্যোগে এর চেয়ে ভালো কোনো অপশন আর হতেই পারে না। তবুও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি একবার জিজ্ঞাসু চোখে পাশে বসা চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণী এতক্ষণ বাইরে এক ফোঁটা কাদা লাগার ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল, কিন্তু গাড়ির ওপর যেভাবে বাজ পড়ার শব্দ হচ্ছিল, তাতে সে-ও আর ঝুঁকি নিতে চাইল না। সে সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল, "চলো, আর তো কোনো উপায় নেই।"
অয়ন এবার মহিলার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, "চলুন তবে।"
"আসেন আমাদের সাথে," বলে মহিলাটি আবার ওই অবাধ্য ছেলে দুটোকে দু-হাতে হ্যাঁচকা টান দিতে দিতে গলির ভেতরের দিকে এগোতে লাগলেন।
কাঁচা রাস্তার লাল কাদা আর চাকার ঘর্ষণে একটা সপসপ শব্দ হলো। অয়ন অত্যন্ত সাবধানে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটা ডান দিকে টার্ন নিলেন এবং গলির নরম কাদার ওপর চাকা সঁপে দিয়ে ওই মহিলার পিছু পিছু এগিয়ে চললেন। এক অজানা আশ্রয়ের খোঁজে, প্রকৃতির বুক চিরে তাদের গাড়ি এগিয়ে চলল গ্রামের আরও গভীরে।
গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে বসে আছেন আটত্রিশ বছর বয়সী ডক্টর অয়ন চ্যাটার্জি। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, আর বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি। ঠিক ভরদুপুরে তারা এসে ফেঁসে গেছেন এই প্রত্যন্ত গ্রামের এক্কেবারে শেষ সীমানায়। সামনেই একটা খাল, যার ওপর কংক্রিটের ছোট পুলটা এতক্ষণ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢল আর জলের তোড়ে পুলটার মাঝখান থেকে বেশ বড় একটা অংশ ভেঙে তলিয়ে গেছে। ঘোলাটে, ফুঁসে ওঠা জল ফেনা তুলে বয়ে যাচ্ছে সেই ভাঙা অংশ দিয়ে। এপারে দাঁড়িয়ে ছাই রঙের ফোর-হুইলার গাড়ির ভেতর বসে থাকা ছাড়া অয়নের আর কোনো উপায় নেই।
বাঁ দিকের কো-ড্রাইভার সিটে বসা চন্দ্রাণী। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কিছুক্ষণ পরপরই সে জানলার বাইরে তাকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু জলের ঝাপটায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন, প্ল্যানটা কত নিখুঁত ছিল! সরকারি উদ্যোগে স্পেশালিস্ট ডাক্তার হিসেবে আজ সকালে এই প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। কয়েক মাস ধরে অয়নের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড কাজের চাপ গেছে। পড়াশোনা শেষ করতেই জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেধাবী ছেলেটার। দু-বছর আগে যখন চন্দ্রাণীর সাথে বিয়ে হলো, তারপর থেকেও প্র্যাকটিস আর হাসপাতালের ডিউটি সামলাতে সামলাতে তাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সময় পাননি। তাই এবার যখন এই গ্রামের ভিজিটের ডাক এলো, অয়ন ভাবলেন—এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাক।
চন্দ্রাণী অবশ্য আসতে চায়নি। এই অজপাড়াগাঁয়ে আসার ব্যাপারে তার ঘোর আপত্তি ছিল। অয়নই একপ্রকার জোর করে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে সাথে এনেছেন। প্ল্যান ছিল, সকাল সকাল গ্রামের হাসপাতালে গিয়ে জনাকয়েক রোগীকে ফ্রি-তে প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়া আর সরকারি তদারকির কাজটা সেরে নেবেন। দুপুরের মধ্যে কাজ শেষ করে সোজা গাড়ি ছুটিয়ে দেবেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। রাতের মধ্যে সেখানে পৌঁছে কোনো ভালো হোটেলে একটা বা দুটো দিন নির্ভেজাল ছুটি কাটানো যাবে। তারপরের দিন চট্টগ্রাম ব্যাক করবেন।
কিন্তু প্রকৃতির ইচ্ছে বোধহয় অন্যরকম ছিল। সকাল থেকে গ্রামের মানুষের সাথে কথাবার্তা বলা, রোগীদের ভিড় সামলানো—সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই আকাশ কালো করে এমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল, যা রূপ নিল অকাল দুর্যোগে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অয়ন একটু আড়চোখে চন্দ্রাণীকে দেখলেন। পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই চন্দ্রাণীর রূপ এখনো আগের মতোই মায়াবী। নিয়মিত যোগব্যায়াম করার কারণে শরীরটা বেশ টানটান, অয়নের মতোই লম্বা আর ছিপছিপে। আজ থেকে তিন বছর আগে একটা এনজিওর ইভেন্টে চন্দ্রাণীর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল অয়নের। চন্দ্রাণী তখন একটা নামী কলেজে ইংরেজি পড়াতো, এখনো সেই শিক্ষকতা সে ছাড়েনি। অয়নের জীবনে চন্দ্রাণীই প্রথম নারী। পড়াশোনার চাপে অয়নের কখনো প্রেম করার ফুরসত হয়নি। অন্যদিকে চন্দ্রাণীর কলেজ লাইফে দু-একটা রিলেশনশিপ থাকলেও সেগুলো অতটা সিরিয়াস ছিল না। অয়নকেই সে নিজের জীবনে প্রথম এবং শেষ পুরুষ হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছে। এক বছরের জমজমাট প্রেমের পর তাদের চার হাত এক হয়েছিল।
হঠাৎ করেই চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। একটা বিকট শব্দে গাড়ির ঠিক একশো মিটারের মধ্যে একটা মস্ত বড় বাজ পড়ল। তীব্র আলোয় চারপাশটা এক পলকের জন্য সাদা হয়ে গেল, আর সেই সাথে গাড়িটা যেন কেঁপে উঠল।
"ওহ গড! প্লিয অয়ন, কোথাও একটা চলো! এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা নির্ঘাত মরব!" চন্দ্রাণী দুই কানের ওপর হাত চেপে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। তার ফর্সা মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
অয়নের নিজের বুকেও তখন ধক করে উঠেছে। পরিস্থিতি সত্যিই সুবিধার নয়। এই জনমানবহীন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে আর যাই হোক, কোনো সমাধান হবে না। পেছনের দিকে তাকালে ঝাপসা কুয়াশা আর বৃষ্টির পর্দার আড়ালে দু-চারটে টিনের চাল আর মাটির ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে—যা একটু আগেই তারা পার করে এসেছেন। অয়নের মন সায় দিচ্ছিল না অপরিচিত কোনো গ্রামবাসীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে, কিন্তু এই মুহূর্তে অহংকার বা দ্বিধা করার বিলাসিতা দেখানোর সময় নয়।
"ঠিক আছে, শান্ত হও। আমি গাড়ি ঘোরাচ্ছি," অয়ন নিজের গলাকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললেন।
তিনি গিয়ার শিফট করে গাড়িটা ব্যাক করলেন। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অত্যন্ত সাবধানে গাড়িটাকে আবার সেই কাদা-প্যাচপ্যাচে কাঁচা রাস্তায় ঢোকালেন, যেখান থেকে একটু আগেই তারা এসেছিলেন। চাকাগুলো কাদায় সামান্য স্কিড করল, কিন্তু অয়ন দক্ষতার সাথে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। সামনের ওই আদিম, অচেনা বসতিটুকুর দিকেই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।
কাদা আর জলের চাদরে ঢাকা সরু রাস্তা ধরে গাড়িটা আরও কিছুটা এগোতেই অয়নের চোখে পড়ল গ্রামের চেনা এক চিলতে শৈশব। একটা গলির মুখে থৈ থৈ করছে জমে থাকা জল। আর সেই জলের মধ্যেই পরম আনন্দে মগ্ন দুটো পুঁচকে বাচ্চা, বয়স বড়জোর পাঁচ থেকে সাত বছর হবে। পরনে শুধু হাফ প্যান্ট, খালি গা। তীব্র বৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা পরম উৎসাহে কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসানোর প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গাড়িটা তাদের একদম কাছাকাছি আসতেই অয়ন ড্রাইভিং সিটের জানলার কাঁচটা সামান্য নামালেন। বৃষ্টির ছাঁট এসে অয়নের ডান গাল আর চশমায় এসে লাগল। ঠিক তখনই দেখা গেল এক মাঝবয়সী গৃহবধূকে। গায়ে একটা সাধারণ কামিজ, বুকে ওড়না জড়ানোর ফুরসত মেলেনি। দূর থেকে বৃষ্টির মধ্যে প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছেন তিনি।
বাচ্চা দুটোর সামনে এসেই রাগে আর উদ্বেগে ফেটে পড়লেন মহিলা— "কই রে তোরা? চল বাসায় চল! এত জল-ঝড় হচ্ছে, তাও এদের দুষ্টুমি বন্ধ হয় না!" বলতে বলতেই বড় ছেলেটার পিঠে ‘ঠাস’ করে একটা চড় কষিয়ে দিলেন।
মেজো ছেলেটা ততক্ষণে খিলখিল করে হেসে উঠেছে। অয়ন দেখেই বুঝলেন, এই মহিলাই এদের জননী। শাসন করার পর মহিলাটি এবার দুই হাতে দুই ছেলের হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে গলির ভেতরের বাসার দিকে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু ছেলে দুটোও মহা ফাজিল! শরীর ভারী করে মাটিতে পা ঘষতে ঘষতে দাঁড়িয়ে রইল, কিছুতেই যাবে না।
সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না অয়ন। জানলার ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে একটু চড়া সুরে ডাকলেন, "শুনছেন ভাবি? এদিকে... একটু এদিকে শুনবেন?"
ঝড়ের শব্দের মধ্যে আচমকা এক শহুরে পুরুষের গলার আওয়াজ পেয়ে মহিলাটি একটু থতমত খেয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপর দেখতে পেলেন রাস্তার ওপর কালো কাঁচ ঢাকা একটা মস্ত বড় ফোর-উইলার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরটা অন্ধকার, চট করে বোঝা যাচ্ছে না কারা বসে আছে।
অয়ন আর দেরি না করে গাড়িটা গিয়ারে ফেলে টুক করে একটু এগিয়ে নিয়ে মহিলাটির একদম সামনে দাঁড় করালেন। কাঁচটা আরেকটু নামিয়ে বিনীতভাবে বললেন, "বলছি ভাবি, এখানে আশেপাশে কোথাও একটু অপেক্ষা করার মতো জায়গা আছে? এত ঝড়-বৃষ্টি, দেখতেই তো পারছেন—পুলটাও ভেঙে গেছে। গাড়ি নিয়ে একদম ফেঁসে গেছি।"
মহিলাটি প্রথমে শহরের এমন বাবুদের গাড়ি দেখে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অবাক হয়ে বললেন, "আপনারা শহরে ফিরে যাচ্ছিলেন বুঝি?"
"হ্যাঁ," অয়ন কপালে হাত দিয়ে অসহায়ভাবে বললেন, "দেখুন না, একদম ফেঁসে গেলাম। কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা পাচ্ছি না।"
মহিলার চোখে-মুখে গ্রামীণ সহজ সরল আতিথেয়তা ফুটে উঠল। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, "আসেন আসেন, আমাদের বাসা এই দুটো বাড়ি পরেই। আপনারা চাইলে খানিকক্ষণ সেখানে বসে জিরিয়ে নিতে পারেন। বৃষ্টিটা কমলে তারপর যাবেন।"
অয়ন মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। এই দুর্যোগে এর চেয়ে ভালো কোনো অপশন আর হতেই পারে না। তবুও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি একবার জিজ্ঞাসু চোখে পাশে বসা চন্দ্রাণীর দিকে তাকালেন। চন্দ্রাণী এতক্ষণ বাইরে এক ফোঁটা কাদা লাগার ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল, কিন্তু গাড়ির ওপর যেভাবে বাজ পড়ার শব্দ হচ্ছিল, তাতে সে-ও আর ঝুঁকি নিতে চাইল না। সে সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল, "চলো, আর তো কোনো উপায় নেই।"
অয়ন এবার মহিলার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, "চলুন তবে।"
"আসেন আমাদের সাথে," বলে মহিলাটি আবার ওই অবাধ্য ছেলে দুটোকে দু-হাতে হ্যাঁচকা টান দিতে দিতে গলির ভেতরের দিকে এগোতে লাগলেন।
কাঁচা রাস্তার লাল কাদা আর চাকার ঘর্ষণে একটা সপসপ শব্দ হলো। অয়ন অত্যন্ত সাবধানে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটা ডান দিকে টার্ন নিলেন এবং গলির নরম কাদার ওপর চাকা সঁপে দিয়ে ওই মহিলার পিছু পিছু এগিয়ে চললেন। এক অজানা আশ্রয়ের খোঁজে, প্রকৃতির বুক চিরে তাদের গাড়ি এগিয়ে চলল গ্রামের আরও গভীরে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)