15-07-2026, 08:40 PM
৩১।
আশিক ভাই!
আশিক ভাই আমাদের 'ঢাকা পেপারস'-এর ক্রাইম বিটের চিফ রিপোর্টার। উনার বয়স পঁয়ত্রিশের মতো হবে। উনার চেহারাটা সবসময় একটা রুক্ষ, রাফ-অ্যান্ড-টাফ লুক দেয়। উনাকে কখনো ফর্মাল শার্ট বা ইন-করা প্যান্ট পরতে দেখিনি। উনার সিগনেচার ড্রেস হলো একটা উসকোখুস্কো, ফেডেড জিন্স আর একটা চেক শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম সবসময় খোলা থাকে। উনার গলায় পত্রিকার প্রেস কার্ডটা একটা মাদুলি বা তাবিজের মতো ঝোলে।
আশিক ভাইয়ের চোখ দুটো সব সময় লাল থাকে। কেউ বলে উনি রাত জেগে সোর্স মেইনটেইন করেন বলে এই অবস্থা, আবার অফিসে এমন গুজবও আছে যে উনি নাকি গাঁজা বা অন্য কোনো নেশা করেন। তবে কারণ যাই হোক, উনার চোখের ওই লালচে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় উনি আপনার পেটের ভেতরের কথাটাও স্ক্যান করে ফেলছেন।
বাংলাদেশের সংবাদ পাড়ায় আশিক ভাই বেশ নামি দামি একটা চরিত্র। ঢাকা শহরের বড় বড় থানার ওসি থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক গডফাদারের সাথে উনার ডিরেক্ট কানেকশন। ডিবি পুলিশ, র্যাব, সিআইডি— সব জায়গায় উনার সোর্স আছে। কোথায় কোন মার্ডার হলো, কোন পলিটিশিয়ান কার সাথে ঘুষের ডিল করল, কোন মডেলকে কোন ব্যবসায়ী ফ্ল্যাট কিনে দিল— এই সমস্ত খবর আশিক ভাইয়ের নখদর্পণে। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে উনি একাই একশো।
উনার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব একটা গভীর না। একই অফিসে কাজ করার সুবাদে জাস্ট 'হাই-হ্যালো' টাইপ সম্পর্ক। আমি থাকি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে, বিশ্বের পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, হোয়াইট কলার খবর নিয়ে। আর উনি থাকেন দেশের ড্রেন, নর্দমা আর রক্তের খবরের মধ্যে। আমাদের দুজনের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝে মাঝে অফিসের নিচে টং দোকানে চা খাওয়ার সময় বা স্মোকিং লাউঞ্জে সিগারেট টানার সময় দেখা হলে একটু কুশল বিনিময় হয়।
"কী অবস্থা রাশেদ? বাইডেনের খবর কী?" উনি হয়তো সিগারেট ধরাতে ধরাতে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করেন।
"এই তো ভাই, চলছে। আপনার এলাকার খবর কী? আজ কয়টা খুন হলো?" আমি পাল্টা মজা করি।
উনি আমাকে খুব একটা পাত্তা দেন না, কারণ উনার চোখে আমি তো নিরামিষ অনুবাদক। আমার জীবনে তো কোনো থ্রিল নেই, কোনো রহস্য নেই। কিন্তু আজ... আজ আমার এই নিরামিষ জীবনে যে পরিমাণ আমিষ মসলা, যে পরিমাণ রক্ত আর অপরাধের ছায়া ঢুকেছে, তাতে আশিক ভাই ছাড়া আমাকে আর কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।
আশিক ভাই হয়তো আমাকে একটা গালি দেবেন। হয়তো বলবেন, "শালা, তুই দেখতে তো খুব ভদ্র, আর ভেতরে ভেতরে এত বড় প্লেয়ার! অন্যের বউয়ের সাথে বিছানায় যাস!" কিন্তু গালি দেওয়ার পরও উনি আমাকে পুলিশের সাইকোলজিটা অন্তত বুঝিয়ে বলতে পারবেন। উনি বলতে পারবেন আনিকা নাওহারের এই জিডি ফাইল করার পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী হতে পারে। উনি আমাকে একটা পথ দেখাতে পারবেন, যাতে আমি এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারি।
আমি ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরালাম। পুতিন তখনো স্পিচ দিয়ে যাচ্ছেন। পুতিন সাহেব, আপনার যুদ্ধ আপনি করুন। আমাকে এখন আমার নিজের বিশ্বযুদ্ধে নামতে হবে। আমি ল্যাপটপটা লক করলাম। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে আমি আমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
আশিক ভাইয়ের ডেস্কটা নিউজ রুমের একদম শেষ মাথায়। সেখানে সবসময় একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকে। চায়ের খালি কাপ, প্রিন্ট করা কাগজ, আর ছাইদানিতে সিগারেটের স্তূপ। আমি বুক দুরুদুরু অবস্থায় উনার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আশিক ভাই তখন কানে ইয়ারফোন দিয়ে একটা ভয়েস রেকর্ড শুনছেন, আর খুব দ্রুত কিছু টাইপ করছেন। উনার মুখের এক পাশে একটা আধা-খাওয়া সিগারেট জ্বলছে।
"আশিক ভাই? একটু ডিস্টার্ব করি?" আমি খুব মিনমিন করে বললাম।
আশিক ভাই ইয়ারফোনটা এক কান থেকে খুলে আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন। উনার লালচে চোখে একটা বিরক্তি আর কৌতূহলের মিশ্রণ। "আরে রাশেদ সাহেব! কী খবর? পুতিন আর ট্রাম্প কি সন্ধি কইরা ফেলল নাকি? তুমি ক্রাইম ডেস্কে কী মনে করে?"
"ভাই, সন্ধি তো দূরের কথা, আমার নিজের জীবনেই থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হয়ে গেছে। আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল। একান্ত ব্যক্তিগত। পাঁচটা মিনিট সময় দেওয়া যাবে?" আমি খুব অসহায় একটা মুখ করে বললাম।
আমার গলার স্বর আর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আশিক ভাইয়ের রিপোর্টার ইনস্টিংক্ট হয়তো কিছু একটা আঁচ করতে পারল। উনি টাইপিং থামিয়ে উনার চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরলেন। "বসো," উনি সামনের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন। "বলো, কী এমন ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হইলো তোমার লাইফে?"
আমি চেয়ারটায় বসলাম। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। আমাকে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। এমনভাবে গল্পটা সাজাতে হবে যাতে আমার ইনভলভমেন্টটা থাকে, কিন্তু আমার আর আনিকার শারীরিক বা যৌন সম্পর্কের বিষয়টা পুরোপুরি আড়ালে থাকে। ক্রাইম রিপোর্টাররা খুব শার্প হয়, একটু এদিক-সেদিক হলেই তারা আসল ঘটনা ধরে ফেলবে।
"ভাই, ব্যাপারটা হচ্ছে..." আমি গলা পরিষ্কার করে শুরু করলাম। "আমার এক পরিচিত বড় আপু আছেন। উনি একজন লেখিকা। লন্ডন থাকেন। আমি উনার বইয়ের প্রুফরিডিংয়ের কাজ করি। তো, উনি গত এক মাস ধরে দেশে আছেন। উনার একটা ফ্ল্যাট আছে ধানমন্ডিতে। উনি আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন কয়েকদিনের জন্য উনার ফ্ল্যাটে থেকে উনার নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা এডিট করে দিতে। আমি গত কয়েকদিন ওই ফ্ল্যাটেই ছিলাম।"
আশিক ভাই পকেট থেকে একটা নতুন সিগারেট বের করে ধরিয়ে বললেন, "হুম। তারপর? প্রুফরিডিং করতে গিয়া কি কোনো ঝামেলা পাকাইছ?"
"না না ভাই, সে রকম কিছু না!" আমি দ্রুত বললাম। "ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। ওই আপুর হাসব্যান্ড সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু গত পরশু রাত থেকেই উনার হাসব্যান্ডকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনি নিখোঁজ।"
আশিক ভাই সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছাড়লেন। উনার চোখে এখন একটা পেশাদার কৌতূহল। "লন্ডনপ্রবাসী হাসব্যান্ড নিখোঁজ? হুম। তারপর?"
"তারপর ভাই, ওই আপু আজ সকালে থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট মানে জিডি করেছেন। আর জিডিতে উনি আমার নামটাও দিয়েছেন। উনি বলেছেন যে উনার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার আগে আমি ওই বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলাম।"
আমি কথাগুলো বলে একটু থামলাম। আমার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। আমি আশিক ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ভাই, আমি তো এসব থানা-পুলিশের কিচ্ছু বুঝি না। পুলিশ যদি এখন আমাকে ডাকে? আমাকে যদি সাসপেক্ট করে বসে? আমি তো ভাই একজন নিরীহ অনুবাদক। আমার তো ভয়ে হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।"
আশিক ভাই কোনো কথা বললেন না। উনি উনার লালচে, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। উনার ঠোঁটে একটা বাকা হাসি। "রাশেদ," আশিক ভাই খুব ধীর, চিবিয়ে চিবিয়ে বলা গলায় শুরু করলেন, "আমি ক্রাইম রিপোর্টিং করতে করতে মানুষের চোখ পড়া শিখে গেছি। তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছ।"
আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। "কই না তো ভাই! যা সত্যি তা-ই বললাম।" আশিক ভাই একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। উনার গলার স্বরটা আরও নিচু হলো। "স্টোরিটা পুরোপুরি মিলছে না রাশেদ। আমাকে সত্যি কথাটা বলো তো ভাই, ওই আপুর সাথে তোমার কি 'ভাবি-দেবর' টাইপ কোনো রোমান্স চলছিল নাকি? চক্কর আছে কোনো?"
আমি ঢোঁক গিললাম। আমার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললাম, "আস্তাগফিরুল্লাহ ভাই! কী যে বলেন! উনি আমার বড় বোনের মতো। প্রুফরিডিংয়ের বাইরে উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"
"শিওর?" আশিক ভাই চোখ সরু করলেন। "লন্ডনপ্রবাসী মহিলা। ধানমন্ডির ফ্ল্যাট। টাকার তো অভাব নাই। সম্পত্তির লোভে কি মহিলা নিজের জামাইরে দুনিয়া থেকে সরাইয়া দিছে বলে তোমার মনে হয়? এই নিখোঁজের পেছনে ওই মহিলার কোনো হাত আছে?"
"আমি কীভাবে বলব ভাই? আমি তো কিছুই জানি না," আমি বোকা সাজার ভান করলাম।
আশিক ভাই এবার উনার সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে ফেলে খুব তীক্ষ্ণ একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। "আর তুমি? তুমি এই গুমের পেছনে জড়িত নাই তো? মানে, সত্যি করে বলো, তুমি তো আর ওই লোকটাকে ড্রয়িংরুমে একা পেয়ে অ্যাশট্রে দিয়ে মাথায় বাড়ি মারো নাই?"
"ভাই!" আমি আক্ষরিক অর্থেই চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "আমি একটা মশাও মারতে পারি না, আর আপনি বলছেন মানুষ খুন! আমি ওই লোকটাকে জীবনে ওইদিন সকালেই ফার্স্ট টাইম দেখেছি। আমি জাস্ট আমার কাজ শেষ করে চলে এসেছি। ট্রাস্ট মি ভাই, আমি কিচ্ছু জানি না।"
আশিক ভাই আমার মুখের আতঙ্কের ছাপটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপর হঠাৎ করে উনার সেই গম্ভীর, ইন্টারোগেটিভ চেহারাটা পাল্টে গেল। উনি একটা খুব তাচ্ছিল্য মেশানো, ডন্ট-কেয়ার মার্কা হাসি হাসলেন। "আরে ধুর মিয়া! রিল্যাক্স! আমি তো জাস্ট চেক করতেছিলাম তুমি কদ্দুর কী জানো," আশিক ভাই হাসতে হাসতে বললেন। "এইটুক বিষয় নিয়া তুমি এমন শুকাইয়া যাইতেছ? আমি তো ভাবলাম তুমি সত্যি সত্যিই কারো মাথা ফাটায়া আসছ। মিসিং জিডিতে নাম দিছে, এতে এত প্যারা খাওয়ার কী আছে? তুমি যখন গুম করো নাই, তখন চিল।"
"ভাই, পুলিশ তো পুলিশই। তারা যদি আমাকে থানায় বসিয়ে রাখে? যদি আজেবাজে জেরা করে?" আমি তবুও আমার ভয়টা প্রকাশ করলাম।
আশিক ভাই একটু হাসলেন। "আচ্ছা, জিডিটা কোন থানায় করছে, জানো কিছু?" আমি দ্রুত বললাম, "কলাবাগান থানায়। আপুর ফ্ল্যাটটা ধানমন্ডি আর কলাবাগানের বর্ডারের দিকে তো, তাই কলাবাগান থানায় করেছে।"
কলাবাগান থানার নামটা শোনার সাথে সাথেই আশিক ভাইয়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উনি এমন একটা ভাব করলেন যেন আমি উনার নিজের বাড়ির কোনো ড্রয়িংরুমের নাম বলেছি। "কলাবাগান থানা! আরে ধুর মিয়া! তুমি তো আগেই বলবা!" আশিক ভাই উনার টেবিল চাপড়ে বললেন। "কলাবাগান থানার ওসি হইলো শাহাদাত ভাই। শাহাদাত ভাই আমার নিজের এলাকার বড় ভাই, আমার খুব ক্লোজ পরিচিত। আমরা সপ্তাহে দুই দিন একসাথে বইসা আড্ডা দিই। তোমার কোনো প্যারা নাই রাশেদ।"
আমার কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ঢাকা শহরে বিপদের সময় একজন ওসি যদি পরিচিত বের হয়, তার চেয়ে বড় জ্যাকপট আর কিছু হতে পারে না। আশিক ভাই একটা কাগজ টেনে নিয়ে তাতে একটা নাম্বার লিখলেন। "শোনো রাশেদ," আশিক ভাই খুব প্রটেক্টিভ গলায় বললেন, "তোমাকে যদি থানা থেকে ডাকে, তুমি একদম বুক ফুলায়া যাবা। কোনো ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তুমি গিয়া ডিরেক্ট ওসি শাহাদাত ভাইয়ের রুমে ঢুকবা। বলবা, 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিকের কলিগ।' শাহাদাত ভাই আমার নাম শুনলে তোমারে চা-বিস্কুট খাওয়াইয়া, স্যালুট দিয়া বিদায় করব। কেউ তোমার দিকে চোখ তুইল্যাও তাকানোর সাহস পাইব না। শুধু যা সত্যি তা-ই বলবা। বলবা তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ।"
আমার মনে হলো, আশিক ভাই এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো সাধারণ রিপোর্টার নন, উনি যেন সাক্ষাৎ কোনো ত্রাণকর্তা ফেরেশতা হয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। "ভাই... আপনাকে যে কীভাবে ধন্যবাদ দেব!" আমি প্রায় আবেগে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা করে বললাম। "আমি আসলেই খুব ভয়ে ছিলাম।"
আশিক ভাই হাসলেন। "আরে বোকা! আমরা একই অফিসে চাকরি করি, আমরা তো ফ্যামিলির মতো। তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তোমার কোনো সমস্যা হইলে আমি দেখব না তো কে দেখবে? আর শোনো, তারপরও যদি তোমার একা থানায় যাইতে অস্বস্তি লাগে, তুমি জাস্ট আমাকে একটা কল দিবা। আমি তোমার সাথে থানায় যামু। শাহাদাত ভাইয়ের রুমে বইসা একসাথে চা খাইয়া আসমু। যাও, গিয়া টেনশন ফ্রি হইয়া কাম করো।"
আমি আশিক ভাইয়ের হাতটা ধরে একটা আন্তরিক ঝাঁকুনি দিলাম। "থ্যাংক ইউ ভাই! থ্যাংক ইউ সো মাচ।" আমি উনার ডেস্ক থেকে যখন ফিরে আসছিলাম, তখন আমার পায়ের নিচের মাটিটা আবার শক্ত মনে হচ্ছিল।
হ্যাঁ, আমার ভেতরে একটা বিশাল নোংরা গোপন সত্য লুকিয়ে আছে। আমি আনিকার সাথে শুয়েছি, আমি বেলালের বিছানায় দাগ ফেলেছি। পুলিশ যদি কখনো সেই সত্যটা খুঁড়ে বের করে, তাহলে হয়তো আশিক ভাই বা ওসি শাহাদাত কেউই আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু আপাতত... আপাতত অন্তত আমার মাথার ওপর থেকে সেই রিমান্ডের, সেই সিলিং ফ্যানে ঝোলানোর ভয়টা কেটে গেছে। আশিক ভাইয়ের ওই একটা 'প্যারা নাই' শব্দ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লাইফ জ্যাকেট হয়ে আমাকে ভাসিয়ে রেখেছে।
আমি আমার ডেস্কে এসে বসলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা আবার অন করলাম। আমার হাত এখন আর কাঁপছে না। আনিকা নাওহারের সেই মায়াবী, ঘাতক ফাঁদে আমি জড়িয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু আমি রাশেদ আহমেদ এত সহজে হার মানার পাত্র নই। আমি পরিস্থিতি দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই এই গল্পের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
আমি কি-বোর্ডে আবার টাইপ করতে শুরু করলাম।
আনিকার সাথে গ্লোরিয়া জিন্স কফিশপে সেই নার্ভ-কাঁপানো সাক্ষাৎ, উনার স্বামী বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার খবর, এবং ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাইয়ের কাছে গিয়ে আমার সেই করুণ আত্মসমর্পণ— এই সবকিছুর পর চোখের পলকে কেটে গেছে তিনটে দিন।
আজ এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ। সোমবার।
সাধারণত আমার জীবনে সোমবার মানেই ছুটির দিন। সোমবার মানেই কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে গিয়ে চা খাওয়া, উদীয়মান কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডা দেওয়া, আর ফরাসি সাহিত্য বা জাদুবাস্তবতা নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক আলোচনা করা। কিন্তু আজ আমার চন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার কোনো মানসিক বা শারীরিক শক্তি নেই। মিরপুরের মেসে নিজের দশ ফুট বাই দশ ফুট রুমের ভেতর আমি একটা ইঁদুরের মতো লুকিয়ে আছি।
গত তিন দিন আমার কেটেছে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে। আমি না পেরেছি ঠিকমতো ঘুমাতে, না পেরেছি খেতে, না পেরেছি অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে। আমার মাথার ভেতর একটা অদৃশ্য টাইমবোমা টিকটিক করছে, যেটা যেকোনো সময় ফাটতে পারে।
এই তিন দিনের মধ্যে আনিকার সাথে আমার কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। প্রথমবার যখন আনিকার কলটা আমার ফোনে আসে, তখন স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল। আমি ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আনিকার সেই চিরচেনা, রেশমি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "কী গো অনুবাদক সাহেব, কেমন আছো?"
আমি আনিকার গলা শুনে যতটা না স্বস্তি পেয়েছিলাম, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আতঙ্কিত হয়েছিলাম। আমি প্রায় ফিসফিস করে, চরম প্যানিক করা গলায় বলেছিলাম, "আনিকা! তুমি আমাকে কল করছ কেন? তোমার স্বামী নিখোঁজ, তুমি থানায় জিডি করেছ! তুমি কি জানো না মিসিং কেসে পুলিশ সবার আগে স্বামী-স্ত্রীর কল লিস্ট চেক করে? তারা তোমার ফোন ট্যাপ করে বসে আছে! তুমি আমাকে এই অবস্থায় ফোন করছ, আমরা তো দুজনেই ফেঁসে যাব!"
আমার এই রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কের কথা শুনে আনিকা ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আরে বোকা!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন, "তুমি কি আমাকে এতই কাঁচা খেলোয়াড় ভেবেছ? আমি কি আমার রেগুলার নাম্বার থেকে তোমাকে ফোন দিচ্ছি নাকি? ট্রু-কলারে চেক করে দেখো, এটা কার নাম্বার।"
আমি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনে দেখলাম। ট্রু-কলারে নাম ভাসছে— 'মজিদ মিয়া, কাওরান বাজার'। "মজিদ মিয়া কে?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। "কে জানে কে মজিদ মিয়া!" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "লন্ডন থেকে আসার পর এয়ারপোর্টের বাইরে এক ভাসমান সিম বিক্রেতার কাছ থেকে এই সিমটা কিনেছিলাম। কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, কার এনআইডি দিয়ে এই সিম তোলা, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। এটা একটা ঘোস্ট সিম বা বেনামি নাম্বার। এই নাম্বার আমি শুধু ইন্টারনেট ডেটা আর তোমাকে কল করার জন্যই ইউজ করি। পুলিশের বাপের সাধ্য নেই এই নাম্বার ট্রেস করে আমার আসল পরিচয় বের করার।"
আমি তবুও আশ্বস্ত হতে পারলাম না। "কিন্তু আনিকা, পুলিশ যদি কোনোভাবে ট্র্যাক করে ফেলে? যদি তারা আমাদের কথাবার্তা শুনে ফেলে?" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আর জানলেই বা কী? আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি নাকি? আমরা কি বেলালকে খুন করেছি? আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, ফোনে কথা বলছি, এতে পুলিশের কী করার আছে?"
উনার এই অদ্ভুত কনফিডেন্স আমাকে কিছুটা শান্ত করলেও, পুরোপুরি চিন্তামুক্ত করতে পারল না। আমি এই তিন দিনে উনার সাথে যতবার কথা বলেছি, ততবারই আমি চেষ্টা করেছি আসল সত্যটা খুঁড়ে বের করার। আমার মাথার ভেতর ওই ২রা এপ্রিল সকালের ঘটনাটা একটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছিল।
"আনিকা, আমাকে সত্যি করে বলো তো," আমি একদিন রাতে উনাকে ফোনে ধরলাম, "আসলে বেলাল সাহেবের কী হতে পারে? তোমার কী সন্দেহ? উনার কি কোনো ব্যবসায়িক শত্রু ছিল? নাকি লন্ডনে কারো সাথে কোনো ঝামেলা ছিল?"
আনিকা প্রতিবারই এই প্রশ্নগুলো খুব নিপুণভাবে এড়িয়ে গেছেন। "আমি জানি না রাশেদ। আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না। বেলালের তো এমন কোনো শত্রু থাকার কথা না। হয়তো রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছে, অথবা অন্য কিছু। পুলিশ খুঁজছে, দেখা যাক কী হয়।"
উনার গলার স্বরে কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো টেনশন নেই। নিজের স্বামী নিখোঁজ, অথচ উনি কথা বলছেন এমনভাবে যেন উনার হাতের একটা সস্তা ছাতা হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল অন্য জায়গায়।
"আনিকা, একটা কথা আমি কিছুতেই মেলাতে পারছি না," আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাইলাম। "সেদিন সকালে... যেদিন বেলাল সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে লাগেজ নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আমি দরজা খুলে দিলাম। একটা অচেনা লোক, সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিচ্ছে, আর বেলাল সাহেব সেটা দেখে কোনো রিঅ্যাক্ট করলেন না? উনি আমাকে হাসিমুখে বললেন— 'কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?' এটা কীভাবে সম্ভব আনিকা? উনি কীভাবে আমাকে এত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলেন? উনি কি কিছুই সন্দেহ করেননি?"
এই প্রশ্নটা করার পর আনিকা ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো উনি সত্যটা বলবেন। হয়তো বলবেন বেলাল সাহেবের কোনো মানসিক সমস্যা আছে, অথবা অন্য কোনো গোপন চুক্তির কথা।
কিন্তু আনিকা সেই প্রশ্নটাও বরাবরের মতোই এড়িয়ে গেলেন। "রাশেদ, তুমি তো জানোই বেলাল একটু অন্যরকম মানুষ। ও হয়তো ভেবেছে তুমি আমার আইটি ফার্মের কোনো এমপ্লয়ি, রাত জেগে কাজ করেছো। ওর মাথা তখন লম্বা জার্নির কারণে টায়ার্ড ছিল। বাদ দাও তো বেলালের কথা। ও কোথায় গেছে, কী হয়েছে, সব পুলিশ দেখবে। তুমি শুধু আমার কথা ভাবো।"
এই 'বাদ দাও তো' বলার পরেই আনিকা উনার আসল রূপে ফিরে আসতেন। উনার ভেতরের সেই কর্পোরেট, প্র্যাকটিক্যাল নারীটা মুহূর্তের মধ্যে যেন উধাও হয়ে যেত, আর তার জায়গা নিত এক কামুক, বন্য এবং তৃষ্ণার্ত নারী। এই তিন দিনে উনার সাথে আমার ৩-৪ বার কথা হয়েছে। এবং প্রত্যেকটা ফোন কলের শেষের দিকে আনিকা আমাকে উনার কথার জাদুতে, উনার কামুক ফিসফিসানিতে এমনভাবে উত্তেজিত করেছেন, যা কোনো সুস্থ পুরুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।
"রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে, একদম ফিসফিস করে, একটা ভেজা এবং স্যাঁতস্যাঁতে গলায় কথা বলা শুরু করতেন। "আমার না এখন খুব ইচ্ছা করছে..." "কীসের ইচ্ছা করছে আনিকা?" আমি সতর্ক গলায় বলতাম, কিন্তু আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি ততক্ষণে বেড়ে যেত।
"তোমার ওই শক্ত, গরম শরীরটার জন্য আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে রাশেদ। উমমম... জানো, আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি। আমার গায়ে কোনো কাপড় নেই। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছি তুমি আমার ওপর ঝুঁকে আছো..."
"আনিকা, প্লিজ... পরিস্থিতি তো এখন এসব ভাবার মতো না। তোমার স্বামী নিখোঁজ!"
"চুলোয় যাক স্বামী! চুলোয় যাক দুনিয়া!" আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কামনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলতেন, "আহহ... রাশেদ... তোমার আদর পেতে আমার শরীরটা নিশপিশ করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে? ওইদিন বাথরুমের কমোডের ওপর তুমি আমাকে যেভাবে... ইসসস... আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে ওই ধাক্কাগুলো ফিল করতে পারি। আমার মনে হচ্ছে তুমি এখনো আমার ভেতরে আছো।"
উনার গলা দিয়ে তখন 'উহু... আহা... উমমম...' ধরনের এমন সব আদিম, বন্য শব্দ বের হতো, যা শুনে আমি আমার মেসের অন্ধকার রুমে শুয়ে শুয়ে ঘামতে শুরু করতাম।
"রাশেদ... তুমি কি আমাকে মিস করছ না?" আনিকা ফোনে উনার নিজের শরীরের কোনো একটা অংশে হাত বুলানোর শব্দ করতেন। "আমি কিন্তু এখন আমার আঙুল দিয়ে তোমাকে ফিল করার চেষ্টা করছি। আহহ... রাশেদ... তুমি কবে আসবে আমার কাছে? কবে আমাকে আবার ওইভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে তোমার জন্য..."
এই ধরনের নোংরা, চরম সেক্সুয়াল এবং উত্তেজক কথাগুলো উনি এমন একটা সময় বলতেন, যখন উনার স্বামী নিখোঁজ, পুলিশ তদন্ত করছে, আর আমি রিমান্ডের ভয়ে কাঁপছি! কিন্তু মানুষের শরীর বড়ই বেইমান। আমার মস্তিষ্ক আমাকে বলত— "রাশেদ, ফোনটা কেটে দে। এই মহিলা একটা সাইকোপ্যাথ।" কিন্তু আমার অবদমিত পুরুষাঙ্গটি আনিকার ওই 'উহু-আহা' শুনে চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে যেত। আমি মেসের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতাম।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরটাকেই নয়, আমার মনস্তত্ত্বটাকেও উনার হাতের পুতুলে পরিণত করেছেন।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)