12-07-2026, 01:55 AM
২৮।
ভুররর... ভুররর... ভুররর... ভাইব্রেশন। আনিকার মোবাইল ফোন বাজছে।
আনিকা উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার চোখে একটু আগের সেই বন্য, আদিম কামনার ঘোরটা মুহূর্তের মধ্যে কেটে গিয়ে একটা চরম বাস্তবতার সতর্ক দৃষ্টি ফুটে উঠল। আমরা দুজনেই জানি, এই অসময়ে, শপিং মলে ঘোরার মাঝখানে কে ফোন করতে পারে।
আনিকা কোনো কথা না বলে উনার হাতটা বাড়িয়ে ভ্যানিটি ব্যাগের চেইন খুলে ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উনি আমার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি দিলেন। উনার চোখের ইশারায় লেখা ছিল— "বেলাল।" এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলে, আমি আনিকার শরীরের ভেতর অর্ধেক প্রবেশ করে বসে আছি, আর এই অবস্থায় উনার স্বামী উনাকে ফোন দিচ্ছে! এর চেয়ে পরাবাস্তব, নার্ভ-কাঁপানো আর ভয়াবহ পরিস্থিতি কোনো মানুষের জীবনে আসতে পারে বলে আমার জানা নেই।
আনিকা একটুও প্যানিক করলেন না। গলাটা একবার হালকা পরিষ্কার করে নিয়ে, ফোনের গ্রিন বাটনটা স্লাইড করে ফোনটা কানে ধরলেন। আমরা দুজন এত কাছাকাছি বসে আছি যে, ফোনের ইয়ারপিস থেকে আসা ওপারের শব্দগুলো আমি খুব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে বেলাল সাহেবের ভরাট গলা শোনা গেল। "কই তুমি? আমার কাজ তো শেষ। চলো, বাসায় ফিরি। অনেকক্ষণ তো ঘোরা হলো।"
আনিকা উনার ডান হাত দিয়ে আমার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো আলতো করে বিলি কাটতে কাটতে, অত্যন্ত ক্যাজুয়াল, বিরক্তহীন গলায় বললেন, "ওহ, তোমার কাজ শেষ? আচ্ছা, আমি পাঁচ মিনিট আসতেছি। আমি দুই তলায় আছি। একটা বুটিকে একটু কাজ ছিল। তুমি গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাও। আমি মেইন গেটে আসতেছি।"
"আচ্ছা, আমি নিচে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি এসো," বেলাল সাহেব বললেন।
"ওকে। আসছি।" কল কেটে গেল। আনিকা ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিলেন।
আমি পাথরের মতো বসে আছি। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলটা লম্বায় আর চওড়ায় মেরেকেটে সত্যিই তিন ফুট বাই তিন ফুট হবে। একটা মানুষ কোনোমতে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে কমোডে বসতে পারে। এই ছোট্ট, আবদ্ধ জায়গার ভেতরে একটু আগে যে মাত্রার একটা প্রলয়ঙ্করী, বন্য এবং পারমাণবিক মিলন ঘটে গেছে, তা ভাবলে বিজ্ঞানের স্থান-কালের সূত্রও হয়তো লজ্জায় মুখ লুকাবে।
উদ্দাম মিলনের সমাপ্তি ঘটেছে। আমাদের দুজনের শরীর থেকেই ঘাম ঝরছে। বাথরুমের এই ছোট্ট কিউবিকলের ভেতর এখন লেমন ফ্লেভারের এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে রাজত্ব করছে এক তীব্র, উগ্র, আদিম নারী-পুরুষের শরীরের ঘ্রাণ। কামনার ঘাম আর স্খলনের যে একটা নিজস্ব বন্য গন্ধ থাকে, সেই গন্ধে কিউবিকলের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আপনি স্বর্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। আপনাকে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতেই হবে। চরম মিলনের পর যখন মানুষের হুঁশ ফেরে, যখন রক্তের তেজ কমে গিয়ে স্নায়ুগুলো ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন মানুষের মনে পড়ে সমাজ, সংসার, ইজ্জত আর আশেপাশের বাস্তবতার কথা।
আমরা দুজনেই এখন সেই স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার রুক্ষ প্রক্রিয়ায় আছি। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট জায়গার ভেতর দুজন মানুষের আবার কাপড় ঠিক করাটা একটা আস্ত সার্কাস ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আনিকার কোমর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিলাম। উনি খুব সাবধানে আমার ওপর থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এইটুকু জায়গায় দাঁড়াতে গিয়ে উনার পিঠ বাথরুমের প্লাস্টিকের দরজার সাথে ঘষা খেল।
আমি কমোড থেকে উঠে দাঁড়ালাম। আমার প্যান্টটা তখনো হাঁটুর কাছে নামানো। আমি খুব কসরত করে, বাথরুমের নোংরা দেয়ালে যেন শরীর না লাগে সেই চেষ্টা করতে করতে আমার প্যান্টটা ওপরে তুললাম। জিপারটা টানার সময় আমার হাত কাঁপছিল।
আনিকা উনার সালোয়ার কামিজের ভেতরের অন্তর্বাস ঠিক করে, কামিজটা টেনে নিচে নামালেন। উনার বুকের ওপর ওড়নাটা খুব পরিপাটি করে গুছিয়ে নিলেন। অন্ধকারে তোয়ালে বা টিস্যু ছাড়া কোনোমতে নিজেদের শরীরকে একটু ভদ্রস্থ করা— সে এক ভয়াবহ, নোংরা এবং বিরক্তিকর কসরত।
কাপড় ঠিক করার পর আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা ছোট আয়না আর লিপস্টিক বের করলেন। আয়নায় নিজের মুখটা দেখে, এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো হাত দিয়ে একটু পরিপাটি করে নিলেন। মুছে যাওয়া লিপস্টিকটা আবার একবার আলতো করে ঠোঁটে বুলিয়ে নিলেন।
উনার চোখেমুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি, কিন্তু একই সাথে চরম প্র্যাকটিক্যাল একটা ভাব। একটু আগের সেই কামনায় পাগলিনী নারীটার কোনো চিহ্ন উনার চেহারায় অবশিষ্ট নেই। উনি এখন সম্পূর্ণ একজন কর্পোরেট নারী। উনি উনার ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করে কপালের ঘামটা হালকা মুছে নিয়ে খুব নিচু, ফিসফিস করা গলায় বললেন, "প্রথমে তুমি বের হও রাশেদ। খুব সাবধানে বের হইয়ো। কেউ যেন সন্দেহ না করে।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর একটা তীব্র, তিতকুটে বিরক্তি আর অভিমান ফুঁসে উঠল। আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। এই নারী আসলে কী? একটু আগে এই কিউবিকলের ভেতর সে একটা বন্য পশুর মতো আমার নিচে ছটফট করেছে। আমার কাঁধে উনার দাঁতের দাগ বসে গেছে, আমার নখের আঁচড় উনার পিঠে বসে গেছে। আমরা একে অপরের লালা আর ঘাম খেয়েছি। আর এখন, জাস্ট দুই মিনিটের ব্যবধানে উনি সম্পূর্ণ কর্পোরেট, প্র্যাকটিক্যাল একজন সিইও হয়ে গেছেন!
উনার চোখেমুখে কোনো রোমান্টিক ঘোর নেই, কোনো বিকার নেই। উনি আমাকে বলছেন— 'সাবধানে বের হও'! যেন আমি উনার কোনো গোপন মাদক ডিলার, যার সাথে ডিল শেষ, মাল ডেলিভারি হয়ে গেছে, এবার মালকড়ির হিসাব চুকিয়ে কেটে পড়ার পালা! আমার ভেতরের পুরুষালি ইগো চরমভাবে আহত হলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষরা প্রেমের ক্ষেত্রে একটু ন্যাকামি পছন্দ করে। তারা চায় চরম মিলনের পর নারী তার বুকে মাথা রেখে একটু কাঁদবে, একটু ভালোবাসার কথা বলবে, বলবে— "আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।" কিন্তু এই নারী আমাকে ডিরেক্ট বলছে— 'বের হও'!
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। "এভাবে হয় নাকি আনিকা?" আমি একটু ঝাঁঝালো, ফিসফিস করা গলায় বললাম। আমার গলার স্বরে ক্ষোভ স্পষ্ট। "তোমার এই একটুখানি আদরের জন্য আমি গত কয়েকদিন ধরে পাগল হয়ে ছিলাম। তুমি আমাকে যেভাবে তড়পাচ্ছিলে, মেসেজ দিয়ে, ছবি দিয়ে... আমি মরে যাচ্ছিলাম। আর এখন কাজ শেষ, তুমি বলছ বেরিয়ে যাও? এভাবে কয়দিন চলবে? কী করবে তুমি এখন? তুমি কি ওই বেলালের সাথে আবার ওই লন্ডনে চলে যাবে? আর তোমার এই স্বামীকে তুমি সামাল দিলেই বা কেমনে?" আমার কথাগুলো একটা ক্ষোভের মালার মতো উনার ওপর ছুঁড়ে দিলাম। আমি জানতাম, এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর উনার কাছে নেই।
কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আনিকা নাওহারের ডিকশনারিতে 'উত্তর নেই' বলে কিছু নেই। "চুপ!" আনিকা একটা ছোট্ট, সাপের মতো হিসহিসে ধমক দিলেন। আর তার পরের মুহূর্তেই উনি উনার দুই হাত বাড়িয়ে আমার শার্টের কলারটা প্রবল শক্তিতে খামচে ধরলেন। আমাকে এক হ্যাঁচকা টানে উনার মুখের একদম কাছে টেনে নিলেন। উনি উনার মুখটা আমার মুখের ওপর নামিয়ে আনলেন এবং একটা উন্মাদ, সর্বগ্রাসী চুম্বনে আমার ঠোঁট দুটোকে আক্ষরিক অর্থেই গিলে ফেললেন।
এটা কোনো সাধারণ বিদায়ী বা রোমান্টিক চুম্বন ছিল না। এটা ছিল আমার সমস্ত ক্ষোভ, সমস্ত অভিমানকে গলা টিপে হত্যা করার একটা বন্য, আদিম প্রক্রিয়া। উনার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর এমন আক্রোশে চেপে বসল যে, আমার দাঁতের সাথে উনার দাঁতের সজোরে সংঘর্ষ হলো। আমি একটা অস্ফুট শব্দ করতে গেলাম, কিন্তু উনি উনার উষ্ণ, ভেজা জিভটা একটা তপ্ত শলার মতো আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন।
আমার মুখের ভেতর উনার জিভটা এক আদিম তাণ্ডব শুরু করল। আমার জিভের সাথে উনার জিভের এক অদ্ভুত, স্যাঁতস্যাঁতে এবং বন্য লড়াই চলতে লাগল। উনার মুখের ভেতরের লালার মিষ্টতা, লিপস্টিকের হালকা স্বাদ, এবং একটু আগের সেই চরম উত্তেজনার ঘ্রাণ— সবকিছু মিলে আমার মস্তিষ্ককে আবার অচল করে দিল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। উনি উনার মুখের লালা আমার মুখের ভেতর ট্রান্সফার করে দিচ্ছিলেন, আর আমার লালা উনি শুষে নিচ্ছিলেন। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলে, কমোডের পাশে দাঁড়িয়ে, একজন বিবাহিত নারীর এই লালা-বিনিময় করা, শ্বাসরুদ্ধকর চুম্বনের কাছে আমার সমস্ত রাগ, সমস্ত লজিক, সমস্ত ইগো ধুলোয় মিশে গেল। আমি উনাকে ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবতে পারছিলাম না।
প্রায় এক মিনিট পর আনিকা উনার ঠোঁটটা আমার ঠোঁট থেকে একটা তীক্ষ্ণ 'পপ' শব্দ করে ছাড়িয়ে নিলেন। আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি। আমাদের দুজনের ঠোঁটই ভিজে চকচক করছে। আনিকা উনার ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁটের কোণ থেকে উনার লেগে থাকা লালাটুকু পরম আদরে, খুব মায়াবী একটা ভঙ্গিতে মুছে দিলেন। উনার চোখে এখন একটা ঘাতক, রহস্যময় হাসি।
"সাবধানে বের হও," আনিকা আবার সেই ফিসফিসে গলায় বললেন। তবে এবার উনার গলায় কোনো কর্পোরেট কাঠিন্য নেই, সেখানে একটা অদ্ভুত মায়া ঝরে পড়ছে। "শেষে দুজনে একসাথে বের হতে গিয়ে ধরা পড়ে একটা কেলেঙ্কারি হবে। আমি চাই না আমার বা তোমার কোনো ক্ষতি হোক। আমি তোমাকে ছাড়ছি না। যাও।" আমি আর কোনো কথা বলার শক্তি খুঁজে পেলাম না। এই নারী জানে কীভাবে একটা পুরুষকে কথার জাদুতে, আর শরীরের জাদুতে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিতে হয়। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়লাম।
আমি কিউবিকলের দরজার লকটা খুব সাবধানে, নিঃশব্দে খুললাম।একটু ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিলাম। বাথরুমের বেসিনের কাছে কেউ নেই। ভাগ্য আজ পুরোপুরি আমাদের সহায়। দ্রুত কিউবিকল থেকে বেরিয়ে এলাম। বেসিনের আয়নায় একবার নিজের দিকে তাকালাম। চুল উসকোখুস্কো, চোখ লাল, শার্টের কলার এলোমেলো। আমি দ্রুত চোখেমুখে একটু পানি ছিটিয়ে নিলাম। চুলটা হাত দিয়ে আঁচড়ে ঠিক করলাম। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
বসুন্ধরা সিটির চার তলার করিডোরে এসে আমি একটা বড় শ্বাস নিলাম। চারপাশের মানুষজন শপিং ব্যাগ হাতে ঘুরছে, হাসছে, কথা বলছে। কেউ জানে না, এইমাত্র ওই পুরুষদের বাথরুমের ভেতর কী একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। আমি বাথরুম থেকে একটু দূরে, একটা বিশাল কাঁচের শোরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। শোরুমটার নাম সম্ভবত 'দেশি দশ' বা ওইরকম কিছু হবে। আমি আড়চোখে বাথরুমের দরজার দিকে নজর রাখলাম। মিনিট তিনেক পর। পুরুষদের বাথরুমের দরজা ঠেলে অত্যন্ত স্বাভাবিক, ধীর এবং কনফিডেন্ট ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলেন আনিকা নাওহার।
উনার কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ, চোখে সেই বিশাল সানগ্লাস। উনি উনার হাতের একটা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হলেন, এমন একটা ভাব যেন উনি ভুল করে পুরুষদের বাথরুমে ঢুকে গিয়েছিলেন, অথবা জাস্ট বেসিনে হাত ধুতে গিয়েছিলেন! উনার হাঁটার মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা নেই, কোনো ভয় নেই। উনি একবারও এদিক-ওদিক তাকালেন না। সোজা হেঁটে এস্কেলেটরের দিকে চলে গেলেন এবং ভিড়ের মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।
আমি অবাক বিস্ময়ে উনার চলে যাওয়া দেখলাম। একটা মানুষ কতটা পারফেক্ট অভিনেতা হলে, এতটা স্নায়ুর চাপ সামলে এমন একটা কাণ্ড করার পর এভাবে র্যাম্প মডেলের মতো হেঁটে যেতে পারে! হঠাৎ আমার পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করল। আমি দ্রুত ফোন বের করে দেখলাম। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ। আনিকা।
"আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমি শীঘ্রই তোমাকে বিস্তারিত জানাব।"
মেসেজটা পড়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত আশা আর ভয়ের মিশ্রণ তৈরি হলো। প্ল্যান! কিসের প্ল্যান? উনি কি বেলালের সাথে ডিভোর্স নেবেন? উনি কি আমাকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাবেন? নাকি আমাকে এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটেই উনার পারমানেন্ট 'সিক্রেট লাভার' হিসেবে রেখে দেবেন?
"আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না।" এই একটা বাক্য আমাকে যেন একটা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাল। আমি বসুন্ধরা সিটি থেকে নিচে নেমে এলাম। মেইন রোডের পাশে দাঁড়িয়ে একটা বেনসন ধরালাম। ধোঁয়াটা ফুসফুসের একদম গভীর পর্যন্ত টেনে নিলাম। আমার হাতের আঙুলে তখনো আনিকার শরীরের সেই বন্য সুবাস লেগে আছে।
আমি একটা সিএনজি নিয়ে অফিসে ফিরলাম। অফিসে ঢুকতেই এহসান ভাই আমার দিকে চোখ কপালে তুলে তাকালেন। "রাশেদ! তুমি ছিলে কোথায়? আমি তোমাকে চারটা থেকে খুঁজছি! ল্যাপটপ অন, মানুষ নাই!" এহসান ভাই প্রায় ফেটে পড়লেন। আমি খুব করুণ এবং বিধ্বস্ত একটা মুখ করে বললাম, "ভাই, পেটটা হঠাৎ করে এমন খারাপ হলো! আমি তো ফার্মেসিতে দৌড়েছিলাম ওষুধ আনতে। তারপর একটু শুয়ে ছিলাম লাউঞ্জে। খুব অবস্থা খারাপ ভাই।" বাঙালি বসরা আর যাই হোক, পেট খারাপের কথা শুনলে একটু নরম হয়। কারণ এই দেশে গ্যাস্ট্রিক আর পেট খারাপ হলো জাতীয় ব্যাধি।
"পেট খারাপ! তো আমাকে একটা মেসেজ দিবা না? যাও, জলদি নিউজগুলো ক্লিয়ার করো। আমেরিকার ইলেকশনের আপডেটগুলো পড়ে আছে।" আমি ডেস্কে বসে নিউজ করতে লাগলাম ঠিকই, কিন্তু আমার ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আমি জো বাইডেন বা পুতিনের নাম টাইপ করছিলাম না, আমি মনে মনে শুধু আনিকার নাম টাইপ করছিলাম।
অফিস শেষ করে রাত নয়টার দিকে আমি মিরপুরের মেসে ফিরলাম।
মেসের সেই চিরচেনা গুমোট পরিবেশ। রাজু আর তুহিন মিলে ডাইনিংয়ে ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে। আমি কোনোমতে একটু খেয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। বিছানায় শুয়ে আমি মোবাইলটা হাতে নিলাম। রাত দশটা। আনিকার কোনো মেসেজ নেই।
সাড়ে এগারোটা। আনিকার কোনো মেসেজ নেই। বারোটা। আনিকার লাস্ট সিন দেখাচ্ছে সন্ধ্যা সাতটায়।
আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, চিনচিনে অস্থিরতা শুরু হলো। উনি তো বলেছিলেন প্ল্যান জানাবেন। তাহলে মেসেজ দিচ্ছেন না কেন? বেলাল সাহেব কি উনার ফোন চেক করছেন? নাকি উনি বেলালের সাথে এখন কোনো রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করছেন?
আমার মাথার ভেতর ঈর্ষার পোকাটা আবার কামড়াতে শুরু করল। আমি আর থাকতে পারলাম না। রাত সাড়ে বারোটার দিকে আমি নিজেই কয়েকটা মেসেজ টাইপ করা শুরু করলাম। আমার ভেতরের সেই আদিম, সেক্সুয়াল ক্ষুধাটা তখনো পুরোপুরি মেটেনি। আমি লিখলাম: "আনিকা... বাথরুমের ওই কিউবিকলের গন্ধটা এখনো আমার গায়ে লেগে আছে। তুমি আমাকে পাগল করে দিয়েছ।"
কোনো রিপ্লাই নেই। সিঙ্গেল টিক। আমি আবার লিখলাম: "আমার হাত এখনো তোমার শরীরের ওই ভাঁজগুলো খুঁজছে। ইচ্ছে করছে এখনই গিয়ে তোমাকে আবার ওই বাথটাবের পানিতে ডুবিয়ে..."
মেসেজটা ডেলিভারড হলো, ডাবল টিক হলো। কিন্তু ব্লু টিক হলো না। আনিকা অনলাইনে নেই। আমি এক চরম ডেসপারেট এবং করুণ অবস্থায় চলে গেলাম। আমি লিখলাম: "তুমি কি ঘুমাচ্ছ? নাকি বেলালের সাথে... প্লিজ আনিকা, আমাকে পাগল করো না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমাকে একটা রিপ্লাই দাও।"
রাত একটা বাজল। দুইটা বাজল। আনিকা সিন তো দূরের কথা, মেসেজগুলো ডেলিভারড হয়েই পড়ে রইল। আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, বিশাল একাকিত্ব ভর করল। আমার মনে হতে লাগল, আমার বউকে কেউ যেন আমার চোখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে! এই গত পঁচিশ দিনে আনিকা নাওহার নামের এই বিবাহিত নারীটির প্রতি আমার কী এক ভয়ংকর ভালোবাসা, কী এক তীব্র আকর্ষণ জন্মেছে, সেটা আমি আজ এই মিরপুরের মেসে একা শুয়ে বুঝতে পারছি।
আমার মাথার ভেতর একটা সাইকোপ্যাথিক চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। ইচ্ছে করছে, একটা ধারালো চাকু নিয়ে সোজা ধানমন্ডির ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ে যাই। কলিংবেল বাজাই। বেলাল সাহেব দরজা খুললে সোজা চাকুটা উনার পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিই। বেলালকে খুন করে আনিকাকে নিজের করে নিই!
কিন্তু আমি জানি, এসব মধ্যবিত্তের ফ্যান্টাসি। মধ্যবিত্ত পুরুষরা মনে মনে হাজারটা খুন করে, কিন্তু বাস্তবে মশা মারতেও তাদের হাত কাঁপে। আমি বেলালকে খুন করতে পারব না। আমাকে এই মেসের অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে শুধু যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে।
হায়, আমার কী হবে!
আমি অন্ধকারে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। একজন পরিণত পুরুষ, যে কিনা আজ সকালেই একটা নারীর সাথে মহাকাব্যিক সঙ্গম করেছে, সে এখন একটা খেলনা হারানো শিশুর মতো কাঁদছে। আমার চোখের সামনে আনিকার সেই ঐশ্বরিক শরীরটা ভাসতে লাগল।
আমি কি আর কোনোদিন উনার সেই ডালিমের দানার মতো লালচে, রসালো ঠোঁটে আমার ঠোঁট ছোঁয়াতে পারব না? আমি কি আর কোনোদিন উনার সেই তরমুজের মতো বিশাল, ভরাট স্তনের মাঝে আমার মুখ লুকাতে পারব না? উনার সেই কুলবরইয়ের মতো শক্ত, উদ্ধত বোঁটাগুলো কি আর আমার জিভের স্পর্শ পাবে না? আমার চোখের সামনে ভাসছে উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, রহস্যময় যোনিপথ, যেখান থেকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুধা পান করেছি।
আমি কি আর কোনোদিন উনার ওই দুই পাহাড়ের মতো সুডৌল, নিখুঁত পাছা এবং তার মাঝখানের সেই গভীর গিরিখাতের স্বাদ নিতে পারব না? ওই শরীরটা তো এখন বেলালের দখলে! বেলাল হয়তো এখন ওই তরমুজের মতো স্তনগুলোতে হাত রাখছে, ওই ডালিমের দানার মতো ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে! বেলাল হয়তো এখন উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম স্বর্গে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে!
"আমার কী হবে! আমার কী হবে!"
আমি বালিশে মুখ গুঁজে একটা আহত, পরাজিত পশুর মতো গোঙাতে লাগলাম। আমার নখগুলো বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে। আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের জীবন, আমার অনুবাদক সত্তা, আমার ফিলোসফি— সবকিছু আজ আনিকা নাওহারের ওই গোলাপের পাপড়ির মতো যোনি আর দুই পাহাড়ের মতো পাছার কাছে চরমভাবে হেরে গেছে।
এই সীমাহীন তৃষ্ণা, এই ধ্বংসাত্মক ঈর্ষা আর এই তীব্র হাহাকার নিয়েই আমি একসময় একটা ক্লান্ত, যন্ত্রণাদায়ক ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)