Today, 02:09 AM
(This post was last modified: Today, 02:12 AM by Orbachin. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
২৩।
সময় ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ধাঁধা হলো এই সময়। বিজ্ঞানীরা, দার্শনিকরা, এবং কবিরা হাজার হাজার বছর ধরে এই একটা জিনিস নিয়ে মাথা ঘামিয়ে গেছেন, কিন্তু কেউ এর কোনো সুনির্দিষ্ট, সর্বজনীন সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেননি।
কেউ কেউ বলেন, সময় হলো চতুর্থ মাত্রা বা ফোর্থ ডাইমেনশন। আমরা যেমন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার ভেতর দিয়ে ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারি, সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা সেভাবে পারি না। সময় আমাদেরকে ঘাড় ধরে, একমুখী একটা রাস্তা দিয়ে কেবল সামনের দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
আবার আরেক দল দার্শনিক বলেন, সময় বলতে আসলে মহাবিশ্বে কিচ্ছু নেই। এটা একটা সম্পূর্ণ অলীক ধারণা। মানুষের তৈরি করা একটা মেটাফোর বা রূপক মাত্র। প্রকৃতিতে শুধু ‘পরিবর্তন’ ঘটে। সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে, ঋতু বদলায়, মানুষের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে। এই পরিবর্তনগুলোকে একটা হিসেবে বাঁধার জন্য মানুষ ঘড়ি বানিয়েছে, ক্যালেন্ডার বানিয়েছে, আর তার নাম দিয়েছে ‘সময়’।
তবে সময়ের সবচেয়ে সুন্দর এবং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি বলেছেন, সময় হলো আপেক্ষিক (Relative)। এর কোনো নির্দিষ্ট গতি নেই। পর্যবেক্ষকের মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সময়ের গতি নির্ধারিত হয়। আইনস্টাইন সাহেব খুব মজার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছিলেন— "আপনি যদি একটা জ্বলন্ত চুলার ওপর এক মিনিট বসে থাকেন, আপনার মনে হবে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আর আপনি যদি একজন সুন্দরী রমণীর পাশে এক ঘণ্টা বসে থাকেন, আপনার মনে হবে মাত্র এক মিনিট পার হয়েছে। দ্যাট ইজ রিলেটিভিটি!"
এই অদ্ভুত এবং ভারী থিওরিগুলো আমার মাথার ভেতর এল খুব বাস্তব একটা অভিজ্ঞতার কারণে। আমি নিজের জীবনের সাথে সময়ের এই আপেক্ষিকতা আর ফ্ল্যাট সার্কেল থিওরিটা মিলিয়ে দেখলাম। এই ধরুন, আনিকা নাওহারের সাথে আমার সেই চরম শারীরিক মিলনের মুহূর্তগুলো। একটা মিলনের অ্যাভারেজ বা গড় সময় কতক্ষণ হয়? পেনিট্রেশন শুরু হওয়ার পর থেকে চরম স্খলন বা ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত হয়তো ৫ থেকে ৭ মিনিট। খুব বেশি হলে ১০ মিনিট। কিন্তু ওই ৫-৭ মিনিটের সময়টুকু আমার কাছে কেমন মনে হয়েছিল? মনে হয়েছিল অনন্তকাল! আমার মনে হয়েছিল আমি যেন একটা মহাশূন্যের ভেতর ভাসছি, যেখানে ঘড়ির কাঁটা পুরোপুরি থেমে গেছে। আনিকার শরীরের ভেতরে আমার সেই আদিম ভ্রমণের প্রতিটা সেকেন্ড আমার মস্তিষ্কে এমনভাবে রেকর্ড হয়েছে যে, ফ্ল্যাট সার্কেল থিওরির মতো— আমার মনে হয় ধানমন্ডির ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের বিছানায়, বা বাথটাবের পানিতে, আমাদের ওই মিলনের মুহূর্তটা মহাবিশ্বের বুকে একটা অনন্তকালের লুপ হয়ে আটকে গেছে। আজ থেকে এক হাজার বছর পরও হয়তো ওই নির্দিষ্ট স্থান-কালে আমরা দুজন এভাবেই একে অপরের ভেতর বিলীন হতে থাকব।
অন্যদিকে, আমার অফিসের সেই ছুটিটা! আমি এহসান ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করে এক সপ্তাহের ছুটি আদায় করেছিলাম। আমার প্ল্যান ছিল, এই সাতটা দিন আমি আনিকার সাথে কাটাব। সাত দিন মানে ১৬৮ ঘণ্টা। ১০,০৮০ মিনিট। কিন্তু আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে দিয়ে, আমার সেই ছুটির পাঁচ-সাতটা দিন রকেটের মতো উড়ে চলে গেল! আমার মনে হলো, আমি জাস্ট চোখ বন্ধ করলাম আর খুললাম, আর এর মধ্যেই পাঁচটা দিন শেষ! একটা সুন্দর, মাদকতাময় ঘোরের ভেতর দিয়ে পাঁচটা দিন যেন পাঁচ মিনিটের মতো পার হয়ে গেল।
এই পাঁচটা দিন আমরা ফ্ল্যাটের বাইরে পা রাখিনি। পৃথিবীর কোনো খবর, কোনো যুদ্ধ, কোনো রাজনীতি আমাদের ছুঁতে পারেনি। আমাদের পৃথিবীটা সীমাবদ্ধ ছিল ওই চার হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, সেন্ট্রাল এসি, ফুডপান্ডার খাবার আর একটা বিশাল কিং-সাইজ বিছানার ভেতরে। এই পাঁচ দিনে আমরা যেন নববিবাহিত কোনো দম্পতির মতো একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।
আমাদের দিন শুরু হতো দুপুরে, আর রাত শেষ হতো ভোরবেলায়। আনিকা আর আমার মধ্যে কোনো আড়াল, কোনো লজ্জা বা কোনো জড়তা অবশিষ্ট ছিল না। আমরা একে অপরের শরীরটাকে একটা ম্যাপের মতো তন্নতন্ন করে পড়েছি। আনিকার শরীরের এমন কোনো অংশ, এমন কোনো ভাঁজ, এমন কোনো গোপন তিল বাকি রইল না, যেখানে আমার ঠোঁট, আমার জিভ, অথবা আমার আদরের আঘাত লাগেনি। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত জ্যামিতির প্রতিটি ইঞ্চি আমার মুখস্থ হয়ে গেল।
উল্টোভাবে, আমার শরীরেরও এমন কোনো অংশ বাকি রইল না, যেখানে আনিকার সেই জাদুকরী স্পর্শ, উনার নখের আঁচড়, অথবা উনার বন্য কামড় লাগেনি। আমরা দুজন যেন একটা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলাম— কে কাকে কতটা মুগ্ধ করতে পারে, কে কাকে কতটা চরম সুখের স্বর্গে পৌঁছে দিতে পারে।
আমরা সারা দিন বিছানায়, সোফায়, এমনকি কিচেনের মার্বেল টপের ওপর বসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। আনিকা উনার লন্ডনের জীবনের কথা বলতেন, উনার আইটি ফার্মের ক্লায়েন্টদের কথা বলতেন। আর আমি বলতাম আমার অনুবাদক জীবনের হতাশা, মিরপুরের মেসের দারোয়ান মফিজের কথা। আমরা হাসতাম, আমরা কফি খেতাম, আর হঠাৎ করেই কথার মাঝখানে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্যতায় মেতে উঠতাম।
কী অদ্ভুত এক মোহ! কী ভয়ংকর এক নেশা!
কিন্তু ছুটির দিনগুলোর একটা খুব খারাপ স্বভাব হলো, এগুলো খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ষষ্ঠ দিনের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি বুঝলাম, আমার ছুটি শেষ। আমাকে আবার কারওয়ান বাজারের বাস্তবতায় ফিরে যেতে হবে। আমি যখন গোসল করে, আনিকার কিনে দেওয়া আড়ংয়ের সেই দামি শার্ট আর ট্রাউজার পরে ড্রয়িংরুমে এলাম, আনিকা তখন সোফায় বসে কফি খাচ্ছিলেন। উনার পরনে একটা খুব পাতলা, সিল্কের নাইটি।
"অফিসে যাচ্ছ?" আনিকা কফির মগে চুমুক দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ। ছুটি শেষ। এখন যদি অফিসে না যাই, এহসান ভাই আমাকে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে ট্রান্সফার করে দেবেন," আমি ঘড়ি পরতে পরতে বললাম।
আনিকা উঠে এসে আমার শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে দিলেন। উনার হাতটা আমার বুকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। "তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু। আমি ওয়েট করব।" আমি উনার কপালে একটা চুমু খেয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। লিফটে করে নিচে নামার সময় আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আমার একটা খুব অদ্ভুত, মিশ্র অনুভূতি হলো।
আমার মনে হলো, আমি যেন কোনো 'ঘরজামাই'!
ঘরজামাইদের সাইকোলজি কেমন হয়, সেটা আমি আগে কখনো বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝতে পারলাম। আমি থাকি আমার ‘স্ত্রীর’ (যদিও আনিকা আমার স্ত্রী নন, কিন্তু সম্পর্কটা তো তেমনই) ফ্ল্যাটে। উনার কেনা দামি শার্ট পরে আমি অফিসে যাচ্ছি। অফিস শেষ করে আমি আবার উনারই ফ্ল্যাটে ফিরে আসব, উনারই টাকায় অর্ডার করা ফুডপান্ডার খাবার খাব। আমার নিজের কোনো স্বাধীনতা নেই, নিজের কোনো মেস নেই। আমি পুরোপুরি একজন ক্ষমতাশালী, বিলিয়নিয়ার নারীর আশ্রয়ে থাকা এক পালিত পুরুষ!
আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষদের জন্য এই 'ঘরজামাই' ফিলিংটা খুব ইগো-হার্ট করা একটা বিষয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমার কোনো ইগো হার্ট হচ্ছিল না। বরং আমি এই পরজীবী জীবনটাকে, এই আনিকা নাওহারের ছায়াতলে থাকাটাকে চরমভাবে উপভোগ করছিলাম।
অফিসে ঢুকতেই এহসান ভাই আমার দিকে চোখ সরু করে তাকালেন। "কী ব্যাপার রাশেদ? এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে এলে, কিন্তু তোমার চেহারায় তো রোগীর মতো কোনো ছাপ দেখছি না! উল্টো তো মনে হচ্ছে গ্যালন গ্যালন ফ্রেশ রক্ত শরীরে ঢুকিয়ে এসেছ। চেহারায় এত গ্লেজ কেন?"
আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, "আরে ভাই, রেস্ট নিলে তো মানুষের চেহারা একটু ভালো হবেই। তাছাড়া ওই আত্মীয়ের স্ট্রোকের ধকলটা কেটে গেছে, তাই একটু রিল্যাক্সড।" মামুন আমার দিকে চাকাওয়ালা চেয়ারটা ঠেলে এগিয়ে এল। "রাশেদ ভাই, শার্টটা তো জখ্কাস! আড়ংয়ের মনে হচ্ছে। এক সপ্তাহের ছুটিতে কি বিয়ে-শাদি করে ফেললেন নাকি ভাই? ভাবি কি বড়লোকের মাইয়া?" মামুন চোখ টিপে বলল।
আমি ল্যাপটপ অন করতে করতে বললাম, "মামুন, তুমি অনুবাদ করো, গোয়েন্দাগিরি না। তোমার ওই স্পেনের নিউজের কী অবস্থা?"
মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাই, নিউজ তো একটা সেই লেভেলের পেয়েছি। আমেরিকার টেক্সাসে এক লোক একটা রোবটকে বিয়ে করেছে। রোবটটার নাম ‘অ্যালিস’। লোকটা দাবি করছে, অ্যালিস নাকি সাধারণ মেয়েদের চেয়ে অনেক ভালো। সে কখনো ঝগড়া করে না, শপিংয়ে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে না, আর মেকআপের পেছনে টাকা উড়ায় না।"
আমি হাসলাম। "তো তুমি কী হেডলাইন দিচ্ছ?"
"আমি দিয়েছি— ‘টেক্সাসে যন্ত্রমানবীর গলায় বরমাল্য, প্রেমের নতুন দিগন্ত’।"
"মামুন, তুমি আবার বরমাল্যতে ফিরে গেছ! তুমি হেডলাইন দাও— ‘টেক্সাসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে মানুষের বিয়ে: প্রযুক্তির নতুন প্রভাব’।"
অফিস চলছে তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু আমার মাথার ভেতর, আমার শরীরের প্রতিটা কোষে তখন শুধু একটাই নাম— আনিকা। আমি কি-বোর্ডে টাইপ করছি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা, আর আমার মনে পড়ছে আনিকার সেই নগ্ন পিঠের কথা। আমি অনুবাদ করছি আমেরিকার নির্বাচনের খবর, আর আমার কানে বাজছে আনিকার সেই চরম মুহূর্তের বন্য গোঙানি।
অফিস শেষ করে আমি আর মিরপুরের বাসে উঠলাম না। আমি উবার ডেকে সোজা চলে গেলাম ধানমন্ডিতে।
এভাবেই আমার নতুন একটা রুটিন শুরু হয়ে গেল। সকালে আনিকার ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া, সারাদিন অফিসে ডিউটি করা, আর রাতে ফিরে এসে আনিকার সাথে বিছানায় ডিউটি করা। আমার মনে আছে, আনিকা আমাকে বলেছিলেন উনি দেশে আর আট-নয় দিন আছেন। উনার ইংল্যান্ডের ফ্লাইট ছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে আট দিন, নয় দিন, বিশ দিন পার হয়ে গেল। আনিকার ইংল্যান্ডে ফেরার কোনো লক্ষণ দেখলাম না।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তোমার না ফ্লাইট ছিল?" (হ্যাঁ, আমি এখন উনাকে তুমি করেই বলি, আর উনিও আমাকে তুমি বলেন। সম্পর্কের এই পর্যায়ে এসে আপনি-আজ্ঞে করাটা একটা চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়)। আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বলেছিলেন, "ফ্লাইটের ডেট পিছিয়ে দিয়েছি। লন্ডনে এখন বেশ ঠান্ডা। আর আইটি ফার্মের কাজগুলো তো আমি ল্যাপটপেই রিমোটলি ম্যানেজ করে নিচ্ছি। বেলালও কয়েক দিনের জন্য একটা কনফারেন্সে জার্মানি গেছে। আমার এখনই ফেরার এত তাড়া নেই।" আমি আর কথা বাড়াইনি। আমি তো এটাই চাইছিলাম। এই স্বপ্নটা যত দীর্ঘ হয়, ততই ভালো।
দেখতে দেখতে এভাবে ২২-২৩ দিন পার হয়ে গেল। আজ মার্চ মাসের ২৪ তারিখ। ফেব্রুয়ারির সেই মিষ্টি, ঠান্ডা ভাবটা ঢাকা শহর থেকে বিদায় নিয়েছে। মার্চ মাসের শেষ দিক মানেই ঢাকায় একটা ভ্যাপসা, খরতাপের শুরু। বাইরে বের হলেই রোদের তাপে পিঠ পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। রাস্তার পিচ গলে যাওয়ার মতো গরম। চারদিকে ধুলাবালি আর ঘামের গন্ধ।
কিন্তু আনিকার সেই ষোলো তলার ফ্ল্যাটে গরমের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেন্ট্রাল এসি চব্বিশ ঘণ্টা চলছে। ফ্ল্যাটের ভেতরটা সবসময় বাইশ বা তেইশ ডিগ্রিতে স্থির। এই ২২-২৩ দিনে আমাদের সম্পর্কের ডাইনামিক্সে একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্বাভাবিক পরিবর্তন এল। প্রথম যে পাঁচ-সাত দিন আমরা একসাথে ছিলাম, তখন আমাদের অবস্থা ছিল খাঁচায় বন্দি দুটো ক্ষুধার্ত পশুর মতো। আমাদের কোনো হুশ ছিল না। দিনে তিনবার, চারবার, এমনকি পাঁচবারও আমরা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। শরীরের প্রতিটি শক্তি নিংড়ে নিয়ে আমরা একে অপরকে ভোগ করতাম। মনে হতো, আমাদের চামড়ার নিচে রক্ত নয়, কোনো তরল আগুন বইছে।
কিন্তু মানুষের শরীর তো আর মেশিন না। আর মানুষের উত্তেজনাও একটা নির্দিষ্ট গ্রাফ মেনে চলে। আস্তে আস্তে আমাদের সেই বন্য, পাগলাটে রেগুলারিটি বা ফ্রিকোয়েন্সি একটু কমে আসতে শুরু করল। অফিস শুরু হওয়ার পর, দিনে তিন-চারবারের সেই রুটিনটা নেমে এল দিনে দুই বা তিনবারে। আমি অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হওয়ার আগেই হয়তো আনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন, তারপর রাতে ঘুমানোর আগে আরেকবার।
আর এখন, এই মার্চ মাসের ২৪ তারিখে এসে, আমাদের রুটিনটা আরও একটু স্থির হয়েছে। এখন শুধু রাতের বেলা একবার। কিন্তু এই ‘একবার’ মানে এই নয় যে আমাদের ভালোবাসা বা আকর্ষণ কমে গেছে। বরং, এই কমার ভেতরে একটা অদ্ভুত মানসিক গভীরতা তৈরি হয়েছে।
প্রথম দিকের সেই পাগলামিটা ছিল শুধুই লোলুপতা, একটা নতুন শরীরকে আবিষ্কার করার উত্তেজনা। কিন্তু এখন, এই ২২ দিন পর, আনিকার শরীরটা আমার কাছে আর নতুন কোনো মহাদেশ নেই। উনার শরীরের কোন জায়গায় স্পর্শ করলে উনি শিউরে ওঠেন, উনার স্তনের কোন পাশটায় কামড় দিলে উনি বন্য হয়ে ওঠেন, উনার মধুভাণ্ডারের কতটা গভীরে গেলে উনি স্কোয়ার্ট করেন— এই সব কিছু এখন আমার একদম মুখস্থ। আমি যেন উনার শরীরের একজন সার্টিফাইড মেকানিক হয়ে গেছি।
ঠিক তেমনি, আনিকাও আমার শরীরের সমস্ত সুইচ চিনে গেছেন। উনি জানেন আমার পুরুষাঙ্গের কোথায় উনার জিভের স্পর্শ লাগলে আমি পাগল হয়ে যাই, উনি জানেন আমার পিঠের ঠিক কোন জায়গায় নখ বসালে আমি পশুর মতো থাপ দেওয়া শুরু করি। এখন আমাদের রাতের ওই ‘একবার’-এর মিলনটা হয় খুব গভীর, খুব দীর্ঘ এবং খুব ইনটেন্স। এখন আর কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। আমরা অনেক সময় নিয়ে একে অপরকে আদর করি। অনেকক্ষণ ধরে ফোরপ্লে চলে। আমরা এখন একে অপরের শরীরের সাথে একটা আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলি। এই মিলনটা এখন আর শুধু যৌনতা নয়, এটা এখন আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার একটা থেরাপি। এটা এখন আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা নেশার মতো।
২৪শে মার্চ রাত এগারোটা।
আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে রাতের খাবার শেষ করেছি। আজ আনিকা নিজের হাতে রান্না করেছেন। হ্যাঁ, এই ২২ দিনে উনার ভেতরেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। যেই নারী জীবনেও কিচেনে যেতেন না, তিনি ইউটিউব দেখে দেখে আমার জন্য চিকেন স্টেক আর পাস্তা বানানো শিখে গেছেন। খাওয়া শেষ করে আমরা বারান্দায় এসে বসেছি। বাইরে ঢাকা শহরে একটা গুমোট গরম। কিন্তু বারান্দায় যেহেতু বাতাস আছে, তাই খুব একটা খারাপ লাগছে না। আমি একটা সিগারেট ধরালাম। আনিকা উনার একটা হাত আমার হাঁটুর ওপর রেখে আমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছেন। উনার পরনে একটা পাতলা, সুতির নাইটি। আমার পরনে শুধু একটা শর্টস। আমি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে কোনো তারা নেই। ঢাকা শহরের আকাশে তারা থাকে না।
"আনিকা," আমি খুব শান্ত গলায় ডাকলাম।
"হুম?" উনি চোখ বন্ধ করেই উত্তর দিলেন।
"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
"বলো।"
"তুমি ব্যাক করবা কবে? মানে... ইংল্যান্ডে।"
প্রশ্নটা শোনার পর আনিকা কয়েক সেকেন্ড কোনো নড়াচড়া করলেন না। উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিটাও যেন একটু থমকে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটা ঢিল ছুঁড়েছি, যেটা আমাদের এই মায়াবী ফ্ল্যাট সার্কেলের শান্ত পুকুরে একটা বড় ঢেউ তৈরি করেছে। আনিকা আস্তে করে উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার সেই বাদামি চোখ দুটো দিয়ে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।
উনার চোখে এখন কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো সিইও-র কাঠিন্য নেই। সেখানে এখন এক অদ্ভুত, অসহায় মায়া। "যেতে তো হবেই রাশেদ," আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু গলায় বললেন। "আমার ওখানে একটা সেটেলড লাইফ আছে। আমার ব্যবসা আছে, আমার লিগ্যাল স্ট্যাটাস আছে... বেলাল আছে।"
‘বেলাল’ নামটা শোনার পর আমার বুকের ভেতর একটা সুই বিঁধল। গত ২২ দিনে এই নামটা আমাদের মাঝখানে একবারও উচ্চারিত হয়নি। আমরা যেন সচেতনভাবেই এই নামটাকে আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে নির্বাসন দিয়ে রেখেছিলাম। "তাহলে যাচ্ছ কবে?" আমি আমার গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললাম।
আনিকা উনার হাতটা আমার গালের ওপর রাখলেন। উনার আঙুলগুলো খুব আলতো করে আমার চিবুকে বিলি কাটতে শুরু করল। "আমি টিকিট কনফার্ম করেছি। সামনের মাসের ১৪ তারিখ," আনিকা বললেন। আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল পাথর যেন ধপ করে পড়ে গেল। ১৪ এপ্রিল। মানে আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর এই স্বপ্ন, এই রূপকথার জীবন শেষ। আমাকে আবার সেই মিরপুর দশ নাম্বারের মেসে ফিরে যেতে হবে।
"কিন্তু জানো রাশেদ," আনিকা উনার মুখটা আমার আরও কাছে নিয়ে এলেন। উনার চোখ দুটো পানিতে টলটল করছে। "আমার একদম যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমাকে ছেড়ে, এই আনন্দ, এই পাগলামি, এই অদ্ভুত সুখ ছেড়ে আমার ওই যান্ত্রিক লন্ডনে ফিরে যেতে একটুও মন চাইছে না। আমি জানি না তুমি আমাকে কী জাদু করেছ, কিন্তু আমি তোমার শরীরের, তোমার এই আদরের একটা মারাত্মক নেশায় পড়ে গেছি। মনে হচ্ছে, আমি যদি আর কিছুদিন এখানে থাকি, আমি হয়তো আর কোনোদিনই ফিরে যেতে পারব না।"
কথাগুলো আনিকা খুব ভেঙে ভেঙে, একটা চরম অসহায়ত্বের সাথে বললেন। আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি জানি, উনি সত্যি কথা বলছেন। এই নারী আমার প্রেমে পড়েননি, উনি আমার শরীরের প্রেমে পড়েছেন। উনি আমাদের এই বন্য, আদিম যৌনতার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে শরীরের প্রেম আর আত্মার প্রেমের মাঝখানের দেয়ালটা খুব পাতলা হয়ে যায়। আমি হাতের সিগারেটটা বারান্দার গ্রিলের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। তারপর আমার দুই হাত দিয়ে আনিকার কোমর জড়িয়ে ধরে উনাকে একেবারে আমার কোলে তুলে নিলাম। "যতদিন আছ, ততদিন এই নেশাটা উপভোগ করো আনিকা," আমি উনার ঠোঁটের একদম কাছে ফিসফিস করে বললাম। "লন্ডনের ওই ঠান্ডা শহরে ফিরে গেলে এই ঢাকা শহরের ঘাম আর আগুনের কথা তোমার খুব মনে পড়বে।"
আনিকা একটা চাপা গোঙানি দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। উনার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর প্রবল আক্রোশে আছড়ে পড়ল। আমি উনাকে কোলে নিয়েই বারান্দা থেকে বেডরুমের দিকে পা বাড়ালাম।
জীবন চলছে তার নিজস্ব নিয়মে। একটা অদ্ভুত, ফ্ল্যাট সার্কেলের মতো। প্রতিদিন সকালে অফিস, আর রাতে এই বিশাল বিছানায় এক অনন্তযাত্রা।
কী অদ্ভুত এক সুখ! কী অদ্ভুত এক আনন্দ! আর কী অদ্ভুত এক ধ্বংসাত্মক নেশা!
মানুষের জীবনে কিছু কিছু পরিবর্তন আসে খুব নিঃশব্দে। আপনি টেরও পাবেন না কখন আপনার চারপাশের পরিবেশ, মানুষের দৃষ্টি, এবং আপনার নিজের মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলে গেছে। দেখতে দেখতে আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেল।
আজ এপ্রিল মাসের ২ তারিখ।
সকালবেলা আমি আনিকার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যখন অফিসের দিকে যাচ্ছি, তখন বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ড আমাকে দেখে খুব স্মার্ট একটা স্যালুট দিল। আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম। এই সেই দারোয়ান, যে প্রথম দিন আনিকার সাথে আমাকে এই বিল্ডিংয়ে ঢুকতে দেখে খুব সন্দেহজনক এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। তার চোখে তখন একটা স্পষ্ট প্রশ্ন ছিল— "এই ছ্যাঁচড়া, ম্যাড়ম্যাড়ে চেহারার লোকটা এই ভিআইপি বিল্ডিংয়ে কী মনে করে ঢুকছে?"
আর আজ? আজ সেই লোক আমাকে স্যালুট দিচ্ছে! শুধু সিকিউরিটি গার্ডই নয়, এই বিল্ডিংয়ের আশেপাশের টং দোকানের চা-ওয়ালা, মুদি দোকানের ছেলেটা— সবাই এখন আমাকে চেনে। আমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটি, চা-ওয়ালা দূর থেকেই মুচকি হেসে বলে, "স্যার, আইজকা কি অফিসে যাইবার টাইমে চা খাইয়া যাইবেন?" শুরুতে এই ধানমন্ডির হাই-সোসাইটি, কোটিপতিদের এলাকায় নিজেকে আমার ভীষণ অনাহূত, বেমানান এবং উটকো অতিথি বলে মনে হতো। আমার মনে হতো, যেকোনো সময় কেউ এসে আমার কলার চেপে ধরে বলবে, "অ্যাই ব্যাটা! তুই তো মিরপুরের মেসের পাবলিক। তুই এইখানে কী করস? ভাগ এইখান থেকে!"
কিন্তু আজ, এই এক মাসের কাছাকাছি সময়ে এসে, আমার ভেতরে সেই হীনম্মন্যতা আর নেই। আমার এখন মনে হয়, আমি এখানকারই লোক। আমি এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, এই সেন্ট্রাল এসি, এই আড়ংয়ের দামি শার্ট— এগুলোর জন্যই জন্মেছি। মানুষের অ্যাডাপটেশন বা মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সত্যিই মারাত্মক। একটা কুকুরকে যদি আপনি ড্রেন থেকে তুলে এনে রাজপ্রাসাদের সোফায় বসিয়ে দেন, দেখবেন দুই দিন পর সে এমন ভাব করবে যেন ওই সোফাটা তার বাপ-দাদার সম্পত্তি! আমার অবস্থাও অনেকটা সেই কুকুরের মতোই।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)