28-06-2026, 09:10 PM
(This post was last modified: 02-07-2026, 01:30 AM by RockyKabir. Edited 3 times in total. Edited 3 times in total.)
গুপ্তাসাহেব উঠে দাঁড়ালেন। প্রোটোকল অনুযায়ী বাকি ডিরেক্টরেরাও তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
"মিটিং ডিসমিসড," গুপ্তাসাহেব ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বললেন।
"প্রশান্ত, ইস্টার্ন জোনের অপারেশনাল ইস্যুগুলো নিয়ে আগামীকাল সকালে আমি আপনার আর অরুণের সাথে আলাদাভাবে বসব। আর মিস্টার বনসাল, পোলারিস এই ফাঁদে আটকে যাওয়ার পর ইস্টার্ন জোনের যে কন্টেইনার ভলিউমটা ওপেন থাকবে, সেটা আমরা কীভাবে ট্যাপ করতে পারি, আপনি তার একটা ফিনান্সিয়াল মডেল রেডি করুন। অরুণ, গুড জব।"
"থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার," অরুণ সামান্য মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বললেন।
গুপ্তাসাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রাজীব মাথুর আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে বোর্ডরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
অরুণ শান্তভাবে নিজের ঘড়ির দিকে তাকালেন, লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে।
সিম্পোজিয়াম শেষ হওয়ার ঠিক চারদিন পর।
বিদিশার কেবিন
কলেজের মেন বিল্ডিং
ইভেন্ট শেষ হওয়া মানেই যে কাজ শেষ, তা নয়। এই মুহূর্তে ভেন্ডারদের ফাইনাল পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স, স্পনসরশিপের টাকার পাই-টু-পাই হিসেব, ডেলিগেটদের ট্রাভেল অ্যালাউন্সের ভাউচার, সব মিলিয়ে গাদাখানেক বিল এবং রসিদের স্তূপ বিদিশার মেহগনি কাঠের ডেস্কের ওপর জমে পাহাড় প্রমাণ স্তূপের মতো হয়ে আছে।
সাধারণত ন্যাশনাল লেভেলের এত বড় একটা ইভেন্টের পর 'ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্ট' জমা দেওয়ার জন্য অন্তত দশ-বারো দিন সময় পাওয়া যায়। কিন্তু, ন্যাক-এর পিয়ার টিমের ভিজিট অতটা এগিয়ে আসার জন্য প্রত্যাশিতভাবেই দশ-বারো দিনের মেয়াদ কমে চার-পাঁচ দিনে নেমে এসেছে। তাই ইভেন্ট আয়োজনের পরেও বিদিশার একটুও স্বস্তি মেলেনি।
আগের মতো এখন তাঁকে আর রোজ রোজ সাত সকালে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কলেজে ছুটতে হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু কাজের চাপ এখনও কমেনি।
তাই ইভেন্ট শেষ হওয়ার পরে তিন দিন কেটে গেলেও তিনি এখনও ক্লাসে ফিরতে পারেননি।
আজ বিদিশার পরনে একটা সাধারণ, ছাই-রঙা সুতির শাড়ি, চুলগুলো একটা পেন্সিল দিয়ে খোঁপার মতো করে আটকানো। তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ক্লান্ত চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে এক্সেল শিটের ডেটাগুলোর সাথে ভেন্ডারদের দেওয়া ম্যানুয়াল বিলগুলো মেলাচ্ছিলেন।
এসির ঠান্ডা হাওয়াও স্বস্তি দিতে ব্যর্থ। মাথাটা দপদপ করছে, এক্সেল শিটের সারি সারি সংখ্যাগুলো চোখের সামনে বারবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকবার চেষ্টার পরে হার মেনে নিয়ে বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে দু'হাত দিয়ে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার বুক চিরে একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
তিন সপ্তাহের উপর কাজের চাপ, তার সঙ্গে টেনশন, দুটোর ভার বহন করতে করতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।
অথচ উপায় নেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে রিপোর্ট রেডি করে কাল অথবা পরশুর মধ্যেই প্রিন্সিপালের টেবিলে জমা দিতে হবে।
কিন্তু, এই মুহূর্তে তার সাময়িক মুক্তির দরকার। অন্তত আধ ঘন্টার জন্য তার এমন একটা মানুষের সঙ্গ চাই, যার সাথে কথা বললে কাজ বা কলেজের পলিটিক্স কোনটা নিয়ে ভাবতে হবে না।
তার মনের আয়নায় একটা মুখ ভেসে উঠল, রাহুল বোস। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিদিশার কাছে একটা 'কমফোর্ট জোন' হয়ে উঠেছেন।
মুখে না বললেও রাহুলের আন্তরিকতা, সূক্ষ্ম রসবোধ, কথায় কথায় সাহিত্যের উপমা এগুলো বিদিশা উপভোগ করেন। একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের সঙ্গে কথা বলার যে আলাদা একটা আনন্দ আছে, রাহুলের সাহচর্যে এসে বিদিশা প্রতি মুহূর্তেই সেটা অনুভব করতে পারেন। তার শুকনো, রুটিনমাফিক নিঃসঙ্গ জীবনে এটা একটা বড় প্রাপ্তি।
তাছাড়া, নিজের কাছে স্বীকার করতে না চাইলেও রাহুলের চোখের প্রচ্ছন্ন, মার্জিত মুগ্ধতাবোধ বিদিশার অবদমিত নারীসত্তাকে তৃপ্ত করে।
অরুণের সাথে একটানা একঘেয়ে যান্ত্রিক দাম্পত্য-জীবন এবং অয়নের সাথে দূরত্বের ফলে তাঁর জীবনের একটা বড়সড় শূন্যতা আছে, রাহুল বোস সেটা নিজের অজান্তেই একটু একটু করে ভরাট করতে শুরু করেছেন।
তার সাথে কথা বলার সময় বিদিশা অনুভব করেন যে তিনিও একজন রক্তমাংসের মানুষ। তার নিজস্ব কিছু অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া আছে।
অরুণের আচরণে তো সেটা কখনোই মনে হয় না। তার জীবনের প্রথম প্রায়োরিটি তার কেরিয়ার। তার কাছে রাত করে বাড়ি ফেরা, মাসের মধ্যে পনের দিন, এমনকী কুড়ি দিন আউট অফ স্টেশন থাকা খুব সাধারণ বিষয়। এই তো, আজ নিয়ে সাতদিন হল অফিসের কাজে অরুণ মুম্বই গিয়েছেন , এর মধ্যে বাড়িতে ফোন করেছেন মাত্র একবার। সেটাও মুম্বই পৌঁছনোর পরে।
বাড়িতে একটা লোক যে একা আছে সেটা একবারের জন্যও তার মনে আসেনি। আজকালকার মেয়ে হলে কবেই ডিভোর্স হয়ে যেত। বিদিশা আলাদা ধাতুতে তৈরি, তার এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে। তিনি মানিয়ে নিয়েছেন। তার বাবাও এরকমই ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন অয়নটা অন্তত আলাদা হবে...তার চাহিদা তো খুব বেশি কিছু ছিল না...
কলেজের এই চাকরিটা তাকে অন্তত একটা খোলা জানালার সন্ধান দিয়েছে। শেষবার কবে তিনি কারোর কথায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হেসে উঠেছিলেন, সেটা বিদিশা আজ অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারেন না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, দুপুর দেড়টা।
এখন লাঞ্চ আওয়ার চলছে।
তিনি ডেস্ক থেকে উঠে পড়লেন। শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে দোতলার কমন স্টাফরুমের দিকে পা বাড়ালেন।
দোতলার কমন স্টাফরুম যেটা ইদানীং টিচার্স লাউঞ্জ নামে পরিচিত, সাধারণত এই সময় ফাঁকা থাকে। বেশিরভাগ সিনিয়র ফ্যাকাল্টিরা নিজেদের ব্যক্তিগত কেবিনেই লাঞ্চ করা পছন্দ করেন। অন্য টিচাররাও যে যার ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি।
সিম্পোজিয়ামের আগে এটাকে অনেকটা ফাইভ-স্টার হোটেলের বিজনেস লাউঞ্জের মতো রূপ দেওয়া হয়েছিল। মেঝেতে ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেট বিছানো হয়েছিল, যা হাঁটার শব্দ পুরোপুরি শুষে নেবে। ঘরের মাঝখানে থেকে কাঠের টেবিল-চেয়ারগুলো সরিয়ে তার জায়গায় দেওয়াল ঘেঁষে সারি সারি লেদার সোফা আর কাঁচের সেন্টার টেবিল রাখা হয়েছিল। ঘরের এককোণে একটা অত্যাধুনিক প্যান্ট্রি সেট করা হয়েছিল, যেখানে স্বয়ংক্রিয় কফি মেশিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস আর কুকিজ রাখা থাকবে।
বিদিশা আশা করেছিলেন যে আজকেও স্টাফরুমটা ফাঁকাই থাকবে এবং রাহুল বোস হয়তো তার জন্য কফি নিয়ে রেডি হয়ে থাকবেন।
কিন্তু স্টাফরুমের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি একটু থমকে গেলেন। স্টাফরুমের দৃশ্যটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে অন্তত জনা কুড়ি-পঁচিশ ফ্যাকাল্টি এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত।
বিদিশা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই পুরো স্টাফরুমটা একবার চোখ বুলিয়ে স্ক্যান করে নিলেন।
এসির ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মিশে থাকা কফির গন্ধ আর উপস্থিত সবার সমবেত কণ্ঠস্বর, যা দূর থেকে শুনলে একটানা গুঞ্জনের মতো লাগে।
নাহ, রাহুল বোস এখানে নেই।
বিদিশার মনটা এক মুহূর্তের জন্য হালকা হতাশায় ভরে গেল। একা একা এই ভিড় স্টাফরুমে বসে কফি খাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার নেই। এই ভিড়ের মধ্যে তার এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। তিনি দরজার হ্যান্ডেলটা টেনে আবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।
"মিস গাঙ্গুলি এখানে বসুন না। দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।"
বিদিশার খুব কাছ থেকে একটা মার্জিত নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
বিদিশা থমকে দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বরটা তার অপরিচিত। তিনি ঘুরে তাকালেন।
তার ঠিক বাঁ দিকের একটা কর্নার সোফায় বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে।
গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা, মুখের গড়ন ডিম্বাকৃতি, পরনে একটা দামি, প্যাস্টেল শেডের তসর সিল্কের শাড়ি। পরিপাটি করে ব্লো-ড্রাই করা চুলগুলো তার কাঁধের ওপর নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে আছে। চোখে একটা সরু, গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা, ভেতর দিয়ে তার চোখের দৃষ্টি ঠিকরে বেরোচ্ছে।
তার ঠোঁটে আন্তরিক হাসি। ভদ্রমহিলার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ভীষণ রিল্যাক্সড, অথচ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তার সামনে সেন্টার টেবিলে একটা খোলা ল্যাপটপ আর একটা স্যান্ডউইচের প্লেট রাখা। ডান হাতে একটা কফির কাপ আর বাঁ হাতের আঙুলগুলো সোফার হাতলের ওপর একটা নির্দিষ্ট ছন্দে টোকা দিচ্ছে।
তার পুরো বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যা স্টাফরুমের এই পরিবেশের সাথে একদমই খাপ খাচ্ছে না। তিনি যেন এই ঘরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবে সবকিছু খুব পর্যবেক্ষণ করছেন। বিদিশা এই মহিলাকে আগে কখনো দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।
"অত্যন্ত ক্লান্ত লাগছে আপনাকে। প্লিজ, বসুন, এখানে জায়গা আছে" ভদ্রমহিলা নিজের পাশের ফাঁকা জায়গাটার দিকে একটু সরে গিয়ে, পাশের ফাঁকা লেদার সোফাটার দিকে ডান হাত দিয়ে বিদিশাকে বসার ইশারা করলেন।
বিদিশা স্বভাবতই একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। নিজে থেকে গিয়ে অপরিচিতদের সাথে বসে গল্প করা তার ধাতে নেই। কিন্তু মহিলা যেভাবে তাকে নাম ধরে ডাকলেন এবং বসার জায়গা করে দিলেন, তাতে সরাসরি না বলে বেরিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত অভদ্রতা হয়ে যায়।
বিদিশা একটু ইতস্তত করে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফাটার এক প্রান্তে, ভদ্রতাসূচক দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন।
"থ্যাংক ইউ" বিদিশা মাপা গলায় বললেন।
মহিলা কফির কাপটা সামনের কাঁচের টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তার হাতের নখগুলো পারফেক্টলি ম্যানিকিওর করা, নেলপলিশের রঙটা শাড়ির বর্ডারের সাথে নিখুঁতভাবে ম্যাচ করানো।
"আমি অনামিকা। অনামিকা রায়," ভদ্রমহিলা নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
"কলেজের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলর।"
বিদিশা হাত মেলালেন।
"আমি বিদিশা গাঙ্গুলি। ম্যাথমেটিক্স..."
"ওহ, আপনার নতুন করে পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।"
অনামিকা খুব মিষ্টি করে হেসে উঠলেন।
"আমি তো প্রিন্সিপাল স্যারকে সেদিন বলছিলাম, আমাদের কলেজে একজন সত্যিকারের ক্রাইসিস ম্যানেজার এসেছেন।"
অনামিকা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন।
বিদিশা সামান্য ভ্রু কুঁচকালেন। মহিলা তার সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজ রাখেন।
"সিম্পোজিয়ামের ওই হাড়ভাঙা খাটুনির পর আপনার তো অন্তত এক সপ্তাহ ছুটিতে থাকা উচিত ছিল।"
মহিলা খুব মোলায়েম গলায়, হাসিমুখে কথাগুলো বললেন।
"কাজ তো করতেই হবে। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা ন্যাকের অডিটের জন্য খুব ক্রুশিয়াল। তাই ছুটি নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না,"
বিদিশা প্রফেশনাল এবং ফ্ল্যাট টোনে উত্তর দিলেন। তিনি নিজের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য অপরিচিত কাউকে দিতে চান না।
"অফকোর্স। আর আপনার কাজের এফিসিয়েন্সি নিয়ে তো এখন সবাই চর্চা করছে। সিম্পোজিয়াম নিয়ে ঐ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট! মাই গুডনেস!
এমনকি ম্যানেজমেন্টের উপরতলা অবধি আপনার খবর পৌঁছে গেছে।"
মহিলার কথাটা শোনার সাথে সাথে বিদিশার মস্তিষ্কে একটা সতর্কঘণ্টা বেজে উঠল।
'ম্যানেজমেন্টের উপরতলা?'
একজন সাধারণ টিচারের কানে কীভাবে এসব কথা পৌঁছয় ?
"থ্যাংক ইউ, মিস রায়। কিন্তু, ক্রাইসিস ম্যানেজার হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল।"
বিদিশা খুব সাবধানে, মেপে মেপে উত্তর দিলেন।
"আমি বুঝতে পারছি। বাইরে থেকে সবাই শুধু গ্ল্যামার আর সাকসেসটা দেখে। কিন্তু আমি একজন সাইকোলজিস্ট। আমি মানুষের মুখ দেখে বুঝতে পারি তাদের ভেতরে কী হচ্ছে। এই যে গত তিন সপ্তাহ ধরে আপনি লড়ে যাচ্ছেন... ইটস মেন্টালি এক্সহস্টিং।"
অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার চোখদুটো সরাসরি বিদিশার চোখের দিকে স্থির।
"আর তার ওপর, এই কলেজের পলিটিক্স। আপনি নতুন এসেছেন, হয়তো এখনো সবটা বুঝে উঠতে পারেননি।"
বিদিশার মস্তিষ্কের অ্যালার্ম বেলটা বেজে উঠল।
পলিটিক্স ! এই মহিলা কি ড. বাগচী আর সুব্রত সেনের ফান্ড আটকানোর ব্যাপারটা জানেন? নাকি তিনি অন্য কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন?
"পলিটিক্স তো সব জায়গাতেই থাকে, মিস রায়।"
বিদিশা তার ফেস এক্সপ্রেশন সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক রেখে উত্তর দিলেন।
"আমি অ্যাকাডেমিক্সে ফোকাস করতে পছন্দ করি। এই পলিটিক্যাল নয়েজগুলো আমি ইগনোর করার চেষ্টা করি।"
"দ্যাটস আ ভেরি স্মার্ট অ্যাপ্রোচ" অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন।
"কিন্তু প্রবলেম হলো, আপনি পলিটিক্সকে ইগনোর করলেও, পলিটিক্স কিন্তু আপনাকে ইগনোর করবে না। স্পেশালি, যখন আপনি এত ব্রিলিয়ান্ট, এত ফোকাসড। আপনার মতো স্বাধীনচেতা মেয়েদের এই সিস্টেম খুব ভয় পায়। স্টুডেন্টদের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে দেখেছি, এই অল্প ক'দিনেই ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের মধ্যে আপনার একটা বিশাল ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়েছে।
স্পেশালি, ফেস্টের রাতের সেই ঘটনার পর..."
অনামিকা একটু থামলেন।
তিনি খুব সন্তর্পণে বিদিশার চোখের মাইক্রো-এক্সপ্রেশনগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন। বিদিশার শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল।
ফেস্টের রাত! অয়ন!
এই মহিলা কি অয়নের সাথে তার সম্পর্কের কোনো আঁচ পেয়েছেন? নাকি তিনি শুধু অয়নের বিক্রম মালহোত্রাকে ঘুঁষি মারার ঘটনাটার দিকে ইঙ্গিত করছেন?"
বিদিশা নিজের মুখের পেশিগুলোকে পাথরের মতো শক্ত করে ফেললেন। তার চোখেমুখে কোনরকম ইমোশন বা অস্বস্তির বিন্দুমাত্র ছাপ তিনি প্রকাশ হতে দিলেন না।
"স্টুডেন্টরা অনেক কিছুই বানিয়ে বলতে ভালোবাসে, মিস রায়। আমি শুধু একজন টিচার হিসেবে আমার বাউন্ডারি মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। দ্যাটস অল" বিদিশা ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন।
অনামিকার চোখের ভেতর দিয়ে একটা সূক্ষ্ম বিস্ময়ের ঝলক বয়ে গেল। তিনি ভেবেছিলেন এবার হয়তো বিদিশা তার কাছে একটু ওপেন-আপ হবেন, একটু ফ্রাস্ট্রেশন দেখাবেন, বা ম্যানেজমেন্টের নামে দু-চার কথা বলবেন।
এই বিদিশা গাঙ্গুলি মেয়েটার সেল্ফ-কন্ট্রোল মারাত্মক। এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে চায় না।
"অ্যাবসোলিউটলি," অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন।
"বাউন্ডারি মেইনটেইন করাটা খুব দরকার। কিন্তু মুশকিল হলো, এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি।"
অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরটা ফিসফিসানিতে নেমে এসেছে।
"আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল। তাদের সমস্যা, তাদের সাইকোলজি, তাদের পলিটিক্স... এগুলো ক্লাসরুম থেকে বোঝা যায় না। আর সেই সমস্যাগুলো যদি আউট অফ 'কন্ট্রোল' হয়ে যায়, তখন আবার ম্যানেজমেন্টকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়।"
বিদিশা চুপ করে শুনছেন। তার প্রখর গাণিতিক মস্তিষ্ক অনামিকা রায়ের ছুঁড়ে দেওয়া প্রত্যেকটা শব্দকে ডিকোড করার চেষ্টা করছে। এই মহিলা তাকে এসব কথা কেন বলছেন?
"সেইজন্যই"
অনামিকা আবার সোফায় হেলান দিলেন।
"ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়।"
"ওপরতলার ইমপ্রেশন নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না, মিস রায়। আমার কাজ আমার সাবজেক্ট পড়ানো আর যে দায়িত্বটা প্রিন্সিপাল স্যার দেন, সেটা নিখুঁতভাবে শেষ করা। এর বাইরে কোন কিছু নিয়ে আমার কোনো এক্সপার্টিজও নেই আর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্টও নেই।"
বিদিশা কথাটা এমন একটা টোনে বললেন, যা ওপর থেকে শুনতে মার্জিত লাগলেও তাতে প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট সুর মেশানো ছিল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এই ধরনের গসিপে অংশ নিতে চান না।
অনামিকার মতো অভিজ্ঞ মানুষের ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না।
"দ্যাটস সো রিলিভিং টু হিয়ার!"
অনামিকা আবার তার মিষ্টি হাসির আবরণে ফিরে গেলেন।
"আপনার এই কনফিডেন্সটাই আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বিদিশা। কিপ ইট আপ।"
অনামিকা তার ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করলেন।
"আমি উঠি। আমার একটা কাউন্সেলিং সেশন আছে। বেশ কিছু স্টুডেন্ট আজকাল সিভিয়ার ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি নিয়ে আসছে। কলেজের এই প্রেশার কুকার এনভায়রনমেন্ট অনেক বাচ্চাই নিতে পারে না।"
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে অনামিকা উঠে দাঁড়ালেন।
"আপনার সাথে কথা বলে ভীষণ ভালো লাগল, বিদিশা। আপনি যে কোন সময়, কোন মেন্টাল স্ট্রেস বা কলেজের কোনো ইন্টারনাল বিষয়ে কথা বলতে চাইলে, মাই ডোর ইজ অলওয়েজ ওপেন। সামটাইমস, উই অল নিড আ সেফ স্পেস টু টক। তাই না?"
অনামিকা আবার একটা উষ্ণ হাসি ছুঁড়ে দিয়ে স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বিদিশা সোফায় বসে রইলেন। তার মনের ভেতর এখন একটা নতুন চিন্তার স্রোত বইতে শুরু করেছে।
স্টাফরুমের চারপাশের কোলাহল, গুঞ্জন তার চিন্তায় কোনরকম ব্যাঘাত ঘটল না। তার মনের ভেতর অনামিকা রায়ের কয়েকটা শব্দ ইকো হচ্ছে - ম্যানেজমেন্ট তার মতো মানুষদের চায়... কিন্তু কেন ?
স্টাফরুমে একগাদা টিচারের সামনে অচেনা একজন মানুষকে ডেকে হুট করে এসব কথা কেউ কাউকে বলবে কেন ? আর, ফেস্টের কথা তুলে উনি কী বোঝাতে চাইলেন, ইঙ্গিতটা কী অয়নের দিকে ছিল ? নাকি ওই মহিলা তাকে আসন্ন কোন ঘটনার ইঙ্গিত দিতে চাইছিলেন ?
কী হতে পারে সেটা ? আবার নতুন কোন একটা ফাঁদ যা ম্যানেজমেন্ট থুড়ি বাগচী তার জন্য পাতা শুরু করেছে ? অনামিকা রায়ের সাথে কী বাগচীর কোন যোগাযোগ আছে ?
বিদিশা একটা গভীর শ্বাস নিলেন। তার এতক্ষণের ক্লান্তি, রিপোর্ট জমা নিয়ে টেনশন সব কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় মাথায় গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রশ্ন। বাসা বেঁধেছে তীক্ষ্ণ সতর্কতা।
এখন তার মনে হচ্ছে, সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং আটকানোর চেষ্টাটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা একক প্রয়াস ছিল না।
তিনি নিশ্চিত যে শুধু বাগচী নয় এর পেছনে ম্যানেজমেন্টের কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির হাত ছিল। কলেজের এই আপাত-শান্ত অ্যাকাডেমিক খোলসটার নিচে একটা ক্ষমতার লড়াই চলছে, আর কেউ চাইছে বিদিশা তাতে জড়িয়ে যাক।
বিদিশা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ করেই একটা নতুন অ্যাড্রেনালিনের রাশ অনুভব করলেন তিনি, এতক্ষণের ক্লান্ত অনুভূতিটা আর নেই।
যে বা যারা তাকে এই জালে জড়াতে চাইছে, তাদের খুব শিগগিরই বুঝতে হবে যে তারা ভুল মানুষকে টার্গেট করেছে। তিনি কারোর সামনে মাথা নোয়ান না।
যে উদ্দেশ্য নিয়েই এরা এমন কাজ করে থাকুক সেটা সফল হবে না। নাহ, এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করে লাভ নেই।
বিদিশা নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর ঠিক করে নিয়ে, মেরুদণ্ড টানটান করে কমন স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা তাকে আজ রাতের মধ্যেই শেষ করতে হবে।
To be continued...
"মিটিং ডিসমিসড," গুপ্তাসাহেব ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বললেন।
"প্রশান্ত, ইস্টার্ন জোনের অপারেশনাল ইস্যুগুলো নিয়ে আগামীকাল সকালে আমি আপনার আর অরুণের সাথে আলাদাভাবে বসব। আর মিস্টার বনসাল, পোলারিস এই ফাঁদে আটকে যাওয়ার পর ইস্টার্ন জোনের যে কন্টেইনার ভলিউমটা ওপেন থাকবে, সেটা আমরা কীভাবে ট্যাপ করতে পারি, আপনি তার একটা ফিনান্সিয়াল মডেল রেডি করুন। অরুণ, গুড জব।"
"থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার," অরুণ সামান্য মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বললেন।
গুপ্তাসাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রাজীব মাথুর আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে বোর্ডরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
অরুণ শান্তভাবে নিজের ঘড়ির দিকে তাকালেন, লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে।
সিম্পোজিয়াম শেষ হওয়ার ঠিক চারদিন পর।
বিদিশার কেবিন
কলেজের মেন বিল্ডিং
ইভেন্ট শেষ হওয়া মানেই যে কাজ শেষ, তা নয়। এই মুহূর্তে ভেন্ডারদের ফাইনাল পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স, স্পনসরশিপের টাকার পাই-টু-পাই হিসেব, ডেলিগেটদের ট্রাভেল অ্যালাউন্সের ভাউচার, সব মিলিয়ে গাদাখানেক বিল এবং রসিদের স্তূপ বিদিশার মেহগনি কাঠের ডেস্কের ওপর জমে পাহাড় প্রমাণ স্তূপের মতো হয়ে আছে।
সাধারণত ন্যাশনাল লেভেলের এত বড় একটা ইভেন্টের পর 'ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্ট' জমা দেওয়ার জন্য অন্তত দশ-বারো দিন সময় পাওয়া যায়। কিন্তু, ন্যাক-এর পিয়ার টিমের ভিজিট অতটা এগিয়ে আসার জন্য প্রত্যাশিতভাবেই দশ-বারো দিনের মেয়াদ কমে চার-পাঁচ দিনে নেমে এসেছে। তাই ইভেন্ট আয়োজনের পরেও বিদিশার একটুও স্বস্তি মেলেনি।
আগের মতো এখন তাঁকে আর রোজ রোজ সাত সকালে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কলেজে ছুটতে হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু কাজের চাপ এখনও কমেনি।
তাই ইভেন্ট শেষ হওয়ার পরে তিন দিন কেটে গেলেও তিনি এখনও ক্লাসে ফিরতে পারেননি।
আজ বিদিশার পরনে একটা সাধারণ, ছাই-রঙা সুতির শাড়ি, চুলগুলো একটা পেন্সিল দিয়ে খোঁপার মতো করে আটকানো। তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ক্লান্ত চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে এক্সেল শিটের ডেটাগুলোর সাথে ভেন্ডারদের দেওয়া ম্যানুয়াল বিলগুলো মেলাচ্ছিলেন।
এসির ঠান্ডা হাওয়াও স্বস্তি দিতে ব্যর্থ। মাথাটা দপদপ করছে, এক্সেল শিটের সারি সারি সংখ্যাগুলো চোখের সামনে বারবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকবার চেষ্টার পরে হার মেনে নিয়ে বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে দু'হাত দিয়ে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার বুক চিরে একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
তিন সপ্তাহের উপর কাজের চাপ, তার সঙ্গে টেনশন, দুটোর ভার বহন করতে করতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।
অথচ উপায় নেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে রিপোর্ট রেডি করে কাল অথবা পরশুর মধ্যেই প্রিন্সিপালের টেবিলে জমা দিতে হবে।
কিন্তু, এই মুহূর্তে তার সাময়িক মুক্তির দরকার। অন্তত আধ ঘন্টার জন্য তার এমন একটা মানুষের সঙ্গ চাই, যার সাথে কথা বললে কাজ বা কলেজের পলিটিক্স কোনটা নিয়ে ভাবতে হবে না।
তার মনের আয়নায় একটা মুখ ভেসে উঠল, রাহুল বোস। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিদিশার কাছে একটা 'কমফোর্ট জোন' হয়ে উঠেছেন।
মুখে না বললেও রাহুলের আন্তরিকতা, সূক্ষ্ম রসবোধ, কথায় কথায় সাহিত্যের উপমা এগুলো বিদিশা উপভোগ করেন। একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের সঙ্গে কথা বলার যে আলাদা একটা আনন্দ আছে, রাহুলের সাহচর্যে এসে বিদিশা প্রতি মুহূর্তেই সেটা অনুভব করতে পারেন। তার শুকনো, রুটিনমাফিক নিঃসঙ্গ জীবনে এটা একটা বড় প্রাপ্তি।
তাছাড়া, নিজের কাছে স্বীকার করতে না চাইলেও রাহুলের চোখের প্রচ্ছন্ন, মার্জিত মুগ্ধতাবোধ বিদিশার অবদমিত নারীসত্তাকে তৃপ্ত করে।
অরুণের সাথে একটানা একঘেয়ে যান্ত্রিক দাম্পত্য-জীবন এবং অয়নের সাথে দূরত্বের ফলে তাঁর জীবনের একটা বড়সড় শূন্যতা আছে, রাহুল বোস সেটা নিজের অজান্তেই একটু একটু করে ভরাট করতে শুরু করেছেন।
তার সাথে কথা বলার সময় বিদিশা অনুভব করেন যে তিনিও একজন রক্তমাংসের মানুষ। তার নিজস্ব কিছু অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া আছে।
অরুণের আচরণে তো সেটা কখনোই মনে হয় না। তার জীবনের প্রথম প্রায়োরিটি তার কেরিয়ার। তার কাছে রাত করে বাড়ি ফেরা, মাসের মধ্যে পনের দিন, এমনকী কুড়ি দিন আউট অফ স্টেশন থাকা খুব সাধারণ বিষয়। এই তো, আজ নিয়ে সাতদিন হল অফিসের কাজে অরুণ মুম্বই গিয়েছেন , এর মধ্যে বাড়িতে ফোন করেছেন মাত্র একবার। সেটাও মুম্বই পৌঁছনোর পরে।
বাড়িতে একটা লোক যে একা আছে সেটা একবারের জন্যও তার মনে আসেনি। আজকালকার মেয়ে হলে কবেই ডিভোর্স হয়ে যেত। বিদিশা আলাদা ধাতুতে তৈরি, তার এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে। তিনি মানিয়ে নিয়েছেন। তার বাবাও এরকমই ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন অয়নটা অন্তত আলাদা হবে...তার চাহিদা তো খুব বেশি কিছু ছিল না...
কলেজের এই চাকরিটা তাকে অন্তত একটা খোলা জানালার সন্ধান দিয়েছে। শেষবার কবে তিনি কারোর কথায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হেসে উঠেছিলেন, সেটা বিদিশা আজ অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারেন না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, দুপুর দেড়টা।
এখন লাঞ্চ আওয়ার চলছে।
তিনি ডেস্ক থেকে উঠে পড়লেন। শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে দোতলার কমন স্টাফরুমের দিকে পা বাড়ালেন।
দোতলার কমন স্টাফরুম যেটা ইদানীং টিচার্স লাউঞ্জ নামে পরিচিত, সাধারণত এই সময় ফাঁকা থাকে। বেশিরভাগ সিনিয়র ফ্যাকাল্টিরা নিজেদের ব্যক্তিগত কেবিনেই লাঞ্চ করা পছন্দ করেন। অন্য টিচাররাও যে যার ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি।
সিম্পোজিয়ামের আগে এটাকে অনেকটা ফাইভ-স্টার হোটেলের বিজনেস লাউঞ্জের মতো রূপ দেওয়া হয়েছিল। মেঝেতে ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেট বিছানো হয়েছিল, যা হাঁটার শব্দ পুরোপুরি শুষে নেবে। ঘরের মাঝখানে থেকে কাঠের টেবিল-চেয়ারগুলো সরিয়ে তার জায়গায় দেওয়াল ঘেঁষে সারি সারি লেদার সোফা আর কাঁচের সেন্টার টেবিল রাখা হয়েছিল। ঘরের এককোণে একটা অত্যাধুনিক প্যান্ট্রি সেট করা হয়েছিল, যেখানে স্বয়ংক্রিয় কফি মেশিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস আর কুকিজ রাখা থাকবে।
বিদিশা আশা করেছিলেন যে আজকেও স্টাফরুমটা ফাঁকাই থাকবে এবং রাহুল বোস হয়তো তার জন্য কফি নিয়ে রেডি হয়ে থাকবেন।
কিন্তু স্টাফরুমের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি একটু থমকে গেলেন। স্টাফরুমের দৃশ্যটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে অন্তত জনা কুড়ি-পঁচিশ ফ্যাকাল্টি এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত।
বিদিশা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই পুরো স্টাফরুমটা একবার চোখ বুলিয়ে স্ক্যান করে নিলেন।
এসির ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মিশে থাকা কফির গন্ধ আর উপস্থিত সবার সমবেত কণ্ঠস্বর, যা দূর থেকে শুনলে একটানা গুঞ্জনের মতো লাগে।
নাহ, রাহুল বোস এখানে নেই।
বিদিশার মনটা এক মুহূর্তের জন্য হালকা হতাশায় ভরে গেল। একা একা এই ভিড় স্টাফরুমে বসে কফি খাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার নেই। এই ভিড়ের মধ্যে তার এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। তিনি দরজার হ্যান্ডেলটা টেনে আবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।
"মিস গাঙ্গুলি এখানে বসুন না। দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।"
বিদিশার খুব কাছ থেকে একটা মার্জিত নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
বিদিশা থমকে দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বরটা তার অপরিচিত। তিনি ঘুরে তাকালেন।
তার ঠিক বাঁ দিকের একটা কর্নার সোফায় বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে।
গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা, মুখের গড়ন ডিম্বাকৃতি, পরনে একটা দামি, প্যাস্টেল শেডের তসর সিল্কের শাড়ি। পরিপাটি করে ব্লো-ড্রাই করা চুলগুলো তার কাঁধের ওপর নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে আছে। চোখে একটা সরু, গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা, ভেতর দিয়ে তার চোখের দৃষ্টি ঠিকরে বেরোচ্ছে।
তার ঠোঁটে আন্তরিক হাসি। ভদ্রমহিলার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ভীষণ রিল্যাক্সড, অথচ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তার সামনে সেন্টার টেবিলে একটা খোলা ল্যাপটপ আর একটা স্যান্ডউইচের প্লেট রাখা। ডান হাতে একটা কফির কাপ আর বাঁ হাতের আঙুলগুলো সোফার হাতলের ওপর একটা নির্দিষ্ট ছন্দে টোকা দিচ্ছে।
তার পুরো বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যা স্টাফরুমের এই পরিবেশের সাথে একদমই খাপ খাচ্ছে না। তিনি যেন এই ঘরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবে সবকিছু খুব পর্যবেক্ষণ করছেন। বিদিশা এই মহিলাকে আগে কখনো দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।
"অত্যন্ত ক্লান্ত লাগছে আপনাকে। প্লিজ, বসুন, এখানে জায়গা আছে" ভদ্রমহিলা নিজের পাশের ফাঁকা জায়গাটার দিকে একটু সরে গিয়ে, পাশের ফাঁকা লেদার সোফাটার দিকে ডান হাত দিয়ে বিদিশাকে বসার ইশারা করলেন।
বিদিশা স্বভাবতই একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। নিজে থেকে গিয়ে অপরিচিতদের সাথে বসে গল্প করা তার ধাতে নেই। কিন্তু মহিলা যেভাবে তাকে নাম ধরে ডাকলেন এবং বসার জায়গা করে দিলেন, তাতে সরাসরি না বলে বেরিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত অভদ্রতা হয়ে যায়।
বিদিশা একটু ইতস্তত করে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফাটার এক প্রান্তে, ভদ্রতাসূচক দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন।
"থ্যাংক ইউ" বিদিশা মাপা গলায় বললেন।
মহিলা কফির কাপটা সামনের কাঁচের টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তার হাতের নখগুলো পারফেক্টলি ম্যানিকিওর করা, নেলপলিশের রঙটা শাড়ির বর্ডারের সাথে নিখুঁতভাবে ম্যাচ করানো।
"আমি অনামিকা। অনামিকা রায়," ভদ্রমহিলা নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
"কলেজের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলর।"
বিদিশা হাত মেলালেন।
"আমি বিদিশা গাঙ্গুলি। ম্যাথমেটিক্স..."
"ওহ, আপনার নতুন করে পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।"
অনামিকা খুব মিষ্টি করে হেসে উঠলেন।
"আমি তো প্রিন্সিপাল স্যারকে সেদিন বলছিলাম, আমাদের কলেজে একজন সত্যিকারের ক্রাইসিস ম্যানেজার এসেছেন।"
অনামিকা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন।
বিদিশা সামান্য ভ্রু কুঁচকালেন। মহিলা তার সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজ রাখেন।
"সিম্পোজিয়ামের ওই হাড়ভাঙা খাটুনির পর আপনার তো অন্তত এক সপ্তাহ ছুটিতে থাকা উচিত ছিল।"
মহিলা খুব মোলায়েম গলায়, হাসিমুখে কথাগুলো বললেন।
"কাজ তো করতেই হবে। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা ন্যাকের অডিটের জন্য খুব ক্রুশিয়াল। তাই ছুটি নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না,"
বিদিশা প্রফেশনাল এবং ফ্ল্যাট টোনে উত্তর দিলেন। তিনি নিজের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য অপরিচিত কাউকে দিতে চান না।
"অফকোর্স। আর আপনার কাজের এফিসিয়েন্সি নিয়ে তো এখন সবাই চর্চা করছে। সিম্পোজিয়াম নিয়ে ঐ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট! মাই গুডনেস!
এমনকি ম্যানেজমেন্টের উপরতলা অবধি আপনার খবর পৌঁছে গেছে।"
মহিলার কথাটা শোনার সাথে সাথে বিদিশার মস্তিষ্কে একটা সতর্কঘণ্টা বেজে উঠল।
'ম্যানেজমেন্টের উপরতলা?'
একজন সাধারণ টিচারের কানে কীভাবে এসব কথা পৌঁছয় ?
"থ্যাংক ইউ, মিস রায়। কিন্তু, ক্রাইসিস ম্যানেজার হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল।"
বিদিশা খুব সাবধানে, মেপে মেপে উত্তর দিলেন।
"আমি বুঝতে পারছি। বাইরে থেকে সবাই শুধু গ্ল্যামার আর সাকসেসটা দেখে। কিন্তু আমি একজন সাইকোলজিস্ট। আমি মানুষের মুখ দেখে বুঝতে পারি তাদের ভেতরে কী হচ্ছে। এই যে গত তিন সপ্তাহ ধরে আপনি লড়ে যাচ্ছেন... ইটস মেন্টালি এক্সহস্টিং।"
অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার চোখদুটো সরাসরি বিদিশার চোখের দিকে স্থির।
"আর তার ওপর, এই কলেজের পলিটিক্স। আপনি নতুন এসেছেন, হয়তো এখনো সবটা বুঝে উঠতে পারেননি।"
বিদিশার মস্তিষ্কের অ্যালার্ম বেলটা বেজে উঠল।
পলিটিক্স ! এই মহিলা কি ড. বাগচী আর সুব্রত সেনের ফান্ড আটকানোর ব্যাপারটা জানেন? নাকি তিনি অন্য কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন?
"পলিটিক্স তো সব জায়গাতেই থাকে, মিস রায়।"
বিদিশা তার ফেস এক্সপ্রেশন সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক রেখে উত্তর দিলেন।
"আমি অ্যাকাডেমিক্সে ফোকাস করতে পছন্দ করি। এই পলিটিক্যাল নয়েজগুলো আমি ইগনোর করার চেষ্টা করি।"
"দ্যাটস আ ভেরি স্মার্ট অ্যাপ্রোচ" অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন।
"কিন্তু প্রবলেম হলো, আপনি পলিটিক্সকে ইগনোর করলেও, পলিটিক্স কিন্তু আপনাকে ইগনোর করবে না। স্পেশালি, যখন আপনি এত ব্রিলিয়ান্ট, এত ফোকাসড। আপনার মতো স্বাধীনচেতা মেয়েদের এই সিস্টেম খুব ভয় পায়। স্টুডেন্টদের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে দেখেছি, এই অল্প ক'দিনেই ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের মধ্যে আপনার একটা বিশাল ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়েছে।
স্পেশালি, ফেস্টের রাতের সেই ঘটনার পর..."
অনামিকা একটু থামলেন।
তিনি খুব সন্তর্পণে বিদিশার চোখের মাইক্রো-এক্সপ্রেশনগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন। বিদিশার শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল।
ফেস্টের রাত! অয়ন!
এই মহিলা কি অয়নের সাথে তার সম্পর্কের কোনো আঁচ পেয়েছেন? নাকি তিনি শুধু অয়নের বিক্রম মালহোত্রাকে ঘুঁষি মারার ঘটনাটার দিকে ইঙ্গিত করছেন?"
বিদিশা নিজের মুখের পেশিগুলোকে পাথরের মতো শক্ত করে ফেললেন। তার চোখেমুখে কোনরকম ইমোশন বা অস্বস্তির বিন্দুমাত্র ছাপ তিনি প্রকাশ হতে দিলেন না।
"স্টুডেন্টরা অনেক কিছুই বানিয়ে বলতে ভালোবাসে, মিস রায়। আমি শুধু একজন টিচার হিসেবে আমার বাউন্ডারি মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। দ্যাটস অল" বিদিশা ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন।
অনামিকার চোখের ভেতর দিয়ে একটা সূক্ষ্ম বিস্ময়ের ঝলক বয়ে গেল। তিনি ভেবেছিলেন এবার হয়তো বিদিশা তার কাছে একটু ওপেন-আপ হবেন, একটু ফ্রাস্ট্রেশন দেখাবেন, বা ম্যানেজমেন্টের নামে দু-চার কথা বলবেন।
এই বিদিশা গাঙ্গুলি মেয়েটার সেল্ফ-কন্ট্রোল মারাত্মক। এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে চায় না।
"অ্যাবসোলিউটলি," অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন।
"বাউন্ডারি মেইনটেইন করাটা খুব দরকার। কিন্তু মুশকিল হলো, এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি।"
অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরটা ফিসফিসানিতে নেমে এসেছে।
"আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল। তাদের সমস্যা, তাদের সাইকোলজি, তাদের পলিটিক্স... এগুলো ক্লাসরুম থেকে বোঝা যায় না। আর সেই সমস্যাগুলো যদি আউট অফ 'কন্ট্রোল' হয়ে যায়, তখন আবার ম্যানেজমেন্টকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়।"
বিদিশা চুপ করে শুনছেন। তার প্রখর গাণিতিক মস্তিষ্ক অনামিকা রায়ের ছুঁড়ে দেওয়া প্রত্যেকটা শব্দকে ডিকোড করার চেষ্টা করছে। এই মহিলা তাকে এসব কথা কেন বলছেন?
"সেইজন্যই"
অনামিকা আবার সোফায় হেলান দিলেন।
"ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়।"
"ওপরতলার ইমপ্রেশন নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না, মিস রায়। আমার কাজ আমার সাবজেক্ট পড়ানো আর যে দায়িত্বটা প্রিন্সিপাল স্যার দেন, সেটা নিখুঁতভাবে শেষ করা। এর বাইরে কোন কিছু নিয়ে আমার কোনো এক্সপার্টিজও নেই আর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্টও নেই।"
বিদিশা কথাটা এমন একটা টোনে বললেন, যা ওপর থেকে শুনতে মার্জিত লাগলেও তাতে প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট সুর মেশানো ছিল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এই ধরনের গসিপে অংশ নিতে চান না।
অনামিকার মতো অভিজ্ঞ মানুষের ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না।
"দ্যাটস সো রিলিভিং টু হিয়ার!"
অনামিকা আবার তার মিষ্টি হাসির আবরণে ফিরে গেলেন।
"আপনার এই কনফিডেন্সটাই আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বিদিশা। কিপ ইট আপ।"
অনামিকা তার ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করলেন।
"আমি উঠি। আমার একটা কাউন্সেলিং সেশন আছে। বেশ কিছু স্টুডেন্ট আজকাল সিভিয়ার ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি নিয়ে আসছে। কলেজের এই প্রেশার কুকার এনভায়রনমেন্ট অনেক বাচ্চাই নিতে পারে না।"
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে অনামিকা উঠে দাঁড়ালেন।
"আপনার সাথে কথা বলে ভীষণ ভালো লাগল, বিদিশা। আপনি যে কোন সময়, কোন মেন্টাল স্ট্রেস বা কলেজের কোনো ইন্টারনাল বিষয়ে কথা বলতে চাইলে, মাই ডোর ইজ অলওয়েজ ওপেন। সামটাইমস, উই অল নিড আ সেফ স্পেস টু টক। তাই না?"
অনামিকা আবার একটা উষ্ণ হাসি ছুঁড়ে দিয়ে স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বিদিশা সোফায় বসে রইলেন। তার মনের ভেতর এখন একটা নতুন চিন্তার স্রোত বইতে শুরু করেছে।
স্টাফরুমের চারপাশের কোলাহল, গুঞ্জন তার চিন্তায় কোনরকম ব্যাঘাত ঘটল না। তার মনের ভেতর অনামিকা রায়ের কয়েকটা শব্দ ইকো হচ্ছে - ম্যানেজমেন্ট তার মতো মানুষদের চায়... কিন্তু কেন ?
স্টাফরুমে একগাদা টিচারের সামনে অচেনা একজন মানুষকে ডেকে হুট করে এসব কথা কেউ কাউকে বলবে কেন ? আর, ফেস্টের কথা তুলে উনি কী বোঝাতে চাইলেন, ইঙ্গিতটা কী অয়নের দিকে ছিল ? নাকি ওই মহিলা তাকে আসন্ন কোন ঘটনার ইঙ্গিত দিতে চাইছিলেন ?
কী হতে পারে সেটা ? আবার নতুন কোন একটা ফাঁদ যা ম্যানেজমেন্ট থুড়ি বাগচী তার জন্য পাতা শুরু করেছে ? অনামিকা রায়ের সাথে কী বাগচীর কোন যোগাযোগ আছে ?
বিদিশা একটা গভীর শ্বাস নিলেন। তার এতক্ষণের ক্লান্তি, রিপোর্ট জমা নিয়ে টেনশন সব কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় মাথায় গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রশ্ন। বাসা বেঁধেছে তীক্ষ্ণ সতর্কতা।
এখন তার মনে হচ্ছে, সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং আটকানোর চেষ্টাটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা একক প্রয়াস ছিল না।
তিনি নিশ্চিত যে শুধু বাগচী নয় এর পেছনে ম্যানেজমেন্টের কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির হাত ছিল। কলেজের এই আপাত-শান্ত অ্যাকাডেমিক খোলসটার নিচে একটা ক্ষমতার লড়াই চলছে, আর কেউ চাইছে বিদিশা তাতে জড়িয়ে যাক।
বিদিশা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ করেই একটা নতুন অ্যাড্রেনালিনের রাশ অনুভব করলেন তিনি, এতক্ষণের ক্লান্ত অনুভূতিটা আর নেই।
যে বা যারা তাকে এই জালে জড়াতে চাইছে, তাদের খুব শিগগিরই বুঝতে হবে যে তারা ভুল মানুষকে টার্গেট করেছে। তিনি কারোর সামনে মাথা নোয়ান না।
যে উদ্দেশ্য নিয়েই এরা এমন কাজ করে থাকুক সেটা সফল হবে না। নাহ, এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করে লাভ নেই।
বিদিশা নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর ঠিক করে নিয়ে, মেরুদণ্ড টানটান করে কমন স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা তাকে আজ রাতের মধ্যেই শেষ করতে হবে।
To be continued...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)