Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
ঘরের ঠিক মাঝখানে চল্লিশ ফুটের বিশাল মেহগনি কাঠের কনফারেন্স টেবিল। টেবিলের চারধারে ইতালিয়ান লেদারের হাই-ব্যাক চেয়ারগুলো সাজানো।

টেবিলের ঠিক মাঝখানে বসে আছেন ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং প্রেসিডেন্ট, মিস্টার বিনোদ কুমার গুপ্তা। বয়স ষাটের উপর, রুপোলি চুল, গম্ভীর মুখ, হাতে একটা ফাউন্টেন পেন; তার দুপাশে বসে আছেন কোম্পানির CFO অজয় বনসাল, লিগ্যাল হেড মীরা আইয়ার, NDPO প্রশান্ত আহুজা, NDCS সচ্চিদানন্দ পাঠক এবং HMO ইন্দ্রজিত সিনহা। 

অরুণের ঠিক উল্টো দিকে অভিব্যক্তিহীন মুখে বসে আছে রাজীব মাথুর, ভ্যানগার্ডের ওয়েস্ট জোনের হেড এবং এই কোম্পানীতে অরুণের প্রধান রাইভাল। 

যদিও আজকে রাজীব নয়, অরুণের প্রধান মাথাব্যথা গুপ্তাসাহেব নিজেই। সে জানে কেন মিটিংটা ডাকা হয়েছে।

কিন্তু, গুপ্তাসাহেব কাউকেই সরাসরি নিজের লক্ষ্যবস্তু বানালেন না।

"ওয়েল জেন্টেলম্যান, এই মাসের শেষেই ফোর্থ কোয়ার্টার ক্লোজ হচ্ছে। ম্যানেজমেন্ট যে ফিন্যান্সিয়াল টার্গেট সেট করেছিল, আমরা তা থেকে কতটা শর্ট রান করছি, জানতে পারি কি?"

গুপ্তাসাহেব তার ভারী, গমগমে ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙলেন।

মুখে সবাইকে অ্যাড্রেস করলেও প্রশ্নবাণটা যে কমার্শিয়াল হেড সচ্চিদানন্দ পাঠকের দিকেই ধেয়ে গেল, তা বুঝতে ঘরের কারও বাকি রইল না। তবে সচ্চিদানন্দ পাঠক মুখ খোলার আগেই টেবিলের ওপাশ থেকে একটা ফাইল গুপ্তাসাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন CFO অজয় বনসাল।

লাল রঙের ফাইলটার ওপর গুপ্তাসাহেবের রুপোলি ফাউন্টেন পেনটা মৃদু শব্দ করে টোকা মারলেন। অরুণের মনে হল, ঘরের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় আরো কয়েক ডিগ্রি নেমে গেছে। ঠিক ওর উল্টো দিকে বসা রাজীব মাথুরের ঠোঁটের কোণে হালকা, প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি ওর চোখ এড়িয়ে গেল না।

সচ্চিদানন্দ পাঠক গলা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসলেন, 

"স্যার, আমরা ফোর্থ কোয়ার্টারে ওশান ফ্রেইট এবং লাইনার সেলস থেকে যে রেভিনিউ প্রজেক্ট করেছিলাম, তা থেকে আমরা প্রায় চোদ্দো শতাংশ শর্ট রান করছি। 

তবে এর পেছনে পিওরলি কমার্শিয়াল ফেইলিওর নেই। 

রেড-সীতে হুথি অ্যাটাকের কারণে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের যে দশা হয়েছে তাতে কমার্শিয়াল লাইন্সের প্রফিট মার্জিন ধরে রাখা কঠিন ছিল। 

আমাদের ভেসেলগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে আসতে হচ্ছে। কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে জাহাজ আসায় আমাদের ভেসেল ট্রানজিট টাইম প্রায় বারো থেকে পনেরো দিন বেড়ে গেছে। তার ওপর বাঙ্কার কস্ট (জ্বালানি খরচ) বেড়েছে।

ওদিকে আমেরিকার নতুন ট্রেড ট্যারিফের ধাক্কায় গ্লোবাল ফ্রেইট কস্ট আর ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম ডাবল হয়ে গেছে। গ্লোবাল ক্লায়েন্টরা এই মুহূর্তে লং-টার্ম কন্ট্রাক্ট হোল্ডে রাখছে। তা সত্ত্বেও আমরা টার্গেটের কাছাকাছি ছিলাম।"

পাঠক একটু থামলেন, তারপর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে টেবিলের ওপাশে বসা প্রশান্ত আহুজার দিকে তাকিয়ে একটা বিষাক্ত হাসি ছুড়ে দিলেন।

"কিন্তু, ডোমেস্টিক্যালি আমরা পোর্ট অপারেশন্সের থেকে যে লজিস্টিকাল সাপোর্ট আশা করেছিলাম, সেটা পাওয়া যায়নি। কমার্শিয়াল টিম বুকিং এনে রেডি রাখলেও, আমাদের অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি যদি পোর্টে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমাতে না পারে... তবে কস্ট ওভাররানের দায় কমার্শিয়ালের একার নয়। জাহাজ এসে বন্দরে দিনের পর দিন বার্থিংয়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে, শুধু লজিস্টিকস আর ক্লিয়ারেন্সের গাফিলতিতে। যার জন্য প্রতিদিন আমাদের লক্ষ লক্ষ ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। 

বিশেষ করে কিছু স্ট্র্যাটেজিক জোনে লোকাল পোর্ট হ্যান্ডলিংয়ের অবস্থা খুবই হতাশাজনক।

স্যার, কমার্শিয়াল টিম ক্লায়েন্ট এনে দেবে, কিন্তু অপারেশনাল টিম যদি পোর্ট হ্যান্ডলিং-ই স্মুদ না করতে পারে, তবে ফিন্যান্সিয়াল টার্গেট মিস হওয়াটাই স্বাভাবিক।"

প্রশান্ত আহুজার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, পাঠক এভাবে সরাসরি তার দিকে আক্রমণ শানাবেন সেটা তিনি ভাবেননি। সাধারণত, কর্পোরেটের এই স্তরে কেউ এভাবে সামনাসামনি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে না।

তিনি টেবিলে রাখা কাচের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করতে যাবেন, এমন সময় হেড অফ মেরিন অপারেশনস ইন্দ্রজিত সিনহা তার হাতের পেনটা টেবিলে রেখে মাঝখান থেকে কথা লুফে নিলেন।

"পাঠক সাহেব, আপনি কেবল কমার্শিয়াল দিকটা দেখছেন, কিন্তু রিয়্যালিটিটা আলাদা।"

ইন্দ্রজিৎ সিনহা সরাসরি পাঠকের দিকে তাকালেন।

"আমাদের দুটো কেপসাইজ ভেসেলকে এই মুহূর্তে ওশেন সেফটির কারণে হলদিয়া আর বিশাখাপত্তনমের মাঝখানে হোল্ড করাতে হয়েছে। পোর্ট অপারেশনস রাতারাতি চ্যানেলের ড্রেজিং করতে পারবে না। লো-টাইডের কারণে হলদিয়াতে বড় জাহাজ ঢুকতে পারছে না, এটার সাথে অপারেশনাল ফেইলিওরের কোন সম্পর্ক নেই।"

সচ্চিদানন্দ পাঠক আর ইন্দ্রজিত সিনহার মধ্যে তর্কাতর্কি চরমে ওঠার আগেই গুপ্তাসাহেবের হাতের ফাউন্টেন পেনটা টেবিলের ওপর দুবার শব্দ করল। 

ঠং! ঠং!

মুহূর্তে ঘরের আবহাওয়া আবার থমেথমে হয়ে গেল। গুপ্তাসাহেব ঠান্ডা চোখে তাকালেন প্রশান্ত আহুজার দিকে।

"প্রশান্ত, জিওগ্রাফির লেকচার আমি গ্লোবাল বোর্ড মিটিংয়ে অনেকবার শুনেছি। আমার ইন্ডিয়া রিজিয়নের জাস্টিফিকেশন চাই। ইস্টার্ন জোনের গ্রাফ গত তিন মাসে এভাবে ক্র্যাশ করল কেন?"

প্রশান্ত টেবিলে রাখা মেহগনি কাঠের ওপর দুই হাত রাখলেন, তার কপালে হালকা ঘামের বিন্দু দেখা দিয়েছে। তিনি গলাটা সামান্য ঝেড়ে নিলেন,

"পাঠক সাহেব মেরিটাইম জিওপলিটিক্স ভালোই বোঝেন। কিন্তু উনি নিজের টিমের সেলস ড্রপ ঢাকতে ট্রেড ওয়ার, রেড সী ক্রাইসিস এসব টেনে আনছেন। অপারেশনস টিম চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।"

প্রশান্ত এবার একটু থামলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাঁর ঠিক পাশে বসা অরুণের দিকে তাকালেন। অরুণের মনে হলো প্রশান্তের চোখের মণি দুটো যেন জমে বরফ হয়ে গেছে।

"তাছাড়া স্যার..." প্রশান্ত এবার সরাসরি এমডি বিনোদ কুমার গুপ্তার দিকে চাইলেন। "পোর্ট অপারেশন্স টিম দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করেই এগোচ্ছিল। কিন্তু আমাদের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী ছিল। স্পেসিফিকালি ইন ইস্ট জোন। 

ফাইনাল বিডিংয়ের ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা আগে, কোনোরকম ভ্যালিড রিজন ছাড়া অরুণ হলদিয়া পোর্ট এক্সপ্যানশনের তিনশো কোটি টাকার একটা টেন্ডার থেকে আমাদের বিড উইথড্র করেছে। 

ওই প্রোজেক্টটা আমাদের হাতে এলে আগামী বছরের জন্য ইস্টার্ন জোনে ভ্যানগার্ডের রেভিনিউ নিয়ে কোনো চিন্তাই করতে হতো না।

কোম্পানির হিস্ট্রিতে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।ইস্টার্ন হেড কেন কোম্পানির গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে এই কাজটা করলেন, সেটা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।"

পুরো ঘরে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মীরা আইয়ার চমকে উঠে অরুণের দিকে তাকালেন।

গুপ্তাসাহেব তাঁর হাতের ফাউন্টেন পেনটার ক্যাপটা আস্তে করে আটকে, অত্যন্ত শীতল দৃষ্টিতে অরুণের দিকে তাকালেন।

"মিস্টার চ্যাটার্জী, আমি আপনার এক্সপ্ল্যানেশন শোনার জন্য ওয়েট করছি।"

গুপ্তা সাহেবের গলার স্বরটা থমথমে,

 "আপনি আমাদের কোম্পানির ইস্ট জোন টেকওভার করার পর, আমি আপনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। কারণ আপনার ট্র্যাক রেকর্ড ইমপেকেবল।আমরা আশা করেছিলাম, আপনি ইস্ট জোনে আমাদের মনোপোলি তৈরি করবেন। কিন্তু, তার রেজাল্ট কী হলো? থ্রি হান্ড্রেড ক্রোরস! তিনশো কোটি টাকার একটা স্ট্র্যাটেজিক টেন্ডার আমাদের হাতছাড়া হলো।"

গুপ্তাসাহেব সামান্য সামনে ঝুঁকলেন,

"শুধু হাতছাড়া হলো না, আপনি ফাইনাল বিডিং প্রসেসের ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা আপনি নিজের ভেটো পাওয়ার ইউজ করে আমাদের বিডটা প্রত্যাহার করে নিলেন ! বোর্ডকে শুধু একটা এক লাইনের ইমেইল পাঠালেন যে - 'This project is non-viable' এবং টেন্ডারটা পেল আমাদের সবচেয়ে বড় রাইভাল, 'পোলারিস পোর্টস & শিপিং। 

তিনশো কোটির টেন্ডারটা আপনি কার স্বার্থে ছেড়ে দিলেন? ভ্যানগার্ডের নাকি অন্য কারও?"

কথা বলতে বলতে বিনোদ গুপ্তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল।

এতক্ষণ ধরে চুপ করে থাকা ওয়েস্ট জোনের হেড রাজীব মাথুর এবার সুযোগ বুঝে একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। তার মুখে একটা মেকি সহানুভূতির ভাব।

"ইফ আই মে অ্যাড, স্যার", রাজীব অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকিয়ে বলল। 

"অরুণ হয়তো আমাদের কোম্পানির কাজের স্কেলের সাথে এখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। একটা মিড সাইজ কোম্পানীতে কাজ করা আর ভ্যানগার্ডের মতো একটা ন্যাশনাল কোম্পানির হয়ে তিনশো কোটির টেন্ডার হ্যান্ডেল করার মধ্যে অনেক তফাত। আমাদের টেকনিক্যাল টিম, লিগ্যাল টিম গত তিন মাস ধরে ওই প্রজেক্টের পেছনে খেটেছে। আমাদের বিড সবচেয়ে স্ট্রং ছিল। কিন্তু অরুণ লাস্ট মোমেন্টে উইথড্র করে আমাদের পুরো কোম্পানিকে ইন্ডাস্ট্রির কাছে একটা জোক বানিয়ে দিয়েছে। শেয়ারহোল্ডাররা অলরেডি প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।"

অজয় বনসাল তার চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত গলায় যোগ করলেন, "অরুণ, রাজীবের কথায় লজিক আছে। আমাদের ফিনান্সিয়াল প্রোজেকশন অনুযায়ী এই পোর্ট প্রজেক্টটা আগামী তিন বছরে আমাদের ইবিটা (EBITDA) মার্জিন অন্তত ১৫% গ্রোথ দিত। আপনার এই সাডেন পুল-আউটটা ইনভেস্টরদের কাছে একটা খুব ভুল মেসেজ দিয়েছে। দিস লাইক পিওর সাবোটাজ। এর জন্য আপনাকে কিন্তু উপযুক্ত জবাবদিহি করতে হবে।"

বোর্ডরুমের সবাই এখন অরুণের উত্তরের অপেক্ষায়। রাজীবের মুখে একটা অদৃশ্য হাসি।

পুরো বোর্ডরুম অরুণের উত্তরের অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে বসে আছে। সবাই নিশ্চিত, অরুণ আজ শেষ। ইচ্ছে করে তিনশো কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতছাড়া করার পর পৃথিবীতে কেউ কোন কোম্পানিতে টিকে থাকতে পারে না।

অরুণ চ্যাটার্জী এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে নিজের ডান হাতের রোলেক্স ঘড়িটার ডায়ালে একবার হাত বোলালেন। তারপর খুব ধীরেসুস্থে টেবিলের ওপর রাখা নিজের আইপ্যাডটা অন করলেন এবং স্ক্রিনটা স্লাইড করে বোর্ডরুমের মেইন প্রজেক্টরে কানেক্ট করলেন। তার মুখে ভয়ের বা নার্ভাসনেসের কোনো ছিটেফোঁটা নেই। 

অরুণ নিজের আইপ্যাডটা আনলক করলেন 

"মিস্টার বনসাল ঠিকই বলেছেন, অন পেপার এই প্রজেক্টটা আমাদের ১৫% গ্রোথ দিত" অরুণের শান্ত আত্মবিশ্বাসী গলা বোর্ডরুমের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল। 

"কিন্তু রিয়েলিটিতে, এই প্রজেক্টটা ভ্যানগার্ড গ্লোবালের বিরাট ক্ষতি করে দিত।"

অরুণ প্রজেক্টরের দিকে ইশারা করলেন। স্ক্রিনে একটা জটিল কর্পোরেট স্ট্রাকচারের গ্রাফ ভেসে উঠল।

"স্যার, আপনারা পোর্ট এক্সপ্যানশনের টেন্ডার ডকুমেন্টের ক্লজ নং ফোর-পয়েন্ট-টু (Clause 4.2) নিশ্চয়ই পড়েছেন?" 
অরুণ জিজ্ঞেস করলেন।

"অফকোর্স। লোকাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সাব-কন্ট্রাক্টিং ক্লজ।" 

মীরা আইয়ার এতক্ষণে মুখ খুললেন। 

"প্রজেক্টের অন্তত ৪০% কাজ লোকাল রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলোকে দিতে হবে। দ্যাটস স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর।"

"কারেক্ট" অরুণ মৃদু হাসলেন। 

"স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর। কিন্তু যেটা স্ট্যান্ডার্ড নয়, সেটা হলো ওই লোকাল কোম্পানিগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড। আমি গত এক মাস ধরে শুধু পোর্টের ড্রাফটের পাশাপাশি ওই এলাকার লোকাল সাপ্লায়ার এবং পলিটিক্যাল সিন্ডিকেটের রুট স্টাডি করেছি।"

অরুণ আইপ্যাডে একটা সোয়াইপ করতেই স্ক্রিনে তিনটে কোম্পানির নাম এবং ডিরেক্টরদের ডিটেইলস ফুটে উঠল।

"আমাদের টেন্ডার জিতলে এই তিনটে কোম্পানিকেই সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে হতো, কারণ ওই পার্টিকুলার জোনে পোর্ট অথরিটির ক্লিয়ারেন্স শুধু এদেরই আছে। আপনারা কি জানেন এই কোম্পানিগুলোর আসল মালিক কে?"

বোর্ডরুমের সবাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মীরা আইয়ার চোখ সরু করে ডেটাগুলো পড়ার চেষ্টা করছেন।

"এরা কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি নয়, স্যার। এরা লোকাল মাফিয়াদের টাকা সাদা করার মেশিন। কিন্তু প্রবলেমটা শুধু এখানে নয়। আসল ডেডলকটা হলো এনভায়রনমেন্টাল ক্লিয়ারেন্স।" 

অরুণ আবার স্ক্রিন পাল্টালেন। এবার স্ক্রিনে একটা সরকারি রিপোর্টের স্ক্যান কপি ফুটে উঠল, যার ওপর লাল কালিতে 'RESTRICTED' লেখা।

"অরুণ! এই ড্রাফট তো পাবলিক ডোমেইনে নেই! আপনি এই রিপোর্ট কোথায় পেলেন?"

মীরা আইয়ার চমকে উঠলেন। 

"আমি কোথা থেকে ইনফরমেশন পাই, সেটা আমার প্রফেশনাল সিক্রেট, মিসেস আইয়ার।" অরুণ নিস্পৃহ গলায় বললেন।

তারপর সরাসরি মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকিয়ে বললেন। 

"রিপোর্টটা দেখুন, স্যার, যে জমিটা পোর্ট এক্সপ্যানশনের জন্য অ্যালোকেট করা হয়েছে, সেটা কোস্টাল রেগুলেশন জোন-ওয়ানের (CRZ-I) আন্ডারে পড়ে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) অলরেডি ওই জমির ওপর একটা স্যু-মোটো (Suo-motu) কগনিজেন্স নিয়েছে, যেটা পাবলিকলি ডিক্লেয়ার করা হয়নি। কারণ, এই শেল কোম্পানিগুলোর পলিটিক্যাল বাবারা সেটা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল।"

বোর্ডরুমের এসি-র ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যেও রাজীব মাথুরের কপালে এবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল।

"আমরা যদি তিনশো কোটি টাকা বিড করে টেন্ডারটা জিততাম, তাহলে প্রথম তিন মাসের মধ্যেই আমাদের অন্তত একশো কোটি টাকা মবিলাইজেশন ফান্ড হিসেবে ইনভেস্ট করতে হতো। আর ঠিক তার পনেরো দিনের মাথায় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রজেক্টের ওপর 'স্টে অর্ডার' (Stay Order) চলে আসত। কাজ বন্ধ হয়ে যেত। লোকাল সাব-কন্ট্রাক্টররা আমাদের চেপে ধরত পেমেন্টের জন্য, আর এদিকে পোর্ট অথরিটি আমাদের পেনাল্টি করত ডেডলাইন মিট না করার জন্য।"

অরুণ একটু থামলেন। তিনি স্থির দৃষ্টিতে মিস্টার গুপ্তার দিকে ফিরে তাকালেন।

"আমাদের তিনশো কোটি টাকা আগামী দশ বছরের জন্য লিটিগেশনে আটকে যেত, স্যার। কোম্পানির ব্যালেন্স শিট ব্লিড করত, আর স্টক মার্কেটে ভ্যানগার্ড গ্লোবালের শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ত। 

আর পোলারিস? তারা এই পলিটিক্যাল ফাঁদে জেনেশুনেই পা দিয়েছে, কারণ তাদের পলিটিক্যাল ইকুয়েশন আলাদা। কিন্তু আমরা কর্পোরেট প্লেয়ার। দ্যাটস হোয়াই, আই পুলড দ্য প্লাগ। আমি একটা গ্লোবাল কর্পোরেশনকে লোকাল সিন্ডিকেটের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে দিতে পারি না। নাও স্যার, ডিসিশন ইজ ইয়োর্স।"

বোর্ডরুমে এখন পিন-ড্রপ সাইলেন্স। মিস্টার গুপ্তা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে একবার অজয় বনসালের দিকে চাইলেন।

অজয় বনসাল চুপ করে রইলেন। তিনি একজন সিএফও, তিনি কেবল সংখ্যার ভাষা বোঝেন। অরুণের দেখানো ডেটাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে অরুণ আজ কোম্পানিকে বিরাট বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

রাজীব মাথুর টেবিলের দিকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। তাঁর গলায় কোনো চিৎকার নেই, বরং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও ধারালো টোনে বললেন, 

"অরুণ, তোমার এই ডেটা অ্যানালিসিস অন-পেপার বেশ ইমপ্রেসিভ শোনায়। কিন্তু রিয়ালিটি হলো, পোলারিস পোর্টস কিন্তু এই রিস্কগুলো জেনেশুনেই বিড করেছে। তাদের লিগ্যাল আর টেকনিক্যাল টিম আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কমজোরি নয়। তুমি কি বলতে চাইছ তারা এই সিআরজেড ক্লিয়ারেন্সের লুপহোলটা ধরতে পারেনি? নাকি তুমি স্রেফ অতিরিক্ত সাবধানী হয়ে ভ্যানগার্ডের একটা নিশ্চিত রেভিনিউ উইন্ডো হাতছাড়া করলে?"

গুপ্তাসাহেব কোনো কথা বললেন না। তাঁর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের কর্পোরেট কেরিয়ারে তিনি বহু প্রজেক্ট প্রপোজাল দেখেছেন। তিনি তীক্ষ্ণ চোখে প্রজেক্টরের স্ক্রিনে থাকা এনভায়রনমেন্টাল রিপোর্টের ডেট আর স্যু-মোটো নোটিসের নম্বরটা মিলিয়ে দেখছিলেন।


এই ফাঁকে, মীরা আইয়ার নিজের ল্যাপটপে দ্রুত টাইপ করে কিছু খুঁজছিলেন। স্ক্রিনে কিছু দেখে তাঁর মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। তিনি চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে সরাসরি মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকালেন।

"স্যার, অরুণ যে ফাইলটা দেখাচ্ছে, সেটার সোর্স পাবলিক ডোমেইনে না থাকলেও, এটার লিগ্যাল ইমপ্যাক্ট জেনুইন," মীরা আইয়ারের শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলা পুরো বোর্ডরুমের মনোযোগ কেড়ে নিল। 

"আমি জাস্ট দিল্লির এনজিটি (NGT) রেজিস্ট্রি থেকে ইন্টারনাল সোর্সের মাধ্যমে চেক করলাম। গ্রিন ট্রাইব্যুনাল অলরেডি এই পার্টিকুলার কোস্টাল বেল্টের ওপর একটা কড়া রুলিং ড্রাফট করে রেখেছে, যা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পাবলিশ হবে। পোলারিস পোর্টস হয়তো তাদের পলিটিক্যাল কানেকশন নিয়ে কনফিডেন্ট ছিল, কিন্তু এই ক্লিয়ারেন্স ভায়োলেশনের পর কোনো ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক তাদের এই প্রজেক্টের জন্য ফান্ড রিলিজ করবে না।"

বোর্ডরুমের আবহাওয়া এক মুহূর্তে পাল্টে গেল। রাজীব মাথুরের পিঠ সোজা হয়ে হাই-ব্যাক চেয়ারে ঠেকে গেল। তাঁর ঠোঁটের কোণের সেই সূক্ষ্ম হাসির রেখাটা এবার পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে।

সিএফও অজয় বনসাল তাঁর সামনে থাকা ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। ক্যালকুলেটিভ চোখে অরুণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 

"তার মানে তিনশো কোটির টেন্ডার জিতলেও, অন্তত আগামী এক বছর পোলারিস ইয়ার্ডের একটা ইটও নাড়াতে পারবে না। অথচ তাদের মবিলাইজেশন ক্যাপিটাল আটকে থাকবে। অরুণ, তুমি আমাদের ব্যালেন্স শিট ব্লিড হওয়া থেকে বাঁচিয়েছ, দ্যাটস আ ফ্যাক্ট। কিন্তু এই লিটিগেশনের খবর তুমি অফিশিয়াল চ্যানেলগুলোর আগে কীভাবে পেলে?"

অরুণ চ্যাটার্জী নিজের জায়গায় অত্যন্ত শান্তভাবে বসে ছিলেন। তিনি আইপ্যাডটা লক করে টেবিলের ওপর রাখলেন।

"আমি যখন মিড-সাইজ কোম্পানিতে কাজ করতাম রাজীব।" 

অরুণ উত্তরটা অজয়কে না দিয়ে সরাসরি রাজীবের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন। তাঁর স্বরে কোনো দম্ভ নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা। 

"তখন আমাদের রিসোর্স কম ছিল। তাই মাঠের ইনফরমেশন আমাদের নিজেদের জোগাড় করতে হতো। ভ্যানগার্ডের মতো বড় কর্পোরেশনে এসে আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি - আমরা টেবিলে বসে রিপোর্টের ওপর ভরসা করি বেশি, গ্রাউন্ড রিয়ালিটি দেখি না। হলদিয়া পোর্ট ট্রাস্টে আমার সোর্সের কাছ থেকে যখন আমি এই সিন্ডিকেটের খবর পাই, তখনই আমি পার্সোনালি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টিম পাঠিয়েছিলাম।"

মিস্টার গুপ্তা এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। তিনি তাঁর ফাউন্টেন পেনটার ক্যাপটা আস্তে করে টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে সামান্য সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গম্ভীর মুখাবয়বে এবার অত্যন্ত সূক্ষ্ম সন্তুষ্টির আভাস পাওয়া গেল।

"রাজীব" 

গুপ্তাসাহেবের ভারী গলা ঘরটার নীরবতা ভাঙল। 

"কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজি মানে শুধু আগ্রাসন নয়। কোন লড়াইটা লড়তে হবে আর কোনটা ছেড়ে দিতে হবে, সেটা বুঝতে পারাটাই আসল লিডারশিপ। অরুণ যদি শেষ মুহূর্তে বিড প্রত্যাহার না করত, তবে আজ আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে থার্ড কোয়ার্টারের শর্টফলের বদলে কীভাবে আমরা তিনশো কোটি টাকার একটা ডেড প্রজেক্ট থেকে নিজেদের ক্যাপিটাল উদ্ধার করব সেই নিয়ে আলোচনা হত।"

গুপ্তাসাহেব এবার অরুণের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এখন প্রচ্ছন্ন সমীহ।

"অরুণ, উইথড্র করার পর এক লাইনের ইমেইল না পাঠিয়ে, এই ফাইলটা যদি চব্বিশ ঘণ্টা আগে আমার ডেস্কে আসত, আই উড হ্যাভ বিন মোর কম্ফোর্টেবল। তবে, এন্ড রেজাল্টটা ভ্যানগার্ডের ফেভারে গেছে। ইউ সেভড আওয়ার ক্যাপিটাল, অ্যান্ড মোর ইম্পর্ট্যান্টলি, আওয়ার রেপুটেশন।"

To be continued...
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মরীচিকা ও মোহময়ী - by RockyKabir - 28-06-2026, 09:02 PM



Users browsing this thread: Blue12, Evan Sarker, 4 Guest(s)